📘 রউফুর রহীম 📄 সাত. সাফিয়্যাহ রা.-এর সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে

📄 সাত. সাফিয়্যাহ রা.-এর সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে


খাইবারে সালাম বিন আবীল হাকীকের কেল্লা বিজয়ের পর এখানকার বন্দিদের মধ্যে সাফিয়্যাহ-ও ছিলেন। বণ্টনে দিহইয়া কালবি তাকে পেয়ে যান। এদিকে আল্লাহর রাসূলের কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই একজন নেতার মেয়ে। দিহইয়া কালবির ভাগ্যে জুটেছে সে; কিন্তু সে আপনি ছাড়া অন্য কারও উপযুক্ত নয়।'

লোকটির পরামর্শ আল্লাহর রাসূলের কাছে চমৎকার মনে হলো। নবিজি দিহইয়াকে বললেন, 'তুমি বন্দিদের মধ্যে অন্য কোনো বাঁদিকে নিয়ে নাও।' এরপর আল্লাহর রাসূল সাফিয়্যাহকে নিয়ে আজাদ করে দেন। এই মুক্তিদানই ছিল তার বিয়ের মোহরানা। সাফিয়্যাহ ইসলাম গ্রহণ করেন। ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হলে আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করেন।

আল্লাহর রাসূল খাইবার থেকে বের হওয়ার আগেই সাফিয়্যাহ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হন। ফেরার পথে নবিজি তাকে নিজের পেছনে বসান। খাইবার থেকে ছয় মাইল দূরত্বে একস্থানে এসে যাত্রা বিরতি হয়। আল্লাহর রাসূল সেখানে বাসর যাপন করতে চান; কিন্তু সাফিয়্যাহ বারণ করেন। ব্যাপারটি নবিজি কিছুটা অপছন্দ করলেও তিনি তার ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করেন।

সাহবা নামক স্থানে এসে আল্লাহর রাসূল তাকে নিয়ে অবতরণ করেন। এখানে উম্মু সুলাইম সাফিয়্যার চুল আঁচড়ে দেন। সুগন্ধি মাখিয়ে বধু সাজিয়ে পাঠিয়ে দেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। নবিজি ও সাফিয়্যার বাসর রাত এখানেই যাপিত হয়। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'প্রথমবার নামতে বারণ করেছিলে কেন?' সাফিয়্যাহ বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আসলে আপনাকে ইয়াহুদিয়্যাতের গন্ধ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছি।' নবিজির কাছে এটি মহৎ কিছু মনে হলো। তিনি খুশি হলেন।

আল্লাহর রাসূল সাহবায় তিনদিন অবস্থান করেন। বিয়ের ওলিমা করে দাওয়াত করেন মুজাহিদ মুসলিমদেরকে। এই ওলিমায় গোশত ছিল না। খাবার হিসেবে ছিল খেজুর, যব ও ঘি। মুসলিমরা সাফিয়্যাহর ব্যাপারে বলছিলেন, 'তিনি একজন উম্মুল মুমিনীন; নাকি আল্লাহর রাসূলের মালিকানাধীন বাঁদি।' সফর শুরু হলে নবিজি তাকে নিজের পেছনে বসান। আবৃত করেন পর্দায়। এবার সবাই বুঝতে পারেন সাফিয়্যাহ উম্মুল মুমিনীন।

সাফিয়্যাহ যুদ্ধের আগে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাইহাকি শরিফে ইবনু 'উমার থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত আছে। ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল সাফিয়্যাহর চোখে সবুজাভ রং দেখে বললেন, 'সাফিয়্যাহ, তোমার চোখ এমন কেন?' সাফিয়্যাহ বললেন, 'সেদিন আমি ইবনু হাকীকের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুমের ঘোরে আমি স্বপ্নে দেখলাম, একটি চাঁদ আমার কোলে এসে নামল। চোখ খুলে তাকে স্বপ্নের কথা জানালাম; কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও আমায় চড় মেরে বলল, 'তুইও ইয়াসরিবের মালিককে কামনা করিস!'

অবশেষে আল্লাহ তাআলা সাফিয়্যার জীবন পরিবর্তনী স্বপ্ন পূরণ করেছেন, আল্লাহর রাসূলের সাথে বিয়ে সম্পন্ন করে সম্মানিত করেছেন, রক্ষা করেছেন জাহান্নাম থেকে। বানিয়েছেন উম্মুল মুমিনীন। খাতামুল আম্বিয়া সাইয়িদুল মুরসালীনের সঙ্গিনী করেছেন অনন্তকালের জান্নাতে। আল্লাহর রাসূল-ও তাকে স্ত্রী হিসেবে অগাধ ভালোবাসা দিয়েছেন। রেখেছিলেন উন্নত মর্যাদার আসনে। এই তো খাইবার থেকে মাদীনার দিকে ফেরার পথে সাফিয়্যাকে উটে ওঠানোর সময় হলে আল্লাহর রাসূল জানুদেশ পেতে দিতেন। শ্রেষ্ঠ মানুষটার সামনে কীভাবে বিনীত হতে হয় পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধায়, অনন্য ভব্যতা ও শিষ্টতায়, তা সাফিয়্যাকে শেখাতে হয়নি। ভালোবাসার সাথে ভব্যতার চরিত্রও মিশে গেছে তার মনের গভীরে। তাই তো নবিজির জানুদেশে তিনি পা দিতেন না; বরং হাঁটু রেখে বাহনে আরোহণ করতেন।

আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে এসে তাঁর সর্বোত্তম চরিত্র-মাধুর্য খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে সাফিয়্যার। তিনি বলছেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল-এর চেয়ে উত্তম চরিত্রের মানুষ আর দেখিনি। আমার খুব মনে আছে। খাইবারে তখন রাত নেমেছে। আল্লাহর রাসূল আমাকে নিয়ে উটে আরোহণ করলেন। আমি ছিলাম কুঁজের ওপর। একটু পর নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। বারবার আমার মাথা গিয়ে লাগছিল হাওদার সাথে। আল্লাহর রাসূল আমাকে ছুঁয়ে বলতেন, 'সাফিয়্যা, একটু ধীরে!'

সাফিয়্যা বলেন, আমি একবার জানতে পারলাম, আয়িশা ও হাফসা নিজেদের ব্যাপারে বলেছেন, আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে সাফিয়্যার চেয়ে বেশি সম্মানিত, কেননা আমরা একই সাথে তার স্ত্রী ও চাচার মেয়ে।' আমি নবিজিকে তাদের কথা জানালাম। তিনি বললেন, 'তা হলে তুমিও বলে দাও, তোমরা আমার চেয়ে উত্তম হও কীভাবে? যখন আমার স্বামী মুহাম্মাদ, বাবা হারুন ও চাচা মূসা!'

আল্লাহর রাসূলের সুমহান চরিত্র সাফিয়্যার হৃদয়ে ভালোবাসার স্নিগ্ধ অনুভূতি গড়ে তোলে। ফলে নবিজি হয়েছেন তার কাছে মা-বাবা, আত্মীয়-পরিজন; এমনকি নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। সাধ্যের সবকিছু নবিজির করকমলে সঁপে দিতেন, এমনকি নিজেকেও। আল্লাহর রাসূল কোনো অসুস্থতায় কষ্ট পেলে তিনি কামনা করতেন, এই অসুখ যদি তার হতো, যার বিনিময়ে প্রিয়তম থাকতেন নিরাপদ ও সুস্থ!

ইবনু সাআদ হাসান-সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যাইদ ইবনু আসলাম বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের অন্তিম শয্যায় সকল স্ত্রী তাঁর কাছে আসেন। সবার মধ্য থেকে সাফিয়্যাহ নবিজিকে বললেন, 'ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ, আপনার অসুস্থতা আমার হয়ে যদি আপনি সুস্থ হয়ে যেতেন!' সাফিয়্যার কথা শুনে অন্য স্ত্রীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে খোঁচা দেওয়া কথা বলেন। আল্লাহর রাসূল স্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা কুলি করো।' তারা বললেন, 'কিন্তু কেন?' নবিজি বললেন, 'তোমরা সাফিয়্যাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলেছ, এ কারণে। আল্লাহর কসম সে সত্যবাদিনী।

সাফিয়্যার সাথে আল্লাহর রাসূলের বাসর যাপনের রাতে তাদের পাহারায় থাকা আবু আইয়ুব আনসারি-এর গল্পটাও স্মরণ করতে পারি। ইবনু ইসহাক বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবারে কিংবা ফেরার পথে নিজ তাঁবুতে বাসর যাপন করেন। এদিকে আবু আইয়ুব খালিদ বিন যাইদ আনসারি খাপছাড়া তরবারি হাতে জেগে থাকেন রাতব্যাপী। নবিজির তাঁবুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিয়েছেন নিষ্ঠার সাথে। ভোরে আল্লাহর রাসূল বাইরে আসেন। আবু আইয়ুবকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করেন, 'কী ব্যাপার আবু আইয়ুব, তুমি এখানে?' তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই নারীর ব্যাপারে আমার আশঙ্কা হয়েছে। সে এমন একজন নারী, যার বাবা, স্বামী ও গোত্রের অনেকেই মুসলিমদের হাতে নিহত হয়েছে। তার কুফরের অন্ধকার থেকে ফেরাটাও বেশি দিন হয়নি। তাই ভয় হয়েছে, যদি অযাচিত কিছু করে বসে!'

