📄 তিন. মুসলিমদের বহুজাতিক বাহিনী পর্যবেক্ষণ
শত্রু থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় পূর্ণ সতর্ক অবস্থা অব্যাহত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আহযাবের খবরাখবর, গতিবিধি ও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে দৃষ্টি রাখছিল ইসলামি রাষ্ট্র। খাইবারের প্রতিনিধি দলটি মাক্কার উদ্দেশ্যে রওনা করার পর থেকে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে মুসলিমদের অনুসন্ধানি চোখ ছায়ার মতো লেগে থাকে। ইয়াহূদি প্রতিনিধি ও কুরাইশের মধ্যকার সম্পন্ন হওয়া গোপন চুক্তি, দ্বিতীয় পর্যায়ে চুক্তিতে চলে আসা গাতফানিদের ব্যাপার- সবকিছুই মুসলিমদের অবগতিতে ছিল। সংগত এসব তথ্যের ভিত্তিতে শত্রুদের থেকে মাদীনাকে রক্ষা করতে নবিজি প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে খুব দ্রুত একটি মাশওয়ারা সভার আয়োজন করেন। উপস্থিত হন জ্যেষ্ঠ মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরাম। কুচক্রি ইয়াহুদিদের ভয়ানক পরিকল্পনা থেকে উত্তরণের জন্য মুক্ত আলোচনা হয় এ সভায়।[১৫]
এই বিশাল বাহিনী রুখে দিতে সালমান ফারসি পরিখা খননের পরামর্শ দেন। সম্পূর্ণ নতুন এই পরিকল্পনার কথা শুনে আল্লাহর রাসূল অনেকটা অবাক হন। ওয়াকিদি বলেন: সালমান বলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ, পারস্যে আমরা শত্রু প্রবেশের আশঙ্কা করলে নিজেদের রক্ষায় পরিখা খনন করতাম। আপনিও এমনটা করে দেখতে পারেন। সালমান-এর এই পরামর্শ উপস্থিত মুসলিমদেরকে অভিভূত করে।[১৬]
পরিখা খননের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর নবিজি ও কয়েকজন সাহাবি স্থান নির্ধারণের জন্য চলে আসেন। সেনাবাহিনীর সহায়তা করতে সাধারণ মুসলিমদের জন্য আরেকটি স্থান নির্দিষ্ট করেন। ওয়াকিদি বলেন—নবিজি কয়েকজন মুহাজির ও আনসার সাহাবিকে সঙ্গে করে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে মাদীনার বাইরে আসেন। তিনি অবতরণের জন্য জুতসই একটা জায়গা খুঁজছিলেন। শেষে একটু আশ্চর্য ধরনের স্থান বেছে নেন। সিলা পাহাড় পেছনে রেখে মাজাদ থেকে জুবাব পর্যন্ত পরিখা খননের সংকল্প করেন। পেছন দিক থেকে সাহাবিদের রক্ষায় সিলা পাহাড় থেকে তিনি সুবিধা লাভ করেন।[১৭]
পরিখা খননের মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মজুত করতে এই স্থানগুলোকে নির্ধারণ করার কারণ হলো, শত্রুর সামনে মাদীনার শুধু উত্তর দিকটা উন্মুক্ত ছিল। এদিক দিয়ে সহজেই মাদীনায় প্রবেশ করে তাণ্ডব চালানো সম্ভব। অন্য দিকগুলোতে সে সুবিধা ছিল না। দক্ষিণ প্রান্তের উঁচু স্থানগুলো প্রাকৃতিকভাবে নিরাপত্তার দেওয়াল হয়ে ছিল। পূর্ব দিকে সকালের গা ঝলসানো উত্তাপ এবং পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের তাপদাহ নীরবে প্রাকৃতিক ব্যুহের কাজ করছিল। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পেছন থেকে মুসলিমদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল বনু কুরাইযাহ। সেসময় নবিজি ও বনু কুরাইযার মাঝে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত ছিল, তারা মাদীনার বিরুদ্ধে কাউকে প্ররোচিত কিংবা সাহায্য কোনোটিই করবে না।[১৮]
আল্লাহর রাসূল-এর এই পরিকল্পনা ছিল উন্নত ও কার্যকরী। বলতে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন তিনি। আরবরা যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশলটির সঙ্গে মোটেও পরিচিত ছিল না। এটা ছিল তাদের কাছে অজানা অদ্ভুত কিছু। অন্য দিকে এই পরিখা খননের মধ্য দিয়ে মুসলিম ও আরব্য ইতিহাসে আল্লাহর রাসূলই প্রথম ব্যক্তি, যিনি পরিখা খননের প্রচলন ঘটান। এই পরিখা ইসলামের শত্রুদের সকল পরিকল্পনা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। মুসলিমদের গুঁড়িয়ে দিতে এসে আচমকা পরিখার মুখে পড়ে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। এই চমক বাস্তবায়নে মুসলিমরা কাজে লাগিয়েছেন সুদৃঢ় মনোবল, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কাজের ক্ষিপ্রতা। লড়াই ক্ষেত্রে এই নতুন পদ্ধতি গ্রহণ বহুজাতিক বাহিনীকে দুর্বল ও তাদের শক্তির দণ্ড চূর্ণ করে দিয়েছিল।
টিকাঃ
[১৫] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪, ১৪৫
[১৬] ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৪৪৪। আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২/৬
[১৭] এটি মাদীনার একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়। মুজামুল বুলদান, ৩/২৩৬
[১৮] আল-আবকারিয়্যাতুল আসকারিয়্যাহ ফি গাযওয়াতির রাসূল, পৃ. ৪৪২
📄 চার. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় নবিজির গুরুত্ব
১. বহুজাতিক বাহিনী মাদীনার উদ্দেশে আসার খবর শুনে পরিখা খননের আগে আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের সন্তান, নারী ও শিশুদেরকে বনু হারিসার দুর্গে নিরাপদে রাখবার নির্দেশ দেন। যেন তারা শত্রুর শ্যেনদৃষ্টি থেকে আশঙ্কামুক্ত থাকে। নবিজি প্রথমে এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধানতম কারণ হলো, মুজাহিদরা যেন পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তায় না পড়ে। স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেলে সেনা সদস্যদের মন আর বিক্ষিপ্ত হবে না। পার্থিব চিন্তা তাদের তাড়া করবে না। দৈহিক ও চিন্তাশক্তি শুধু যুদ্ধের পেছনেই ব্যয় করবে; কিন্তু এর বিপরীত হলে সেনাবাহিনীর অবস্থা হবে টালমাটাল। মনোবল হারিয়ে ফেলবে। ঐক্যবদ্ধতার ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে এই অভ্যন্তরীণ অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা।[১৯]
২. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় আরও সহায়ক হয়েছে সাহাবিদের সাথে কাজে আল্লাহর রাসূল-এর সশরীরে অংশগ্রহণ। পরিখা খননের কাজে তিনি নিজে সাহাবিদের সাথে শরিক হয়েছেন। ইবনু ইসহাক বলেন: আমি বারা ইবনু আযিবকে বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেছেন—সম্মিলিত বাহিনী আসার আগে আল্লাহর রাসূলও পরিখা খনন করেছেন। আমি দেখেছি তিনি পরিখার মাটি বহন করছেন। এমনকি তাঁর পেটের চামড়ায় ধুলার আস্তরণ দেখা যাচ্ছিল। ঘন পশম ছিল নবিজির শরীরে।
ক্লান্তি ও জড়তা ভুলে অসীম সাহসিকতা নিয়ে নবিজি সাহাবিদের সাথে কাজ করেছেন। তাঁর সরব উপস্থিতি এক অদৃশ্য শক্তি সঞ্চারিত করেছে সাহাবিদের মনে। ফলে পরিখা খনন সমাপ্তিতে পৌঁছাতে সাহাবিরা নিজেদের সবটুকু চেষ্টা ব্যয় করেছেন।
৩. আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হতেন। সাহাবিদের আগলে রেখে নিজেই কষ্ট সহ্য করতেন। আহযাব যুদ্ধের দৃশ্যপটগুলো আমাদের দেখায়, অন্যদের মতো তিনিও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করছেন; বরং আরও বেশি। ক্ষুধার আতিশয্যে তিনি পেটে পাথর পর্যন্ত বাঁধতে বাধ্য হয়েছেন।[২০] সুখস্বাচ্ছন্দ্যের সময়েও তিনি সাহাবিদের পাশে থেকেছেন। তিন দিন অব্যাহত ক্ষুধার পর যখন খাদ্যের ব্যবস্থা হয়েছে, তখন সাহাবিদের ভুলে শুধু নিজের কথা চিন্তা করেননি। সামনে জাবির ইবনু আবদিল্লাহ-এর হাদীসে আমরা ক্ষুধা নিবারণের দারুণ গল্প জানতে পারব।
