📄 অবশেষে মহান আল্লাহর সাহায্য ও কুরআনে আহযাব যুদ্ধের বর্ণনা
এক. নবিজির একান্ত মিনতি, এলো আল্লাহর সাহায্য
আল্লাহর রাসূল একান্ত মিনতি ভরে অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন; বিশেষ করে যুদ্ধের সময়ে। এক সময় যখন মুসলিমদের ওপর দুর্ভোগ আগের চেয়ে কঠিন আকার ধারণ করে, প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হবার উপক্রম হয়, অন্তর কেঁপে ওঠে বিভীষিকায়, তখন সাহাবায়ে কেরাম নিরুপায় হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের কি কিছু বলার সুযোগ আছে? আমাদের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত!'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'হ্যাঁ অবশ্যই—হে আল্লাহ, আমাদের দোষত্রুটি গোপন রাখুন, ভীতি দূর করে নিরাপত্তা দান করুন।' (আহমাদ, ৬/৩, বাযযার, ৩১১৯)
সহীহ বুখারি ও মুসলিমে আছে, আবদুল্লাহ ইবনু আবি আওফা বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বদ দুআ করে বলেন—'হে আল্লাহ, তুমি কিতাব অবতীর্ণকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী, এই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করো। হে আল্লাহ, তাদেরকে পরাভূত করো, সমূলে কাঁপিয়ে দাও।' (বুখারি, ২৯৩৩। মুসলিম, ১৭৪২)
আল্লাহ নবিজির দুআ কবুল করে বিজয় ও প্রশান্তির সুবার্তা পাঠান। তিনি তাঁর অসীম কুদরতে শত্রু বাহিনীকে পরিখার পাশ থেকে সরিয়ে দেন, চূর্ণ করে দেন তাদের ঐক্য। এরপর প্রবল শৈত্যপ্রবাহ পাঠিয়ে তাদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন। শেষে নিজের পক্ষ থেকে পাঠান এক বিশেষ বাহিনী। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন—
'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্য বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা আহযাব: ০৯)
ইমাম কুরতুবি বলেন—'এই প্রবল শৈত্যপ্রবাহ ছিল আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর একটি দীপ্যমান মু'জিযা। কেননা, নবিজি ও সাহাবায়ে কেরাম পরিখার কাছেই ছিলেন, শত্রুদের সাথে শারীরিক দূরত্ব ছিল শুধু এই পরিখা; অথচ শৈত্য প্রবাহের প্রবল আক্রোশে মুসলিমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন। যেখানে কাছাকাছি দূরত্বে এই প্রবাহে শত্রুদের বিশাল বাহিনী নাকাল, মুসলমানরা তার আবহ টেরই পাননি। অধিকন্তু, আল্লাহ তাআলা মুশরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ফেরেশতা পাঠান। তারা এসে তাঁবুর খুঁটি উপড়ে ফেলেন, শামিয়ানার রশি কেটে দেন, নির্বাপিত করেন মশালের আগুন, উলটে ফেলেন খাবারের পাতিল। ঘোড়াগুলো চক্কর খেতে থাকে একটা আরেকটার সাথে।
শেষ পর্যায়ে ফেরেশতারা তাদের অন্তরে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। শত্রু বাহিনীকে ঘিরে ফেরেশতাদের তাকবীর ধ্বনি গুঞ্জরিত হতে থাকে, সৃষ্টি হয় ভীতিকর এক অবস্থা। এক সময় অস্থির হয়ে প্রত্যেক তাঁবুর নেতা হাঁক ছেড়ে ডাকতে থাকে, 'ওহে অমুক, আমার কাছে এসো...'। সবাই একত্রিত হলে নেতা বলে, আমরা মুক্তি চাই, মুক্তি চাই। এর কারণ একটাই, আল্লাহ তাদের অন্তরে ভয়াবহ আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছেন।[৫৩]
আল্লাহর রাসূল সাহাবায়ে কেরাম ও সকল মুসলিমকে দীপ্তভাবে জানিয়ে দিলেন, 'দশ হাজার সৈন্যের এই বিশাল বাহিনীকে মুসলিমরা যুদ্ধ করে পরাজিত করতে পারত না। সম্মুখ যুদ্ধেও যেকোনো কৌশলে তাদের পরাজিত করা সম্ভব হতো না; বরং আল্লাহ একাই তাদের পরাজিত করেছেন। এ কথা স্মরণ রাখতে আল্লাহ কুরআনে বলছেন—
'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্য বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা আহযাব: ০৯)
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলতেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহা নেই, তিনি এক। তিনি তাঁর বাহিনীকে শক্তিশালী করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, সম্মিলিত বাহিনীকে একাই করেছেন পরাজিত, সুতরাং তাঁর পরে আর কেউ নেই।' (বুখারি, ৪১১৪। মুসলিম, ২৭২৪)
নবিজি তাঁর রবকে মিনতিভরে ডেকেছেন, ভরসা করেছেন শুধু তাঁরই ওপর। তাই বলে মানবীয় উপায় অবলম্বন করা সাহায্য-প্রার্থনার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এই যুদ্ধে তিনি বাহ্যিক উপায়-উপকরণও কাজে লাগিয়েছেন। চেষ্টা করেছেন দলগুলোর মাঝে ফাটল সৃষ্টি করতে, তুলে দিতে অবরোধ।[৫৪]
আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন বাহ্যিক কৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি আবশ্যক হলো আল্লাহর দিকে অভিমুখী হওয়া ও একনিষ্ঠ দাসত্বে তাঁর কাছে সমর্পিত হওয়া। কেননা, শক্তিশালী কোনো মাধ্যমই কাজে আসবে না, যদি না পূর্ণ মিনতিভরে আল্লাহর দিকে অভিমুখী হয়ে তাঁর কাছে সাহায্য ও সফলতা চাওয়া না হয়। আল্লাহর রাসূল আমরণ আল্লাহর কাছে মিনতিপূর্ণ দুআর আমল অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে গেছেন।[৫৫]
দুই. শত্রু বাহিনী প্রস্থানের খবর সংগ্রহ
আল্লাহর রাসূল সম্মিলিত বাহিনীর সার্বিক খোঁজখবর রাখছিলেন এবং তিনি চাচ্ছিলেন সামনে কী ঘটতে চলেছে, তা অনুসন্ধান করে দেখতে। এ উদ্দেশ্যেই তিনি সাহাবিদের লক্ষ করে বলেন,
'কে আছ, শত্রু বাহিনীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমাকে জানাতে পারবে? কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আমার সাথে রাখবেন।' এই পদ্ধতিতে কাজ না হতে দেখে দৃঢ়তাসূচক পন্থা গ্রহণ করেন। নির্দিষ্ট নাম উচ্চারণ করে বলেন— 'হুজাইফা দাঁড়াও, ওদের খবর নিয়ে এসো। তবে ওদের কাউকে আঘাত করবে না।' (মুসলিম, ১৭৮৮)
হুজাইফা বলেন—'নির্দেশ পেয়ে আমি চলা শুরু করলাম। আমি যেন উষ্ণ আবহের ভেতর দিয়ে চলছিলাম। বিন্দু পরিমাণ শীত অনুভূত হচ্ছিল না। এক সময় সামনেই আবু সুফিয়ানকে দেখতে পাই। কনকনে এই শীতে উষ্ণতা পেতে আগুন জ্বালিয়েছে। আমি ধনুকে তির লাগিয়ে নিক্ষেপের ইচ্ছা করলাম; কিন্তু আল্লাহর রাসূলের কথা মনে পড়ে গেল। কাউকে আঘাত করতে তিনি নিষেধ করেছেন। আমি তির ছুড়লে অবশ্যই তাকে আক্রান্ত করতে পারতাম।
খবর সংগ্রহ করে আমি ফিরে আসছি। এবারও যেন আগের মতোই চলছিলাম—উষ্ণ আবহের ভেতর দিয়ে। এতক্ষণে আমার সর্দি লেগে গেছে। বিলম্ব না করে নবিজির কাছে ফিরে এসে সবকিছু খুলে বললাম। তিনি আমার অবস্থা দেখে একটা কাপড়ের অতিরিক্ত অংশ দিয়ে আমাকে আচ্ছাদিত করলেন। অন্যরকম উষ্ণতার পরশে আমি সকাল পর্যন্ত ঘুমালাম। সকাল হলে আল্লাহর রাসূল ডেকে বললেন, ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তি, ওঠো...!' (মুসলিম, ১৭৮৮)
হুজাইফা-এর ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো: আল্লাহর রাসূল সুপ্ত প্রতিভার সাথে পরিচিত ছিলেন। তাই তো দুশমনের ভেতরে ঢুকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নির্বাচন করেছেন হুজাইফা-কে। কেননা, তার ব্যক্তিত্বে বিদ্যমান ছিল বিরল বীরত্ব ও গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের অপার দক্ষতা। ফলে এই কাজের জন্য তার মতো সাহাবিরই প্রয়োজন ছিল। হুজাইফা সামরিক শৃঙ্খলার প্রতি পূর্ণ খেয়াল রেখেছিলেন। একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন দুশমন বাহিনীর নেতাকে হত্যার জন্য। এ কাজে অগ্রসর হবার চিন্তাও করছিলেন, ঠিক তখনই মনে পড়ে যায়, আল্লাহর রাসূল তাকে শুধু সংবাদ-সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন, কাউকে আঘাত করতে বরং বারণ করেছেন। ফলে তিনি ধনুক থেকে তির সরিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন।[৫৬]
ওলিদের কারামাতের সত্যতা স্পষ্ট হয়। হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান যখন সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হন, তখন প্রচণ্ড বেগে শৈত্যপ্রবাহ প্রবাহিত হচ্ছিল; কিন্তু তিনি এসবের কিছুই অনুভব করেননি; বরং উষ্ণ আবহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। নিজেদের মাঝে ফিরে আসা পর্যন্ত তার এই অবস্থা অব্যাহত ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, এটি একটি কারামাত, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করে থাকেন।[৫৭]
হুজাইফা ফিরে আসবার পর তার সাথে নবিজি-এর মমতার আচরণ। স্বভাবত নবিজি ছিলেন সাহাবিদের প্রতি মমতাময়। হুজাইফার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে তাকে রাতের সালাত ও মুনাজাতে কাছে টেনেছেন। এই হুজাইফাই তো একটু আগে নিয়ে এসেছেন মুসলিমদের জন্য শুভ বার্তা ও সত্য সংবাদ! এরপর তার ক্লান্তির কথা ভেবে তাকে সালাতের কাপড় দিয়ে জড়িয়েছেন, সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত এভাবেই রেখেছেন। জাগিয়েছেন একদম ফরজ সালাতের সময় নরম স্নেহময় কণ্ঠে। বলেছেন, 'ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তি, ওঠো...!' এ আহ্বানে যেন মিষ্টতা ঝরে ঝরে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার স্নিগ্ধতা ও সুবাস। নবিজির কণ্ঠে এমনই কোমলতা, নম্রতা ও মিষ্টতা লেগে থাকত, সাহাবিদের তিনি এভাবেই সম্বোধন করতেন।[৫৮] তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
'মুমিনদের প্রতি তিনি দয়ার সাগর, মমতাময়।' (সূরা তাওবা: ১২৮)
সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই ছিলেন উপস্থিত বুদ্ধিতে অনন্য। হুজাইফা কুরাইশের লোকদের ভেতর প্রবেশ করেছিলেন। আবু সুফিয়ান কিছু একটা টের পেয়ে সাথিদের বলল, 'তোমরা সবাই পাশের ব্যক্তির হাত ধরো।' হুজাইফা বলেন—'আমি তাদের মাঝেই ছিলাম। বেগতিক অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য আমার ডান পাশের ব্যক্তির হাতে হাত রেখে বললাম, 'তুমি কে?' সে বলল, 'মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান।' এভাবে বাম পাশের লোকটার হাত ধরে বললাম, 'তুমি কে?' সে বলল 'আমর ইবনুল আ'স।'[৫৯] উপস্থিত বুদ্ধিতে আগে আগে জিজ্ঞেস করে ফেলার পর কেউ আর তাকে প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়েনি। এভাবেই হুজাইফা নাজুক মুহূর্ত সামাল দিয়েছেন। দুশমনের সামনে প্রশ্নের সুযোগই রাখেননি।[৬০]
তিন. কুরআনে আহযাব যুদ্ধের বিবরণ ও ফলাফল
কুরআনুল কারীম আহযাব যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছে। বলেছে—সব কিছু আল্লাহ-এর অধীন। কুরআনুল কারীম এই আহযাব ও কুরাইযা যুদ্ধের কথা লিখিত রেখেছে। এই লেখনী চিরকালীন, সময়ের বিবর্তনে মুছে যাবে না। মুসলিমরা সর্বকালেই এই দৃষ্টান্ত সামনে রাখবে, তারা ঘরবাড়ি কিংবা শহর রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে না। স্মরণ রাখবে—শত্রু আসতে পারে কুকুরের মতো চারপাশ থেকে।
কুরআন আহযাব ও বনু কুরাইযা যুদ্ধের কথা পুনরাবৃত্তির মতো ব্যক্ত করেছে, যেন মুসলিম জাতি ঘটনাবহুল এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিতে পারে।[৬১] কুরআনে বর্ণিত আহযাব যুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃশ্যত হয়,
মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সমূহ নিয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন—'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্য বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা আহযাব: ০৯)
সম্মিলিত বাহিনী মাদীনাকে ঘেরাও করার কারণে মুসলিম জাতিকে যে দুশ্চিন্তা গ্রাস করেছিল, সে চিত্র ফুটে উঠেছে কুরআনে। যেমন: 'যখন তারা তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল উচ্চভূমি ও নিম্নভূমি থেকে এবং যখন তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছিল, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে।' (সূরা আহযাব: ১০)
মুনাফিকদের নিকৃষ্ট মনোভাব, নিন্দিত চরিত্র, কাপুরুষতা, অমার্জনীয় গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতা এবং চুক্তি ভঙ্গের গোপন দুর্ভিসন্ধি প্রকাশ করেছে কুরআন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদের দেওয়া আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।' (সূরা আহযাব: ১২)
পৃথিবীর সর্বকালের সব জায়গার মুমিনদেরকে কথা, কাজ ও জিহাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে কুরআন। সর্বোপরি তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সবার জন্য গ্রহণীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—'নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।' (সূরা আহযাব: ২১)
কুরআন মুমিনদের একনিষ্ঠ ঐক্যবদ্ধতার প্রশংসা করেছে। তারা সত্যনিষ্ঠ ঈমান দিয়ে সম্মিলিত বাহিনীর মোকাবিলা করেছে এবং আল্লাহকে দেওয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— 'মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।' (সূরা আহযাব: ২৩)
আল্লাহ তাআলার একটি অপরিবর্তনশীল নির্ধারিত বিধানের কথা ব্যক্ত করেছে কুরআন, তা হলো—চূড়ান্ত বিজয় মুমিনদের জন্য এবং শত্রুরা পরাজিত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—'আল্লাহ কাফিরদের ক্রুদ্ধাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোনো কল্যাণ পায়নি। যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ মুমিনদের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছেন। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।' (সূরা আহযাব: ২৫)
