📘 রউফুর রহীম 📄 ইসলামি রাষ্ট্র ধ্বংসে মুশরিকদের সমূহ অপতৎপরতা

📄 ইসলামি রাষ্ট্র ধ্বংসে মুশরিকদের সমূহ অপতৎপরতা


উহুদযুদ্ধ ইসলামি দাওলাতের দুশমনদের মনে সাহস সঞ্চার করে। আরাবি মুশরিকদের মাঝে এ অনুভূতি জাগিয়ে দেয় যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে বিজয়ী হওয়া সম্ভব। কিছু মুশরিক গোত্র মুসলিমদের মূলোৎপাটন ও তাদের দাপট চূর্ণ করতে মাদীনা আক্রমণের ফন্দি আঁটতে থাকে। বনু আসাদ ইসলামি দাওলাতের দিকে শ্যেনদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। খালিদ বিন সুফিয়ান হুযালি মাদীনার মুখোমুখি হতে বহুজাতিক বাহিনী সমবেত করে। আদল ও কারাহ মুসলিমদের প্রতারিত করতে গোপন মিশনে জড়িয়ে পড়ে। আমির বিন তোফায়েল আমিনীন উপাধি খ্যাত কারীদের হত্যার ধৃষ্টতা দেখায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এসব প্রতিহত করেন অবিনাশী বীরত্ব, দক্ষ রাজনৈতিক কৌশল, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে।

১. ইসলামি দাওলাতে বনু আসাদের শ্যোনদৃষ্টি: গোয়েন্দা মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানতে পারেন, বনু আসাদ গোত্র তুলাইহা আসাদির নেতৃত্বে মাদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নবিজি ﷺ দেড়শো সাহাবির একটি মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন এবং আবু সালামা ইবনু আবুল আসাদ মাখযূমিকে আমীর নিযুক্ত করেন। আবু সালামার গেরিলা বাহিনীর অযাচিত আগমনে শত্রুরা হতবিহ্বল হয়ে পালিয়ে যায়। [৫৩৭]

২. খালিদ বিন সুফিয়ান হুজালির প্রতিরোধে ‘আবদুল্লাহ বিন উনাইস: খালিদ বিন সুফিয়ান মাদীনা আক্রমণের জন্য সৈন্য সমাবেশ করছিল। নবিজি ﷺ 'আবদুল্লাহ বিন উনাইসকে তার শিরশ্ছেদ করার দায়িত্ব দেন। ইবনু উনাইস অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে একাকী গিয়ে তাকে হত্যা করে ফিরে আসেন। নবিজি তাকে উপহারস্বরূপ একটি লাঠি দেন এবং বলেন এটি কিয়ামতের দিন আমাদের মাঝে নিদর্শন হবে। [৫৩৮]

৩. আদাল ও কারাহ গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাজি' ট্রাজেডি: আদাল ও কারাহ গোত্র নবিজির কাছে এসে দীন শিক্ষার জন্য শিক্ষক চায়। নবিজি ১০ জন সাহাবি পাঠান। পথিমধ্যে বনু লাহিয়ান তাদের ওপর আক্রমণ করে। আসিম বিন সাবিতসহ অধিকাংশ সাহাবি শহিদ হন। খুবাইব ও যাইদ বিন দুসনাহকে মক্কায় বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং পরে তাদের শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করা হয়।

৪. মুসলিমদের সঙ্গে প্রতারণা ও বী-রে মাউনার মর্মান্তিক ঘটনা: আমির বিন তোফায়েল ৭০ জন কারী সাহাবিকে দাওয়াতের শিক্ষক হিসেবে নিয়ে গিয়ে বী-রে মাউনা নামক স্থানে বিশ্বাসঘাতকতা করে সবাইকে হত্যা করে। আনাস-এর চাচা হারাম বিন মিলহান শহিদ হওয়ার সময় বলেছিলেন, 'কা'বার রবের কসম, আমি সফল হয়েছি'। [৫৩৯] নবিজি এক মাস পর্যন্ত কুনূতে নাযেলার মাধ্যমে এই ঘাতকদের বিরুদ্ধে বদ দু'আ করেন। [৫৪০]

