📘 রউফুর রহীম 📄 তিরন্দাজ বাহিনী ও মুনাফিকদের সঙ্গে নবিজির আচরণ

📄 তিরন্দাজ বাহিনী ও মুনাফিকদের সঙ্গে নবিজির আচরণ


তিরন্দাজ বাহিনী
যে তিরন্দাজরা ইজতিহাদে ভুল করেছিলেন, আল্লাহর রাসূল তাদের কাতারের বাইরে পাঠিয়ে দেননি কিংবা তাদের এ কথাও বলেননি যে, তোমরা কোনো ধরনের নামাজ পড়তে পারবে না; বরং তাদের দুর্বলতা গ্রহণ করেছেন, হৃদয় উজাড় করে তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর দিকে খেয়াল করে আল্লাহ তা'আলাও এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। যারা দুনিয়া প্রত্যাশা করেছে, দুর্বলতা প্রকাশ করে রণক্ষেত্র ত্যাগ করেছে, সবার অপূর্ণতা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তাঁর নির্দেশে তোমরা তাদের হত্যা করছিলে; অবশেষে তোমরা যখন দুর্বলতা দেখালে, কাজের ক্ষেত্রে মতভেদ করলে এবং তোমরা যা পছন্দ কর, তা তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হলে, তোমাদের মাঝে কেউ দুনিয়া কামনা করছিল, আবার কতক আখিরাত, অতঃপর তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য তাদের থেকে সরিয়ে নিলেন; নিশ্চয় তিনি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, আর আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫২]

বাস্তবতা হলো—তারা নবিজির পক্ষ থেকে ক্ষমা পেলে মন প্রফুল্ল থাকবে। এর মাধ্যমে তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামাতও পূর্ণতা লাভ করবে। এজন্যই আল্লাহ তাঁর নবিকে বলেছেন তাদের ক্ষমা করে দিতে এবং তাদের ইসতিগফারে উৎসাহিত করতে। এমনিভাবে তাদের সঙ্গে মাশওয়ারা করার কথাও বলেছেন; ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রাহমাতে আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন; আপনি যদি কঠোর ও রুক্ষ মেজাজের হতেন, তাহলে তারা আপনার পাশে ঘেঁষত না; অতএব, তাদের ক্ষমা করে দিন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কোনো বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। যখন সংকল্পবদ্ধ হবেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৯]

মুনাফিক ইবনু সালুলের পশ্চাদপসরণ
তিনশো মুনাফিককে নিয়ে রণে ভঙ্গ দেওয়ার দ্বারা ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালুলের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি বাহিনীতে দ্বিধা সৃষ্টি করে তাদের দুর্বল করা, শত্রুকে সাহায্য ও নিজের হিম্মত বৃদ্ধি করা। ‘আবদুল্লাহ ইবনু হারাম তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পলায়ন করতে নিষেধ করেছেন; কিন্তু তারা তার ডাক প্রত্যাখ্যান করে।¹ এই পরিস্থিতিতেই আল্লাহ বলেন, দুটি দল মুখোমুখি হবার দিন তোমাদের যা স্পর্শ করেছে, তা আল্লাহর অনুমতিতেই, যেন তিনি মু'মিনদের চিনে নিতে পারেন এবং চিনতে পারেন মুনাফিকদের। তাদের বলা হলো—তোমরা ফিরে এসো, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো কিংবা প্রতিরোধ করো, তারা বলল—আমরা যদি লড়াইয়ের কথা জানতাম, তাহলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ঈমান অপেক্ষা সেদিন তারা কুফুরির অধিক নিকটবর্তী ছিল। তারা মুখে এমন কথা বলে, যা তাদের অন্তরে নেই; তাদের সুপ্ত বিষয় সম্পর্কে আল্লাহই অধিক অবগত। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৬-১৬৭]

মুনাফিকদের পলায়নের ফলে মুসলিমদের সংখ্যা কমে গিয়ে মুশরিকদের সঙ্গে তাদের সৈন্য-ব্যবধানটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। মুসলিমদের দুটি গোত্র প্রভাবিত হয়েছিল বেশ। মুনাফিক নেতাকে কড়া শাস্তির সম্মুখীন করা হলে তা সংগত হতো; কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এই মুনাফিকদের তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। জনসম্মুখে তাদের পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়াকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। এ কারণে হামরাউল আসাদ থেকে ফিরে এসে তাকে তাচ্ছিল্য ও লাঞ্ছিত করা সহজ হয়েছে।

ইমাম যুহরি বলেন, নিজ গোত্রের কাছে বেশ সম্মান ছিল 'আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের। লোকদের মাঝে সে শরীফ হিসেবে পরিচিত ছিল। এক জুমু'আর দিন নবিজি ﷺ বসে আছেন। ইবনু উবাই বয়ান করতে গিয়ে বলছিল, হে লোকসকল, তোমাদের মাঝে ইনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তোমাদের সম্মানিত করেছেন। সুতরাং তাঁকে সাহায্য করো, তাঁর কথা শোনো ও মানো। এ কথা বলে সে বসে পড়ে। উহুদের দিন তার আসল চেহারা সে প্রকাশ করে। লোকজন ফিরে আসার পর সে আবার দাঁড়িয়ে যায় আগের মতোই কিছু বলার জন্য। উপস্থিত মুসলিমরা তার কাপড়ের প্রান্ত ধরে আটকিয়ে বলে, আরে আল্লাহর দুশমন, বসে থাক। তুই যে কাজ করেছিস, তাতে তোর কোনো যোগ্যতা নেই। অপমানে মাথা নিচু করে সে লোকদের ডিঙিয়ে যেতে যেতে বলছিল, আল্লাহর কসম, যদিও আমি তাঁর কাজ শক্তিশালী করার জন্য উঠেছিলাম; কিন্তু ওরা মনে করেছে, আমি অনিষ্ট সাধনের জন্য উঠেছি। মাসজিদের দরজায় কিছু আনসারি সাহাবির সঙ্গে দেখা হলে তারা বলেন, কী ব্যাপার, কী হয়েছে তোমার? ইবনু উবাই ঘটে যাওয়া সবকিছু খুলে বলে। তারা বললেন, আরে, এতে কী হয়েছে! ফিরে যাও, আল্লাহর রাসূল তোমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। সে বলল, আল্লাহর কসম, তিনি আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন, এতে আমার কোনো আগ্রহ নেই।²

উহুদ আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি
আনাস ইবনু মালিক বলেন, একবার উহুদ পাহাড় নবিজির চোখে পড়লে তিনি বলেন, এই পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি। আল্লাহর রাসূলের এই কথার অনেক অর্থ হতে পারে। যেমন: সালিহ শামি বলেছেন, আগেরকার মানুষ আপতিত বিপদের সঙ্গে স্থান ও কালকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করত। মনে করত, এই স্থান কিংবা এই সময়ের কারণে এই বিপদ ঘটেছে। বর্তমানের মূর্তিপূজকরা এখনো এমন বিশ্বাস পোষণ করে। এরপর ইসলামের আবির্ভাব ঘটল। ইসলাম তার জন্মের শুরু থেকেই প্রচলিত ভ্রান্ত বিশ্বাস, অপসংস্কৃতি, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সব সময় দূরে থেকেছে কুলক্ষণের ধারণা থেকে। উহুদযুদ্ধের পর ব্যথাতুর একটি স্মৃতি মুসলিমদের অন্তরে গেঁথে ছিল। এতে সন্দেহ নেই যে, মুসলিমরা উহুদের পাশে দাঁড়ালে যুদ্ধের কথা মনে পড়ত। এরপর তাদের অন্তরে যেন এই মন্দ ধারণা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য নবিজি স্পষ্ট করেছেন স্থান ও কাল আল্লাহর দুটি সৃষ্টি; এই বিপদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই; সবকিছুই আল্লাহর হাতে। আর উহুদকে কেন ভালোবাসবেন না, অথচ হামযা ও সাহাবিদের আশ্রয় দেবার জন্য আল্লাহ এই পাহাড়কে নির্বাচন করেছেন!

উহুদযুদ্ধে ফিরিশতাদের দল
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস বলেন, উহুদের দিন আমি রাসূলুল্লাহ-এর ডানে-বামে শুভ্র পোশাক পরিহিত দুজন লোককে দেখেছি। তারা নবিজিকে বাঁচাতে বীর বিক্রমে লড়াই করছিলেন। উহুদের আগে-পরে তাদের কোনো দিন দেখিনি। আর তারা ছিলেন জিবরীল ও মীকাইল। নবিজিকে রক্ষা করতে এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। কেননা তিনি মানুষের অনিষ্ট থেকে তাকে রক্ষার ওয়াদা করেছেন। এছাড়া উহুদের অন্য কোথাও ফিরিশতারা যুদ্ধ করেছিল-বিশুদ্ধ সূত্রে এমনটা প্রমাণিত নয়। তিনটি শর্তসাপেক্ষে আল্লাহ মু'মিনদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন-সবর, তাকওয়া ও দ্রুত শত্রুর আগমন। এ বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি বিধায় আল্লাহর সাহায্য আসেনি (আল্লাহ সরাসরি ফিরিশতা নিযুক্ত করেননি)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, স্মরণ করুন, যখন আপনি মু'মিনদের বলছিলেন, তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয়, তিনি তোমাদের অবতীর্ণ তিন হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য করবেন? হ্যাঁ, তোমরা যদি সবর করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা তোমাদের কাছে দ্রুত আসে, তবে তোমাদের রব তোমাদের সারিবদ্ধ পাঁচ হাজার ফিরিশতা দ্বারা সাহায্য করবেন। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১২৪-১২৫]

শহিদদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের স্থায়ী নিয়ামাত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমাদের ভাইয়েরা উহুদে শহিদ হবার পর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রাণগুলোকে সবুজ পাখির পেটে রেখে দিয়েছেন। ওরা জান্নাতের নহরসমূহের তীরে ঘুরে বেড়ায়, জান্নাতের ফল খায় এবং আরশের ছায়ায় স্বর্ণের বাসায় তারা আশ্রয় নেয়। অমীয় সুধা, সুস্বাদু খাবার ও উত্তম স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন অনুভব করে। জান্নাতি নিয়ামাতের আবেশে মুগ্ধতার পরশে তারা বলে, হায়, আমাদের ভাইয়েরা যদি জানত, আল্লাহ আমাদের জন্য কী প্রস্তুত করে রেখেছেন—তারা আমরণ জিহাদ করত, যুদ্ধ থেকে পলায়ন করত না। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমি তাদের কাছে তোমাদের কথা পৌঁছে দেবো। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেন, আল্লাহর রাস্তায় যারা শহিদ হয়েছে, তাদের মৃত ভেব না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত—রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছে। আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহে তারা উৎফুল্ল, তাদের পেছনে, এখনো যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি, তাদের জন্য আনন্দিত হয় এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামাত ও অনুগ্রহ লাভে আনন্দিত হয় এবং আল্লাহ মু'মিনদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৯-১ৃতি]

আয়াতের তাফসীর আলোচনায় ওয়াহিদি সাঈদ বিন জুবাইর থেকে বর্ণনা করেন, হামযা ও মুস'আব বিন উমাইরের শাহাদাত বরণের পর তাদের জান্নাতের স্বপ্নিল ভুবনে নেওয়া হয়। উত্তম রিযিকের অভাবনীয় স্বাদ প্রাপ্তির পর তারা বলেন, হায়, আমাদের ভাইয়েরা এই সুখ ও সমৃদ্ধির কথা জানলে জিহাদে প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের কথা শুনে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন। মুসলিম মাসরুক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, আমরাও এটা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম; নবিজি বলেছেন, তাদের রূহগুলো সবুজ পাখির পেটে রাখা হয়েছে; আরশের সঙ্গে সংযুক্ত বাসায় তারা থাকে, জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়ায়, আবার তারা তাদের ঘরে আশ্রয় নেয়। আল্লাহ তাদের দর্শন দিয়ে বলেন, তোমরা আরও কিছু প্রত্যাশা করো? তারা বলে, আমরা আর কী চাইব? তারা তো জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা যেতে পারি! এই প্রশ্ন তিনি তাদের তিনবার করেন। যখন তারা দেখল, তাদের কিছু চাওয়া ব্যতীত ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না, তখন তারা বলে, আমাদের রব, আমাদের রূহগুলো আবার আমাদের দেহে প্রবেশ করান, যেন আমরা আপনার রাস্তায় আবার জিহাদ করতে পারি। আল্লাহ তাদের উপযুক্ত কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই দেখে অবশেষে তাদের ছেড়ে দেন।

টিকাঃ
৫৩৫. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/৫৩
৫৩৬. মুসলিম, ফাজায়েল অধ্যায়, ৪/১৮০২

ফন্ট সাইজ
15px
17px