মুমিন বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বিবৃত হয়েছে, যেমন: বনু কুরাইযাহ তাদের সুরক্ষিত দুর্গেই অবস্থান করছিল; কিন্তু আল্লাহ কোনো যুদ্ধ ছাড়াই মুসলিমদের সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছেন, ফলে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য নেমে আসে।[৬২]
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'কিতাবিদের মধ্যে যারা কাফিরদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন। ফলে তোমরা এক দলকে হত্যা করেছ এবং এক দলকে বন্দি করেছ। তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘরবাড়ির, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খণ্ডের মালিক করে দিয়েছেন, যেখানে তোমরা অভিযান করনি। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।'
একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল গাযওয়ায়ে আহযাব। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী এক যোগে শত্রুদের বিরুদ্ধে নিবিষ্ট হয়েছিলেন এবং আবশ্যক করেছেন কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর পরিণতি। যেমন:
'যখন মুমিনরা শত্রু বাহিনীকে দেখল, তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল। মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।' (সূরা আহযাব: ২২-২৩)
ফলাফল:
মুসলিমদের বিজয় অর্জন, শত্রুদের পরাজয় ও বিভক্তি, শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে প্রত্যাগমন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থতায় পরিণত হওয়া।
মুসলিম জাতির অবস্থার পরিবর্তন। প্রতিরোধের সিঁড়ি পালটে এখন অবস্থান নেবেন আক্রমণের ঘাঁটিতে। এদিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'এত দিন আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, এখন আমরা তাদের দিকে যুদ্ধে বের হব।'
এই যুদ্ধেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে বনু কুরাইযার গাদ্দারি প্রকাশ পায়। মুসলিমদের এক কঠিন দুর্দিনে ওরা আল্লাহর রাসূলকে দেওয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করে।
এই আহযাব যুদ্ধ মুসলিমদের ঈমানের সত্যতা, মুনাফিকদের আসল চেহারা ও বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের প্রকৃত চরিত্র সামনে এনেছে। বলতে হয়, এই আহযাব যুদ্ধের বিপদ মুসলিমদের বিশুদ্ধ করেছে; পক্ষান্তরে মুনাফিক ও ইয়াহুদিদের চেহারা থেকে খুলে দিয়েছে মুখোশ।
বনু কুরাইযার যুদ্ধ ছিল আহযাব যুদ্ধেরই ফলাফল। এর ফলে বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের সাথে হিসাবনিকাশের পালা ঢুকে গেছে, যারা কঠিন এক মুহূর্তে আল্লাহর রাসূলের সাথে গাদ্দারি করে অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।[৬০]
চার. বনু কুরাইযা থেকে মুক্তি
খন্দক থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রাসূল অস্ত্র রেখে দেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিকে নির্দেশ দিলেন বনু কুরাইযার সাথে যুদ্ধ করতে। নবিজিও তাঁর সাহাবিদের দ্রুত ওদের দিকে অভিমুখী হতে বলেন। সবাইকে জানিয়ে দেন, বনু কুরাইযার দুর্গ-দেওয়ালে কম্পন সৃষ্টি করে তাদের অন্তরে আতঙ্ক সঞ্চার করতে আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল-কে পাঠিয়েছেন।' বিদায়ের সময় তাগিদ দিয়ে বলেন— 'বনু কুরাইযায় পৌঁছার আগে কেউ যেন আসরের সালাত আদায় না করে।' (বুখারি, ৪১১৯। মুসলিম, ১৭৭০)
সাহাবায়ে কেরাম বনু কুরাইযার দুর্গ ২৫ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখেন।[৬৪] বনু কুরাইযা যখন দেখল, অবরোধে জীবন নাজেহাল হয়ে পড়েছে, বিপদের আবর্ত থেকে বেরোবার কোনো পথ নেই, তখন নিরুপায় হয়ে তারা এই মর্মে আত্মসমর্পণ করতে ও নেমে আসতে সম্মত হয় যে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাআদ ইবনু মুআজকে সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব দেবেন।
বনু কুরাইযা ভেবেছিল, সাআদ ইবনু মুআজকে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হলে তাদের ও আউস গোত্রের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি তাদের প্রতি দয়া দেখাবেন; কিন্তু তা আর হয়নি। সাআদ ইবনু মুআজ খন্দকের দিন তিরের আঘাত পেয়েছিলেন, তাই তাকে বহন করে নিয়ে আসা হয়। তিনি ফায়সালা করেন, 'যুদ্ধে সক্ষম পুরুষদের হত্যা করে সন্তান ও নারীদের বন্দি করা হবে। সম্পদ মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করা হবে। আল্লাহর রাসূল তাকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেন—'তুমি আল্লাহর বিধান মতেই ফায়সালা করেছ।' (বুখারি, ৩০৪৩, ৪১২২। মুসলিম, ১৭৬৮)
মাদীনার বাজারে চারশো ব্যক্তির ওপর ফায়সালা কার্যকর করা হয়। যুদ্ধে সক্ষম পুরুষদের হত্যা করে বেশ কিছু গর্তে নিক্ষেপ করা হয়। স্বল্প সংখ্যক মানুষ ইসলামে প্রবেশ ও ওয়াদা পূর্ণ করার কারণে মুক্তি পায়। সবশেষে বনু কুরাইযার সমস্ত সম্পদ বণ্টন করা হয় মুসলিমদের মাঝে।
গাদ্দারি ও মুসলিমদের চুক্তি থেকে মুক্তিপ্রার্থীদের এটাই ছিল ন্যায়ানুগ প্রতিদান। আসলে এই প্রতিদান তাদের পরিকল্পিত কাজের অনুরূপ। তারা খিয়ানাত করে মুসলিমদের হত্যা করা-সহ তাদের ধনসম্পদ লুটপাট ও বন্দি করতে চেয়েছিল স্ত্রী-সন্তানদের। এই নিকৃষ্ট ইচ্ছার পরিণতিতে তাদের ওপর শাস্তিও নেমে এসেছে ঠিক এমনই।[৬৫]
এদিন বনু কুরাইযার শুধু একজন নারীকে হত্যা করা হয়। এ সম্পর্কে আয়িশা বলেন—‘তাদের নারীদের থেকে শুধু একজনকে হত্যা করা হয়। সে-ই আমার কাছে এসে গল্প করত। আমি তার মতো উচ্ছল ও হাস্যোজ্জ্বল নারী আর দেখিনি। আল্লাহর রাসূল বাজারে পুরুষদের হত্যা করার সময় একজন গলা উঁচিয়ে নাম নিয়ে বলে ওঠে, অমুক নারী কোথায়?
সে বলল, এই তো আমি এখানে।
আমি বললাম, ‘তুমি তো বিপদে পড়ে যাবে, কী হলো তোমার?’ সে বলল, ‘আমাকে হত্যা করা হবে।’ বললাম, ‘কেন?’ সে বলল, ‘আমি একটা অমার্জনীয় ঘটনা ঘটিয়েছি।’ (এই নারী জাঁতাকলের চাকা নিক্ষেপ করে খল্লাদ বিন সুয়াইদ-কে হত্যা করেছিল। এরপর নবীজি তাকে এটা দিয়েই হত্যা করেন) আয়িশা বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, তার প্রাণবন্ত আশ্চর্য মানসিকতার কথা আমি কখনোই ভুলব না। সে ছিল হাস্যোজ্জ্বল; কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম সে মারা যাবে।’[৬৬]
বনু কুরাইযার ওপর এই সিদ্ধান্তের ফলে মাদীনা ইয়াহুদিমুক্ত হয়। উন্মুক্ত হয় শুধু মুসলিমদের জন্য। অভ্যন্তর ভাগ ক্ষতির উপাদান মুক্ত হয়, কেননা ওদের সক্ষমতা ছিল গোপন পরামর্শে, কূটকচাল ও চক্রান্তে। কুরাইশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। কেননা, ইয়াহুদিদের ব্যাপারে ওরা মনে করত, মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই একটা জাতি তাদের পাশে থাকবে, এখন সেই আশাগুলো বনু কুরাইযার লাশগুলোর সাথে মাদীনার বাজারে সমাধিত হয়। ইয়াহুদিদের দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা দূরীভূত হয়। কারণ, এরা-ই মুনাফিকদের শক্তি ও সাহস দিয়ে সাহায্য করত।[৬৭] এরপর ইসলামি দাওলাতের সুরক্ষা কল্পে আল্লাহর হাবীব মুস্তাফা মুসলিম উম্মাহর জন্য যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
[৫৩] তাফসিরে কুরতুবি, ১৪/১৪৪
[৫৪] গযবান রচিত ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, ৫০৩
[৫৫] বৃতি রচিত ফিকহুস সীরাহ পৃ. ২২২
[৫৬] গযবান রচিত ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ৫০৩
[৫৭] আবু ফারিস রচিত সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৬৭
[৫৮] সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ২৪৬
[৫৯] দেখুন, শারহু যুরকানি, ২/১২০
[৬০] দেখুন, মিন মায়ীনিস সীরাহ, পৃ. ২৯৩
[৬১] দেখুন আল আসাস ফিস সুন্নাহ, ২/৬৬২
[৬২] দেখুন, নবীজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের বর্ণনা, ২/৪৯০, ৪৯১
[৬০] সূত্র প্রাগুক্ত, ২/৪৪২
[৬৪] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৩৭০
[৬৫] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/ ৩১৫, ৩১৬, ৩১৭
[৬৬] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৩৭৭। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, বনু কুরাইযা অধ্যায়।
[৬৭] সুজা’ রচিত সীরাতুর রাসূল, পৃ. ১৫৩
📄 মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
আল্লাহর রাসূল পার্শ্ববর্তী শক্তিগুলোকে যেমন সতর্ক করতেন, তেমনই তাদের শক্তিমত্তা থেকে উদাসীনও থাকতেন না। খন্দক যুদ্ধের পর তো তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, 'আমাদের সামনের পরিকল্পনা হলো কুরাইশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।' কেননা, শক্তির মানদণ্ডে পরিবর্তন এসেছে, আক্রমণ করার জন্য মুসলিমরা এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
ফলে নবিজি মাদীনার পার্শ্ববর্তী শক্তিগুলোর ওপর ইসলামি দাওলার কর্তৃত্ব সম্প্রসারণে সচেষ্ট হন। কেননা, কুরাইশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সাথে এর সম্পর্ক সুগভীর। এই পদক্ষেপের ফলাফলে দেখা গেছে, এক বছরের মধ্যে তিনি দুটি যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, প্রেরণ করেছেন ১৪টি সারিয়্যাহ বা ছোট অভিযান।
নবিজির এই কর্মপন্থা ও পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশের শক্তি ভেঙে চূর্ণ করে দেওয়া। তাদের মিত্রশক্তি যোগানদাতাদেরও চরমভাবে কোণঠাসা করা।[১৬৩] সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সফলতা ও তাদের পরিকল্পনা পর্যুদস্ত করতে আল্লাহর রাসূল ও সাহাবিগণ এসবই কাজে লাগিয়েছিলেন। ওদিকে ফাঁসির রশি পরিয়েছেন বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের গলায়। ফলে সবদিক থেকে শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয়ের বার্তা পেয়েছেন এবং নতুন করে কুরাইশের অর্থনৈতিক খাতকে করতে পেরেছেন সংকীর্ণ। তা ছাড়া বেশ কিছু সারিয়্যাহ পরিচালনা করেছেন মুশরিক বাহিনীকে শায়েস্তা করতে, কিংবা সেই গোত্রগুলোর মাঝে দাপট সৃষ্টি করতে, যারা ইসলামের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গাদ্দারি করেছে।
এক. বনু কুরতা-এর উদ্দেশ্যে মুহাম্মাদ বিন মাসলামার অভিযান
নাজদের জাতিগুলোর মধ্যে মুসলিমদের বিপক্ষে সবচেয়ে দুঃসাহসিক ছিল মরুবাসী মূর্তিপূজারী গোত্রগুলো। নাজদিরা ছিল সংখ্যায় বিপুল ও প্রবল শক্তির অধিকারী। আমরা দেখেছি, প্রতিদ্বন্দ্বী সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে যারা মেরুদণ্ডের ভূমিকা রেখেছিল, তারা ছিল নাজদের গোত্রগুচ্ছ। গাতফান, আশজা, আসলাম, ফাযারাহ ও আসাদ গোত্রের সেনা সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। মাদীনা অবরোধে এগিয়ে আসা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে শামিল হয়েছিল তারা।
খন্দক যুদ্ধের পর সেনা অভিযানের মাধ্যমে এই প্রতিপক্ষদের শায়েস্তা করার দিকে মনোযোগী হন আল্লাহর রাসূল। বাসরা ও নাজদ থেকে মাক্কার পথে একটি আবাদি জনপদের পাশে কুরতা নামক স্থানে বাস করত কিছু নাজদি, বনু বকর বিন কিলাবের লোক। মাদীনা থেকে সাতদিনের দূরত্ব ছিল এদের। নবিজি প্রথম এদের বিরুদ্ধেই সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন।[১৬৪] বনু কুরাইযার যোদ্ধাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর ৬ষ্ঠ হিজরির মুহাররাম মাসের প্রথম দশকে ত্রিশজন মুজাহিদের একটি বাহিনী ছিল এটি। তাদের আমীর নির্ধারণ করেন মুহাম্মাদ বিন মাসলামা-কে।[১৬৫]
শত্রুদল তখন অসতর্ক। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা সাথিদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হত্যা করেন দশজন মূর্তিপূজারীকে। বাকিরা পালিয়ে যায়। মুজাহিদরা তাদের উট ও অন্যান্য জিনিস গানীমাত হিসেবে লাভ করেন। ফেরার পথে বনু হানীফার নেতা সুমামাহ বিন আছালকে বন্দি করেন। যদিও তারা তারা চিনতেন না; তবু তাকে ধরে মাদীনায় এনে মাসজিদে নববির একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখেন।
এক সময় আল্লাহর রাসূল তার কাছে এসে বললেন, 'সুমামাহ, তোমার কি বলবার মতো কিছু আছে?' সুমামাহ বলল, 'আমার মাঝে শুধু কল্যাণই আছে মুহাম্মাদ! আমাকে হত্যা করলে তুমি একটি প্রাণকে হত্যা করবে, আমার প্রতি অনুগ্রহ করলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করা হবে, আর আমার কাছ থেকে সম্পদ চাইলে তাও চাইতে পার।'
এদিন নবিজি তাকে ছেড়ে দিলেন। পরেরদিন আবার বললেন, 'তোমার কাছে বলবার মতো কিছু আছে?' সুমামাহ বলল, 'আমার অভিব্যক্তি তোমাকে আমি বলেছি। আমার প্রতি অনুগ্রহ করলে আমাকে কৃতজ্ঞচিত্ত পাবে।'
নবিজি এদিনও তাকে ছেড়ে দিলেন। কিছু বললেন না। আগাম কোনো আভাসও দিলেন না। পরের দিন আবার এসে বললেন, 'সুমামাহ, তোমার কিছু বলার আছে?' সুমামাহ বলল, 'আমার যা বলবার, বলে দিয়েছি।' আজ নবিজি সাহাবিদের বললেন, 'সুমামাহকে ছেড়ে দাও।'
সুমামাহ মুক্ত হয়ে মাসজিদের কাছেই একটা খেজুর বাগানে ঢুকে গোসল করল। মাসজিদে প্রবেশ করে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর নবি, শুনুন, পৃথিবীতে আপনার চেহারা ছিল আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত; আর আজ আপনার এই চেহারা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহর কসম, সব ধর্ম অপেক্ষা আপনার ধর্মই ছিল আমার কাছে ঘৃণার; কিন্তু আজ আপনার দীনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আল্লাহর কসম, আপনার শহরটি ছিল পৃথিবীতে আমার কাছে সবচেয়ে মন্দ শহর; আর আজ আপনার এই নগরী আমার অতি প্রিয় নগরী। আপনার উট কি আমাকে দেবেন? আমি উমরার ইচ্ছা করেছিলাম। আপনি কী মনে করেন?'
