📘 রউফুর রহীম 📄 চার. গ্রাম্য শহীদ, কৃষ্ণা রাখাল এবং জাহান্নামের যাত্রী যে বীর

📄 চার. গ্রাম্য শহীদ, কৃষ্ণা রাখাল এবং জাহান্নামের যাত্রী যে বীর


১. গ্রাম্য শহীদ
যুদ্ধের সামান্য অবসরে এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে আল্লাহর রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন। আনুগত্য প্রকাশ করে বলেন, 'আমি আপনার সাথে হিজরাত করতে চাই।' নবিজি কয়েকজন সাহাবির দায়িত্বে তাকে সোপর্দ করেন। সময়ের বহতায় খাইবর যুদ্ধ চলে আসে। আল্লাহর রাসূল গানীমাতের একটা অংশ তার জন্যেও বরাদ্দ রাখেন। তিনি উপস্থিত না থাকায় তা সাথিদের দেন। ইনি চারণভূমিতে পশু চরাতেন। কাজ শেষে ফিরে আসার পর সাথিরা গানীমাতের বণ্টিত অংশ তাকে দিয়ে দেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কীসের সম্পদ? সাথিরা বললেন, 'এগুলো আল্লাহর রাসূল তোমার জন্য রেখেছেন।'

গ্রাম্য সাহাবি এগুলো নিয়ে নবিজির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এগুলো কী জন্য?' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'গানীমাতের এই অংশটা তোমার জন্য রেখেছি।' সাহাবি বললেন, 'আমি এজন্য আপনার অনুসরণ করিনি; আমি আপনার অনুসারী হওয়ার উদ্দেশ্য হলো, আমার গলার এই জায়গাটার এসে তির বিদ্ধ হবে, এরপর আমি মৃত্যুবরণ করে জান্নাতে প্রবেশ করব!’

আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘তুমি আল্লাহর জন্য সত্য বলে থাকলে তিনি তোমার ইচ্ছা সত্যে পরিণত করবেন।’ কিছুক্ষণ পর এই গ্রাম্য সাহাবি জিহাদে অংশ নেন। শাহাদাতের পর তার লাশ নবিজির সামনে পেশ করা হয়। নবিজি বললেন, ‘এ সেই লোকটা না?’ সাহাবিরা বললেন, ‘জি’। সমাহিত করার আগে আল্লাহর রাসুল নিজের জুব্বা দিয়ে এই সাহাবির কাফন পরান। তার জানাযার সালাত পড়িয়ে দুয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, তোমার এই বান্দা তোমার রাস্তায় হিজরতের জন্য বেরিয়েছে। এখন সে শহীদ। আর আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছি।’

২. কৃষ্ণ রাখাল
খায়বারে একজন কৃষ্ণ হাবশি গোলাম তার মালিকের পশু চরাতো। সে খায়বারের লোকদেরকে অস্ত্র ধরতে দেখে বলল, ‘আপনারা কী করতে চাচ্ছেন?’ ইয়াহুদিরা বলল, ‘আমরা এই লোকটার সাথে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, সে নিজেকে নবি বলে দাবি করে।’ নবুওয়াত শব্দটা তার মনে রেখাপাত করে। যেন উদয় ঘটে আলোর। সে মেষপাল নিয়েই আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে বলল, ‘আপনি কীসের দিকে আহ্বান করেন?’ নবিজি বললেন, ‘আমি ইসলামের দিকে ডাকি এবং এ সাক্ষ্য দিতে বলি—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি আল্লাহর রাসুল এবং তুমি আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদাত করবে না।’

গোলাম বলল, ‘আমি যদি সাক্ষ্য দিই, ঈমান আনি আল্লাহর ওপর, তা হলে বিনিময়ে কী পাব?’ নবিজি বললেন, ‘ঈমানের ওপর তোমার মৃত্যু হলে জান্নাত লাভ করবে।’
হাবশি লোকটা ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, এই পশুগুলো আমার কাছে আমানত, এগুলো নিয়ে এখন আমি কী করতে পারি?’ আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘এগুলো বের করে মাঠে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তোমার আমানত যথাস্থানে পৌঁছে দেবেন।’ নতুন হাবশি সাহাবি তা-ই করেন। আল্লাহর ইশারায় পশুগুলো মালিকের কাছে চলে আসে। ইয়াহুদি বুঝতে পারে তার গোলাম ইসলাম গ্রহণ করেছে।

