📄 এক. হুদাইবিয়া সন্ধির কারণ ও পটভূমি
৬ষ্ঠ হিজরি।[২৪১] জিলকদ মাসের এক সোমবারে সাহাবিদের নিয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ উমরা পালনের উদ্দেশে মাদীনা থেকে মাক্কা অভিমুখে রওয়ানা করেন। [২৪২] এই অভিযাত্রার কারণ ছিল স্বপ্ন। আল্লাহর রাসূল ﷺ তখন মাদীনায়। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, উমরা পালনের জন্য সাহাবিদের নিয়ে ইহরামের শুভ্র বেশে তিনি মাক্কায় প্রবেশ করেছেন। নবিজি স্বপ্নের কথা সাহাবিদের জানানোর পর সবাই অত্যন্ত খুশি হন। [২৪৩] জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে মাক্কা ও কা'বার প্রতি ভালোবাসা ধারণ করে, ইসলামের পর এই ভালোবাসা ও আগ্রহে যেন জোয়ার আসে। বাইতুল্লাহ তাওয়াফের জন্য তাদের হৃদয়গুলো ভীষণ উদ্গ্রীব ও ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
মাক্কার প্রতি মুহাজির সাহাবিদের ব্যাকুলতা বর্ণনা করে বোঝাবার মতো নয়। সেটা ছিল তাদের নিজেদের ভূমি; যেখানে তারা চোখ মেলে প্রথম পৃথিবীর আলো দেখছেন, যার উষ্ণ নিঃশ্বাস বুকে নিয়ে বেড়ে উঠেছেন; জন্ম-মাটি মাক্কা নগরী আর কা'বাকে ভালোবেসেছেন প্রাণ উজাড় করে। ফলে তাদের হৃদয়গুলো এক অদৃশ্য বেচাইন টানে কা'বাকে এক পলক দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল; সদা বিদ্যমান মাক্কার প্রতি দুর্মর টানের এই সময়ে যখন আল্লাহর রাসূল ﷺ স্বপ্নের কথা জানান, তখন অচেনা চঞ্চলতা সৃষ্টি হয় অন্তর জুড়ে। [২৪৪]
আল্লাহর রাসূল ﷺ আশঙ্কা করছিলেন—কুরাইশরা মুসলিমদেরকে বাইতুল্লাহয় প্রবেশে বাধা দিতে পারে, তাই মাদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার গ্রাম্য সাহাবিদেরও এই অভিযাত্রায় শামিল হবার নির্দেশ দেন। মাদীনার গোয়েন্দাগণ জানতে পেরেছেন, মাদীনার উত্তরে খাইবার ও দক্ষিণের গোত্রগুলোর সাথে কুরাইশের মুশরিকরা দ্বিপাক্ষিক সামরিক প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো ইসলামি দাওলাহ মাদীনাকে দুই সাঁড়াশির মাঝখানে কোণঠাসা করে রাখা। অতঃপর একটি মোক্ষম সুযোগে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
কিন্তু এখন মুসলিমদের সময় হয়েছে রাজনৈতিকভাবে এই দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতির দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার। অন্য দিকে আরবের দৃষ্টিতে কা'বা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। তাদের পিতা ইসমাঈলের মিরাস। যার কারণে কুরাইশ এ অধিকার রাখে না যে, তারা যাকে ইচ্ছা বাইতুল্লাহয় প্রবেশ করতে দেবে, যাকে ইচ্ছা বারণ করবে। মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর সাথিদের জন্য মাক্কায় প্রবেশাধিকার অনুমতির মুখাপেক্ষী হওয়া অমানবিক ও নীতি বিরুদ্ধ।[২৪৫]
আরবের গোত্রগুলোতে আল্লাহর রাসূলের অভিযাত্রার কথা ছড়িয়ে পড়ে। মুখে মুখে এই খবর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষকরে আল্লাহর রাসূল ﷺ যখন দৃঢ় সংকল্প করেন, যুদ্ধের কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই, তিনি আসছেন শুধু উমরা পালন করতে ও আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান জানাতে। নবিজি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি উমরা পালনের উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহ যিয়ারাতে যাচ্ছেন, ফলে এখানে কারও অন্য পরিকল্পনা ছিল না। সাহাবিরা সেলাই করা কাপড় ছেড়ে জুল হুলাইফা থেকে ইহরামের কাপড় পরেছেন, পশুর গলায় মালা পরিয়েছেন। [২৪৬]
সতর্কতা ও নিরাপত্তার বিষয়টাকে আল্লাহর রাসূল ﷺ সর্বোচ্চ গুরুত্বের চোখে দেখতেন। তাই সামনের সুগম পথের নিশ্চয়তার জন্য তিনি বাশার বিন সুফিয়ানকে গোয়েন্দা হিসেবে প্রেরণ করেন।[২৪৭] গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্য তার সাথে প্রেরণ করেন আরও বিশজন সাহাবিকে। এ সম্পর্কে ওয়াকিদি বলেন—'বিশজন অশ্বারোহীর আমীর বানিয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ উব্বাদ বিন বাশার-কে সামনে প্রেরণ করেন। মুহাজির ও আনসার উভয় পক্ষের সাহাবি ছিলেন এ দলটিতে।[২৪৮] এর দ্বারা মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুদের গোপন তৎপরতা ও পদক্ষেপ সম্পর্কে অবগত হওয়া।
জুল হুলাইফায় এসে 'উমার ফারুক একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। তিনি বলেন—'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি এমন একটি কওমের মাঝে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, যারা আপনি নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও আপনার সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে পারে। নবিজি তার পরামর্শ গ্রহণ করে মাদীনায় লোক পাঠান অস্ত্র নিয়ে আসতে।[২৫০] এখানে নবিজির উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শত্রুদের বিরুদ্ধে যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রস্তুত থাকা—যে শত্রুর পর্যাপ্ত অস্ত্র আছে এবং সে নীতি ভঙ্গ করে মুসলিম বাহিনীটিকে কষ্টও দিতে পারে।[২৫১]
নিরাপত্তার উপকরণ গ্রহণ করা নববি সুন্নাহ, তাঁর অবর্তমানে উম্মাহ যেন এই কাজের অনুসরণ করে, এ দিশাও তিনি দিয়েছেন। কেননা, সতর্কতা অবলম্বন করলে ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকলে আচমকা আপতিত বিপদ এড়ানো সহজ হয়। তা ছাড়া যে শত্রুরা মুসলিমদের ধ্বংসে সদা ব্যস্ত, তাদের থেকে নিরাপত্তার নিমিত্তে অস্ত্র সঙ্গে রাখার বিকল্প নেই।
টিকাঃ
[২৪১] দেখুন, ইমাম নববীর আল মাজমু' গ্রন্থ; ৭/৭৮
[২৪২] দেখুন, নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৩৪
[২৪৩] দেখুন, 'নবীজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের বর্ণনা', ২/৪৯০
[২৪৪] দেখুন নদভী রচিত, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২৭৩
[২৪৫] দেখুন, মুহাম্মাদ কালআজি রচিত 'কিরাআতুন সিয়াসিয়্যাহ লিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২১৩, ২১৪
[২৪৬] দেখুন মারবিয়্যাতুল হুদাইবিয়্যাহ, পৃ. ৫৫
[২৪৭] দেখুন হাকামী রচিত মারবিয়্যাতু গাযওয়াতিল হুদাইবিয়্যাহ, পৃ. ৫৮, ৫৯
[২৪৮] দেখুন, ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৯৭৪
[২৪৯] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৩০৯
[২৫০] দেখুন, তারিখে তাবারি, ২/৬২২
[২৫১] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮৯
📄 দুই. আল্লাহর রাসূলের উসফানে অবতরণ
আল্লাহর রাসূল ﷺ তখন উসফান পৌঁছেছেন কেবল। এমন সময় বাশার বিন সুফিয়ান খুযাঈ এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কুরাইশ আপনার অভিযাত্রার কথা জানতে পেরেছে। ওরা স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। চামড়ার পোশাক পরে কসম করেছে, কিছুতেই তারা আপনাকে মাক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না।'
উত্তরে আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'কুরাইশের কি বুঝ হবে না! যুদ্ধবিগ্রহ তো ওদের শেষ করে দিয়েছে। সকল মানুষের মাঝে আমার দাওয়াতের রাস্তা ছেড়ে দিলে ওদের কী আসে যায়? ওরা আমার ওপর বিজয়ী হলে যা ইচ্ছা করতে পারবে; কিন্তু আল্লাহ আমাকে ওদের ওপর বিজয়ী করলে ওদেরকে ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। এ পথ নির্বাচন না করলে ওদের জন্য যুদ্ধের অবকাশ থাকবে। কুরাইশ কী মনে করেছে? আল্লাহর কসম, যে আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন, আমি তাঁর জন্য ওদের বিরুদ্ধে লড়ব, আল্লাহ আমাকে বিজয়ী করা পর্যন্ত; কিংবা আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।'
বাইতুল্লাহ শরীফে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কুরাইশের প্রস্তুতির কথা শুনে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। পরামর্শের সময় আল্লাহর রাসূল ﷺ দুটি বিষয় রাখেন সাহাবিদের সামনে:
১. মুসলিমদের সাথে লড়াই, বাইতুল্লাহ থেকে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কুরাইশকে সাহায্য করার জন্য যে গোত্রগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের ওপর আক্রমণাত্মক হওয়া।
২. সোজা বাইতুল্লাহর দিকে এগিয়ে যাওয়া, অভীষ্টে পৌঁছা পর্যন্ত যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করা। [২৫২]
এখানে আবু বাকর এগিয়ে এসে অন্য পরামর্শ দেন। তার মতামতের যৌক্তিকতা ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন— 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, যুদ্ধের ইচ্ছা ত্যাগ করে উমরার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের জন্য উত্তম হবে, যেন যুদ্ধের শুরুটা ওদের পক্ষ থেকেই হয়। নবিজি এ মতটাকে উত্তম ভেবে এটিই গ্রহণ করেন। সাহাবিদেরকে নির্দেশ দেন এ উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে যেতে। [২৫৩] মুশরিকদের অশ্বারোহী বাহিনী মুসলিমদের কাছাকাছি চলে এলে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে উসফানে সালাতুল খাউফ আদায় করেন।
টিকাঃ
[২৫২] দেখুন আল কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮৯
[২৫৩] দেখুন, শাইখ আদনান নাহভী রচিত 'মালামিহুশ শূরা ফিদ দা'ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬০
📄 তিন. পথ পরিবর্তন ও হুদাইবিয়ায় অবতরণ
আল্লাহর রাসূল ﷺ জানতে পারেন, খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কুরাইশের গেরিলা বাহিনী গিরিখাতে ওত পেতে ঘাপটি মেরে আছে। নবিজি স্থির করলেন তাদের মুখোমুখি হবেন না। তাই মুশরিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে পথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন— 'কে পারবে, আমাদেরকে ওদের পথ ভিন্ন অন্য পথে নিয়ে যেতে?'
আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার অন্য পথ জানা আছে।' মুসলিমদের জন্য চলা কষ্টকর দুর্গম এক পথ দিয়ে তিনি অগ্রসর হন। উপত্যকার শেষ প্রান্তে এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহলা ভূমির দিকে বের হন। এ সময় নবিজি সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন— 'তোমরা বলো, আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তাঁর দিকে ফিরে আসছি।' সাহাবায়ে কেরাম এটি পাঠ করেন।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'আল্লাহর কসম, এই ক্ষমার বাণী বনি ইসরাইলের সামনে পেশ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা এটা বলেনি।' [২৫৪] এরপর নবিজি হামশের ডান দিক দিয়ে একটি পথ ধরার নির্দেশ দেন, যা সানিয়্যাতুল মারার-এ এসে মিলিত হয়েছে। সাহাবিদের পদাঘাতে সৃষ্ট উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা দেখে ওত পেতে থাকা খালিদ মুসলিমদের পথ সম্পর্কে জানতে পারেন। সাথিদের নিয়ে তিনি দ্রুত ঘোড়া হাঁকান মাক্কার দিকে। স্বজাতির কাছে পৌঁছে হঠাৎ আসন্ন এই বিপদের জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মুশরিকদের মাঝে আতঙ্ক জেঁকে বসে। ইসলামি বাহিনীকে হুদাইবিয়ায় থামিয়ে দিতে বাহিনী প্রস্তুত করে তারা। মুসলিমদের থেকে মাক্কা রক্ষার জন্য সবখানে জারি হতে থাকে সতর্ক বার্তা।
এই মোহন প্রেক্ষাপট সম্পর্কে মাহমুদ শিত বলেন, 'মুসলিমদের নিয়ে নবিজি শত্রুদের ভয়ে ভীত হয়ে পথ পরিবর্তন করেননি। কেননা, যারা শত্রুকে ভয় পায়, তারা নিজেদের শক্তির কেন্দ্র মূল বাহিনী নিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে, [২৫৫] যেন শত্রুদের ধারাবাহিক পরিকল্পনা দীর্ঘায়িত হয়। এর মাঝে শত্রুকে ঘায়েল করতে গ্রহণ করা যায় উপযুক্ত পরিকল্পনা।
'সামরিক নীতি গ্রহণ' সম্পর্কিত কিতাবাদিতে এসেছে, 'নিরাপদ ভিন্ন রাস্তা গ্রহণ করে আল্লাহর রাসূল ﷺ সামরিক নেতৃত্বে বিচক্ষণতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। দূরবর্তী রাস্তা অবলম্বন করে ইসলামি বাহিনীকে তিনি ধ্বংস ও ক্ষতির আবর্ত থেকে সুরক্ষা দিয়েছেন। শত্রুর অতর্কিত হামলার সমূহ পথ থেকে নিজেকে রেখেছেন নিরাপদ দূরত্বে।”[২৫৬]
টিকাঃ
[২৫৪] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/৩৩৮
[২৫৫] দেখুন, আবু ফারিস রচিত গাযওয়াতুল হুদাইবিয়া, পৃ. ৩৯
[২৫৬] দেখুন, আবু ফারিস রচিত সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৭৪
📄 চার. কাসওয়া বেঁকে বসেনি, ওর চরিত্রে এমন স্বভাবও নেই
আল্লাহর রাসূল ﷺ হুদাইবিয়ার নিকটবর্তী হবার পর তাঁর কাসওয়া নামক উটটি হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম বলছিলেন, 'কাসওয়া বেঁকে বসেছে!'
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'কাসওয়া বেঁকে বসেনি, ওর স্বভাবে এমনটা নেই, বরং হস্তি বাহিনীকে যিনি আটকিয়ে ছিলেন, তিনি এটারও পথ রোধ করেছেন। সেই সত্তার কসম, যাঁর অধীনে আমার জীবন, মাক্কার কাফিররা আল্লাহর নিদর্শনাবলির সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে আমাকে যেকোনো প্রস্তাব দিলে আমি তা গ্রহণ করব।' [২৫৭] এরপর নবিজি নিজে উটের গায়ে খোঁচা দেওয়ার পর সে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল ﷺ মাক্কার পথ ছেড়ে হুদাইবিয়ার শেষ প্রান্তে একটি ঝরনার পাশে এসে তাঁবু স্থাপন করেন। খুব সামান্য পানি ঝরছিল এই ঝরনা বেয়ে।
সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দেওয়ার কারণে সবাই ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম তৃষ্ণা কাতরতার কথা জানালেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ তৃণীর থেকে একটি তির বের করে বললেন, 'এটি কূপের ভেতর গেঁথে দাও।' সাহাবিগণ তিরটি কূপের ভেতর গেঁথে দেওয়ার পর মৃতপ্রায় কূপ থেকে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা উৎসারিত হয়। সাহাবায়ে কেরাম তৃপ্তি ভরে পানি পান করেন। [২৫৮]
অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ কূপের কিনারে বসে কুলি করেন। [২৫৯] এই কুলির পানি কূপে ফেলার পর স্বচ্ছ পানিতে ভরে ওঠে তার ভেতর। বর্ণনা দুটির মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব—নবিজি একই সাথে দুটি কাজই করেছেন। ইবনু হাজার এই মতই ব্যক্ত করেছেন। ওয়াকিদি উরওয়া থেকে বর্ণনা করে বলেন— 'আল্লাহর রাসূল ﷺ বালতিতে কুলি করে তা কূপে ঢেলে দেন, এরপর একটি তির বের করে কূপে নিক্ষেপ করে আল্লাহর কাছে দুআ করেন।'[২৬০]
আল্লাহর রাসূলের উট কাসওয়া হাঁটু গেড়ে বসার মাঝে লক্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরা এখন সংগত মনে করছি:
১. পৃথিবীর সব কিছুই চলে আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছায়। তাঁর ইচ্ছা ও নির্দেশের বাইরে কেউ যেতে পারে না। তা হলে আল্লাহর রাসূলের উটের ব্যাপারে ভেবে দেখুন, সেটা কোথায় থেমেছিল এবং সাহাবিগণ এটাকে কেমন অপছন্দ করেছেন, চেষ্টা করেছেন উঠিয়ে দিতে মাক্কা অভিমুখে যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। ধরে নিলাম, যাত্রা অব্যাহত থাকার পর তারা বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছালেন, এরপর ফলাফল কী দাঁড়াত? কিন্তু না, আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন অন্য কিছু।'[২৬১]
২. আল্লাহর রাসূলের কথা, 'এটিকে তিনি থামিয়েছেন, যিনি থামিয়েছিলেন হস্তিবাহিনীকে'। এর ভিত্তিতে ইবনু হাজার আসকালানি বলেন, 'এখান থেকে উপমার ব্যাপকতা জায়েয প্রমাণিত হয়, যদিও বিশেষ দিকটার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকে। কেননা, হস্তিবাহিনী ছিল শুধুই ভ্রান্তির ওপর, আর এই উটের মালিক ছিলেন চির সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু উপমা দেওয়া হয়েছে সাধারণভাবে মাসজিদুল হারামে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় আল্লাহর ইচ্ছার দিক বিবেচনায়। বাতিলকে আল্লাহ থামিয়ে দিয়েছেন স্পষ্ট কারণে, আর নবিজির উট থামিয়ে দেওয়ার কারণ কারও কাছে অবিদিত নয়।[২৬২]
৩. আরেকটি জিনিস স্পষ্ট হয়, যেমন: মুশরিক, বিদআতি, অপরাধী, বিদ্রোহী ও জালিমরাও যদি এমন বিষয়ের দিকে আহ্বান জানায়, যেখানে নিহিত থাকে আল্লাহর নির্ধারিত সম্মানিত বিষয়কে মর্যাদা দানের কথা। তখন সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে সে কাজে সাহায্য করতে হবে। তবে অবশ্যই তাদের কুফুরি ও অবাধ্যতায় কোনোভাবেই সাহায্য করা যাবে না। শুধু যেটা আল্লাহর প্রিয় ও যেখানে তাঁর সন্তুষ্টি আছে, তাতে সাড়া দিতে হবে। তবে দেখতে হবে সেখানে আল্লাহর অভিশাপের বিষয়টি সংযুক্ত কিনা। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি দিক, যা অনেক মানুষের জন্য কষ্টকর। [২৬৩]
৪. আল্লাহ-এর সিদ্ধান্ত ছিল এ অভিযানে মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হবে না। কী হিকমাহ ছিল! সময়ের মুহূর্ত ব্যবধানে তা প্রকাশ পেয়েছে।
ক. মুসলিম বাহিনী শক্তি নিয়ে প্রবেশ করত, অনেক প্রাণ ঝরত, উভয় পক্ষের মানুষের মাঝে রক্তপাত ঘটত। আল্লাহ এমনটি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন উভয় পক্ষের মাঝে কল্যাণ সাধিত হোক।
খ. এটার সম্ভবনাও ছিল যে, মাক্কায় অভিযান পরিচালিত হলে সেখানকার দুর্বল মুমিনরা হত্যার শিকার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এটি এমন আবর্ত, যেখানে মুসলিমরা পতিত হওয়া সংগত নয়। আল্লাহ তাআলা বলছেন:
'তারাই তো কুফুরি করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মাসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কুরবানির জন্তুদের যথাস্থানে পৌঁছাতে। যদি মাক্কায় কিছু সংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না; অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সবকিছু চুকিয়ে দেওয়া হতো; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম। (সূরা ফাতহ: ২৫)
গ. আল্লাহ তাআলা তো জানেন, আজকে যারা আল্লাহর রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিদেরকে মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে, একদিন আল্লাহ তাদেরই অন্তর ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করবেন, তাদের হাতে বিজিত করবেন পৃথিবীর বিভিন্ন শহর। তারা মানুষের মাঝে এই রিসালাতের বার্তা নিয়ে ভ্রমণ করবেন, অন্ধকারাচ্ছন্ন পথগুলো আসমানি আলোয় আলোকিত করবেন। [২৬৪]
টিকাঃ
[২৫৭] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৮] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৫৯] ফাতহুল বারি, ৪/৭০৮
[২৬০] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮৪
[২৬১] আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৩
[২৬২] ফাতহুল বারি, ৬/৬১
[২৬৩] আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৭
[২৬৪] আবু ফারিস রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি' পৃ. ৪৫