আল্লাহর রাসূল তাকে সুসংবাদ শুনিয়ে উমরা করার নির্দেশ দিলেন। তিনি মাক্কায় আসার পর কেউ একজন বলল, 'তুমি কি সাবিয়ি হয়েছ?' তিনি বললেন, 'না, আমি বরং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম, ইয়ামামাহ থেকে তোমাদের কাছে একটা গমের দানাও আসবে না আল্লাহর রাসূলের অনুমতি ছাড়া।'[১৬৬]
পরবর্তী সময়ে সুমামাহ এই কসম পূর্ণ করেছেন। তার জনপদের পথ ধরে মক্কার একটি বণিকদল খাদ্য সামগ্রী নিয়ে আসছিল। সুমামাহ এদের পথ আটকে নবিজির কাছে চিঠি লিখতে বাধ্য করেছেন। এরা মাদীনায় আল্লাহর রাসূলের কাছে চিঠি লিখে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, তিনি যেন সুমামাহকে চিঠি লিখে খাবারের বোঝা মুক্ত করার অনুমতি দেন।[১৬৭] আল্লাহর রাসূল তখন যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি বনু হানীফার নেতা সুমামাহকে চিঠি লিখে বললেন, 'আমার জাতির রাস্তা খালি করে দাও।' সুমামাহ নবিজির নির্দেশ পালন করেছেন। বনু হানীফাকে সরিয়ে নিয়ে মাক্কার মাল-সামানা থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিয়েছেন।'[১৬৮]
এই ঘটনাতে নিহিত কিছু শিক্ষণীয় দিক:
১. কাফিরকে মাসজিদে বেঁধে রাখা জায়েয।
২. কাফির বন্দির প্রতি অনুগ্রহ করারও অনুমতি আছে। অনিষ্টকারীর সাথেও ক্ষমার মহান আদর্শ রাখা ইসলাম শিক্ষা দিচ্ছে। ক্ষমার আচরণ অপরাধী ব্যক্তিকে ভেতর থেকে আন্দোলিত করে নিয়ে আসে পরিবর্তন। এই তো সুমামাহ কসম করে বলেছেন, তার ক্ষোভ মুহূর্তেই ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। কেননা, আল্লাহর রাসূল তাকে কোনো মোকাবিলা ছাড়াই ক্ষমা ও অনুগ্রহে ধন্য করেছেন।
৩. ইসলাম গ্রহণের পূর্বে গোসল করে নেওয়া, যেমনটি করেছেন সুমামাহ।
৪. একটি পরিষ্কার কথা হলো—ইহসান ক্ষোভ মুছে দিয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে।
৫. কোনো কাফির ভালো কাজের ইচ্ছার পর ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ভালো কাজের মাঝে অব্যাহত রাখা।
৬. যে বন্দি থেকে ইসলামের আশা করা যায়, তার প্রতি দয়া দেখানো; যদি তাতে ইসলামের কল্যাণ থাকে। বিশেষত যদি এমন ব্যক্তি হয়, যার মাধ্যেম তার জাতির পরিবর্তনের আশা করা যায়।[১৬৯]
৭. ইসলাম মুমিনের আচরণ বিধিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে, যখন সে ইসলাম ও মুসলিমদের নেতৃত্বাধীন কিছু করার সামর্থ্য রাখবে। যেমন: সুমামাহ আল্লাহর রাসূলের অনুমতি ব্যতীত মাক্কায় মালের বোঝা প্রেরণে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন।
৮. একজন মুমিনের উচিত, ঈমান গ্রহণ ও কুফুর ত্যাগের পর পূর্ববর্তী সকল সম্পর্ক ত্যাগ করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সকল নির্দেশ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে পালন করার প্রতি একনিষ্ঠ হবে।[১৭০]
সাগর-তীরে উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর অভিযান:
কুরাইশের অর্থনৈতিক খাত স্থায়ীভাবে পঙ্গু করতে আল্লাহর রাসূল-এর অব্যাহত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর অভিযান। আল্লাহর রাসূল তাকে তিনশো অশ্বারোহী বাহিনীর আমীর নির্ধারণ করে কুরাইশের বাণিজ্যিক কাফেলার উদ্দেশ্যে সাগর-তীরে প্রেরণ করেন। নির্দেশ পেয়ে সঠিক সময়ে সাথিদের নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন আবু উবাইদা।
কিন্তু পৌঁছুনোর আগেই পথিমধ্যে পাথেয় সংকট দেখা দেয়। আবু উবাইদা বাহিনীর মুজাহিদদের সবার পাথেয় একত্রিত করতে বলেন। সবার পাথেয় একত্রিত করা হলে দেখা গেল সবটুকু দিয়ে মাত্র একটি পাত্র পূর্ণ হয়েছে। এটা দিয়ে তারা প্রথম দিকে খুব অল্প পরিমাণে আহার করতে থাকেন। শেষে প্রত্যেকের ভাগ্যে জুটতে থাকল মাত্র একটি করে খেজুর। সংকটময় মুহূর্ত বাহিনীকে গ্রাস করে; কিন্তু কোনো অভিযোগ কিংবা আপত্তি ছাড়া সবাই এই পরিস্থিতি মেনে নেন। আমীরের কথার প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে একটি খেজুর খেয়েই তারা পার করেন রাতদিনের অধিকাংশ সময়।[১৭১]
জাবির বলেন—‘আমরা শিশুদের মতো করে একটা খেজুর চুষে তারপর পানি খেতাম। এটা দিয়েই আমাদের একদিন আর এক রাত তুষ্ট থাকতে হতো।’[১৭২] ওয়াহাব ইবনু কাইসান জিজ্ঞেস করলেন, 'এই একটা খেজুর আপনাদের কী কাজে আসত?' তিনি বললেন, 'এই একটা খেজুরের মর্ম তখন অনুভব করলাম, যখন এটাও শেষ হয়ে গেল!'[১৭৩]
বাহিনীর মুজাহিদদের এক সময় গাছের পাতা খেয়ে থাকতে হয়েছে। জাবির বলেন—‘আমরা লাঠি দিয়ে পাতা পেড়ে তা পানিতে ভিজিয়ে খেয়ে নিতাম।' ফলে এই বাহিনীর নাম দেওয়া হয়েছিল 'পত্রভোজী বাহিনী'। এই করুণ অবস্থা কাইস ইবনু সাআদ-কে ভীষণ নাড়া দেয়। এই বাহিনীরই একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন তিনি। দানবীর পরিবারের কৃতী সন্তান। পরপর তিন দিন তিনটি করে উট জবাই দিয়ে তিনি সাথিদের খাওয়ান। তৃতীয় দিনের পরে আবু উবাইদা তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন।
খিদের কষ্ট যখন তুঙ্গে, চেহারাগুলো হয়েছে মলিন, সবার থেকে নেওয়া হয়েছে ত্যাগের ইমতিহান, এবার নেমে এলো আল্লাহর সাহায্য। সমুদ্রের এক উদগীরণে বের হলো বিরাট এক মাছ। সাগরের ঢেউ মাছটাকে নিয়ে এল তীরে। জাবির এই বিশাল আকারের আশ্চর্য মাছের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমরা সাগর-তীরে ঘুরে ফিরছিলাম। হঠাৎ আমাদের সামনে উঠে এলো বিশাল আকারের বালির টিলার মতো একটি মাছ। কাছে এসে দেখে বুঝতে পারলাম, আমাদের ভাষায় বিশাল এই মাছটিকে বলা হয় আম্বার।
আবু উবাইদা প্রথমে বললেন, 'এটা তো মৃত!' পরক্ষণেই বললেন, 'না; তোমরা এটা খেতে পারবে, কারণ, আল্লাহর রাসূল তোমাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় পাঠিয়েছেন। তোমরা এখন অপারগ, কাজেই খেতে পারবে।'
এরপর আমরা সেখানে একমাস অবস্থান করেছি। আমরা তিনশোজন এটা থেকেই প্রতিদিন আহার করতাম। ক্ষুধার আতিশয্যে যে আমরা শীর্ণ হয়ে পড়েছিলাম, সেই আমরা এখন যেন মুটিয়ে গেছি। এ সময়টাতে আমরা আম্বারের দুচোখ থেকে বড় কলস দিয়ে তেল উঠাতাম, আর একপাশ থেকে ষাঁড়ের আকৃতির মতো বড় অংশের গোশত কাটতাম।
আবু উবাইদা আমাদের মধ্য থেকে তেরোজন মুজাহিদকে বেছে নিয়ে আম্বারের চোখের কোটরে বসিয়ে সেখান থেকে চর্বি তোলেন। মাছটা এত বড়—আমাদের একজন তো সবচেয়ে বড় উটটাতে আরোহণ করে এটার নিচের ফাঁক দিয়ে চলাচল করেছে।[১৭৪] দীর্ঘ এক মাস পর মাছের অবশিষ্ট গোশত পাথেয় হিসেবে নিয়ে আমরা মাদীনায় ফিরে আসি।[১৭৫]
আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি বললেন, 'কী ব্যাপার, দেরি হলো যে?' আমরা কুরাইশের বাণিজ্যিক কাফেলার অনুসরণ করার কথা বলে আম্বারের কথা উল্লেখ করলাম।[১৭৬] নবিজি বললেন, 'এই রিযিক আল্লাহ তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন। এর গোশত কি তোমাদের কাছে আছে? থাকলে আমাদেরও খাওয়াও।' আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে এর গোশত পাঠানোর পর তিনি আহার করেছেন।”[১৭৭]
প্রাধান্যযোগ্য মত অনুযায়ী এই অভিযান প্রেরিত হয়েছিল হুদাইবিয়া সন্ধির পূর্বে; কিন্তু ইবনু সাআদ[১৭৮] যে বলেছেন, ৮ম হিজরির রজব মাসের কথা, তা সঠিক নয় দু কারণে:
১. আল্লাহর রাসূল হারাম মাসে কোনো অভিযান প্রেরণ করেননি।
২. ৮ম হিজরির রজব মাস হুদাইবিয়া সন্ধির নিকটতম সময়।[১৭৯]
ইবনু সাআদ ও ওয়াকিদি[১৮০] বর্ণনা করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল এই সাহাবিদের প্রেরণ করেছিলেন জুহাইনা গোত্রের একটা গ্রামের দিকে।' ইবনু হাজার আসকালানি বলেন,[১৮১] ‘এটা বিশুদ্ধ বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, হতে পারে জুহাইনার একটি গ্রামের দিকেই যাচ্ছিলেন, পথে কুরাইশের বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে দেখা হয়েছিল।' আবার এটাও হতে পারে যে, সাহাবিগণ শুধু কাফেলার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন, যুদ্ধ নয়; বরং উদ্দেশ্য ছিল জুহাইনা থেকে রক্ষা করা। মুসলিমের বর্ণনা এই কথাকেই সমর্থন করে।[১৮২]
অভিযানের শিক্ষণীয় দিকসমূহ:
সাথিদের পাথেয় একত্রিত করে সকল মুজাহিদদের মাঝে সমানভাবে বণ্টন করা ছিল আবু উবাইদা-এর প্রাজ্ঞচিত একটি কাজ। উদ্দেশ্য—কঠিন মুহূর্ত সবাই অনুভব করা। এটা কার্যত তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছেই একাধিকবার শিখেছেন।
দুর্ভিক্ষের সময় কাইস বিন সাআদ বিন উবাদা-এর বদান্যতা। তিনি চেষ্টা করেছেন কীভাবে সাহাবিদের সময়গুলো সহজ করা যায়। ওয়াকিদির বর্ণনায় আছে, ‘কাইস বিন সাআদ এক জুহানি লোকের কাছ থেকে উট ধার নিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে আবু উবাইদা তাকে নিষেধ করে বললেন, 'তুমি কি তোমার দায়িত্ব রক্ষা করতে পারবে, অথচ তোমার কাছে এখন কোনো সম্পদ নেই।'[১৮৩] আবু উবাইদা মূলত তার প্রতি দয়ার্দ্রই হয়েছিলেন।[১৮৪]
কাইস উট জবাই করা শুরুও করেছিলেন। আবু উবাইদা নিষেধ করলে তিনি বলেন—‘প্রিয় আমীর, আপনি জানেন না, আবু সাবিত ঋণ পরিশোধ করেন, অভাবির বোঝা বহন করেন, দুর্ভিক্ষের সময় খাওয়ান; অথচ সেই তিনি মুজাহিদদের জন্য ব্যয় করা ঋণের খেজুর পরিশোধ করবেন না, তা কী হয়?’[১৮৫]
কাইস আসলে জুহাইনা গোত্রের এক লোকের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন, তার কাছ থেকে নেওয়া প্রতিটি উটের বদলায় মাদীনার নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুর পরিশোধ করবেন। জুহানি লোকটাও এতে রাজি হয়েছিল। এ কারণে কাইস আবু উবাইদাকে বর্ণিত কথাটি বলেছিলেন।
কাফেলা ফিরে আসার পর কাইসের বাবা সাআদ বিন উবাদা যখন জানতে পারলেন, ছেলের সম্পদ নেই বলে আবু উবাইদা তাকে ঋণ নেওয়া থেকে বারণ করেছেন, তখন তিনি কাইস-কে বাগানের এক চতুর্থাংশ দিয়ে দেন। যা থেকে প্রতি মৌসুমে ৫০ ওয়াসাক (মাপের একটি পরিমাণ) খেজুর আসত।[১৮৬]