টিকাঃ
৫৩৭. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ৩/৩৭৩, ৩৭৪
৫৩৮. উমদাতুল ক্বারি, শারহু সাহীহ আল-বুখারি, ৬/২৬৩
৫৩৯. মুসলিম, হাদীস নং ৬৭৭
৫৪০. সুয়ারুন ওয়া ইবারুন মিনাল জিহাদিন নাবাউই ফিল মাদীনা, পৃ. ১৫২
৫৪১. প্রাগুক্ত
৫৪২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৪০৯৩
৫৪৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আস-সাওবানি, পৃ. ১৩১

উহুদযুদ্ধ ইসলামি দাওলাতের দুশমনদের মনে সাহস সঞ্চার করে। আরাবি মুশরিকদের মাঝে এ অনুভূতি জাগিয়ে দেয় যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে বিজয়ী হওয়া সম্ভব। কিছু মুশরিক গোত্র মুসলিমদের মূলোৎপাটন ও তাদের দাপট চূর্ণ করতে মাদীনা আক্রমণের ফন্দি আঁটতে থাকে। বনু আসাদ ইসলামি দাওলাতের দিকে শ্যেনদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। খালিদ বিন সুফিয়ান হুযালি মাদীনার মুখোমুখি হতে বহুজাতিক বাহিনী সমবেত করে। আদল ও কারাহ মুসলিমদের প্রতারিত করতে গোপন মিশনে জড়িয়ে পড়ে। আমির বিন তোফায়েল আমিনীন উপাধি খ্যাত কারীদের হত্যার ধৃষ্টতা দেখায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এসব প্রতিহত করেন অবিনাশী বীরত্ব, দক্ষ রাজনৈতিক কৌশল, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে।

এক. ইসলামি দাওলাতে বনু আসাদের শ্যোনদৃষ্টি:
গোয়েন্দা মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানতে পারেন, বনু আসাদ গোত্র তুলাইহা আসাদির নেতৃত্বে মাদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো মাদীনা লুট করা, শরিকদের প্রতিশোধ নেওয়া এবং কুরাইশকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাহায্য করা। নবিজি ﷺ মুহাজির ও আনসার মিলিয়ে দেড়শো সাহাবির একটি মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন। তাদের আমীর নিযুক্ত করেন আবু সালামা ইবনু ‘আবদুল আসাদ মাখযূমি-কে। পতাকাবাহীও তাকেই নির্ধারণ করেন। প্রেরণের সময় বলেন, দ্রুত অগ্রসর হও। বনু আসাদের জনপদে পৌঁছানোর আগে থামবে না। তাদের মিত্ররা একত্রিত হওয়ার আগে অতর্কিত হামলা চালাবে। মুহাররম মাসে আবু সালামা তাদের উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হন। ওদের গবাদি পশুর স্থান দিয়ে গুপ্ত হামলা চালান। অতর্কিত হামলার ফলে কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই বেকায়দায় পড়ে ওরা পালিয়ে যায়। ইসলামের এই শত্রুদের ঐক্য ভাঙতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে মাদীনায় ফিরে আসেন তিনি। [৫৩৭]

দুই. খালিদ বিন সুফিয়ান হুজালির প্রতিরোধে ‘আবদুল্লাহ বিন উনাইস:
কুরাইশ মুশরিকদের সহযোগিতা, নৈকট্য অর্জন, নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর অটল থাকা, সর্বোপরি মাদীনার সম্পদ লুণ্ঠন করতে খালিদ বিন সুফিয়ান যোদ্ধাদের একত্রিত করতে থাকে। প্রস্তুতি নেয় মাদীনা আক্রমণের। আল্লাহর রাসূল তার এই গোপন দুরভিসন্ধির কথা জানতে পারেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস বলেন, আল্লাহর রাসূল আমাকে ডেকে বললেন, ইবনু উনাইস, আমি জানতে পেরেছি খালিদ বিন সুফিয়ান মাদীনা আক্রমণের জন্য উরনায় সেনা সমাবেশ ঘটাচ্ছে। তোমার দায়িত্ব হলো তার কাছে গিয়ে গর্দান উড়িয়ে দেওয়া। আমি তরবারি কোষমুক্ত করেই বের হলাম। উরনায় পৌঁছে সত্যিই ওর শরীরে শিহরন দেখতে পেলাম, যেমনটা নবিজি বলেছিলেন। আমি তার একদম নিকটবর্তী হলাম। হুজালি জিজ্ঞেস করল, এই লোকটা কে? আমি বললাম, শুনলাম আরবের এক লোকের বিরুদ্ধে তুমি যোদ্ধাদের একত্রিত করছ? আসলে তুমিই কি সেই ব্যক্তি? সে বলল হুম, আমিই সেই ব্যক্তি। মিত্রতার ভান করে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ চললাম। পেয়ে গেলাম সুযোগ। তরবারির এক আঘাতে তার জীবনের স্বাদ মিটিয়ে দিলাম। তারপর উটে চেপে নিশ্চিন্তে ফিরলাম মাদীনায়। মিশন শেষে যখন আল্লাহর রাসূলের কাছে এলাম, আমায় দেখে তিনি বললেন, তোমার চেহারায় বিজয়ের ঝিলিক দেখতে পাচ্ছি। [৫৩৮]

