📄 ইসলামি সীমানা থেকে আগাছা পরিষ্কারের অভিযান
এক. আবদুল্লাহ ইবনু আতীকের বিরুদ্ধে অভিযান
বনু নাযিরের একজন বিশিষ্ট ইয়াহুদি ছিল আবু রাফি' সালাম বিন আবিল হাকীক। ইসলামি দাওলাতের বিরুদ্ধে তার অপচেষ্টার শেষ ছিল না। এমনকি সে গাতফান ও তাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুশরিকদেরকে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে উসকে দিত। খন্দকের যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীকে সে-ই প্রলুব্ধ করেছিল। ইসলামি দাওলাতের বিরুদ্ধে তার অপতৎপরতার একটা বিহিত করা ছিল তখন সময়ের দাবি।[২২৫]
ক. খাইবারের উদ্দেশ্যে অভিযান প্রেরণ
একদিন আল্লাহর রাসূল ইসলাম ও মুসলিমদের এই শত্রুকে হত্যা করতে কয়েকজন আনসারি সাহাবিকে প্রেরণ করেন, তাদের আমীর নির্ধারণ করেন আবদুল্লাহ বিন আতীককে। এদিন আবু রাফি তার বিশেষ মহলেই ছিল।
সূর্য কেবল চোখের আড়াল হয়েছে, দুর্গের ভেতরের রাখালরা চারণভূমি থেকে মেষপাল নিয়ে ফিরেছে ঘরে। এমন সময় আবদুল্লাহ বিন আতীক সাথিদের নিয়ে খাইবারের সীমানায় পৌঁছেন। তিনি সাথিদের বললেন, ' তোমরা এখানে অপেক্ষা করো, আমি দেখছি, ভেতরে ঢোকার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কিনা।'
তিনি দরজার কাছে এলেন। এক টুকরো কাপড় মাথায় দিয়ে এমনভাবে বসলেন, মনে হচ্ছিল তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন। দুর্গের লোকেরা ভেতরে যাওয়া শেষ হলেও মূল ফটক তখনও খোলা ছিল। দারোয়ান ফটক বন্ধ করার সময় মাথায় কাপড় দেওয়া একজনকে বসে থাকতে দেখে ডাক দিয়ে বলল, 'আল্লাহর বান্দা, ভেতরে আসতে চাইলে এসো, আমি দরজা বন্ধ করব।'
আবদুল্লাহ বিন আতীক বলেন—'আমি ভেতরে এসে আত্মগোপন করলাম। দুর্গবাসী সবার ভেতরে প্রবেশ নিশ্চিত হবার পর দারোয়ান দরজা বন্ধ করে চাবিগুলো পেরেকে লটকিয়ে রাখল। এখানটায় নির্জনতা নেমে এলে আমি চাবি নিয়ে দরজা খুললাম।[২২৬]
খ) আবু রাফির পরিণতি
ইবনু আতীক ও অভিযানের সাথিরা দুর্গে প্রবেশ করলেন। আবু রাফিকে হত্যার একটা মোক্ষম সুযোগের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা। বুখারির বর্ণনায় আছে— রাতের বেলা আবু রাফির ঘরে গল্পের আসর বসত। আজও চলছিল হাসি-আনন্দের সেই মজমা। আড্ডাবাজরা বিদায় নেবার পর আমি তার প্রাসাদে ওঠা শুরু করলাম। প্রতিটি দরজা খুলে প্রবেশের পর ভেতর থেকে সেগুলো লাগিয়ে দিচ্ছিলাম। আমার কথা হলো, আমার পর্যন্ত কেউ পৌঁছালে তাকে হত্যা করব।
আমি আবু রাফির ঘরে ঢুকে বুঝলাম সে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে রয়েছে; কিন্তু অন্ধকারে আমি ঠাহর করতে পারছিলাম না, ঘরের ঠিক কোন জায়গায় সে অবস্থান করছে। সঠিক স্থান নির্ণয় করতে আমি তাকে ডেকে বললাম, 'আবু রাফি...? সে বলে উঠল; 'কিন্তু তুমি কে?' আমি আওয়াজের দিকে এগিয়ে গেলাম। অন্ধকারেই অনুমান করে তরবারি চালালাম; কিন্তু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বিধায় আমার আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। আবু রাফি চিল্লিয়ে উঠল। আমি ঘরের বাইরে এসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম।
তারপর আবার ঘরে গিয়ে বললাম, 'কী ব্যাপার আবু রাফি, এভাবে চিৎকার করে উঠলে যে?' সে বলল, 'আরে কপালপোড়া, কামরায় কেউ একজন ছিল, একটু আগে সে তরবারি দিয়ে আমাকে আঘাত করেছিল।'