ইয়াহুদিদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপট চলে আসে। আল্লাহর রাসূল ﷺ সমবেত সাহাবিদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের জিহাদের প্রতি উজ্জীবিত করেন। শুরু হয় যুদ্ধ। যাদের ব্যাপারে শাহাদাত লিপিবদ্ধ ছিল, তারা শহীদ হন। এই মিছিলে হাবশি রাখাল সাহাবিও ছিলেন। মুসলিমরা তাকে সেনা ছাউনিতে নিয়ে আসেন। তারা ভেবেছিলেন আল্লাহর রাসূল এখানে আসবেন। নবিজি সাহাবিদের সামনে এসে বললেন, 'আল্লাহ তার এই বান্দাকে সম্মানিত করেছেন। নিয়ে এসেছেন খাইবারে। আমি তার মাথার কাছে দুজন হুর দেখেছি, অথচ সে আল্লাহর জন্য একটি সিজদাও করেনি।

৩. একজন বীরের শেষ পরিণতি
খাইবার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীতে একজন যোদ্ধা ছিলেন, মুশরিকদের যাকেই পাচ্ছেন, কাটছেন। তার তরবারির আঘাত থেকে নিস্তার পাচ্ছে না কেউ। অসীম বীরত্বের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন তিনি। তার ব্যাপারেই আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সে তো জাহান্নামি।' সাহাবিরা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'সে যদি জাহান্নামি হয়, তা হলে আমাদের আর কে জান্নাতি হবে!' একজন সাহাবি বললেন, 'আল্লাহর কসম, সে এই অবস্থায় মরতে পারে না।' তিনি ওই লড়াকুর পিছু নিলেন। দেখলেন, যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ক্ষতস্থানের ব্যথা তীব্র হলে সে তার তরবারি মাটিতে রেখে এর ধারালো ডগা রাখে বুকের মাঝখানে। এরপর নিজেকে তরবারিতে ছেড়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে।

এই দৃশ্য দেখে সাহাবি আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।' নবিজি বললেন, 'তা হঠাৎ একথা বলছ?' সাহাবি পুরো খবর তাকে জানালেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'মানুষের কাছে মনে হয় এক ব্যক্তি জান্নাতের আমল করছে, অথচ সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, আরেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে মনে হয় সে জাহান্নামের আমল করছে, অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। '

টিকাঃ
[৪০৫] নাসাঈ, ৪/ ৬১-৬২; হাকিম, ৩/ ৫৯৫-৫৯৬
[৪০৬] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩২৩, ৩২৪
[৪০৭] বুখারি, ৪২০২; বাইহাকি ফি দালায়িলিন নুবুওয়াহ, ৪/২৫২

📘 রউফুর রহীম 📄 পাঁচ. হাবাশা থেকে জা'ফার ইবনু আবি তালিব ও সাথিদের প্রত্যাবর্তন

📄 পাঁচ. হাবাশা থেকে জা'ফার ইবনু আবি তালিব ও সাথিদের প্রত্যাবর্তন


খাইবার বিজয়ের দিন জা'ফার বিন আবি তালিব হাবাশা থেকে আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে আসেন। আল্লাহর রাসূল তাকে বুকে টেনে নেন, চুমু খান কপালে—দু চোখের মাঝখানে। আনন্দিত গলায় বলেন, 'বুঝতে পারছি না, কোন কারণে আমি বেশি উচ্ছ্বসিত, খাইবার বিজয়ে নাকি জা'ফারের প্রত্যাবর্তনে।'

এর আগে আল্লাহর রাসূল বাদশা নাজ্জাশির কাছে সেখানে হিজরাত করা সাহাবিদের সন্ধানে আমর বিন উমাইয়া যমরি-কে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দুটি জাহাজে সাহাবিদের নিয়ে আসেন। ঠিক খাইবার বিজয়ের দিন তারা ফিরে আসেন। জা'ফার ফিরে আসার সময় আবু মূসা আশআরি ও তার অন্যান্য আশআরি সাথিদেরও সঙ্গে নিয়ে আসেন।