চূড়ান্ত ভালোবাসা প্রকাশের এই দৃষ্টান্তে আল্লাহর রাসূল মুগ্ধ হন। তার জন্য দুআ করে বলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি আবু আইয়ুবকে সুরক্ষিত রাখো, যেমন সে বিনিদ্র থেকে আমাকে পাহারা দিয়েছে।'

সাফিয়্যাকে বিয়ে করা যেমন ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনমুখী একটি দিক, তেমনই এতে ছিল অন্তর্নিহিত কিছু কারণও। প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ কিংবা অনিবার্য কামনা তৃপ্তির জন্য নবিজি তাকে বিয়ে করেননি; বরং উদ্দেশ্য ছিল তার যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। সাফিয়্যাকে এভাবেও সুরক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, হতে পারে সে এমন কারো শয্যাসঙ্গিনী হবে, যে তার বংশীয় আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের বিষয়টা বুঝবে না। একজন নারীর জন্য এটাও একটি সান্ত্বনার বিষয়। কেননা যে নারীর বাবা, স্বামী ও গোত্রের অনেকেই মারা গেছে, তার জীবনের পথে আল্লাহর রাসূলের চেয়ে উত্তম সঙ্গী আর কে হতো?

এ ছাড়া সাফিয়্যার সাথে বিয়ের কারণে নবিজি ও ইয়াহুদিদের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে একটি বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, এর ভিত্তিতে ইসলামের প্রতি ওদের শত্রুতার মনোভাব দুর্বল হওয়াটাও স্বাভাবিক। প্রভাব ফেলে তাদের কূটকচালও ফ্যাসাদের মনোবৃত্তিতেও।

সাফিয়্যাহ ছিলেন বুদ্ধিমতী সহনশীলা ও সত্যবাদিনী। বর্ণিত আছে, তার এক বাঁদি 'উমার ইবনুল খাত্তাবের কাছে এসে অভিযোগ করে বলল, 'আমিরুল মুমিনীন, সাফিয়্যাহ তো এখনো শনিবারকে ভালোবাসে, সম্পর্ক রাখে ইয়াহুদিদের সাথে।'
'উমার তার কাছে লোক পাঠিয়ে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে সাফিয়্যা বলেন, 'আল্লাহ আমাকে জুমু'আর দিন দানের পর থেকে আমি আর শনিবারকে বিশেষ মনে করি না। আর ইয়াহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখি মর্মে আপত্তির উত্তর হলো, ওখানে আমার শেকড় গেঁথে আছে।' 'উমার তার কথা মেনে নেন। সাফিয়্যাহ বাঁদিকে জিজ্ঞেস করেন, 'কী ব্যাপার, তোকে এ কাজে কে প্ররোচিত করেছে?' বাঁদি বলল, 'আর কেউ না, শয়তান।' সাফিয়্যা বললেন, তুই আসতে পারিস, এখন থেকে তুই মুক্ত।'

মুআবিয়া-এর শাসনামলে ৫০ হিজরি সনে রামাদান মাসে তিনি মারা যান। অন্য বর্ণনা মতে ৫২হিজরি সনে। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।

টিকাঃ
[৪২১] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১০১
[৪২২] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, 'আস সীরাতুন নাবাবিয়‍্যাহ, ২/৩৮৪
[৪২৩] বাকিহাকি ফিল কিবরা, ৯/১৩৭
[৪২৪] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১২২
[৪২৫] মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৯/২৫২
[৪২৬] তিরমিযি, ৩৮৯২; হাকিম, ৪/২৯
[৪২৭] দেখুন, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনইয়াহ, ২/২৩৩
[৪২৮] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩২৮
[৪২৯] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/ ৩৫৪-৩৫৫
[৪৩০] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, 'আস সীরাতুন নাবাবিয়‍্যাহ, ২/৩৮৫
[৪৩১] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, 'আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৩৮৫

📘 রউফুর রহীম 📄 আট. দুষ্কর্মী ইয়াহুদিদের সাথে কথোপকথন, একটি ভুনা বকরি

📄 আট. দুষ্কর্মী ইয়াহুদিদের সাথে কথোপকথন, একটি ভুনা বকরি


আবু হুরাইরা বলেন, 'খাইবার বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূলকে একটি বিষমাখা ভুনা বকরি হাদিয়া দেওয়া হয়। আল্লাহর রাসূল নির্দেশ দিলেন, এখানকার সব ইয়াহুদিকে আমার সামনে হাজির করো।' ইয়াহুদিরা সমবেত হলে আল্লাহর রাসূল তাদেরকে বললেন, 'আমি তোমাদের কাছে কিছু জানতে চাইব, তোমরা আমাকে সত্য বলবে।'

