📄 তিন. ভেঙে ফেল দুর্গ-প্রাসাদ
ইয়াহুদিরা দুর্গের ভেতর আশ্রয় নেয়। মুসলিম বাহিনী থেমে থাকার জন্য আসেনি। তারা প্রথমে দুর্গ অবরোধ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে একের পর এক দুর্গ জয় করে সামনে এগোচ্ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। মুসলিমরা সর্বপ্রথম নুতাত এলাকার না'য়িম ও সা'ব নামক দুর্গ পদানত করেন। তারপর শাক নামক এলাকায় আবুন নাযযারের দুর্গ। খাইবারের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল এই এলাকা দুটি। সময়ের অগ্রসরতায় কুতাইবা নামক এলাকার কুমূসুল মানি নামক দুর্গও মুসলিমরা জয় করেন। এটাই ছিল সালাম বিন আবীল হাকীকের দুর্গ। যাকে রাতের আঁধারে হত্যা করেছিলেন আবদুল্লাহ বিন আতীক-এর গেরিলা বাহিনী। শেষ পর্যায়ে এসে ভেঙে ফেলা হয় ওয়াতীহ ও সালালিম অঞ্চলের দুর্গ দুটি।
এগুলোর মধ্যে কিছু দুর্গ পদানত করতে মুসলিম বাহিনীকে কঠিন মোকাবিলা ও কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিশেষ করে না'য়িম নামক দুর্গ। এর নিচেই শাহাদাত বরণ করেছেন মাহমুদ বিন মাসলামা আনসারি। দুর্গের ওপর থেকে তার মাথার ওপর চাক্কি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই দুর্গ জয় করতে সময় লেগেছিল পাক্কা দশদিন। কোনো দুর্গ জয়ের পেছনে ব্যয় করা এটাই সর্বোচ্চ সময়। এখানে মুসলিমদের ঝান্ডা বহন করছিলেন আবু বাকর সিদ্দীক; কিন্তু তার মাধ্যমে এটি বিজিত হয়নি। মুসলিমরা চূড়ান্ত চেষ্টা ব্যয় করেও কোনো ফলাফল আসছিল না।
শেষে আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'আগামীকাল এই পতাকা এমন ব্যক্তিকে দেবো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাকে ভালোবাসে, সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। বিজয় লাভ করে তবেই সে ফিরে আসবে।' প্রতিটি মুসলিম হৃদয় এই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিল। একেবারে তৃতীয়দিন ফজরের সালাতের পর আল্লাহর রাসূল ﷺ 'আলি-কে কাছে ডাকেন। তার হাতেই তুলে দেবেন আজকের পতাকা; কিন্তু চোখে তার পিচুটির অসুস্থতা। নবিজি 'আলি-এর চোখে নিজের থুতু লেপ্টে দিয়ে দুআ করলেন। আশ্চর্য! ভালো হওয়ার কল্পনা করার আগেই তার চোখ স্বাভাবিক সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। এবার তিনি হাতে পতাকা তুলে নেন।
বিদায়ের আগে বিশেষ নির্দেশনা দিতে গিয়ে নবিজি বললেন, 'শোনো 'আলি, ইয়াহুদিদের ওপর হামলা করার আগে তাদেরকে ইসলামের দিকে ডাকবে। আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে একজন মানুষ হিদায়াত লাভ করা তোমার জন্যে লাল উট অপেক্ষা উত্তম।' 'আলি নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কতক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করব?' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'যতক্ষণ না তারা এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এ কথার সাক্ষ্য দিলে তাদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত হবে, তবে সংগত কারণ ব্যতীত। আর হিসাবের দায়িত্ব আল্লাহর।' অবশেষে 'আলি-এর হাতেই বিজিত হয় এই না'য়িম দুর্গ।
মুসলিমরা দুর্গটি অবরোধ করার পর এখানকার নেতা বেরিয়ে এসে মল্লযুদ্ধের ডাক দেয়। তার সাথে লড়তে গিয়ে আমির ইবনুল আকওয়া' প্রথমে শাহাদাত বরণ করেন। এরপর 'আলি তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করে তাকে হত্যা করেন। আরেক বর্ণনায় আছে, তাকে হত্যা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা। এই হত্যা ইয়াহুদিদের অভ্যন্তরীণ শক্তি দুর্বল করে দেয়; এরপরই তারা পরাজিত হয়।
কোনো কোনো বর্ণনায় ওঠে এসেছে, যুদ্ধের সময় ঢাল ভেঙে যাওয়ার পর না'য়িম দুর্গের একটি বিশাল দরজা 'আলি একাই এক হাত দিয়ে তুলে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এ সম্পর্কিত প্রত্যেকটি বর্ণনা দুর্বল। তবে এগুলোর অগ্রহণযোগ্যতা কিন্তু 'আলি-এর বীরত্ব ও শক্তিমত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। প্রমাণিত ও সাব্যস্ত বর্ণনাগুলোই তার বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট।