৪. সাহাবিদের মনঃকষ্ট দূর করে তাদের তৃষ্ণ হৃদয়ে উচ্ছলতা নির্মাণে সচেষ্ট থেকেছেন নবিজি। পরিখা খননের পর কঠিন পরিস্থিতি সবাইকে গ্রাস করে। আবহাওয়া ছিল ঠান্ডা, প্রবাহিত হতে থাকে প্রবল শৈত্যপ্রবাহ। জীবিকা নির্বাহের উপায় সংকীর্ণ। শত্রু আগমনের ভয় সর্বক্ষণ জেঁকে ধরে আছে সবাইকে। এমন করুণ পরিস্থিতিতেও সাহাবিরা পরিখা খনন করছেন, মাটি বহন করে ফেলছেন অন্য জায়গায়। এই নাজুক অবস্থায় অবশ্যই প্রয়োজন ছিল দৃঢ়তা ও উন্নত মনোবলের। কাজের ঘোরে নবিজি ভুলে যাননি, সাহাবিরাও অন্যদের মতো মানুষ। কাজ শেষে তাদেরও একটু প্রশান্তির প্রয়োজন আছে। আবার এমন একজনের মুখাপেক্ষী ছিলেন সবাই, যিনি হৃদয়ের মালিক; অন্তরের সমস্ত কষ্ট-যন্ত্রণা ভুলিয়ে আনন্দের ফল্গুধারা সৃষ্টি করেন। তাইতো দেখি মানবতার মহান প্রতিনিধি নবিজি ইবনু রাওয়াহার কবিতা আবৃত্তি করে মাটি বহন করে বলছিলেন:
'হে আল্লাহ, আপনি ছাড়া কে দিত আমাদের হিদায়াত/আপনি ছাড়া করতে পারতাম না সাদাকা, পড়তাম না সালাত।
কাজেই আমাদের ওপর আপনি প্রশান্তির জোয়ার ঢেলে দিন/সম্মুখ যুদ্ধের সময় দৃঢ় রাখুন আমাদের পদক্ষেপ।
তারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্রলুব্ধ হয়েছে/ তারা ফিতনার ইচ্ছা করলে আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
বলবার সময় নবিজি বলিষ্ঠ কণ্ঠে শেষের ব্যক্তিটিকেও শুনিয়ে দিতেন।[২১]
আনাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূলের সাহাবিরা পরিখা খননের সময় বলছিলেন 'আমরা আনুগত্যের শপথ নিয়েছি মুহাম্মাদের হাতে/ আমরণ প্রাণ নিবেদিত হবে আল্লাহর পথে।' অথবা তারা বলতেন 'শপথ নিয়েছি জিহাদের'। এরপর সাহাবিদের উদ্দীপনা বাড়িয়ে দিতে নবিজি বলতেন 'হে আল্লাহ, আখিরাতের কল্যাণই তো প্রকৃত কল্যাণ/ অতএব, মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের ক্ষমা করুন।[২২]
জীবনের কঠিন ও যন্ত্রণাময় এই বাঁকটাকে নবিজির নিঃস্বার্থ আন্তরিকতা ও প্রফুল্লতায় গ্রহণ সাহাবায়ে কেরামকে অনেকটা নির্ভার করেছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত পরিখা খননের কাজ দুশমন বাহিনী আসার আগেই দ্রুত সম্পন্নকরণেও জোরালো ভূমিকা রেখেছে।[২৩]
৫. সৈন্যদের জন্য স্থান নির্ধারণ, প্রয়োজনের সময় প্রস্থানের অনুমতি সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলের সামনে চূড়ান্ত ভদ্রতা ও শিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন। অনিবার্য কোনো প্রয়োজনে কাজ ছেড়ে বাইরে যেতে হলে তারা আগে বিনয়ের সাথে অনুমতি প্রার্থনা করতেন। প্রয়োজন শেষে ফিরে এসে আবার আত্মনিয়োগ করতেন কাজে। উদ্দেশ্য একটাই, প্রতিদান ও কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে কুরআনে উল্লেখ করেন:
মুমিন তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, আর যখন তারা তাঁর সাথে সম্মিলিত কাজে অংশ নেয়, তখন অনুমতি প্রার্থনার আগে তারা কোথাও চলে যায় না। যারা আপনার কাছে অনুমতি চায়, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে। অতএব, তারা আপনার কাছে কোনো কাজে অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন ও তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা নূর: ৬২]
আয়াতের মর্ম হলো, প্রিয় মুহাম্মাদ, এমন নাজুক মুহূর্তে যারা নিজেদের অতি জরুরি কোনো প্রয়োজনেও আপনার অনুমতি না নিয়ে কোথাও যেতে চায় না, তাদের যাকে ইচ্ছা আপনি কাজ সেরে আসার অনুমতি দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।[২৪] আল্লাহর রাসূল-কে এখানে ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছে, তিনি যদি দেখতেন অনুমতিপ্রার্থীর সামনে যৌক্তিক প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এবং অন্যদের জন্য তা ক্ষতিকর নয়, তা হলে তিনি অনুমতি দিতেন। অথবা অবস্থা বুঝে সবার সাথে থাকতে বলতেন।[২৫]
৬. পাহারার জন্য সাহাবিদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্তকরণ, শত্রু বাহিনীর যে কারও পরিখা অতিক্রম প্রতিরোধ করতে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবিদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে পাহারার ব্যবস্থা করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিমরা নিষ্ঠার সাথে পালন করেন অর্পিত দায়িত্ব। পরিখা অতিক্রমে মুশরিকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। সন্দেহ নেই, সামরিক শক্তি ও নেতৃত্বের দিক থেকে পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন সবাই।
আগ্রাসী শত্রুদের প্রতিরোধে পরিখার কিনারে প্রহরী রাখাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। একদিন তো সাহরির সময় থেকে নিয়ে দ্বিতীয় দিন মধ্যরাত পর্যন্ত বিশ্রামহীন টানা পাহারা দিয়ে যেতে হয়। রণাঙ্গনে ব্যস্ত থাকার কারণে এদিন মুসলিমদের চার ওয়াক্ত সালাত ছুটে যায়। পরে তারা এই সালাতগুলো কাযা আদায় করে নেন। ইকরিমা ইবনু আবি জাহল কিছু যোদ্ধা নিয়ে পরিখা অতক্রম করলেও ‘আলি তাদেরকে প্রতিহত করেন। কুরাইশের বিখ্যাত বীর আমর বিন আবদুদকে হত্যা করে তাদেরকে নিজের জাত চিনিয়ে দেন।[২৬] এখানে আনসারদের একটি বাহিনী নবিজির নির্দেশে প্রতি রাতে প্রহরায় নিযুক্ত হতেন। তাদের প্রধান ছিলেন উব্বাদ ইবনু বাশার। সাকুল্যে আল্লাহর রাসূলই ছিলেন মুসলিমদের সর্বাধিনায়ক। যুদ্ধের দিনগুলোতে সঠিক দিক-নির্দেশনায় সবাইকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করছিলেন। নিখুঁত পরিকল্পনা করে সব সময় পর্যবেক্ষণও করছিলেন তা কার্যকর করণে। শত্রু বাহিনীকে প্রতিহত করতে তার নির্ণিত পরিকল্পনা ছিল নিম্নরূপ,
১. মাশওয়ারা সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর পরিখা খননের নির্দেশ দেন। এজন্য মাদীনার উত্তর দিকটাকে নির্ধারণ করেন। কারণ, এই একটা দিকই মাদীনা প্রবেশের জন্য শত্রুদের সামনে উন্মুক্ত ছিল।
২. সাহাবিদের মাঝে পরিখা খননের কাজ ভাগ করে দেন। প্রতি চল্লিশ গজ মাটি খননের দায়িত্ব দেন ১০জন সাহাবিকে।
৩. কাজের ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা এবং প্রত্যেককে নিয়োগ করা হয়েছে উপযুক্ত কাজে। তাই কোনো একজন নবিজির অনুমতি ছাড়া কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে বাইরে যেতে পারেনি।
৪. রাত দিনের প্রতিটি মুহূর্ত প্রতি বিঘত স্থান পাহারা দেওয়ার জন্য সাহাবিদের সামনে স্থান নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহর রাসূল নিজেও মুজাহিদ বাহিনীর কষ্ট দূর করে তাদেরকে উজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
৫. সর্বোপরি নবিজি জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক দক্ষতা ও আল্লাহর সাহায্যে মোড়ানো নুবুওয়াতি ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে সম্মিলিত মুশরিক বাহিনী মাদীনায় পৌঁছার পর মুমিনদেরকে বড়োসড়ো বিপদের আশঙ্কা থেকে উদ্ধার করেছেন।[২৭] অধিকন্তু গোটা বাহিনীকে নিজের একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করতে পারা ছিল যুদ্ধ জয়ের অন্যতম কারণ।
টিকাঃ
[১৯] গাযওয়াতুল আহযাব, ডা. মুহাম্মাদ আবদুল কাদির আবু ফারিস, পৃ. ৯৮
[২০] প্রাগুক্ত সূত্র, ১১৬, ১১৭
[২১] বুখারি, ৪১০৬
[২২] বুখারি, ২৮৩৪। মুসলিম, ১৮০৫
[২৩] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়াহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮২
[২৪] সাবুনি রচিত সাফওয়াতুত তাফাসির, ১/৩৯১
[২৫] আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী, ৩/১৪১০
[২৬] মুনীর গাযবান রচিত ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৫০৪। এটি আরও বর্ণিত আছে, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থের আহযাব যুদ্ধের অধ্যায়ে।
[২৭] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ১১
📄 কঠিনতম পরীক্ষার মুখোমুখি মুসলিম বাহিনী