তারা বলল, জি আবুল কাসিম, আমরা সত্যই বলব।
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?'
'আমাদের পিতা অমুক।'
'উঁহু, তোমরা মিথ্যা বলেছ, তোমাদের পিতা তো অমুক ব্যক্তি!'
'জি, আপনি সত্য বলেছেন।'
'আমি আবারও বলছি, আমি কিছু জানতে চাইব, তোমরা সত্য বলবে।'
‘জি, আবুল কাসিম। তা ছাড়া আমরা মিথ্যা বললে আপনি ধরতে পারবেন, যেমন বাবার ব্যাপারে ধরেছেন।’
'আচ্ছা, তা হলে বলো, কারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'
'আমরা সেখানে অল্প কিছুদিন থাকব, তারপর আমাদের মুক্তি দেওয়া হবে।'
'তোমরা এ ব্যাপারে ধোঁকার আবর্তে পড়ে আছো। আল্লাহর কসম, তোমাদের কখনোই মুক্তি দেওয়া হবে না।'
'তোমাদেরকে এখন একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সত্যি বলবে।'
'জি, সত্যি বলব।'
'তোমাদেরকে এ কাজে কে প্ররোচিত করেছে?'
'আমাদের ইচ্ছা ছিল, আপনি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকলে আমরা শান্তি পাব, আর আসলেই আপনি নবি হয়ে থাকলে এই বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।'

বুলুগুল আমানির রচয়িতা বিষমাখা বকরির ব্যাপারে বলেছেন, 'ইয়াহূদি নারী সালাম বিন মিশকামের স্ত্রী যাইনাব বিনতুল হারিস এই বকরি নবিজিকে হাদিয়া দেয়। সে আগে জেনে নিয়েছে আল্লাহর রাসূল বকরির কোন অংশ বেশি পছন্দ করেন। রানের কথা জানতে পেরে এ অংশে বিষের পরিমাণ বেশি দিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল রানের অংশ নিয়ে কেবল চিবিয়েছিলেন, গিলে ফেলেননি; কিন্তু তাঁর সাথে খাবারে শরিক হওয়া বিশর ইবনুল বারা একটি মাত্র লোকমা খাওয়ার পরই মৃত্যুবরণ করেন।'

উরওয়া মাগাযিতে উল্লেখ করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল রানের একটা অংশ নিয়ে কেবল মুখে দিয়েছেন। ওদিকে মাংস খাওয়া শুরু করেছিলেন বিশর। নবিজি একটু চেখে দেখেই উপস্থিত সাহাবিদের বললেন, 'তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও। বকরির গোশত আমাকে বলে দিচ্ছে এখানে বিষ মাখানো হয়েছে।' নবিজির কথা শুনে বিশর ইবনুল বারা বললেন, 'সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, আমার লোকমাতেও এটা আমি বুঝতে পেরেছি; কিন্তু আপনার সামনে খাবার নষ্ট করতে মন চাচ্ছিল না, তাই ফেলে দিইনি। আর আপনার খাবারে শরিক থাকার পর এই জীবনে আর কোনো চাওয়া আমার বাকি নেই। তা ছাড়া আমি ভেবেছিলাম, খাবারে বিষ থাকলে আপনি অবশ্যই ফেলে দেবেন।'

ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের কাছে মহিলাকে গ্রেফতার করে আনা হলে সে দায় স্বীকার করে বলল, 'আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছি।' নবিজি বললেন, কিন্তু আমাকে হত্যার ক্ষমতা আল্লাহ তোমাকে দেননি' সাহাবিরা মহিলাকে হত্যার অনুমতি চাইলে নবিজি বারণ করেন। তাকে কোনো প্রকার শাস্তিও দেওয়া হয়নি। এদিকে নবিজি দ্রুত আক্রান্ত সাহাবিদের চিকিৎসার জন্য গ্রীবাসন্ধিতে হিজামার নির্দেশ দেন। তারপরও কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছিলেন।'

খাবারে বিষ প্রয়োগকারী এই নারীকে হত্যা করা হয়েছিল কিনা, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। বিশুদ্ধমত হলো, বিশর-এর মৃত্যুর পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। একটি ঐতিহাসিক সত্য হলো, ইয়াহুদি নারীর মেশানো বিষ ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী। ফলে বিশর ইবনুল বারা দ্রুতই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন; আর আল্লাহর রাসূলের ওফাতের সময় এই বিষের ব্যথা তাঁকে ভীষণভাবে ভুগিয়েছে। আয়িশা বলেন, 'আল্লাহর রাসূল মৃত্যুশয্যায় বলতেন, আয়িশা, আমি এখনো খাইবারের সেই বিষের যন্ত্রণা অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, এই বিষের কারণে আমার কণ্ঠনালি বুঝি ছিঁড়ে যাবে।'

