📄 নবিজির দু'টি বিয়ে এবং অন্যান্য বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা
যাইনাব বিনতে খুযাইমা: তার স্বামী 'আবদুল্লাহ বিন জাহাশ উহুদ যুদ্ধে শহিদ হলে নবিজি তাকে বিয়ে করেন। তিনি 'উম্মুল মাসাকীন' বা মিসকিনদের জননী নামে পরিচিত ছিলেন। বিয়ের মাত্র ৮ মাস পর তিনি মারা যান।
উম্মু সালামার সঙ্গে বিয়ে: আবু সালামার মৃত্যুর পর নবিজি উম্মু সালামাকে বিয়ে করেন। উম্মু সালামার একটি দুগ্ধপোষ্য কন্যা ছিল। বিয়ের পর নবিজি আবু সালামার পরিবারের প্রতি গভীর মমতা প্রদর্শন করেন। [৫৪৪]
হাসান ইবনু 'আলির জন্ম: চতুর্থ হিজরির শা'বান মাসে হাসান ؓ জন্মগ্রহণ করেন। নবিজি তাঁর নাম রাখেন হাসান এবং তাঁর কানে আযান দেন।
যাইদ বিন সাবিত ؓ-এর ভাষা শিক্ষা: নবিজির নির্দেশে যাইদ বিন সাবিত মাত্র ১৫ দিনে ইয়াহুদিদের ভাষা রপ্ত করেন যাতে তিনি বিদেশি পত্র আদান-প্রদান করতে পারেন। এটি ইসলামি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচায়ক।
বনু নাযীরের ইয়াহুদিদের বিতাড়ন: বনু নাযীর ইয়াহুদিরা নবিজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে তিনি তাদের মাদীনা থেকে বহিষ্কার করেন। তাদের সম্পদ 'ফাঈ' হিসেবে মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করা হয়। এ বিষয়ে সূরা হাশর নাযিল হয়।
টিকাঃ
৫৪৪. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/২৪৮, ২৪৯
এক. যাইনাব বিনতে খুযাইমা, উপাধি: উম্মুল মাসাকীন।
তার পূর্ণ নাম যাইনাব বিনতে খুযাইমা ইবনুল হারিস আল হিলালিয়াহ। দরিদ্র লোকদের পরম সহযোগী হওয়ার কারণে জাহিলি যুগে তাকে বলা হতো উম্মুল মাসাকীন। হিজরাতের পর দুই বছর সাত মাসের মাথায় রমযান মাসে নবিজি তাকে বিয়ে করেন। স্বামীর মৃত্যুশোক তাঁর অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই রাসূল বিয়ে করেন।
দুই. উম্মু সালামার সঙ্গে বিয়ে:
তার পূর্ণ নাম হিন্দা বিনতে আবু উমাইয়া হুজাফাহ বিন মুগীরা কুরাশিয়াহ মাখযুমিয়াহ। তার স্বামী আবু সালামা উহুদযুদ্ধে পাওয়া আঘাতে মারা যান। নবিজি তাকে বিয়ে করেন। উম্মুল মু'মিনীনদের মাঝে উম্মু সালামা সবার পরে; ৬১ হিজরি সনে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি আল্লাহর রাসূল থেকে গ্রহণ করা ইলমের নূর বিকিরণে ব্রতী ছিলেন সারা জীবন। [৫৪৪]
তিন. হাসান ইবনু 'আলির জন্ম:
ইমাম কুরতুবি বলেন, হাসান প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছেন ৪র্থ হিজরিতে। নবিজি বললেন, ওর নাম বরং হাসান। আবু রাফি' বলেন, আমি নবি-কে দেখেছি, ফাতিমা হাসানকে জন্ম দেওয়ার পর তিনি হাসানের দুই কানে সালাতের আযান দিয়েছেন।
চার. যাইদ বিন সাবিত এর ঘটনা:
চতুর্থ হিজরিতে তিনি ইয়াহুদিদের ভাষা শিক্ষা করেন। আল্লাহর রাসূল মাদীনায় আসার পর যাইদ-কে তার কাছে নিয়ে আসা হয়। রাসূলুল্লাহ বললেন, যাইদ, আমার জন্য তুমি ইয়াহুদিদের ভাষা শেখো। কেননা ইয়াহুদিদের লেখা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। যাইদ বলেন, আমি ১৫ দিন কেটে যাওয়ার আগেই আমি বেশ দক্ষতা অর্জন করি।
বনু নাযীরের ইয়াহুদিদের বিতাড়ন:
সীরাত গবেষক ঐতিহাসিকরা বলেন, বনু নাযীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল উহুদযুদ্ধের পর ৪র্থ হিজরির রবীউল আউয়াল মাসে। বনু নাযীর কুরাইশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের প্ররোচিত করে এবং নবিজিকে হত্যার জন্য দেওয়ালের ওপর থেকে প্রকাণ্ড আকারের পাথর ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবিকে ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। নবিজি তাদের মাদীনা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য দশ দিন সময় বেঁধে দেন। অবরোধ ও বিতাড়নের পর তারা খাইবারে ও সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়। [৫৪৫] [৫৪৬] [৫৪৭] [৫৪৮]