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় সব রকম সতর্কতা অবলম্বন এবং সম্মিলিত বাহিনী থেকে ইসলাম ও মাদীনাকে রক্ষায় যথার্থ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন মুসলিম বাহিনী। তা সত্ত্বেও আল্লাহর সুন্নাহ হলো, সর্বোচ্চ কসরতের পর তাঁর সাহায্য প্রকাশিত হয়। চূড়ান্ত প্রচেষ্টার পর নেমে আসে মদদ। যখনই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী হয়েছে, তার আগে বৃদ্ধি পেয়েছে বিপদাপদ, পরীক্ষা। এই আহযাব যুদ্ধের সময়টাতেও চূড়ান্ত পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন মুসলিমরা। যেমন:
এক. বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের চুক্তি ভঙ্গ ও মুসলিমদেরকে পেছন থেকে আক্রমণের চেষ্টা
মাদীনার দক্ষিণে অবস্থিত বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের ব্যাপারে মুসলিমরা আশঙ্কা করছিলেন, এই জাতির লোকেরা চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে। বাস্তবতা এমন হলে মুসলিমরা দুই বিপদের মাঝখানে পড়বে। পেছনে ধূর্ত ইয়াহুদি, আর সামনে সম্মিলিত শত্রু বাহিনী। ওদিকে বনু নাজীরের মিত্র ইয়াহুদি এগিয়ে গিয়ে বনু কুরাইযার মিত্র কাআব বিন আসাদের সাথে কথা বলে, যেন সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিত্র বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়।
ক্রমশ মুসলিমদের মাঝে আশঙ্কা তীব্রভাবে দানা বাঁধতে থাকে যে, বনু কুরাইযা তাদের সাথে মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করছে! আল্লাহর রাসূলও একই আশঙ্কা করছিলেন। কারণ ইয়াহুদিরা এমন এক জাতি, যাদের কোনো অঙ্গীকার নেই, কথার কোনো বুকপিঠ নেই। তাই বিষয়টা খতিয়ে দেখতে প্রেরণ করেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম-কে। তিনি বনু কুরাইযার জনপদ পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এসে বলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি দেখলাম, ওরা দুর্গগুলো মেরামত করছে, মুসলিমদের দিকে আসার রাস্তাগুলো সুগম করছে আর একত্রিত করছে সামানপত্র।[২৮]
বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গের প্রমাণ ও ইঙ্গিত প্রবল হলে আল্লাহর রাসূল ﷺ চারজন ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। সাআদ ইবনু মুআজ, সাআদ ইবনু উবাদাহ, আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা ও খাওয়াত ইবনু জুবাইর। তাদেরকে বনু কুরাইযায় পাঠাবার সময় নির্দেশনা দিয়ে নবিজি বলেন—তোমরা সামনে চলতে থাকবে, দেখবে ওদের ব্যাপারে আমাদের কাছে পৌঁছা সংবাদ সত্য কি না। আমাদের আশঙ্কা সত্য হয়ে থাকলে এমন ইঙ্গিতবাহী শব্দ ব্যবহার করবে, যা শুধু আমিই বুঝব। কাউকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে না। আর অঙ্গীকার রক্ষা করে থাকলে, তা লোকদের মাঝে প্রকাশ করবে।[২৯]
চারজন বের হয়ে বনু কুরাইযায় আসেন। তারা সবকিছু দেখে অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ফিরে আসেন। নবিজিকে ইঙ্গিতে বলেন—'আদল ওয়াল কারাহ।'[৩০] আল্লাহর রাসূল তাদের কথার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেন।[৩১]
বনু কুরাইযার গাদ্দারির ব্যাপারে নবিজি নিশ্চিত হন। সাহাবায়ে কেরাম মনোবল হারাতে পারেন, তাই তাদের অন্তর চাঙ্গা রাখতে সব রকম উপায়-উপকরণ ব্যবহার করেন। পাহারার জন্য তখনই সালামা ইবনু আসলামকে দুশো মুজাহিদের আমীর বানিয়ে ও যাইদ বিন হারিসাকে তিনশ মুজাহিদের আমীর বানিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠিয়ে দেন। বনু কুরাইযাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে সীমানায় নিয়োজিত সাহাবিরা উচ্চকিত আওয়াজে তাকবীর ধ্বনি তোলেন।
এসবের মাঝেই বনু কুরাইযা সম্মিলিত বাহিনীর সাথে শরিক হবার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। ভূমিকাস্বরূপ প্রেরণ করে খেজুর, যব ও তীনফল বোঝাই বিশটি উট। উদ্দেশ্য, তাদেরকে সাহায্য করা ও অবরোধ দীর্ঘ করণে শক্তি জোগানো; কিন্তু সকাল হতেই পাহারারত মুসলিমরা তা বাজেয়াপ্ত করে নেন। সরাসরি নিয়ে আসেন নবিজির কাছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে ইয়াহুদিদের পণ্য মুসলিমদের গানীমাতে পরিণত হয়।[৩২]
দুই. মুসলিমদের ওপর কঠোর অবরোধ, মুনাফিকদের পিছুটান ও মুশরিকদের আক্রমণ
বনু কুরাইযা যুক্ত হবার পর সম্মিলিত বাহিনী মুসলিমদের ওপর অবরোধ কঠিন পর্যায়ে নিয়ে যায়। মুমিনদের কষ্টের পরিধি ব্যাপৃত হয়। অবস্থা হয়ে ওঠে আরও সঙ্গিন। মুসলিমদের ওপর আপতিত এই যন্ত্রণাময় অবস্থার বর্ণনা খুব সুন্দরভাবে দিয়েছে কুরআন। ভয় ও শঙ্কার কথা ফুটিয়ে তুলেছে অতি চমৎকারভাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'যখন তারা তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল উচ্চ ভূমি ও নিম্নভূমি থেকে এবং যখন তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছিল, প্রাণ হয়েছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে। সে সময়ে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল।' (সূরা আহযাব: ১০-১১)
তবে প্রকৃত মুমিনদের অন্তরে আল্লাহর ব্যাপারে আস্থা ছিল অবিচল। আল্লাহ তাআলা সে কথা ব্যক্ত করে বলেন—
'মুমিনরা বহুজাতিক বাহিনী দেখে বলল, এটা সেই বিষয়, যার ওয়াদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের সাথে করেছিলেন। এরপর তাদের কেবল ঈমান ও সমর্পণই বৃদ্ধি পেয়েছে।' (সূরা আহযাব: ২২)
কিন্তু মুনাফিকরা ভীত-কম্পিত হয়ে মুসলিম বাহিনী থেকে সরে আসে। তীব্র শঙ্কা জেঁকে বসে ওদের মনে। মাতাব বিন কুশাইর তো বলেই ফেলল 'বনু আমরের ভাইয়েরা, আমার কথা শুনছ, মুহাম্মাদ আমাদেরকে অঙ্গীকার দিয়েছিল আমরা নাকি কিসরা-কাইসারের ধনভান্ডার লাভ করব, অথচ আমরা এখন ইসতিঞ্জায় যেতেও ভয় পাচ্ছি।' অনেকে বাড়ি অরক্ষিত হয়ে পড়ার অজুহাত দেখিয়ে বাসায় যাওয়ার অনুমতি চায়। আসলে তাদের অন্তরে বাসা বেঁধেছিল কাপুরুষতা, ভীরুতা ও মুমিনদেরকে হীনম্মন্য করার নীচ চিন্তা। কিছু দুর্বল ঐতিহাসিক বর্ণনায় মুনাফিকদের কাপুরুষতার কথা আলোচিত হয়েছে;[৩৩] কিন্তু আল্লাহ তাদের কুটিল অবস্থার কথা কুরআনেই ফুটিয়ে তুলেছেন সুন্দর ভঙ্গিমায়।[৩৪] আল্লাহ তাআলা বলেন,
'এবং যখন তাদের এক দল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, এটা টিকবার মতো জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চলো। তাদেরই একদল নবির কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়িঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা। যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না; অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। বলুন, তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন করো, তবে এ পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না। তখন তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে। বলুন, কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করবে, যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন অথবা তোমাদের প্রতি অনুকম্পার ইচ্ছা? তারা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যদাতা পাবে না। আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে এসো। তারা কমই যুদ্ধ করে। তারা তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যু ভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উলটিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। অতঃপর যখন বিপদ টলে যায়, তখন তারা ধনসম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরীতে অবতীর্ণ হয়। তারা মুমিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্য সহজ। তারা মনে করে শত্রু বাহিনী চলে যায়নি। যদি শত্রু বাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা গ্রামবাসীর মধ্য থেকে তোমাদের সংবাদাদি জেনে নিত, তবেই ভালো হতো। তারা তোমাদের মধ্যে অবস্থান করলেও যুদ্ধ সামান্যই করত।' [সূরা আহযাব: ১৩-২০]