এই দুর্গ বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী সা'ব বিন মুআজের দুর্গের দিকে অভিমুখী হন। এই অংশের পতাকাবাহী হাব্বাব ইবনুল মুনজির কৌশলী যুদ্ধ নীতিগ্রহণ করেছিলেন। ফলে মাত্র তিন দিনেই ইবনু মুআজের দুর্গ জয় করেন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তারা লাভ করেন প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী। এটা সেই দিনকার কথা, যেদিন মুসলিমরা ছিলেন খাদ্য স্বল্পতায় ও অভুক্ত।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে মুসলিম বাহিনী যুবাইর-এর দুর্গের দিকে যাত্রা করে। না'য়িম ও ইবনু মুআজের দুর্গ থেকে যারা পালিয়েছিল, তাদেরকে যুবাইর এখানে আশ্রয় দিয়েছে। মুসলিমরা এই দুর্গ অবরোধ করে বাইরে থেকে আসা পানির লাইন কেটে দেন। ফলে তারা যুদ্ধের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয় এবং তিন দিন গত হতেই তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়। এভাবে নুতাত এলাকার শেষ দুর্গটিও মুসলিমদের পদানত হয়; সেখানে সবচেয়ে দাপুটে ও শক্তিশালী ইয়াহুদিদের বাস ছিল।
এ পর্যায়ে মুসলিমরা শাক্ক এলাকার অভিমুখী হন। বেশ কয়েকটি দুর্গ ছিল এখানে। সাহাবিরা অবরোধ শুরু করেন উবাই-এর দুর্গ থেকে। মুসলিমরা তাকে পরাজিত করেন। কিছু যোদ্ধা পালিয়ে নাযযারের দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলিমরা এখানেও তাদের পিছু নিয়ে আগের ধারাবাহিকতায় অবরোধ করেন। তারপর অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত বিজয়। তবে শাক্ক অঞ্চলের কিছু লোক এখান থেকে পালিয়ে কুমূসুল মানী, ওয়াতীহ ও সুলালিম দুর্গে একত্রিত হয়। মুসলিমরা চৌদ্দ দিন পর্যন্ত তাদেরকে অবরোধ করে রাখেন। অবশেষে তারা আপসের প্রস্তাব নিয়ে বের হয়ে আসে।
টিকাঃ
[৩৯০] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫০১
[৩৯১] প্রাগুক্ত
[৩৯২] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/ ৬৫৭
[৩৯৩] বুখারি, ৪২১০; মুসলিম, ২৪০৬
[৩৯৪] হাকিম, ৩/৩৭
[৩৯৫] বুখারি ৩০০৯; মুসলিম, ২৪০৬
[৩৯৬] মুসলিম, ২৪০৫
[৩৯৭] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫০২
[৩৯৮] প্রাগুক্ত
[৩৯৯] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/ ৩২৪
[৪০০] প্রাগুক্ত
[৪০১] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬৫৮-৬৭১
[৪০২] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫০৪
📄 চার. গ্রাম্য শহীদ, কৃষ্ণা রাখাল এবং জাহান্নামের যাত্রী যে বীর
১. গ্রাম্য শহীদ
যুদ্ধের সামান্য অবসরে এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে আল্লাহর রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন। আনুগত্য প্রকাশ করে বলেন, 'আমি আপনার সাথে হিজরাত করতে চাই।' নবিজি কয়েকজন সাহাবির দায়িত্বে তাকে সোপর্দ করেন। সময়ের বহতায় খাইবর যুদ্ধ চলে আসে। আল্লাহর রাসূল গানীমাতের একটা অংশ তার জন্যেও বরাদ্দ রাখেন। তিনি উপস্থিত না থাকায় তা সাথিদের দেন। ইনি চারণভূমিতে পশু চরাতেন। কাজ শেষে ফিরে আসার পর সাথিরা গানীমাতের বণ্টিত অংশ তাকে দিয়ে দেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কীসের সম্পদ? সাথিরা বললেন, 'এগুলো আল্লাহর রাসূল তোমার জন্য রেখেছেন।'
গ্রাম্য সাহাবি এগুলো নিয়ে নবিজির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এগুলো কী জন্য?' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'গানীমাতের এই অংশটা তোমার জন্য রেখেছি।' সাহাবি বললেন, 'আমি এজন্য আপনার অনুসরণ করিনি; আমি আপনার অনুসারী হওয়ার উদ্দেশ্য হলো, আমার গলার এই জায়গাটার এসে তির বিদ্ধ হবে, এরপর আমি মৃত্যুবরণ করে জান্নাতে প্রবেশ করব!’
আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘তুমি আল্লাহর জন্য সত্য বলে থাকলে তিনি তোমার ইচ্ছা সত্যে পরিণত করবেন।’ কিছুক্ষণ পর এই গ্রাম্য সাহাবি জিহাদে অংশ নেন। শাহাদাতের পর তার লাশ নবিজির সামনে পেশ করা হয়। নবিজি বললেন, ‘এ সেই লোকটা না?’ সাহাবিরা বললেন, ‘জি’। সমাহিত করার আগে আল্লাহর রাসুল নিজের জুব্বা দিয়ে এই সাহাবির কাফন পরান। তার জানাযার সালাত পড়িয়ে দুয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, তোমার এই বান্দা তোমার রাস্তায় হিজরতের জন্য বেরিয়েছে। এখন সে শহীদ। আর আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছি।’
২. কৃষ্ণ রাখাল
খায়বারে একজন কৃষ্ণ হাবশি গোলাম তার মালিকের পশু চরাতো। সে খায়বারের লোকদেরকে অস্ত্র ধরতে দেখে বলল, ‘আপনারা কী করতে চাচ্ছেন?’ ইয়াহুদিরা বলল, ‘আমরা এই লোকটার সাথে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, সে নিজেকে নবি বলে দাবি করে।’ নবুওয়াত শব্দটা তার মনে রেখাপাত করে। যেন উদয় ঘটে আলোর। সে মেষপাল নিয়েই আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে বলল, ‘আপনি কীসের দিকে আহ্বান করেন?’ নবিজি বললেন, ‘আমি ইসলামের দিকে ডাকি এবং এ সাক্ষ্য দিতে বলি—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি আল্লাহর রাসুল এবং তুমি আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদাত করবে না।’
গোলাম বলল, ‘আমি যদি সাক্ষ্য দিই, ঈমান আনি আল্লাহর ওপর, তা হলে বিনিময়ে কী পাব?’ নবিজি বললেন, ‘ঈমানের ওপর তোমার মৃত্যু হলে জান্নাত লাভ করবে।’
হাবশি লোকটা ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, এই পশুগুলো আমার কাছে আমানত, এগুলো নিয়ে এখন আমি কী করতে পারি?’ আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘এগুলো বের করে মাঠে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তোমার আমানত যথাস্থানে পৌঁছে দেবেন।’ নতুন হাবশি সাহাবি তা-ই করেন। আল্লাহর ইশারায় পশুগুলো মালিকের কাছে চলে আসে। ইয়াহুদি বুঝতে পারে তার গোলাম ইসলাম গ্রহণ করেছে।
ইয়াহুদিদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপট চলে আসে। আল্লাহর রাসূল ﷺ সমবেত সাহাবিদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের জিহাদের প্রতি উজ্জীবিত করেন। শুরু হয় যুদ্ধ। যাদের ব্যাপারে শাহাদাত লিপিবদ্ধ ছিল, তারা শহীদ হন। এই মিছিলে হাবশি রাখাল সাহাবিও ছিলেন। মুসলিমরা তাকে সেনা ছাউনিতে নিয়ে আসেন। তারা ভেবেছিলেন আল্লাহর রাসূল এখানে আসবেন। নবিজি সাহাবিদের সামনে এসে বললেন, 'আল্লাহ তার এই বান্দাকে সম্মানিত করেছেন। নিয়ে এসেছেন খাইবারে। আমি তার মাথার কাছে দুজন হুর দেখেছি, অথচ সে আল্লাহর জন্য একটি সিজদাও করেনি।
৩. একজন বীরের শেষ পরিণতি