হালাল ও হারাম: এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী ক্ষুধার চরম সীমায় পৌঁছে ছিলেন। সফরের পথে কঠিন মুহূর্তে পূর্ণ একদিনের জন্য প্রত্যেক সাহাবি পেতেন মাত্র একটি করে খেজুর। এ করুণ অবস্থায় জুহানি গোত্রের পাশ অতিক্রমের সময় তাদের খাবার ছিনিয়ে নেবার চিন্তাও সাহাবিদের মাথায় আসেনি। যেমনটি স্বাভাবিক ছিল জাহিলি যুগে। কারণ, এরা মুসলিম; ইসলামের উন্নত চেতনায় উদ্ভাসিত অনন্য জাতি। তারা অন্যের সম্পদ হরণ নয়; বরং রক্ষণে আদিষ্ট। এ সময়টাতেও তারা আল্লাহ তাআলার শেখানো হালাল হারামের মাঝে পার্থক্যের বিবেকটাকে সজাগ রেখেছিলেন।[১৮৭]
সাগরের মৃত খাওয়া জায়েয:
ঘটনা প্রমাণ করছে সাগরের মৃত খাওয়া জায়েয। এটা কুরআনের কথার অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ বলছেন, 'তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী।' (সূরা মাইদাহ: ৩) কেননা, অন্য আয়াতে তিনি বলছেন, 'তোমাদের জন্য সাগরের শিকার ও খাবার হালাল, তোমাদের ও বাহনের জন্য ভোগ্য স্বরূপ।' (সূরা মাইদা: ৯৬)
আবু বাকর সিদ্দীক, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস ও একদল সাহাবি থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত, 'সাগরের শিকার হলো, তা থেকে যা শিকার করা হয়, আর খাবার হলো মৃত প্রাণী।'
সুনান গ্রন্থসমূহে ইবনু 'উমার থেকে মারফু ও মাওকুফ উভয় সূত্রে বর্ণিত আছে, 'আমাদের জন্য দুটি মৃত ও দুটি রক্ত হালাল করা হয়েছে। দুটি মৃত হলো মাছ ও পঙ্গপাল, আর দুটি রক্ত হলো কলিজা ও প্লীহা।[১৮৮] (সনদ হাসান)
আবার আল্লাহর রাসূলেরও সেই মাছটি থেকে খাওয়া প্রমাণ করে সাগরের মৃত খাওয়া শারী'আহসিদ্ধ।
ইমাম নববি উল্লেখিত কিছু বিধান:
ইমাম নববি বলেন—'এই হাদীস থেকে জানা যায়, যোদ্ধাদের জন্য শিকার করা ও নিজেদের সম্পদ গ্রহণের জন্য বের হওয়া জায়েয। বাহিনীতে অবশ্যই এমন একজন আমীর থাকতে হবে, যিনি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করবেন, তার আদেশ-নিষেধ পালিত হবে, আর নিশ্চয় আমীর হতে হবে শ্রেষ্ঠজন অথবা তাদের মধ্যে যিনি উত্তম। জনসংখ্যা কম হলে তাদের দায়িত্ব হলো নিজেরা একজন আমীর নির্ধারণ করে তার কথা মেনে চলবে। আমাদের সাথি ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বলেছেন, 'মুসাফিরদের জন্য বারাকাহর আশায় নিজেদের পাথেয় একত্রিত করা মুস্তাহাব। এতে সম্পর্ক ভালো থাকবে, কেউ বিশেষিত হবে না, কেউ খাবে কেউ খাবে না, এমনও হবে না। বাকি আল্লাহই ভালো জানেন।'[১৮৯]
দাওমাতুল জান্দালের উদ্দেশে অভিযান:
আল্লাহর রাসূলের প্রেরিত অভিযানগুলোর মধ্যে এটি ছিল মাদীনা থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে। সিরিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল দাওমাতুল জান্দালের জনপদটি। দামেস্কের তুলনায় মাদীনা থেকে তিনগুণ দূরত্বে এই দাওমাতুল জান্দালের অবস্থান। আরব ও রোমের একদম মধ্যবর্তী মানচিত্রে অবস্থিত ছিল এই অঞ্চলটি। কালবের বড় গোত্রের লোকদের বাস এখানেই। প্রতিবেশী রোম ও খ্রিস্টানদের প্রভাবে এরাও খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিল। তদানীন্তন বিশ্বের পরাশক্তি রোমানদের মাঝে প্রভাব বিস্তারের জন্যেই আল্লাহর রাসূল ﷺ এই অভিযান প্রেরণ করেন।
এই অভিযানের আমীর আবদুর রাহমান ইবনু আউফ জান্নাতের সুবার্তা প্রাপ্ত সাহাবিদের একজন। ইসলামি দাওয়াতি অঙ্গনে একজন বড় দাঈ। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে সিদ্দীক-এর সংসর্গ গ্রহণ করে আসছেন। সবদিক থেকেই নেতৃত্বের যোগ্য ছিলেন তিনি।
এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক বিবেচ্য ছিল। ১. দাওয়াত, ২. যুদ্ধ। এজন্যই আবদুর রাহমান ইবনু আউফকে নির্বাচন করা হয়, যিনি ইসলাম গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই অব্যাহত চলমানতায় দীপিত হয়েছেন ইসলামি চেতনায়।[১৯০]
এই অভিযান সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন—‘আল্লাহর রাসূল আবদুর রাহমান ইবনু আউফকে ডেকে বললেন, 'পাথেয় গুছিয়ে নাও, তোমাকে আজই কিংবা আগামীকাল একটি অভিযানে পাঠাব, ইনশাআল্লাহ।'
আমি মনে মনে বললাম, 'আমি অবশ্যই কাল আল্লাহর রাসূলের সাথে সালাত আদায় করে ইবনু আউফকে দেওয়া উপদেশ মনোযোগ দিয়ে শুনব।' পরদিন সালাত আদায় করে দেখলাম, এখানে আছেন আবু বাকর, 'উমার, কয়েকজন মুহাজির সাহাবি ও আবদুর রাহমান ইবনু আউফ। আবার দেখলাম, আল্লাহর রাসূল তাকে দাওমাতুল জান্দালের উদ্দেশে রাতে সফরের নির্দেশ দিয়ে প্রথমে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে বলছিলেন। এরপর নবিজি আবদুর রাহমানকে বললেন, 'কী ব্যাপার, তুমি পেছনে রয়ে গেছ কেন?'
বুঝতে পারলাম, তার মুজাহিদ সাথিরা রাতের শেষ প্রহরে রওয়ানা করেছেন। তাদের সংখ্যা ছিল সাতশো। ইবনু আউফ বললেন, 'আমার গায়ে দেখুন সফরের পোশাক জড়ানো। আসলে আমি চাচ্ছিলাম আপনার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎটা হয়ে যাক।'
আল্লাহর রাসূল তাকে সামনে বসিয়ে নিজ হাতে পাগড়ি খুললেন। তারপর বেঁধে দিলেন একটা কালো পাগড়ি। শেষে পাগড়ির ঝুলন্ত অংশ কাঁধের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'ইবনু আউফ, সামনে থেকে এভাবেই পাগড়ি বাঁধবে। আর শোনো, আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর নামে জিহাদ করবে। আল্লাহকে যারা অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়বে। ফসল নষ্ট করবে না, ধোঁকা দেবে না, শিশুদের হত্যা করবে না।'
এরপর নবিজি হাত প্রসারিত করে বলেন—'প্রিয় সাহাবিগণ, পাঁচটি বিষয় আপতিত হবার আগেই এগুলোকে তোমরা ভয় করো। যখন কোনো জাতির পরিমাপ কমে যায়, তখন আল্লাহ তাদের অভাব-অনটন দিয়ে পাকড়াও করেন, ফল-ফসল কমিয়ে দেন, হয়তো তারা ফিরে আসবে। কোনো জাতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তাদের ওপর শত্রুদের চাপিয়ে দেন। কোনো জাতি যাকাত দেওয়া বন্ধ করলে আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেন; চতুষ্পদ প্রাণীরা না থাকলে আসলে বারিধারা বন্ধ হয়ে যেত। কোনো জাতির মাঝে অশ্লীলতা প্রকাশ পেলে আল্লাহ তাদের ওপর মহামারি চাপিয়ে দেন। কোনো জাতি আল্লাহর বিধান ভিন্ন অন্য কিছু দিয়ে বিচার করলে আল্লাহ তাদের মাঝে বিভক্তি অনিবার্য করেন। ফলে তারা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।'[১৯১]
নবিজির কথা শেষে ইবনু আউফ রওয়ানা করে সাথিদের সঙ্গে মিলিত হন। রাতদিনের বিভাজন ভুলে অবিশ্রান্ত পথ চলে তারা দাওমাতুল জান্দালে পৌঁছেন। জনপদে প্রবেশ করে অধিবাসীদের ইসলামের দিকে ডাকেন। এ ধারা অব্যাহত থাকে তিন দিন পর্যন্ত। প্রথম দিকে ওরা বলছিল, কথা হবে শুধু তরবারি দিয়ে। পরে তৃতীয় দিনে এসে আসবাগ বিন আমর কালবি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গোত্রপ্রধান ও খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। ইবনু আউফ আসবাগের ইসলাম গ্রহণের খবর দিয়ে রাফি বিন মাকীসকে মাদীনায় প্রেরণ করেন। সাথে চিঠিতে নিজের বিয়ের ইচ্ছেটাও জানান।
আল্লাহর রাসূল চিঠি লিখে আসবাগের মেয়েকে বিয়ে করতে বলেন। ইবনু আউফ বিয়ে সম্পন্ন করে তাকে উঠিয়েও নেন। তাদের ঔরসে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল আবু সালামাহ বিন আবদুর রাহমান। এই ছেলের দিকে সম্বোধিত করে ইবনু আউফকে আবু সালামা উপনামে ডাকা হতো। ওয়াকিদি বলেছেন, ৬ষ্ঠ হিজরির শাবান মাসে পরিচালিত হয়েছিল এই অভিযান।[১৯২]
অভিযান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
১. সাহাবিদের প্রতি আল্লাহর রাসূলের কোমলতা ও মমতা কেমন ছিল, তার নমুনা আছে সীরাতের পরতে পরতে। এখানকার দৃশ্যে তিনি ইবনু আউফের মাথায় নিজ হাতে কালো পাগড়ি বেঁধে দিয়েছেন। এই রকম টুকরো কোমলতা ও মমতা সাহাবিদের অভ্যন্তরে এক অবিনাশী মানসিক শক্তি সৃষ্টি করত, ফলে দীনের সেবায় নিজেদেরকে পূর্ণ শক্তিতে প্রকাশ করতেন তারা। সেনাপতি ও সেনাদের মধ্যকার ভালোবাসার আচরণ, কার্যসিদ্ধি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নেও বিরাট ভূমিকা রাখে।[১৯৩]
২. আবদুর রাহমান ইবনু আউফের বাহিনী ছিল মৌলিক বিশ্বাসে সমৃদ্ধ। দীর্ঘ মরুপথ মাড়িয়েছেন আল্লাহর বিধিবিধান ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। অন্য দিকে আল্লাহর রাসূল তাদেরকে জিহাদের উদ্দেশ্য ও বিধান-নিষেধ ভালোভাবে শিখিয়েছেন। স্পষ্ট করেছেন—মুহাম্মাদ-এর নামে কোনো জিহাদ নেই, তিনি তো আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। মনে রাখতে হবে, ইসলামি জিহাদ নেতৃত্ব, রাষ্ট্র, গোত্র কিংবা প্রতাপশালী কোনো বাহিনী প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিধিবদ্ধ হয়নি। এজন্যই নবিজি বলেছেন, 'আল্লাহর নামে জিহাদ করো'।
এটি ছিল সেই আল্লাহর বাহিনী, যাদেরকে তিনি শুকনো মরুভূমিতে তীব্র তৃষ্ণার সময় তাওহীদের আকীদার মাধ্যমে জীবনী শক্তি সঞ্চার করেছেন।[১৯৪] আর আল্লাহর রাস্তায় তাদের এই পদক্ষেপের একটিমাত্র লক্ষ্য, সেটা আল্লাহই বলে দিচ্ছেন, 'বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু, জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই, আমি এজন্যই আদিষ্ট এবং আমিই প্রথম মুসলিম।' (সূরা আনআম: ১৬২-১৬৩)
নবিজি বলেছেন, 'কাফিরদের সাথে লড়াই করবে। জাহিলি সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো জিহাদ নেই।' জোয়ান মুজাহিদে সমৃদ্ধ শক্তিশালী এই বাহিনী কেবল কাফিরদের বিরুদ্ধেই জিহাদ করেছেন।[১৯৫]
৩. আল্লাহর রাসূল ইবনু আউফ-কে গানীমাতের সম্পদে অনধিকার চর্চা বা আত্মসাৎ করতে নিষেধ করেছেন। 'গুলূল' হলো বণ্টনের আগেই গানীমাতের সম্পদ থেকে কিছু নেওয়া। আরও নিষেধ করেছেন প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে প্রতারণা এবং শিশুদেরকে হত্যা থেকে। ইসলামি আদাবুল জিহাদের এটাই নির্যাস। লড়াই বাহ্যত কঠোরতা ও অনমনীয়তা; কিন্তু সেই মুসলিম জাতি, আল্লাহ যাদের অন্তর পবিত্র করেছেন অন্যায় হস্তক্ষেপ আর হিংসা থেকে, তাদের কাছে জিহাদ হলো সত্য প্রতিষ্ঠা ও বাতিলকে বিনাশের নাম। এর মধ্যে নিহিত আছে ভ্রান্তদের থেকে সত্যের অনুসারীদের রক্ষা করা। এটা তাদের অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এ কারণে ইসলামের জিহাদ ছিল এমন নীতিমালায় জড়ানো, যা একজন মানুষকে সামগ্রিকভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ে শক্তিশালী করত, আবৃত করত অনুগ্রহ ও মমতায়।[১৯৬]
