📘 রউফুর রহীম 📄 নারী সাহাবিয়াদের ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত

📄 নারী সাহাবিয়াদের ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত


সাফিয়্যাহ বিনতে ‘আবদুল মুত্তালিব
উহুদযুদ্ধে শহিদ ভাইকে দেখতে এলেন সাফিয়্যাহ। ততক্ষণে মুশরিকরা খুব জঘন্যভাবে তার অঙ্গবিকৃতি—নাক-কান কেটে ফেলেছে, ফেঁড়েছে পেট; পুরুষাঙ্গ পর্যন্ত ওদের ছুরি থেকে রক্ষা করেনি। রাসূলুল্লাহ সাফিয়্যার ছেলে যুবাইরকে বললেন, তাকে থামিয়ে ফিরে যেতে বলো। তার ভাইয়ের এই করুণ দৃশ্য যেন না দেখে। যুবাইর তাকে বললেন, মা, আল্লাহর রাসূল আপনাকে ফিরে যেতে বলেছেন। তিনি বললেন, কিন্তু কেন? আমি শুনেছি, আমার ভাইয়ের অঙ্গহানি করা হয়েছে? তবে তা আল্লাহর জন্য। ইনশাআল্লাহ, আমি সবর ও সাওয়াবের প্রত্যাশা করব। যুবাইর ইবনুল আওয়াম নবিজির কাছে এসে সাফিয়্যার কথা জানালেন। তিনি বললেন, তাকে যেতে দাও। এরপর সাফিয়্যাহ এসে ভাইকে দেখেন। তার জন্য দু’আ করে ফিরে আসেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

হামনা বিনতে জাহাশ
শহিদদের লাশ দাফন করার পর নবিজি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। মুসলিমরা তাকে অনুসরণ করেন মাদীনায় ফিরে আসার জন্য—এমন সময় হামনা বিনতে জাহাশ নবিজির সঙ্গে দেখা করেন। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, হামনা, সাওয়াবের আশা করো। হামনা জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্য ইয়া রাসূলাল্লাহ? তোমার খালু হামযা ইবনু ‘আবদুল মুত্তালিবের জন্য।—বললেন রাসূলুল্লাহ। হামনা বললেন, আমরা আল্লাহর জন্য, তার দিকেই আমরা প্রত্যাবর্তিত হব, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তার শাহাদাত হোক সুখময়। নবিজি আবার বললেন, হামনা, আল্লাহর কাছে সাওয়াবের প্রত্যাশা করো। কার জন্য, ইয়া রাসূলাল্লাহ?—হামনা জিজ্ঞেস করলেন। তোমার স্বামী মুস'আব বিন উমায়েরের জন্য।—রাসূল বললেন। হামনা বললেন, হায় আল্লাহ, আমার এ ব্যথা কোথায় রাখি! এরপর তিনি চিৎকার করে কান্না করতে থাকেন। নবিজি বললেন, নারীর কাছে তার স্বামীর স্থান অন্যরকম। তিনি দেখলেন, ভাই ও খালুর মৃত্যুর কথা শুনে হামনা অবিচল ছিলেন; কিন্তু স্বামীর কথা শুনতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। নবিজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এমন করে বললে কেন? হামনা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে তো তার সন্তানকে ইয়াতীম করে চলে গেল। নবিজি তার সন্তান ও উত্তম স্থলাভিষিক্তের জন্য দু’আ করলেন। কিছুদিন পরেই তালহা বিন উবাইদুল্লাহ হামনাকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় মুহাম্মাদ ও ইমরান। মুহাম্মাদ বিন তালহা ছিলেন বাবার জন্য সবচেয়ে বন্ধন রক্ষাকারী।

এক দীনারি নারী
রাসূলুল্লাহ বনি দীনারের এক নারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তাকে বলা হলো—যুদ্ধে তোমার ভাই, স্বামী ও বাবা শহিদ হয়েছেন। মহিলা বলল, আমাকে বলুন—আল্লাহর রাসূল কেমন আছেন? লোকেরা বলল, তিনি ভালো আছেন। আলহামদুলিল্লাহ তিনি সুস্থ আছেন। মহিলা বলল, আমাকে বলুন—তিনি কোথায় আছেন? আমি তাকে এক পলক দেখতে চাই। তাকে ইশারা করা হলো। এই নারী নবিজির কাছে এসে তাকে সুস্থ দেখে বললেন, আপনার পরে প্রত্যেক বিপদই আমার কাছে তুচ্ছ। প্রিয়নবির প্রতি এমনই ছিল তাদের ভালোবাসা। মুসলিমদের কাছে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়।

