📄 তিন. দুজনের মাঝে বিচ্ছেদ
আল্লাহর ইচ্ছা ছিল এই সংসারে দুজনের মাঝে বনিবনা হবে না। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জীবনে মনোমালিন্যের অন্ধকার নেমে এলো। এক সময় যাইদ সংকল্প করে ফেলেন, যাইনাবকে বিদায় দেবেন। এর আগে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে তিনি অভিযোগ করে বলেও ছিলেন, এই বিয়ে টিকিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিবারই নবিজি বলেছেন, 'আল্লাহকে ভয় করে যেন স্ত্রীকে রাখা হয়।' পরিশেষে আল্লাহ তালাকের অনুমতি দেওয়ার পর যাইদ তাকে তালাক দেন। বিচ্ছেদের এই ঘটনা ঘটে এক বছর পর। ইবনু কাসীর বলেন—যাইনাব তাঁর সংসারে থেকেছেন এক বছর, কিংবা আরও কিছু সময়। এরপর তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে। যাইদের পক্ষে সংসার টিকিয়ে রাখা যখন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বিচ্ছেদের অনুমতি প্রার্থনা করেন। আল্লাহর রাসূলও প্রতিবার বলছিলেন, 'আল্লাহকে ভয় করে স্ত্রীকে সাথেই রাখো।'[১৩৬]
কিন্তু যাইনাবের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তিনি একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, ওদিকে যাইনাবের ভেতর বইছিল ভীষণ অস্থিরতা। আর যাইদও কোনোভাবেই চাচ্ছিলেন না অন্যের মনঃকষ্ট ও যন্ত্রণার কারণ হবেন। তাই তাকে কষ্ট না দিয়ে বিচ্ছেদের সংকল্প করেন। এখানেই দুজনের বিবাহিত জীবনের ইতি ঘটে। কেউ তাদের মাঝে নাক গলাতে যায়নি। যাইদ তালাক দিয়েছেন শুধুই নিজের ইচ্ছাতে। যদিও আল্লাহর রাসূল তাঁকে তালাক দেওয়া থেকে নিষেধ করে বলেছিলেন আল্লাহকে ভয় করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে।[১৩৭] ইবনু কাসীর বলেন—'বিচ্ছেদের এই কারণটি উল্লেখের পর ইবনু আবি হাতিম ও ইবনু জারীর কয়েকজন সালাফ থেকে কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেন, বিশুদ্ধ না হবার কারণে আমরা তা উল্লেখের প্রয়োজন মনে করছি না।[১৩৮]
টিকাঃ
[১৩৬] আহমাদ, ৩/ ১৫০। তিরমিজি, ৩২১২
[১৩৭] দেখুন, হাফসা বিনতে উসমান খলীফি রচিত 'কাযায়া নিসায়িন নাবিয়্যি ওয়াল মুমিনাত', পৃ. ২০৯
[১৩৮] দেখুন, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩/৪৯১
📄 চার. আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাবের বিয়েতে নিহিত হিকমাহ
তদানীন্তন সময়ে পালকপুত্রের নীতিটা মানুষের হৃদয়ে ও চেতনায় গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল। এটাকে মুছে দেওয়া অতটা সহজ ছিল না। ইসলামের শুরুর দিকে মাক্কায় এবং মাদীনায় হিজরাতের পর প্রথম দিকে এই অভ্যাস বলবৎ ছিল। আল্লাহ তাআলা এর বিলুপ্তি ঘটাতে চাইলেন; তিনি কুরআনে উল্লেখ করলেন—পালকপুত্র কখনো ব্যক্তির আসল পুত্র হতে পারে না। এটা শুধু একজনের মুখের ডাক। তাই বাস্তবতায় এটা কোনোরূপ পরিবর্তন আনবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
'আল্লাহ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি। তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা যিহার করো, তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্য পুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ ন্যায় কথা বলেন এবং পথ প্রদর্শন করেন।' (সূরা আহযাব: ০৪)
দ্বিতীয় পর্যায়ে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন ছেলেকে তার প্রকৃত বাবার দিকে সম্বোধন যুক্ত করতে। এটাই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা, এতেই রয়েছে কল্যাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
'তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ পরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধু রূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের কোনো বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা আহযাব: ০৫)
আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন—'আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর মাওলা যাইদ ইবনু হারিসাকে আমরা যাইদ ইবনু মুহাম্মাদ ছাড়া ডাকতাম না। পরে আল্লাহ কুরআনে আয়াত নাযিল করে আমাদের বলেন— 'তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত।'
আল্লাহ ﷻ পুত্রকে তার আসল পিতৃপরিচয়ে ডাকার নির্দেশ দিয়ে এটার অবকাশ রাখেননি যে, দত্তকের বিধান বাকি থাকবে; বরং এই অবস্থায় দত্তক নেওয়াকে তিনি হারাম করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দত্তক নেওয়া সন্তান তাদের ভাই ও বন্ধু। আয়াতের পরের অংশেই আল্লাহ বলেন— 'যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে।'
অর্থাৎ, তোমরা যদি তাদের আসল পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তোমাদের ও তাদের মাঝে সম্পর্ক হবে শুধু ভাই ও আজাদ করা-সংক্রান্ত। বংশীয় সম্পর্ক যারা হারিয়ে ফেলেছে, এটা তাদের বিকল্প ব্যবস্থা। এই সংশোধনীর পর বলা হতো, 'সে অমুকের মাওলা অথবা সে অমুক গোত্রের মাওলা।[১৩৯] দীন কেন্দ্রিক এই ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। পিতৃপরিচয় থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এটা প্রমাণিত। এজন্যই আল্লাহর রাসূল যাইদ বিন হারিসাকে বলতেন, 'তুমি আমাদের ভাই ও বন্ধু; অর্থাৎ ইসলাম ও বন্ধুত্বে তুমি আমাদের ভাই।' এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
'নিশ্চয় মুমিনরা ভাই; অতএব, তোমরা ভাইদের মাঝে সমঝোতা করো, আর আল্লাহকে ভয় করো, হয়তো তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হবে।' (সূরা হুজুরাত: ১০)
অন্য কিছু বর্ণনা এই দিকটাকে আরেক দিক থেকে পরিশুদ্ধ করেছে। সেটা হলো সন্তানের দিক। যেমন: আসল পিতা ব্যতীত অন্য কারও দিকে পিতৃত্বের সম্পর্ক যুক্ত করা হারাম করা হয়েছে।[১৪০] আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্য কাউকে পিতা ডাকবে কিংবা অপাত্রে বন্ধু দাবি করবে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সকল মানুষের লা'নাত পতিত হবে। কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তার কোনো আমল গ্রহণ করবেন না।'[১৪১]
শরী'আতে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ও বংশধারা বিষয়ক স্পষ্ট নিয়ম-বিধি বিবৃত হয়েছে। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ব্যাপারে সীমারেখা হলো বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রী গ্রহণ কিংবা মালিকানার মাধ্যমে অধিভুক্ত করে রাখা। যিনা ও ব্যভিচারের মাধ্যমে জাহিলি যুগে সন্তান দাবির ভ্রান্ত প্রথাকে ইসলাম বাতিল করেছে। নবিজি বলেন—'সন্তানের সম্পর্ক হবে ঔরসের সঙ্গে, আর ব্যভিচারির জন্য আছে প্রস্তর।' মানে হলো, শারঈ মাপকাঠিতে জন্ম নেওয়া বৈধ সন্তান তার পিতৃপরিচয়ে বেড়ে উঠবে। ব্যভিচারের মাধ্যমে কোনো বৈধ সম্পর্ক নির্মিত হয় না; তা ছাড়া (অবিবাহিত) ব্যভিচারী যুগলকে তো পাথর মেরে হত্যার আইন রয়েছে।[১৪২]
আল্লাহ দত্তক নেওয়া ব্যক্তির দিকে পিতৃত্বের সম্পর্ক করা হারাম ঘোষণা করেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন সন্তানকে প্রকৃত বাবার দিকে সম্পর্কযুক্ত করেই ডাকতে—যদি পিতার পরিচয় জানা না থাকে, তাহলে দীনি সম্পর্কের ভাই বলতে হবে। এটা পরিষ্কার হবার পর যারা ভুল করবে কিংবা এই আসমানি সিদ্ধান্তের বিরোধিতার ইচ্ছা করবে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
'তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধু রূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের কোনো বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্নকথা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা আহযাব: ০৫)