টিকাঃ
[৪৩২] বুখারি, ৩১৬৯ আহমাদ, ২/৪৫১
[৪৩৩] বুখারি, ৩১৬৯;
[৪৩৪] দেখুন, বুলুগুল আমানি ফি হাশিয়াতিল ফাতহির রাব্বানী, ২১/১২৩
[৪৩৫] মুসলিম, ২১৯০
[৪৩৬] দেখুন, উরওয়া ইবনু যুবাইর সংকলিত 'আল্লাহর রাসূলের মাগাযি, পৃ. ১৯৮
[৪৩৭] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩৩৬
[৪৩৮] বুখারি, ৪৪২৮

📘 রউফুর রহীম 📄 নয়. মাক্কা থেকে হাজ্জাজ বিন আলাত সালামির সমূহ সম্পদ নিয়ে আসা

📄 নয়. মাক্কা থেকে হাজ্জাজ বিন আলাত সালামির সমূহ সম্পদ নিয়ে আসা


আনাস ইবনু মালিক বলেন, 'খাইবার বিজয়ের পর হাজ্জাজ বিন আলাত আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মাক্কায় আমার পরিবার ও বেশ কিছু মাল-সামানা আছে। এ ক্ষেত্রে আমি আপনার ব্যাপারে কিছু বলে তাদের কাছে চিঠি লিখতে চাই।' আল্লাহর রাসূল তাকে ইচ্ছে মতো কথা বলার অনুমতি দেন।

হাজ্জাজ স্ত্রীর কাছে এসে বলল, 'তোমার কাছে যা-কিছু আছে, নিয়ে এসো। ইয়াহুদিরা মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের থেকে যে সম্পদ লাভ করেছে, আমি খাইবারে গিয়ে তা কিনতে চাচ্ছি। আর শোনো, যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হয়েছে, ইয়াহুদিরা ওদের সমস্ত সম্পদ লুট করেছে।' মক্কায় হাজ্জাজের কথা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। মিথ্যে পরাজয়ের খবর শুনে মক্কার মুসলিমদের মনে বিষণ্ণতা ছেয়ে গেলেও মুশরিকদের মাঝে আনন্দ ও খুশি দেখা দেয়।

আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের কাছেও পৌঁছে যায় এ খবর। তিনি কী এক কারণে তখন দাঁড়াতে পারছিলেন না। খবরটা শুনে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। মা'মার বলেন, 'উসমান জাযারি মিকসামের সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করে বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছেলে কুসামের হাত ধরে উঠে বসলেন আব্বাস। কুসাম বাবাকে বুকের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখেন। এ সময় আব্বাস বলছিলেন,
'পুত্র কুসামকে আমি ভীষণ ভালোবাসি/তাকে রাখি মুহাম্মাদের সাথে সাদৃশ্যে যিনি অনুগ্রহশীল রবের প্রেরিত নবি/তাঁর প্রতি অনাগ্রহী ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য।

সাবিত বিন আনাস বলেন, 'আব্বাস তার এক গোলামকে হাজ্জাজের কাছে প্রেরণ করে বলেন, 'তোমাকে তো ভালো মনে করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাদেরকে এসব কী শোনাচ্ছ? তোমার আনীত সংবাদে তো আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেননি।'

হাজ্জাজ বিন আলাত আগত গোলামকে বলল, 'আবুল ফজলকে আমার সালাম জানাবে। তাকে বলবে, তিনি যেন আমার সাথে কোনো নির্জন ঘরে বসার ব্যবস্থা করেন। কেননা, আমার আনীত প্রকৃত সংবাদ শুনে তিনি অবশ্যই খুশি হবেন।'
গোলাম ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, 'ওহে আবুল ফজল, সুসংবাদ গ্রহণ করুন।' গোলামের মুখে এইটুকু শুনেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তিনি লাফিয়ে ওঠেন। গোলামের কপালে চুমু খান। গোলাম হাজ্জাজ বিন আলাতের কথা প্রকাশ করার পর আব্বাস তাকে আজাদ করে দেন।'

এক সুযোগে হাজ্জাজ বিন আলাত আব্বাসের কাছে নির্জনে এসে বললেন, 'খুশির খবর শুনুন। আল্লাহর রাসূল খাইবার জয় করেছেন, লাভ করেছেন প্রচুর পরিমাণ গানীমাতের সম্পদ। তাদের সম্পদে আল্লাহর অংশও নির্ধারিত হয়েছে। ওদিকে আল্লাহর রাসূল সাফিয়্যাকে নিজের জন্য পছন্দ করেছেন। তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে আগে আজাদ করেছিলেন। আর আমি এখানে এসেছি আমার সম্পদ নেওয়ার জন্য। নবিজির কাছে যা ইচ্ছা বলার অনুমতি চাওয়ার পর তিনি অনুমতি দিয়েছেন। ওহে আবুল ফজল, অন্তত তিনদিন পর্যন্ত আমার ভেতরের খবর গোপন রাখবেন। তারপর যা ইচ্ছা বলতে পারবেন আপনি।'

