📘 রউফুর রহীম 📄 সাত. বাইআতুর রিদওয়ান

📄 সাত. বাইআতুর রিদওয়ান


আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে দুঃসংবাদ এলো, মাক্কায় উসমান-কে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আর অপেক্ষা করলেন না। মুশরিকদের উচিত শিক্ষা দিতে ও প্রাণপণ যুদ্ধ করতে সাহাবিদেরকে বাইআতের জন্য ডাকলেন। সাহাবায়ে কেরাম মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য বাইআত গ্রহণ করেন। অন্তরে নিফাকি সুপ্ত রাখার কারণে জাদ্দ ইবনু কাইস এতে অংশ নিতে পারেনি। [২৮৫]

এক বর্ণনায় আছে, বাইআত নেওয়া হয়েছিল সবরের শর্তে।[২৮৬] আরেক বর্ণনা অনুযায়ী পিছু না হটার শর্তে।[২৮৭] তবে উভয় বর্ণনার মাঝে কোনো বৈপরিত্য নেই। কেননা, মৃত্যুর শর্তে বাইআতের বিষয়টি ইঙ্গিত করে, যুদ্ধের সময় সবর করতে হবে, পলায়ন করা যাবে না।

এ সময় প্রথম আনুগত্যের শপথ নেন আবু সিনান আবদুল্লাহ বিন ওয়াহাব আসদি।[২৮৮] তার পরে সাহাবিরা সবাই নবিজির দিকে এগিয়ে এসে শপথ নেন।[২৮৯] সালামা ইবনুল আকওয়া তিন বার বাইআত হয়েছিলেন, শুরুতে, মাঝখানে এবং সবার পরে আরেকবার। [২৯০]

আল্লাহর রাসূল ﷺ নিজের ডান হাত তুলে ধরে বললেন, 'এটা উসমানের হাত।' তারপর তা বাম হাতের ওপর রাখেন।[২৯১] নবিজির হাতে এদিন বাইআত হওয়া সাহাবিদের সংখ্যা ছিল ১৪শ।[২৯২]

বাইআতুর রিদওয়ানের কথা কুরআনে আলোচিত হয়েছে; কুরআনের বেশ কিছু আয়াত ও নবিজির হাদীসে বাইআতটিতে অংশ নেওয়া সাহাবিদের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন—

'যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে, অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, আল্লাহ সত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন। (সূরা ফাতহ: ১০)

এ আয়াতে বাইআতুর রিদওয়ানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের অনন্য প্রশংসায় ভূষিত করা হয়েছে। এরচেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে যে, নবিজির হাতে তাদের বাইআতের অর্থ হলো আল্লাহর হাতেই বাইআত! সন্দেহ নেই, সাহাবিদেরকে এখানে সম্মানের উন্নত শিখরে সমুন্নত করা হয়েছে।[২৯৩]

আল্লাহর রাসূল ﷺ-ও বিভিন্নভাবে তাদের প্রশংসা ও মর্যাদা প্রকাশ করেছেন। যেমন—
ক. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, হুদাইবিয়ার দিন আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের বলেছেন, 'আজ তোমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব কাফেলা।' সেদিন আমরা ছিলাম ১৪শ সাহাবি। আমি এখনো দেখতে চাইলে তাদেরকে বৃক্ষ ছায়ায় দেখতে পাই।'

খ. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ বলেন—উম্মু বাশার আমাকে জানিয়েছেন, তিনি শুনেছেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ হাফসাকে বলছিলেন, 'ইনশাআল্লাহ, বৃক্ষতলায় বাইআত হওয়া সাহাবিদের একজনও জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।' হাফসা বললেন, 'আসলেই কি তাই ইয়া রাসূলাল্লাহ্!' নবিজি তার প্রতি রাগ করেন। এবার হাফসা কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন—'তোমাদের সকলকেই তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে।'

নবিজি বললেন, 'হ্যাঁ, এরপর আল্লাহ এ কথাও বলেছেন— 'অতঃপর আমি পরহেযগারদের উদ্ধার করব এবং জালেমদের সেখানে নতানু অবস্থায় ছেড়ে দেবো।' (সূরা মারইয়াম: ৭২)

ইমাম নববি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর হাদীস—বৃক্ষের নিচে বাইআত হওয়া একজন সাহাবিও ইনশাআল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না—বিষয়ে উলামায়ে কেরাম বলেছেন, 'এটা সুনিশ্চিত সংবাদ যে, তাদের কেউ-ই জাহান্নামে যাবে না। নবিজি ইনশাআল্লাহ মূলত বলেছেন, বারাকাহ হাসিলের জন্য, সন্দিগ্ধ হয়ে নয়।

২য় পর্যায়ে হাফসা সংশয় প্রকাশ করেছেন, নবিজি তাকে ধমক দিয়েছেন, তারপর হাফসা আবার মতের পক্ষে দলিল হিসেবে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেছেন, 'তোমাদের সবাই এর ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে।' শেষে নবিজি বলেছেন, পরের আয়াত— 'অতঃপর আমি মুত্তাকিদের মুক্তি দেবো।' এই কথোপকথন প্রমাণ করে, বিতর্ক করা ও সঠিক বিষয় জানানোর জন্য জবাব দেওয়া জায়েয। হাফসা আল্লাহর রাসূলের কাছে জানতে চেয়েছেন, নবিজির কথা প্রত্যাখ্যান করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।

আর বিশুদ্ধ কথা হলো, আয়াতে জাহান্নামের ওপর দিয়ে অতিক্রমের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা জাহান্নামের ওপরে নির্মিত পুল। জাহান্নামিরা এখানে পড়ে যাবে, আর জান্নাতিরা মুক্তি পাবে।

বদর যুদ্ধের সাথে এই প্রেক্ষাপটটির তুলনা করলে স্পষ্ট হয়, হুদাইবিয়া সন্ধির সময় মুহাজির সাহাবিদের সংখ্যা বেশি ছিল। যেখানে বদর প্রান্তরে মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৩ জন, সেখানে আজ হুদাইবিয়ায় তাদের সংখ্যা ৮০০। এদের সিংহভাগই ছিলেন পার্শ্ববর্তী আরব ছোট গোত্রগুলোর যুবকশ্রেণি। ছোট এই গোত্রগুলোর যুবকরা হিজরাত করে মাদীনায় আসতেন। মিলিত হতেন আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর শান্তির পতাকাতলে। প্রাত্যহিক জীবনের শিক্ষা অর্জন করতেন মাসজিদে, আর বিভিন্ন যুদ্ধ ও অভিযানে ঋদ্ধ হতেন বাস্তব জীবনের শিক্ষায়। বিশেষ সামরিক বাহিনীতে অংশী হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে শিখতেন দীনের গভীর জ্ঞান। এভাবে বেড়ে উঠতেন অগ্রবর্তী মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের নিবিড় পরিচর্যা আর যত্নশীলতার ছায়ায়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালনে প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ফলে স্বভাবতই ছোট গোত্রগুলো মর্যাদায় বহুদূর এগিয়ে যায় আর বড় গোত্রগুলো ইসলামের সাথে বিচ্ছিন্নতার কারণে একদম তলানিতে পড়ে থাকে।

ক্রমশ উন্নয়নশীল গোত্রগুলোর শীর্ষে ছিল আসলাম ও গিফার গোত্র। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে একদম প্রথম দিকে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এদের মাঝে দা'ওয়ার সূচনা হয়েছিল আবু যর গিফারি-এর হাত ধরে। ইসলামের ঊষালগ্নে মাক্কায় এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর জাতির মাঝে ফিরে যান একজন একনিষ্ঠ দাঈ হয়ে। তার অবিশ্রান্ত মেহনতের ফলাফল প্রকাশ পেতে তেমন অপেক্ষা করতে হয়নি। এই তো, উহুদ যুদ্ধের পর বনু গিফারের ৭০টি পরিবার নিয়ে তিনি মাদীনায় আসেন। এদিকে হিজরাতের আগেই মাদীনায় এসে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বুরাইদা ইবনুল হাসীব আসলামি। তার গোত্রের ৭০জন ব্যক্তিসহ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। [২৯৪]

অন্যান্য গোত্রের মধ্যে মুযাইনা, জুহাইনা, আশজা ও খুযাআ গোত্রের কিছু যুবক মাদীনায় এসে ইসলামের পতাকা তলে শামিল হয়। বাকি অধিকাংশ থেকে যায় শিরকের অন্ধকারে। মাদীনার স্পর্শে থাকলেও মহান লক্ষ্য থেকে পড়ে থাকে অনেক দূরে। ফলে এমন মর্যাদা ও নবুওয়াতি অমৃত সুধা অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করতে পারেনি তারা। এজন্যই গ্রাম্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকা সম্পর্কে যখন আয়াত নাযিল হয়, সেই আয়াত তাদের বুকে বজ্রের মতো আঘাত হানে। [২৯৫]

টিকাঃ
[২৮৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়াহ, পৃ. ৪৮৬
[২৮৬] প্রাগুক্ত
[২৮৭] প্রাগুক্ত
[২৮৮] প্রাগুক্ত
[২৮৯] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৯০] সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৪০৪
[২৯১] বুখারি, ৩৬৯৮, তিরমিযি, ৩৭০৬
[২৯২] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮২
[২৯৩] নাসির হাসান রচিত, 'আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ ফিস সাহাবা, ১/২০৫
[২৯৪] আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ২১৪
[২৯৫] আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ৪/ ২১৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px