প্রকৃত পিতার দিকে সম্পর্কযুক্ত করার ক্ষেত্রে কেউ যদি ভুল করে, তাহলে আল্লাহ তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে নিষেধ করেছেন। ভুলের অর্থ হলো, ইজতিহাদ কিংবা পিতৃপরিচয় ভুলে যাওয়ার কারণে প্রচলিত বাবার দিকেই সম্পর্কযুক্ত করা। অপরাধী ও পাপী হবে সেই ব্যক্তি, হারামের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও যে অন্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাবা সাব্যস্ত করবে।[১৪৩]
সন্তান দত্তক নেওয়ার প্রচলনটা সে যুগে মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল, যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল এই প্রথা। এর বিপরীতে আল্লাহর রাসূল যাইনাব বিনতে জাহাশকে বিয়ে করে সেই জাহিলি প্রথা বিলুপ্ত করেছেন।[১৪৪] সহজেই প্রতিভাত হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল যাইনাবকে বিয়ে করার মাঝে প্রথা ভাঙার অতি জরুরি হিকমাহ নিহিত ছিল। কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে বিধান ও কারণ উল্লেখ করে বলেন—
'যেন মুমিনদের পোষ্য পুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে।' (সূরা আহযাব: ৩৭)
কাফিরদের মদদপুষ্ট একটা পথভ্রষ্ট মূর্খ গোষ্ঠী আল্লাহর রাসূলের এই বিয়ে নিয়ে মিথ্যাচার করে। তারা বলে, 'যাইদ বিন হারিসা যাইনাব বিনতে জাহাশকে বিয়ে করার পর নবিজি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যাইদ নবিজির এই মনোভাব বুঝতে পেরে যাইনাবকে তালাক দেন, নবিজি যেন তাকে বিয়ে করতে পারেন।'[১৪৫]
এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা। ইমাম ইবনুল আরাবি তাদের এই উদ্ভট মিথ্যাচারের জবাবে বলেন, “তোমরা বলে থাকো, 'তাকে দেখে নবিজি-এর মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে।' এটা তোমাদের নিছক মিথ্যাচার। নবিজি তাকে দেখার কী আছে? তখনও পর্যন্ত তো পর্দার বিধান অবতীর্ণই হয়নি। ফলে (আপন ফুফাতো বোন হওয়ায়) পারিবারিক পরিবেশে চলাফেরার সময় অহর্নিশ তার সাথে দেখা হতো; কিন্তু আল্লাহর রাসূলের মনে কখনোই তার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ জাগেনি। তা ছাড়া তখনো আল্লাহর রাসূলের ঘরে একাধিক স্ত্রী ছিলেন।
নবিজির পবিত্র হৃদয়ের ব্যাপারে নারী-আকর্ষণ বিষয়ক কলুষ আঁটার চেষ্টা সীমালঙ্ঘন ছাড়া কিছু নয়; যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
'আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি প্রসারিত করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিযিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।' (সূরা ত্বা-হা: ১৩১)
এদিকে নারী জাতি সব সময়ই স্পর্শকাতর। একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করাও যেখানে পুরুষের জন্য ফিতনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে বা ইসলামে এই রকম দৃষ্টি দেওয়ার ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে, সেখানে একজন বিবাহে আবদ্ধ নারীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কত ভয়ানক হবার কথা!? অধিকন্তু আল্লাহর রাসূলের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আরেকটা কথা বলছেন, 'আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন।' অর্থাৎ, যাইদের থেকে তালাক হয়ে যাওয়ার পর নবিজি যাইনাবকে বিয়ে করার চিন্তা করেছিলেন, আল্লাহ সেটাই প্রকাশ করেছেন।
ওপরের আয়াত থেকে এটাও বোঝা যায়, আল্লাহর রাসূল যদি যাইনাবের প্রতি আকর্ষিত হয়ে লোকলজ্জায় অথবা যেকোনো কারণে বিষয়টি গোপন করে থাকতেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা স্পষ্টভাষায় প্রকাশ করে দিতেন। আল্লাহ যেহেতু এমন কিছু কুরআনে উল্লেখ করেননি, তাই দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, 'আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাবের বিয়ে হবে, এটাই তিনি অপ্রকাশ রেখেছিলেন শুধু, ভ্রষ্টদের প্রচারিত যাইদের বিবাহ বন্ধনে থাকা অবস্থায় আকর্ষণের গল্প সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা ছাড়া কিছু নয়।”[১৪৬]
শরী'আতে চেয়েছে দত্তক-সংক্রান্ত সামাজিক প্রথাগুলো ভেঙে দেবে এবং এই বিষয়ে স্পষ্ট বিধানাবলি আল্লাহর আদেশ ও রাসূলের আমলের মাধ্যমে সুনির্ধারিত হয়ে প্রতিষ্ঠা পাবে। যার কারণে আল্লাহর নির্দেশে রাসূল যাইনাবকে বিয়ে করেন।[১৪৭]
পাঁচ. আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাবের বিয়েতে শিক্ষণীয় দিকগুলো
যাইনাব বিনতে জাহাশের ইদ্দত তখন শেষ হয়েছে। আল্লাহর রাসূল যাইদকে ডেকে বললেন, 'যাও, যাইনাবের কাছে আমার কথা উল্লেখ করো।' যাইদ তার কাছে এসে দেখেন, তিনি আটার খামির বানাচ্ছেন। যাইদ বলেন— 'তাকে দেখতেই আমার বুক সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। আমি তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। মুখ ফিরিয়ে কিছুটা পেছনে সরে এলাম। আড়ষ্ট কণ্ঠে বললাম, 'যাইনাব, আল্লাহর রাসূল তোমার কথা স্মরণ করে আমাকে পাঠিয়েছেন।'
যাইনাব বলল, 'আমার রবের সাথে পরামর্শের আগে আমি কিছু করছি না।' এ কথা বলে তিনি সালাতের স্থানে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়াত নাযিল হলো—
'অতঃপর যায়েদ যখন যাইনাবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম।' (সূরা আহযাব: ৩৭)
সাধারণত কারও ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে তার অনুমতি নিতে হয়, এটাই ইসলামের নিয়ম; কিন্তু ওপরের আয়াত নাযিল হওয়ার পর আল্লাহর রাসূল অনুমতির অপেক্ষা না করেই যাইনাবের ঘরে প্রবেশ করলেন।[১৪৮] আসলে আসমানে বিয়ে সম্পন্ন হবার পর আর কার অনুমতি নেবেন তিনি! আয়াতটিতে তো আল্লাহ বলেই দিয়েছেন, তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর সঙ্গে যাইনাবের বিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ নিজে যাদের বিয়ে দিয়েছেন, সেখানে কার কী বলার থাকতে পারে?
আয়াত নাযিলের পর নবিজি অনুমতি ছাড়াই যাইনাবের ঘরে গেলেন। মোহর হিসেবে দিলেন চারশো দিরহাম। প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাবের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে ৫ম হিজরিতে। ইমাম বায়হাকি বলেছেন, 'আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করেছেন বনু কুরাইযা যুদ্ধের পর।’[১৪৯]
যাইনাবের বাসরে আল্লাহর রাসূল বিস্তৃত পরিসরে ওলিমার আয়োজন করেন। নবিজির নির্দেশনা অনুযায়ী[১৫০] আনাস প্রত্যেককেই ওয়ালিমার দাওয়াত দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন—'আল্লাহর রাসূল যাইনাবের ওলিমা যেভাবে করেছেন, (উম্মাহাতুল মুমিনীন) আর কারও বেলায় এমন আয়োজন হয়নি। তিনি বকরি জবাই করে ওয়ালিমা করেছিলেন।'
মোদ্দাকথা, যাইদ যাইনাবকে তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত শেষে আল্লাহর নির্দেশেই নবিজি তাকে বিয়ে করেন; বরং আল্লাহই পবিত্র কুরআনে তাদের বিয়ের ঘোষণা দেন। যাইনাবকে আল্লাহর রাসূলের পরিণয়ে বদ্ধ করা, একে কেন্দ্র করে নাযিল হওয়া কুরআনের আয়াত ও প্রাসঙ্গিক ঘটনায় রয়েছে উম্মাহর জন্য শিক্ষা ও হিকমাহ।[১৫১] এ পর্যায়ে আমরা এই শিক্ষণীয় দিকগুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব—
১. আল্লাহর রাসূল যাইনাবের কাছে তার প্রথম স্বামী যাইদকে পাঠিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। এক্ষেত্রে যাইদকে নির্বাচন করে মূলত সমালোচকদের মুখে তিনি অগ্রিম সিলগালা মেরে দিয়েছেন। ওরা ধারণা করত, যাইদ যাইনাবকে তালাক দিয়েছেন অনিচ্ছায়, ছাড়াছাড়ির পর যাইদের মনে সামান্য হলেও যাইনাবের প্রতি আগ্রহ কিংবা দুর্বলতা ছিল। নবিজি এই পথটাও রুদ্ধ করে দেন। যাইদ নিজে যখন নবিজির হয়ে যাইনাবের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান, তখন নিন্দুকেরা বুঝতে পারে, যাইদ স্বেচ্ছায় যাইনাবকে তালাক দিয়েছেন এবং এখন তার মনে যাইনাবের প্রতি মোটেও আগ্রহ নেই।
এ প্রসঙ্গে ইবনু হাজার আসকালানি বলেন, 'তখনকার ঘটনা প্রবাহে এটি ছিল অতি উত্তম একটি দিক। প্রাক্তন স্বামী নিজেই প্রস্তাব দিয়েছেন, যেন কেউ ধারণা করতে না পারে তালাকের ঘটনা হয়েছে রাগের বশে, অনিচ্ছাকৃত। যাইদকে বাছাই করে নবিজি এটাও দেখেছেন, এখনো তার মনে প্রাক্তন স্ত্রীর অবস্থান বাকি আছে কিনা।[১৫২]
এখান থেকে প্রাজ্ঞচিত একটি বিষয় প্রতিভাত হয়, তা হলো—মনোমালিন্যের পরে বিচ্ছেদ ঘটলেও একে অন্যের প্রতি কল্যাণকামী হতে পারে। ঈমানি অধিকার পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে রাখতে পারে। যদ্দরুণ দেখা যায়, যাইনাবের কাছে গিয়ে যাইদ মনে কিছু গোপন রাখেননি। স্পষ্ট বলতে পেরেছেন, যাইনাব, 'সুসংবাদ গ্রহণ করো।'
২. বিয়ে সম্পর্কিত আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক চিলতে ভর্ৎসনাও ছিল। যখন যাইদ এসে আল্লাহর রাসূলের কাছে যাইনাবের সাথে তার মনোমালিন্যের কথা বললেন, যাইনাবকে তালাক দেবেন মর্মে সিদ্ধান্ত জানালেন, তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমার স্ত্রীকে কাছে রাখো, আল্লাহকে ভয় করো।' অর্থাৎ, আল্লাহকে ভয় করে তালাকের পথ পরিহার করো; অথবা তুমি তার যে মন্দ আচরণের কথা প্রকাশ করছ, এ ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এদিকে আল্লাহ তাআলা নবিজিকে জানিয়ে দিলেন, যাইদ যাইনাবকে তালাক দেবে এবং অচিরেই সে নবিজির স্ত্রী হবে—এটা তিনি নিজের মাঝে গোপন রাখছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, পাছে লোকেরা আবার না বলে বসে, তিনি পোষ্যপুত্র যাইদ বিন হারিসার স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন!
আনাস ইবনু মালিক বলেন— 'যাইদ এসে অভিযোগ করার পর আল্লাহর রাসূল তাকে বলছিলেন, 'আল্লাহকে ভয় করে স্ত্রীকে তোমার কাছে রাখো।' আনাস বলেন—আল্লাহর রাসূল যদি ওয়াহির কোনো টুকরো গোপন করতে পারতেন, এই আয়াতটি তিনি গোপন করতেন।[১৫৩]
৩. আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'যাইদ তাকে তালাক দেওয়ার পর আমি তাকে আপনার সাথে বিয়ে দিয়েছি।'
এখানে যাইদ-কে অনন্য এক মর্যাদায় চিরকালীন সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। সুহাইলি বলেন—‘লোকেরা বলত, যাইদ ইবনু মুহাম্মাদ। যখন নাযিল হলো, ‘তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো’, তখন তিনি বললেন, আমি যাইদ বিন হারিসা, কেননা আয়াতে যাইদ বিন মুহাম্মাদ বলা হারাম করা হয়েছে। এই গর্ব ও মর্যাদার বিষয়টা নিজের থেকে মুছে যাওয়ায় যাইদের যখন মনঃকষ্ট হচ্ছিল, তখন তাকে বিশেষ সম্মানে মহিমান্বিত করলেন স্বয়ং আল্লাহ। সাহাবিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই সৌভাগ্যবান, আল্লাহ কুরআনে যার নাম—'যাইদ' উল্লেখ করেছেন। আর কোনো সাহাবির নাম কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। আল্লাহ বলছেন, 'যাইদ তাকে তালাক দেওয়ার পর আমি তার সাথে আপনার বিয়ে দিয়েছি।'
কুরআনুল হাকীমে উল্লেখের মধ্য দিয়ে তার নামটি স্থান পেল অসংগতিহীন কিতাবে, অনন্ত যা তিলাওয়াত হতে থাকবে। এখানে যেমন তাকে সম্মানিত করা হয়েছে, অন্য দিকে আল্লাহর রাসূলের সাথে পিতৃত্বের সম্পর্ক মুছে যাওয়ার পর এটা তার জন্য সান্ত্বনাও বটে। এই প্রসঙ্গে উবাই ইবনু কা'আব-এরও একটি ঘটনা আছে। আল্লাহর রাসূল উবাই ইবনু কা'আব-কে বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমার সামনে অমুক সূরা পাঠ করি।’ রাসূলের মুখে এই কথা শুনে উবাই ইবনু কা'আব আবেগে আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলে বললেন, 'আমি কি তাঁর কাছে আলোচিত হয়েছি?'
আল্লাহ তাআলা তার আলোচনা করেছেন, এই চির সৌভাগ্যের বিষয়টি জানতে পেরে তিনি আনন্দের আতিশয্যে কেঁদেছেন। তাহলে সেই ব্যক্তির আনন্দ কেমন হবে, যার নামই কুরআনে স্থান পেয়েছে, চিরকাল পঠিত হবে, মুছে যাবে না দুনিয়া ধ্বংসের পরেও! মুমিনরা কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাকেও পাঠ করবে, জান্নাতিরা তিলাওয়াত করবে অনন্তকাল। চিরকাল মুমিনদের ঠোঁটে মিশে থাকবে তার নামটি। বিশেষত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছেও তিনি থাকবেন আলোচিত। কেননা, এই কালাম আল্লাহর বাণী, তা চির অম্লান, কোনো ক্ষয় নেই, নেই কোনো ধ্বংস। সর্বোপরি এর মাধ্যমে আল্লাহ যাইদকে হারানো গর্বের বিনিময় দান করেছেন।'[১৫৪]
৪. আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাব বিনতে জাহাশের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে আল্লাহর নির্দেশে। সাফ কথা হলো, আল্লাহই নবিজিকে যাইনাবের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
'আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন, আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন, তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন, আপনি লোক নিন্দার ভয় করেছিলেন; অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যাইনাবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কাজে পরিণত হয়েই থাকে।' (সূরা আহযাব: ৩৭)
যাইনাব-এর সমুন্নত মর্যাদার কথা প্রকাশ পেয়েছে এখানে। এটা নিয়ে তিনি গর্বও করতেন বটে। আনাস থেকে বর্ণিত, যাইনাব অন্যান্য স্ত্রীদের ওপর গর্ব করে বলতেন, 'তোমাদেরকে তোমাদের পরিবার বিয়ে দিয়েছে, আর আমাকে বিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ সাত আসমানের ওপরে।'[১৫৫] আরেকটি বর্ণনায় আছে, তিনি নবিজি-এর স্ত্রীদের ওপর গর্ব করে বলতেন, 'আল্লাহ তাআলা আসমানে আমার বিয়ে সম্পন্ন করেছেন।'
আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। আল্লাহর রাসূল যখন আজাদকৃত গোলাম যাইদ বিন হারিসার সাথে যাইনাবকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, এটাকে তিনি অপছন্দ করছিলেন। তবে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশের কথা জানতে পেরে তিনি সম্মত হন; কিন্তু মনঃকষ্টের ব্যাপারটা তো ছিলই। হতে পারে এজন্য আল্লাহ তাকে সমুন্নত মর্যাদায় সম্মানিত করেছেন।[১৫৬]
৫. যাইনাবের বিয়েতে আল্লাহর রাসূলের ওলিমায় নুবুওয়াতি মু'জিযাও প্রকাশ পেয়েছে। নবিজির দুআর পর খাবারে আধিক্য এসেছিল। এই ওলিমার সময়েই উম্মাহাতুল মুমিনীনদের ক্ষেত্রে পর্দার বিধান অবতীর্ণ হয়েছে, শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যিয়াফত খাওয়ার শিষ্টাচার।[১৫৭]
আনাস বলেন—'বিয়ের পর আল্লাহর রাসূল তাঁর পরিবারে প্রবেশের পরের কথা। আমার মা উম্মে সুলাইম কিছু খাবার প্রস্তুত করেন। একটা পাত্রে রেখে আমাকে বললেন, 'এগুলো আল্লাহর রাসূলকে দিয়ে বলবে, 'আমার মা এই সামান্য খাবার আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, তিনি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।'
আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেন, 'আমাদের পক্ষ থেকে এই সামান্য খাবার আপনার জন্য।'
নবিজি বললেন, 'এগুলো রেখে অমুক অমুককে ডাকবে, যাদের সাথে দেখা হবে, তাদের সবাইকেও ডাকবে।' নবিজি কিছু সাহাবির নাম উল্লেখ করেন। আমি নাম বলা সাহাবিদেরকে ডাকলাম, সাক্ষাৎ হওয়া লোকদেরকে সাথে নিয়ে এলাম।' বর্ণনাকারী বলেন—আমি আনাসকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা সেদিন কতজন ছিলেন। তিনি বললেন, তিনশোর অধিক।
সাহাবিগণ আসার পর আল্লাহর রাসূল আমাকে বললেন, 'আনাস, পাত্রটি নিয়ে এসো।' সাহাবিগণ ঘরে প্রবেশ করলেন। নবিজির হুজরা ও সুফফা জনতায় পূর্ণ হলো। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমরা দশজন দশজন করে একসাথে বসো আর প্রত্যেকেই নিজের পাশ থেকে খাবে।' সাহাবিগণ তৃপ্তিভরে খেলেন। একদল বের হবার পর আরেকদল প্রবেশ করছিল। এভাবে সবার খাওয়া শেষ হলো। নবিজি আমাকে বললেন, 'আনাস, পাত্রটা এবার ওঠাও দেখি।' আমি পাত্র ওঠালাম এবং অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হলাম, ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, আমি পাত্রটি রাখার সময় খাবার বেশি ছিল, নাকি এখন ওঠানোর পর!'
খানাপিনার পর্ব শেষে কিছু মানুষ তখনও আল্লাহর রাসূলের হুজরায় বসে গল্প করছিল। নবিজি বসে আছেন, আর তাঁর স্ত্রী দেওয়ালের দিকে ফিরে আছেন। আল্লাহর রাসূলের কাছে বিষয়টা কষ্টকর মনে হচ্ছিল। নবিজি স্ত্রীদের কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলেন। নবিজিকে ফিরতে দেখে লোকেরা ভাবল, তাদের অবস্থান নবিজিকে কষ্ট দিচ্ছে। তাই সবাই দ্রুত ঘর থেকে বের হলো। আল্লাহর রাসূল ঘরে ঢুকে দরজায় পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। আমি হুজরাতেই বসা ছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর নবিজি আবার বের হয়ে এসে কেবলই নাযিল হওয়া এই আয়াত তিলাওয়াত করেন—
'হে মুমিনগণ, তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য খাদ্য রান্নার অপেক্ষা না করে নবির গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদের ডাকা হলে প্রবেশ করো, অতঃপর খাওয়া শেষে আপনা-আপনি চলে যেয়ো, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবির জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচবোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ করেন না। তোমরা তাঁর পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর পত্নীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।' (সূরা আহযাব: ৫৩)
জা'দ[১৫৮] বলেন—'আনাস ইবনু মালিক বলেছেন, 'লোকদের মাঝে আমিই সবার আগে এই আয়াত ও নবিপত্নীদের পর্দার ব্যাপারে অবগত হয়েছি।' আল্লাহর রাসূল তাঁর স্ত্রীদেরকে পর্দা করিয়েছেন নিম্নের আয়াত নাযিলের পর, 'হে মুমিনগণ, তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা নবির ঘরে প্রবেশ করো না।'
মুওয়াল্লি বলেন—'পর্দার আয়াত নাযিল হওয়া ছিল 'উমার-এর মতের সাথে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। ইমাম বুখারি আনাস থেকে বর্ণনা করেন, 'উমার বলেন—'আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার কাছে ভালোমন্দ সবাই আসে, আপনি যদি স্ত্রীদেরকে পর্দার কথা বলতেন! এর পরেই আল্লাহ তাআলা পর্দার বিধান সংবলিত আয়াত নাযিল করেন।'
এই আয়াতের মাধ্যমে পর্দাকে শারী'আহসিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামে পর্দার উদ্দেশ্য হলো, শরীরকে গাইরে মাহরাম ব্যক্তিদের থেকে আবৃত রাখা, তাদের সাথে কথা না বলা। আর স্ত্রীলোকদের কাছে কিছু চাইতে হলে পর্দার আড়াল থেকে চাইতে হবে। আয়াতটি নাযিলের পর নবিপত্নীদের বাবা, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনরা বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরাও তাদের সাথে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলব?' এর উত্তরে আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন—
'নবি পত্নীগণের জন্য তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, নারী এবং অধিকারভুক্ত দাসদাসীদের সামনে যাওয়ার ব্যাপারে গুনাহ নেই। নবিপত্নীগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয় প্রত্যক্ষ করেন।' (সূরা আহযাব: ৫৫)
পাশাপাশি অন্যকে সম্বোধন ও বাড়িতে অবস্থানের শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন—
'হে নবিপত্নীগণ, তোমরা অন্য নারীদের মতো নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে; তোমরা সংগত কথাবার্তা বলবে। তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে এবং মূর্খযুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। হে নবি-পরিবারের সদস্যবর্গ, আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র রাখতে। (সূরা আহযাব: ৩২-৩৩)
বিশ হিজরি সনে যাইনাব নবিজির সঙ্গে মিলিত হন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। নবিজির কথা অনুযায়ী স্ত্রীদের মধ্যে যাইনাবই প্রথম মৃত্যু বরণ করেন।[১৫৯] বাকি ইবনু মাখলাদের কিতাব অনুযায়ী যাইনাব আল্লাহর রাসূল থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ১১টি।[১৬০] এর মধ্যে কুতুবুস সিত্তায় আছে ৫টি।[১৬১] বুখারি ও মুসলিম একই সূত্রে দুটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।[১৬২]
টিকাঃ
[১৩৯] দেখুন, তাফসীরে সা'দী, ৪/১৩৬
[১৪০] দেখুন, হাফসা বিনতে উসমান খলীফি রচিত 'কাযায়া নিসায়িন নাবিয়্যি ওয়াল মুমিনাত', পৃ. ১৮৯
[১৪১] বুখারি, ১৮৭০, মুসলিম, ১৩৭০
[১৪২] দেখুন, ড, সাআদ সানি' রচিত ইলাকাতুল আ-বায়ি, বিল আবনা-য়ি ফিশ শারীাতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৫২, ৫৩
[১৪৩] দেখুন, হাফসা বিনতে উসমান খলীফি রচিত 'কাযায়া নিসায়িন নাবিয়্যি ওয়াল মুমিনাত', পৃ. ১৯১, ১৯২
[১৪৪] দেখুন, শামি রচিত 'মিন মুয়াইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩১১
[১৪৫] দেখুন, আব্দুল কারীম যাইদান রচিত 'আল মুফাসসাল ফি আহকামিল মারআতি', ১১/ ৪৭৪, ৪৭৫
[১৪৬] দেখুন, ইবনুল আরাবী রচিত আহকামুল কুরআন, ৩/১৫৩১, ১৫৩২
[১৪৭] দেখুন, আব্দুল কারীম যাইদান রচিত 'আল মুফাসসাল ফি আহকামিল মারআতি', ১১/৪৭৬
[১৪৮] আহমাদ, ৩/১৯৫, মুসলিম, ১৪২৮
[১৪৯] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/ ১৪৭
[১৫০] বুখারি, ৫১৬৮। মুসলিম, ১৪২৮
[১৫১] দেখুন, হাফসা বিনতে উসমান খলীফি রচিত 'কাযায়া নিসায়িন নাবিয়্যি ওয়াল মুমিনাত', পৃ. ৩১২
[১৫২] ফাতহুল বারি, ৮/৫২৪
[১৫৩] বুখারি, ৭৪২০
[১৫৪] তাফসীরে কুরতুবি, ১৪/১৯৪
[১৫৫] বুখারি, ৭৪২০
[১৫৬] দেখুন, হাফসা বিনতে উসমান খলীফি রচিত 'কাযায়া নিসায়িন নাবিয়্যি ওয়াল মুমিনাত', পৃ. ২১৮
[১৫৭] প্রাগুক্ত
[১৫৮] ইনি জা'দ ইবনু দীনার আবু উসমান বাসরী, আনাস-এর একজন শিষ্য।
[১৫৯] বুখারি, ১৪২০ মুসলিম, ২৪৫২
[১৬০] দেখুন, ইবনুল জাওযী রচিত, 'তালকীহুল ফুহুম', পৃ. ৩৭০
[১৬১] দেখুন, মিযযী রচিত, তুহফাতুল আশরাফ, ১১/৩২১-৩২৩
[১৬২] দেখুন, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ২/১২১