হাজ্জাজের স্ত্রী নিজের কাছে থাকা সমস্ত অলংকার ও সামানপত্র জমা করে। সরল মনেই দিয়ে দেয় স্বামীকে। ঠিক তিনদিন পরের কথা। আব্বাস হাজ্জাজ বিন আলাতের স্ত্রীর কাছে এলেন। কুশলাদি বিনিময়ের পর বললেন, 'তোমার স্বামীর কী খবর?'
স্ত্রী বলল, 'উনি অমুক দিন এসেছিলেন, আবার চলেও গেছেন। আরেকটা কথা হলো, আল্লাহ আপনাকে লজ্জিত করবেন না। তবে আপনি যা শুনেছেন, সে কারণে আমরা বেশ কষ্ট পেয়েছি।'

আব্বাস বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ, আল্লাহ আমাকে লজ্জিত করবেন না। আর আলহামদুলিল্লাহ, মাদীনায় আমার অপছন্দের কিছুই ঘটেনি। আসল খবর শোনো, আল্লাহর রাসূলের হাতে আল্লাহ খাইবারে বিজয় দান করেছেন। সেখানে আল্লাহর অংশ নির্ধারিত হয়েছে। সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াইকে নবিজি নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। স্বামীর কাছে তোমার কোনো কাজ থাকলে তার কাছে যেতে পার।'

হাজ্জারের স্ত্রী বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে সত্যবাদীই মনে করি।' আব্বাস বললেন, হ্যাঁ আমি সত্য বলেছি।' এরপর আব্বাস সেখান থেকে চলে এসে কুরাইশের একটি আসরে উপস্থিত হন। তিনি পাশ অতিক্রমের সময় ওরা টিটকারি করে বলছিল, 'ওহে আবুল ফজল, আশা করি আপনি শুধু কল্যাণই লাভ করবেন।' তিনি কুরাইশদের বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, কল্যাণ ছাড়া আমি কিছু আশাও করি না। হাজ্জাজ বিন আলাত আমাকে বলেছে, আল্লাহর রাসূল খাইবার জয় করেছেন, সেখানে আল্লাহর অংশ আরোপিত হচ্ছে, সবিশেষ সাফিয়্যাকে নবিজি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ কথা আমি আগে বলিনি; কারণ, হাজ্জাজ আমাকে প্রকৃত বিষয়টা তিনদিন পর্যন্ত গোপন রাখবার অনুরোধ জানিয়েছিল। আর সে মূলত এসেছিল তার সম্পদ নেওয়ার জন্য। নিজের কাজ সেরে তোমাদের বোকা বানিয়ে চলেও গেছে।'

এভাবে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের মানসিক যন্ত্রণা চাপিয়ে দিলেন মুশরিকদের ওপর। আনন্দের দ্যুতিতে উজ্জ্বল হলো মুমিনদের চেহারা, বিষাদের কালো ছায়া নামল মুশরিকদের জীবনে।

হাজ্জাজ বিন আলাতের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, ক্ষেত্র বিশেষে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে মিথ্যা বলা জায়েয, যদি এতে অন্যের অনিষ্ট জড়িয়ে না থাকে। এবং যদি এটাও পরিষ্কার থাকে যে, মিথ্যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারবে। হাজ্জাজ বিন আলাত এ কাজটাই করেছেন। কারও কোনো ক্ষতি না করে মাক্কা থেকে নিজ সম্পদ নিয়ে মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়েছেন, এ ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। আর প্রাথমিকভাবে মাক্কার মুসলিমরা যে দুশ্চিন্তা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন, পরে সত্যের মাধ্যমে অর্জিত কল্যাণের তুলনায় তা সহজই বিবেচিত হবে। শেষে তো তাদের মাঝে উচ্ছ্বাসের ফল্গুধারা নেমেই এসেছিল। প্রকৃত সংবাদ শোনবার পর তাদের ঈমান হয়েছিল আগের চেয়েও মজুত, দৃঢ়। বলতে পারি, হাজ্জাজ বিন আলাতের মিথ্যার মাধ্যমে এ কল্যাণগুলোই অর্জিত হয়েছে।

টিকাঃ
[৪৩৯] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৪৫৯
[৪৪০] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, পৃ. ৪৩৯
[৪৪১] আহমাদ, ৩/১৩৮-১৩৯; বাযযার, ১৮১৬; আবু ইয়া'লা, ৩৪৭৯

📘 রউফুর রহীম 📄 দশ. খাইবার অভিযান সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধিবিধান

📄 দশ. খাইবার অভিযান সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধিবিধান


১. গৃহপালিত গাধার গোশত হারামের বিধান
খাইবার যুদ্ধের সময় রাসূল ﷺ ও ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।'

২. গর্ভবতী বন্দিনীর সাথে সহবাস হারাম
খাইবার প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসে ঈমান রাখে, সে যেন তার পানি অন্যের ক্ষেতে সিঞ্চন না করে।'

৩. গর্ভবতী নয় এমন দাসী লাভ করলে ঋতুস্রাবের আগে তার সাথে সহবাস হারাম করা হয়
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য হালাল নয় রেহেম-মুক্ততার আগে বন্দিনী নারীর সাথে সহবাস করা।'
রেহেম-মুক্ততা স্পষ্ট হবে শুধু এক হায়েজ থেকে পবিত্র হলেই। এ মহিলার জন্য ইদ্দত আবশ্যক নয়। যদিও সে কাফির স্বামীর স্ত্রী ছিল, চাই সে মারা যাক কিংবা না যাক। কেননা, ইদ্দত হলো মৃত স্বামীর জন্য শোক পালন, আর কাফিরের ক্ষেত্রে এর কোনো বিধান নেই।

৪. অবশিষ্ট সুদও হারাম করা হয়
আবু সাঈদ খুদরি ও আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহর রাসূল এক ব্যক্তিকে খাইবারে কাজে নিযুক্ত করেন। তিনি একবার নবিজির কাছে উন্নতমানের খেজুর নিয়ে আসেন। নবিজি বললেন, 'খাইবারের সব খেজুরই কি এমন?' সাহাবি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সব খেজুর এমন নয়। অন্য খেজুর দুই কিংবা তিন সেরের বিনিময়ে আমরা এই খেজুর একসের নিয়ে থাকি।' নবিজি বললেন, এমন আর করবে না। অন্য জাতের সব খেজুর আগে দিরহামের বিনিময়ে বেচে দেবে। তারপর সেই দিরহাম দিয়ে এমন উন্নত জাতের খেজুর কিনবে।'
একই শ্রেণির বস্তু কমবেশি করে লেনদেন করাকে বলে 'রিবাল ফাদলি।' যেমন—এক সের খেজুর কিনল দুই সেরের বিনিময়ে। এখানে অতিরিক্ত যা দেওয়া হচ্ছে, সেটাই সুদ। বিবৃত বর্ণনা অনুযায়ী এটা হারাম। কেননা, নবিজি এ থেকে নিষেধ করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন, 'অধিকারে থাকা খেজুর বিক্রি করে দিয়ে এর মূল্য দিয়ে যেন অন্য খেজুর ক্রয় করে।

৫. স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, খাঁটি রূপার বিনিময়ে রূপা বেচাকেনা হারাম
উবাদা ইবনু সামিত বলেন, 'খাইবার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নিষেধ করেছেন, আমরা যেন খাঁটি সোনার বিনিময়ে সোনা বেচাকেনা না করি। এমনিভাবে রুপার বিনিময়ে রুপা। নবিজি বলেছেন, 'তোমরা রুপার বিনিময়ে সোনা, কিংবা খাঁটি সোনার বিনিময়ে রুপা বেচাকেনা করতে পারো।'
এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রুপার বিনিময়ে রুপা বেচাকেনা করতে চাইলে নিরেট সমান সমান হতে হবে। কোনো প্রকার কমবেশি হওয়া যাবে না; কিন্তু যখন সোনারুপার মাঝে বেচাকেনা হবে, তখন একই ধরনের ও সমপরিমাণ হওয়া শর্ত থাকবে না। (কারণ, সোনারুপা দুটি আলাদা দুই জিনিস।)'

৬. পারস্পরিক চুক্তিতে চাষাবাদ বৈধ হওয়া
আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবারের ভূমি ইয়াহুদিদের দায়িত্বে এই শর্তে দেন যে, তারা এখানে কাজ করবে, চাষ করবে; আর উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক তারা পাবে।'
কয়েকজন গবেষক এই প্রশ্ন করে বসেছেন যে, ব্যবসার এই বিধান কেন শরিআতসিদ্ধ হলো, আর এতে হিকমতই-বা কী?
শাইখ মুহাম্মাদ আবু যুহরা এর উত্তরে বলেন, 'সম্পদ বিনিময়ের প্রচলনের ক্ষেত্রে খাইবার বিজয় ছিল সম্পূর্ণ নতুন বিজয়। সংগত কারণেই পারস্পরিক চাষাবাদের শরিআতসিদ্ধতা কাম্য ছিল। যা ইয়াসরিবে ইতঃপূর্বে ছিল না।

৭. ঘোড়ার গোশত খাওয়া হালাল হওয়া
জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবার যুদ্ধে গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম করার পর ঘোড়ার গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে অবকাশ রাখেন।'

৮. মুতআ বিবাহ হারাম হওয়া
'আলি ইবনু আবি তালিব বলেন, 'খাইবার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নারীদের সাথে মুতআ বিয়ে ও গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

৯. খাইবার যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ
উমাইয়া বিনতু আবিস সাল্‌ত বনু গিফার গোত্রের এক নারী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'বনু গিফারের কিছু নারীর সাথে আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে দেখা করতে এলাম। সঙ্গিনী নারীরা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সাধ্যমতো মুসলিমদের সাহায্য ও আঘাতপ্রাপ্তদের সেবা করার জন্য আপনার এই সফরে অংশী হতে চাচ্ছি।' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আল্লাহ বারাকাহ দান করুন, তোমরা যোগ দিতে পারো।'

আমরা নবিজির সাথে সফরে বের হলাম। খাইবারের পথে ঊষালগ্নে আল্লাহর রাসূল এক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন। আমি বাহন থেকে নামার পর নিচের কাপড়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখতে পেলাম। বিচলিত হইনি। বুঝতে পেরেছি এ আমার ঋতুস্রাবের রক্ত এবং জীবনে এই প্রথম। আমি উটের সাথে মিশে থাকছিলাম। ভীষণ সংকুচিত লাগছিল আমাকে। আল্লাহর রাসূল আমার আড়ষ্টভাব ও কাপড়ে রক্তের দাগ দেখে বললেন, 'কী ব্যাপার, মনে হয় ঋতুস্রাব এসেছে?' বললাম, 'জি।'

নবিজি বললেন, 'দেখো নিজেকে স্বাভাবিক রেখে একটা কাজ করো। একপাত্র পানি নিয়ে তাতে কিছু লবণ দাও। তারপর এই পানি দিয়ে স্রাবের রক্ত ধুয়ে ফেলে বাহনে ফিরে যাও।' এরপর দাপুটে সময় কাটে মুসলিমদের। আল্লাহ তাআলা খাইবারে বিজয় দান করেন। নবিজি আমাদের জন্য ফাই-এর একটি অংশ নির্ধারিত রাখেন। তিনি সেখান থেকে একটি মালা নিয়ে নিজ হাতে আমার গলায় পরিয়ে দেন। এখনো তা শোভা পাচ্ছে আমার গলায়। আল্লাহর কসম, আমি এটিকে কখনো আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করিনি।'

এই মালা গলায় নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি অসিয়ত করেছিলেন, এই মালা-সহই তাকে যেন সমাধিত করা হয়। জীবনে একটি অভ্যস্ততায় তিনি এগিয়েছেন। (রাসূলের শেখানো পন্থায়) লবণ ব্যবহার না করলে তিনি ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হতেন না। মৃত্যুর আগে তিনি এও অসিয়ত করেছিলেন, তার গোসলের পানিতেও যেন লবণ দেওয়া হয়।'

মুসলিমদের সাথে জিহাদে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক তরুণীর সামনে এ এক চির জীবন্ত দৃষ্টান্ত। আল্লাহর রাসূলের জীবনজুড়ে এভাবে ছিল উম্মাহর জন্য অবারিত শিক্ষার সম্ভার, জীবনের নিরাপত্তায় ও যুদ্ধের সংক্ষুব্ধতায়। তিনি ছিলেন স্পষ্ট বিশ্বাসে উদ্ভাসিত, দাসত্বের মহিমায় উজ্জ্বল, যেন তিনিও অংশী হয়েছিলেন প্রত্যেকের জীবনে।'

টিকাঃ
[৪৪২] দেখুন, যাদুল মাআদ, ১২২-১২৩। বুখারি, ৪২১৮; মুসলিম, ৫৬১
[৪৪৩] আবু দাউদ, ২১৫৮; তিরমিযি, ১১৩১; তাবাকাত, ২/১১৩
[৪৪৪] আহমাদ, ৪/১০৮; আবু দাউদ, ২১৫৮
[৪৪৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১৩৪
[৪৪৬] প্রাগুক্ত
[৪৪৭] দেখুন, সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ৩২১
[৪৪৮] দেখুন, খাতামুন নাবিয়্যীন, ২/১১০৪
[৪৪৯] বুখারি, ৫৫২৩; মুসলিম, ১৯৪১
[৪৫০] বুখারি, ৫৫২৩; মুসলিম, ১৪০৭
[৪৫১] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/২০৫
[৪৫২] আহমাদ, ৬/৩৮০; বাইহাকি ফিল কুবরা, ২/৪০৭; ইবনু সাআদ, ৮/২১৪
[৪৫৩] দেখুন, গাযবান রচিত ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৫৩৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px