📘 রউফুর রহীম 📄 এক. আকীদাহ বিষয়ক বিধানাবলি

📄 এক. আকীদাহ বিষয়ক বিধানাবলি


১. সম্মানিত ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে থাকার বিধান
আল্লাহর রাসূল বসা ছিলেন। তাঁর পাশে নাঙা তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুগীরা ইবনু শু'বা। আসলে নবিজি বসা অবস্থায় তাঁর মাথার কাছে এভাবে দাঁড়িয়োনোর বিশেষ কোনো নীতি ছিল না। তবে শত্রুপক্ষের দূত আগমনের সময় সম্মান ও ফখরের নিমিত্তে এমন করা অনুসরণীয় সুন্নাহ। এতে ইমামের প্রতি মর্যাদা ও তার আনুগত্য প্রকাশ পাবে। মুমিনদের বার্তাবাহক কাফিরদের কাছে যাওয়া ও কাফিরদের দূত মুমিনদের কাছে আসার ক্ষেত্রে এই নীতিটা প্রচলিত ছিল। এটা আল্লাহর রাসূলের সতর্কীকরণের আওতাভুক্ত হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন—'যে ব্যক্তি চায়, মানুষ তার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকুক, তা হলে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা অবধারিত করে নেয়।'

অহংবোধ ও দম্ভভরে পথ চলা ইসলামে যদিও নিষিদ্ধ; কিন্তু এই দাম্ভিক চলন যুদ্ধক্ষেত্রে নিন্দিত বিবেচিত হয় না। কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে এটা জায়েয ঘোষণা করা হয়েছে। উহুদ যুদ্ধে এমনটাই করেছিলেন আবু দুজানাহ। আবু দুজানার দাম্ভিক চলন দেখে আল্লাহর রাসূল বলেছিলেন, 'এ ধরনের চলন আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে এই ক্ষেত্রটা ভিন্ন।'

২. শুভ সংকেত দেওয়া মুস্তাহাব, যা অশুভ লক্ষণের বিপরীত
সুহাইল বিন আমর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্য হুদাইবিয়ায় এলে আল্লাহর রাসূল সাহাবিদেরকে বললেন, 'তোমাদের কাজ সহজ হলো।' এই হাদীস থেকে শুভ সংকেত দেওয়া মুস্তাহাব হবার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, এটা নিষিদ্ধ অশুভ লক্ষণ নয়। আল্লাহর রাসূল থেকে পাওয়া বিভিন্ন হাদীস শুভ লক্ষণ শব্দের মর্ম স্পষ্ট করে। আল্লাহর রাসূল একবার সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'অশুভক্ষণ বলতে কিছু নেই, তবে এর উত্তম দিকটা হলো শুভ লক্ষণ।' সাহাবিগণ বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, শুভ লক্ষণ বলতে কী বুঝব?' তিনি বললেন, 'তোমাদের কেউ কল্যাণকর কথা শোনা।'

তা হলে শুভ সংকেত ও অশুভ লক্ষণের মাঝে পার্থক্য হলো, শুভ সংকেত আল্লাহর প্রতি সুধারণার পথ বেয়ে এসে থাকে, আর অশুভ লক্ষণে কেবল মন্দ ধারণাই প্রবল থাকে। এ কারণেই এটা নিন্দনীয়। আল্লাহর রাসূলের কাছে একবার অশুভ লক্ষণের কথা উল্লেখ করা হলো। তিনি বললেন, এর সুন্দরটা হলো শুভ লক্ষণ। এটা কোনো মুসলিমকে প্রতিহত করতে পারে না। তবে তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় কিছু দেখলে সে যেন বলে, 'হে আল্লাহ সমস্ত সুন্দর-কিছু তোমার পক্ষ থেকেই আসে, আবার সকল অকল্যাণ কেবল তুমিই প্রতিহত করো, আমরা ভালো কাজ করতে পারি না, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারি না তোমার তাওফিক ছাড়া।'

৩. বৃষ্টি বর্ষণে তারকারাজির প্রভাব বিশ্বাস করা কুফুরি আকীদাহ
খালিদ জুহানি বলেন— 'হুদাইবিয়া প্রান্তরে আল্লাহর রাসূল আমাদের নিয়ে রাত শেষের আলো-আঁধারিতে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাম ফিরিয়ে তিনি সাহাবিদের অভিমুখী হয়ে বললেন, 'তোমরা কি জানো, তোমাদের রব কী বলেছেন?' তারা বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।' তিনি বললেন, 'আমার বান্দাদের মধ্যে অনেকের ভোর হয়েছে আমার প্রতি বিশ্বাসী ও কুফুরি অবস্থায়। যে ব্যক্তি বলেছে, আল্লাহর রাহমাহ ও অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে, সে ব্যক্তি আমার প্রতি বিশ্বাসী আর তারকারাজিতে অবিশ্বাসী, আর যে ব্যক্তি এর বিপরীত বলেছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী ও তারকারাজিতে বিশ্বাসী।'

হাদীসে উল্লিখিত কুফুরকে উলামায়ে কেরাম কথকের কথার অবস্থা অনুযায়ী দুটি অর্থে নিয়েছেন। যারা বলবে, 'এই বৃষ্টি হয়েছে চাঁদের প্রভাবে; কিংবা তারা বিশ্বাস করে যে, বৃষ্টি বর্ষণে কার্যত তারকারাজির প্রভাব রয়েছে, তাহলে সে কাফির, ইসলামি মিল্লাত থেকে বের হয়ে যাবে।' ইমাম শাফিঈ বলেন, 'যে ব্যক্তি বলবে, তারকার কারণে এভাবে বৃষ্টি হয়েছে; যেমন জাহিলি যুগের মানুষ তারকার সাথে সম্পৃক্ত করে এমন করে বলত, তাহলে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর বক্তব্য অনুযায়ী এটা হবে কুফুরি আকীদাহ। কেননা, তারকা উদয়ের ক্ষণ একটি সময়, আর সময় আল্লাহর সৃষ্টি, সে নিজের ও অন্যের ক্ষেত্রে কিছু করার সাধ্য রাখে না। তাই যদি কেউ বলে, অমুক তারকা উদয়ের সময় বৃষ্টি হয়েছে, তাহলে এটা কুফুরি হবে না। তবে আমার কাছে এর চেয়ে অন্য কথা বলাই উত্তম।'

৪. বারাকাহর জন্য নেককারদের উচ্ছিষ্ট ব্যবহার কি জায়েয?
উরওয়া ইবনু মাসউদের হাদীসে আছে, তিনি সাহাবিদের কর্মতৎপরতা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন—'আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল থুতু ফেললে তা অবশ্যই কোনো ব্যক্তির হাতে এসে পড়ে, সে ব্যক্তি এই থুতু নিজের চেহারা ও ত্বকে মেখে নেয়। নিবিজি নির্দেশ দিলে তারা দ্রুত সেটা পালন করে। আর যখন তিনি ওযু করেন, তার ওযুর পানি নেবার জন্য তাদের মাঝে লড়াই বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়।'

এই হাদীস ও অনুরূপ হাদীসের প্রাসঙ্গিক আলোচনায় শাতিবি বলেছেন, 'এখান থেকে বাহ্যত বোঝা যায়, আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ ও তাঁর ওযুর অতিরিক্ত পানি দ্বারা বারাকাহ হাসিলের চেষ্টা করা হয়। এর অনুসরণে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এটা শরীআতসিদ্ধ হবে। তেমনইভাবে থুতু মেখে এর প্রভাবে শিফার আশা করার ব্যাপারেও একই কথা। তবে সাহাবিদের পরবর্তী আচরণবিধি এ বিষয়টির মাঝে আমাদের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কেননা, আল্লাহর রাসূলের ওফাতের পর কোনো একজন সাহাবি এমন কাজ করেননি। পরবর্তী লোকদের মাঝে যদিও যুগশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরাও ছিলেন। কেননা, আল্লাহর রাসূল তাঁর পরে উম্মাহর কাছে আবু বাকর অপেক্ষা উত্তম মানুষ আর রেখে যাননি। আবু বাকর নবিজির খলিফা ছিলেন; কিন্তু থুতু গায়ে মাখা, ওযুর পানি নিয়ে নেওয়া—এমন কিছুই তার সাথে হয়নি, এমনইভাবে 'উমার ইবনুল খাত্তাবের সাথেও, যিনি আবু বাকরের পরে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তারপর উসমান, 'আলি ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও আমরা এমন কিছুই পাই না, উম্মাহর মাঝে যাদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ আর কেউ হতে পারে না। আর বিশুদ্ধ কোনো সূত্রে তাদের কারও থেকে বারাকাহ হাসিলের এমন যেকোনো পন্থা প্রমাণিত নেই; বরং কথা, কাজ, জীবন অনুকরণে তাদের সকল বিষয় আল্লাহর রাসূল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কাজেই বলা যায়, নবিজির পরে এগুলো তরক করার ব্যাপারে সাহাবিদের মাঝে ইজমা সম্পন্ন হয়েছে।'

ইবনু ওয়াহাব তার জামে গ্রন্থে ইউনুস বিন ইয়াযীদের হাদীস উল্লেখ করেছেন, ইবনু শিহাব বলেন—'আমার কাছে আনসারী এক সাহাবি বর্ণনা করে বলেছেন, 'আল্লাহর রাসূল যখন ওযু করতেন কিংবা থুতু ফেলতেন, তখন আশপাশের মুসলিমরা দ্রুত তাঁর থুতু ও ওযুর পানি নিয়ে পান করতেন কিংবা গায়ে মাখতেন। নবিজি তাদেরকে এমন করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এমন করো কেন? সাহাবিগণ বললেন, 'আমরা এর দ্বারা বারাকাহ হাসিল করতে চাই।' এবার আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসতে চায়, সে যেন সত্য কথা বলে, আমানত রক্ষা করে ও প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।'

এই হাদীস জানাচ্ছে, আল্লাহর রাসূল থেকেও বারাকাহ হাসিলের উক্ত প্রতিযোগিতাটা ত্যাগ করাই উত্তম। আর হুদাইবিয়ার সময় তিনি সাহাবিদের এইসব কাজের সময় নীরব থেকেছেন, এর কারণ হতে পারে, তিনি মূলত কুরাইশের দূত উরওয়া ইবনু মাসউদকে তাঁর প্রতি সাহাবিদের অপার ভালোবাসার দৃশ্য দেখাতে চেয়েছেন। এমন হওয়া অনেকটা স্বাভাবিক, কেননা উরওয়া বিন মাসঊদ এসেই বলেছিল, 'আমি এমন কিছু মানুষ দেখতে পাচ্ছি, যারা তোমাকে একা রেখে পলায়ন করবে।'

টিকাঃ
[৩৩৩] আবু দাউদ, ৫২২৯; তিরমিযি, ২৭৫৫
[৩৩৪] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩০৪
[৩৩৫] মু'জামুল কাবীরে উল্লেখ করেছেন তাবারানী, ৬৫০৮
[৩৩৬] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/৩০৫
[৩৩৭] প্রাগুক্ত
[৩৩৮] বুখারি, ৫৭৫৪; মুসলিম, ২২২৩
[৩৩৯] ফাতহুল বারি, ১০/২২৫
[৩৪০] আবু দাউদ, ৩৯১৯
[৩৪১] বুখারি, ৮৪৬; মুসলিম, ৭১
[৩৪২] কিতাবুল উম্ম, ১/২৫২
[৩৪৩] দেখুন, হাকামী রচিত, গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া, পৃ. ৩০৫
[৩৪৪] তিনি আব্দুর রহমান ইবনু আবী কুরদ রাদিয়াল্লাহু আনহু।
[৩৪৫] মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ১৯৭৪৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px