এ ব্যাপারে আবু মূসা আশআরি নিজেই বলেন, 'আল্লাহর রাসূল-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির খবর যখন আমাদের কাছে আসে, তখনো আমরা ইয়েমেনে। আমার দু'ভাইয়ের সাথে হিজরাতের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলাম। আমার ভাই দুজন হলেন, আবু বুরদাহ ও আবু রেহেম। আশআরি কাফেলায় আমিই ছিলাম সবার ছোট।' বর্ণনাকারী বলেন, কাফেলার জনসংখ্যার ব্যাপারে আবু মূসা থেকে তিনটি মত পাওয়া যায়। সবগুলো মত অনুযায়ী তার ভাষ্য হলো, 'হিজাজের সফরে আমি ছিলাম পঞ্চাশের অধিক বায়ান্ন কিংবা তেপ্পান্নজন সাথির সাথে। আমরা নদীপথে একটা নৌকায় যাত্রা করেছিলাম। নিয়তির নিপুণতায় এটি আমাদেরকে নিয়ে নোঙর করে নাজ্জাশির দেশ হাবাশায়। এখানে জা'ফারের সাথে আমাদের দেখা হয়। আমরা সবাই কিছুদিন সেখানে অবস্থান করি। তারপর মাদীনায় এসে দেখি আল্লাহর রাসূল এই মাত্র খাইবার দুর্গ জয় করেছেন। '

জা'ফার ও তার সাথিরা সেখানে অবস্থান করেছেন দশ বছরেরও বেশি সময়। কুরআনের বহু অংশ নাযিল হয়েছে ইতোমধ্যে। কাফিরদের সাথে সংঘটিত হয়েছে বহু যুদ্ধ। মুসলিমদের সাধারণ হিজরাতের পূর্বাপর অবস্থার মধ্যে এসেছে স্পষ্ট পরিবর্তন। নির্ণিত হয়েছে মর্যাদার স্তর। ফলে অনেকেই মনে করতে থাকে হাবাশায় হিজরাতকারীরা এই সৌভাগ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। তাদের মর্যাদা অন্যদের চেয়ে কম।

এ ব্যাপারে আবু মূসা আশআরি বলেন, আমাদেরকে অনেকেই বলত, 'আমরা হিজরাত করে অনেক আগেই মাদীনায় এসেছি, আর তোমরা মাদীনায় হিজরাত করেছ অনেক দেরিতে।' তাদের এই দেরিতে হিজরাতের কথাটা আমাদেরকে একটু নিচু করে রাখত যেন। আমাদের সাথে হাবশা থেকে মাদীনায় এসেছিলেন আসমা বিনতে উমাইস। আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী হাফসার সাথে তিনি একবার দেখা করতে আসেন। দুজনে গল্প করছিলেন, এমন সময় 'উমার সেখানে এসে পড়েন। তিনি আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, 'ইনি কে?' হাফসা বললেন, 'ইনি আসমা বিনতে উমাইস।' 'উমার বললেন, 'ও! ইনি তো হাবাশায় ছিলেন, সমুদ্রে সফর করেছেন।' আসমা বললেন, 'হ্যাঁ, আমি সেই নারী।'

'উমার বললেন, 'হিজরাতে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রবর্তী। তাই তোমাদের চেয়ে আমরা আল্লাহর রাসূলের নৈকট্যের বেশি অধিকার রাখি।' আসমা রেগে গেলেন। ক্রোধের রেশ মেশানো কণ্ঠে বললেন, 'এমন কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা আল্লাহর রাসূলের কাছে ছিলেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন, অন্ধকে শিক্ষা দিতেন। আর আমরা এমন লোকদের মাঝে ছিলাম, যারা শুধু দীন থেকে দূরে ছিল না; দীন ছিল তাদের শত্রু। আমাদেরকে এসব কষ্ট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সহ্য করতে হয়েছে। আল্লাহর কসম, আপনার কথাটি আমি আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস করব, এর আগ পর্যন্ত খানাপিনা কিছুই করব না। আমি মিথ্যা বলব না। আমার কথায় এদিক সেদিকও হবে না। আমার পক্ষ থেকে বাড়িয়েও বলব না।'

আল্লাহর রাসূল এলে আসমা জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ, 'উমার আমাদেরকে এমন এমন কথা বলেছেন।' সবটা শুনে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তুমি তাকে কী উত্তর দিয়েছ?' তিনি বললেন, 'আমি এভাবে উত্তর দিয়েছি।' নবিজি বললেন, 'ওরা তোমাদের চেয়ে আমার নৈকট্যের বেশি অধিকার রাখে না। কারণ, 'উমার ও তার সাথিরা একবার হিজরাত করেছে, আর তোমরা হিজরাত করেছ দুইবার।'

আসমা এই স্বর্ণবিন্দু গ্রহণ করে ডগমগ আনন্দে হাবাশা থেকে আসা সবার মাঝে প্রচার করেন। তিনি বলেন, 'তারা প্রায়ই আমার কাছে এসে এই হাদীস শুনে যেত। পৃথিবীতে তাদের কাছে আল্লাহর রাসূলের এই সুসংবাদের চেয়ে মহৎ আর কিছুই ছিল না।' খাইবার অভিযানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের অনুমতি নিয়ে নবিজি এদের মাঝেও গানীমাতের সম্পদ বণ্টন করেছেন।