মুশরিকরা পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। প্রতি রাতে বিশাল এক অশ্বারোহী বাহিনী পরিখার পার ঘেঁষে ঘুরতে থাকে। ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত তারা চেষ্টা করে যায়। খালিদ বিন ওয়ালিদ তখন অমুসলিম; কুরাইশের কিছু অশ্বারোহী নিয়ে মুখিয়ে থাকেন কখন মুসলিমরা একটু অন্যমনস্ক হবে এবং তিনি এই সুযোগে পরিখা অতিক্রম করে ঝাঁপিয়ে পড়বেন! এদিকে উসাইদ বিন হুদাইর দুশো সাহাবি নিয়ে তার প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। ফলে খালিদের ব্যগ্রতা দীর্ঘ হতে থাকে।
এরই মাঝে মুখোমুখি সংঘাতের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। দুপাশ থেকে শুরু হয় তির নিক্ষেপের যুদ্ধ। এ সময় নবিজির চাচা হামযার হত্যাকারী ওয়াহশির বর্ষার আঘাতে শহীদ হন তুফাইল ইবনু নুমান।[৩৫] ওদিকে মুশরিকদের পক্ষ থেকে হিব্বান ইবনুল আরাকা একটি তির নিক্ষেপ করে। নিক্ষেপের সময় বলছিল, 'এই নাও আমার উপহার। আমি ইবনুল আরাকা।' এটা এসে বিদ্ধ হয় সাআদ ইবনু মুআজ-এর বাহুর মাঝখানে। এতে এমন একটি রগ কেটে যায়, যার ফলে রক্তঝরা বন্ধ করা যাচ্ছিল না। আক্রান্ত হয়ে ইবনু মুআজ দুআ করে বলেন—
'হে আল্লাহ, কুরাইশের সাথে যুদ্ধ বাকি থাকলে আপনি আমাকে জীবিত রাখুন। আমি আপনার জন্য তাদের সাথে যুদ্ধ করব। কারণ, আপনার রাসূলকে যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাকে পিতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য করেছে, তাদের সাথে জিহাদ করার চেয়ে আমার কাছে প্রিয় আর কিছু নেই। হে আল্লাহ, আমি মনে করছি, আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে যুদ্ধের ইতি টানবেন। যদি আমাদের ও তাদের মাঝে যুদ্ধ স্তিমিত করে থাকেন, তা হলে আমার এই রক্ত প্রবাহিত করুন, এতেই আমার মৃত্যু নির্ধারণ করুন।[৩৬] আল্লাহ তাআলা শ্রেষ্ঠতম এই আনসার সাহাবির দুআ কবুল করেন।
অবরোধের সময়টাতে একবার মুশরিকরা শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে নবিজির অবস্থানস্থলের দিকে অভিমুখী হয়। মুসলিমরা রাত পর্যন্ত এদের সাথে যুদ্ধ করেন। সেদিন আসরের সালাতের সময় বাহিনীটা আরও কাছে চলে আসে। নবিজি এবং তাঁর সঙ্গী সাহাবিদের কেউই সালাত আদায় করতে পারেননি। প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়েই তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। পরে এই সালাত ছুটে যাবার কষ্ট থেকে তারা আল্লাহকে ডেকে বললেন 'হে আল্লাহ, আপনি তাদের বাড়িঘর, সমাধিগুলো আগুনে ভস্ম করে দিন, যেমন তারা আমাদেরেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মধ্যবর্তী সালাত থেকে ব্যস্ত রেখেছে।'[৩৭]
তিন. গাতফানের সাথে গোপন সন্ধি করে অবরোধের তেজ শীতল করবার প্রচেষ্টা এবং শত্রু বাহিনীতে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা:
১. গাতফানের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নবিজির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে নবিজি গাতফানকেই সন্ধির জন্য নির্বাচন করেন। শর্ত হলো, যুদ্ধ ত্যাগ করে নিজেদের শহরে ফিরে যাবে। নিঃসন্দেহে নবিজি এখানে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি জানেন, মুশরিকদের সাথে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পেছনে গাতফানের এমন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই, যা তারা অর্জন করতে চায়, কিংবা আকীদাগত এমন কোনো বিষয় নেই, যে কারণে তারা যুদ্ধ করতে পারে; বরং তাদের প্রধান লিপ্সা হলো মাদীনা দখলের পর এখানকার ধনসম্পদ লুট করা। এ কারণে আল্লাহর রাসূল সম্মিলিত বাহিনীর ইয়াহুদি নেতা হুয়াই বিন আখতাব, কিনানাহ ইবনুর রাবী; কিংবা কুরাইশের নেতা আবু সুফিয়ানের সাথে আলোচনার চেষ্টা করেননি।
কারণ যুদ্ধের পেছনে এদের উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক ও আকীদাহ-সংক্রান্ত। ইসলামকে সমূলে ধ্বংস করে এরা বিশেষ লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। যে রকম কোনো ব্যাপার গাতফান গোত্রের নেই। এ জন্যেই নবিজি কেবল গাতফানের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এরা আল্লাহর রাসূলের প্রস্তাব গ্রহণে দ্বিধার দোলাচালে দোলেনি। বরং গাতফানের দুই নেতা উয়াইনাহ ইবনু হিসন ও হারিস ইবনু আউফ নবিজির ডাকে সাড়া দিয়ে কিছু গোয়েন্দাকে সাথে নিয়ে পরিখার এপারে চলে আসে। আল্লাহর রাসূলের সাথে গোপনে মিলিত হয়।[৩৮]
দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকে প্রথমে আল্লাহর রাসূল কথা শুরু করেন। প্রস্তাবিত এই গোপন ঐক্যটির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল নিম্নরূপ—
ক. বহুজাতিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত শুধু গাতফানের সেনা ও মুসলিমদের মাঝে এককভাবে সন্ধি স্থাপিত হবে।
খ. গাতফান মুসলিমদের থেকে বিদায় নেবে। মাদীনার বিরুদ্ধে সব ধরনের যুদ্ধ সম্পর্কিত বিষয় থেকে বিরত থাকবে। বিশেষ করে এই অবরোধের সময়ে।
গ. গাতফানের লোকেরা অবরোধ বাতিল করবে এবং মিত্র বাহিনী থেকে সরে আসবে। সেনাদেরকে সরিয়ে নিয়ে ফিরে যাবে নিজেদের শহরে।
ঘ. এর বিনিময়ে মুসলিমরা গাতফানকে দেবে মাদীনার এক-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন ধরনের খেজুর। প্রকাশ থাকে যে, গাতফানিরা এটা পাবে এক বছরের জন্য।[৩৯]
ওয়াকিদি উল্লেখ করেন, আল্লাহর রাসূল গাতফানের নেতাদ্বয়কে বললেন, তোমরা ভেবে দেখো, আমি তোমাদেরকে মাদীনার এক-তৃতীয়াংশ খেজুর দিলে তোমরা বাহিনী নিয়ে ফিরে যাবে, বেদুইনদেরকে ত্যাগ করবে?
নেতা দুজন বলল, আপনি আমাদেরকে মাদীনার অর্ধেক খেজুর দিলে আপনার শর্ত মেনে নেব। নবিজি বললেন, না, আমি এর বেশি দিতে পারব না। অবশেষে তারা এতেই রাজি হয়। সিদ্ধান্তের সময় ঘনিয়ে এলে নিজেদের দশজন ব্যক্তিকে নিয়ে চলে আসে।[৪০]
সামরিক দিক থেকে গাতফানিরা আল্লাহর রাসূলের প্রস্তাব গ্রহণ করার প্রতি আগ্রহী হবার কারণ হলো, তাদের কাছে যুদ্ধে বের হবার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। তারা মূলত এসেছিল সামনে থেকে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে। এখন সন্ধির মাধ্যমে তাদেরকে প্রশমিত করায় মিত্র বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ শক্তি লোপ পেয়েছে। দুর্বল হয়েছে অভ্যন্তরীণ শক্তি। নবিজিও সক্ষম হয়েছেন বহুজাতিক বাহিনীর ঐক্যের শক্তি ও উদ্যমতা হ্রাস করতে।[৪১]
সংকটময় মুহূর্ত জটিল হলে তা সমাধা করার অত্যন্ত কার্যকরী কৌশল আল্লাহর রাসূল এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় শিক্ষা দিয়েছেন। যেন পরবর্তী মুসলিম প্রজন্ম বিপদের ঘনঘটায় এই পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিতে পারে।[৪২]
আল্লাহর রাসূল গাতফানিদের সাথে সন্ধি করার আগে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। তারা পরামর্শ দেন, মাদীনার ফলমূলের একটা কনাকড়িও যেন দেওয়া না হয়। সাআদ ইবনু মুআজ ও সাআদ ইবনু উবাদাহ নবিজিকে বলেন—ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা কি আপনি পছন্দ করছেন, তা হলে আমরাও করব, না আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যার ওপর আমল করা আমাদের জন্য আবশ্যক, নাকি আপনি আমাদের জন্য কিছু করতে চাচ্ছেন?'