৪. আবদুর রাহমান ইবনু আউফ ছিলেন এ উম্মাহর একজন সাইয়িদ, একনিষ্ঠ দাঈ। তার মানবসত্তায় বিদ্যমান ছিল সহিষ্ণুতা, প্রজ্ঞা, সমৃদ্ধ চেতনা, ঋদ্ধ অভিজ্ঞতা ও বহুমুখী প্রতিভা। প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করে মর্যাদায় অন্য অনেককে ছাড়িয়ে গেছেন বহুদূর। আত্মিক ও মানবিক এই শক্তিমত্তার কারণে তিনি চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে ছিলেন বদ্ধপরিকর। হৃদয়ের অভিব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তর সজাগ ছিলেন তিনি, মনকে নিজেই পরিচালনা করতেন, আর তাই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে প্রখর চিন্তাশক্তি ও দৃঢ় পদক্ষেপ তাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তার প্রতিভায় সফল হয়েছে মুসলিম বাহিনী। সবিশেষ আল্লাহর রাসূলের একনিষ্ঠ পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানের ফলে তার এই ত্যাগ ও প্রচেষ্টা সাফল্য স্পর্শ করেছে।
৫. আবদুর রাহমান ইবনু আউফ-এর হাতে দাওমাতুল জান্দালে বনু কালবের নেতা আসবাগ বিন আমরের ইসলাম গ্রহণ; জা'ফার বিন আবি তালিবের হাতে হাবাশার বাদশা নাজ্জাশির ইসলাম গ্রহণ; আর মুসআব বিন 'উমাইর-এর দাওয়াতে আউস ও খাযরাজের নেতা ও সাধারণ মানুষের ইসলাম গ্রহণ ইতিহাসে স্মরণীয় অভিযোজন। এই মহান তিন ব্যক্তিত্ব ইসলামের প্রথম যুগের দিশারী, মাক্কা মুকাররামায় প্রথম ইসলামি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা।
ইনিই আবদুর রাহমান ইবনু আউফ এগারোটা আঘাত তাকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, তবুও তিনি তার বিজয়ী বাহিনী নিয়ে দক্ষিণ আরব উপদ্বীপে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। উম্মাহর জামা'আতে যুক্ত করেছেন বহু মানুষকে। উদ্দেশ্যে, দাওমাতুল জান্দাল এলাকাটিকে নতুন ইসলামি ঠিকানায় রুপান্তরিত করা। মুসলিমরা এই দুর্গ থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার আসলে কোনো অবকাশ নেই। এটি এমন একটি স্থান, নিকটতম ভবিষ্যতে ইসলামের জন্য যেখানে আরব ও রোমানরা মুখোমুখি হবে।[১৯৭]
৬. এবারই প্রথম ইসলাম তার সীমানার বাইরে বিচারকার্য পরিচালনা করছে। একই ভূখণ্ডে মুসলিম ও খ্রিস্টানরা বসবাস করছে। ইসলাম গ্রহণকারীদেরকে দীনের বিধানের ওপর অভ্যস্ত করে তোলা হচ্ছে আর খ্রিস্টানদের থেকে নেওয়া হচ্ছে জিযিয়া বা কর। এই বিজয় সাহাবিদের সামনে মূলত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। যেখানে তারা অচিরেই স্থানান্তরিত হবেন, অভিযান পরিচালনা করবেন—ইরাক সিরিয়া এবং রোম ও পারস্যের কেন্দ্রে। মানুষ মুক্তি পাবে যুগযুগান্তর ধরে চলে আসা নানাবিধ অন্ধকারের কবল থেকে।[১৯৮]
৭. দাওমাতুল জান্দালের কর্ণধার, বনু কালবের নেতার মেয়েকে ইবনু আউফ বিয়ে করে সেখানকার নতুন মুসলিম নেতার সঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্র মাদীনার সম্পর্ক মজুবত করেছেন। তার আশ্রয়স্থলকে যুক্ত করেছেন ইসলামি রাষ্ট্রের সঙ্গে। আল্লাহর রাসূল-ও বেশ আগ্রহী ছিলেন ইবনু আউফের সঙ্গে নেতার মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে। কেননা, ইসলামের দিকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে এর রয়েছে বিরাট ভূমিকা। কারণ, এই বৈবাহিক বন্ধন একে অপরকে নৈকট্যশীল করবে, যে নৈকট্য এক সময় গোত্রের সবাইকে টেনে আনবে ইসলামের দিকে।[১৯৯]
চার. বনু লিহইয়ান, আল গাবাহ ও অন্যান্য এলাকায় অভিযান
খন্দক যুদ্ধের পর সম্মিলিত বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। এরপরই পালটে যায় মুসলিমদের ইতিহাসের মোড়। প্রতিরোধী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এখন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ফলে সময় আসে বনু লিহইয়ানকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার। কারণ, এরাই খুবাইব ও তার সাথিদের পাহাড়ি ঢলের দিন প্রতারিত করেছিল। এদেরকে শায়েস্তা করতে আল্লাহর রাসূল দুইশো সাহাবির একটি বাহিনী নিয়ে অভিযানে বের হন। সময়টা ছিল হিজরি ৬ষ্ঠ বছরের রবিউল আউয়াল কিংবা জুমাদাল উলা মাস।[২০০]
ক. শত্রুকে বিভ্রান্ত করা:
মাদীনা থেকে হুজাইলের বনু লিহইয়ান গোত্রের দূরত্ব ছিল দুইশো মাইলেরও বেশি। মরু সফরের ক্ষেত্রে এই দূরত্বটা অনেক বেশি। যেকোনো মুসাফির কাফেলাকে বেগ পেতে হবে; কিন্তু যে সাহাবিগণ এদের হাতে গাদ্দারির শিকার হয়েছেন, আল্লাহর রাসূল চাচ্ছিলেন এই গাদ্দার গোত্রটি থেকে প্রতিশোধ নিতে, যাদের কাছে প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য নেই।
অভিয়ানের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূলের অভ্যাস ছিল শত্রুকে বিভ্রান্ত করা। এ ক্ষেত্রে অভিনব পন্থা তিনি অবলম্বন করতেন। মূল লক্ষ্যের কথা গোপন রেখে প্রকাশ করতেন অন্য কথা। এ অভিযানের শুরুতেও আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের নিয়ে দক্ষিণ দিকে অভিমুখী হন, অথচ বনু লিহইয়ানের জনপদটা ছিল উত্তর সীমান্তে।
রওয়ানা করার আগে নবিজি এলান করলেন দক্ষিণ দিকের। যেন তিনি সিরিয়া সীমান্তে হামলা করতে চাচ্ছেন। সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে তিনি যখন উত্তরের দিকে অভিমুখী হন, তখনই কেবল জানা যায়, নবিজির উদ্দেশ্য হলো বনু লিহইয়ান। বাতরা নামক স্থানে এসে আল্লাহর রাসূল দক্ষিণ থেকে ঘুরে উত্তর দিকের পথ ধরেন। এখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলতে শুরু করেন বনু লিহইয়ানের পথে।[২০১]
খ. লিহইয়ানিদের পলায়ন: বনু লিহইয়ান ছিল সতর্ক, সজাগ ও চতুর। গুপ্ত খবর সংগ্রহের জন্য ওরা পথে পথে গোয়েন্দা ছড়িয়ে রেখেছিল। এদিকে আল্লাহর রাসূল তাঁর বাহিনী নিয়ে ওদের জনপদের কাছাকাছি কেবল এসেছেন, তার আগেই ওরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে আত্মগোপন করে। কারণ, গোয়েন্দারা ফিরে এসে আল্লাহর রাসূলের বাহিনী সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করেছিল।
আল্লাহর রাসূল ওদের জনপদে আসার পর কিছু সাহাবিকে গেরিলা হামলা করার জন্য পাঠিয়ে দেন। উদ্দেশ্য, এ গোত্রের গাদ্দারদের পিছু নেওয়া, যে কাউকে পেলে ধরে নিয়ে আসা। নবিজির এই গেরিলা বাহিনী পূর্ণ দুদিন তন্নতন্ন করে চারপাশে এদের খুঁজে ফেরেন; কিন্তু কোথাও এদের সামান্য নিশানাটুকুও পান না। ওদের অন্তরে ভীতি সঞ্চারিত করার জন্য আল্লাহর রাসূল এখানে দুদিন অবস্থান করেন। শত্রুদের কাছে যেন মুসলিমদের শক্তির ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়। ওরা যেন বুঝতে পারে, মুসলিমরা এখন এমন বলীয়ান, চাইলে তারা শত্রুদের দোরগোড়ায় এসে হুমকি দিতেও সক্ষম।[২০২]
গ. যুদ্ধের সময় আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের নিয়ে মাক্কার খুব কাছে উপস্থিত হয়েছেন। এটাকে সুযোগ ভেবে তিনি স্থির করলেন, এই বাহিনী নিয়ে কৌশলে মাক্কার মুশরিকদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করবেন। এ লক্ষ্যে বাহিনী নিয়ে আসফান উপত্যকায় শিবির স্থাপন করেন। এখানে এসে দশজন অশ্বারোহীর আমীর নির্ধারণ করেন আবু বাকর সিদ্দীককে। মাক্কার লোকদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তাকে মাক্কার পথে সামনে এগোতে বলেন।
আবু বাকর সিদ্দীক অশ্বারোহী সাথিদের নিয়ে কুরাউল গামীম পর্যন্ত এগিয়ে যান। এটি মাক্কার অতি নিকটবর্তী জায়গা। কুরাইশের কানে মুসলিম অশ্বারোহী দলটির খুরধ্বনি ঝংকার তোলে। ওদের মনে প্রবল ধারণা জেঁকে বসে যে, নবিজি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইচ্ছায় এসেছেন। স্বাভাবিক ওদের ভঙ্গুর মনে আতঙ্ক দানা বাঁধে। মাত্র দশ অশ্বারোহীর এই বাহিনী দিয়ে এইটুকুই চেয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল।
আবু বাকর সিদ্দীক সাথিদের নিয়ে কুরাউল গামীমে পৌঁছার পর বুঝতে পারেন, মাক্কার লোকদের মাঝে তাদের খবর হয়ে গেছে। মাক্কাবাসীর মাঝে সঞ্চারিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত আতঙ্ক। ফলে তিনি আর বিলম্ব না করে নিরাপদে আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে আসেন। নবিজিও বাহিনী নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন মাদীনায়।[২০৩]
ঘ. শহীদদের প্রতি মমতা
আল্লাহর রাসূল সাথিদের নিয়ে ফিরছিলেন। গুরান নামক স্থানে এসে হুজাইলের বিশ্বাসঘাতকতায় শহীদ হওয়া সাহাবিদের সমাধিস্থল চোখে পড়ে। এখানে মাটির নিচে শুয়ে থাকা সাহাবিদের প্রতি মমতায় ভরে ওঠে তাঁর নবিমন। সবাইকে থামিয়ে সাহাবিদের জন্য বিগলিত হৃদয়ে দুআ করেন তিনি।[২০৪]
দুই. গাযওয়াতুল গাবাহ
মাদীনার পার্শ্ববর্তী বনে নবিজির উটের পাল চরানো হতো। দায়িত্বে ছিলেন যার ইবনু আবি যার। তার কাজে সহযোগিতা করতেন স্ত্রী লাইলা। আল্লাহর রাসূল বনু লিহইয়ান থেকে ফেরার পর মাত্র কয়েকটা রাত গত হয়েছে। এরই মধ্যে উয়াইনাহ বিন হিস্স্স ফাযারি গাতফানের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে আল্লাহর রাসূলের এই উষ্ট্রী পালের ওপর হামলা করে বসে। কয়েকটি গাভীন উটনীর পাশে বাচ্চা উটও ছিল তাতে। আর ডাকাতদের সংখ্যা ছিল চল্লিশজন।
এরা যার ইবনু আবি যারকে হত্যা করে, বন্দি করে তার স্ত্রী লায়লাকে। সবশেষে প্রায় বিশটি উট তারা হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। বাতাসের বেগে আল্লাহর রাসূলের কাছে এর খবর চলে আসে। অতি দ্রুত পাঁচশত সাহাবির বাহিনী নিয়ে তিনি এদের পিছু ধাওয়া করেন। মাদীনা সুরক্ষার দায়িত্বে রেখে যান সাআদ বিন উবাদাহ-কে। তাঁর সহযোগী হিসেবে নির্ধারণ করেন ৩০০ সাহাবি।
জি কারাদ-এর একটি পাহাড়ের পাদদেশে আল্লাহর রাসূল শত্রুদের ধরে ফেলেন। ওদের কয়েকজনকে হত্যা করে উদ্ধার করেন ছিনতাই হওয়া উটগুলো।[২০৫]
এ যুদ্ধে সালামা ইবনুল আকওয়া বীরত্বের অনুপম দৃষ্টান্ত প্রকাশ করেন। বিশেষ করে আল্লাহর রাসূলের মূল বাহিনী শত্রুদের কাছে পৌঁছাবার আগে; তখন তিনি বনাঞ্চলের ভেতর রাখালদের সঙ্গে ছিলেন। পরে তিনি একাই ডাকাতদের ব্যস্ত রেখেছেন বিরতিহীন তির নিক্ষেপ করে। বলতে হয়, সময়ের একজন অন্যতম দক্ষ তিরন্দাজ ছিলেন তিনি। অশ্বারোহী বাহিনীর আগেই একক প্রচেষ্টায় ছিনতাই হওয়া উটগুলোর একটা অংশ তিনি মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।[২০৬]
যার ইবনু আবি যারকে হত্যার পর তার স্ত্রীকে বন্দি করেছিল গাতফানিরা। আল্লাহর রাসূলের পেছনে একটা উটনীতে নিরাপদেই তিনি মাদীনায় ফিরে আসেন। তিনি মান্নত করে বলেছিলেন, 'আল্লাহ তাকে আপতিত এই বিপদ থেকে মুক্তি দিলে তিনি এই উটনীকে মুক্ত করবেন।'
আল্লাহর রাসূল তার মান্নতের কথা শুনে মুচকি হাসলেন। হাসির রেশ রেখেই বললেন, 'তুমি উটনীটাকে খুব মন্দ প্রতিদান দিয়েছ। (যে উটনীটা তোমাকে বহন করল, শত্রুদের হাত থেকে নিয়ে এলো বের করে, তার প্রতিদান হওয়া উচিত ছিল আল্লাহর নামে জবাই করা।) শেষে আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, 'আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো মান্নত নেই। তোমার মালিকানা বহির্ভূত কোনো ব্যাপারেও মান্নত নেই।'[২০৭]
খাইবার যুদ্ধের আগে, খন্দক যুদ্ধ ও বনু কুরাইযার পর আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়া এই যুদ্ধকে প্রতিশোধমূলক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়।[২০৮] এ ছাড়া কারাদ যুদ্ধের পরেও মুশরিকদের শায়েস্তা করার জন্য আল্লাহর রাসূলের নির্দেশিত অভিযান ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে। কিছু অভিযানে মুসলিমরা সফলতা অর্জন করেছেন, আর কিছুর মাধ্যমে বিস্তার করেছে প্রভাব। এগুলোর মধ্যে বিশেষ একটা হলো, উক্বাশা বিন মুহসিন পরিচালিত আল-গম্র অভিযান। ৬ষ্ঠ হিজরির রবীউল আউয়াল মাসে আল্লাহর রাসূল তাকে প্রেরণ করেন বনু আসাদের দিকে। তিনি গম্র নামক স্থানে গিয়ে দেখেন, কওমের লোকেরা পালিয়ে গিয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। পরে উক্বাশা ও সাথিরা ওদের গবাদি পশুকে টার্গেট করে ২০০ উট গানীমাত হিসেবে লাভ করেন। শেষে তারা নিরাপদে মাদীনায় ফিরে আসেন।[২০৯]
চলতি হিজরি সনের আরেকটি আলোচিত অভিযান হলো জিল কিসসার[২১০] উদ্দেশে মুহাম্মাদ বিন মাসলামার অভিযান। এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল বনু সা'লাবা ও উওয়ালের মাঝে ভীতি সঞ্চার করা। সাথে মাদীনার সীমান্তে কোনোভাবে হামলা করা থেকে সতর্ক করে দেওয়া। হিজরি ৬ষ্ঠ বছরের রবীউস সানি মাসে দশজন মুসলিম সাথি নিয়ে এদের উদ্দেশ্যে বের হন মুহাম্মাদ বিন মাসলামা। বনু সা'লাবার এলাকায় গিয়ে পৌঁছেন রাতের শুরুতে। মুসলিমদের এই ছোট্ট বাহিনী দেখে গোত্রের অন্তত একশজন এদের চারপাশ থেকে বেষ্টন করে ফেলে। রাতের অনেকটা সময়জুড়ে ওরা তির নিক্ষেপ করে। এরপর গ্রাম্যরা সাহাবিদের ওপর হামলা করে তাদের হত্যা করে। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা ভীষণ আহত হয়ে পড়েছিলেন। শত্রুরা চলে যাওয়ার পর একজন মুসলিম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাকে উঠিয়ে মাদীনায় নিয়ে আসেন।[২১১]
এদের পর আল্লাহর রাসূল আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহকে বনু সা'লাবার জনপদে প্রেরণ করেন। তিনি গিয়ে ওদের টিকিটিও খুঁজে পাননি। তবে ওদের কিছু গবাদী পশু গানীমাত হিসেবে লাভ করেন। এগুলো নিয়েই তিনি মাদীনায় ফিরে আসেন।[২১২]
এ বছরেই জুমাদাল উলা মাসে যাইদ বিন হারিসা-কে ৭০০ অশ্বারোহীর একটি বাহিনীর আমীর নির্ধারণ করে 'ঈসের[২১৩] দিকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য সিরিয়া থেকে ফিরে আসা কুরাইশের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা বধ করা। সাহাবিগণ তাদের ঘিরে ফেলে সবকিছু জব্দ করেন, বন্দি করেন কয়েকজনকে। বন্দিদের মাঝে আল্লাহর রাসূলের মেয়ে যাইনাবের স্বামী আবুল আ'স বিন রাবীও ছিলেন। এই নবি-জামাতার মা ছিলেন খাদীজা-এর বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদ।
এ বছরেরই শাবান মাস। আল্লাহর রাসূল জানতে পারেন বনু সাআদ বিন বাকরের লোকেরা খাইবারের ইয়াহুদিদের সাহায্য করার জন্য সেনা সমাবেশ ঘটাচ্ছে। নবিজি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। 'আলি-কে ১০০ মুজাহিদের একটি বাহিনীর আমীর নির্ধারণ করে এদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। 'আলি সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে কিছু পশু গানীমাত লাভ করে নিরাপদে মাদীনায় ফিরে আসেন।[২১৪]
ইয়াহুদিদের সাহায্য করার মনোভাব যারা পোষণ করত, এই অভিযান এদের সবার বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে। গোত্রগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছে মাদীনার গুপ্তচররা চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে পূর্ণ সজাগ। ওদের সমস্ত পদক্ষেপ মাদীনার পর্যবেক্ষণে রয়েছে।[২১৫] ইসলামি রাষ্ট্র খুব সূক্ষ্মভাবে শত্রুদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। নিরাপদ যুদ্ধ পরিকল্পনা আসলে এমনই হতে হয়।
আল্লাহর রাসূলের প্রেরিত এই সমস্ত অভিযান মুসলিম সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার দিকে প্রদর্শিত করছে। তা হলো—অবিরত শত্রুদের খবর সংগ্রহ ও তাদের ব্যাপারে সার্বিক জ্ঞান রাখা। আল্লাহর রাসূলের কাছে বিভিন্ন উৎস থেকে এই খবরগুলো আসত—অনুসন্ধানী টিম, মুসলিম গুপ্তচর, মুসলিমদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা ও চুক্তিবদ্ধ গোত্র থেকে। স্পষ্ট হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা কিংবা বহিরাগত বিষয় থেকে পলকের জন্যও উদাসীন হতেন না।[২১৬]
পাঁচ. উরানিয়ীনদের বিরুদ্ধে কুরায ইবনু জাবির ফিহরির অভিযান
এ বছরেই শাওয়াল মাসে উকাল ও উরাইনা গোত্রের একটি দল আল্লাহর রাসূলের কাছে আসে। তারা ইসলামের আলোচনা উঠিয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা পল্লি এলাকার মানুষ নই। ফলে মাদীনার পরিবেশ তাদের কাছে বৈরি মনে হয়। আল্লাহর রাসূল তাদের বলেন— তোমরা মধ্যম বয়সি উটের[২১৭] দুধ পান করো এবং ওগুলোর পেশাবের গন্ধ নাকে লাগাও। ওরা হাররা নামক স্থানে এসে ইসলামের পর আবার কুফুরিতে ফিরে যায়। রাখালকে হত্যা করে উটগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়।
আল্লাহর রাসূল এদের জঘন্য কাজের সংবাদ পেয়ে পেছনে বাহিনী প্রেরণ করেন।[২১৮] প্রেরিত সাহাবিগণ এদের ধরে নবিজির কাছে নিয়ে আসেন। পরে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে এদের চোখ তুলে হাত-পা উলটো দিক থেকে কেটে ফেলা হয়। সব শেষে মৃত্যু পর্যন্ত ফেলে রাখা হয় হাররার উত্তপ্ত স্থানে।
এই হাদীস বর্ণনাকারী কাতাদাহ বলেন, 'আমি জানতে পেরেছি, নবিজি এদের পরে সাদাকাহ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, বারণ করেছেন অঙ্গবিকৃতি করা থেকে।[২১৯]
আবু কিলাবাহ এই হাদীসে বলেন, 'এরা এমন গোত্র, যারা ডাকাতি করে হত্যা করেছে, আবার ঈমানের পর কুফুরি করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধও ঘোষণা করেছিল।[২২০]
জমহুর উলামায়ে কেরাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে এবং দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হলো- তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। (সূরা মাইদাহ: ৩৩)
এটি অবতীর্ণ হয়েছে এই উরানিয়ীনদের প্রেক্ষাপটেই।[২২১] অবশ্য এই আয়াত নাযিলের অন্য কারণের কথাও বর্ণিত আছে।[২২২] তবে আয়াতে শব্দের ব্যাপকতা কোনো নির্দিষ্ট কারণের সাথে বিশেষিত নয়। আয়াতের বিধান আমাদের কালেও বলবৎ আছে, কিয়ামাত পর্যন্ত থাকবে। ইসলামে ডাকাতির বিধানের বিদ্যমানতার ক্ষেত্রে অবশ্য মুসলিমরা এ বিষয়ে একমত যে, আয়াতটি চাই কাফির কিংবা মুসলিমদের ক্ষেত্রে নাযিল হোক না কেন, উপর্যুক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে—বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী—মুশরিকদের ক্ষেত্রে। এটি প্রমাণ করে আয়াতে শব্দের ব্যাপকতা থেকেই উদ্দেশ্য গ্রহণ করতে হবে, নাযিলের বিশেষ কারণের ভিত্তিতে নয়।
অঙ্গ বিকৃতির ব্যাপারটি রহিত হয়েছে; কিংবা তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর নবিজি উরানিয়ীনদের চোখ তুলে ফেলেছেন। তার এই ফায়সালা প্রমাণ করে না যে, ওরা রাখালদের চোখ তুলেছিল, ফলে আল্লাহর রাসূলও বদলাস্বরূপ তাদের চোখ তুলে ফেলেছেন, অঙ্গ বিকৃতি ছিল না; বরং উরানিয়ীনদের ওপর কার্যকর হয়েছে ডাকাতির বিধান।[২২৩] স্পষ্ট আয়াতও নাযিল হয়েছে এ ক্ষেত্রেই। মুয়াল্লি এই ডাকাতদের শাস্তির জন্য চারটি কারণ শনাক্ত করেছেন—
১. এরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
২. নিরপরাধ মানুষকে ভয় দেখিয়ে সৃষ্টি করেছে আতঙ্ক।
৩. রাখালকে হত্যা করে চরম ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছে।
৪. অন্যায়ভাবে তাদের মালিকানাধীন সম্পদ ছিনতাই করে পৃথিবীতে ত্রাস সৃষ্টির পাঁয়তারা করেছে।
এদের কাজের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি করা। ফলে এসব অপরাধের বিপরীতে অপরাধীদের ক্ষেত্রে চারটির যেকোনো একটি শাস্তি আবশ্যক হবে। তা হলো—হত্যা করা, শূলিতে চড়ানো, উলটো দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা, দেশান্তর করা। এভাবে ওরা আর কখনো এমন জঘন্য অপরাধে জড়াতে পারবে না। কঠিন এই শাস্তির কারণে নতুন করে কেউ এমন অপরাধে প্রবৃত্ত হবার আগে তার অন্তরাত্মা অবশ্যই কেঁপে উঠবে। আর তাওবা করলে এই শাস্তির মাধ্যমে তারা পাপ থেকে পবিত্র হতে পারবে।
মুসলিমদের কষ্ট দেওয়ার কারণে পৃথিবীতেই এদের লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রাপ্য ছিল। ডাকাতির অপরাধে প্রবৃত্ত হবার কারণে পার্থিব জীবনেই আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য লাঞ্ছনা অবধারিত করেছেন। আর আখিরাতের মহাআযাব তো রয়েছেই!
পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রাজ্ঞচিত ভঙ্গিমায় এই নিকৃষ্ট অপরাধ থেকে ফিরতেও তাওবার পথে ডেকেছেন। তিনি বলেছেন, গ্রেফতারের আগেই যারা তাওবা করবে, তাদের জন্য ক্ষমার সুযোগ থাকবে। এটা তিনি শর্ত দিয়ে বলেছেন। শর্তানুযায়ী গ্রেফতারের আগে তাওবা না করলে তার জন্য ক্ষমার সুযোগ থাকবে না।
অপরাধ দমনে এটি সূক্ষ্ম ও ইনসাফপূর্ণ পদ্ধতি। অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি বিলুপ্তির যে পদ্ধতি এখানে বয়ান করা হয়েছে, তা যেকোনো বোদ্ধা মানুষের কাছে অস্পষ্ট থাকবার কথা নয়।
আয়াত দুটির শেষে আল্লাহ তাআলা আরেকবার জানিয়ে দিয়েছেন, তার জন্য তিনি পরম করুণাময় ও অতি ক্ষমাশীল, যে তাওবায় নত হয়ে নিজেকে সংশোধন করে নেবে। কাজেই আল্লাহ তাআলার অসীম রাহমাত থেকে যেন সে নিরাশ না হয়। অধিকন্তু বান্দা ও তার রবের রাহমাতের মধ্যখানে পাপরাশি কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। যতক্ষণ না বান্দা শির্কে লিপ্ত হয়। সর্বোপরি এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলামি সমাজে আল্লাহ তাআলা যে শুদ্ধিতার ব্যবস্থা করেছেন, তা নিম্নরূপ:
১. বলা হয়েছে, এরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
২. ডাকাতের ওপর কঠিন শাস্তি আরোপিত হবে, সে যে-ই হোক না কেন।
৩. তাওবা না করলে দুনিয়া ও আখিরাতে তার অবস্থান হবে হীনতর।
৪. কুরআনের চিকিৎসা পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে দু-ভাবে। তাওবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, বিচারের ক্ষেত্রে এমন শাস্তির বিধান নির্ধারিত হয়েছে, যার ফলে দোষী ব্যক্তি তার অপরাধ অব্যাহত রাখতে পারবে না। অন্যদের জন্য এটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।[২২৪]
আল্লাহ তাআলা বলেন—
মূলত তাদের প্রতিফল- যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে এবং দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হলো— তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। কিন্তু যারা তাওবা করে তোমাদের প্রবলতার পূর্বে, তবে জেনে রেখো, আল্লাহ ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। (সূরা মাইদাহ: ৩৩-৩৪)
টিকাঃ
[১৬৩] দেখুন, সুজা' রচিত দিরাসাত ফি আহদিন নুবুওয়্যাহ, পৃ. ১৩৯
[১৬৪] দেখুন, বাশ'মীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ২৪
[১৬৫] দেখুন, যাহাবী রচিত, তারীখুল ইসলাম, মাগাযি অধ্যায়, পৃ. ৩৫১
[১৬৬] বুখারি ৪৬২ মুসলিম, ১৭৪৬। সুত্র নাদরাতুন নাঈম, ১/৩৩০
[১৬৭] প্রাগুক্ত।
[১৬৮] দেখুন, আস সীরাতুল হালবিয়্যাহ, ২/২৯৮
[১৬৯] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৩৮৬, ৩৮৭
[১৭০] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৭
[১৭১] দেখুন, আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১১৮
[১৭২] ইমাম নববীর শরহে মুসলিম, ১৩/৮৪
[১৭৩] বুখারি, ৪৩৬০ মুসলিম, ১৯৩৫
[১৭৪] দেখুন, আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১১৮
[১৭৫] দেখুন ইমাম নববী রচিত, শহরে মুসলিম, ১৩/৮৫-৮৭
[১৭৬] সুনানে নাসায়ী, তাহকীকে আলবানী, ৩/৯১০
[১৭৭] বুখারি, ৪৩৬২, মুসলিম, ১৪৩৫
[১৭৮] দেখুন তাবাকাতে ইবনু সাআদ, ২/১৩২
[১৭৯] দেখুন, উমরি রচিত আল মুজতামাউল মুদনী, পৃ. ১২৫
[১৮০] মাগাযি, ২/৭৭৪
[১৮১] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৮০
[১৮২] প্রাগুক্ত
[১৮৩] দেখুন, মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩২৩
[১৮৪] দেখুন, আস সারায়া ওয়াল বুহুসুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১১৯
[১৮৫] দেখুন, মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩২৩
[১৮৬] প্রাগুক্ত
[১৮৭] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৪
[১৮৮] আহমাদ, ২/৯৭। ইবনু মাজাহ, ৩২১৮।
[১৮৯] দেখুন ইমাম নববী রচিত, শহরে মুসলিম, ১৩/৮৬
[১৯০] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/১৬৭, ১৬৮
[১৯১] যাইলাঈ রচিত নাসবুর রা-য়াহ, অধ্যায় সন্ধি
[১৯২] দেখুন, ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৫৬০, ৫৬১
[১৯৩] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৬/১৮৪
[১৯৪] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/১৭১
[১৯৫] প্রাগুক্ত, ৪/১৭২
[১৯৬] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৬/১৮৪
[১৯৭] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/১৭৪
[১৯৮] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদ্যাহ, ৪/ ১৭৪
[১৯৯] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৬/১৮৬
[২০০] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৬৮
[২০১] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৩৪, ৩৫
[২০২] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬
[২০৩] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৩৭
[২০৪] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৩৮
[২০৫] দেখুন, আত তারিখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারি, পৃ. ৩২৭
[২০৬] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৪৩
[২০৭] প্রাগুক্ত
[২০৮] দেখুন, বাশমীল রচিত 'হুদাইবিয়া সন্ধি', পৃ. ৪৫
[২০৯] দেখুন, তারিখে তাবারি, ২/৬৪০
[২১০] রাবজা যাওয়ার পথে মদিনা থেকে ৪০ মাইল দূরে একটি এলাকার নাম জুল কিসসা।
[২১১] দেখুন, আত তারিখুস সিয়াসি আল আসকারি, পৃ. ৩২৭
[২১২] দেখুন, ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ১/৫৫১
[২১৩] মদিনা থেকে চার দিনের দূরত্বে এই এলাকাটির অবস্থান।
[২১৪] দেখুন, আত তারিখুস সিয়াসি আল আসকারি, পৃ. ৩২৫
[২১৫] দেখুন, মিন মুআইয়্যানিস সীরাহ, পৃ. ৩২৫
[২১৬] দেখুন আল আসাস ফিস সুন্নাহ, ২/৭১২
[২১৭] নবীজি যাওদ শব্দ ব্যবহার করেছেন। আর যাওদ হলো তিন থেকে দশ, এর মধ্যবর্তী বয়সের উট।
[২১৮] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৭৮
[২১৯] প্রাগুক্ত
[২২০] প্রাগুক্ত
[২২১] দেখুন সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, শামি রচিত, ৬/ ১৮১-১৯০
[২২২] তাফসীরে কুরতুবি, ১০/২৪২-২৪৪
[২২৩] ড, আবদুল্লাহ শানকীতি রচিত, ইলাজুল কুরআনিল কারীম লিল জারীমাহ, পৃ. ২৯৭,২৯৮
[২২৪] ইলাজুল কুরআনিল কারীম লিল জারীমাহ, পৃ. ৩১৩, ৩১৪, ৩১৫
📄 ইসলামি সীমানা থেকে আগাছা পরিষ্কারের অভিযান
এক. আবদুল্লাহ ইবনু আতীকের বিরুদ্ধে অভিযান
বনু নাযিরের একজন বিশিষ্ট ইয়াহুদি ছিল আবু রাফি' সালাম বিন আবিল হাকীক। ইসলামি দাওলাতের বিরুদ্ধে তার অপচেষ্টার শেষ ছিল না। এমনকি সে গাতফান ও তাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুশরিকদেরকে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে উসকে দিত। খন্দকের যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীকে সে-ই প্রলুব্ধ করেছিল। ইসলামি দাওলাতের বিরুদ্ধে তার অপতৎপরতার একটা বিহিত করা ছিল তখন সময়ের দাবি।[২২৫]
ক. খাইবারের উদ্দেশ্যে অভিযান প্রেরণ
একদিন আল্লাহর রাসূল ইসলাম ও মুসলিমদের এই শত্রুকে হত্যা করতে কয়েকজন আনসারি সাহাবিকে প্রেরণ করেন, তাদের আমীর নির্ধারণ করেন আবদুল্লাহ বিন আতীককে। এদিন আবু রাফি তার বিশেষ মহলেই ছিল।
সূর্য কেবল চোখের আড়াল হয়েছে, দুর্গের ভেতরের রাখালরা চারণভূমি থেকে মেষপাল নিয়ে ফিরেছে ঘরে। এমন সময় আবদুল্লাহ বিন আতীক সাথিদের নিয়ে খাইবারের সীমানায় পৌঁছেন। তিনি সাথিদের বললেন, ' তোমরা এখানে অপেক্ষা করো, আমি দেখছি, ভেতরে ঢোকার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কিনা।'
তিনি দরজার কাছে এলেন। এক টুকরো কাপড় মাথায় দিয়ে এমনভাবে বসলেন, মনে হচ্ছিল তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন। দুর্গের লোকেরা ভেতরে যাওয়া শেষ হলেও মূল ফটক তখনও খোলা ছিল। দারোয়ান ফটক বন্ধ করার সময় মাথায় কাপড় দেওয়া একজনকে বসে থাকতে দেখে ডাক দিয়ে বলল, 'আল্লাহর বান্দা, ভেতরে আসতে চাইলে এসো, আমি দরজা বন্ধ করব।'
আবদুল্লাহ বিন আতীক বলেন—'আমি ভেতরে এসে আত্মগোপন করলাম। দুর্গবাসী সবার ভেতরে প্রবেশ নিশ্চিত হবার পর দারোয়ান দরজা বন্ধ করে চাবিগুলো পেরেকে লটকিয়ে রাখল। এখানটায় নির্জনতা নেমে এলে আমি চাবি নিয়ে দরজা খুললাম।[২২৬]
খ) আবু রাফির পরিণতি
ইবনু আতীক ও অভিযানের সাথিরা দুর্গে প্রবেশ করলেন। আবু রাফিকে হত্যার একটা মোক্ষম সুযোগের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা। বুখারির বর্ণনায় আছে— রাতের বেলা আবু রাফির ঘরে গল্পের আসর বসত। আজও চলছিল হাসি-আনন্দের সেই মজমা। আড্ডাবাজরা বিদায় নেবার পর আমি তার প্রাসাদে ওঠা শুরু করলাম। প্রতিটি দরজা খুলে প্রবেশের পর ভেতর থেকে সেগুলো লাগিয়ে দিচ্ছিলাম। আমার কথা হলো, আমার পর্যন্ত কেউ পৌঁছালে তাকে হত্যা করব।
আমি আবু রাফির ঘরে ঢুকে বুঝলাম সে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে রয়েছে; কিন্তু অন্ধকারে আমি ঠাহর করতে পারছিলাম না, ঘরের ঠিক কোন জায়গায় সে অবস্থান করছে। সঠিক স্থান নির্ণয় করতে আমি তাকে ডেকে বললাম, 'আবু রাফি...? সে বলে উঠল; 'কিন্তু তুমি কে?' আমি আওয়াজের দিকে এগিয়ে গেলাম। অন্ধকারেই অনুমান করে তরবারি চালালাম; কিন্তু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বিধায় আমার আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। আবু রাফি চিল্লিয়ে উঠল। আমি ঘরের বাইরে এসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম।
তারপর আবার ঘরে গিয়ে বললাম, 'কী ব্যাপার আবু রাফি, এভাবে চিৎকার করে উঠলে যে?' সে বলল, 'আরে কপালপোড়া, কামরায় কেউ একজন ছিল, একটু আগে সে তরবারি দিয়ে আমাকে আঘাত করেছিল।'
আওয়াজ খেয়াল করে আবার তরবারি চালিয়ে দিলাম। আঘাতটা এবার লাগল ঠিক; কিন্তু মরল না। বুঝতে পারলাম, সে আমার পায়ের কাছে। আমি দ্রুত তরবারির ডগা তার পেটে রেখে সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দিলাম। এবারে কাজ হলো। তরবারি পৌঁছে গেছে একদম কোমর পর্যন্ত। ব্যস, আমার কাজ শেষ। দেরি না করে ফেরার পথ ধরলাম। আবার একটা একটা করে দরজা খুলে বাইরে আসছিলাম। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলাম। চাঁদনি রাত, আবছা আলো-আঁধারির পরিবেশ। অনেকটা নিচে নেমে এসেছি। একটা সিঁড়িতে পা রেখে মনে হলো আরেক পা নামলেই মাটি। এই হিসেবে পা বাড়ানোর পর মাটিতে বেকায়দায় পড়ে গেলাম। এতে পায়ের পিণ্ডলী একেবারেই ভেঙে গেল। ব্যথা তীব্র হলেও এখানে টু শব্দ করারও জো নেই। অগত্যা পাগড়ি দিয়ে বেঁধে মূল ফটকের কাছে এলাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
এখনই বের হব না। বসে অপেক্ষা করছি; আজ রাত এখানেই কাটিয়ে দেবো। আবু রাফির মৃত্যু-সংবাদ শুনে তবেই ফিরব। ভোরের আভাস পেয়ে মোরগ ডেকে উঠল। শুনলাম কেল্লার ওপরে দেওয়ালে ওঠে একজন হাঁক ছেড়ে বলল, 'আরে কে আছ, শুনছ? হিজাজের ব্যবসায়ী আবু রাফি মারা গেছে...!'
আমি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সাথিদের কাছে এসে বললাম, জলদি চলো; আল্লাহ আবু রাফির কাহিনি শেষ করেছেন।' আমরা যেমন একসাথে এসেছিলাম, তেমনই একসাথেই মাদীনায় ফিরলাম। আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে সব কাহিনি খুলে বললাম।'
আমার বয়ান শেষে নবিজি আমাকে পা ছড়িয়ে দিতে বললেন। আমি পা লম্বা করলাম। তিনি হাতের তালু দিয়ে একবার মাসাহ করলেন। কী আশ্চর্য! মুহূর্তেই আমার পা এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠল, মনে হলো এখানে কখনোই কিছু হয়নি।'[২২৭]
সীরাত গ্রন্থকাররা লিখেছেন, 'আবু রাফিকে আঘাত করার পর তার স্ত্রী বাঁচাও বলে চিৎকার শুরু করেছিল। সাহাবি তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়ে আবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। কেননা, আল্লাহর রাসূল নারী ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন।[২২৮] উল্লেখ্য, ইবনু আতীকরা ইহুদীদের ভাষা রপ্ত করেছিলেন, আর আবু রাফির স্ত্রীর সাথে কথা বলতে এই ভাষারই সাহায্য নিয়েছেন তিনি।
সীরাতের গ্রন্থগুলোতে আরেকটি কথা উল্লেখ আছে। তা হলো—আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে আসার পর অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকেই আবু রাফিকে হত্যা করেছেন মর্মে দাবি করছিলেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাদের সবার তরবারি নিয়ে এসো।' সবাই তরবারি নিয়ে এলে আল্লাহর রাসূল পরখ করে বললেন, এই তরবারিটি তাকে হত্যা করেছে।' দেখা গেল, সেটা আবদুল্লাহ ইবনু উনাইসের তরবারি। তার তরবারিতে তখনো (পেটের) খাবার এঁটে ছিল।[২২৯]
পাঠকরা এখানে বুখারির বর্ণনা ও সীরাহ গ্রন্থকারদের বর্ণনায় বৈপরিত্য দেখতে পাচ্ছেন। বর্ণনা বলছে, ইয়াহুদি আবু রাফিকে হত্যা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস; কিন্তু বাস্তবতা আসলে এমন নয়। কেননা, আবদুল্লাহ ইবনু আতীক এ বলেছেন, তার প্রবল ধারণা, তিনি হত্যা করেছেন এবং তিনিই বর্ণনা করেছেন ইয়াহূদিকে হত্যার ব্যাপারে তার ভূমিকার কথা। এখানে তিনি বলেননি যে, হত্যায় অন্য কেউ শরিক ছিল না। যেহেতু তার বর্ণনা অন্যের অংশকে অস্বীকার করছে না, তাই ধরে নিতে হবে বর্ণনাগুলো একটা আরেকটার ব্যাখ্যা করছে।
বর্ণনাগুলো একথাও বলছে, প্রত্যেকের দাবি ছিল আবু রাফিকে চূড়ান্ত আঘাতে হত্যা তিনিই করেছেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ সবার কথা শেষে তরবারিগুলো পরখ করে দেখেন। শেষে তিনি ফায়সালা দেন, চূড়ান্ত আঘাতকারী তরবারি হলো আবদুল্লাহ ইবনু উনাইসের তরবারি। কেননা, তার তরবারিতে খাবার লেগে ছিল। অর্থাৎ, এই তরবারি আবু রাফির পাকস্থলী ভেদ করে খাবার মিশেছিল।[২৩০] সীরাত গ্রন্থকারদের ভাষ্যানুযায়ী এ অভিযানে ছিলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু আতীক, মাসঊদ বিন সিনান, আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস, আবু কাতাদাহ, হারিস বিন রিবঈ, খুযাঈ ইবনু আসওয়াদ।
বিবৃত ঘটনাতে নিহিত শিক্ষণীয় দিকসমূহ:
১. এই অভিযানে অংশ নেওয়া সবাই ছিলেন খাযরাজ গোত্রের। আউস গোত্রের কয়েকজন কাআব বিন আশরাফকে হত্যার পর সেই থেকে এরা প্রতিযোগিতামুখর হয়ে আছেন। কল্যাণের পথে উভয় গোত্র যেন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দুজন অশ্বারোহী। পার্থিব জীবনের ধনসম্পদের জন্য তাদের এই প্রতিযোগিতা ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর রাসূলের সন্তুষ্টির মাধ্যমে হৃদয়ে উচ্ছলতার প্রাসাদ গড়ে তোলা।[২৩১]
'কাআব বিন মালিক বলেন—'আল্লাহ তাআলা তাঁর দীনের প্রসারে যেসব ব্যাপার ঘটিয়েছেন, তার একটি হলো আনসারদের দুই গোত্র আউস ও খাযরাজের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। আল্লাহর রাসূলের সাহায্যে তারা যেন দুজন বলবান মল্লযোদ্ধার মতো প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। আউস গোত্রের লোকেরা নবিজির সন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ করলে খাযরাজের সাহাবিগণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বলতেন, 'তোমরা এ কাজ করে আল্লাহর রাসূলের কাছে আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারবে না। খুব শিগগির আরও উত্তম কাজ আমরা নবিজিকে উপহার দেবো।' এরপর তারা মুখিয়ে থাকতেন সুযোগের অপেক্ষায়। খাযরাজ গোত্রের লোকেরা এমন কোনো কাজ করে বসলে আউসের সাহাবিগণ অনুরূপ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন।[২৩২]
২. শত্রুদের আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষার উপকারিতা এখানে স্পষ্ট। সেদিন আবদুল্লাহ ইবনু আতীক আবু রাফির মহলে উঠে তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন নির্বিঘ্নে। কেননা, তিনি সে সময় ইয়াহুদিদের ভাষায় কথা বলেছিলেন। এখান থেকে জানতে পারি, অমুসলিমদের ভাষা শিক্ষা করা মুস্তাহাব। শত্রুদেরকে লক্ষ্য বানালে তো তা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সেই বাহিনীর জন্য যারা শত্রুদের গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্য জীবন বাজি রাখেন।[২৩৩]
৩. লক্ষ্য অর্জনে আবদুল্লাহ ইবনু আতীক নিখুঁত পরিকল্পনা করেছেন। তিনি স্থির করেছেন, দুর্গের কাছে একাই গিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন। তারপর একটা ব্যবস্থা করে অন্যদেরও ঢুকাবেন। প্রয়োজন সারার ভঙ্গিতে বসে তিনি এক দিকে দারোয়ানের দৃষ্টি যেমন আকর্ষণ করেছেন, অন্য দিকে বুঝতেও দেননি যে তিনি অপরিচিত; দুর্গের বাইরের কেউ। ঢোকার পর তার আসল কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র। তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন, দারোয়ানের দরজা বন্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থানে চাবি রাখা ও অন্যান্য বিষয় পরিকল্পিতভাবে দেখে নিয়েছেন। তারপর চাবি নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন—এখন যখন ইচ্ছা খুলতে পারবেন দুর্গের মূল ফটক।[২৩৪]
৪. আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের সাহায্য করেছেন। ইসলামের মহান সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আতীক আল্লাহর রহমতকে সঙ্গী করে পথ চলেছেন, লক্ষ্য অর্জনে নিজের মেধা ও শক্তি ব্যয় করেছেন। ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। পা মচকে যায়; কিন্তু এদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। যেন কিছুই হয়নি। চূড়ান্ত সংবাদ শোনার পরই তার পায়ে ব্যথার অনুভূতি ফিরে আসে। সাথিরা তাকে ধরাধরি করে নিয়ে আসে মাদীনায়। আল্লাহর রাসূলকে বিস্তারিত বলা হয় তার সম্পর্কে। সব শুনে নবিজি বললেন, 'তোমার পা প্রসারিত করো'। তিনি পা প্রসারিত করেন। নবিজি তার মচকানো স্থানে হাত বোলানোর পর এমনভাবে সুস্থ হয়ে যান যে, যেন সেখানে কখনোই অসুস্থতা ছিল না।[২৩৫]
৫. বর্ণিত কাহিনির কিছু নির্যাস উৎসারিত করেছেন ইবনু হাজার আসকালানি। তিনি বলেন—'এই হাদীস থেকে জানতে পারি, এমন মুশরিককে গুপ্তহত্যা জায়েয আছে, যার কাছে দা'ওয়াহ পৌঁছেছে। আবার যে ব্যক্তি নিজে কিংবা সম্পদ ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে অন্যকে সাহায্য করে, তাকেও হত্যা করা বৈধ। যুদ্ধে সক্ষম জাতির ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করা, তাদের গোপন সংবাদ অনুসন্ধান করাও জায়েয। আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নাজুক মুহূর্তে কল্যাণার্থে দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা জায়েয।[২৩৬]
৬. আমরা দেখি, এ অভিযানে আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস একজন সাধারণ সৈন্য হিসেবে ছিলেন। এখান থেকে আমরা নববি পরশের এক অপূর্ব শিক্ষা পাই। আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস ছিলেন উকাবি ও বদরি—একজন অগ্রণী আনসারি সাহাবি। উভয় কিবলায় সালাত আদায় করেছেন। রণক্ষেত্রে তার শৌর্য ও বীরত্বের বিষয়টা কারও অজানা ছিল না। একটা অভিযানে—মাক্কার নিকটবর্তী অঞ্চলের সুফিয়ান বিন খালিদ হুজালিকে গুপ্তহত্যার জন্য নবিজি তাকে প্রেরণ করেন। ইবনু উনাইস এখানে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি একা হুজালির তাঁবুতে ঢুকে তার বিছানাতেই তাকে হত্যা করেন। বাধ্য করেন তার সম্প্রদায়কে পালিয়ে বাঁচতে। শেষে ফিরে আসেন বিজয়ী বেশে।
দেখতে পাচ্ছি মর্যাদার সমগ্রতায় পূর্ণ এক জীবন তার। তা সত্ত্বেও আবু রাফিকে হত্যার জন্য প্রেরিত বাহিনীর আমীর ছিলেন না তিনি; বরং ছিলেন একজন সাধারণ সেনা। তিনি বিনয় ও আনুগত্যের এই উজ্জ্বল ইতিহাস জীবনের ডায়রিতে বহন করছিলেন শুধু আল্লাহর জন্য।
এটি আসলে চিরন্তন নববি শিক্ষার ফল, যা সাহাবিরা কোঁচড় ভরে রপ্ত করেছেন। এই শিক্ষা ও দীক্ষার সমন্বিত রূপ পৃথিবীর বুকে বিরল। কেন বিরল। সে কথা বলছি—যিনি সেনাবাহিনীকে মর্যাদার স্তর অনুযায়ী সাজাবেন, তিনি প্রথম পজিশনে রাখবেন সর্বাগ্রে আসা ব্যক্তিকে, এ ব্যক্তির ওপরও অগ্রাধিকার দেবেন অধিক মান্যকারী ব্যক্তিকে, যদিও তার আগমনের বয়স কম হয়।' এই নীতি অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবনু উনাইসের আগে আসলে কেউই থাকবার কথা নয়; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল-এর মহৎ নববি পরিকল্পনা ছিল এর বিপরীত। যেন বর্তমান প্রজন্ম তাঁর অগ্রণী ব্যক্তিত্ব থেকে শেখে, তাঁর হাতে গড়ে ওঠে। ফলে দেখা গেছে, আল্লাহর রাসূল আবু বাকর ও 'উমারকে অন্যের অধীন করে অভিযানে পাঠিয়েছেন।[২৩৭]
দুই. উসাইর বিন রিযামের বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার অভিযান
সালাম বিন আবুল হাকীকের পরে খাইবারের আমীর নির্বাচিত হয় উসাইর বিন রিযাম। আল্লাহর রাসূল জানতে পারেন, এই নব নির্বাচিত আমীর দক্ষিণের ইয়াহুদিদের একত্রিত করে তাঁর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করছে। এখানেই সে ক্ষান্ত হয়নি; বরং গাতফানের গোত্রগুলোকেও আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে একযোগে হামলার জন্য উসকে দিচ্ছে। নবিজি এও জানতে পারেন, ইয়াহুদিদের রাত কাটে প্রতারণা ও চক্রান্তের ফন্দি এঁটে। এরা কাল হয়ে দাঁড়াবার আগেই একটা পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে আল্লাহর রাসূল আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে আমীর নির্ধারণ করে অভিযানে প্রেরণ করেন। যাদের কাজ হবে ইয়াহুদিদের সামনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হওয়া, আরব মুশরিকদের তোড়জোড় নিয়ে অনুসন্ধান চালানো।[২৩৮]
উসাইর বিন রিযামের সার্বিক খবর জানার পর আল্লাহর রাসূল ত্রিশ সদস্যের একটি অভিযান প্রেরণ যথেষ্ট মনে করেন। আবদুল্লাহ বিন উনাইসকে এ বাহিনীতে যুক্ত করেন, আর আমীর নির্ধারণ করেন আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে।
সাহাবিগণ খাইবারে এসে উসাইরকে বললেন, 'তোমাকে খাইবারে নেতা হিসেবে নিযুক্ত করার জন্য আল্লাহর রাসূল আমাদের পাঠিয়েছেন। তারা তার সাথে এমনভাবে কথা বলতে থাকেন, এক পর্যায়ে সে আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলার জন্য তাদের সাথে মদিনায় আসতে সম্মত হয়।'
কিন্তু সে শর্ত জুড়ে দেয় যে তার সাথেও উনত্রিশজন মানুষ যাবে। উসাইরসহ ত্রিশজন, মুসলিমদের সাথে একই ঘোড়ায় আরোহন করে। প্রত্যেক মুসলিমের পেছনে তার একজন করে লোক আরোহন করে। উসাইরের ঘোড়ায় আরোহন করেন আবদুল্লাহ বিন উনাইস।
খাইবার থেকে মাদীনার পথ কারকারাতা সিয়ার নামক স্থানে এসে গল্পের মোড় ঘুরে যায়। উসাইর আল্লাহর রাসূলের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনুতাপ বোধ করা শুরু করে। সে ইবনু উনাইসের তরবারির দিকে হাত বাড়ায়। ইবনু উনাইস বুঝতে পেরে ক্ষিপ্র গতিতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করেন। কেটে ফেলেন পা। উসাইর গাছের একটা ডাল দিয়ে উনাইসের মাথায় আঘাত করে। এই অবস্থা দেখে অন্যান্য মুসলিম সৈন্যরাও তাদের সঙ্গী প্রত্যেক ইয়াহূদিকে হত্যা করেন। শুধু একজন বাঁচতে পেরেছিল। সে দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস মাদীনায় ফিরে আসেন। আল্লাহর রাসূল তার ক্ষতস্থানে থুতু লাগিয়ে দেওয়ার পর ব্যথা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।[২৩৯]
অভিযান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাসমূহ:
১. শুরুতে মুসলিম ও ইয়াহুদিদের মাঝে রক্তপাতের পরিকল্পনা ছিল না আল্লাহর রাসূলের। আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা এ স্বাভাবিকতায়-ই সামনে এগোচ্ছিলেন; কিন্তু ইয়াহুদিদের প্রতারণা গোটা প্রেক্ষাপট পালটে দেয়। যার তিক্ত রস তাদেরকে পান করানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাবই তাদের খোলস ছেড়ে প্রকাশ্যে আসে। সমস্ত পরিকল্পনায় ধুলো ছিটিয়ে মুসলিমদের সাথে গাদ্দারিতে প্রবৃত্ত হয়; কিন্তু এটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
২. যুদ্ধ ক্ষেত্রের ব্যাপারটা আসলে এমনই। শত্রু পক্ষকে ভীত-সন্ত্রস্ত না করা পর্যন্ত নিজেদেরকে আতঙ্কিত ও শঙ্কিত থাকতে হয়। ফলে সংগত কারণেই শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য বিষয়। আর উদ্ভূত কোনো পরিস্থিতিতে আবশ্যক হলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করে আনা। আলোচনা—আধুনিক ভাষায় কূটনৈতিক তৎপরতা কাজে না আসে, তখন শত্রুর সাথে কঠোরতা ছাড়া আর উপায় থাকে না। আসন্ন যুদ্ধের সংকেত পাওয়ার পর শত্রুর সাথে রুক্ষতার আচরণই কেবল সঠিক সিদ্ধান্ত হয়। আর আল্লাহর জন্য এই কাজে কোনো সমালোচকের নিন্দার পরোয়া করা যাবে না।
৩. হিজরি ৬ষ্ঠ সন শত্রুদের সাথে মুখোমুখিতার অনেক ঘটনা-অনুঘটনা প্রবাহের সাক্ষী হয়েছে। মাস গড়ানোর আগেই একাধিক অভিযানের রুক্ষ ছাপ পড়েছে মরুর বুকে। কোনো শত্রুকে শায়েস্তা করতে দলবদ্ধ অভিযান প্রেরিত হয়েছে, সংগত বিবেচনা করে কাউকে করা হয়েছে গুপ্তহত্যা। এ যেন আল্লাহর রাসূলের কথার সাক্ষাৎ প্রতিফলন। তিনি বলেছিলেন, 'আমাদের সাথে ওদের যুদ্ধের দিন শেষ, এখন আমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়ব।' আল্লাহর এই বাহিনীর সৈনিকরা তাঁর বারাকাহপূর্ণ নাম নিয়ে পৃথিবী মাড়িয়েছেন। অনুক্ষণ বুকে বহন করতেন চিরন্তন চেতনা। উন্নত অভীষ্ট, যা তাদেরকে সকল সৃষ্টির ওপর সমুন্নত করেছে। ফলে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তরায় সমস্ত তাগুতের স্তম্ভ গুড়িয়ে দিতে তাদের বেগ পোহাতে হয়নি।
আল্লাহর বাহিনীর সকল সেনাকে আমরা স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায়। যারা অর্জন করেছিলেন উন্নত চরিত্র, চিন্তাশীলতা। সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সূক্ষ্ম দর্শন। সামনে হুদাইবিয়ার আলোচনায় আমরা ইতিহাসের স্রোতে ভেসে ভেসে মিশে যাব তাদের নির্মল জীবন প্রবাহে।[২৪০]
টিকাঃ
[২২৫] দেখুন, মুহাম্মাদ কালআজি রচিত 'কিরাআতুন সিয়াসিয়্যাহ লিস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ২১২
[২২৬] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৬৫
[২২৭] বুখারি, ৪০০৯
[২২৮] দেখুন, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনইয়াহ, ২/১৬৮
[২২৯] বুখারি, ৪০০৯, ৪০৪০। ইবনু সাআদ, ২/৯১,৯২। ইবনু হিশাম, ৩/২৮৬-২৮৮।
[২৩০] দেখুন, আবু ফারিস রচিত, 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ১/ ১৮৯
[২৩১] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৬/১৭৭
[২৩২] দেখুন, সীরাতে ইবনু হিশাম, ৩/২৮৬
[২৩৩] 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ১/১৯১
[২৩৪] 'আস সিরা' মাআল ইয়াহুদ, ১/১৯২, ১৯৩
[২৩৫] বুখারি, ৪০৩৯
[২৩৬] ফাতহুল বারি, শরহে হাদিস, ৪০৩৯, -৪০
[২৩৭] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/১৪৮
[২৩৮] দেখুন, আল ইয়াহুদ ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ, ১/৩৮৮, ৩৮৯
[২৩৯] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৭৭
[২৪০] দেখুন, আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৪/ ১৮৯-১৯২