টিকাঃ
[৪০৮] ইবনু সাআদ, ৪/৩৫; হাকিম, ৩/৪০৮, ৪০৯
[৪০৯] দেখুন, মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৫৩
[৪১০] বুখারি, ৪২৩০; মুসলিম, ২৫০২
[৪১১] দেখুন, ফিকহুস সীরাহ লিল গাযালি, পৃ. ৩৫০
[৪১২] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/৯৬

📘 রউফুর রহীম 📄 ছয়. গানীমাত বণ্টন

📄 ছয়. গানীমাত বণ্টন


ভূমি, খেজুর বাগান, পোশাক ও খাদ্যদ্রব্য—সবদিক থেকেই খাইবারে আল্লাহর রাসূল সবচেয়ে বেশি গানীমাতের সম্পদ লাভ করেছেন। সীরাহ গ্রন্থসমূহের আলোকে গানীমাত সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব।

ক. খাদ্যদ্রব্য। খাইবারের দুর্গগুলো থেকে মুসলিমরা প্রচুর পরিমাণে খাদ্য গানীমাত লাভ করেছেন। দুর্গগুলো থেকে পাওয়া গেছে চর্বি, তেল, মধু, ঘি ও আরো অন্যান্য জিনিস। নবিজি এখান থেকে খাওয়ার সাধারণ অনুমতি দেন। এক পঞ্চমাংশ নিজের জন্য রাখেননি।
খ. পোশাক, উট, গাভী ও মেষ। আল্লাহর রাসূল এখান থেকে খুমুস (এক পঞ্চমাংশ) গ্রহণ করেন। আল্লাহর নির্দেশিত খাতের জন্য রেখে দেন। আর বাকিগুলো যোদ্ধা সাহাবিদের মাঝে বণ্টন করেন।
গ. বন্দি। ইয়াহুদিদের বহু নারী বন্দি হয় এ যুদ্ধে। এই বন্দিদেরকেও মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করেন। এরাও গানীমাত। গানীমাতের হুকুম এদের ওপর বর্তাবে।
ঘ. খাইবারের ভূমি ও খেজুর বাগান নবিজি ৩৬ ভাগে ভাগ করেন। প্রত্যেক ভাগে রাখেন একশটি অংশ। মোট অংশ দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ৬শো। আল্লাহর রাসূল ও মুসলিমদের জন্য রাখা হয় অর্ধেক যার পরিমাণ ১৮-শো। আর বাকি অর্ধেক বণ্টন করেন এখানকার মুসলিমদের নায়েবদের মাঝে এবং যারা মুসলিমদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে।
ঙ. গানীমাতের সম্পদের মাঝে তাওরাতের কিছু কপিও ছিল। ইয়াহুদিরা সেগুলো ফেরত চায়। নবিজি তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি রোমানদের মতো করেননি। ওরা বিজয় লাভের পর কিতাবাদি পুড়িয়ে ফেলত, পা দিয়ে মাড়াত। খ্রিষ্টানদের মতোও করেননি তিনি। খ্রিষ্টানরা আন্দালুস বিজয়ের পর সেখানকার তাওরাতের কপিগুলো আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

আল্লাহর রাসূল ﷺ ইয়াহুদিদেরকে খাইবার থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তারা বলল, 'এখানে চাষাবাদের ব্যাপারে আমরা বেশি অভিজ্ঞ।' নবিজি তাদের প্রস্তাব ভেবে দেখে থাকার অনুমতি দেন—শর্ত হলো, বাগানের ফলমূলের অর্ধেক মুসলিমদেরকে দিতে হবে। আর মুসলিমদের এ অধিকার থাকবে যে, তারা যখন ইচ্ছা তার অংশ নিতে পারবে এবং যখন ইচ্ছা তাদেরকে দেশান্তরে বাধ্য করতে পারবে।

শর্তারোপ করার ক্ষেত্রে এখানে আল্লাহর রাসূলের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছে। ইয়াহুদিরা তাদের আবাসভূমিতে থাকলে নিজেদের খাটাখাটুনি ছাড়াই আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদদের খাদ্যের পূর্ণ জোগান হয়ে যাবে। অন্যদিক থেকে ইয়াহুদিরা এই ভূমির আসল মালিক ছিল। এখানকার কৃষি কাজের ব্যাপারে ওরাই সর্বাধিক অবহিত। ফলে ওরা থাকলে অধিক ও উন্নত ফলমূল উৎপন্ন হবে। বিশেষ করে শ্রমের বিনিময়ে তো তারা কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করবে না; বরং তাদের থেকে সময় মতো নেওয়া হবে বাগানে উৎপন্ন ফলের নির্ধারিত অংশ।

আল্লাহর রাসূল আরেকটি শর্ত যুক্ত করেছেন, তা হলো, মুসলিমরা যখন ইচ্ছা ইয়াহুদিদেরকে দেশান্তরে বাধ্য করতে পারবে। এভাবে তাদেরকে দুর্বল করার পাশাপাশি ক্ষমতার মেরুদণ্ডও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কেননা, এই শর্তের কারণে ওরা সহজেই বুঝে নিয়েছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিলে তাদেরকে অবশ্যই বিতাড়িত করা হবে, আর কখনোই ফিরে আসতে পারবে না।

খাইবারের ইয়াহুদিরা সোনারুপা লুকিয়ে রাখা ও বনু কুরাইযায় নিহত হুয়াই বিন আখতাবের মিশক গোপন করার চেষ্টা করেছিল। বনু নাযির দেশান্তর হওয়ার সময় সাথে করে এই মিশকও নিয়েছিল। খাইবার বিজয়ের পর কোথাও এই মিশক না পেয়ে আল্লাহর রাসূল হুয়াই বিন আখতাবের চাচাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হুয়াই বিন আখতাবের মিশক কোথায়?' বুড়ো বলল, 'যুদ্ধের কারণে কোথায় চাপা পড়েছে জানি না।'

আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সমস্যা নেই, আমরা অচিরেই এর চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ লাভ করব।' বুড়ো মুখ খুলছে না। কীভাবে খোলা যায়? এ দায়িত্ব দিলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম-এর হাতে। যুবাইর কেবল উত্তম-মাধ্যম দেওয়া শুরু করছিলেন, এরই মধ্যে বুড়ো অশনি সংকেত বুঝতে পেরে মুখ খুলে বলল, 'আমি হুয়াইকে দেখেছিলাম, সে এখানকার এই ধ্বংসস্তূপে ঘোরাঘুরি করে কী যেন খুঁজছিল।' সাহাবায়ে কেরাম সেখানে গিয়ে স্তূপের নিচে মিশক খুঁজে পান।

খাইবারের ইয়াহুদিদের সাথে আল্লাহর রাসূলের মীমাংসা হওয়ার পর তিনি এখানে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে বাৎসরিক কর আদায়কারী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি প্রতি বছর এসে সার্বিক অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করে ন্যায়পরায়ণতার সাথে কর নিরূপণ করতেন। ইয়াহুদিরা একবার আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে তাঁর কঠোরতা নিয়ে অভিযোগ করে; ওদিকে তারা আবার আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকেও ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আবদুল্লাহ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, 'ওরে আল্লাহর শত্রুর দল, তোরা আমাকে ঘুষ খাওয়াতে চাচ্ছিস! আল্লাহর কসম, আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষের পক্ষ থেকে এসেছি, আর তারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত সম্প্রদায়। এই তো তোরাই কৃতকর্মের কারণে বানর ও শূকরে পরিণত হয়েছিলি! তবে হ্যাঁ, তোদের প্রতি ঘৃণা আর তার প্রতি ভালোবাসা আমাকে ইনসাফের বৃত্ত থেকে বাইরে আনতে পারবে না।' ইয়াহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ এই ইনসাফের ভিত্তিতেই তো আসমান-যমিন স্থির আছে।”

খাইবার পুরোপুরি মুসলিমদের মালিকানায় চলে আসে। হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইবনু 'উমার বলেন, 'খাইবার বিজয়ের আগে আমরা তৃপ্তিভরে খেতে পারতাম না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও অর্জিত হয় খাইবার বিজয়ের পর। মুহাজির সাহাবিরা হিজরাতের পর পাওয়া দানের খেজুর বাগান ফিরিয়ে দেন আনসার সাহাবিদেরকে।

টিকাঃ
[৪১৩] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১৪১
[৪১৪] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/ ১৪১-১৪২
[৪১৫] দেখুন, আবু শুহবা রচিত 'আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪১৯
[৪১৬] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ৩/৩২৮
[৪১৭] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/৩২৬
[৪১৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, পৃ. ৪২৪
[৪১৯] দেখুন, যাহাবির 'তারিখুল ইসলাম, ও ওয়াকিদির মাগাযি, পৃ. ৪২৪
[৪২০] দেখুন, শামি রচিত 'মিন মুয়াইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৫২