আওয়াজ খেয়াল করে আবার তরবারি চালিয়ে দিলাম। আঘাতটা এবার লাগল ঠিক; কিন্তু মরল না। বুঝতে পারলাম, সে আমার পায়ের কাছে। আমি দ্রুত তরবারির ডগা তার পেটে রেখে সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দিলাম। এবারে কাজ হলো। তরবারি পৌঁছে গেছে একদম কোমর পর্যন্ত। ব্যস, আমার কাজ শেষ। দেরি না করে ফেরার পথ ধরলাম। আবার একটা একটা করে দরজা খুলে বাইরে আসছিলাম। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলাম। চাঁদনি রাত, আবছা আলো-আঁধারির পরিবেশ। অনেকটা নিচে নেমে এসেছি। একটা সিঁড়িতে পা রেখে মনে হলো আরেক পা নামলেই মাটি। এই হিসেবে পা বাড়ানোর পর মাটিতে বেকায়দায় পড়ে গেলাম। এতে পায়ের পিণ্ডলী একেবারেই ভেঙে গেল। ব্যথা তীব্র হলেও এখানে টু শব্দ করারও জো নেই। অগত্যা পাগড়ি দিয়ে বেঁধে মূল ফটকের কাছে এলাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
এখনই বের হব না। বসে অপেক্ষা করছি; আজ রাত এখানেই কাটিয়ে দেবো। আবু রাফির মৃত্যু-সংবাদ শুনে তবেই ফিরব। ভোরের আভাস পেয়ে মোরগ ডেকে উঠল। শুনলাম কেল্লার ওপরে দেওয়ালে ওঠে একজন হাঁক ছেড়ে বলল, 'আরে কে আছ, শুনছ? হিজাজের ব্যবসায়ী আবু রাফি মারা গেছে...!'
আমি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সাথিদের কাছে এসে বললাম, জলদি চলো; আল্লাহ আবু রাফির কাহিনি শেষ করেছেন।' আমরা যেমন একসাথে এসেছিলাম, তেমনই একসাথেই মাদীনায় ফিরলাম। আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে সব কাহিনি খুলে বললাম।'
আমার বয়ান শেষে নবিজি আমাকে পা ছড়িয়ে দিতে বললেন। আমি পা লম্বা করলাম। তিনি হাতের তালু দিয়ে একবার মাসাহ করলেন। কী আশ্চর্য! মুহূর্তেই আমার পা এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠল, মনে হলো এখানে কখনোই কিছু হয়নি।'[২২৭]
সীরাত গ্রন্থকাররা লিখেছেন, 'আবু রাফিকে আঘাত করার পর তার স্ত্রী বাঁচাও বলে চিৎকার শুরু করেছিল। সাহাবি তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়ে আবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। কেননা, আল্লাহর রাসূল নারী ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন।[২২৮] উল্লেখ্য, ইবনু আতীকরা ইহুদীদের ভাষা রপ্ত করেছিলেন, আর আবু রাফির স্ত্রীর সাথে কথা বলতে এই ভাষারই সাহায্য নিয়েছেন তিনি।
সীরাতের গ্রন্থগুলোতে আরেকটি কথা উল্লেখ আছে। তা হলো—আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে আসার পর অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকেই আবু রাফিকে হত্যা করেছেন মর্মে দাবি করছিলেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাদের সবার তরবারি নিয়ে এসো।' সবাই তরবারি নিয়ে এলে আল্লাহর রাসূল পরখ করে বললেন, এই তরবারিটি তাকে হত্যা করেছে।' দেখা গেল, সেটা আবদুল্লাহ ইবনু উনাইসের তরবারি। তার তরবারিতে তখনো (পেটের) খাবার এঁটে ছিল।[২২৯]
পাঠকরা এখানে বুখারির বর্ণনা ও সীরাহ গ্রন্থকারদের বর্ণনায় বৈপরিত্য দেখতে পাচ্ছেন। বর্ণনা বলছে, ইয়াহুদি আবু রাফিকে হত্যা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস; কিন্তু বাস্তবতা আসলে এমন নয়। কেননা, আবদুল্লাহ ইবনু আতীক এ বলেছেন, তার প্রবল ধারণা, তিনি হত্যা করেছেন এবং তিনিই বর্ণনা করেছেন ইয়াহূদিকে হত্যার ব্যাপারে তার ভূমিকার কথা। এখানে তিনি বলেননি যে, হত্যায় অন্য কেউ শরিক ছিল না। যেহেতু তার বর্ণনা অন্যের অংশকে অস্বীকার করছে না, তাই ধরে নিতে হবে বর্ণনাগুলো একটা আরেকটার ব্যাখ্যা করছে।
বর্ণনাগুলো একথাও বলছে, প্রত্যেকের দাবি ছিল আবু রাফিকে চূড়ান্ত আঘাতে হত্যা তিনিই করেছেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ সবার কথা শেষে তরবারিগুলো পরখ করে দেখেন। শেষে তিনি ফায়সালা দেন, চূড়ান্ত আঘাতকারী তরবারি হলো আবদুল্লাহ ইবনু উনাইসের তরবারি। কেননা, তার তরবারিতে খাবার লেগে ছিল। অর্থাৎ, এই তরবারি আবু রাফির পাকস্থলী ভেদ করে খাবার মিশেছিল।[২৩০] সীরাত গ্রন্থকারদের ভাষ্যানুযায়ী এ অভিযানে ছিলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু আতীক, মাসঊদ বিন সিনান, আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস, আবু কাতাদাহ, হারিস বিন রিবঈ, খুযাঈ ইবনু আসওয়াদ।
বিবৃত ঘটনাতে নিহিত শিক্ষণীয় দিকসমূহ:
১. এই অভিযানে অংশ নেওয়া সবাই ছিলেন খাযরাজ গোত্রের। আউস গোত্রের কয়েকজন কাআব বিন আশরাফকে হত্যার পর সেই থেকে এরা প্রতিযোগিতামুখর হয়ে আছেন। কল্যাণের পথে উভয় গোত্র যেন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দুজন অশ্বারোহী। পার্থিব জীবনের ধনসম্পদের জন্য তাদের এই প্রতিযোগিতা ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর রাসূলের সন্তুষ্টির মাধ্যমে হৃদয়ে উচ্ছলতার প্রাসাদ গড়ে তোলা।[২৩১]
'কাআব বিন মালিক বলেন—'আল্লাহ তাআলা তাঁর দীনের প্রসারে যেসব ব্যাপার ঘটিয়েছেন, তার একটি হলো আনসারদের দুই গোত্র আউস ও খাযরাজের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। আল্লাহর রাসূলের সাহায্যে তারা যেন দুজন বলবান মল্লযোদ্ধার মতো প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। আউস গোত্রের লোকেরা নবিজির সন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ করলে খাযরাজের সাহাবিগণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বলতেন, 'তোমরা এ কাজ করে আল্লাহর রাসূলের কাছে আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারবে না। খুব শিগগির আরও উত্তম কাজ আমরা নবিজিকে উপহার দেবো।' এরপর তারা মুখিয়ে থাকতেন সুযোগের অপেক্ষায়। খাযরাজ গোত্রের লোকেরা এমন কোনো কাজ করে বসলে আউসের সাহাবিগণ অনুরূপ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন।[২৩২]
২. শত্রুদের আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষার উপকারিতা এখানে স্পষ্ট। সেদিন আবদুল্লাহ ইবনু আতীক আবু রাফির মহলে উঠে তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন নির্বিঘ্নে। কেননা, তিনি সে সময় ইয়াহুদিদের ভাষায় কথা বলেছিলেন। এখান থেকে জানতে পারি, অমুসলিমদের ভাষা শিক্ষা করা মুস্তাহাব। শত্রুদেরকে লক্ষ্য বানালে তো তা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সেই বাহিনীর জন্য যারা শত্রুদের গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্য জীবন বাজি রাখেন।[২৩৩]
৩. লক্ষ্য অর্জনে আবদুল্লাহ ইবনু আতীক নিখুঁত পরিকল্পনা করেছেন। তিনি স্থির করেছেন, দুর্গের কাছে একাই গিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন। তারপর একটা ব্যবস্থা করে অন্যদেরও ঢুকাবেন। প্রয়োজন সারার ভঙ্গিতে বসে তিনি এক দিকে দারোয়ানের দৃষ্টি যেমন আকর্ষণ করেছেন, অন্য দিকে বুঝতেও দেননি যে তিনি অপরিচিত; দুর্গের বাইরের কেউ। ঢোকার পর তার আসল কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র। তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন, দারোয়ানের দরজা বন্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থানে চাবি রাখা ও অন্যান্য বিষয় পরিকল্পিতভাবে দেখে নিয়েছেন। তারপর চাবি নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন—এখন যখন ইচ্ছা খুলতে পারবেন দুর্গের মূল ফটক।[২৩৪]
৪. আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের সাহায্য করেছেন। ইসলামের মহান সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আতীক আল্লাহর রহমতকে সঙ্গী করে পথ চলেছেন, লক্ষ্য অর্জনে নিজের মেধা ও শক্তি ব্যয় করেছেন। ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। পা মচকে যায়; কিন্তু এদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। যেন কিছুই হয়নি। চূড়ান্ত সংবাদ শোনার পরই তার পায়ে ব্যথার অনুভূতি ফিরে আসে। সাথিরা তাকে ধরাধরি করে নিয়ে আসে মাদীনায়। আল্লাহর রাসূলকে বিস্তারিত বলা হয় তার সম্পর্কে। সব শুনে নবিজি বললেন, 'তোমার পা প্রসারিত করো'। তিনি পা প্রসারিত করেন। নবিজি তার মচকানো স্থানে হাত বোলানোর পর এমনভাবে সুস্থ হয়ে যান যে, যেন সেখানে কখনোই অসুস্থতা ছিল না।[২৩৫]
৫. বর্ণিত কাহিনির কিছু নির্যাস উৎসারিত করেছেন ইবনু হাজার আসকালানি। তিনি বলেন—'এই হাদীস থেকে জানতে পারি, এমন মুশরিককে গুপ্তহত্যা জায়েয আছে, যার কাছে দা'ওয়াহ পৌঁছেছে। আবার যে ব্যক্তি নিজে কিংবা সম্পদ ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে অন্যকে সাহায্য করে, তাকেও হত্যা করা বৈধ। যুদ্ধে সক্ষম জাতির ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করা, তাদের গোপন সংবাদ অনুসন্ধান করাও জায়েয। আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নাজুক মুহূর্তে কল্যাণার্থে দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা জায়েয।[২৩৬]
৬. আমরা দেখি, এ অভিযানে আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস একজন সাধারণ সৈন্য হিসেবে ছিলেন। এখান থেকে আমরা নববি পরশের এক অপূর্ব শিক্ষা পাই। আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস ছিলেন উকাবি ও বদরি—একজন অগ্রণী আনসারি সাহাবি। উভয় কিবলায় সালাত আদায় করেছেন। রণক্ষেত্রে তার শৌর্য ও বীরত্বের বিষয়টা কারও অজানা ছিল না। একটা অভিযানে—মাক্কার নিকটবর্তী অঞ্চলের সুফিয়ান বিন খালিদ হুজালিকে গুপ্তহত্যার জন্য নবিজি তাকে প্রেরণ করেন। ইবনু উনাইস এখানে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি একা হুজালির তাঁবুতে ঢুকে তার বিছানাতেই তাকে হত্যা করেন। বাধ্য করেন তার সম্প্রদায়কে পালিয়ে বাঁচতে। শেষে ফিরে আসেন বিজয়ী বেশে।
দেখতে পাচ্ছি মর্যাদার সমগ্রতায় পূর্ণ এক জীবন তার। তা সত্ত্বেও আবু রাফিকে হত্যার জন্য প্রেরিত বাহিনীর আমীর ছিলেন না তিনি; বরং ছিলেন একজন সাধারণ সেনা। তিনি বিনয় ও আনুগত্যের এই উজ্জ্বল ইতিহাস জীবনের ডায়রিতে বহন করছিলেন শুধু আল্লাহর জন্য।
এটি আসলে চিরন্তন নববি শিক্ষার ফল, যা সাহাবিরা কোঁচড় ভরে রপ্ত করেছেন। এই শিক্ষা ও দীক্ষার সমন্বিত রূপ পৃথিবীর বুকে বিরল। কেন বিরল। সে কথা বলছি—যিনি সেনাবাহিনীকে মর্যাদার স্তর অনুযায়ী সাজাবেন, তিনি প্রথম পজিশনে রাখবেন সর্বাগ্রে আসা ব্যক্তিকে, এ ব্যক্তির ওপরও অগ্রাধিকার দেবেন অধিক মান্যকারী ব্যক্তিকে, যদিও তার আগমনের বয়স কম হয়।' এই নীতি অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবনু উনাইসের আগে আসলে কেউই থাকবার কথা নয়; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল-এর মহৎ নববি পরিকল্পনা ছিল এর বিপরীত। যেন বর্তমান প্রজন্ম তাঁর অগ্রণী ব্যক্তিত্ব থেকে শেখে, তাঁর হাতে গড়ে ওঠে। ফলে দেখা গেছে, আল্লাহর রাসূল আবু বাকর ও 'উমারকে অন্যের অধীন করে অভিযানে পাঠিয়েছেন।[২৩৭]
দুই. উসাইর বিন রিযামের বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার অভিযান
সালাম বিন আবুল হাকীকের পরে খাইবারের আমীর নির্বাচিত হয় উসাইর বিন রিযাম। আল্লাহর রাসূল জানতে পারেন, এই নব নির্বাচিত আমীর দক্ষিণের ইয়াহুদিদের একত্রিত করে তাঁর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করছে। এখানেই সে ক্ষান্ত হয়নি; বরং গাতফানের গোত্রগুলোকেও আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে একযোগে হামলার জন্য উসকে দিচ্ছে। নবিজি এও জানতে পারেন, ইয়াহুদিদের রাত কাটে প্রতারণা ও চক্রান্তের ফন্দি এঁটে। এরা কাল হয়ে দাঁড়াবার আগেই একটা পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে আল্লাহর রাসূল আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে আমীর নির্ধারণ করে অভিযানে প্রেরণ করেন। যাদের কাজ হবে ইয়াহুদিদের সামনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হওয়া, আরব মুশরিকদের তোড়জোড় নিয়ে অনুসন্ধান চালানো।[২৩৮]
উসাইর বিন রিযামের সার্বিক খবর জানার পর আল্লাহর রাসূল ত্রিশ সদস্যের একটি অভিযান প্রেরণ যথেষ্ট মনে করেন। আবদুল্লাহ বিন উনাইসকে এ বাহিনীতে যুক্ত করেন, আর আমীর নির্ধারণ করেন আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে।
সাহাবিগণ খাইবারে এসে উসাইরকে বললেন, 'তোমাকে খাইবারে নেতা হিসেবে নিযুক্ত করার জন্য আল্লাহর রাসূল আমাদের পাঠিয়েছেন। তারা তার সাথে এমনভাবে কথা বলতে থাকেন, এক পর্যায়ে সে আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলার জন্য তাদের সাথে মদিনায় আসতে সম্মত হয়।'
কিন্তু সে শর্ত জুড়ে দেয় যে তার সাথেও উনত্রিশজন মানুষ যাবে। উসাইরসহ ত্রিশজন, মুসলিমদের সাথে একই ঘোড়ায় আরোহন করে। প্রত্যেক মুসলিমের পেছনে তার একজন করে লোক আরোহন করে। উসাইরের ঘোড়ায় আরোহন করেন আবদুল্লাহ বিন উনাইস।
খাইবার থেকে মাদীনার পথ কারকারাতা সিয়ার নামক স্থানে এসে গল্পের মোড় ঘুরে যায়। উসাইর আল্লাহর রাসূলের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনুতাপ বোধ করা শুরু করে। সে ইবনু উনাইসের তরবারির দিকে হাত বাড়ায়। ইবনু উনাইস বুঝতে পেরে ক্ষিপ্র গতিতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করেন। কেটে ফেলেন পা। উসাইর গাছের একটা ডাল দিয়ে উনাইসের মাথায় আঘাত করে। এই অবস্থা দেখে অন্যান্য মুসলিম সৈন্যরাও তাদের সঙ্গী প্রত্যেক ইয়াহূদিকে হত্যা করেন। শুধু একজন বাঁচতে পেরেছিল। সে দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস মাদীনায় ফিরে আসেন। আল্লাহর রাসূল তার ক্ষতস্থানে থুতু লাগিয়ে দেওয়ার পর ব্যথা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।[২৩৯]
অভিযান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাসমূহ:
১. শুরুতে মুসলিম ও ইয়াহুদিদের মাঝে রক্তপাতের পরিকল্পনা ছিল না আল্লাহর রাসূলের। আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা এ স্বাভাবিকতায়-ই সামনে এগোচ্ছিলেন; কিন্তু ইয়াহুদিদের প্রতারণা গোটা প্রেক্ষাপট পালটে দেয়। যার তিক্ত রস তাদেরকে পান করানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাবই তাদের খোলস ছেড়ে প্রকাশ্যে আসে। সমস্ত পরিকল্পনায় ধুলো ছিটিয়ে মুসলিমদের সাথে গাদ্দারিতে প্রবৃত্ত হয়; কিন্তু এটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
২. যুদ্ধ ক্ষেত্রের ব্যাপারটা আসলে এমনই। শত্রু পক্ষকে ভীত-সন্ত্রস্ত না করা পর্যন্ত নিজেদেরকে আতঙ্কিত ও শঙ্কিত থাকতে হয়। ফলে সংগত কারণেই শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য বিষয়। আর উদ্ভূত কোনো পরিস্থিতিতে আবশ্যক হলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করে আনা। আলোচনা—আধুনিক ভাষায় কূটনৈতিক তৎপরতা কাজে না আসে, তখন শত্রুর সাথে কঠোরতা ছাড়া আর উপায় থাকে না। আসন্ন যুদ্ধের সংকেত পাওয়ার পর শত্রুর সাথে রুক্ষতার আচরণই কেবল সঠিক সিদ্ধান্ত হয়। আর আল্লাহর জন্য এই কাজে কোনো সমালোচকের নিন্দার পরোয়া করা যাবে না।
৩. হিজরি ৬ষ্ঠ সন শত্রুদের সাথে মুখোমুখিতার অনেক ঘটনা-অনুঘটনা প্রবাহের সাক্ষী হয়েছে। মাস গড়ানোর আগেই একাধিক অভিযানের রুক্ষ ছাপ পড়েছে মরুর বুকে। কোনো শত্রুকে শায়েস্তা করতে দলবদ্ধ অভিযান প্রেরিত হয়েছে, সংগত বিবেচনা করে কাউকে করা হয়েছে গুপ্তহত্যা। এ যেন আল্লাহর রাসূলের কথার সাক্ষাৎ প্রতিফলন। তিনি বলেছিলেন, 'আমাদের সাথে ওদের যুদ্ধের দিন শেষ, এখন আমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়ব।' আল্লাহর এই বাহিনীর সৈনিকরা তাঁর বারাকাহপূর্ণ নাম নিয়ে পৃথিবী মাড়িয়েছেন। অনুক্ষণ বুকে বহন করতেন চিরন্তন চেতনা। উন্নত অভীষ্ট, যা তাদেরকে সকল সৃষ্টির ওপর সমুন্নত করেছে। ফলে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তরায় সমস্ত তাগুতের স্তম্ভ গুড়িয়ে দিতে তাদের বেগ পোহাতে হয়নি।
আল্লাহর বাহিনীর সকল সেনাকে আমরা স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায়। যারা অর্জন করেছিলেন উন্নত চরিত্র, চিন্তাশীলতা। সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সূক্ষ্ম দর্শন। সামনে হুদাইবিয়ার আলোচনায় আমরা ইতিহাসের স্রোতে ভেসে ভেসে মিশে যাব তাদের নির্মল জীবন প্রবাহে।[২৪০]
টিকাঃ
[২২৫] দেখুন, মুহাম্মাদ কালআজি রচিত 'কিরাআতুন সিয়াসিয়্যাহ লিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২১২
[২২৬] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৬৫
[২২৭] বুখারি, ৪০০৯
[২২৮] দেখুন, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনইয়াহ, ২/১৬৮
[২২৯] বুখারি, ৪০০৯, ৪০৪০। ইবনু সাআদ, ২/৯১,৯২। ইবনু হিশাম, ৩/২৮৬-২৮৮।
[২৩০] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ১/ ১৮৯
[২৩১] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৬/১৭৭
[২৩২] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/২৮৬
[২৩৩] 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ১/১৯১
[২৩৪] 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ১/১৯২, ১৯৩
[২৩৫] বুখারি, ৪০৩৯
[২৩৬] ফাতহুল বারি, শরহে হাদিস, ৪০৩৯, -৪০
[২৩৭] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/১৪৮
[২৩৮] দেখুন, আল ইয়াহুদ ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ, ১/৩৮৮, ৩৮৯
[২৩৯] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৭৭
[২৪০] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ১৮৯-১৯২