📄 এক. যুদ্ধের সন নির্ণয়
সীরাত ও যুদ্ধ বিষয়ক ঐতিহাসিকদের অধিকাংশের মতে আহযাব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৫ম হিজরির শাওয়াল মাসে।[১] ওয়াকিদি বলেন, ৫ম হিজরির জিলকদ মাসের ৮ম দিনে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[২] ইবনু সা'আদ বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের দুআ কবুল করে মুশরিকদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন ৫ম হিজরির জিলকদ মাসের চতুর্থ দিনে।[৩] তবে যুহরি, মালিক ইবনু আনাস, মূসা ইবনু উকবা থেকে বর্ণিত, আহযাব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল চতুর্থ হিজরি সনে।[৪]
উলামায়ে কেরামের অনেকে মনে করেন, যারা বলে চতুর্থ হিজরিতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তারা হিজরাতের সন গণনা করে থাকেন মুহাররম মাস থেকে। রবিউল আউয়াল থেকে জিলহাজ্জ পর্যন্ত এই মাসগুলোকে তারা গণনার বাইরে রাখেন। কিন্তু জমহুর গবেষক উলামায়ে কেরাম মুহাররাম মাস থেকে হিজরাতের সন গণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।[৫]
এদিকে ইবনু হাযাম যাহিরি দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, আহযাব যুদ্ধ চতুর্থ হিজরিতেই সংঘটিত হয়েছিল। কারণ, ইবনু 'উমার বলেছেন, আল্লাহর রাসূল তাকে তৃতীয় হিজরির উহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। আর পনেরো বছর বয়সে তিনি আহযাব যুদ্ধে শরিক হয়েছেন। বোঝা গেল, এক বছর পর চতুর্থ হিজরিতে সংঘটিত হয়েছিল আহযাব যুদ্ধ।[৬]
কিন্তু বাইহাকি, ইবনু হাজার আসকালানি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ ইবনু 'উমারের এই কথার ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'উহুদের দিন ইবনু 'উমার ছিলেন ১৪ বছরের শুরুতে, আর আহযাব যুদ্ধের সময় তিনি পৌঁছেছিলেন ১৫ বছরের শেষ সীমায়। মাঝখানে দুই বছর গত হয়েছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই মতটাই ব্যক্ত করেছেন।[৮] আমার কাছে জমহুরের এই মতটাই প্রাধান্যযোগ্য। ইবনুল কাইয়িম এই মতটাকে সমর্থন করে বলেন—বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ৫ম হিজরির শাওয়াল মাসে আহযাব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কেননা এ ব্যাপারে মতভেদ নেই যে, উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে। এরপর মুশরিকরা পরের বছর যুদ্ধের অঙ্গীকার করে; কিন্তু দুর্ভিক্ষের কারণে সে বছর তারা অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। ফলে আরেক বছর পর ৫ম হিজরি সনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে তারা যুদ্ধের জন্য মাদীনার উদ্দেশে ধেয়ে আসে।[৯]
টিকাঃ
[১] আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাওয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৪৩
[২] মাগাযি, ২/৪৪০ সনদহীন
[৩] আত-তাবাকাত, ২/৬৫,৭৩ মুত্তাসিল সনদে।
[৪] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/১০৫
[৫] প্রথম সূত্র পৃ. ৪৪৩
[৬] জাওয়ামিউস সিয়ার, পৃ. ১৮৫
[৭] ফাতহুল বারি, ৩/৩৯৬
[৮] ১ম সূত্রে উল্লেখিত গ্রন্থ, পৃ. ৪৪৪
[৯] যাদুল মাআদ, ২/২৮৮
📄 দুই. আহযাব যুদ্ধের কারণ
বনু নাজীরের ইয়াহুদিরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মনে হিংসা আর ক্ষোভ নিয়েই মাদীনা থেকে বের হয়ে খাইবারে আশ্রয় নেয়। ফলে খাইবারে অন্যান্য ইয়াহুদিদের সাথে মিশে একটু স্থিতিশীল হতেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বোনা শুরু করে দেয়। তারা একমত হয়, আরবের বিভিন্ন গোত্রকে টোপ দেখিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। এ লক্ষ্যে তারা একটি প্রতিনিধি দল গঠন করে। গঠিত এই দলটির সদস্য ছিল সালাম ইবনু আবিল হাকিক, হুয়াই ইবনু আখতাব, কিনানা ইবনুর রাবি, হাওজা ইবনু কাইস ওয়ায়িলি ও আবু আম্মার।[১০]
ইয়াহূদি প্রতিনিধিরা তাদের চক্রান্তে ব্যাপক সফলতা পায়। মুসলিমদের কারণে মাক্কার মুশরিকরা অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। ফলে সহজেই তারা এদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। এমনইভাবে মাদীনায় লুটপাট চালাতে, এখানকার ধনসম্পদের লোভে গাতফান গোত্রও ইয়াহুদিদের সাথে হাত মেলায়। প্রলুব্ধকরণের অংশ হিসেবে মাক্কার মুশরিকদেরকে ইয়াহুদিরা এ-ও বলেছিল, তোমাদের ধর্ম মুহাম্মাদের ধর্মের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।[১১] এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন—
আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যাদেরকে কিতাবের কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে, তারা তাগুত ও প্রতিমায় বিশ্বাস রাখে, আর কাফিরদের উদ্দেশে বলে, এরা মুমিনদের তুলনায় অধিক হিদায়াতের অনুসারী। আল্লাহ এদেরকে লানত করেছেন, আর আল্লাহ যাকে লানত করেন, আপনি তার কোনো সাহায্যকারী পাবেন না। (সূরা নিসা: ৫১-৫২)
এর প্রাসঙ্গিকতায় প্রফেসর ওফেনসন বলেন,
ইয়াহুদিরা স্বপ্রণোদিত হয়েই একটা বিরাট অন্যায়ে প্রবৃত্ত হয়। মুশরিকদের সাথে আলোচনার সময় মূর্তিপূজার ধর্মকে তারা ইসলামের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়; অথচ ইসলাম শুনিয়েছে এক আল্লাহর ইবাদাতের মহান বাণী। মুসলিমদের মনে কষ্টের জায়গাটা ছিল এখানে যে, এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বে মুসলিম- ইয়াহুদিরা সমান বিশ্বাস লালন করে। তা হলে ওরা কীভাবে পারল পৌত্তলিক মূর্খতার ধর্মকে ইসলামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতে![১২]
নিঃসন্দেহে নিজেদের ধর্মের ব্যাপারে প্রশংসা শুনে কুরাইশরা বেজায় খুশি হয়েছে। তাদের আনীত প্রস্তাবের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রলুদ্ধ হয়েছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এরপর তারা ইয়াহুদিদের সঙ্গে মাদীনা ধ্বংসের হামলায় একাত্মতার ঘোষণা দিয়ে শরিক থাকবার অঙ্গীকার করে।[১৩]
সবিশেষ ইয়াহুদিরা গাতফানের বেদুইন মিত্রগোত্রগুলোকে নিয়ে মুসলিমদের বিপরীতে পৌত্তলিক আরব্য জাতি ও ইয়াহুদি সেনাদের সমন্বয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ সংঘ গঠন করে। এই সংঘের বুনিয়াদি নীতি ছিল,
১. এই ঐক্যবদ্ধ বাহিনীতে গাতফানের সেনা সংখ্যা থাকবে ছয় হাজার।
২. গাতফানের এই যোদ্ধাদেরকে খাইবারের এক বছরের সমস্ত খেজুর দেওয়া হবে।[১৪]
ইয়াহুদি প্রতিনিধি দলটি মাদীনায় ফিরে আসবার সময় দশ হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ফিরতে সক্ষম হয়। কুরাইশ ও তার মিত্রবাহিনীর যোদ্ধা ছিল চার হাজার, আর গাতফান ও তাদের মিত্রদের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। সর্বমোট দশ হাজার সেনার এই বহুজাতিক বাহিনী মাদীনার দিকে ঝড়ের রূপে ধেয়ে আসে।
টিকাঃ
[১০] ইবনু হিশামের সীরাহ, ৩/২৩৭
[১১] আত-তারিখুস সিয়াসি ওয়াল-আসকারি, পৃ. ৩১০
[১২] তারিখুল ইয়াহূদ ফি বিলাদিল আরাব, পৃ. ১৪২
[১৩] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১০
[১৪] মুহাম্মাদ বাশমিল রচিত আহযাব যুদ্ধ, পৃ. ১৪১
📄 তিন. মুসলিমদের বহুজাতিক বাহিনী পর্যবেক্ষণ
শত্রু থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় পূর্ণ সতর্ক অবস্থা অব্যাহত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আহযাবের খবরাখবর, গতিবিধি ও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে দৃষ্টি রাখছিল ইসলামি রাষ্ট্র। খাইবারের প্রতিনিধি দলটি মাক্কার উদ্দেশ্যে রওনা করার পর থেকে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে মুসলিমদের অনুসন্ধানি চোখ ছায়ার মতো লেগে থাকে। ইয়াহূদি প্রতিনিধি ও কুরাইশের মধ্যকার সম্পন্ন হওয়া গোপন চুক্তি, দ্বিতীয় পর্যায়ে চুক্তিতে চলে আসা গাতফানিদের ব্যাপার- সবকিছুই মুসলিমদের অবগতিতে ছিল। সংগত এসব তথ্যের ভিত্তিতে শত্রুদের থেকে মাদীনাকে রক্ষা করতে নবিজি প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে খুব দ্রুত একটি মাশওয়ারা সভার আয়োজন করেন। উপস্থিত হন জ্যেষ্ঠ মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরাম। কুচক্রি ইয়াহুদিদের ভয়ানক পরিকল্পনা থেকে উত্তরণের জন্য মুক্ত আলোচনা হয় এ সভায়।[১৫]
এই বিশাল বাহিনী রুখে দিতে সালমান ফারসি পরিখা খননের পরামর্শ দেন। সম্পূর্ণ নতুন এই পরিকল্পনার কথা শুনে আল্লাহর রাসূল অনেকটা অবাক হন। ওয়াকিদি বলেন: সালমান বলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ, পারস্যে আমরা শত্রু প্রবেশের আশঙ্কা করলে নিজেদের রক্ষায় পরিখা খনন করতাম। আপনিও এমনটা করে দেখতে পারেন। সালমান-এর এই পরামর্শ উপস্থিত মুসলিমদেরকে অভিভূত করে।[১৬]
পরিখা খননের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর নবিজি ও কয়েকজন সাহাবি স্থান নির্ধারণের জন্য চলে আসেন। সেনাবাহিনীর সহায়তা করতে সাধারণ মুসলিমদের জন্য আরেকটি স্থান নির্দিষ্ট করেন। ওয়াকিদি বলেন—নবিজি কয়েকজন মুহাজির ও আনসার সাহাবিকে সঙ্গে করে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে মাদীনার বাইরে আসেন। তিনি অবতরণের জন্য জুতসই একটা জায়গা খুঁজছিলেন। শেষে একটু আশ্চর্য ধরনের স্থান বেছে নেন। সিলা পাহাড় পেছনে রেখে মাজাদ থেকে জুবাব পর্যন্ত পরিখা খননের সংকল্প করেন। পেছন দিক থেকে সাহাবিদের রক্ষায় সিলা পাহাড় থেকে তিনি সুবিধা লাভ করেন।[১৭]
পরিখা খননের মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মজুত করতে এই স্থানগুলোকে নির্ধারণ করার কারণ হলো, শত্রুর সামনে মাদীনার শুধু উত্তর দিকটা উন্মুক্ত ছিল। এদিক দিয়ে সহজেই মাদীনায় প্রবেশ করে তাণ্ডব চালানো সম্ভব। অন্য দিকগুলোতে সে সুবিধা ছিল না। দক্ষিণ প্রান্তের উঁচু স্থানগুলো প্রাকৃতিকভাবে নিরাপত্তার দেওয়াল হয়ে ছিল। পূর্ব দিকে সকালের গা ঝলসানো উত্তাপ এবং পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের তাপদাহ নীরবে প্রাকৃতিক ব্যুহের কাজ করছিল। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পেছন থেকে মুসলিমদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল বনু কুরাইযাহ। সেসময় নবিজি ও বনু কুরাইযার মাঝে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত ছিল, তারা মাদীনার বিরুদ্ধে কাউকে প্ররোচিত কিংবা সাহায্য কোনোটিই করবে না।[১৮]
আল্লাহর রাসূল-এর এই পরিকল্পনা ছিল উন্নত ও কার্যকরী। বলতে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন তিনি। আরবরা যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশলটির সঙ্গে মোটেও পরিচিত ছিল না। এটা ছিল তাদের কাছে অজানা অদ্ভুত কিছু। অন্য দিকে এই পরিখা খননের মধ্য দিয়ে মুসলিম ও আরব্য ইতিহাসে আল্লাহর রাসূলই প্রথম ব্যক্তি, যিনি পরিখা খননের প্রচলন ঘটান। এই পরিখা ইসলামের শত্রুদের সকল পরিকল্পনা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। মুসলিমদের গুঁড়িয়ে দিতে এসে আচমকা পরিখার মুখে পড়ে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। এই চমক বাস্তবায়নে মুসলিমরা কাজে লাগিয়েছেন সুদৃঢ় মনোবল, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কাজের ক্ষিপ্রতা। লড়াই ক্ষেত্রে এই নতুন পদ্ধতি গ্রহণ বহুজাতিক বাহিনীকে দুর্বল ও তাদের শক্তির দণ্ড চূর্ণ করে দিয়েছিল।
টিকাঃ
[১৫] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪, ১৪৫
[১৬] ওয়াকিদির মাগাযি, ২/৪৪৪। আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২/৬
[১৭] এটি মাদীনার একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়। মুজামুল বুলদান, ৩/২৩৬
[১৮] আল-আবকারিয়্যাতুল আসকারিয়্যাহ ফি গাযওয়াতির রাসূল, পৃ. ৪৪২
📄 চার. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় নবিজির গুরুত্ব
১. বহুজাতিক বাহিনী মাদীনার উদ্দেশে আসার খবর শুনে পরিখা খননের আগে আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের সন্তান, নারী ও শিশুদেরকে বনু হারিসার দুর্গে নিরাপদে রাখবার নির্দেশ দেন। যেন তারা শত্রুর শ্যেনদৃষ্টি থেকে আশঙ্কামুক্ত থাকে। নবিজি প্রথমে এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধানতম কারণ হলো, মুজাহিদরা যেন পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তায় না পড়ে। স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেলে সেনা সদস্যদের মন আর বিক্ষিপ্ত হবে না। পার্থিব চিন্তা তাদের তাড়া করবে না। দৈহিক ও চিন্তাশক্তি শুধু যুদ্ধের পেছনেই ব্যয় করবে; কিন্তু এর বিপরীত হলে সেনাবাহিনীর অবস্থা হবে টালমাটাল। মনোবল হারিয়ে ফেলবে। ঐক্যবদ্ধতার ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে এই অভ্যন্তরীণ অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা।[১৯]
২. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় আরও সহায়ক হয়েছে সাহাবিদের সাথে কাজে আল্লাহর রাসূল-এর সশরীরে অংশগ্রহণ। পরিখা খননের কাজে তিনি নিজে সাহাবিদের সাথে শরিক হয়েছেন। ইবনু ইসহাক বলেন: আমি বারা ইবনু আযিবকে বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেছেন—সম্মিলিত বাহিনী আসার আগে আল্লাহর রাসূলও পরিখা খনন করেছেন। আমি দেখেছি তিনি পরিখার মাটি বহন করছেন। এমনকি তাঁর পেটের চামড়ায় ধুলার আস্তরণ দেখা যাচ্ছিল। ঘন পশম ছিল নবিজির শরীরে।
ক্লান্তি ও জড়তা ভুলে অসীম সাহসিকতা নিয়ে নবিজি সাহাবিদের সাথে কাজ করেছেন। তাঁর সরব উপস্থিতি এক অদৃশ্য শক্তি সঞ্চারিত করেছে সাহাবিদের মনে। ফলে পরিখা খনন সমাপ্তিতে পৌঁছাতে সাহাবিরা নিজেদের সবটুকু চেষ্টা ব্যয় করেছেন।
৩. আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হতেন। সাহাবিদের আগলে রেখে নিজেই কষ্ট সহ্য করতেন। আহযাব যুদ্ধের দৃশ্যপটগুলো আমাদের দেখায়, অন্যদের মতো তিনিও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করছেন; বরং আরও বেশি। ক্ষুধার আতিশয্যে তিনি পেটে পাথর পর্যন্ত বাঁধতে বাধ্য হয়েছেন।[২০] সুখস্বাচ্ছন্দ্যের সময়েও তিনি সাহাবিদের পাশে থেকেছেন। তিন দিন অব্যাহত ক্ষুধার পর যখন খাদ্যের ব্যবস্থা হয়েছে, তখন সাহাবিদের ভুলে শুধু নিজের কথা চিন্তা করেননি। সামনে জাবির ইবনু আবদিল্লাহ-এর হাদীসে আমরা ক্ষুধা নিবারণের দারুণ গল্প জানতে পারব।
৪. সাহাবিদের মনঃকষ্ট দূর করে তাদের তৃষ্ণ হৃদয়ে উচ্ছলতা নির্মাণে সচেষ্ট থেকেছেন নবিজি। পরিখা খননের পর কঠিন পরিস্থিতি সবাইকে গ্রাস করে। আবহাওয়া ছিল ঠান্ডা, প্রবাহিত হতে থাকে প্রবল শৈত্যপ্রবাহ। জীবিকা নির্বাহের উপায় সংকীর্ণ। শত্রু আগমনের ভয় সর্বক্ষণ জেঁকে ধরে আছে সবাইকে। এমন করুণ পরিস্থিতিতেও সাহাবিরা পরিখা খনন করছেন, মাটি বহন করে ফেলছেন অন্য জায়গায়। এই নাজুক অবস্থায় অবশ্যই প্রয়োজন ছিল দৃঢ়তা ও উন্নত মনোবলের। কাজের ঘোরে নবিজি ভুলে যাননি, সাহাবিরাও অন্যদের মতো মানুষ। কাজ শেষে তাদেরও একটু প্রশান্তির প্রয়োজন আছে। আবার এমন একজনের মুখাপেক্ষী ছিলেন সবাই, যিনি হৃদয়ের মালিক; অন্তরের সমস্ত কষ্ট-যন্ত্রণা ভুলিয়ে আনন্দের ফল্গুধারা সৃষ্টি করেন। তাইতো দেখি মানবতার মহান প্রতিনিধি নবিজি ইবনু রাওয়াহার কবিতা আবৃত্তি করে মাটি বহন করে বলছিলেন:
'হে আল্লাহ, আপনি ছাড়া কে দিত আমাদের হিদায়াত/আপনি ছাড়া করতে পারতাম না সাদাকা, পড়তাম না সালাত।
কাজেই আমাদের ওপর আপনি প্রশান্তির জোয়ার ঢেলে দিন/সম্মুখ যুদ্ধের সময় দৃঢ় রাখুন আমাদের পদক্ষেপ।
তারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্রলুব্ধ হয়েছে/ তারা ফিতনার ইচ্ছা করলে আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
বলবার সময় নবিজি বলিষ্ঠ কণ্ঠে শেষের ব্যক্তিটিকেও শুনিয়ে দিতেন।[২১]
আনাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূলের সাহাবিরা পরিখা খননের সময় বলছিলেন 'আমরা আনুগত্যের শপথ নিয়েছি মুহাম্মাদের হাতে/ আমরণ প্রাণ নিবেদিত হবে আল্লাহর পথে।' অথবা তারা বলতেন 'শপথ নিয়েছি জিহাদের'। এরপর সাহাবিদের উদ্দীপনা বাড়িয়ে দিতে নবিজি বলতেন 'হে আল্লাহ, আখিরাতের কল্যাণই তো প্রকৃত কল্যাণ/ অতএব, মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের ক্ষমা করুন।[২২]
জীবনের কঠিন ও যন্ত্রণাময় এই বাঁকটাকে নবিজির নিঃস্বার্থ আন্তরিকতা ও প্রফুল্লতায় গ্রহণ সাহাবায়ে কেরামকে অনেকটা নির্ভার করেছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত পরিখা খননের কাজ দুশমন বাহিনী আসার আগেই দ্রুত সম্পন্নকরণেও জোরালো ভূমিকা রেখেছে।[২৩]
৫. সৈন্যদের জন্য স্থান নির্ধারণ, প্রয়োজনের সময় প্রস্থানের অনুমতি সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলের সামনে চূড়ান্ত ভদ্রতা ও শিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন। অনিবার্য কোনো প্রয়োজনে কাজ ছেড়ে বাইরে যেতে হলে তারা আগে বিনয়ের সাথে অনুমতি প্রার্থনা করতেন। প্রয়োজন শেষে ফিরে এসে আবার আত্মনিয়োগ করতেন কাজে। উদ্দেশ্য একটাই, প্রতিদান ও কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে কুরআনে উল্লেখ করেন:
মুমিন তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, আর যখন তারা তাঁর সাথে সম্মিলিত কাজে অংশ নেয়, তখন অনুমতি প্রার্থনার আগে তারা কোথাও চলে যায় না। যারা আপনার কাছে অনুমতি চায়, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে। অতএব, তারা আপনার কাছে কোনো কাজে অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন ও তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা নূর: ৬২]
আয়াতের মর্ম হলো, প্রিয় মুহাম্মাদ, এমন নাজুক মুহূর্তে যারা নিজেদের অতি জরুরি কোনো প্রয়োজনেও আপনার অনুমতি না নিয়ে কোথাও যেতে চায় না, তাদের যাকে ইচ্ছা আপনি কাজ সেরে আসার অনুমতি দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।[২৪] আল্লাহর রাসূল-কে এখানে ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছে, তিনি যদি দেখতেন অনুমতিপ্রার্থীর সামনে যৌক্তিক প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এবং অন্যদের জন্য তা ক্ষতিকর নয়, তা হলে তিনি অনুমতি দিতেন। অথবা অবস্থা বুঝে সবার সাথে থাকতে বলতেন।[২৫]
৬. পাহারার জন্য সাহাবিদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্তকরণ, শত্রু বাহিনীর যে কারও পরিখা অতিক্রম প্রতিরোধ করতে আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবিদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে পাহারার ব্যবস্থা করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিমরা নিষ্ঠার সাথে পালন করেন অর্পিত দায়িত্ব। পরিখা অতিক্রমে মুশরিকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। সন্দেহ নেই, সামরিক শক্তি ও নেতৃত্বের দিক থেকে পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন সবাই।