📘 রউফুর রহীম 📄 সাত. সাফিয়্যাহ রা.-এর সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে

📄 সাত. সাফিয়্যাহ রা.-এর সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে


খাইবারে সালাম বিন আবীল হাকীকের কেল্লা বিজয়ের পর এখানকার বন্দিদের মধ্যে সাফিয়্যাহ-ও ছিলেন। বণ্টনে দিহইয়া কালবি তাকে পেয়ে যান। এদিকে আল্লাহর রাসূলের কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই একজন নেতার মেয়ে। দিহইয়া কালবির ভাগ্যে জুটেছে সে; কিন্তু সে আপনি ছাড়া অন্য কারও উপযুক্ত নয়।'

লোকটির পরামর্শ আল্লাহর রাসূলের কাছে চমৎকার মনে হলো। নবিজি দিহইয়াকে বললেন, 'তুমি বন্দিদের মধ্যে অন্য কোনো বাঁদিকে নিয়ে নাও।' এরপর আল্লাহর রাসূল সাফিয়্যাহকে নিয়ে আজাদ করে দেন। এই মুক্তিদানই ছিল তার বিয়ের মোহরানা। সাফিয়্যাহ ইসলাম গ্রহণ করেন। ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হলে আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করেন।

আল্লাহর রাসূল খাইবার থেকে বের হওয়ার আগেই সাফিয়্যাহ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হন। ফেরার পথে নবিজি তাকে নিজের পেছনে বসান। খাইবার থেকে ছয় মাইল দূরত্বে একস্থানে এসে যাত্রা বিরতি হয়। আল্লাহর রাসূল সেখানে বাসর যাপন করতে চান; কিন্তু সাফিয়্যাহ বারণ করেন। ব্যাপারটি নবিজি কিছুটা অপছন্দ করলেও তিনি তার ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করেন।

সাহবা নামক স্থানে এসে আল্লাহর রাসূল তাকে নিয়ে অবতরণ করেন। এখানে উম্মু সুলাইম সাফিয়্যার চুল আঁচড়ে দেন। সুগন্ধি মাখিয়ে বধু সাজিয়ে পাঠিয়ে দেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। নবিজি ও সাফিয়্যার বাসর রাত এখানেই যাপিত হয়। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'প্রথমবার নামতে বারণ করেছিলে কেন?' সাফিয়্যাহ বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আসলে আপনাকে ইয়াহুদিয়্যাতের গন্ধ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছি।' নবিজির কাছে এটি মহৎ কিছু মনে হলো। তিনি খুশি হলেন।

আল্লাহর রাসূল সাহবায় তিনদিন অবস্থান করেন। বিয়ের ওলিমা করে দাওয়াত করেন মুজাহিদ মুসলিমদেরকে। এই ওলিমায় গোশত ছিল না। খাবার হিসেবে ছিল খেজুর, যব ও ঘি। মুসলিমরা সাফিয়্যাহর ব্যাপারে বলছিলেন, 'তিনি একজন উম্মুল মুমিনীন; নাকি আল্লাহর রাসূলের মালিকানাধীন বাঁদি।' সফর শুরু হলে নবিজি তাকে নিজের পেছনে বসান। আবৃত করেন পর্দায়। এবার সবাই বুঝতে পারেন সাফিয়্যাহ উম্মুল মুমিনীন।

সাফিয়্যাহ যুদ্ধের আগে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাইহাকি শরিফে ইবনু 'উমার থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত আছে। ইবনু 'উমার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল সাফিয়্যাহর চোখে সবুজাভ রং দেখে বললেন, 'সাফিয়্যাহ, তোমার চোখ এমন কেন?' সাফিয়্যাহ বললেন, 'সেদিন আমি ইবনু হাকীকের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুমের ঘোরে আমি স্বপ্নে দেখলাম, একটি চাঁদ আমার কোলে এসে নামল। চোখ খুলে তাকে স্বপ্নের কথা জানালাম; কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও আমায় চড় মেরে বলল, 'তুইও ইয়াসরিবের মালিককে কামনা করিস!'

অবশেষে আল্লাহ তাআলা সাফিয়্যার জীবন পরিবর্তনী স্বপ্ন পূরণ করেছেন, আল্লাহর রাসূলের সাথে বিয়ে সম্পন্ন করে সম্মানিত করেছেন, রক্ষা করেছেন জাহান্নাম থেকে। বানিয়েছেন উম্মুল মুমিনীন। খাতামুল আম্বিয়া সাইয়িদুল মুরসালীনের সঙ্গিনী করেছেন অনন্তকালের জান্নাতে। আল্লাহর রাসূল-ও তাকে স্ত্রী হিসেবে অগাধ ভালোবাসা দিয়েছেন। রেখেছিলেন উন্নত মর্যাদার আসনে। এই তো খাইবার থেকে মাদীনার দিকে ফেরার পথে সাফিয়্যাকে উটে ওঠানোর সময় হলে আল্লাহর রাসূল জানুদেশ পেতে দিতেন। শ্রেষ্ঠ মানুষটার সামনে কীভাবে বিনীত হতে হয় পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধায়, অনন্য ভব্যতা ও শিষ্টতায়, তা সাফিয়্যাকে শেখাতে হয়নি। ভালোবাসার সাথে ভব্যতার চরিত্রও মিশে গেছে তার মনের গভীরে। তাই তো নবিজির জানুদেশে তিনি পা দিতেন না; বরং হাঁটু রেখে বাহনে আরোহণ করতেন।

আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে এসে তাঁর সর্বোত্তম চরিত্র-মাধুর্য খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে সাফিয়্যার। তিনি বলছেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল-এর চেয়ে উত্তম চরিত্রের মানুষ আর দেখিনি। আমার খুব মনে আছে। খাইবারে তখন রাত নেমেছে। আল্লাহর রাসূল আমাকে নিয়ে উটে আরোহণ করলেন। আমি ছিলাম কুঁজের ওপর। একটু পর নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। বারবার আমার মাথা গিয়ে লাগছিল হাওদার সাথে। আল্লাহর রাসূল আমাকে ছুঁয়ে বলতেন, 'সাফিয়্যা, একটু ধীরে!'

সাফিয়্যা বলেন, আমি একবার জানতে পারলাম, আয়িশা ও হাফসা নিজেদের ব্যাপারে বলেছেন, আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে সাফিয়্যার চেয়ে বেশি সম্মানিত, কেননা আমরা একই সাথে তার স্ত্রী ও চাচার মেয়ে।' আমি নবিজিকে তাদের কথা জানালাম। তিনি বললেন, 'তা হলে তুমিও বলে দাও, তোমরা আমার চেয়ে উত্তম হও কীভাবে? যখন আমার স্বামী মুহাম্মাদ, বাবা হারুন ও চাচা মূসা!'

আল্লাহর রাসূলের সুমহান চরিত্র সাফিয়্যার হৃদয়ে ভালোবাসার স্নিগ্ধ অনুভূতি গড়ে তোলে। ফলে নবিজি হয়েছেন তার কাছে মা-বাবা, আত্মীয়-পরিজন; এমনকি নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। সাধ্যের সবকিছু নবিজির করকমলে সঁপে দিতেন, এমনকি নিজেকেও। আল্লাহর রাসূল কোনো অসুস্থতায় কষ্ট পেলে তিনি কামনা করতেন, এই অসুখ যদি তার হতো, যার বিনিময়ে প্রিয়তম থাকতেন নিরাপদ ও সুস্থ!

ইবনু সাআদ হাসান-সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যাইদ ইবনু আসলাম বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের অন্তিম শয্যায় সকল স্ত্রী তাঁর কাছে আসেন। সবার মধ্য থেকে সাফিয়্যাহ নবিজিকে বললেন, 'ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ, আপনার অসুস্থতা আমার হয়ে যদি আপনি সুস্থ হয়ে যেতেন!' সাফিয়্যার কথা শুনে অন্য স্ত্রীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে খোঁচা দেওয়া কথা বলেন। আল্লাহর রাসূল স্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা কুলি করো।' তারা বললেন, 'কিন্তু কেন?' নবিজি বললেন, 'তোমরা সাফিয়্যাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলেছ, এ কারণে। আল্লাহর কসম সে সত্যবাদিনী।

সাফিয়্যার সাথে আল্লাহর রাসূলের বাসর যাপনের রাতে তাদের পাহারায় থাকা আবু আইয়ুব আনসারি-এর গল্পটাও স্মরণ করতে পারি। ইবনু ইসহাক বলেন, 'আল্লাহর রাসূল খাইবারে কিংবা ফেরার পথে নিজ তাঁবুতে বাসর যাপন করেন। এদিকে আবু আইয়ুব খালিদ বিন যাইদ আনসারি খাপছাড়া তরবারি হাতে জেগে থাকেন রাতব্যাপী। নবিজির তাঁবুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিয়েছেন নিষ্ঠার সাথে। ভোরে আল্লাহর রাসূল বাইরে আসেন। আবু আইয়ুবকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করেন, 'কী ব্যাপার আবু আইয়ুব, তুমি এখানে?' তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই নারীর ব্যাপারে আমার আশঙ্কা হয়েছে। সে এমন একজন নারী, যার বাবা, স্বামী ও গোত্রের অনেকেই মুসলিমদের হাতে নিহত হয়েছে। তার কুফরের অন্ধকার থেকে ফেরাটাও বেশি দিন হয়নি। তাই ভয় হয়েছে, যদি অযাচিত কিছু করে বসে!'

চূড়ান্ত ভালোবাসা প্রকাশের এই দৃষ্টান্তে আল্লাহর রাসূল মুগ্ধ হন। তার জন্য দুআ করে বলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি আবু আইয়ুবকে সুরক্ষিত রাখো, যেমন সে বিনিদ্র থেকে আমাকে পাহারা দিয়েছে।'

সাফিয়্যাকে বিয়ে করা যেমন ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনমুখী একটি দিক, তেমনই এতে ছিল অন্তর্নিহিত কিছু কারণও। প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ কিংবা অনিবার্য কামনা তৃপ্তির জন্য নবিজি তাকে বিয়ে করেননি; বরং উদ্দেশ্য ছিল তার যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। সাফিয়্যাকে এভাবেও সুরক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, হতে পারে সে এমন কারো শয্যাসঙ্গিনী হবে, যে তার বংশীয় আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের বিষয়টা বুঝবে না। একজন নারীর জন্য এটাও একটি সান্ত্বনার বিষয়। কেননা যে নারীর বাবা, স্বামী ও গোত্রের অনেকেই মারা গেছে, তার জীবনের পথে আল্লাহর রাসূলের চেয়ে উত্তম সঙ্গী আর কে হতো?

এ ছাড়া সাফিয়্যার সাথে বিয়ের কারণে নবিজি ও ইয়াহুদিদের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে একটি বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, এর ভিত্তিতে ইসলামের প্রতি ওদের শত্রুতার মনোভাব দুর্বল হওয়াটাও স্বাভাবিক। প্রভাব ফেলে তাদের কূটকচালও ফ্যাসাদের মনোবৃত্তিতেও।

সাফিয়্যাহ ছিলেন বুদ্ধিমতী সহনশীলা ও সত্যবাদিনী। বর্ণিত আছে, তার এক বাঁদি 'উমার ইবনুল খাত্তাবের কাছে এসে অভিযোগ করে বলল, 'আমিরুল মুমিনীন, সাফিয়্যাহ তো এখনো শনিবারকে ভালোবাসে, সম্পর্ক রাখে ইয়াহুদিদের সাথে।'
'উমার তার কাছে লোক পাঠিয়ে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে সাফিয়্যা বলেন, 'আল্লাহ আমাকে জুমু'আর দিন দানের পর থেকে আমি আর শনিবারকে বিশেষ মনে করি না। আর ইয়াহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখি মর্মে আপত্তির উত্তর হলো, ওখানে আমার শেকড় গেঁথে আছে।' 'উমার তার কথা মেনে নেন। সাফিয়্যাহ বাঁদিকে জিজ্ঞেস করেন, 'কী ব্যাপার, তোকে এ কাজে কে প্ররোচিত করেছে?' বাঁদি বলল, 'আর কেউ না, শয়তান।' সাফিয়্যা বললেন, তুই আসতে পারিস, এখন থেকে তুই মুক্ত।'

মুআবিয়া-এর শাসনামলে ৫০ হিজরি সনে রামাদান মাসে তিনি মারা যান। অন্য বর্ণনা মতে ৫২হিজরি সনে। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।

টিকাঃ
[৪২১] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১০১
[৪২২] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, 'আস সীরাতুন নাবাবিয়‍্যাহ, ২/৩৮৪
[৪২৩] বাকিহাকি ফিল কিবরা, ৯/১৩৭
[৪২৪] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১২২
[৪২৫] মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৯/২৫২
[৪২৬] তিরমিযি, ৩৮৯২; হাকিম, ৪/২৯
[৪২৭] দেখুন, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনইয়াহ, ২/২৩৩
[৪২৮] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩২৮
[৪২৯] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/ ৩৫৪-৩৫৫
[৪৩০] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, 'আস সীরাতুন নাবাবিয়‍্যাহ, ২/৩৮৫
[৪৩১] দেখুন, আবু শুহবা রচিত, 'আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৩৮৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px