উম্মু সা'দ বিন মু'আজ
তার নাম কাবশা বিনতে উবাইদ খাযরাজিয়্যাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোড়ার পিঠে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় উম্মু সা'দ তার দিকে ছুটে আসেন। সা'দ বিন মু'আজ নবিজির ঘোড়ার লাগাম ধরে ছিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা আসছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাকে অভিনন্দন জানাও। উম্মু সা'দ নবিজির আরও কাছে এসে বললেন, আপনাকে সুস্থ ও নিরাপদ দেখে আমার মুসীবতের কথা ভুলে গেছি। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে তার ছেলে আমর বিন মু'আজের সঙ্গে মিলিয়ে বলেন, উম্মু সা'দ, সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তাদের পরিবারকেও সুসংবাদ দাও। তাদের নিহতরা সবাই জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে, তারা তাদের পরিবারের পক্ষেও শাফা'আত করবে। উম্মু সা'দ বলেন, আমরা সন্তুষ্ট ইয়া রাসূলাল্লাহ। এরপরও কে কাঁদবে তাদের জন্য? ইয়া রাসূলাল্লাহ, পরবর্তীদের জন্য দু'আ করুন। নবিজি ﷺ বললেন, হে আল্লাহ, তাদের অন্তরের দুশ্চিন্তা দূর করে দাও, বিপদ উঠিয়ে নাও, উত্তম স্থলাভিিক্ত দিয়ে দাও।¹

হামরাউল আসাদ যুদ্ধ
কিছু বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল ﷺ জানতে পারেন, আবু সুফিয়ান তার সৈন্যদের তিরস্কার করছিল এ কারণে যে, তারা মুহাম্মাদ ও তার বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করতে পারেনি। ইবনু আব্বাস বলেন-মুশরিকরা রাওহা নামক স্থানে পৌঁছে যাত্রাবিরতি করে। আবু সুফিয়ান সবাইকে তাচ্ছিল্য করে বলে, তোমরা মুহাম্মাদকেও হত্যা করতে পারলে না, সক্ষম হলে না তাদের পায়ের গোড়ালি ভেঙে দিতে! কী করলে তোমরা? আমরা আবার মাদীনায় অভিযান চালাব। তাদের এই মনোবৃত্তি অবশ্য গোপন থাকে না। গুপ্তচর নবিজি ﷺ-এর কাছে ওদের সব খবর সরবরাহ করে। আল্লাহর নবি ভীত হবার পাত্র নন। দীনের শত্রুদের উচিত শিক্ষা দিতে তিনিও হামরাউল আসাদে সেনা সমাবেশ ঘটান।

ইবনু ইসহাক বলেন, শাওয়াল মাসের মাঝের দিকে শনিবার দিন উহুদযুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরের দিনই আল্লাহর রাসূলের একজন ঘোষক লোকদের মাঝে ঘোষণা দিয়ে বলে, শত্রুদের বিরুদ্ধে আবার অভিযানের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আজ আমাদের সঙ্গে তারাই বের হতে পারবে, যারা উহুদযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এবার জাবির বিন 'আবদুল্লাহ ﷺ জিহাদের জন্য অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সাহাবিগণ আবার জিহাদের ডাকে সাড়া দেন। এমনকি আঘাতপ্রাপ্তরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে আসেন। বনু 'আবদুল আশহালের এক ব্যক্তি বলছিলেন, আমি ও আমার ভাই উহুদে অংশ নিয়েছিলাম। পরদিন আবার যুদ্ধের ঘোষণা এলে আমরা একে অপরকে বললাম, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে কোনো যুদ্ধ করার সুযোগ আমরা কি হারিয়ে ফেলব? আল্লাহর কসম, আরোহণের মতো কোনো বাহন আমাদের ছিল না। আমাদের আঘাতও ছিল তুলনামূলক মারাত্মক। আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা অন্তরে পুষে মনের শক্তিতেই আমরা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে রওনা করলাম। তুলনামূলক আমার ক্ষত ছিল সহনীয় পর্যায়ের; কিন্তু আমার বন্ধুর জন্য হাঁটতে পারাই ছিল দুষ্কর। তাই আমি ওকে নিয়ে কতক্ষণ চলতাম, আর কিছুক্ষণ সে পা টেনে চলত। এভাবেই আমরা আমাদের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যাই।