খাইবার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীতে একজন যোদ্ধা ছিলেন, মুশরিকদের যাকেই পাচ্ছেন, কাটছেন। তার তরবারির আঘাত থেকে নিস্তার পাচ্ছে না কেউ। অসীম বীরত্বের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন তিনি। তার ব্যাপারেই আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সে তো জাহান্নামি।' সাহাবিরা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'সে যদি জাহান্নামি হয়, তা হলে আমাদের আর কে জান্নাতি হবে!' একজন সাহাবি বললেন, 'আল্লাহর কসম, সে এই অবস্থায় মরতে পারে না।' তিনি ওই লড়াকুর পিছু নিলেন। দেখলেন, যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ক্ষতস্থানের ব্যথা তীব্র হলে সে তার তরবারি মাটিতে রেখে এর ধারালো ডগা রাখে বুকের মাঝখানে। এরপর নিজেকে তরবারিতে ছেড়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এই দৃশ্য দেখে সাহাবি আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।' নবিজি বললেন, 'তা হঠাৎ একথা বলছ?' সাহাবি পুরো খবর তাকে জানালেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'মানুষের কাছে মনে হয় এক ব্যক্তি জান্নাতের আমল করছে, অথচ সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, আরেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে মনে হয় সে জাহান্নামের আমল করছে, অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। '
টিকাঃ
[৪০৫] নাসাঈ, ৪/ ৬১-৬২; হাকিম, ৩/ ৫৯৫-৫৯৬
[৪০৬] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩২৩, ৩২৪
[৪০৭] বুখারি, ৪২০২; বাইহাকি ফি দালায়িলিন নুবুওয়াহ, ৪/২৫২
📄 পাঁচ. হাবাশা থেকে জা'ফার ইবনু আবি তালিব ও সাথিদের প্রত্যাবর্তন
খাইবার বিজয়ের দিন জা'ফার বিন আবি তালিব হাবাশা থেকে আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে আসেন। আল্লাহর রাসূল তাকে বুকে টেনে নেন, চুমু খান কপালে—দু চোখের মাঝখানে। আনন্দিত গলায় বলেন, 'বুঝতে পারছি না, কোন কারণে আমি বেশি উচ্ছ্বসিত, খাইবার বিজয়ে নাকি জা'ফারের প্রত্যাবর্তনে।'
এর আগে আল্লাহর রাসূল বাদশা নাজ্জাশির কাছে সেখানে হিজরাত করা সাহাবিদের সন্ধানে আমর বিন উমাইয়া যমরি-কে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দুটি জাহাজে সাহাবিদের নিয়ে আসেন। ঠিক খাইবার বিজয়ের দিন তারা ফিরে আসেন। জা'ফার ফিরে আসার সময় আবু মূসা আশআরি ও তার অন্যান্য আশআরি সাথিদেরও সঙ্গে নিয়ে আসেন।
এ ব্যাপারে আবু মূসা আশআরি নিজেই বলেন, 'আল্লাহর রাসূল-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির খবর যখন আমাদের কাছে আসে, তখনো আমরা ইয়েমেনে। আমার দু'ভাইয়ের সাথে হিজরাতের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলাম। আমার ভাই দুজন হলেন, আবু বুরদাহ ও আবু রেহেম। আশআরি কাফেলায় আমিই ছিলাম সবার ছোট।' বর্ণনাকারী বলেন, কাফেলার জনসংখ্যার ব্যাপারে আবু মূসা থেকে তিনটি মত পাওয়া যায়। সবগুলো মত অনুযায়ী তার ভাষ্য হলো, 'হিজাজের সফরে আমি ছিলাম পঞ্চাশের অধিক বায়ান্ন কিংবা তেপ্পান্নজন সাথির সাথে। আমরা নদীপথে একটা নৌকায় যাত্রা করেছিলাম। নিয়তির নিপুণতায় এটি আমাদেরকে নিয়ে নোঙর করে নাজ্জাশির দেশ হাবাশায়। এখানে জা'ফারের সাথে আমাদের দেখা হয়। আমরা সবাই কিছুদিন সেখানে অবস্থান করি। তারপর মাদীনায় এসে দেখি আল্লাহর রাসূল এই মাত্র খাইবার দুর্গ জয় করেছেন। '
জা'ফার ও তার সাথিরা সেখানে অবস্থান করেছেন দশ বছরেরও বেশি সময়। কুরআনের বহু অংশ নাযিল হয়েছে ইতোমধ্যে। কাফিরদের সাথে সংঘটিত হয়েছে বহু যুদ্ধ। মুসলিমদের সাধারণ হিজরাতের পূর্বাপর অবস্থার মধ্যে এসেছে স্পষ্ট পরিবর্তন। নির্ণিত হয়েছে মর্যাদার স্তর। ফলে অনেকেই মনে করতে থাকে হাবাশায় হিজরাতকারীরা এই সৌভাগ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। তাদের মর্যাদা অন্যদের চেয়ে কম।
এ ব্যাপারে আবু মূসা আশআরি বলেন, আমাদেরকে অনেকেই বলত, 'আমরা হিজরাত করে অনেক আগেই মাদীনায় এসেছি, আর তোমরা মাদীনায় হিজরাত করেছ অনেক দেরিতে।' তাদের এই দেরিতে হিজরাতের কথাটা আমাদেরকে একটু নিচু করে রাখত যেন। আমাদের সাথে হাবশা থেকে মাদীনায় এসেছিলেন আসমা বিনতে উমাইস। আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী হাফসার সাথে তিনি একবার দেখা করতে আসেন। দুজনে গল্প করছিলেন, এমন সময় 'উমার সেখানে এসে পড়েন। তিনি আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, 'ইনি কে?' হাফসা বললেন, 'ইনি আসমা বিনতে উমাইস।' 'উমার বললেন, 'ও! ইনি তো হাবাশায় ছিলেন, সমুদ্রে সফর করেছেন।' আসমা বললেন, 'হ্যাঁ, আমি সেই নারী।'
'উমার বললেন, 'হিজরাতে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রবর্তী। তাই তোমাদের চেয়ে আমরা আল্লাহর রাসূলের নৈকট্যের বেশি অধিকার রাখি।' আসমা রেগে গেলেন। ক্রোধের রেশ মেশানো কণ্ঠে বললেন, 'এমন কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা আল্লাহর রাসূলের কাছে ছিলেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন, অন্ধকে শিক্ষা দিতেন। আর আমরা এমন লোকদের মাঝে ছিলাম, যারা শুধু দীন থেকে দূরে ছিল না; দীন ছিল তাদের শত্রু। আমাদেরকে এসব কষ্ট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সহ্য করতে হয়েছে। আল্লাহর কসম, আপনার কথাটি আমি আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস করব, এর আগ পর্যন্ত খানাপিনা কিছুই করব না। আমি মিথ্যা বলব না। আমার কথায় এদিক সেদিকও হবে না। আমার পক্ষ থেকে বাড়িয়েও বলব না।'
আল্লাহর রাসূল এলে আসমা জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ, 'উমার আমাদেরকে এমন এমন কথা বলেছেন।' সবটা শুনে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তুমি তাকে কী উত্তর দিয়েছ?' তিনি বললেন, 'আমি এভাবে উত্তর দিয়েছি।' নবিজি বললেন, 'ওরা তোমাদের চেয়ে আমার নৈকট্যের বেশি অধিকার রাখে না। কারণ, 'উমার ও তার সাথিরা একবার হিজরাত করেছে, আর তোমরা হিজরাত করেছ দুইবার।'
আসমা এই স্বর্ণবিন্দু গ্রহণ করে ডগমগ আনন্দে হাবাশা থেকে আসা সবার মাঝে প্রচার করেন। তিনি বলেন, 'তারা প্রায়ই আমার কাছে এসে এই হাদীস শুনে যেত। পৃথিবীতে তাদের কাছে আল্লাহর রাসূলের এই সুসংবাদের চেয়ে মহৎ আর কিছুই ছিল না।' খাইবার অভিযানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের অনুমতি নিয়ে নবিজি এদের মাঝেও গানীমাতের সম্পদ বণ্টন করেছেন।
টিকাঃ
[৪০৮] ইবনু সাআদ, ৪/৩৫; হাকিম, ৩/৪০৮, ৪০৯
[৪০৯] দেখুন, মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৫৩
[৪১০] বুখারি, ৪২৩০; মুসলিম, ২৫০২
[৪১১] দেখুন, ফিকহুস সীরাহ লিল গাযালি, পৃ. ৩৫০
[৪১২] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/৯৬
📄 ছয়. গানীমাত বণ্টন
ভূমি, খেজুর বাগান, পোশাক ও খাদ্যদ্রব্য—সবদিক থেকেই খাইবারে আল্লাহর রাসূল সবচেয়ে বেশি গানীমাতের সম্পদ লাভ করেছেন। সীরাহ গ্রন্থসমূহের আলোকে গানীমাত সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব।
ক. খাদ্যদ্রব্য। খাইবারের দুর্গগুলো থেকে মুসলিমরা প্রচুর পরিমাণে খাদ্য গানীমাত লাভ করেছেন। দুর্গগুলো থেকে পাওয়া গেছে চর্বি, তেল, মধু, ঘি ও আরো অন্যান্য জিনিস। নবিজি এখান থেকে খাওয়ার সাধারণ অনুমতি দেন। এক পঞ্চমাংশ নিজের জন্য রাখেননি।
খ. পোশাক, উট, গাভী ও মেষ। আল্লাহর রাসূল এখান থেকে খুমুস (এক পঞ্চমাংশ) গ্রহণ করেন। আল্লাহর নির্দেশিত খাতের জন্য রেখে দেন। আর বাকিগুলো যোদ্ধা সাহাবিদের মাঝে বণ্টন করেন।
গ. বন্দি। ইয়াহুদিদের বহু নারী বন্দি হয় এ যুদ্ধে। এই বন্দিদেরকেও মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করেন। এরাও গানীমাত। গানীমাতের হুকুম এদের ওপর বর্তাবে।
ঘ. খাইবারের ভূমি ও খেজুর বাগান নবিজি ৩৬ ভাগে ভাগ করেন। প্রত্যেক ভাগে রাখেন একশটি অংশ। মোট অংশ দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ৬শো। আল্লাহর রাসূল ও মুসলিমদের জন্য রাখা হয় অর্ধেক যার পরিমাণ ১৮-শো। আর বাকি অর্ধেক বণ্টন করেন এখানকার মুসলিমদের নায়েবদের মাঝে এবং যারা মুসলিমদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে।
ঙ. গানীমাতের সম্পদের মাঝে তাওরাতের কিছু কপিও ছিল। ইয়াহুদিরা সেগুলো ফেরত চায়। নবিজি তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি রোমানদের মতো করেননি। ওরা বিজয় লাভের পর কিতাবাদি পুড়িয়ে ফেলত, পা দিয়ে মাড়াত। খ্রিষ্টানদের মতোও করেননি তিনি। খ্রিষ্টানরা আন্দালুস বিজয়ের পর সেখানকার তাওরাতের কপিগুলো আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
আল্লাহর রাসূল ﷺ ইয়াহুদিদেরকে খাইবার থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তারা বলল, 'এখানে চাষাবাদের ব্যাপারে আমরা বেশি অভিজ্ঞ।' নবিজি তাদের প্রস্তাব ভেবে দেখে থাকার অনুমতি দেন—শর্ত হলো, বাগানের ফলমূলের অর্ধেক মুসলিমদেরকে দিতে হবে। আর মুসলিমদের এ অধিকার থাকবে যে, তারা যখন ইচ্ছা তার অংশ নিতে পারবে এবং যখন ইচ্ছা তাদেরকে দেশান্তরে বাধ্য করতে পারবে।
শর্তারোপ করার ক্ষেত্রে এখানে আল্লাহর রাসূলের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছে। ইয়াহুদিরা তাদের আবাসভূমিতে থাকলে নিজেদের খাটাখাটুনি ছাড়াই আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদদের খাদ্যের পূর্ণ জোগান হয়ে যাবে। অন্যদিক থেকে ইয়াহুদিরা এই ভূমির আসল মালিক ছিল। এখানকার কৃষি কাজের ব্যাপারে ওরাই সর্বাধিক অবহিত। ফলে ওরা থাকলে অধিক ও উন্নত ফলমূল উৎপন্ন হবে। বিশেষ করে শ্রমের বিনিময়ে তো তারা কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করবে না; বরং তাদের থেকে সময় মতো নেওয়া হবে বাগানে উৎপন্ন ফলের নির্ধারিত অংশ।
আল্লাহর রাসূল আরেকটি শর্ত যুক্ত করেছেন, তা হলো, মুসলিমরা যখন ইচ্ছা ইয়াহুদিদেরকে দেশান্তরে বাধ্য করতে পারবে। এভাবে তাদেরকে দুর্বল করার পাশাপাশি ক্ষমতার মেরুদণ্ডও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কেননা, এই শর্তের কারণে ওরা সহজেই বুঝে নিয়েছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিলে তাদেরকে অবশ্যই বিতাড়িত করা হবে, আর কখনোই ফিরে আসতে পারবে না।
খাইবারের ইয়াহুদিরা সোনারুপা লুকিয়ে রাখা ও বনু কুরাইযায় নিহত হুয়াই বিন আখতাবের মিশক গোপন করার চেষ্টা করেছিল। বনু নাযির দেশান্তর হওয়ার সময় সাথে করে এই মিশকও নিয়েছিল। খাইবার বিজয়ের পর কোথাও এই মিশক না পেয়ে আল্লাহর রাসূল হুয়াই বিন আখতাবের চাচাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হুয়াই বিন আখতাবের মিশক কোথায়?' বুড়ো বলল, 'যুদ্ধের কারণে কোথায় চাপা পড়েছে জানি না।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সমস্যা নেই, আমরা অচিরেই এর চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ লাভ করব।' বুড়ো মুখ খুলছে না। কীভাবে খোলা যায়? এ দায়িত্ব দিলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম-এর হাতে। যুবাইর কেবল উত্তম-মাধ্যম দেওয়া শুরু করছিলেন, এরই মধ্যে বুড়ো অশনি সংকেত বুঝতে পেরে মুখ খুলে বলল, 'আমি হুয়াইকে দেখেছিলাম, সে এখানকার এই ধ্বংসস্তূপে ঘোরাঘুরি করে কী যেন খুঁজছিল।' সাহাবায়ে কেরাম সেখানে গিয়ে স্তূপের নিচে মিশক খুঁজে পান।
খাইবারের ইয়াহুদিদের সাথে আল্লাহর রাসূলের মীমাংসা হওয়ার পর তিনি এখানে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে বাৎসরিক কর আদায়কারী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি প্রতি বছর এসে সার্বিক অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করে ন্যায়পরায়ণতার সাথে কর নিরূপণ করতেন। ইয়াহুদিরা একবার আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে তাঁর কঠোরতা নিয়ে অভিযোগ করে; ওদিকে তারা আবার আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকেও ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আবদুল্লাহ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, 'ওরে আল্লাহর শত্রুর দল, তোরা আমাকে ঘুষ খাওয়াতে চাচ্ছিস! আল্লাহর কসম, আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষের পক্ষ থেকে এসেছি, আর তারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত সম্প্রদায়। এই তো তোরাই কৃতকর্মের কারণে বানর ও শূকরে পরিণত হয়েছিলি! তবে হ্যাঁ, তোদের প্রতি ঘৃণা আর তার প্রতি ভালোবাসা আমাকে ইনসাফের বৃত্ত থেকে বাইরে আনতে পারবে না।' ইয়াহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ এই ইনসাফের ভিত্তিতেই তো আসমান-যমিন স্থির আছে।”
খাইবার পুরোপুরি মুসলিমদের মালিকানায় চলে আসে। হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইবনু 'উমার বলেন, 'খাইবার বিজয়ের আগে আমরা তৃপ্তিভরে খেতে পারতাম না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও অর্জিত হয় খাইবার বিজয়ের পর। মুহাজির সাহাবিরা হিজরাতের পর পাওয়া দানের খেজুর বাগান ফিরিয়ে দেন আনসার সাহাবিদেরকে।
টিকাঃ
[৪১৩] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/১৪১
[৪১৪] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ৩/ ১৪১-১৪২
[৪১৫] দেখুন, আবু শুহবা রচিত 'আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪১৯
[৪১৬] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ৩/৩২৮
[৪১৭] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/৩২৬
[৪১৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, পৃ. ৪২৪
[৪১৯] দেখুন, যাহাবির 'তারিখুল ইসলাম, ও ওয়াকিদির মাগাযি, পৃ. ৪২৪
[৪২০] দেখুন, শামি রচিত 'মিন মুয়াইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩৫২