📄 ছয়. কুরাইশের কাছে আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি
আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর পক্ষ থেকে কুরাইশের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণের প্রয়োজন অনুভব করেন। এই প্রতিনিধির কাজ হবে নবিজির আগমনের উদ্দেশ্য তাদের জানানো, অর্থাৎ নবিজির উদ্দেশ্য স্বচ্ছ, তিনি যুদ্ধের ইচ্ছায় আসেননি, বরং পবিত্র নিদর্শনসমূহকে সম্মান প্রদর্শন ও উমরা পালন করতে চান। শেষে তিনি আবার মাদীনায় প্রস্থান করবেন। এ লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয় খিরাশ ইবনু উমাইয়া খুযাঈকে। সা'লাব নামক উট নিয়ে তিনি মাক্কার দিকে রওয়ানা করেন।
তিনি মাক্কায় প্রবেশ করার পর কুরাইশের মুশরিকরা তাকে আটক করে হত্যা করতে উদ্যত হয়; কিন্তু আহাবীসের লোকেরা এসে রক্ষা করে। খিরাশ সেখানে আর অপেক্ষা করেননি। তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে কুরাইশের ধৃষ্টতার কথা তুলে ধরেন।
এ পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর বার্তা দিয়ে আরেকজন দূত প্রেরণের উদ্যোগ নেন। শুরুতে তিনি এ কাজের জন্য নির্বাচন করেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব-কে। কিন্তু ‘উমার অপারগতা প্রকাশ করে ইঙ্গিত করেন উসমান ইবনু আফফানের দিকে। [২৭৭]
এই মতামত প্রকাশের পেছনে ‘উমারের অবশ্য যৌক্তিক কারণ ছিল। তিনি চেয়েছেন, শত্রুদের সাথে মেশার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। যার কারণে ‘উমারের জন্য কাজটি সংগত ছিল না। তাই তিনি উসমানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন—‘মক্কায় উসমানের গোত্রের লোকেরা এখনো বিদ্যমান। ওরা তাকে মুশরিকদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারবে, ফলে তিনি আল্লাহর রাসূলের চিঠিও পৌঁছাতে পারবেন।’ ‘উমার নবিজিকে বলেন— ‘আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কুরাইশ আমার ক্ষতি করবে, ওদের সাথে আমার শত্রুতার কথা খুব ভালো মনে আছে। সেখানে বনু আদির এমন কেউ নেই, যে আমাকে রক্ষা করবে; কিন্তু তবুও আপনি চাইলে আমি যেতে পারি।’[২৭৮] আল্লাহর রাসূল ﷺ কিছু বললেন না। ‘উমার নীরবতা ভেঙে আবার বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, তবে মক্কায় আমার চেয়ে সম্মানিত এক ব্যক্তির কথা বলতে পারি। তার আত্মীয়স্বজনও সেখানে বেশি। তিনি হলেন উসমান ইবনু আফফান।’ ‘উমারের এই পরামর্শ গ্রহণ করে নবিজি উসমানকে ডেকে বললেন, ‘উসমান, কুরাইশের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দাও—আমরা কাউকে হত্যা করতে আসিনি, এসেছি বাইতুল্লাহ যিয়ারত করতে। আমরা তার পবিত্র সীমানাকে সম্মান জানাতে চাই। আমাদের সাথে আছে হাদীর পশু। এগুলো আমরা জবাই করে আবার ফিরে যাব।’
উসমান রওয়ানা করে লাদাহ নামক স্থানে পৌঁছলেন। সেখানে কুরাইশের কিছু লোক তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল—‘উসমান, কোথায় যাচ্ছ?’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে এক আল্লাহ ও ইসলামের দিকে ডাকছেন। তোমরা পরিপূর্ণভাবে দীনে প্রবেশ করো। মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন এবং তাঁর নবিকে করবেন সম্মানিত। আরেকটি কথা হলো, অন্যদের পক্ষ না নিয়ে তাঁর পথ থেকে তোমরা সরে দাঁড়াও। তারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর বিজয়ী হলে তোমাদের ইচ্ছাই হাসিল হবে; কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ বিজয়ী হলে তোমাদের ইচ্ছাধিকার থাকবে। চাইলে অন্যদের মতো তোমরাও ইসলামে প্রবেশ করতে পার, অন্যথায় তোমাদের সামনে যুদ্ধেরও ইচ্ছাধিকার থাকবে। তা ছাড়া বলতে গেলে যুদ্ধ তো তোমাদের ক্লান্ত করে ফেলেছে। তোমরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছ।' এভাবে উসমান কথার চালে তাদেরকে তুচ্ছ করছিলেন। তারা এ ধরনের ঘা লাগানো কথা শুনতে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তাই জবাবে বলল, 'তোমার কথা আমরা শুনেছি; কিন্তু এটা কোনোভাবেই হবার নয়। মুহাম্মাদ ﷺ কোনোভাবেই আমাদের এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। তুমি তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে বলো, সে আমাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না।'
কিন্তু আবান ইবনু সাআদ উসমান-এর দিকে এগিয়ে আসেন। তাকে জড়িয়ে ধরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, 'তোমার প্রয়োজন থেকে পিছু হটবার দরকার নেই। এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে আসেন। উসমান তাকে পেছনে নিয়ে আবার মাক্কার পথ ধরেন। হালকা গতিতে তিনি মাক্কায় প্রবেশের পর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একে একে তার দিকে এগিয়ে আসে। আবু সুফিয়ান ইবনু হারব, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া ও অন্য অনেকে। এদের অনেকের সাথে উসমানের দেখা হয়েছে লাদাহে, অন্যদের সাথে মাক্কায়। তাদের একটাই কথা— 'মুহাম্মাদ ﷺ আমাদের এখানে কখনোই ঢুকতে পারবে না।' [২৭৯]
তবে মুশরিকরা উসমান-এর সামনে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের প্রস্তাব রাখে; কিন্তু তিনি অস্বীকার করে [২৮০] দুর্বল মুসলিমদের কাছে আল্লাহর রাসূলের এই বার্তা পৌঁছাতে যান যে, অচিরেই আল্লাহ তাদের জন্য সহজতা ও পরিত্রাণের পথ বের করবেন।[২৮১] ফেরার পথে এই দুর্বল মুসলিমদের একটা মৌখিক বার্তা তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে নিয়ে আসেন। তাদের ভাষ্য ছিল—'আল্লাহর রাসূলকে আমাদের পক্ষ থেকে সালাম বলুন। যে সত্তা তাকে হুদাইবিয়া অবতরণ করাতে সক্ষম, সেই সত্তা তাকে মক্কাতেও প্রবেশে সক্ষম।' [২৮২]
সন্ধির বিষয়ে মুশরিকদের সাথে মুসলিমদের মুখোমুখি আলোচনা চলছিল। এ সময় হঠাৎ কোনো পক্ষের একজন অন্য পক্ষের লোকদের দিকে তির নিক্ষেপ করে। জবাবে অপর পক্ষও তির, পাথর ইত্যাদি নিক্ষেপ শুরু করলে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। শুরু হয় শোরগোল, হইচই। নিজেদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে উভয়। পক্ষের লোকেরাই।[২৮৩] এই অবস্থার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলছেন—
'তিনি মাক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা ফাতাহ: ২৪)
ইমাম মুসলিম এই আয়াত নাযিল কারণ সম্পর্কে বলেন—'মাক্কার আশিজন মুশরিক জাবালে তানঈম থেকে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নেমে আসে। আল্লাহর রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের অমনোযোগিতার সুযোগ সন্ধানী ছিল ওরা। আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদের ধরে আবার ছেড়ে দেন। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ ওপরের আয়াতটি নাযিল করেন।'
সালামা ইবনুল আকওয়া এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন— 'হুদাইবিয়ায় মুশরিকরা আমাদের কাছে সন্ধির চিঠি প্রেরণ করে। এ সময় একে অপরের সাথে মিলেমিশে চলছিল। আমি আমার পরিবার-পরিজন ও সম্পদ ছেড়ে আল্লাহর রাসূলের দিকে হিজরাত করেছিলাম মাদীনায়। এখানে আসার পর থেকে আমি তালহা বিন উবাইদুল্লাহর অধীনে ছিলাম। তার ঘোড়াকে পানি খাওয়াতাম, পাতা পাড়তাম, তার সেবা করতাম, তার কাছেই খেতাম।
শান্তি আলোচনার এ পর্যায়ে মাক্কাবাসী ও আমরা মিলিত হয়ে সময় পার করছিলাম। ঝিমঝিম ঘুমের আভাসমাখা সময়। আমি একটি গাছের গোড়ায় এসে কাঁটা পরিষ্কার করলাম। এরপর শেকড়ে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। এমন সময় মাক্কার চারজন লোক আমার কাছে এসে আল্লাহর রাসূলের ব্যাপারে আলাপ জুড়ে দিলো। আমি বিরক্তি প্রকাশ করে অন্য গাছের নিচে চলে এলাম; কিন্তু তাদের থেকে দৃষ্টি সরাইনি।
ওরা গাছের ডালে অস্ত্র ঝুলিয়ে শুয়ে পড়ল। এভাবেই কেটে গেল কিছু সময়। হঠাৎ একজনের আওয়াজ ভেসে এলো। উপত্যকার নিচের দিক থেকে একজন ডেকে বলছে, 'মুহাজির সাহাবিগণ সতর্ক হও, ইবনু যানীমকে হত্যা করা হয়েছে।' আওয়াজ আমার কানে আসতেই দ্রুত তরবারি নিয়ে শুয়ে থাকা চার মুশরিকের দিকে এগিয়ে এলাম। তারা জেগে উঠবার আগেই অস্ত্রগুলো নিজের আয়ত্তে নিয়েনিলাম।
শেষে ওদেরকে বললাম, 'সেই সত্তার কসম, যিনি মুহাম্মাদ ﷺ-কে সম্মানিত করেছেন, তোমাদের যে কেউ মাথা ওঠানোর চেষ্টা করলে আমি তার মুণ্ডু ফেলে দেবো।'
ঘটনার আকস্মিকতায় তারা এখন আমার হাতে জিম্মি। আমি তাদের নিয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এলাম। দেখলাম, আমার চাচা আমেরও একজন আবলাতি লোককে নিয়ে আসছেন। লোকটার নাম ছিল মুকরিয। সত্তরজন অশ্বারোহীর সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে আসছেন।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বন্দিদের দেখে বললেন, 'এদেরকে ছেড়ে দাও।' এভাবে নবিজি তাদের ক্ষমা করে দেন। যার প্রেক্ষিতে আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন, 'তিনি মাক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা ফাতাহ: ২৪)
ইবনু কাসীর বলেন— 'মুমিনদের প্রতি এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। তিনি মুশরিকদের হাত তাদের থেকে নিবারিত রেখেছেন, ফলে এদের দিক থেকে মুমিনরা কোনো অনিষ্টের শিকার হয়নি, আবার মুশরিকদের ব্যাপারেও মুমিনদের হাত নিবারিত রেখেছেন, ফলে মাসজিদে হারামের কাছে তাদেরকে হত্যা করা হয়নি; বরং উভয় পক্ষ রক্ষা পেয়েছে এবং নিজেদের মাঝে যে কল্যাণকামিতা দেখেছে, তাতে ছিল মুমিনদের জন্য কল্যাণ এবং দুনিয়া-আখিরাতে নিরাপত্তা ও মুক্তি। [২৮৪]
টিকাঃ
[২৭৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৩
[২৭৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৯] যাদুল মাআদ, ৩/ ২৯০ সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/ ৩৪৪
[২৮০] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪৪
[২৮১] যাদুল মাআদ, ৩/২৯০
[২৮২] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৫
[২৮৩] যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৮৪] তাফসিরে ইবনে কাসীর, ৪/ ১৯২
📄 সাত. বাইআতুর রিদওয়ান
আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে দুঃসংবাদ এলো, মাক্কায় উসমান-কে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আর অপেক্ষা করলেন না। মুশরিকদের উচিত শিক্ষা দিতে ও প্রাণপণ যুদ্ধ করতে সাহাবিদেরকে বাইআতের জন্য ডাকলেন। সাহাবায়ে কেরাম মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য বাইআত গ্রহণ করেন। অন্তরে নিফাকি সুপ্ত রাখার কারণে জাদ্দ ইবনু কাইস এতে অংশ নিতে পারেনি। [২৮৫]
এক বর্ণনায় আছে, বাইআত নেওয়া হয়েছিল সবরের শর্তে।[২৮৬] আরেক বর্ণনা অনুযায়ী পিছু না হটার শর্তে।[২৮৭] তবে উভয় বর্ণনার মাঝে কোনো বৈপরিত্য নেই। কেননা, মৃত্যুর শর্তে বাইআতের বিষয়টি ইঙ্গিত করে, যুদ্ধের সময় সবর করতে হবে, পলায়ন করা যাবে না।