টিকাঃ
৫৪৪. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/২৪৮, ২৪৯
৫৪৫. আত-তারীখুস সিয়াসি ওয়াল-আসকারি, পৃ. ১৮৮, ১৮৯
৫৪৬. হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযওয়াতির রাসূল, ২৫১, ২৫২
৫৪৭. হাদীসুল কুরআনিল কারীম, ১/২৯১
৫৪৮. ফি যিলালিল কুরআন, ১/২২৯
📄 গাযওয়া: যা-তুর রিকা
নাজদের গোত্রসমূহকে সতর্ক করতে এবং তাদের ঐক্য চূর্ণ করতে নবিজি ﷺ এই অভিযান পরিচালনা করেন। মুজাহিদরা তপ্ত বালুতে হাঁটার কারণে পায়ে কাপড়ের পট্টি বেঁধেছিলেন বলে একে 'যা-তুর রিকা' বা তালিযুক্ত যুদ্ধ বলা হয়। [৫৫০] এই যুদ্ধে প্রথম 'সালাতুল খাউফ' বা ভীতিপূর্ণ সময়ের বিশেষ সালাত আদায় করা হয়। [৫৪৯] এই যুদ্ধের সময় গাওরাস নামের এক মুশরিক নবিজিকে একা পেয়ে তরবারি উঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করলে আল্লাহর কুদরতে সে ব্যর্থ হয়। [৫৫১] এছাড়াও জাবির বিন 'আবদুল্লাহর দুর্বল উটের অলৌকিক দ্রুততা লাভের ঘটনাটি এই সফরের।
টিকাঃ
৫৪৯. বুখারি, ৫/৬২, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫০. বুখারি, যুদ্ধাভিযান অধ্যায়, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫১. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ২০০
এক. নামকরণের সঠিক ইতিহাস ও কারণ:
নাজদের বেশ কিছু গোত্র মুসলিমদের সঙ্গে গাদ্দারি করে। এর উচিত শিক্ষা দিতে আল্লাহর রাসূল বনু সা'লাবা ও মুহারিব গোত্রদ্বয়ের উদ্দেশে বের হন। তপ্ত বালুকারাশির উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য মুজাহিদরা তাদের পায়ে কাপড় ও পট্টি বেঁধেছিলেন, এ কারণেই যুদ্ধের নামকরণ করা হয়েছে যা-তুর রিকা। [৫৫০]
দুই. সালাতুল খাউফ ও প্রহরা:
এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সালাতুল খাউফ সম্পর্কে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন। মুসলিমরা এদিন সালাতুল খাউফ আদায় করেন। একদল লোক নবিজির সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়, আরেকদল লোক অবস্থান নেয় শত্রুদের সামনে। [৫৪৯]
তিন. প্রহরা ব্যবস্থা:
রাসূলুল্লাহ দুজনকে প্রহরার জন্য নিযুক্ত করেন। তারা দুজন হলেন উব্বাদ বিন বাশার ও আম্মার বিন ইয়াসির। উব্বাদ বিন বাশার প্রহরার সময় সালাতে দাঁড়িয়ে যান, পরপর তিনটা তির তাকে আঘাত করে। তারপরও সালাম ফেরানোর আগে তিনি সালাত ছেড়ে দেননি।
চার. নবিজির বীরত্ব ও জাবির বিন 'আবদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর কর্মপন্থা:
রাসূলুল্লাহ একটা গাছের ডালে তরবারি ঝুলিয়ে নিচে শুয়ে ছিলেন। এক গ্রাম্য লোক গাওরাস ইবনুল হারিস এসে তরবারি নিয়ে নবিজিকে হত্যার চেষ্টা করে। নবিজি বললেন, আল্লাহ আমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় মুশরিকের অন্তর ভরে গেছে আতঙ্কে এবং তরবারি তার হাত থেকে খসে পড়ে। রাসূল তাকে ক্ষমা করে দেন। [৫৫১]
টিকাঃ
৫৪৯. বুখারি, ৫/৬২, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫০. বুখারি, যুদ্ধাভিযান অধ্যায়, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫১. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ২০০
📄 প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ ও দাওমাতুল জান্দাল
প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ: উহুদ যুদ্ধের পর আবু সুফিয়ানের দেওয়া চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী নবিজি ﷺ দেড় হাজার সাহাবি নিয়ে বদর প্রান্তরে যান। কিন্তু আবু সুফিয়ান ভীরুতা প্রদর্শন করে মক্কা থেকে কিছু দূর এসেই ফিরে যায়। ফলে কোনো লড়াই ছাড়াই মুসলিমদের সামরিক সুখ্যাতি পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়।
দুমাতুল জান্দাল: রোমান সীমান্তবর্তী এলাকায় লুণ্ঠনকারী গোত্রসমূহকে দমনে নবিজি ﷺ এই অভিযান চালান। এটি ছিল রোমানদের প্রতি এক প্রকার ভীতিপ্রদর্শন এবং ইসলামি দাওয়াতের বৈশ্বিক বিস্তৃতির একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। [৫৫২]
টিকাঃ
৫৫২. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৩/৩৭৩, ৩৭৪
এক. প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ:
উহুদযুদ্ধের পর আবু সুফিয়ান বলেছিল, বদরে আমাদের আবার দেখা হবে। রাসূলুল্লাহ ১৫০০ সাহাবির এক মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে মাদীনা থেকে অভিযানে বের হন। আবু সুফিয়ান মাক্কা থেকে ৪০ মাইল দূরে মাররুজ জাহরান নামক স্থানে এসে ভীরুতা প্রদর্শন করে ফিরে যায়। পরিশেষে যুদ্ধ না করেই ফিরে আসে মুসলিম বাহিনী; কিন্তু মুসলিমরা তা বাস্তবায়ন করে নিজেদের শক্তিমত্তা দেখিয়েছে।
দুই. দুমাতুল জান্দাল:
৫ হিজরি সনে রবিউল আউয়াল মাসে আল্লাহর রাসূল এদের উদ্দেশে অভিযান পরিচালনা করেন। দুমাতুল জান্দাল এলাকাটি ছিল মাদীনা থেকে অনেক দূরে, প্রায় ১৬ দিনের পথ। মুজাহিদরা সেখানে পৌঁছালে লুণ্ঠনকারীরা পালিয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল উয়াইনাহ বিন হিস্স-এর সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেন। এই অভিযানের ফলে সিরিয়রা ইসলামের শক্তি ও দাপট কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারে। [৫৫২]
টিকাঃ
৫৫২. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৩/৩৭৩, ৩৭৪
📄 গাযওয়া বনু মুসতালিক
বনু মুসতালিক গোত্র মাদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিলে নবিজি ﷺ আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাদের পরাজিত করেন। যুদ্ধে গোত্রপতির কন্যা জুওয়াইরিয়াহ বন্দি হলে নবিজি তাকে মুক্ত করে বিয়ে করেন। ফলে সাহাবিরা নবিজির আত্মীয় মনে করে বনু মুসতালিকের সব বন্দিকে মুক্ত করে দেন এবং পুরো গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। [৫৫৩]
মুনাফিকদের চক্রান্ত: যুদ্ধের ফেরার পথে মুনাফিক সর্দার 'আবদুল্লাহ ইবনু উবাই মুহাজির ও আনসারদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং দম্ভ করে বলে যে মাদীনায় ফিরে গিয়ে সম্মানিতরা লাঞ্ছিতদের বের করে দেবে। নবিজি ﷺ অত্যন্ত ধৈর্য ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সাথে এই পরিস্থিতি সামাল দেন। এ প্রসঙ্গে সূরা মুনাফিকুন নাযিল হয়। [৫৫৪]
ইফকের ঘটনা (আয়িশার প্রতি অপবাদ): ফেরার পথে নবিপত্নি আয়িশা ؓ কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়লে মুনাফিকরা তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটায়। দীর্ঘ এক মাস পর আল্লাহ তা'আলা সূরা নূরের মাধ্যমে তাঁর পবিত্রতা ও চারিত্রিক শুভ্রতা ঘোষণা করেন। [৫৫৫]
টিকাঃ
৫৫৩. হাদীসুল কুরআন আন গাযওয়াতির রাসূল, ১/৩১১
৫৫৪. আল-ওয়ালা ওয়াল বারা ফিল ইসলাম, কাহতানি, পৃ. ২০৯
৫৫৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ ফী যাওইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃ. ৪৪০