📄 আহযাব যুদ্ধ ও হুদাইবিয়া মধ্যবর্তী সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি
যুদ্ধের চলমানতা, সুদৃঢ় রাষ্ট্র নির্মাণ ও আরব উপদ্বীপে ইসলামের দাপট বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামি উম্মাহর জন্য নিরাপদ সামাজিক অবকাঠামো ও সুশৃঙ্খল শারঈ ভিত্তি নির্মাণ অব্যাহত ছিল। এই ধারায় পালকপুত্র-সংক্রান্ত জাহিলি নীতি মুছে দেওয়া হয়, ফরজ করা হয় পর্দার বিধান, দৃঢ়তা পায় শারঈ শিষ্টাচার, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের আবশ্যকতায় আয়াত অবতীর্ণ হয়, শারীআতের সাথে প্রচলিত সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোর সাথে ঘোষণা করা হয় যুদ্ধ। জাহিলি যুগে সমাজে দাঁড় করিয়ে দেওয়া অসংগত প্রথা ভেঙে আল্লাহর রাসূলের সাথে বিয়ে হয় সাইয়িদা যাইনাব বিনতে জাহাশের। স্বয়ং আল্লাহ আসমানে করেন তার আয়োজন। এই বিয়ে ও তার ঘটনা পরম্পরায় রয়েছে প্রভূত হিকমাহ ও চিরন্তন শিক্ষা। সময়ের চাকা ঘুরে এগোবে বহুদূর, পরিবর্তন আসবে কালের আবর্তে; কিন্তু এই হিকমাহ ও শিক্ষাগুলো দুনিয়া থেকে মুছে যাবে না। এ পর্যায়ে আমরা যাইনাব বিনতে জাহাশের গল্প তুলে ধরছি পাঠকের সামনে।
📄 এক. নাম ও বংশধারা
তার পুরো নাম, যাইনাব বিনতে জাহাশ বিন রি'য়াব বিন ইয়া'মার আসাদিয়্যাহ। ভাইদের মধ্যে আছেন আবদুল্লাহ বিন জাহাশ, বোনরা হামনা বিনতে জাহাশ, হাবীবা বিনতে জাহাশ। মা উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব বিন হিশাম বিন আ'ব্দে মানাফ বিন কুসাই; আল্লাহর রাসূলের ফুফি, হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিবের বোন।[১৩১] বর্ণিত আছে, যাইনাব বিনতে জাহাশের আগের নাম ছিল বাররা। পরে আল্লাহর রাসূল এ নাম পালটে রাখেন যাইনাব। উম্মুল হাকাম উপনামে ডাকা হতো তাকে।[১৩২]
যাইনাব প্রাথমিকদের সাথে হিজরাত করেছেন। অধিক পরিমাণে সালাত ও সাওম রাখতেন। সাদাকাহ করতেন অকাতরে। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা বলেন—'একবার আল্লাহর রাসূল আমাদের বললেন, 'তোমাদের মধ্যে লম্বা হাতের অধিকারিণী আমার সাথে সবার আগে মিলিত হবে।' আয়িশা বলেন—পরবর্তী সময়ে মেপে দেখতাম, আমাদের মধ্যে কার হাত লম্বা। পরে বুঝলাম, আমাদের মধ্যে যাইনাবের হাত সবচেয়ে লম্বা। কেননা, তিনি হাত দিয়ে অধিক পরিমাণে দান-সাদাকাহ করতেন।'[১৩৩]
আয়িশা মাঝে মধ্যেই যাইনাবের প্রশংসা করতেন। একবার তিনি তার ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, 'ধার্মিকতা, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, অধিক পরিমাণে সাদাকাহ করা ও আমলে নিমগ্ন থাকার ক্ষেত্রে যাইনাবের চেয়ে উত্তম নারী আমি আর দেখিনি। এসবের মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেছেন। তিনি পরিণত হয়েছিলেন গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের আশ্রয়স্থলে।'[১৩৪]
টিকাঃ
[১৩১] দেখুন, ইবনু আব্দিল বার রচিত, 'আল ইসতীআব ফি মা'রিফাতিল আসহাব', ১/৩৭২
[১৩২] দেখুন, ইবনু আব্দিল বার রচিত, 'আল ইসতীআব ফি মা'রিফাতিল আসহাব', ৪/১৮৪৯
[১৩৩] বুখারি, ১৪২০। মুসলিম, ২৪৫২
[১৩৪] দেখুন, হাফসা বিনতে উসমান খলীফি রচিত 'কাযায়া নিসায়িন নাবিয়্যি ওয়াল মুমিনাত', পৃ. ২০৫
📄 আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাব বিনতে জাহাশের বিবাহ বন্ধন
আল্লাহর রাসূলের সাথে যাইনাব বিনতে জাহাশের বিবাহ বন্ধন।
📄 দুই. যাইদ রা.-এর সাথে যাইনাবের বিয়ে
মুসলিম উম্মাহ থেকে জাহিলি যুগের প্রথাগত শ্রেণি-বৈষম্যের মূলোৎপাটনে আল্লাহর রাসূল ছিলেন বদ্ধপরিকর। তিনি চাচ্ছিলেন মানুষে মানুষে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে, ভেঙে দিতে সামাজিক সব কুপ্রথা ও গরমিল-তারতম্য। মানুষ তো শ্রেষ্ঠ হবে কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে! সেকালে গোলামদের সম্মান-মর্যাদা বলতে কিছু ছিল না। যারা গোলামির শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন স্বীকৃতি পেত, তারাও অন্য সাধারণ স্বাধীনদের সমান সম্মান পেত না। আল্লাহর রাসূলের এমনিই একজন মুক্ত গোলাম ছিলেন যাইদ বিন হারিসা। নবিজি তাকে আজাদ করে দিয়ে পালকপুত্র করে নিয়েছিলেন। তারপর তিনি কুরাইশের একজন সম্ভ্রান্ত নারী, তাঁর ফুফাত বোন যাইনাব বিনতে জাহাশকে যাইদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার সংকল্প করেন; উদ্দেশ্য, আগে নিজের পরিবার থেকে জাহিলি প্রথা বিলুপ্ত করা। এটা উঁচু-নীচু শ্রেণিগত এমন এক বৈষম্য ছিল, যা বিলুপ্ত করা আল্লাহর রাসূল ছাড়া অন্য কারও পক্ষে বাস্তবে সম্ভব ছিল না। যেন উম্মাহ এই অনুসৃত পথ আঁকড়ে ধরে, অনাগত ভবিষ্যতের ইসলামি সমাজ তার অনুকরণে পথ চলে। তা ছাড়া হয়তো এই বিয়েতে নিহিত ছিল এমন একটি হিকমাহ, যা পরবর্তীতে একটি বিধান শারীআতসিদ্ধের ক্ষেত্রে ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছে। পরিবারের সুরক্ষা ও সামাজিক জীবনে ভারসাম্য রক্ষায় যার গুরুত্ব অসামান্য। যদিও এই হিকমাহটি শুরুতে স্পষ্ট হয়নি।[১৩৫]
এই অভিপ্রায়ে যাইদ বিন হারিসার প্রস্তাব নিয়ে যাইনাব বিনতে জাহাশের কাছে এলেন আল্লাহর রাসূল। নবিজি বিয়ের কথা প্রকাশ করলেন। যাইনাব বললেন, 'কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি না।' নবিজি বললেন, 'আমি বলছি, তুমি ওকে বিয়ে করে নাও।' যাইনাব বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে নিজের সাথে একটু পরামর্শ করার সুযোগ দিন।' তাদের দুজনের মাঝে এভাবেই কথা চলছিল, এমন সময় আল্লাহ কুরআনে আয়াত নাযিল করে বলেন,
'কোনো মুমিন নরনারীর জন্য উচিত নয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো সিদ্ধান্ত নেবার পর তাদের ইচ্ছাধিকার থাকবে।' (সূরা আহযাব: ৩৬)
আয়াত শোনার পর যাইনাব বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে আমার স্বামী হলে আপনি কি সন্তুষ্ট থাকবেন?' নবিজি বললেন, 'হ্যাঁ।' যাইনাব বললেন, 'আমি আল্লাহর রাসূলের অবাধ্য হব না। আমি তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলাম।' যাইদ বিন হারিসা দীর্ঘদিন ধরে আল্লাহর রাসূলের স্নেহের ছায়ায় বড় হয়েছেন। ফলে লোকেরা তাকে যাইদ বিন মুহাম্মাদ বলে ডাকত। তিনি যাইনাবকে বিয়ে করেন; এই বিয়েতে তিনি মোহরানা দেন দশ দিনার, ষাট দিরহাম, একটি খিমার, একটি লেপ, একটি বর্ম, প্রায় আট কেজি যব, তিন কেজি খেজুর।
টিকাঃ
[১৩৫] দেখুন, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩/৪৮৯