তিন. আদাল ও কারাহ গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাজি' ট্রাজেডি:
একবার আল্লাহর রাসূল-এর কাছে আদাল ও কারাহ গোত্র থেকে একটা প্রতিনিধি দল আসে মাদীনায়। তারা নিবেদন জানিয়ে বলে, আমাদের মাঝে ইসলাম সম্ভাবনাময়। আমাদের সঙ্গে আপনার কিছু সাহাবিকে প্রেরণ করুন, তারা আমাদের বোঝাবে, কুরআন তিলাওয়াত করবে, ইসলামি শারী‘আত শিক্ষা দেবে। নবিজি ১০ জন সাহাবির একটা দল তাদের সাথে প্রেরণ করেন। আসিম বিন সাবিত-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করেন। তারা যখন আসফান ও মাক্কার মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছান, তখন বনু লাহিয়ানের লোকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করে। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় দুশো জন। সাহাবিরা একটি উঁচু টিলায় উঠে যান। আসিম বিন সাবিত বলেন, আমি কসম করছি, আমি কোনো কাফিরের সহযোগীর মুখে নিজেকে সঁপে দেবো না। এরপর তিনি তাদের সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা করেন। শাহাদাতের শুভক্ষণ চলে আসে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। বাকি তিনজনের মাঝে ‘আবদুল্লাহ ইবনু তারিককে হত্যা করা হয়। বাকি দুজন খুবাইব ও যাইদ বিন দুসনাহকে মাক্কায় নিয়ে যায়। বনু হারিস খুবাইব-কে কিনে নেয়। হত্যার আগে খুবাইব বলেন, আমাকে একটু অবকাশ দাও, আমি দু-রাকা‘আত সালাত পড়ে আবার তোমাদের কাছে নিজেকে সঁপে দেবো। তিনিই প্রথম মৃত্যুর আগে সালাতের প্রবর্তন ঘটান। এরপর খুবাইব-কে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করা হয়। যাইদ বিন দুসনাকে কিনে নিয়েছিল সাফওয়ান বিন উমাইয়া। বদরযুদ্ধে তার বাবা উমাইয়া বিন খালফকে হত্যা করেছিলেন যাইদ। তার হত্যার প্রতিশোধে যাইদ-কে হত্যা করে সাফওয়ান।

চার. মুসলিমদের সঙ্গে প্রতারণা ও বী-রে মাউনার মর্মান্তিক ঘটনা:
আমির বিন তোফায়েল ছিল বনু আমিরের নেতা গোছের লোক। নবিজি তাদের কাছে কুরআনের জ্ঞানে জ্ঞানীদের একটা কাফেলা পাঠিয়ে দেন। মুনজির বিন আমর ছিলেন এই কাফেলায়। কিন্তু আমির বিন তোফায়েল বিশ্বাসঘাতকতা করে বনু সালীমের একদল লোক নিয়ে বী-রে মাউনার কাছে মুসলিম কাফেলার সবাইকে হত্যা করে। বেঁচে ফিরতে পারেন শুধু আমর বিন উমাইয়া। আনাস-এর হাদীসে জানা যায়, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল তাদের সঙ্গে আনসারি প্রায় ৭০ জন সাহাবিকে পাঠিয়ে দেন। তাদের কারী হিসেবে অভিহিত করা হতো। এই মুষলধারে পৈশাচিক আচরণের খবর নবি মনের গহীনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এক মাস পর্যন্ত তিনি ফজরের সালাতে কুনূতে নাযেলা পড়েছেন। [৫৩৯] [৫৪০] [৫৪১] [৫৪২] [৫৪৩]

টিকাঃ
৫৩৭. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ৩/৩৭৩, ৩৭৪
৫৩৮. উমদাতুল ক্বারি, শারহু সাহীহ আল-বুখারি, ৬/২৬৩
৫৩৯. মুসলিম, হাদীস নং ৬৭৭
৫৪০. সুয়ারুন ওয়া ইবারুন মিনাল জিহাদিন নাবাউই ফিল মাদীনা, পৃ. ১৫২
৫৪১. আস-সারায়া ওয়াল বু'উসুন নাবাউয়্যাহ, ২/১২৮
৫৪২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৪০৯৩
৫৪৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আস-সাওবানি, পৃ. ১৩১

📘 রউফুর রহীম 📄 নবিজির দু'টি বিয়ে এবং অন্যান্য বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা

📄 নবিজির দু'টি বিয়ে এবং অন্যান্য বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা


যাইনাব বিনতে খুযাইমা: তার স্বামী 'আবদুল্লাহ বিন জাহাশ উহুদ যুদ্ধে শহিদ হলে নবিজি তাকে বিয়ে করেন। তিনি 'উম্মুল মাসাকীন' বা মিসকিনদের জননী নামে পরিচিত ছিলেন। বিয়ের মাত্র ৮ মাস পর তিনি মারা যান।

উম্মু সালামার সঙ্গে বিয়ে: আবু সালামার মৃত্যুর পর নবিজি উম্মু সালামাকে বিয়ে করেন। উম্মু সালামার একটি দুগ্ধপোষ্য কন্যা ছিল। বিয়ের পর নবিজি আবু সালামার পরিবারের প্রতি গভীর মমতা প্রদর্শন করেন। [৫৪৪]

হাসান ইবনু 'আলির জন্ম: চতুর্থ হিজরির শা'বান মাসে হাসান ؓ জন্মগ্রহণ করেন। নবিজি তাঁর নাম রাখেন হাসান এবং তাঁর কানে আযান দেন।

যাইদ বিন সাবিত ؓ-এর ভাষা শিক্ষা: নবিজির নির্দেশে যাইদ বিন সাবিত মাত্র ১৫ দিনে ইয়াহুদিদের ভাষা রপ্ত করেন যাতে তিনি বিদেশি পত্র আদান-প্রদান করতে পারেন। এটি ইসলামি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচায়ক।

বনু নাযীরের ইয়াহুদিদের বিতাড়ন: বনু নাযীর ইয়াহুদিরা নবিজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে তিনি তাদের মাদীনা থেকে বহিষ্কার করেন। তাদের সম্পদ 'ফাঈ' হিসেবে মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করা হয়। এ বিষয়ে সূরা হাশর নাযিল হয়।

টিকাঃ
৫৪৪. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/২৪৮, ২৪৯

এক. যাইনাব বিনতে খুযাইমা, উপাধি: উম্মুল মাসাকীন।
তার পূর্ণ নাম যাইনাব বিনতে খুযাইমা ইবনুল হারিস আল হিলালিয়াহ। দরিদ্র লোকদের পরম সহযোগী হওয়ার কারণে জাহিলি যুগে তাকে বলা হতো উম্মুল মাসাকীন। হিজরাতের পর দুই বছর সাত মাসের মাথায় রমযান মাসে নবিজি তাকে বিয়ে করেন। স্বামীর মৃত্যুশোক তাঁর অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই রাসূল বিয়ে করেন।

দুই. উম্মু সালামার সঙ্গে বিয়ে:
তার পূর্ণ নাম হিন্দা বিনতে আবু উমাইয়া হুজাফাহ বিন মুগীরা কুরাশিয়াহ মাখযুমিয়াহ। তার স্বামী আবু সালামা উহুদযুদ্ধে পাওয়া আঘাতে মারা যান। নবিজি তাকে বিয়ে করেন। উম্মুল মু'মিনীনদের মাঝে উম্মু সালামা সবার পরে; ৬১ হিজরি সনে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি আল্লাহর রাসূল থেকে গ্রহণ করা ইলমের নূর বিকিরণে ব্রতী ছিলেন সারা জীবন। [৫৪৪]

তিন. হাসান ইবনু 'আলির জন্ম:
ইমাম কুরতুবি বলেন, হাসান প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছেন ৪র্থ হিজরিতে। নবিজি বললেন, ওর নাম বরং হাসান। আবু রাফি' বলেন, আমি নবি-কে দেখেছি, ফাতিমা হাসানকে জন্ম দেওয়ার পর তিনি হাসানের দুই কানে সালাতের আযান দিয়েছেন।

চার. যাইদ বিন সাবিত এর ঘটনা:
চতুর্থ হিজরিতে তিনি ইয়াহুদিদের ভাষা শিক্ষা করেন। আল্লাহর রাসূল মাদীনায় আসার পর যাইদ-কে তার কাছে নিয়ে আসা হয়। রাসূলুল্লাহ বললেন, যাইদ, আমার জন্য তুমি ইয়াহুদিদের ভাষা শেখো। কেননা ইয়াহুদিদের লেখা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। যাইদ বলেন, আমি ১৫ দিন কেটে যাওয়ার আগেই আমি বেশ দক্ষতা অর্জন করি।

বনু নাযীরের ইয়াহুদিদের বিতাড়ন:
সীরাত গবেষক ঐতিহাসিকরা বলেন, বনু নাযীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল উহুদযুদ্ধের পর ৪র্থ হিজরির রবীউল আউয়াল মাসে। বনু নাযীর কুরাইশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের প্ররোচিত করে এবং নবিজিকে হত্যার জন্য দেওয়ালের ওপর থেকে প্রকাণ্ড আকারের পাথর ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবিকে ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। নবিজি তাদের মাদীনা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য দশ দিন সময় বেঁধে দেন। অবরোধ ও বিতাড়নের পর তারা খাইবারে ও সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়। [৫৪৫] [৫৪৬] [৫৪৭] [৫৪৮]

টিকাঃ
৫৪৪. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/২৪৮, ২৪৯
৫৪৫. আত-তারীখুস সিয়াসি ওয়াল-আসকারি, পৃ. ১৮৮, ১৮৯
৫৪৬. হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযওয়াতির রাসূল, ২৫১, ২৫২
৫৪৭. হাদীসুল কুরআনিল কারীম, ১/২৯১
৫৪৮. ফি যিলালিল কুরআন, ১/২২৯

📘 রউফুর রহীম 📄 গাযওয়া: যা-তুর রিকা

📄 গাযওয়া: যা-তুর রিকা


নাজদের গোত্রসমূহকে সতর্ক করতে এবং তাদের ঐক্য চূর্ণ করতে নবিজি ﷺ এই অভিযান পরিচালনা করেন। মুজাহিদরা তপ্ত বালুতে হাঁটার কারণে পায়ে কাপড়ের পট্টি বেঁধেছিলেন বলে একে 'যা-তুর রিকা' বা তালিযুক্ত যুদ্ধ বলা হয়। [৫৫০] এই যুদ্ধে প্রথম 'সালাতুল খাউফ' বা ভীতিপূর্ণ সময়ের বিশেষ সালাত আদায় করা হয়। [৫৪৯] এই যুদ্ধের সময় গাওরাস নামের এক মুশরিক নবিজিকে একা পেয়ে তরবারি উঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করলে আল্লাহর কুদরতে সে ব্যর্থ হয়। [৫৫১] এছাড়াও জাবির বিন 'আবদুল্লাহর দুর্বল উটের অলৌকিক দ্রুততা লাভের ঘটনাটি এই সফরের।

টিকাঃ
৫৪৯. বুখারি, ৫/৬২, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫০. বুখারি, যুদ্ধাভিযান অধ্যায়, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫১. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ২০০

এক. নামকরণের সঠিক ইতিহাস ও কারণ:
নাজদের বেশ কিছু গোত্র মুসলিমদের সঙ্গে গাদ্দারি করে। এর উচিত শিক্ষা দিতে আল্লাহর রাসূল বনু সা'লাবা ও মুহারিব গোত্রদ্বয়ের উদ্দেশে বের হন। তপ্ত বালুকারাশির উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য মুজাহিদরা তাদের পায়ে কাপড় ও পট্টি বেঁধেছিলেন, এ কারণেই যুদ্ধের নামকরণ করা হয়েছে যা-তুর রিকা। [৫৫০]

দুই. সালাতুল খাউফ ও প্রহরা:
এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সালাতুল খাউফ সম্পর্কে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন। মুসলিমরা এদিন সালাতুল খাউফ আদায় করেন। একদল লোক নবিজির সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়, আরেকদল লোক অবস্থান নেয় শত্রুদের সামনে। [৫৪৯]

তিন. প্রহরা ব্যবস্থা:
রাসূলুল্লাহ দুজনকে প্রহরার জন্য নিযুক্ত করেন। তারা দুজন হলেন উব্বাদ বিন বাশার ও আম্মার বিন ইয়াসির। উব্বাদ বিন বাশার প্রহরার সময় সালাতে দাঁড়িয়ে যান, পরপর তিনটা তির তাকে আঘাত করে। তারপরও সালাম ফেরানোর আগে তিনি সালাত ছেড়ে দেননি।

চার. নবিজির বীরত্ব ও জাবির বিন 'আবদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর কর্মপন্থা:
রাসূলুল্লাহ একটা গাছের ডালে তরবারি ঝুলিয়ে নিচে শুয়ে ছিলেন। এক গ্রাম্য লোক গাওরাস ইবনুল হারিস এসে তরবারি নিয়ে নবিজিকে হত্যার চেষ্টা করে। নবিজি বললেন, আল্লাহ আমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় মুশরিকের অন্তর ভরে গেছে আতঙ্কে এবং তরবারি তার হাত থেকে খসে পড়ে। রাসূল তাকে ক্ষমা করে দেন। [৫৫১]

টিকাঃ
৫৪৯. বুখারি, ৫/৬২, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫০. বুখারি, যুদ্ধাভিযান অধ্যায়, হাদীস নং ৪১২৮
৫৫১. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ২০০

📘 রউফুর রহীম 📄 প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ ও দাওমাতুল জান্দাল

📄 প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ ও দাওমাতুল জান্দাল


প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ: উহুদ যুদ্ধের পর আবু সুফিয়ানের দেওয়া চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী নবিজি ﷺ দেড় হাজার সাহাবি নিয়ে বদর প্রান্তরে যান। কিন্তু আবু সুফিয়ান ভীরুতা প্রদর্শন করে মক্কা থেকে কিছু দূর এসেই ফিরে যায়। ফলে কোনো লড়াই ছাড়াই মুসলিমদের সামরিক সুখ্যাতি পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়।

দুমাতুল জান্দাল: রোমান সীমান্তবর্তী এলাকায় লুণ্ঠনকারী গোত্রসমূহকে দমনে নবিজি ﷺ এই অভিযান চালান। এটি ছিল রোমানদের প্রতি এক প্রকার ভীতিপ্রদর্শন এবং ইসলামি দাওয়াতের বৈশ্বিক বিস্তৃতির একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। [৫৫২]

টিকাঃ
৫৫২. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ৩/৩৭৩, ৩৭৪

এক. প্রতিশ্রুত বদরযুদ্ধ:
উহুদযুদ্ধের পর আবু সুফিয়ান বলেছিল, বদরে আমাদের আবার দেখা হবে। রাসূলুল্লাহ ১৫০০ সাহাবির এক মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে মাদীনা থেকে অভিযানে বের হন। আবু সুফিয়ান মাক্কা থেকে ৪০ মাইল দূরে মাররুজ জাহরান নামক স্থানে এসে ভীরুতা প্রদর্শন করে ফিরে যায়। পরিশেষে যুদ্ধ না করেই ফিরে আসে মুসলিম বাহিনী; কিন্তু মুসলিমরা তা বাস্তবায়ন করে নিজেদের শক্তিমত্তা দেখিয়েছে।

দুই. দুমাতুল জান্দাল:
৫ হিজরি সনে রবিউল আউয়াল মাসে আল্লাহর রাসূল এদের উদ্দেশে অভিযান পরিচালনা করেন। দুমাতুল জান্দাল এলাকাটি ছিল মাদীনা থেকে অনেক দূরে, প্রায় ১৬ দিনের পথ। মুজাহিদরা সেখানে পৌঁছালে লুণ্ঠনকারীরা পালিয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল উয়াইনাহ বিন হিস্স-এর সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেন। এই অভিযানের ফলে সিরিয়রা ইসলামের শক্তি ও দাপট কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারে। [৫৫২]

টিকাঃ
৫৫২. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ৩/৩৭৩, ৩৭৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية