📄 এক. খাইবার যুদ্ধের কারণ ও সময় নির্ণয়
সীরাত ও যুদ্ধ বিষয়ক ঐতিহাসিকদের অধিকাংশের মতে খাইবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৭ম হিজরির মুহাররম মাসে। ঐতিহাসিক ওয়াকিদি বলেছেন, ‘খাইবারে অভিযান পরিচালিত হয়েছে ৭ম হিজরির সফর কিংবা রবীউল আউয়াল মাসে; হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর। ইবনু সা’আদ অবশ্য ৭ম হিজরির জুমাদাল উলা মাসের কথা উল্লেখ করেছেন। বরেণ্য দুই ইমাম—ইমাম মালিক ও যুহরি ৬ষ্ঠ হিজরির মুহাররম মাসের কথা বলেছেন। সবশেষে ইবনু হাজার আসকালানি ইবনু ইসহাকের ৭ম হিজরির মতটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
খাইবারের ইয়াহুদিরা প্রাথমিক অবস্থায় মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা রাখত না। বনু নাযিরের ইয়াহুদিরা মাদীনা থেকে দেশান্তর হয়ে ওদের দুর্গে আশ্রয় নেওয়ার পর শুরু হয় মুসলিমদের প্রতি শত্রুতা। দেশান্তর হয়েও বনু নাযিরের ক্ষমতা ও দাপট একেবারে ভেঙে পড়েনি। কারণ, মাদীনা ত্যাগ করার সময়ও ওদের সাথে ছিল নারী, শিশু ও বিপুল সম্পদ। সে যুগের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী ওরা চলার পথে পেছনে বাদকদের রেখেছিল দফ ও বাঁশি ইত্যাদি বাজিয়ে নিজেদের অহংবোধ প্রকাশ করবার জন্য।
অনেক আগে থেকেই খাইবারে বনু নাযিরের সবচেয়ে কাছের মিত্র ছিল সাল্লাম বিন আবীল হাকীক, কিনানা বিন আবীল হাকীক ও হুয়াই বিন আখতাব। আর এখন দেশান্তরিত বনু নাযির খাইবারে আশ্রয় নেওয়ার পর মিত্ররা এদের সাথে ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি করে। খাইবারের সম্মিলিত এই ইয়াহুদিরা এক সময় মনে করতে থাকে, মুসলিমদের থেকে প্রতিশোধ নেওয়া, তাদের প্রতিহত করা এবং ইসলামের অগ্ররতা থামিয়ে দেওয়ার জন্য তারা নিজেরাই যথেষ্ট। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই বনু নাযিরের মাঝে মাদীনায় নিজেদের বসতভিটায় আবার ফিরে আসার প্রবল আগ্রহ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই চিন্তার প্রথম শক্তিশালী পদক্ষেপ ছিল খন্দক যুদ্ধ। কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রগুলোকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রলুব্ধ করতে বনু নাযিরের মিত্র খাইবারের ইয়াহুদিরা এখানে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। ব্যয় করেছে বিপুল অর্থ-সম্পদ। সম্মিলিত মুশরিক বাহিনীকে সহায়তা করতে বনু কুরাইযাকে গাদ্দারির পথে উসকে দেওয়ার পেছনেও এদের হাত ছিল। মুসলিমদের ওপর পেছন থেকে হামলা করতে বনু কুরাইযাকে পর্যাপ্ত সম্পদ দেওয়ার চুক্তিও করেছিল ওরা। এসব কারণে মাদীনার ইসলামি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে খাইবার দুর্গ একটি ভয়ংকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
মুসলিম সমাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা খাইবারের ইয়াহুদিদের প্রতি নবিজি মনোযোগী হন হুদাইবিয়া সন্ধির পর। এই সন্ধির পর অবতীর্ণ সূরা ফাতহে খাইবার বিজয় ও সেখানকার ধনসম্পদ গানীমাত হিসেবে অর্জিত হওয়ার সুবার্তা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলছেন—
‘আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করবেন। তিনি তোমাদের থেকে শত্রুদের স্তব্ধ করে দিয়েছেন, যাতে এটা মুমিনদের জন্যে এক নিদর্শন হয় এবং তোমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন। আরও একটি বিজয় রয়েছে যা এখনো তোমাদের অধিকারে আসেনি, আল্লাহ তা বেষ্টন করে আছেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।' (সূরা ফাতহ: ২০-২১)
টিকাঃ
[৩৭৪] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৪৫৫
[৩৭৫] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬৩৪
[৩৭৬] দেখুন, তাবাকাতে ইবনু সা’আদ, ২/১০৬
[৩৭৭] দেখুন, ইবনু আসাকিরের তারিখে দিমাস্ক ১/৩৩
[৩৭৮] দেখুন, ফাতহুল বারি, ১৬/৪১
[৩৭৯] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/ ৩১৯
[৩৮০] প্রাগুক্ত।
[৩৮১] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/ ৩৪৯
[৩৮২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/ ৩৪৯
📄 দুই. খাইবারের পথে মুসলিম বাহিনী
ঈমানদীপ্ত এই বাহিনী অবশেষে খাইবারের পথে রওনা করে। তারা জানেন খাইবারের দুর্গগুলো সুরক্ষিত, সেখানকার পুরুষরা যুদ্ধবাজ ও সামরিক জ্ঞানে অভিজ্ঞ। তারা এও জানেন, বিপরীতে আল্লাহর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি তাদেরকে বেষ্টন করে রাখছে সারাক্ষণ। মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য চলতি পথে সাহাবায়ে কেরাম সুউচ্চ কণ্ঠে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও তাকবীর বলছিলেন মুহুর্মুহু; কিন্তু আল্লাহর রাসূল চাচ্ছিলেন সাহাবিরা কালিমাগুলো নিম্ন স্বরে বলুক। তাই সবাইকে নির্দেশনা দিয়ে বললেন, প্রিয় সাহাবিরা, তোমাদের কথা নিজেদের মাঝেই রাখো, তোমরা দূরের অন্ধ কোনো সত্তাকে ডাকছ না। তোমরা তো ডাকছ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা এক সত্তাকে।
নবিজির এই সফর ছিল রাতের আঁধারে। সালামা ইবনুল আকওয়া বলেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে রাতের বেলায় খাইবারের পথে রওনা করি। চলতি পথে আমির ইবনুল আকওয়া সাহাবিদেরকে উদ্দীপ্ত করতে বলছিল—
'হে আল্লাহ, আপনিহীন আমরা হিদায়াত পেতাম না/ করতাম না সাদাকাহ পড়তাম না সালাত।
জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আপনি আমাদের ক্ষমা করুন আর শত্রুদের মোকাবিলায় দৃঢ় রাখুন আমাদের পদক্ষেপ।
আমাদের মাঝে প্রশান্তির প্রলেপ ঢেলে দিন, আমাদেরকে অশান্তির দিকে ডাকলে আমরা প্রত্যাখ্যান করি; অথচ ওরা ফিতনার মাধ্যমে আমাদের ওপর প্রবল হতে চায়।'
শুনে আল্লাহর রাসূল বললেন, এই কবিতা আবৃত্তি করল কে?' সাহাবিরা বললেন, আমির ইবনুল আকওয়া।' নবিজি বললেন, 'আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।'
সাহাবিদের মধ্যে একজন ('উমার ইবনুল খাত্তাব) বললেন, 'হে আল্লাহর নবি, তার জন্য তো শাহাদাত অনিবার্য হয়ে গেল, তার মাধ্যমে আমাদেরকে যদি আরও বেশি উপকৃত হওয়ার সুযোগ দিতেন?'
মুসলিম বাহিনী খাইবারের নিকটবর্তী এলাকা সাহবায় পৌঁছলে নবিজি আসরের সালাত আদায় করেন। নাশতা করার জন্য আল্লাহর রাসূলের কাছে ছিল মাত্র কয়েক কেজি খেজুর ও যব। এরপর নবিজির নির্দেশে সারীদ বানানো হলে তার সাথে সাহাবায়ে কেরামও আহার করেন। মাগরিবের সময় হয়ে আসে। তিনি ওযু না করে শুধু কুলি করে সাহাবিদের নিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়েন।
এর আগেই অবশ্য আল্লাহর রাসূল উব্বাদ ইবনু বাশার-কে ইয়াহুদিদের খবর অনুসন্ধান ও গুপ্ত ফাঁদ নিরিখের জন্য গোয়েন্দা হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। খাইবারের পথে আশজা গোত্রের এক ইয়াহুদি গুপ্তচরের সাথে উব্বাদ বিন বাশারের দেখা হয়। তিনি লোকটাকে থামিয়ে বলেন, 'কে তুমি?'
সে বলল, 'আমি আমার হারিয়ে যাওয়া কয়েকটা উট খুঁজতে বেরিয়েছি।' উব্বাদ বললেন, 'তুমি খাইবারের কোনো খবর জানো?' লোকটা বলল, 'আমি একটু আগে ওদের ওখান থেকেই এলাম, আপনি ওদের সম্পর্কে কী জানতে চান?' তিনি বললেন, 'ইয়াহুদিদের গতিবিধি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।'
লোকটা বলল, 'আমি ওদের খবর খুব ভালো জানি। কিনানা বিন আবীল হাকীক ও হাওজা ইবনু কাইস তাদের গাতফানি মিত্রদের কাছে গিয়েছিল। গাতফানিদেরকে তারা যুদ্ধের দিকে ডেকে খাইবারের এক বছরের ফল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাতফানিরা বিপুল অস্ত্র-সামগ্রী নিয়ে এদের সাহায্যে এসেছে, তাদের পরিচালনা করছিল উতবা বিন বদর। খাইবারের প্রতিনিধিরা দশ হাজার যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে দুর্গে প্রবেশ করে। আমি দেখেছি, ওদের দুর্গগুলো এমন দুর্ভেদ্য যে, ভেঙে ফেলা অসম্ভব। প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ওরা ভেতরে অবস্থান করছে, কয়েক বছর অবরোধ করে রাখলেও কিছু হবে না। দুর্গের ভেতরে উৎসারিত পানিই ওরা পান করে। আমার মনে হয় না, ওদের বিরুদ্ধে কেউ টিকতে পারবে।'
উব্বাদ লোকটার সাজানো কথা বুঝতে পারলেন। আসল তথ্যের জন্য মুখ খুলতে চাবুক বের করে বসিয়ে দিলেন কয়েকটা। চেপে ধরে বললেন, 'আমি বুঝতে পেরেছি তুই ইয়াহুদিদের গুপ্তচর। এখন সত্যি বলবি, নাকি গর্দান উড়িয়ে দেবো?' জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে লোকটা আসল তথ্য প্রকাশ করে বলল, 'আসলে ওরা তোমাদের কথা ভেবে ভীষণ ভীত ও আতঙ্কিত। বনু নাযিরের দেশান্তরিত ইয়াহুদিরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। কিনানা আমাকে বলেছে, 'তুমি মাদীনার দিকে চলো, ওরা তোমাকে চিনতে পারবে না। ওদেরকে আমাদের ব্যাপারে সতর্ক করো। ভিখারির বেশে ওদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবে। শেষে আমাদের সংখ্যাধিক্য ও দাপট সম্পর্কে বলবে। ওরা কখনোই তোমাকে প্রশ্নের ফাঁদে ফেলবে না। তারপর দ্রুত আমাদের মাঝে ফিরে আসবে।'
দীর্ঘ পথ চলে মুসলিম বাহিনী খাইবারের উঁচু ভূমিতে পৌঁছলে আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের বললেন, 'একটু অপেক্ষা করো।' এরপর তিনি দুআ করে বলেন, 'সমূহ আসমান ও তার বিস্তৃত ছায়ার হে সম্মানিত প্রতিপালক, সাত তবক জমিন ও পৃষ্ঠে বহনীয় সবকিছুর রব, হে বিতাড়িত শয়তান ও ভ্রান্তদের রব, হে প্রবাহিত বাতাসের রব, আমরা তোমার কাছে এই জনপদ, জনপদবাসী এবং এখানকার সবকিছুর কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর আশ্রয় কামনা করছি এই জনপদ, জনপদবাসী ও এখানকার যাবতীয় ক্ষতি থেকে।' দুআ শেষে নির্দেশ দিয়ে বললেন, 'এবার বিসমিল্লাহ বলে তোমরা সামনে অগ্রসর হও।'
নবিজি অবশ্য যেকোনো জনপদে প্রবেশকালে এই দুআ পড়তেন।
এখানেই রাত নামে। আল্লাহর রাসূল সাহাবিদেরকে এই উঁচু ভূমিতে ঘুমানোর অনুমতি দেন। ভোরের আগমনে সবাই জেগে ওঠে তাকবীর হাঁকেন। দ্রুত সময়ে সেনা শিবির স্থাপন করেন গাতফান ও খাইবারের মধ্যবর্তী স্থান রজি নামক উপত্যকায়। উদ্দেশ্য হলো গাতফানিদের সাথে খাইবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।
ভোরের আলো ফোটার পর খাইবারের কৃষকরা লাঙল-কোদাল নিয়ে বেরিয়েছে কেবল। যে স্নিগ্ধ আলোয় ওরা নতুন দিনের কর্ম শুরু করতে চাচ্ছিল, সেই আলোয় মুসলিমদের বিশাল বাহিনী দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। চিৎকার করে বলে, 'আরে ওই দেখো, মুহাম্মাদ ও তাঁর বাহিনী এসে গেছে!'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'আল্লাহু আকবার, খাইবার পদানত হবে। আমরা যখন কোনো কওমের উঠোনে উপনীত হই, তখন সতর্ককৃতদের সকালটা হয় ভয়ানক।'
টিকাঃ
[৩৮৩] বুখারি, ৬৩৮৪; মুসলিম, ২৭০৪
[৩৮৪] দেখুন, ফাতহুল বারি, ৭/৫৩০
[৩৮৫] বুখারি, ৪১৯৬; মুসলিম, ১৮০২
[৩৮৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ২/৩০
[৩৮৭] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬১০-৬৪১
[৩৮৮] ইবনু হিব্বান, ২৭০৯; হাকিম, ২/১০০-১০১।
[৩৮৯] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ২/৪৫
📄 তিন. ভেঙে ফেল দুর্গ-প্রাসাদ
ইয়াহুদিরা দুর্গের ভেতর আশ্রয় নেয়। মুসলিম বাহিনী থেমে থাকার জন্য আসেনি। তারা প্রথমে দুর্গ অবরোধ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে একের পর এক দুর্গ জয় করে সামনে এগোচ্ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। মুসলিমরা সর্বপ্রথম নুতাত এলাকার না'য়িম ও সা'ব নামক দুর্গ পদানত করেন। তারপর শাক নামক এলাকায় আবুন নাযযারের দুর্গ। খাইবারের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল এই এলাকা দুটি। সময়ের অগ্রসরতায় কুতাইবা নামক এলাকার কুমূসুল মানি নামক দুর্গও মুসলিমরা জয় করেন। এটাই ছিল সালাম বিন আবীল হাকীকের দুর্গ। যাকে রাতের আঁধারে হত্যা করেছিলেন আবদুল্লাহ বিন আতীক-এর গেরিলা বাহিনী। শেষ পর্যায়ে এসে ভেঙে ফেলা হয় ওয়াতীহ ও সালালিম অঞ্চলের দুর্গ দুটি।
এগুলোর মধ্যে কিছু দুর্গ পদানত করতে মুসলিম বাহিনীকে কঠিন মোকাবিলা ও কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিশেষ করে না'য়িম নামক দুর্গ। এর নিচেই শাহাদাত বরণ করেছেন মাহমুদ বিন মাসলামা আনসারি। দুর্গের ওপর থেকে তার মাথার ওপর চাক্কি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই দুর্গ জয় করতে সময় লেগেছিল পাক্কা দশদিন। কোনো দুর্গ জয়ের পেছনে ব্যয় করা এটাই সর্বোচ্চ সময়। এখানে মুসলিমদের ঝান্ডা বহন করছিলেন আবু বাকর সিদ্দীক; কিন্তু তার মাধ্যমে এটি বিজিত হয়নি। মুসলিমরা চূড়ান্ত চেষ্টা ব্যয় করেও কোনো ফলাফল আসছিল না।
শেষে আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'আগামীকাল এই পতাকা এমন ব্যক্তিকে দেবো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাকে ভালোবাসে, সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। বিজয় লাভ করে তবেই সে ফিরে আসবে।' প্রতিটি মুসলিম হৃদয় এই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিল। একেবারে তৃতীয়দিন ফজরের সালাতের পর আল্লাহর রাসূল ﷺ 'আলি-কে কাছে ডাকেন। তার হাতেই তুলে দেবেন আজকের পতাকা; কিন্তু চোখে তার পিচুটির অসুস্থতা। নবিজি 'আলি-এর চোখে নিজের থুতু লেপ্টে দিয়ে দুআ করলেন। আশ্চর্য! ভালো হওয়ার কল্পনা করার আগেই তার চোখ স্বাভাবিক সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। এবার তিনি হাতে পতাকা তুলে নেন।
বিদায়ের আগে বিশেষ নির্দেশনা দিতে গিয়ে নবিজি বললেন, 'শোনো 'আলি, ইয়াহুদিদের ওপর হামলা করার আগে তাদেরকে ইসলামের দিকে ডাকবে। আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে একজন মানুষ হিদায়াত লাভ করা তোমার জন্যে লাল উট অপেক্ষা উত্তম।' 'আলি নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কতক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করব?' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'যতক্ষণ না তারা এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এ কথার সাক্ষ্য দিলে তাদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত হবে, তবে সংগত কারণ ব্যতীত। আর হিসাবের দায়িত্ব আল্লাহর।' অবশেষে 'আলি-এর হাতেই বিজিত হয় এই না'য়িম দুর্গ।
মুসলিমরা দুর্গটি অবরোধ করার পর এখানকার নেতা বেরিয়ে এসে মল্লযুদ্ধের ডাক দেয়। তার সাথে লড়তে গিয়ে আমির ইবনুল আকওয়া' প্রথমে শাহাদাত বরণ করেন। এরপর 'আলি তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করে তাকে হত্যা করেন। আরেক বর্ণনায় আছে, তাকে হত্যা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা। এই হত্যা ইয়াহুদিদের অভ্যন্তরীণ শক্তি দুর্বল করে দেয়; এরপরই তারা পরাজিত হয়।
কোনো কোনো বর্ণনায় ওঠে এসেছে, যুদ্ধের সময় ঢাল ভেঙে যাওয়ার পর না'য়িম দুর্গের একটি বিশাল দরজা 'আলি একাই এক হাত দিয়ে তুলে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এ সম্পর্কিত প্রত্যেকটি বর্ণনা দুর্বল। তবে এগুলোর অগ্রহণযোগ্যতা কিন্তু 'আলি-এর বীরত্ব ও শক্তিমত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। প্রমাণিত ও সাব্যস্ত বর্ণনাগুলোই তার বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট।
এই দুর্গ বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী সা'ব বিন মুআজের দুর্গের দিকে অভিমুখী হন। এই অংশের পতাকাবাহী হাব্বাব ইবনুল মুনজির কৌশলী যুদ্ধ নীতিগ্রহণ করেছিলেন। ফলে মাত্র তিন দিনেই ইবনু মুআজের দুর্গ জয় করেন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তারা লাভ করেন প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী। এটা সেই দিনকার কথা, যেদিন মুসলিমরা ছিলেন খাদ্য স্বল্পতায় ও অভুক্ত।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে মুসলিম বাহিনী যুবাইর-এর দুর্গের দিকে যাত্রা করে। না'য়িম ও ইবনু মুআজের দুর্গ থেকে যারা পালিয়েছিল, তাদেরকে যুবাইর এখানে আশ্রয় দিয়েছে। মুসলিমরা এই দুর্গ অবরোধ করে বাইরে থেকে আসা পানির লাইন কেটে দেন। ফলে তারা যুদ্ধের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয় এবং তিন দিন গত হতেই তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়। এভাবে নুতাত এলাকার শেষ দুর্গটিও মুসলিমদের পদানত হয়; সেখানে সবচেয়ে দাপুটে ও শক্তিশালী ইয়াহুদিদের বাস ছিল।
এ পর্যায়ে মুসলিমরা শাক্ক এলাকার অভিমুখী হন। বেশ কয়েকটি দুর্গ ছিল এখানে। সাহাবিরা অবরোধ শুরু করেন উবাই-এর দুর্গ থেকে। মুসলিমরা তাকে পরাজিত করেন। কিছু যোদ্ধা পালিয়ে নাযযারের দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলিমরা এখানেও তাদের পিছু নিয়ে আগের ধারাবাহিকতায় অবরোধ করেন। তারপর অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত বিজয়। তবে শাক্ক অঞ্চলের কিছু লোক এখান থেকে পালিয়ে কুমূসুল মানী, ওয়াতীহ ও সুলালিম দুর্গে একত্রিত হয়। মুসলিমরা চৌদ্দ দিন পর্যন্ত তাদেরকে অবরোধ করে রাখেন। অবশেষে তারা আপসের প্রস্তাব নিয়ে বের হয়ে আসে।
টিকাঃ
[৩৯০] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫০১
[৩৯১] প্রাগুক্ত
[৩৯২] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/ ৬৫৭
[৩৯৩] বুখারি, ৪২১০; মুসলিম, ২৪০৬
[৩৯৪] হাকিম, ৩/৩৭
[৩৯৫] বুখারি ৩০০৯; মুসলিম, ২৪০৬
[৩৯৬] মুসলিম, ২৪০৫
[৩৯৭] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫০২
[৩৯৮] প্রাগুক্ত
[৩৯৯] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/ ৩২৪
[৪০০] প্রাগুক্ত
[৪০১] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬৫৮-৬৭১
[৪০২] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৫০৪
📄 চার. গ্রাম্য শহীদ, কৃষ্ণা রাখাল এবং জাহান্নামের যাত্রী যে বীর
১. গ্রাম্য শহীদ
যুদ্ধের সামান্য অবসরে এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে আল্লাহর রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন। আনুগত্য প্রকাশ করে বলেন, 'আমি আপনার সাথে হিজরাত করতে চাই।' নবিজি কয়েকজন সাহাবির দায়িত্বে তাকে সোপর্দ করেন। সময়ের বহতায় খাইবর যুদ্ধ চলে আসে। আল্লাহর রাসূল গানীমাতের একটা অংশ তার জন্যেও বরাদ্দ রাখেন। তিনি উপস্থিত না থাকায় তা সাথিদের দেন। ইনি চারণভূমিতে পশু চরাতেন। কাজ শেষে ফিরে আসার পর সাথিরা গানীমাতের বণ্টিত অংশ তাকে দিয়ে দেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কীসের সম্পদ? সাথিরা বললেন, 'এগুলো আল্লাহর রাসূল তোমার জন্য রেখেছেন।'
গ্রাম্য সাহাবি এগুলো নিয়ে নবিজির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এগুলো কী জন্য?' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'গানীমাতের এই অংশটা তোমার জন্য রেখেছি।' সাহাবি বললেন, 'আমি এজন্য আপনার অনুসরণ করিনি; আমি আপনার অনুসারী হওয়ার উদ্দেশ্য হলো, আমার গলার এই জায়গাটার এসে তির বিদ্ধ হবে, এরপর আমি মৃত্যুবরণ করে জান্নাতে প্রবেশ করব!’
আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘তুমি আল্লাহর জন্য সত্য বলে থাকলে তিনি তোমার ইচ্ছা সত্যে পরিণত করবেন।’ কিছুক্ষণ পর এই গ্রাম্য সাহাবি জিহাদে অংশ নেন। শাহাদাতের পর তার লাশ নবিজির সামনে পেশ করা হয়। নবিজি বললেন, ‘এ সেই লোকটা না?’ সাহাবিরা বললেন, ‘জি’। সমাহিত করার আগে আল্লাহর রাসুল নিজের জুব্বা দিয়ে এই সাহাবির কাফন পরান। তার জানাযার সালাত পড়িয়ে দুয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, তোমার এই বান্দা তোমার রাস্তায় হিজরতের জন্য বেরিয়েছে। এখন সে শহীদ। আর আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছি।’
২. কৃষ্ণ রাখাল
খায়বারে একজন কৃষ্ণ হাবশি গোলাম তার মালিকের পশু চরাতো। সে খায়বারের লোকদেরকে অস্ত্র ধরতে দেখে বলল, ‘আপনারা কী করতে চাচ্ছেন?’ ইয়াহুদিরা বলল, ‘আমরা এই লোকটার সাথে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, সে নিজেকে নবি বলে দাবি করে।’ নবুওয়াত শব্দটা তার মনে রেখাপাত করে। যেন উদয় ঘটে আলোর। সে মেষপাল নিয়েই আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে বলল, ‘আপনি কীসের দিকে আহ্বান করেন?’ নবিজি বললেন, ‘আমি ইসলামের দিকে ডাকি এবং এ সাক্ষ্য দিতে বলি—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি আল্লাহর রাসুল এবং তুমি আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদাত করবে না।’
গোলাম বলল, ‘আমি যদি সাক্ষ্য দিই, ঈমান আনি আল্লাহর ওপর, তা হলে বিনিময়ে কী পাব?’ নবিজি বললেন, ‘ঈমানের ওপর তোমার মৃত্যু হলে জান্নাত লাভ করবে।’
হাবশি লোকটা ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, এই পশুগুলো আমার কাছে আমানত, এগুলো নিয়ে এখন আমি কী করতে পারি?’ আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘এগুলো বের করে মাঠে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তোমার আমানত যথাস্থানে পৌঁছে দেবেন।’ নতুন হাবশি সাহাবি তা-ই করেন। আল্লাহর ইশারায় পশুগুলো মালিকের কাছে চলে আসে। ইয়াহুদি বুঝতে পারে তার গোলাম ইসলাম গ্রহণ করেছে।
ইয়াহুদিদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপট চলে আসে। আল্লাহর রাসূল ﷺ সমবেত সাহাবিদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের জিহাদের প্রতি উজ্জীবিত করেন। শুরু হয় যুদ্ধ। যাদের ব্যাপারে শাহাদাত লিপিবদ্ধ ছিল, তারা শহীদ হন। এই মিছিলে হাবশি রাখাল সাহাবিও ছিলেন। মুসলিমরা তাকে সেনা ছাউনিতে নিয়ে আসেন। তারা ভেবেছিলেন আল্লাহর রাসূল এখানে আসবেন। নবিজি সাহাবিদের সামনে এসে বললেন, 'আল্লাহ তার এই বান্দাকে সম্মানিত করেছেন। নিয়ে এসেছেন খাইবারে। আমি তার মাথার কাছে দুজন হুর দেখেছি, অথচ সে আল্লাহর জন্য একটি সিজদাও করেনি।
৩. একজন বীরের শেষ পরিণতি
খাইবার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীতে একজন যোদ্ধা ছিলেন, মুশরিকদের যাকেই পাচ্ছেন, কাটছেন। তার তরবারির আঘাত থেকে নিস্তার পাচ্ছে না কেউ। অসীম বীরত্বের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন তিনি। তার ব্যাপারেই আল্লাহর রাসূল বললেন, 'সে তো জাহান্নামি।' সাহাবিরা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'সে যদি জাহান্নামি হয়, তা হলে আমাদের আর কে জান্নাতি হবে!' একজন সাহাবি বললেন, 'আল্লাহর কসম, সে এই অবস্থায় মরতে পারে না।' তিনি ওই লড়াকুর পিছু নিলেন। দেখলেন, যুদ্ধের এক পর্যায়ে সে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ক্ষতস্থানের ব্যথা তীব্র হলে সে তার তরবারি মাটিতে রেখে এর ধারালো ডগা রাখে বুকের মাঝখানে। এরপর নিজেকে তরবারিতে ছেড়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এই দৃশ্য দেখে সাহাবি আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।' নবিজি বললেন, 'তা হঠাৎ একথা বলছ?' সাহাবি পুরো খবর তাকে জানালেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'মানুষের কাছে মনে হয় এক ব্যক্তি জান্নাতের আমল করছে, অথচ সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, আরেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে মনে হয় সে জাহান্নামের আমল করছে, অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। '
টিকাঃ
[৪০৫] নাসাঈ, ৪/ ৬১-৬২; হাকিম, ৩/ ৫৯৫-৫৯৬
[৪০৬] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩২৩, ৩২৪
[৪০৭] বুখারি, ৪২০২; বাইহাকি ফি দালায়িলিন নুবুওয়াহ, ৪/২৫২