এ সময় প্রথম আনুগত্যের শপথ নেন আবু সিনান আবদুল্লাহ বিন ওয়াহাব আসদি।[২৮৮] তার পরে সাহাবিরা সবাই নবিজির দিকে এগিয়ে এসে শপথ নেন।[২৮৯] সালামা ইবনুল আকওয়া তিন বার বাইআত হয়েছিলেন, শুরুতে, মাঝখানে এবং সবার পরে আরেকবার। [২৯০]
আল্লাহর রাসূল ﷺ নিজের ডান হাত তুলে ধরে বললেন, 'এটা উসমানের হাত।' তারপর তা বাম হাতের ওপর রাখেন।[২৯১] নবিজির হাতে এদিন বাইআত হওয়া সাহাবিদের সংখ্যা ছিল ১৪শ।[২৯২]
বাইআতুর রিদওয়ানের কথা কুরআনে আলোচিত হয়েছে; কুরআনের বেশ কিছু আয়াত ও নবিজির হাদীসে বাইআতটিতে অংশ নেওয়া সাহাবিদের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন—
'যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে, অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, আল্লাহ সত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন। (সূরা ফাতহ: ১০)
এ আয়াতে বাইআতুর রিদওয়ানে অংশ নেওয়া সাহাবিদের অনন্য প্রশংসায় ভূষিত করা হয়েছে। এরচেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে যে, নবিজির হাতে তাদের বাইআতের অর্থ হলো আল্লাহর হাতেই বাইআত! সন্দেহ নেই, সাহাবিদেরকে এখানে সম্মানের উন্নত শিখরে সমুন্নত করা হয়েছে।[২৯৩]
আল্লাহর রাসূল ﷺ-ও বিভিন্নভাবে তাদের প্রশংসা ও মর্যাদা প্রকাশ করেছেন। যেমন—
ক. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, হুদাইবিয়ার দিন আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের বলেছেন, 'আজ তোমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব কাফেলা।' সেদিন আমরা ছিলাম ১৪শ সাহাবি। আমি এখনো দেখতে চাইলে তাদেরকে বৃক্ষ ছায়ায় দেখতে পাই।'
খ. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ বলেন—উম্মু বাশার আমাকে জানিয়েছেন, তিনি শুনেছেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ হাফসাকে বলছিলেন, 'ইনশাআল্লাহ, বৃক্ষতলায় বাইআত হওয়া সাহাবিদের একজনও জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।' হাফসা বললেন, 'আসলেই কি তাই ইয়া রাসূলাল্লাহ্!' নবিজি তার প্রতি রাগ করেন। এবার হাফসা কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন—'তোমাদের সকলকেই তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে।'
নবিজি বললেন, 'হ্যাঁ, এরপর আল্লাহ এ কথাও বলেছেন— 'অতঃপর আমি পরহেযগারদের উদ্ধার করব এবং জালেমদের সেখানে নতানু অবস্থায় ছেড়ে দেবো।' (সূরা মারইয়াম: ৭২)
ইমাম নববি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর হাদীস—বৃক্ষের নিচে বাইআত হওয়া একজন সাহাবিও ইনশাআল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না—বিষয়ে উলামায়ে কেরাম বলেছেন, 'এটা সুনিশ্চিত সংবাদ যে, তাদের কেউ-ই জাহান্নামে যাবে না। নবিজি ইনশাআল্লাহ মূলত বলেছেন, বারাকাহ হাসিলের জন্য, সন্দিগ্ধ হয়ে নয়।
২য় পর্যায়ে হাফসা সংশয় প্রকাশ করেছেন, নবিজি তাকে ধমক দিয়েছেন, তারপর হাফসা আবার মতের পক্ষে দলিল হিসেবে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেছেন, 'তোমাদের সবাই এর ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে।' শেষে নবিজি বলেছেন, পরের আয়াত— 'অতঃপর আমি মুত্তাকিদের মুক্তি দেবো।' এই কথোপকথন প্রমাণ করে, বিতর্ক করা ও সঠিক বিষয় জানানোর জন্য জবাব দেওয়া জায়েয। হাফসা আল্লাহর রাসূলের কাছে জানতে চেয়েছেন, নবিজির কথা প্রত্যাখ্যান করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।