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, আল্লাহর কসম, আমি এমনটা এ কারণে করতে চাচ্ছি যে, আমি আরবদেরকে দেখছি, ওরা সমগ্রভাবে তোমাদের একই ধনুকের নিশানা বানিয়েছে। তোমাদেরকে কুকুরের মতো ঘিরে ধরেছে চারপাশ থেকে। আমি চাচ্ছিলাম তোমাদের ব্যাপারে তাদের দাপট ও শক্তি যেন চূর্ণ হয়।
সাআদ ইবনু মুআজ রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওরা ও আমরা আগে আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করতাম, প্রতিমা পূজা করতাম। আল্লাহর ইবাদাত করতাম না, তাঁকে চিনতামই না! সেই সময়েই ওরা আমাদের এখান থেকে একটি ফলও কিনে নেওয়া ছাড়া খাওয়ার আশা করত না; কিন্তু এখন যখন আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, তার দিকে প্রদর্শিত করেছেন, আপনার মাধ্যমে করেছেন শক্তিশালী, এখন নাকি আমাদের সম্পদ ওদেরকে দেব!? এর কোনো দরকার নেই। তারা পাবে শুধু আমাদের তরবারির আঘাত; আল্লাহ আমাদের ও তাদের মাঝে ফায়সালা করা পর্যন্ত আমরা থামব না।
নবিজি বললেন, ঠিক আছে, তোমরা যেমনটা মনে কর।
তখনই সাআদ ইবনু মুআজ রা. সন্ধিচুক্তির কাগজটা এনে সব লেখা মুছে ফেলেন। দৃঢ় স্বরে বলেন—ওরা আমাদের বিরুদ্ধে চেষ্টা করে দেখুক।[৪৩]
দুই আনসার সাহাবি সাআদ ইবনু মুআজ রা. ও সাআদ ইবনু উবাদাহ রা. ছিলেন আল্লাহর জন্য চূড়ান্ত সমর্পিত এবং আল্লাহর রাসূলের সামনে বিনম্র শ্রদ্ধাবনত; কিন্তু সৃষ্ট পরিস্থিতিতে গাতফানিদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে তারা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন।
প্রথমত: গাতফানিদেরকে মাদীনার ফলমূল দেওয়ার সিদ্ধান্ত আল্লাহর হয়ে থাকলে এখানে মত প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই। মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক।
দ্বিতীয়ত: ভালো মনে করে এটাকে আল্লাহর রাসূল পছন্দ করেছেন। এখানে তাঁর মতও অগ্রগণ্য, তাঁর আনুগত্য করাই শ্রেয়।
তৃতীয়ত: আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে তাদের কল্যাণের জন্য এই কাজটা করতে চাচ্ছেন। এখানে সাহাবায়ে কেরাম মত প্রকাশের সুযোগ রাখেন।
সাআদ ইবনু উবাদা ও সাআদ ইবনু মুআজের কাছে যখন স্পষ্ট হলো নবিজি তৃতীয় মত পোষণ করছেন, তখন তারা গাতফানের দুই নেতাকে দীপ্ত কণ্ঠে শক্ত উত্তর দিয়েছেন এবং তারাও এটাই লিখে নিয়েছে। আনসার সাহাবিরা স্পষ্ট করেন, এই সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে জাহিলি যুগেই তারা মাগনা কিছু দেননি, এখন কীভাবে দিয়ে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করবেন, যখন আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত ও শক্তিশালী করেছেন!
দুই সাআদের জবাবে আল্লাহর রাসূল মুগ্ধ হন। আনসারিদের উচ্চ মনোবল ও মজুবত প্রাণশক্তি তাঁকে তাদের ব্যাপারে দারুণ ধারণা দেয়। গাতফানিদের সাথে সন্ধির আলোচনা এখানেই শেষ হয়।[৪৪]
ওদিকে নবিজি যে বলেছিলেন, আমি দেখছি আরবরা তোমাদেরকে একই ধনুকের নিশানা বানিয়েছে[৪৫]—এ কথা প্রমাণ করে, গাতফানিদের সাথে সন্ধির মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল-এর উদ্দেশ্য ছিল, শত্রুরা যেন সাহাবিদের বিরুদ্ধে একই সারিতে এসে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে। এটা মুসলিম জাতিকে কিছু গুরত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নির্দেশ করে মুসলিমরা চেষ্টা করবে শত্রুদের শক্তিতে ফাটল সৃষ্টি করতে।
মুসলিম নেতৃত্বের রণকৌশলের একটি লক্ষ্য থাকবে যারা নিরপেক্ষ থাকতে চায়, তাদেরকে নিরপেক্ষ রাখা; তবে নেতৃত্বশীলরা মাশওয়ারা, ফাতওয়া এবং ইসলামের স্বাতন্ত্র্যের কথা ভুলে গেলে চলবে না।[৪৬]
আর সাহাবিদের কাছে নবিজি পরামর্শ চেয়ে আমাদের সামনে পরিষ্কার করে দিয়েছেন নেতৃত্বের পন্থা ও সামরিক সকল কাজে পরামর্শের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। সুতরাং আমাদের কাজ হবে মাশওয়ারা ভিত্তিক। একক পরামর্শ ও সিদ্ধান্তে কোনো কাজ হবে না। কারণ, ওয়াহির দরজা বন্ধ, নবুওয়াতের সিলসিলাও জারি নেই; সুতরাং আমাদের যেকোনো কাজে রাসূলুল্লাহর শেখানো পন্থায় মাশওয়ারার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।[৪৭]
সন্ধির পরিকল্পনা বাতিল করণে আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের মতামত মেনে নেওয়া প্রমাণ করে 'প্রকৃত নেতা ও তার সেনাদের মাঝে নির্মিত সম্পর্ক থাকবে পাহাড়ের মতো মজুবত। নেতা তাদের কদর বুঝবেন, তারাও নেতাকে যথার্থ অর্থে সমীহ করবে, নেতা তাদের মতামতকে সম্মান করবেন, তারাও নেতার মতামতকে শ্রদ্ধা করবে।' গাতফানের দুই নেতার সাথে সন্ধির প্রস্তাবকে বিবেচনা করা হবে একটি শারঈ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে, যেখানে উম্মাহর ভেতর সঠিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পরিলক্ষিত হবে কিছু কল্যাণ; আর কিছু আপাত না-খুশি।[৪৮]
প্রস্তাবিত এই সন্ধিতে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থান তিনটি অর্থ বহন করে—
ক. যেকোনো বিষয়ে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মুসলিমদের বিনয় মিশ্রিত সাহসিকতা একটি বিশেষ দলের প্রয়োজনীয়তা তাগিদ করে, যদি এর প্রয়োজন দেখা দেয়।
খ. মুসলিমদের শ্রেষ্ঠাংশের মর্যাদাময় অবস্থান আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামের সাথে দৃঢ় সম্পর্কের কথা উন্মোচিত করেছে।
গ. সংকটময় মুহূর্তগুলোতে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাসের চিত্র স্পষ্ট করেছে। অনেক সময় শত্রুদের সংখ্যা বেশি হতে পারে, দাপট হতে পারে ভয়ংকর; কিন্তু তা মোকাবিলা করতে হবে সবর, ধৈর্য ও অসীম সাহসিকতা দিয়ে।[৪৯]
২. শত্রুদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে দিতে নবিজির পদক্ষেপ
সম্মিলিত বাহিনীর মাঝে ফাটল সৃষ্টি করার অস্ত্র ব্যবহার করেন নবিজি। আল্লাহর রাসূল জানেন, শত্রু বাহিনীর মাঝে সুপ্ত ফাটল আগে থেকেই বিদ্যমান আছে। নবিজি চাইলেন তা প্রকাশ্যে এনে প্রশস্ত করতে এবং এর সুবিধা ভোগ করতে। গাতফানিদের লালসার বিষয়টা আগেই প্রকাশ পেয়েছে, এর ফলে দুর্বল হয়েছে তাদের সংকল্প। আর এদিকে একদিন নুআইম ইবনু মাসঊদ গাতফানি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে ইসলামের কথা প্রকাশ করে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার গোত্রের লোকেরা আমার ইসলাম সম্পর্ক কিছুই জানে না। কাজেই আপনি আমাকে যেকোনো কাজের নির্দেশ দিতে পারেন।
নবিজি বললেন, নুআইম—আমাদের মাঝে তুমিই একমাত্র ব্যক্তি। পারলে আমাদের পক্ষ থেকে এদেরকে প্রলুব্ধ করতে পারো। কেননা, যুদ্ধে কূট-কৌশলের অংশ আছে।[৫০]
কাজের অনুমতি পেয়ে নুআইম ইবনু মাসউদ নবিজির কাছ থেকে উঠলেন মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া বিভিন্ন দলের মাঝে সন্দেহের বীজ বপন করার জন্য। প্রথমে তিনি কুরাইশের কাছ থেকে বন্ধক চাওয়ার ক্ষেত্রে ইয়াহুদিদেরকে প্ররোচিত করলেন। যেন কুরাইশ তাদের ছেড়ে অবরোধ উঠিয়ে পালিয়ে না যায়। অপরদিকে কুরাইশের কাছে এসে বললেন, মুসলিমদের কাছে সোপর্দ করার জন্য ইয়াহুদিরা তোমাদের কাছে জামিন চাইবে, তাদের সাথে কৃত সন্ধিচুক্তিতে ফিরে যাওয়ার জন্য।
নুআইম ইবনু মাসউদের এই কূটচালে উভয় দল বিভ্রান্ত হয় এবং তাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তার এই কাহিনি শারঈ রাজনীতির সাথে যুদ্ধে প্ররোচনার দিকটা বিরোধী নয়—মর্মে প্রসিদ্ধি পায়।[৫১]
নুআইম ইবনু মাসঊদ তার কাজে সফল হয়ে দলগুলোর মাঝে সন্দেহের বীজ বপন করতে সক্ষম হন। ফলে তাদের বিশ্বাসের জায়গাটাতে বিদ্যমান ফাটল আরও প্রশস্ত হয়। এতে তাদের মৈত্রীশক্তি চূর্ণ হয়, সংকল্প হয়ে যায় নড়বড়ে। আর নুআইম ইবনু মাসউদ তার প্রচেষ্টায় সফল হবার অন্যতম কারণ হলো, প্রত্যেকের কাছে নিজের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা গোপন রেখেছিলেন। তাই তার প্রস্তাবিত কথা সবাই বিশ্বাস করেছে।
তিনি বনু কুরাইযার সামনে বনু কাইনুকা ও বনু নাজীরের পরিণতির কথা উল্লেখ করেন, তাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন আল্লাহর রাসূলের সাথে যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হতে পারে। এই কথাটিই প্রধানতম ভূমিকা রেখেছে তাদের চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা পরিবর্তনে।
প্রত্যেক পক্ষ যেন তার কথা গোপন রাখে, এখানেও তিনি সফল হয়েছেন, এই গোপনীয়তাই উদ্দেশ্য পূরণে বড়ো ভূমিকা রেখেছে। কোনো এক পক্ষের কাছে তার গোপন কথা প্রকাশ পেলে তিনি নিশ্চিত ফেঁসে যেতেন। ব্যর্থ হতো তার পরিকল্পনা। এভাবেই নুআইম বিন মাসঊদ আহযাব যুদ্ধে বিরাট এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।[৫২]
টিকাঃ
[২৭] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ১১
[২৮] ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৪৫৭
[২৯] ইবনু হিশাম, ৩/২৩২ বাইহাকি রচিত দালায়িলুন নুবুওয়াহ, ৩/৪২৯
[৩০] হুযাইলের দুটি শাখাগোত্র, যারা এর আগে 'যাতুর রাজী' স্থানে সাহাবিদের সাথে গাদ্দারি করেছিল।
[৩১] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/৯৫
[৩২] আস-সীরাতুল হালবিয়্যাহ, ২/৩২৩
[৩৩] তাবারানী রচিত মুজামুল কাবীর, ১১/৩৭৬
[৩৪] আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ, ২/৪২৪
[৩৫] হাদিসুল কুরআনিল কারীম আন গাযওয়াতির রাসূল, ২/৪২৪
[৩৬] আহমাদ, ৬/১৪১। ইবনু হিব্বান, ৭০২৮
[৩৭] বুখারি, ২৯৩১। মুসলিম, ৬২৭
[৩৮] মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমীল রচিত গাযওয়াতুল আহযাব, পৃ. ২০১
[৩৯] প্রাগুক্ত, পৃ. ২০১, ২০২
[৪০] ওয়াকিদি রচিত মাগাযি, ২/৪৭৭
[৪১] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যা ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪১৩
[৪২] সাদিক উরজুন রচিত মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, ৪/ ১৭৬
[৪৩] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/ ১০৬
[৪৪] হুমাইদি রচিত আত তারীখুল ইসলামী, ৬/১২৫
[৪৫] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১০৬
[৪৬] আল-আসাস ফিস সুন্নাহ, ২/৬৮৭
[৪৭] আল-আবকারিয়্যাতুল আসকারিয়্যা ফি গাযওয়াতির রাসূল, পৃ. ৪১৪
[৪Index] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪১৪
[৪৯] প্রাগুক্ত; পৃ. ৪১৫, ৪১৬
[৫০] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/ ১১৩
[৫১] সহীহ সীরতুন নাবী, ২/ ৪৩০
[৫২] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যা ফি আহদির রাসুল, পৃ. ৪৭৭
📄 অবশেষে মহান আল্লাহর সাহায্য ও কুরআনে আহযাব যুদ্ধের বর্ণনা
এক. নবিজির একান্ত মিনতি, এলো আল্লাহর সাহায্য
আল্লাহর রাসূল একান্ত মিনতি ভরে অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন; বিশেষ করে যুদ্ধের সময়ে। এক সময় যখন মুসলিমদের ওপর দুর্ভোগ আগের চেয়ে কঠিন আকার ধারণ করে, প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হবার উপক্রম হয়, অন্তর কেঁপে ওঠে বিভীষিকায়, তখন সাহাবায়ে কেরাম নিরুপায় হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের কি কিছু বলার সুযোগ আছে? আমাদের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত!'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'হ্যাঁ অবশ্যই—হে আল্লাহ, আমাদের দোষত্রুটি গোপন রাখুন, ভীতি দূর করে নিরাপত্তা দান করুন।' (আহমাদ, ৬/৩, বাযযার, ৩১১৯)
সহীহ বুখারি ও মুসলিমে আছে, আবদুল্লাহ ইবনু আবি আওফা বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বদ দুআ করে বলেন—'হে আল্লাহ, তুমি কিতাব অবতীর্ণকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী, এই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করো। হে আল্লাহ, তাদেরকে পরাভূত করো, সমূলে কাঁপিয়ে দাও।' (বুখারি, ২৯৩৩। মুসলিম, ১৭৪২)
আল্লাহ নবিজির দুআ কবুল করে বিজয় ও প্রশান্তির সুবার্তা পাঠান। তিনি তাঁর অসীম কুদরতে শত্রু বাহিনীকে পরিখার পাশ থেকে সরিয়ে দেন, চূর্ণ করে দেন তাদের ঐক্য। এরপর প্রবল শৈত্যপ্রবাহ পাঠিয়ে তাদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন। শেষে নিজের পক্ষ থেকে পাঠান এক বিশেষ বাহিনী। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন—
'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্য বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা আহযাব: ০৯)
ইমাম কুরতুবি বলেন—'এই প্রবল শৈত্যপ্রবাহ ছিল আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর একটি দীপ্যমান মু'জিযা। কেননা, নবিজি ও সাহাবায়ে কেরাম পরিখার কাছেই ছিলেন, শত্রুদের সাথে শারীরিক দূরত্ব ছিল শুধু এই পরিখা; অথচ শৈত্য প্রবাহের প্রবল আক্রোশে মুসলিমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন। যেখানে কাছাকাছি দূরত্বে এই প্রবাহে শত্রুদের বিশাল বাহিনী নাকাল, মুসলমানরা তার আবহ টেরই পাননি। অধিকন্তু, আল্লাহ তাআলা মুশরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ফেরেশতা পাঠান। তারা এসে তাঁবুর খুঁটি উপড়ে ফেলেন, শামিয়ানার রশি কেটে দেন, নির্বাপিত করেন মশালের আগুন, উলটে ফেলেন খাবারের পাতিল। ঘোড়াগুলো চক্কর খেতে থাকে একটা আরেকটার সাথে।
শেষ পর্যায়ে ফেরেশতারা তাদের অন্তরে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। শত্রু বাহিনীকে ঘিরে ফেরেশতাদের তাকবীর ধ্বনি গুঞ্জরিত হতে থাকে, সৃষ্টি হয় ভীতিকর এক অবস্থা। এক সময় অস্থির হয়ে প্রত্যেক তাঁবুর নেতা হাঁক ছেড়ে ডাকতে থাকে, 'ওহে অমুক, আমার কাছে এসো...'। সবাই একত্রিত হলে নেতা বলে, আমরা মুক্তি চাই, মুক্তি চাই। এর কারণ একটাই, আল্লাহ তাদের অন্তরে ভয়াবহ আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছেন।[৫৩]
আল্লাহর রাসূল সাহাবায়ে কেরাম ও সকল মুসলিমকে দীপ্তভাবে জানিয়ে দিলেন, 'দশ হাজার সৈন্যের এই বিশাল বাহিনীকে মুসলিমরা যুদ্ধ করে পরাজিত করতে পারত না। সম্মুখ যুদ্ধেও যেকোনো কৌশলে তাদের পরাজিত করা সম্ভব হতো না; বরং আল্লাহ একাই তাদের পরাজিত করেছেন। এ কথা স্মরণ রাখতে আল্লাহ কুরআনে বলছেন—
'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্য বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা আহযাব: ০৯)
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলতেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহা নেই, তিনি এক। তিনি তাঁর বাহিনীকে শক্তিশালী করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, সম্মিলিত বাহিনীকে একাই করেছেন পরাজিত, সুতরাং তাঁর পরে আর কেউ নেই।' (বুখারি, ৪১১৪। মুসলিম, ২৭২৪)
নবিজি তাঁর রবকে মিনতিভরে ডেকেছেন, ভরসা করেছেন শুধু তাঁরই ওপর। তাই বলে মানবীয় উপায় অবলম্বন করা সাহায্য-প্রার্থনার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এই যুদ্ধে তিনি বাহ্যিক উপায়-উপকরণও কাজে লাগিয়েছেন। চেষ্টা করেছেন দলগুলোর মাঝে ফাটল সৃষ্টি করতে, তুলে দিতে অবরোধ।[৫৪]
আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন বাহ্যিক কৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি আবশ্যক হলো আল্লাহর দিকে অভিমুখী হওয়া ও একনিষ্ঠ দাসত্বে তাঁর কাছে সমর্পিত হওয়া। কেননা, শক্তিশালী কোনো মাধ্যমই কাজে আসবে না, যদি না পূর্ণ মিনতিভরে আল্লাহর দিকে অভিমুখী হয়ে তাঁর কাছে সাহায্য ও সফলতা চাওয়া না হয়। আল্লাহর রাসূল আমরণ আল্লাহর কাছে মিনতিপূর্ণ দুআর আমল অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে গেছেন।[৫৫]
দুই. শত্রু বাহিনী প্রস্থানের খবর সংগ্রহ
আল্লাহর রাসূল সম্মিলিত বাহিনীর সার্বিক খোঁজখবর রাখছিলেন এবং তিনি চাচ্ছিলেন সামনে কী ঘটতে চলেছে, তা অনুসন্ধান করে দেখতে। এ উদ্দেশ্যেই তিনি সাহাবিদের লক্ষ করে বলেন,
'কে আছ, শত্রু বাহিনীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমাকে জানাতে পারবে? কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আমার সাথে রাখবেন।' এই পদ্ধতিতে কাজ না হতে দেখে দৃঢ়তাসূচক পন্থা গ্রহণ করেন। নির্দিষ্ট নাম উচ্চারণ করে বলেন— 'হুজাইফা দাঁড়াও, ওদের খবর নিয়ে এসো। তবে ওদের কাউকে আঘাত করবে না।' (মুসলিম, ১৭৮৮)
হুজাইফা বলেন—'নির্দেশ পেয়ে আমি চলা শুরু করলাম। আমি যেন উষ্ণ আবহের ভেতর দিয়ে চলছিলাম। বিন্দু পরিমাণ শীত অনুভূত হচ্ছিল না। এক সময় সামনেই আবু সুফিয়ানকে দেখতে পাই। কনকনে এই শীতে উষ্ণতা পেতে আগুন জ্বালিয়েছে। আমি ধনুকে তির লাগিয়ে নিক্ষেপের ইচ্ছা করলাম; কিন্তু আল্লাহর রাসূলের কথা মনে পড়ে গেল। কাউকে আঘাত করতে তিনি নিষেধ করেছেন। আমি তির ছুড়লে অবশ্যই তাকে আক্রান্ত করতে পারতাম।
খবর সংগ্রহ করে আমি ফিরে আসছি। এবারও যেন আগের মতোই চলছিলাম—উষ্ণ আবহের ভেতর দিয়ে। এতক্ষণে আমার সর্দি লেগে গেছে। বিলম্ব না করে নবিজির কাছে ফিরে এসে সবকিছু খুলে বললাম। তিনি আমার অবস্থা দেখে একটা কাপড়ের অতিরিক্ত অংশ দিয়ে আমাকে আচ্ছাদিত করলেন। অন্যরকম উষ্ণতার পরশে আমি সকাল পর্যন্ত ঘুমালাম। সকাল হলে আল্লাহর রাসূল ডেকে বললেন, ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তি, ওঠো...!' (মুসলিম, ১৭৮৮)
হুজাইফা-এর ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো: আল্লাহর রাসূল সুপ্ত প্রতিভার সাথে পরিচিত ছিলেন। তাই তো দুশমনের ভেতরে ঢুকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নির্বাচন করেছেন হুজাইফা-কে। কেননা, তার ব্যক্তিত্বে বিদ্যমান ছিল বিরল বীরত্ব ও গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের অপার দক্ষতা। ফলে এই কাজের জন্য তার মতো সাহাবিরই প্রয়োজন ছিল। হুজাইফা সামরিক শৃঙ্খলার প্রতি পূর্ণ খেয়াল রেখেছিলেন। একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন দুশমন বাহিনীর নেতাকে হত্যার জন্য। এ কাজে অগ্রসর হবার চিন্তাও করছিলেন, ঠিক তখনই মনে পড়ে যায়, আল্লাহর রাসূল তাকে শুধু সংবাদ-সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন, কাউকে আঘাত করতে বরং বারণ করেছেন। ফলে তিনি ধনুক থেকে তির সরিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন।[৫৬]
ওলিদের কারামাতের সত্যতা স্পষ্ট হয়। হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান যখন সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হন, তখন প্রচণ্ড বেগে শৈত্যপ্রবাহ প্রবাহিত হচ্ছিল; কিন্তু তিনি এসবের কিছুই অনুভব করেননি; বরং উষ্ণ আবহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। নিজেদের মাঝে ফিরে আসা পর্যন্ত তার এই অবস্থা অব্যাহত ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, এটি একটি কারামাত, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করে থাকেন।[৫৭]
হুজাইফা ফিরে আসবার পর তার সাথে নবিজি-এর মমতার আচরণ। স্বভাবত নবিজি ছিলেন সাহাবিদের প্রতি মমতাময়। হুজাইফার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে তাকে রাতের সালাত ও মুনাজাতে কাছে টেনেছেন। এই হুজাইফাই তো একটু আগে নিয়ে এসেছেন মুসলিমদের জন্য শুভ বার্তা ও সত্য সংবাদ! এরপর তার ক্লান্তির কথা ভেবে তাকে সালাতের কাপড় দিয়ে জড়িয়েছেন, সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত এভাবেই রেখেছেন। জাগিয়েছেন একদম ফরজ সালাতের সময় নরম স্নেহময় কণ্ঠে। বলেছেন, 'ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তি, ওঠো...!' এ আহ্বানে যেন মিষ্টতা ঝরে ঝরে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার স্নিগ্ধতা ও সুবাস। নবিজির কণ্ঠে এমনই কোমলতা, নম্রতা ও মিষ্টতা লেগে থাকত, সাহাবিদের তিনি এভাবেই সম্বোধন করতেন।[৫৮] তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
'মুমিনদের প্রতি তিনি দয়ার সাগর, মমতাময়।' (সূরা তাওবা: ১২৮)
সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই ছিলেন উপস্থিত বুদ্ধিতে অনন্য। হুজাইফা কুরাইশের লোকদের ভেতর প্রবেশ করেছিলেন। আবু সুফিয়ান কিছু একটা টের পেয়ে সাথিদের বলল, 'তোমরা সবাই পাশের ব্যক্তির হাত ধরো।' হুজাইফা বলেন—'আমি তাদের মাঝেই ছিলাম। বেগতিক অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য আমার ডান পাশের ব্যক্তির হাতে হাত রেখে বললাম, 'তুমি কে?' সে বলল, 'মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান।' এভাবে বাম পাশের লোকটার হাত ধরে বললাম, 'তুমি কে?' সে বলল 'আমর ইবনুল আ'স।'[৫৯] উপস্থিত বুদ্ধিতে আগে আগে জিজ্ঞেস করে ফেলার পর কেউ আর তাকে প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়েনি। এভাবেই হুজাইফা নাজুক মুহূর্ত সামাল দিয়েছেন। দুশমনের সামনে প্রশ্নের সুযোগই রাখেননি।[৬০]
তিন. কুরআনে আহযাব যুদ্ধের বিবরণ ও ফলাফল
কুরআনুল কারীম আহযাব যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছে। বলেছে—সব কিছু আল্লাহ-এর অধীন। কুরআনুল কারীম এই আহযাব ও কুরাইযা যুদ্ধের কথা লিখিত রেখেছে। এই লেখনী চিরকালীন, সময়ের বিবর্তনে মুছে যাবে না। মুসলিমরা সর্বকালেই এই দৃষ্টান্ত সামনে রাখবে, তারা ঘরবাড়ি কিংবা শহর রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে না। স্মরণ রাখবে—শত্রু আসতে পারে কুকুরের মতো চারপাশ থেকে।
কুরআন আহযাব ও বনু কুরাইযা যুদ্ধের কথা পুনরাবৃত্তির মতো ব্যক্ত করেছে, যেন মুসলিম জাতি ঘটনাবহুল এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিতে পারে।[৬১] কুরআনে বর্ণিত আহযাব যুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃশ্যত হয়,
মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সমূহ নিয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন—'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্য বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।' (সূরা আহযাব: ০৯)
সম্মিলিত বাহিনী মাদীনাকে ঘেরাও করার কারণে মুসলিম জাতিকে যে দুশ্চিন্তা গ্রাস করেছিল, সে চিত্র ফুটে উঠেছে কুরআনে। যেমন: 'যখন তারা তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল উচ্চভূমি ও নিম্নভূমি থেকে এবং যখন তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছিল, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে।' (সূরা আহযাব: ১০)
মুনাফিকদের নিকৃষ্ট মনোভাব, নিন্দিত চরিত্র, কাপুরুষতা, অমার্জনীয় গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতা এবং চুক্তি ভঙ্গের গোপন দুর্ভিসন্ধি প্রকাশ করেছে কুরআন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদের দেওয়া আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।' (সূরা আহযাব: ১২)
পৃথিবীর সর্বকালের সব জায়গার মুমিনদেরকে কথা, কাজ ও জিহাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে কুরআন। সর্বোপরি তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সবার জন্য গ্রহণীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—'নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।' (সূরা আহযাব: ২১)
কুরআন মুমিনদের একনিষ্ঠ ঐক্যবদ্ধতার প্রশংসা করেছে। তারা সত্যনিষ্ঠ ঈমান দিয়ে সম্মিলিত বাহিনীর মোকাবিলা করেছে এবং আল্লাহকে দেওয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— 'মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।' (সূরা আহযাব: ২৩)
আল্লাহ তাআলার একটি অপরিবর্তনশীল নির্ধারিত বিধানের কথা ব্যক্ত করেছে কুরআন, তা হলো—চূড়ান্ত বিজয় মুমিনদের জন্য এবং শত্রুরা পরাজিত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—'আল্লাহ কাফিরদের ক্রুদ্ধাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোনো কল্যাণ পায়নি। যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ মুমিনদের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছেন। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।' (সূরা আহযাব: ২৫)
মুমিন বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বিবৃত হয়েছে, যেমন: বনু কুরাইযাহ তাদের সুরক্ষিত দুর্গেই অবস্থান করছিল; কিন্তু আল্লাহ কোনো যুদ্ধ ছাড়াই মুসলিমদের সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছেন, ফলে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য নেমে আসে।[৬২]
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'কিতাবিদের মধ্যে যারা কাফিরদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন। ফলে তোমরা এক দলকে হত্যা করেছ এবং এক দলকে বন্দি করেছ। তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘরবাড়ির, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খণ্ডের মালিক করে দিয়েছেন, যেখানে তোমরা অভিযান করনি। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।'
একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল গাযওয়ায়ে আহযাব। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী এক যোগে শত্রুদের বিরুদ্ধে নিবিষ্ট হয়েছিলেন এবং আবশ্যক করেছেন কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর পরিণতি। যেমন:
'যখন মুমিনরা শত্রু বাহিনীকে দেখল, তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল। মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।' (সূরা আহযাব: ২২-২৩)
ফলাফল:
মুসলিমদের বিজয় অর্জন, শত্রুদের পরাজয় ও বিভক্তি, শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে প্রত্যাগমন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থতায় পরিণত হওয়া।
মুসলিম জাতির অবস্থার পরিবর্তন। প্রতিরোধের সিঁড়ি পালটে এখন অবস্থান নেবেন আক্রমণের ঘাঁটিতে। এদিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহর রাসূল বলেছেন, 'এত দিন আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, এখন আমরা তাদের দিকে যুদ্ধে বের হব।'
এই যুদ্ধেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে বনু কুরাইযার গাদ্দারি প্রকাশ পায়। মুসলিমদের এক কঠিন দুর্দিনে ওরা আল্লাহর রাসূলকে দেওয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করে।
এই আহযাব যুদ্ধ মুসলিমদের ঈমানের সত্যতা, মুনাফিকদের আসল চেহারা ও বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের প্রকৃত চরিত্র সামনে এনেছে। বলতে হয়, এই আহযাব যুদ্ধের বিপদ মুসলিমদের বিশুদ্ধ করেছে; পক্ষান্তরে মুনাফিক ও ইয়াহুদিদের চেহারা থেকে খুলে দিয়েছে মুখোশ।
বনু কুরাইযার যুদ্ধ ছিল আহযাব যুদ্ধেরই ফলাফল। এর ফলে বনু কুরাইযার ইয়াহুদিদের সাথে হিসাবনিকাশের পালা ঢুকে গেছে, যারা কঠিন এক মুহূর্তে আল্লাহর রাসূলের সাথে গাদ্দারি করে অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।[৬০]
চার. বনু কুরাইযা থেকে মুক্তি
খন্দক থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রাসূল অস্ত্র রেখে দেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিকে নির্দেশ দিলেন বনু কুরাইযার সাথে যুদ্ধ করতে। নবিজিও তাঁর সাহাবিদের দ্রুত ওদের দিকে অভিমুখী হতে বলেন। সবাইকে জানিয়ে দেন, বনু কুরাইযার দুর্গ-দেওয়ালে কম্পন সৃষ্টি করে তাদের অন্তরে আতঙ্ক সঞ্চার করতে আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল-কে পাঠিয়েছেন।' বিদায়ের সময় তাগিদ দিয়ে বলেন— 'বনু কুরাইযায় পৌঁছার আগে কেউ যেন আসরের সালাত আদায় না করে।' (বুখারি, ৪১১৯। মুসলিম, ১৭৭০)
সাহাবায়ে কেরাম বনু কুরাইযার দুর্গ ২৫ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখেন।[৬৪] বনু কুরাইযা যখন দেখল, অবরোধে জীবন নাজেহাল হয়ে পড়েছে, বিপদের আবর্ত থেকে বেরোবার কোনো পথ নেই, তখন নিরুপায় হয়ে তারা এই মর্মে আত্মসমর্পণ করতে ও নেমে আসতে সম্মত হয় যে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাআদ ইবনু মুআজকে সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব দেবেন।
বনু কুরাইযা ভেবেছিল, সাআদ ইবনু মুআজকে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হলে তাদের ও আউস গোত্রের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি তাদের প্রতি দয়া দেখাবেন; কিন্তু তা আর হয়নি। সাআদ ইবনু মুআজ খন্দকের দিন তিরের আঘাত পেয়েছিলেন, তাই তাকে বহন করে নিয়ে আসা হয়। তিনি ফায়সালা করেন, 'যুদ্ধে সক্ষম পুরুষদের হত্যা করে সন্তান ও নারীদের বন্দি করা হবে। সম্পদ মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করা হবে। আল্লাহর রাসূল তাকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেন—'তুমি আল্লাহর বিধান মতেই ফায়সালা করেছ।' (বুখারি, ৩০৪৩, ৪১২২। মুসলিম, ১৭৬৮)
মাদীনার বাজারে চারশো ব্যক্তির ওপর ফায়সালা কার্যকর করা হয়। যুদ্ধে সক্ষম পুরুষদের হত্যা করে বেশ কিছু গর্তে নিক্ষেপ করা হয়। স্বল্প সংখ্যক মানুষ ইসলামে প্রবেশ ও ওয়াদা পূর্ণ করার কারণে মুক্তি পায়। সবশেষে বনু কুরাইযার সমস্ত সম্পদ বণ্টন করা হয় মুসলিমদের মাঝে।
গাদ্দারি ও মুসলিমদের চুক্তি থেকে মুক্তিপ্রার্থীদের এটাই ছিল ন্যায়ানুগ প্রতিদান। আসলে এই প্রতিদান তাদের পরিকল্পিত কাজের অনুরূপ। তারা খিয়ানাত করে মুসলিমদের হত্যা করা-সহ তাদের ধনসম্পদ লুটপাট ও বন্দি করতে চেয়েছিল স্ত্রী-সন্তানদের। এই নিকৃষ্ট ইচ্ছার পরিণতিতে তাদের ওপর শাস্তিও নেমে এসেছে ঠিক এমনই।[৬৫]
এদিন বনু কুরাইযার শুধু একজন নারীকে হত্যা করা হয়। এ সম্পর্কে আয়িশা বলেন—‘তাদের নারীদের থেকে শুধু একজনকে হত্যা করা হয়। সে-ই আমার কাছে এসে গল্প করত। আমি তার মতো উচ্ছল ও হাস্যোজ্জ্বল নারী আর দেখিনি। আল্লাহর রাসূল বাজারে পুরুষদের হত্যা করার সময় একজন গলা উঁচিয়ে নাম নিয়ে বলে ওঠে, অমুক নারী কোথায়?
সে বলল, এই তো আমি এখানে।
আমি বললাম, ‘তুমি তো বিপদে পড়ে যাবে, কী হলো তোমার?’ সে বলল, ‘আমাকে হত্যা করা হবে।’ বললাম, ‘কেন?’ সে বলল, ‘আমি একটা অমার্জনীয় ঘটনা ঘটিয়েছি।’ (এই নারী জাঁতাকলের চাকা নিক্ষেপ করে খল্লাদ বিন সুয়াইদ-কে হত্যা করেছিল। এরপর নবীজি তাকে এটা দিয়েই হত্যা করেন) আয়িশা বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, তার প্রাণবন্ত আশ্চর্য মানসিকতার কথা আমি কখনোই ভুলব না। সে ছিল হাস্যোজ্জ্বল; কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম সে মারা যাবে।’[৬৬]
বনু কুরাইযার ওপর এই সিদ্ধান্তের ফলে মাদীনা ইয়াহুদিমুক্ত হয়। উন্মুক্ত হয় শুধু মুসলিমদের জন্য। অভ্যন্তর ভাগ ক্ষতির উপাদান মুক্ত হয়, কেননা ওদের সক্ষমতা ছিল গোপন পরামর্শে, কূটকচাল ও চক্রান্তে। কুরাইশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। কেননা, ইয়াহুদিদের ব্যাপারে ওরা মনে করত, মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই একটা জাতি তাদের পাশে থাকবে, এখন সেই আশাগুলো বনু কুরাইযার লাশগুলোর সাথে মাদীনার বাজারে সমাধিত হয়। ইয়াহুদিদের দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা দূরীভূত হয়। কারণ, এরা-ই মুনাফিকদের শক্তি ও সাহস দিয়ে সাহায্য করত।[৬৭] এরপর ইসলামি দাওলাতের সুরক্ষা কল্পে আল্লাহর হাবীব মুস্তাফা মুসলিম উম্মাহর জন্য যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
[৫৩] তাফসিরে কুরতুবি, ১৪/১৪৪
[৫৪] গযবান রচিত ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, ৫০৩
[৫৫] বৃতি রচিত ফিকহুস সীরাহ পৃ. ২২২
[৫৬] গযবান রচিত ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ৫০৩
[৫৭] আবু ফারিস রচিত সীরাতুন নবী, পৃ. ৩৬৭
[৫৮] সুয়ারুন ও ইবার মিলান জিহাদিন নাবাবিয়্যি, পৃ. ২৪৬
[৫৯] দেখুন, শারহু যুরকানি, ২/১২০
[৬০] দেখুন, মিন মায়ীনিস সীরাহ, পৃ. ২৯৩
[৬১] দেখুন আল আসাস ফিস সুন্নাহ, ২/৬৬২
[৬২] দেখুন, নবীজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের বর্ণনা, ২/৪৯০, ৪৯১
[৬০] সূত্র প্রাগুক্ত, ২/৪৪২
[৬৪] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৩৭০
[৬৫] দেখুন, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস সাহীহাহ ১/ ৩১৫, ৩১৬, ৩১৭
[৬৬] দেখুন, সহীহ সীরাতুন নাবী, পৃ. ৩৭৭। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, বনু কুরাইযা অধ্যায়।
[৬৭] সুজা’ রচিত সীরাতুর রাসূল, পৃ. ১৫৩