📄 তিন. পথ পরিবর্তন ও হুদাইবিয়ায় অবতরণ
আল্লাহর রাসূল ﷺ জানতে পারেন, খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কুরাইশের গেরিলা বাহিনী গিরিখাতে ওত পেতে ঘাপটি মেরে আছে। নবিজি স্থির করলেন তাদের মুখোমুখি হবেন না। তাই মুশরিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে পথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন— 'কে পারবে, আমাদেরকে ওদের পথ ভিন্ন অন্য পথে নিয়ে যেতে?'
আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার অন্য পথ জানা আছে।' মুসলিমদের জন্য চলা কষ্টকর দুর্গম এক পথ দিয়ে তিনি অগ্রসর হন। উপত্যকার শেষ প্রান্তে এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহলা ভূমির দিকে বের হন। এ সময় নবিজি সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন— 'তোমরা বলো, আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তাঁর দিকে ফিরে আসছি।' সাহাবায়ে কেরাম এটি পাঠ করেন।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'আল্লাহর কসম, এই ক্ষমার বাণী বনি ইসরাইলের সামনে পেশ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা এটা বলেনি।' [২৫৪] এরপর নবিজি হামশের ডান দিক দিয়ে একটি পথ ধরার নির্দেশ দেন, যা সানিয়্যাতুল মারার-এ এসে মিলিত হয়েছে। সাহাবিদের পদাঘাতে সৃষ্ট উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা দেখে ওত পেতে থাকা খালিদ মুসলিমদের পথ সম্পর্কে জানতে পারেন। সাথিদের নিয়ে তিনি দ্রুত ঘোড়া হাঁকান মাক্কার দিকে। স্বজাতির কাছে পৌঁছে হঠাৎ আসন্ন এই বিপদের জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মুশরিকদের মাঝে আতঙ্ক জেঁকে বসে। ইসলামি বাহিনীকে হুদাইবিয়ায় থামিয়ে দিতে বাহিনী প্রস্তুত করে তারা। মুসলিমদের থেকে মাক্কা রক্ষার জন্য সবখানে জারি হতে থাকে সতর্ক বার্তা।
এই মোহন প্রেক্ষাপট সম্পর্কে মাহমুদ শিত বলেন, 'মুসলিমদের নিয়ে নবিজি শত্রুদের ভয়ে ভীত হয়ে পথ পরিবর্তন করেননি। কেননা, যারা শত্রুকে ভয় পায়, তারা নিজেদের শক্তির কেন্দ্র মূল বাহিনী নিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে, [২৫৫] যেন শত্রুদের ধারাবাহিক পরিকল্পনা দীর্ঘায়িত হয়। এর মাঝে শত্রুকে ঘায়েল করতে গ্রহণ করা যায় উপযুক্ত পরিকল্পনা।
'সামরিক নীতি গ্রহণ' সম্পর্কিত কিতাবাদিতে এসেছে, 'নিরাপদ ভিন্ন রাস্তা গ্রহণ করে আল্লাহর রাসূল ﷺ সামরিক নেতৃত্বে বিচক্ষণতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। দূরবর্তী রাস্তা অবলম্বন করে ইসলামি বাহিনীকে তিনি ধ্বংস ও ক্ষতির আবর্ত থেকে সুরক্ষা দিয়েছেন। শত্রুর অতর্কিত হামলার সমূহ পথ থেকে নিজেকে রেখেছেন নিরাপদ দূরত্বে।”[২৫৬]
টিকাঃ
[২৫৪] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৩৮
[২৫৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া, পৃ. ৩৯
[২৫৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৭৪
📄 চার. কাসওয়া বেঁকে বসেনি, ওর চরিত্রে এমন স্বভাবও নেই
আল্লাহর রাসূল ﷺ হুদাইবিয়ার নিকটবর্তী হবার পর তাঁর কাসওয়া নামক উটটি হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম বলছিলেন, 'কাসওয়া বেঁকে বসেছে!'
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'কাসওয়া বেঁকে বসেনি, ওর স্বভাবে এমনটা নেই, বরং হস্তি বাহিনীকে যিনি আটকিয়ে ছিলেন, তিনি এটারও পথ রোধ করেছেন। সেই সত্তার কসম, যাঁর অধীনে আমার জীবন, মাক্কার কাফিররা আল্লাহর নিদর্শনাবলির সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে আমাকে যেকোনো প্রস্তাব দিলে আমি তা গ্রহণ করব।' [২৫৭] এরপর নবিজি নিজে উটের গায়ে খোঁচা দেওয়ার পর সে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল ﷺ মাক্কার পথ ছেড়ে হুদাইবিয়ার শেষ প্রান্তে একটি ঝরনার পাশে এসে তাঁবু স্থাপন করেন। খুব সামান্য পানি ঝরছিল এই ঝরনা বেয়ে।
সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দেওয়ার কারণে সবাই ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম তৃষ্ণা কাতরতার কথা জানালেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ তৃণীর থেকে একটি তির বের করে বললেন, 'এটি কূপের ভেতর গেঁথে দাও।' সাহাবিগণ তিরটি কূপের ভেতর গেঁথে দেওয়ার পর মৃতপ্রায় কূপ থেকে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা উৎসারিত হয়। সাহাবায়ে কেরাম তৃপ্তি ভরে পানি পান করেন। [২৫৮]
অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ কূপের কিনারে বসে কুলি করেন। [২৫৯] এই কুলির পানি কূপে ফেলার পর স্বচ্ছ পানিতে ভরে ওঠে তার ভেতর। বর্ণনা দুটির মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব—নবিজি একই সাথে দুটি কাজই করেছেন। ইবনু হাজার এই মতই ব্যক্ত করেছেন। ওয়াকিদি উরওয়া থেকে বর্ণনা করে বলেন— 'আল্লাহর রাসূল ﷺ বালতিতে কুলি করে তা কূপে ঢেলে দেন, এরপর একটি তির বের করে কূপে নিক্ষেপ করে আল্লাহর কাছে দুআ করেন।'[২৬০]
আল্লাহর রাসূলের উট কাসওয়া হাঁটু গেড়ে বসার মাঝে লক্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরা এখন সংগত মনে করছি:
১. পৃথিবীর সব কিছুই চলে আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছায়। তাঁর ইচ্ছা ও নির্দেশের বাইরে কেউ যেতে পারে না। তা হলে আল্লাহর রাসূলের উটের ব্যাপারে ভেবে দেখুন, সেটা কোথায় থেমেছিল এবং সাহাবিগণ এটাকে কেমন অপছন্দ করেছেন, চেষ্টা করেছেন উঠিয়ে দিতে মাক্কা অভিমুখে যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। ধরে নিলাম, যাত্রা অব্যাহত থাকার পর তারা বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছালেন, এরপর ফলাফল কী দাঁড়াত? কিন্তু না, আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন অন্য কিছু।'[২৬১]
২. আল্লাহর রাসূলের কথা, 'এটিকে তিনি থামিয়েছেন, যিনি থামিয়েছিলেন হস্তিবাহিনীকে'। এর ভিত্তিতে ইবনু হাজার আসকালানি বলেন, 'এখান থেকে উপমার ব্যাপকতা জায়েয প্রমাণিত হয়, যদিও বিশেষ দিকটার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকে। কেননা, হস্তিবাহিনী ছিল শুধুই ভ্রান্তির ওপর, আর এই উটের মালিক ছিলেন চির সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু উপমা দেওয়া হয়েছে সাধারণভাবে মাসজিদুল হারামে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় আল্লাহর ইচ্ছার দিক বিবেচনায়। বাতিলকে আল্লাহ থামিয়ে দিয়েছেন স্পষ্ট কারণে, আর নবিজির উট থামিয়ে দেওয়ার কারণ কারও কাছে অবিদিত নয়।[২৬২]
৩. আরেকটি জিনিস স্পষ্ট হয়, যেমন: মুশরিক, বিদআতি, অপরাধী, বিদ্রোহী ও জালিমরাও যদি এমন বিষয়ের দিকে আহ্বান জানায়, যেখানে নিহিত থাকে আল্লাহর নির্ধারিত সম্মানিত বিষয়কে মর্যাদা দানের কথা। তখন সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে সে কাজে সাহায্য করতে হবে। তবে অবশ্যই তাদের কুফুরি ও অবাধ্যতায় কোনোভাবেই সাহায্য করা যাবে না। শুধু যেটা আল্লাহর প্রিয় ও যেখানে তাঁর সন্তুষ্টি আছে, তাতে সাড়া দিতে হবে। তবে দেখতে হবে সেখানে আল্লাহর অভিশাপের বিষয়টি সংযুক্ত কিনা। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি দিক, যা অনেক মানুষের জন্য কষ্টকর। [২৬৩]
৪. আল্লাহ-এর সিদ্ধান্ত ছিল এ অভিযানে মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হবে না। কী হিকমাহ ছিল! সময়ের মুহূর্ত ব্যবধানে তা প্রকাশ পেয়েছে।
ক. মুসলিম বাহিনী শক্তি নিয়ে প্রবেশ করত, অনেক প্রাণ ঝরত, উভয় পক্ষের মানুষের মাঝে রক্তপাত ঘটত। আল্লাহ এমনটি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন উভয় পক্ষের মাঝে কল্যাণ সাধিত হোক।
খ. এটার সম্ভবনাও ছিল যে, মাক্কায় অভিযান পরিচালিত হলে সেখানকার দুর্বল মুমিনরা হত্যার শিকার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এটি এমন আবর্ত, যেখানে মুসলিমরা পতিত হওয়া সংগত নয়। আল্লাহ তাআলা বলছেন:
'তারাই তো কুফুরি করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মাসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কুরবানির জন্তুদের যথাস্থানে পৌঁছাতে। যদি মাক্কায় কিছু সংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না; অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সবকিছু চুকিয়ে দেওয়া হতো; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম। (সূরা ফাতহ: ২৫)
গ. আল্লাহ তাআলা তো জানেন, আজকে যারা আল্লাহর রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিদেরকে মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে, একদিন আল্লাহ তাদেরই অন্তর ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করবেন, তাদের হাতে বিজিত করবেন পৃথিবীর বিভিন্ন শহর। তারা মানুষের মাঝে এই রিসালাতের বার্তা নিয়ে ভ্রমণ করবেন, অন্ধকারাচ্ছন্ন পথগুলো আসমানি আলোয় আলোকিত করবেন। [২৬৪]
টিকাঃ
[২৫৭] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৮] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৯] ফাতহুল বারি, ৪/৭০৮
[২৬০] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৬১] আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৩
[২৬২] ফাতহুল বারি, ৬/৬১
[২৬৩] আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৭
[২৬৪] আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৫
📄 পাঁচ. আল্লাহর রাসূল ও কুরাইশের মাঝে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা
আল্লাহর রাসূল ﷺ সাধ্য মতো চেষ্টা করেছেন তার সংকল্পের কথা বোঝাতে যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধের ইচ্ছায় আসেননি, তাঁর ইচ্ছা হলো বাইতুল্লাহ যিয়ারত করা, যে ক্ষেত্রে মুসলিম ও অন্যরা সবাই সমান অধিকার রাখেন। আল্লাহর রাসূলের এই সংকল্প সম্পর্কে অবগত হবার পর কুরাইশরা হুদাইবিয়ায় দূত পাঠায়। উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদের শক্তিমত্তা ও যুদ্ধের মনোভাব সম্পর্কে জানা। সবিশেষ নিরাপদ উপায়ে মুসলিমদেরকে বাইতুল্লাহ থেকে ফিরিয়ে রাখা।[২৬৫]
খুযাআর প্রতিনিধি দলের আগমন:
আল্লাহর রাসূল ﷺ এখানে অবস্থানের শুরুর দিককার কথা। বুদাইল বিন ওরকা তার গোত্র বনু খুযাআর একটি জামাআত নিয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে আসে দেখা করবার জন্য। তিহামা অঞ্চলের অধিবাসীদের মাঝে এরাই ছিল আল্লাহর রাসূলের একান্ত হিতাকাঙ্ক্ষী। ওরা বলল, 'মুসলিমদের মাক্কায় প্রবেশে বাধা দিতে কুরাইশরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আছে।'
আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদেরকে আগমনের কারণ জানান। অব্যাহত যুদ্ধের কারণে কুরাইশ কী পরিমাণ ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাও উল্লেখ করেন। শেষে বলেন— 'একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওদের সাথে আমাদের শান্তিচুক্তি হতে পারে। অস্বীকার করলে যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না, যদিও ব্যাপক ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হয়।
খুযাআর লোকেরা কুরাইশের কাছে আল্লাহর রাসূলের অভিপ্রায় উল্লেখ করে বলল, 'ওহে কুরাইশ, তোমরা মুহাম্মাদের ব্যাপারে তড়িঘড়ি করছ। মুহাম্মাদ ﷺ এখানে যুদ্ধের জন্য আসেননি, তিনি তো এসেছেন বাইতুল্লাহ যিয়ারতে।'
ওরা খুযাআর লোকদের কথা বিশ্বাস করতে পারে না। উলটো তীর্যক কথাবার্তা শুনিয়ে তাদের কান ভারি করে তোলে। শেষে প্রস্তাবের কথা অস্বীকার করে বলে, 'মুহাম্মাদ ﷺ এ উদ্দেশ্যে এলেও সে কোনোভাবে আমাদের মাঝে প্রবেশ করতে পারবে না। আরবরাও এ ব্যাপারে কথা বলবে না।' [২৬৬]
কুরাইশের মনোভাব ইতিবাচক না হলেও তাদের সামনে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দিয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ অনন্য রাজনৈতিক দক্ষতার বিকাশ ঘটিয়েছেন। এর কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন বলেই এ পথে এগিয়েছেন। এখন আমরা দেখব, নবিজি কেন শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন:
ক. এই শান্তিচুক্তি কুরাইশের নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা দেবে, আরব্য উপদ্বীপে ঘটমান সংঘাত থেকে দূরে রাখবে। চাই এই সংঘাত আরবের অন্য গোত্রের সাথে হোক, কিংবা গাদ্দার, অভিশপ্ত শত্রু ইয়াহুদি জাতি হোক, যারা সারাক্ষণ মুসলিমদের বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থাকে।
খ. আল্লাহর রাসূল ﷺ চাচ্ছিলেন তাঁর ও কুরাইশের মাঝে যোগাযোগের দুয়ার উন্মুক্ত থাকুক, যেন মধ্যস্থতাকারী কিংবা দূতের মাধ্যমে তিনি তাদের কথা শোনেন, তারাও তাঁর কথা শোনে। এভাবে মানুষ আসলে আন্তরিকভাবে কাছে আসে, নিভে যায় যুদ্ধের দাবানল। দুর্বল হয় সংঘাতের মানসিকতা।
গ. বুদাইল বিন ওয়ারাকার নেতৃত্বে আসা খুযাআর প্রতিনিধি দলটিকে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তাদের মিত্রগোত্র দুর্বল নয়, শক্তিশালী। ফলে নবিজির প্রতি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। এমনটিই হয়েছে, হুদাইবিয়ার সন্ধিতে তারা গুরুত্ব দিয়েছে।
ঘ. বিবেকবানরা যখন আল্লাহর রাসূলের কথা শুনে সামান্য চিন্তা করবে যে, তিনি এসেছেন বাইতুল্লাহকে সম্মান প্রদর্শন করতে; আর মুশরিকরা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, তিনি সম্মান প্রদর্শনের পথে বাধা গ্রস্ত হচ্ছেন, তখন অচিরেই এই বিবেকবান লোকগুলো তাঁর পাশে দাঁড়াবে, তাঁর প্রতি হবে সহমর্মী। ফলে তাঁর কেন্দ্র শক্তিশালী হবে, মানুষের মনে কুরাইশের কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়বে।
ঙ. বুদাইলের মুখে নবিজির বার্তা বিশ্বাস করেনি কুরাইশ। কেননা তারা আগে থেকেই জানে, বনু খুযা মুহাম্মাদ ﷺ-এর মিত্র গোত্র ও কল্যাণকামী। আল্লাহর রাসূলের ব্যাপারে খুযাআর হিতাকাঙ্ক্ষিতার দিকটাও কুরাইশ বুঝতে পেরেছে। [২৬৭]
২. উরওয়া ইবনু মাসউদের মধ্যস্থতা:
আল্লাহর রাসূল ﷺ যে এসেছেন বাইতুল্লাহ যিয়ারত করতে, যুদ্ধের ইচ্ছায় নয়, বুদাইলের মুখে নবিজির এ কথা কুরাইশ বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওরা বরং এদেরকে সন্দেহ করে আপত্তিকর কথা বলে; কিন্তু উরওয়া ইবনু মাসঊদ আল্লাহর রাসূলের মুখোমুখি হয়ে তাঁর কথা শোনবার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। সে নবিজির কাছ থেকে কুরাইশের কাছে ফিরে যায় দৃঢ় সংবাদ নিয়ে। [২৬৮] ইমাম বুখারির বর্ণনায় আছে—
'উরওয়া বিন মাসউদ দাঁড়িয়ে বলল, 'আমি কি তোমাদের কাছে পিতৃতুল্য নই? সবাই এক বাক্যে বলল, হ্যাঁ, অবশ্যই। উরওয়া আবার বলল, তোমারা কি আমার কাছে সন্তানের মতো নও? এবারও আওয়াজ এলো, হ্যাঁ অবশ্যই। উরওয়া বলল, আমার ব্যাপারে তোমাদের কারও মাঝে কি কোনো সন্দেহ আছে? লোকেরা বলল, না।
উরওয়া আগের ইতিহাস টেনে বলল, আমি উক্কাযের লোকদেরকে তোমাদের সাহায্যের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলাম। তারা আমার ডাকে সাড়া না দিলে আমি আমার পরিবারের লোকজন, সন্তান, ও আমার অনুসারীদের নিয়ে তোমাদের সাহায্যে এসেছি।
লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ, আমরা এ কথা জানি।'
এবার উরওয়া বলল, এই ব্যক্তি তোমাদের সামনে একটি সুন্দর প্রস্তাব রেখেছে। আমার নিবেদন তোমরা প্রস্তাবটি মেনে নাও এবং এ কাজের জন্য আমাকেই পাঠিয়ে দাও। মাক্কার লোকজন তার হুদাইবিয়ায় আসার পক্ষে সায় দিলো।
উরওয়া বিন মাসউদ হুদাইবিয়ায় চলে আসে। আলাপ জুড়ে দেয় আল্লাহর রাসূলের সাথে। নবিজি বুদাইলকে বলা কথাগুলো হুবহু তাকেও শুনিয়ে দেন। উরওয়া বলে, 'শোনো মুহাম্মাদ, তুমি বলো তো, তোমার গোত্রকে যদি সমূলে ধ্বংস করে ফেল; তবে তোমার পূর্বে আরবের কেউ তার স্বজাতিকে ধ্বংস করেছে এমন কথা শুনেছ কি?'
কিন্তু যদি উলটো ঘটে। কুরাইশ তোমার ওপর বিজয়ী হয়, আমি তো দেখছি, সে সময় তোমার কাছে বিশ্বস্ত ও নির্ভরশীল কোনো মানুষ থাকবে না। বিক্ষিপ্ত কিছু মানুষের ভিড় এখানে দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধ শুরু হবার আগেই যারা তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে।'
উরওয়ার কথা শুনে আবু বাকর সিদ্দীক রাগে ফেটে পড়েন। নরম মানুষ অহমে আঘাত পেয়ে এতটা ক্ষিপ্ত হতে পারেন, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। উরওয়ার কথার গালে চপেটাঘাত হানতে বললেন, 'আরে! তুই তোর উপাস্য লাতের লজ্জাস্থান চেটে খা। কী মনে করিস, আমরা নবিজিকে একা ছেড়ে পালিয়ে যাব!'
উরওয়া সম্ভবত এমন অপমানজনক কথা আগে কখনো শোনেনি। তাই কথক সম্পর্কে জানতে জিজ্ঞেস করল, 'এই লোক কে?'
সাহাবিরা বললেন, 'ইনি আবু বাকর সিদ্দীক।' উরওয়া বলল, 'সেই সত্তার কসম, যার অধীনে আমার প্রাণ, আমার প্রতি তোমার সব অনুগ্রহের বিনিময় আমি এখনো দিতে পারিনি, নাহলে আজ অবশ্যই তোমার কথার জবাব দিতাম।'
উরওয়া ইবনু মাসউদ কূটনৈতিক তৎপরতায় মুসলিমদের আক্রমণ করে মানসিকভাবে পরাজিত করার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করে গুজব রটানোর অস্ত্র। অতিরঞ্জনের ওপর ভিত্তি করে কুরাইশের সামরিক শক্তির দিকে ইঙ্গিত করে এমনটাই সে প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি 'আমি তো বিক্ষিপ্ত কিছু মানুষের ভিড় এখানে দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধ শুরু হবার আগেই যারা তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে।' নবিজির সামনে এ কথা বলে সে সেনাপতি ও সৈন্যদের মধ্যকার নির্ভরশীলতায় ফাটল সৃষ্টি করার জন্য মুসলিম শিবিরে বিবশতা ছড়াতে চেয়েছে। সাহাবিদের নিয়ে তাচ্ছিল্যের বাক্য উচ্চারণে তার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মানসিক অবস্থায় প্রভাব বিস্তার করা, কুরাইশের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা।
তার আরও উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের সংকল্পের দেওয়াল চূর্ণ করা ও মানসিক অবস্থায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নবিজি ও সাহাবিদের মাঝে বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা। নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের এ এক শক্তিশালী উপকরণ। আলোচনায় সে কুরাইশের শক্তি বৃন্তান্ত উল্লেখ করে মুসলিমদের মনে ভয় ছড়াবার চেষ্টাকরেছে। [২৬৯]
তবে তার সমস্ত পদক্ষেপ ও আস্ফালন হৃদয়ের গভীরে গ্রথিত ঈমান, দৃঢ় চেতনা ও ইসলামি সীসাঢালা দেওয়ালে লেগে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। আলাপচারিতার মাঝখানে উরওয়া যে অচেনা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, সেটা সাহাবিদের ঈমানী শক্তি, ইসলামের দাপট ও আপসহীনতার কথাই বিকশিত করে। এখানে প্রতিভাত হয়েছে দীনের নৈতিক শক্তি একজন মানুষকে বিতাড়িত শয়তান থেকে কীভাবে নীতিবান মানুষে পরিণত করে। যেমন:
উরওয়া ইবনু মাসউদের সাথে মধ্যস্থতার আলোচনার সময় আল্লাহর রাসূলকে সুরক্ষা দিচ্ছিলেন মুগীরা ইবনু শু'বা। উরওয়ার ভাতিজা ছিলেন তিনি। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি নেশাগ্রস্ত ডাকাত শ্রেণির যুবক ছিলেন; কিন্তু ইসলামে প্রবেশ তাকে উত্তম মানুষে পরিবর্তন করে। আল্লাহর অনুগ্রহে তিনি মুমিনদের কাতারে একজন যোদ্ধা হিসেবে শামিল হন। যুদ্ধের আশঙ্কাময় এই মুহূর্তে আল্লাহর রাসূলের সুরক্ষার দায়িত্ব তার কাঁধেই অর্পিত হয়।
জাহিলি যুগে পারস্পরিক আলোচনার নীতি ছিল একজন আলোচক কথার মাঝখানে প্রতিপক্ষকে নিজের সমকক্ষ জ্ঞান করে তার দাড়িতে হাত দিত। এই নীতি অনুসারেই উরওয়া বিন মাসউদ আলাপচারিতার মাঝখানে আল্লাহর রাসূলের দাড়িতে হাত দিচ্ছিল। নবিজির পাশেই হাতে উন্মুক্ত তরবারি ও মাথায় শিরস্ত্রাণ পরে পাহারায় ছিলেন মুগীরা ইবনু শু'বা। উরওয়ার কাজ তার ক্রোধের আগুন উসকে দেয়। তিনি চাচারের কাছে এগিয়ে এসে তরবারির উলটো পিঠ দিয়ে তার হাতে হালকা বাড়ি দেন আর বলেন, 'আল্লাহর রাসূলের দাড়ি থেকে হাত দূরে রাখো। তাঁর মর্যাদায় পৌঁছার আকাশকুসুম ভাবনারও যোগ্যতা নেই তোমার!'
মুশরিক চাচা ও মুমিন ভাতিজার মধ্যকার এই দৃশ্যটা দেখে আল্লাহর নবি মৃদু হাসেন। মুগীরা ইবনু শু'বা যেহেতু যুদ্ধের সাজে সজ্জিত ছিলেন, হাতে তরবারি, মাথায় শিরস্ত্রাণ, তাই চাচা উরওয়া তাকে চিনতে পারছিল না। সে রাগের শীর্ষে ওঠে নবিজিকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার সাহাবিদের মধ্যে এই লোকটা কে?' আল্লাহ্র রাসূল ﷺ তাকে বললেন, 'এ তোমার ভাতিজা মুগীরা ইবনু শু'বা।'
উরওয়া এবার ভীষণ চটে গিয়ে বলল, 'আরে গাদ্দার! তোর গাদ্দারির ফল কি আমি এখনো ভোগ করছি না?'
জাহিলি সময়ে মুগীরা কিছু লোকের সাথে সফরে গিয়েছিলেন। এক সময় তাদের হত্যা করে সমস্ত সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাসূলের সামনে এসে হাজির হন। সম্পদগুলো রাখেন তাঁর সামনে। নবিজি বললেন, 'তোমার ইসলাম গ্রহণ ঠিক আছে; কিন্তু তোমার এই সম্পদের সাথে আমার কোনো সম্পর্কে নেই।' উরওয়া এই ঘটনার দিকে ইশারা করছিল।
উরওয়া তার আলোচনায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। মাক্কায় এসে কওমের লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমি পৃথিবীর বড় বড় রাজাবাদশাদের কাছে গিয়েছি। কাইসার কিসরা ও নাজ্জাশির সামনে থেকেছি। আল্লাহর কসম, আমি এমন কোনো বাদশা দেখিনি, যাকে এতটা সম্মান করা হয়, যতটা সম্মান মুহাম্মাদের সাথিরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম, নবিজি যখনই থুতু ফেলেন, অবশ্যই তা কোনো না কোনো সাহাবি হাতে নিয়ে মুখে ও দেহে মাখে। কোনো কাজের নির্দেশ দেওয়ার পর দ্রুত সে কাজ সেরে ফেলে। তিনি ওযু করার সময় তাঁর ওযুর পানি নেওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। তিনি কথা বলা শুরু করলে সবাই মুখবন্ধ করে নীরব হয়ে যায়। সব সময় থাকে শ্রদ্ধাবনত—নবির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে না। আসলেই তিনি তোমাদের সামনে একটি সুন্দর প্রস্তাব রেখেছেন, তোমরা তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে নাও। আমি তাদের পরখ করেছি, তোমরা তরবারি উঠাতে চাইলে ওরা সেটা তোমাদের ওপরই ব্যবহার করবে। আমি এমন জাতিকে দেখেছি, তাদের সাথে কী আচরণ করা হবে, তারা এটা নিয়ে পরোয়া করে না। সুতরাং, তোমরা আগের মত থেকে ফিরে এসো, তাঁর প্রস্তাব মেনে নাও। আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী; সাথে এ আশঙ্কাও করছি যে, তোমরা এমন ব্যক্তির ওপর বিজয়ী হতে পারবে না, যিনি এই বাইতুল্লাহর সম্মানার্থে এসেছেন, তাঁর সাথে রয়েছে 'হাদি', তিনি এগুলো জবাই করে ফিরে যাবেন।'
কুরাইশ বলল, 'ওহে আবু ইয়াফুর, আপনি এ ব্যাপারে আর কথা বলবেন না। আপনি ছাড়া অন্য কেউ এ কথাগুলো বললে তাকে আমরা অবশ্যই দেখে নিতাম; কিন্তু আর যাই বলুন, এ বছর তাকে ফিরে যেতেই হবে। আসতে হবে আগামী বছর।' [২৭০]
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও মুসলিম বাহিনী থেকে এর প্রভাব স্থানান্তরিত হয়ে কুরাইশের লোকদের মাঝে জেঁকে বসে। উরওয়া যা সত্য দেখেছে, তা-ই কুরাইশের সামনে এসে বর্ণনা করেছে। তা হলো—হুদাইবিয়ায় মুসলিমদের স্পষ্ট অবস্থান। সাহাবায়ে কেরাম তাদের নবির জন্য সদা অনুগত, তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন, তাঁর ওপর আপতিত যেকোনো বিপদ প্রতিহত করতে সদা প্রস্তুত। অধিকন্তু তাঁর থেকে মুসলিমরা উচ্চ মনোবল, মানসিক ও সামরিক যোগ্যতার রূহানি শক্তি গ্রহণ করে থাকেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের বিরুদ্ধে এখনই যুদ্ধে না জড়ানোর জন্য এটি কার্যকরী সতর্ক-বার্তা হিসেবে কাজ করেছে কুরাইশদের জন্য। কেননা, এই অকস্মাৎ যুদ্ধের ফলাফল চলে যাবে মুসলিমদের পক্ষে, আর শান্তি প্রস্তাব ভেঙে যেতে পারে কুরাইশ নেতাদের হাতেই।
সাকীফ গোত্রের এই সাইয়িদের কথা কুরাইশের নেতাদের অন্তরে বজ্রের মতো আঘাত হানছিল। আর আল্লাহর রাসূলের অবস্থান যেহেতু ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে, তাই এর প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে কুরাইশকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে বলা উরওয়া বিন মাসউদের প্রতিটি কথায়।
উপস্থিত লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহর রাসূল ﷺ তথ্যপূর্ণ বিভিন্ন পন্থা গ্রহণ করে তাঁর দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতায় সফল হয়েছেন। আর তা হলো কুরাইশের অভ্যন্তরীণ দিকটা ভেঙে টুকরো টুকরো করা, পরাজয়ের গ্লানি তাদের অন্তরে বিদ্যমান রাখা এবং মিত্র গোত্রগুলোকে তাদের থেকে দূরে রাখা। এই ফলাফলও আল্লাহর রাসূলের জন্য বিজয় হিসেবেই বিবেচিত হবে, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে আল্লাহর রাসূল যা বাস্তবায়িত করেছেন।[২৭১]
৩. হুলাইস ইবনু আলকামার মধ্যস্থতা
উরওয়া বিন মাসউদের পর কুরাইশের নেতারা আহাবীসের নেতা হুলাইস ইবনু আলকামাকে আল্লাহর রাসূলের উদ্দেশে হুদাইবিয়ায় প্রেরণ করে। আল্লাহর রাসূল ﷺ দূর থেকে তাকে দেখে বললেন, 'দেখো, এ অমুক গোত্রের লোক, যারা কুরবানির পশুকে সম্মান করে। কাজেই তোমরা যারা কুরবানির জন্য উট এনেছ, সেগুলো এই ব্যক্তির সামনে নিয়ে এসো।' সাথে উচ্চ আওয়াজে তালবিয়া পাঠেরও নির্দেশ দেন।
হুলাইস ইবনু আলকামা আসার পথে উপত্যকায় কুরবানির পশু দেখে সেখান থেকেই ফিরে যায়। আল্লাহর রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ না করেই ফিরে গেল কুরাইশের কাছে। এটা তার দেখা সম্মানের প্রতিফলন।[২৭২] উপত্যকাটি ছিল শুকনো, অনুর্বর, চারণভূমিতে ঘাস দানাপানি কিছুই ছিল না। কুরবানির পশুগুলো দীর্ঘ অনাহারের দরুন বাধ্য হয়ে নিজেদের মল খাচ্ছিল। সে মুসলিমদের কাছে আসতেই শুনতে পায় উচ্চ আওয়াজে তালবিয়া পাঠের সম্মিলিত আওয়াজ; যাদের দেহে শোভা পাচ্ছিল ইহরামের পোশাক। একই পোশাক দীর্ঘ সময় পরে থাকার কারণে ধুলোমলিন হয়ে গেছে। এসব দেখে হুলাইস মনস্থির করে, আল্লাহর ঘরের মেহমানদেরকে এভাবে বাধা দিয়ে রাখা অমানবিক। ফলে কুরাইশের হস্তক্ষেপ তার কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য মনে হয়।
শেষে বনু কিনানার এই নেতা আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা না বলেই ফিরে গেল; অথচ আগে থেকেই নবিজির সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল সে। বাইতুল্লাহ যিয়ারতকারীদের বিরুদ্ধে কুরাইশের অবস্থান তার কাছে শত্রুতামূলক মনে হয়। যে কাজে কুরাইশকে সাহায্য কিংবা পাশে থাকা কারও পক্ষেই বৈধ নয়।[২৭৩]
প্রতিনিধিত্বের বিপরীতে উলটো সে কুরাইশের বিরুদ্ধে দলিল হয়ে ফিরে আসে। চেষ্টা করে কুরাইশের সামরিক অবস্থানে পরিবর্তন আনবার। এদিনই সে আহাবীস ও কুরাইশের মধ্যকার প্রতিশ্রুতি ভেঙে দেয়।
পরে কুরাইশের লোকেরা আহাবীস নেতাদের উদ্দেশ্যে বলল, 'আমরা যা কিছু দেখেছি, সব মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিদের কৌশল। কাজেই আমাদের থেকে হাত গুটিয়ে নাও, যেন আমরা আমাদের ব্যাপারে পছন্দ মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারি।'[২৭৪]
হুলাইসের আগমন টের পেয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ তার সম্পর্কে বলেছিলেন 'সে এমন গোত্রের মানুষ, যারা কুরবানির পশুকে সম্মান করে।' এ তথ্যজ্ঞান থেকে স্পষ্ট হয়, আগত এই ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল ﷺ পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। নবিজির ভাষ্য থেকে জানা যায়, সম্মানিত ও পবিত্র নিদর্শনসমূহের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল গভীর। এ কারণে আল্লাহর রাসূল ﷺ-ও সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে অভিভূত করেন। ফলে সংঘাতের এই মুহূর্তে মুসলিমদের অবস্থানকে সে দেখেছে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে।
এ কথা উল্লেখ যথার্থ হবে যে, গোটা আরবে হুলাইসের একটা সুনাম ছিল এবং সুনাম ধরে রাখা সে পছন্দও করত। কেননা, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতায় সে ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে আহাবীসের নেতার আসন হাসিল করাটা তার জন্য উপভোগ্য ছিল। এমনইভাবে আল্লাহর রাসূল ﷺ ও কুরাইশ উভয় পক্ষ থেকে সম্মান ও মর্যাদা সে কামনা করত সমানভাবে। কাজেই তার কাছে যখন স্পষ্ট হলো, সত্য ও ইনসাফ মুসলিমদের পক্ষে; কুরাইশরা অন্যায়ে লিপ্ত, তখন সে বিবদমান দুটি পক্ষের মাঝে নিরাপদ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে। ফলে সে চেষ্টা করেছে কুরাইশের অবাধ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং মাসজিদুল হারাম থেকে মুসলিমদেরকে বাধা দেওয়া ও তাদের সাথে শত্রুতার মনোভাব পরিবর্তনে সম্মত করতে। [২৭৫]
এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষণীয় বিষয়টা হলো, আল্লাহর রাসূল ﷺ হুলাইসের ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ প্রদর্শন করে তার মাঝে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে উরওয়া ইবনু মাসউদকেও প্রভাবিত করে মুশরিক শিবিরে প্রবাহিত করেছেন ফাটলের আবহ।
উস্তাদ উক্কাদ আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর প্রতাপ কাজে লাগানো ও যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সম্পর্কে বলেছেন—
'যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রস্তুত ও তদন্ত করার জন্য আল্লাহর রাসূল ﷺ পূর্ণ সচেতন থাকতেন; এমনইভাবে যুদ্ধের অনিবার্যতায় সামরিক শক্তির সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই থাকত। মতপ্রকাশ ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দাওয়াতের শক্তিটাকে গুরুত্বের চোখে দেখতেন। নবিজির দৃষ্টিতে এর উপকারিতা ছিল অপরিসীম। নির্দেশনামা লেখার সময় তিনি কাতিকে যুদ্ধ ক্ষেত্রেও দাওয়াতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার কথা বলতেন।' মোটাদাগে এখানে নবিজির দুটি উদ্দেশ্য হতে পারে—
এক. সম্ভব হলে তোমার প্রতিপক্ষকে সম্মত করবে।
দুই. প্রতিপক্ষের সংকল্প দুর্বল ও তার বাহিনীতে বিভক্তি সৃষ্টি করে মূলত তাকে দুর্বল করতে হবে।
এরপর উক্কাদ বলেন—'অনেক সময় আল্লাহর রাসূল ﷺ মাত্র এক ব্যক্তির সাহায্যে যে অভীষ্টে পৌঁছেছেন, অনেক দেশও সুশৃঙ্খল বাহিনীর সাহায্যে সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। [২৭৬]
৪. মুকরিয ইবনু হাসের মধ্যস্থতা-আলাপনী
হুদাইবিয়ায় অবস্থানকালে মধ্যস্থতা আলাপের জন্য আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিল মুকরিয ইবনু হাস। ইমাম বুখারি এটি বর্ণনা করে বলেন, 'কুরাইশের পক্ষ থেকে আরেক ব্যক্তি এল হুদাইবিয়ায়। আল্লাহর রাসূল ﷺ তাকে দেখে বললেন, 'এ হলো মুকরিয বিন হাস, স্বভাবে অনাচারী। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন, এমন সময় তাদের মাঝে উপস্থিত হলেন সুহাইল বিন আমর। মা'মার বলেন—আমাকে ইকরিমার সূত্রে আইয়ুব জানিয়েছেন, 'সুহাইল বিন আমরকে আসতে দেখে আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'এ তোমাদের কাজ সহজ করবে।' সুহাইল সম্পর্কে আমাদের কিছু কথা আছে, সামনে আসছে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[২৬৫] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৫
[২৬৬] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪০
[২৬৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৬৭
[২৬৮] প্রাগুক্ত পৃ. ৬৮
[২৬৯] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১৩১, ১৩২
[২৭০] দেখুন ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৫৯৮
[২৭১] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১৪৫
[২৭২] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৮
[২৭৩] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১০৮
[২৭৪] ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৫] দেখুন, সালীম হিজাযী রচিত, মানহাজুল ই'লামিল ইসলামি ফি সুলহিল হুদাইবিয়াহ, পৃ. ১১১
[২৭৬] দেখুন, আবকারিয়্যাতু মুহাম্মাদ, পৃ. ৪৯
📄 ছয়. কুরাইশের কাছে আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি
আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর পক্ষ থেকে কুরাইশের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণের প্রয়োজন অনুভব করেন। এই প্রতিনিধির কাজ হবে নবিজির আগমনের উদ্দেশ্য তাদের জানানো, অর্থাৎ নবিজির উদ্দেশ্য স্বচ্ছ, তিনি যুদ্ধের ইচ্ছায় আসেননি, বরং পবিত্র নিদর্শনসমূহকে সম্মান প্রদর্শন ও উমরা পালন করতে চান। শেষে তিনি আবার মাদীনায় প্রস্থান করবেন। এ লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয় খিরাশ ইবনু উমাইয়া খুযাঈকে। সা'লাব নামক উট নিয়ে তিনি মাক্কার দিকে রওয়ানা করেন।
তিনি মাক্কায় প্রবেশ করার পর কুরাইশের মুশরিকরা তাকে আটক করে হত্যা করতে উদ্যত হয়; কিন্তু আহাবীসের লোকেরা এসে রক্ষা করে। খিরাশ সেখানে আর অপেক্ষা করেননি। তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে কুরাইশের ধৃষ্টতার কথা তুলে ধরেন।
এ পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর বার্তা দিয়ে আরেকজন দূত প্রেরণের উদ্যোগ নেন। শুরুতে তিনি এ কাজের জন্য নির্বাচন করেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব-কে। কিন্তু ‘উমার অপারগতা প্রকাশ করে ইঙ্গিত করেন উসমান ইবনু আফফানের দিকে। [২৭৭]
এই মতামত প্রকাশের পেছনে ‘উমারের অবশ্য যৌক্তিক কারণ ছিল। তিনি চেয়েছেন, শত্রুদের সাথে মেশার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। যার কারণে ‘উমারের জন্য কাজটি সংগত ছিল না। তাই তিনি উসমানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন—‘মক্কায় উসমানের গোত্রের লোকেরা এখনো বিদ্যমান। ওরা তাকে মুশরিকদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারবে, ফলে তিনি আল্লাহর রাসূলের চিঠিও পৌঁছাতে পারবেন।’ ‘উমার নবিজিকে বলেন— ‘আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কুরাইশ আমার ক্ষতি করবে, ওদের সাথে আমার শত্রুতার কথা খুব ভালো মনে আছে। সেখানে বনু আদির এমন কেউ নেই, যে আমাকে রক্ষা করবে; কিন্তু তবুও আপনি চাইলে আমি যেতে পারি।’[২৭৮] আল্লাহর রাসূল ﷺ কিছু বললেন না। ‘উমার নীরবতা ভেঙে আবার বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, তবে মক্কায় আমার চেয়ে সম্মানিত এক ব্যক্তির কথা বলতে পারি। তার আত্মীয়স্বজনও সেখানে বেশি। তিনি হলেন উসমান ইবনু আফফান।’ ‘উমারের এই পরামর্শ গ্রহণ করে নবিজি উসমানকে ডেকে বললেন, ‘উসমান, কুরাইশের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দাও—আমরা কাউকে হত্যা করতে আসিনি, এসেছি বাইতুল্লাহ যিয়ারত করতে। আমরা তার পবিত্র সীমানাকে সম্মান জানাতে চাই। আমাদের সাথে আছে হাদীর পশু। এগুলো আমরা জবাই করে আবার ফিরে যাব।’
উসমান রওয়ানা করে লাদাহ নামক স্থানে পৌঁছলেন। সেখানে কুরাইশের কিছু লোক তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল—‘উসমান, কোথায় যাচ্ছ?’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে এক আল্লাহ ও ইসলামের দিকে ডাকছেন। তোমরা পরিপূর্ণভাবে দীনে প্রবেশ করো। মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন এবং তাঁর নবিকে করবেন সম্মানিত। আরেকটি কথা হলো, অন্যদের পক্ষ না নিয়ে তাঁর পথ থেকে তোমরা সরে দাঁড়াও। তারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর বিজয়ী হলে তোমাদের ইচ্ছাই হাসিল হবে; কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ বিজয়ী হলে তোমাদের ইচ্ছাধিকার থাকবে। চাইলে অন্যদের মতো তোমরাও ইসলামে প্রবেশ করতে পার, অন্যথায় তোমাদের সামনে যুদ্ধেরও ইচ্ছাধিকার থাকবে। তা ছাড়া বলতে গেলে যুদ্ধ তো তোমাদের ক্লান্ত করে ফেলেছে। তোমরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছ।' এভাবে উসমান কথার চালে তাদেরকে তুচ্ছ করছিলেন। তারা এ ধরনের ঘা লাগানো কথা শুনতে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তাই জবাবে বলল, 'তোমার কথা আমরা শুনেছি; কিন্তু এটা কোনোভাবেই হবার নয়। মুহাম্মাদ ﷺ কোনোভাবেই আমাদের এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। তুমি তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে বলো, সে আমাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না।'
কিন্তু আবান ইবনু সাআদ উসমান-এর দিকে এগিয়ে আসেন। তাকে জড়িয়ে ধরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, 'তোমার প্রয়োজন থেকে পিছু হটবার দরকার নেই। এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে আসেন। উসমান তাকে পেছনে নিয়ে আবার মাক্কার পথ ধরেন। হালকা গতিতে তিনি মাক্কায় প্রবেশের পর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একে একে তার দিকে এগিয়ে আসে। আবু সুফিয়ান ইবনু হারব, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া ও অন্য অনেকে। এদের অনেকের সাথে উসমানের দেখা হয়েছে লাদাহে, অন্যদের সাথে মাক্কায়। তাদের একটাই কথা— 'মুহাম্মাদ ﷺ আমাদের এখানে কখনোই ঢুকতে পারবে না।' [২৭৯]
তবে মুশরিকরা উসমান-এর সামনে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের প্রস্তাব রাখে; কিন্তু তিনি অস্বীকার করে [২৮০] দুর্বল মুসলিমদের কাছে আল্লাহর রাসূলের এই বার্তা পৌঁছাতে যান যে, অচিরেই আল্লাহ তাদের জন্য সহজতা ও পরিত্রাণের পথ বের করবেন।[২৮১] ফেরার পথে এই দুর্বল মুসলিমদের একটা মৌখিক বার্তা তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে নিয়ে আসেন। তাদের ভাষ্য ছিল—'আল্লাহর রাসূলকে আমাদের পক্ষ থেকে সালাম বলুন। যে সত্তা তাকে হুদাইবিয়া অবতরণ করাতে সক্ষম, সেই সত্তা তাকে মক্কাতেও প্রবেশে সক্ষম।' [২৮২]
সন্ধির বিষয়ে মুশরিকদের সাথে মুসলিমদের মুখোমুখি আলোচনা চলছিল। এ সময় হঠাৎ কোনো পক্ষের একজন অন্য পক্ষের লোকদের দিকে তির নিক্ষেপ করে। জবাবে অপর পক্ষও তির, পাথর ইত্যাদি নিক্ষেপ শুরু করলে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। শুরু হয় শোরগোল, হইচই। নিজেদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে উভয়। পক্ষের লোকেরাই।[২৮৩] এই অবস্থার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলছেন—
'তিনি মাক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা ফাতাহ: ২৪)
ইমাম মুসলিম এই আয়াত নাযিল কারণ সম্পর্কে বলেন—'মাক্কার আশিজন মুশরিক জাবালে তানঈম থেকে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নেমে আসে। আল্লাহর রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের অমনোযোগিতার সুযোগ সন্ধানী ছিল ওরা। আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদের ধরে আবার ছেড়ে দেন। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ ওপরের আয়াতটি নাযিল করেন।'
সালামা ইবনুল আকওয়া এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন— 'হুদাইবিয়ায় মুশরিকরা আমাদের কাছে সন্ধির চিঠি প্রেরণ করে। এ সময় একে অপরের সাথে মিলেমিশে চলছিল। আমি আমার পরিবার-পরিজন ও সম্পদ ছেড়ে আল্লাহর রাসূলের দিকে হিজরাত করেছিলাম মাদীনায়। এখানে আসার পর থেকে আমি তালহা বিন উবাইদুল্লাহর অধীনে ছিলাম। তার ঘোড়াকে পানি খাওয়াতাম, পাতা পাড়তাম, তার সেবা করতাম, তার কাছেই খেতাম।
শান্তি আলোচনার এ পর্যায়ে মাক্কাবাসী ও আমরা মিলিত হয়ে সময় পার করছিলাম। ঝিমঝিম ঘুমের আভাসমাখা সময়। আমি একটি গাছের গোড়ায় এসে কাঁটা পরিষ্কার করলাম। এরপর শেকড়ে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। এমন সময় মাক্কার চারজন লোক আমার কাছে এসে আল্লাহর রাসূলের ব্যাপারে আলাপ জুড়ে দিলো। আমি বিরক্তি প্রকাশ করে অন্য গাছের নিচে চলে এলাম; কিন্তু তাদের থেকে দৃষ্টি সরাইনি।
ওরা গাছের ডালে অস্ত্র ঝুলিয়ে শুয়ে পড়ল। এভাবেই কেটে গেল কিছু সময়। হঠাৎ একজনের আওয়াজ ভেসে এলো। উপত্যকার নিচের দিক থেকে একজন ডেকে বলছে, 'মুহাজির সাহাবিগণ সতর্ক হও, ইবনু যানীমকে হত্যা করা হয়েছে।' আওয়াজ আমার কানে আসতেই দ্রুত তরবারি নিয়ে শুয়ে থাকা চার মুশরিকের দিকে এগিয়ে এলাম। তারা জেগে উঠবার আগেই অস্ত্রগুলো নিজের আয়ত্তে নিয়েনিলাম।
শেষে ওদেরকে বললাম, 'সেই সত্তার কসম, যিনি মুহাম্মাদ ﷺ-কে সম্মানিত করেছেন, তোমাদের যে কেউ মাথা ওঠানোর চেষ্টা করলে আমি তার মুণ্ডু ফেলে দেবো।'
ঘটনার আকস্মিকতায় তারা এখন আমার হাতে জিম্মি। আমি তাদের নিয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এলাম। দেখলাম, আমার চাচা আমেরও একজন আবলাতি লোককে নিয়ে আসছেন। লোকটার নাম ছিল মুকরিয। সত্তরজন অশ্বারোহীর সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে আসছেন।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বন্দিদের দেখে বললেন, 'এদেরকে ছেড়ে দাও।' এভাবে নবিজি তাদের ক্ষমা করে দেন। যার প্রেক্ষিতে আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন, 'তিনি মাক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা ফাতাহ: ২৪)
ইবনু কাসীর বলেন— 'মুমিনদের প্রতি এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। তিনি মুশরিকদের হাত তাদের থেকে নিবারিত রেখেছেন, ফলে এদের দিক থেকে মুমিনরা কোনো অনিষ্টের শিকার হয়নি, আবার মুশরিকদের ব্যাপারেও মুমিনদের হাত নিবারিত রেখেছেন, ফলে মাসজিদে হারামের কাছে তাদেরকে হত্যা করা হয়নি; বরং উভয় পক্ষ রক্ষা পেয়েছে এবং নিজেদের মাঝে যে কল্যাণকামিতা দেখেছে, তাতে ছিল মুমিনদের জন্য কল্যাণ এবং দুনিয়া-আখিরাতে নিরাপত্তা ও মুক্তি। [২৮৪]
টিকাঃ
[২৭৭] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৩
[২৭৮] দেখুন, ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৬০০
[২৭৯] যাদুল মাআদ, ৩/ ২৯০ সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/ ৩৪৪
[২৮০] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৪৪
[২৮১] যাদুল মাআদ, ৩/২৯০
[২৮২] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া পৃ. ৮৫
[২৮৩] যাদুল মাআদ, ৩/২৯১
[২৮৪] তাফসিরে ইবনে কাসীর, ৪/ ১৯২