আগ্রাসী শত্রুদের প্রতিরোধে পরিখার কিনারে প্রহরী রাখাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। একদিন তো সাহরির সময় থেকে নিয়ে দ্বিতীয় দিন মধ্যরাত পর্যন্ত বিশ্রামহীন টানা পাহারা দিয়ে যেতে হয়। রণাঙ্গনে ব্যস্ত থাকার কারণে এদিন মুসলিমদের চার ওয়াক্ত সালাত ছুটে যায়। পরে তারা এই সালাতগুলো কাযা আদায় করে নেন। ইকরিমা ইবনু আবি জাহল কিছু যোদ্ধা নিয়ে পরিখা অতক্রম করলেও ‘আলি তাদেরকে প্রতিহত করেন। কুরাইশের বিখ্যাত বীর আমর বিন আবদুদকে হত্যা করে তাদেরকে নিজের জাত চিনিয়ে দেন।[২৬] এখানে আনসারদের একটি বাহিনী নবিজির নির্দেশে প্রতি রাতে প্রহরায় নিযুক্ত হতেন। তাদের প্রধান ছিলেন উব্বাদ ইবনু বাশার। সাকুল্যে আল্লাহর রাসূলই ছিলেন মুসলিমদের সর্বাধিনায়ক। যুদ্ধের দিনগুলোতে সঠিক দিক-নির্দেশনায় সবাইকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করছিলেন। নিখুঁত পরিকল্পনা করে সব সময় পর্যবেক্ষণও করছিলেন তা কার্যকর করণে। শত্রু বাহিনীকে প্রতিহত করতে তার নির্ণিত পরিকল্পনা ছিল নিম্নরূপ,
১. মাশওয়ারা সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর পরিখা খননের নির্দেশ দেন। এজন্য মাদীনার উত্তর দিকটাকে নির্ধারণ করেন। কারণ, এই একটা দিকই মাদীনা প্রবেশের জন্য শত্রুদের সামনে উন্মুক্ত ছিল।
২. সাহাবিদের মাঝে পরিখা খননের কাজ ভাগ করে দেন। প্রতি চল্লিশ গজ মাটি খননের দায়িত্ব দেন ১০জন সাহাবিকে।
৩. কাজের ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা এবং প্রত্যেককে নিয়োগ করা হয়েছে উপযুক্ত কাজে। তাই কোনো একজন নবিজির অনুমতি ছাড়া কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে বাইরে যেতে পারেনি।
৪. রাত দিনের প্রতিটি মুহূর্ত প্রতি বিঘত স্থান পাহারা দেওয়ার জন্য সাহাবিদের সামনে স্থান নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহর রাসূল নিজেও মুজাহিদ বাহিনীর কষ্ট দূর করে তাদেরকে উজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
৫. সর্বোপরি নবিজি জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক দক্ষতা ও আল্লাহর সাহায্যে মোড়ানো নুবুওয়াতি ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে সম্মিলিত মুশরিক বাহিনী মাদীনায় পৌঁছার পর মুমিনদেরকে বড়োসড়ো বিপদের আশঙ্কা থেকে উদ্ধার করেছেন।[২৭] অধিকন্তু গোটা বাহিনীকে নিজের একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করতে পারা ছিল যুদ্ধ জয়ের অন্যতম কারণ।
টিকাঃ
[১৯] গাযওয়াতুল আহযাব, ডা. মুহাম্মাদ আবদুল কাদির আবু ফারিস, পৃ. ৯৮
[২০] প্রাগুক্ত সূত্র, ১১৬, ১১৭
[২১] বুখারি, ৪১০৬
[২২] বুখারি, ২৮৩৪। মুসলিম, ১৮০৫
[২৩] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়াহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৮২
[২৪] সাবুনি রচিত সাফওয়াতুত তাফাসির, ১/৩৯১
[২৫] আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী, ৩/১৪১০
[২৬] মুনীর গাযবান রচিত ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৫০৪। এটি আরও বর্ণিত আছে, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থের আহযাব যুদ্ধের অধ্যায়ে।
[২৭] আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ১১