আর বিশুদ্ধ কথা হলো, আয়াতে জাহান্নামের ওপর দিয়ে অতিক্রমের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা জাহান্নামের ওপরে নির্মিত পুল। জাহান্নামিরা এখানে পড়ে যাবে, আর জান্নাতিরা মুক্তি পাবে।
বদর যুদ্ধের সাথে এই প্রেক্ষাপটটির তুলনা করলে স্পষ্ট হয়, হুদাইবিয়া সন্ধির সময় মুহাজির সাহাবিদের সংখ্যা বেশি ছিল। যেখানে বদর প্রান্তরে মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৩ জন, সেখানে আজ হুদাইবিয়ায় তাদের সংখ্যা ৮০০। এদের সিংহভাগই ছিলেন পার্শ্ববর্তী আরব ছোট গোত্রগুলোর যুবকশ্রেণি। ছোট এই গোত্রগুলোর যুবকরা হিজরাত করে মাদীনায় আসতেন। মিলিত হতেন আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর শান্তির পতাকাতলে। প্রাত্যহিক জীবনের শিক্ষা অর্জন করতেন মাসজিদে, আর বিভিন্ন যুদ্ধ ও অভিযানে ঋদ্ধ হতেন বাস্তব জীবনের শিক্ষায়। বিশেষ সামরিক বাহিনীতে অংশী হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে শিখতেন দীনের গভীর জ্ঞান। এভাবে বেড়ে উঠতেন অগ্রবর্তী মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের নিবিড় পরিচর্যা আর যত্নশীলতার ছায়ায়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালনে প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ফলে স্বভাবতই ছোট গোত্রগুলো মর্যাদায় বহুদূর এগিয়ে যায় আর বড় গোত্রগুলো ইসলামের সাথে বিচ্ছিন্নতার কারণে একদম তলানিতে পড়ে থাকে।
ক্রমশ উন্নয়নশীল গোত্রগুলোর শীর্ষে ছিল আসলাম ও গিফার গোত্র। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে একদম প্রথম দিকে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এদের মাঝে দা'ওয়ার সূচনা হয়েছিল আবু যর গিফারি-এর হাত ধরে। ইসলামের ঊষালগ্নে মাক্কায় এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর জাতির মাঝে ফিরে যান একজন একনিষ্ঠ দাঈ হয়ে। তার অবিশ্রান্ত মেহনতের ফলাফল প্রকাশ পেতে তেমন অপেক্ষা করতে হয়নি। এই তো, উহুদ যুদ্ধের পর বনু গিফারের ৭০টি পরিবার নিয়ে তিনি মাদীনায় আসেন। এদিকে হিজরাতের আগেই মাদীনায় এসে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বুরাইদা ইবনুল হাসীব আসলামি। তার গোত্রের ৭০জন ব্যক্তিসহ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। [২৯৪]
অন্যান্য গোত্রের মধ্যে মুযাইনা, জুহাইনা, আশজা ও খুযাআ গোত্রের কিছু যুবক মাদীনায় এসে ইসলামের পতাকা তলে শামিল হয়। বাকি অধিকাংশ থেকে যায় শিরকের অন্ধকারে। মাদীনার স্পর্শে থাকলেও মহান লক্ষ্য থেকে পড়ে থাকে অনেক দূরে। ফলে এমন মর্যাদা ও নবুওয়াতি অমৃত সুধা অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করতে পারেনি তারা। এজন্যই গ্রাম্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকা সম্পর্কে যখন আয়াত নাযিল হয়, সেই আয়াত তাদের বুকে বজ্রের মতো আঘাত হানে। [২৯৫]
টিকাঃ
[২৮৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়াহ, পৃ. ৪৮৬
[২৮৬] প্রাগুক্ত
[২৮৭] প্রাগুক্ত
[২৮৮] প্রাগুক্ত
[২৮৯] দেখুন, যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৯০] সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৪০৪
[২৯১] বুখারি, ৩৬৯৮, তিরমিযি, ৩৭০৬
[২৯২] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮২
[২৯৩] নাসির হাসান রচিত, 'আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ ফিস সাহাবা, ১/২০৫
[২৯৪] আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ২১৪
[২৯৫] আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ২১৬