রাসূলুল্লাহ হামরাউল আসাদে মুশরিকদের অপেক্ষায় তিনদিন কাটিয়ে দেন; কিন্তু ওরা মুখোমুখি হবার কোনো আভাস দেয়নি। নবিজির নির্দেশ সাহাবিগণ একই সময়ে পাঁচশো মশাল জ্বালিয়ে দিতেন। এখানে অবস্থানকালে মা'বাদ বিন আবু মা'বাদ নবিজির সাথে দেখা করেন। গুপ্তচরবৃত্তিতে তার খ্যাতি ছিল বেশ। মুশরিকদের কাছেও যেহেতু তার মুসলিম হওয়ার পরিচয় গোপন ছিল, তাই রাসূল তাকে প্রস্থানে প্রলুব্ধ করতে আবু সুফিয়ানের কাছে প্রেরণ করেন। মা'বাদ রওহা নামক স্থানে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। আবু সুফিয়ান তাকে জিজ্ঞেস করে, মা'বাদ, তোমার পেছনে কারা? তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিরা। তারা তোমাদের অপেক্ষায় ফুঁসে আছে। এমন সৈন্যবহর নিয়ে এসেছে, ইতঃপূর্বে এমনটা দেখা যায়নি। যারা আসেনি, তারা এখন আফসোস করছে। আবু সুফিয়ান বলল, তুমি কী বলতে চাও? মা'বাদ বললেন—আমি বলতে চাচ্ছি, মাদীনায় অভিযানের দুঃসাহস তুমি করো না। আবু সুফিয়ান বলল, আল্লাহর কসম, আমি ওদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য বিপুল সেনা সমাবেশ ঘটাব। মা'বাদ বলেন, আমি তোমাকে এমন বোকামো করতে বারণ করব। পরে পস্তাবে; কিন্তু তাতে লাভ হবে না।

আবু সুফিয়ান ও তার সাথিরা মা'বাদের কথায় খানিক প্রভাবিত হয়। আবু সুফিয়ান তার প্রত্যাগমনের কথা গোপন রেখে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা প্রকাশ করে। উদ্দেশ্য-মুসলিমদের ভীতিপ্রদর্শন করা। এ লক্ষে প্রস্তুত করে এক ঝটিকা দল। তাদের এই বার্তা দিয়ে প্রেরণ করে-আবু সুফিয়ান ও অনুচররা একত্রিত হয়েছে মাদীনায় অভিযান করতে; মুসলিমদের সমূলে ধ্বংস করে ফিরবে তারা। আবু সুফিয়ান তার বাহিনীর সবাইকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উকায বাজারে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক যোদ্ধাকে যাবীব (কিশমিশ) দেবে। রাসূলুল্লাহ তখনো হামরাউল আসাদে অবস্থান করছিলেন। সেখানে প্রতিনিধি দলটি এসে তাকে আবু সুফিয়ানের সংবাদ শুনিয়ে দেয়। তখন নবিজি ও মুসলিমরা একবাক্যে বলে ওঠেন-আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই উত্তম অভিভাবক।

মুসলিমরা তাদের যুদ্ধের সংকল্পে অটল থাকেন। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন আমরণ জিহাদের জন্য। ইসলামি সেনাদের এই অবিচল মানসিক অবস্থান মুশরিকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়। ওরা নিরাপত্তার ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। আল্লাহ ওদের অন্তরে ভীতি সঞ্চারিত করেন। অনেকটা ভয়ার্ত মনে ওরা মাক্কায় ফিরে যায়। ওদের ভাগিয়ে মুসলিমরাও মাদীনায় ফিরে আসে অপ্রতিরোধ্য আত্মিক শক্তি নিয়ে, মুছে যায় পরাজয়ের গ্লানি; ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় ব্যর্থতার দাগ। তারা মাদীনায় প্রবেশ করে সম্মানের চূড়ায় ওঠে, চূর্ণ হয় মুশরিকদের দম্ভ; ভেঙে যায় ইয়াহুদি ও মুনাফিকদের ঐক্য। কুরআনুল কারীম এই যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করেই ইরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পরও, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। যাদের লোকেরা বলেছিল যে, নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে অনেক লোক সমবেত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো; কিন্তু তা তাদের ঈমান আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিল-আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই-না উত্তম অভিভাবক। অতঃপর তারা ফিরে এসেছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামাত ও অনুগ্রহসহ, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি; তারা অনুসরণ করেছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির, আর আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল। (পক্ষান্তরে) সে তো শয়তান, সে তোমাদের তার বন্ধুদের ভয় দেখায়; তোমরা তাদের ভয় করো না; বরং আমাকেই ভয় করো-যদি তোমরা মু'মিন হও। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭২-১৭৫]

আবু ইযযাহ জুমাহি। একজন কবি। বদরযুদ্ধে বন্দি হওয়ার পর সে ওয়াদা করেছিল, মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ করবে না; কিন্তু সে কৃতপ্রতিশ্রুতির কোনো তোয়াক্কা না করে উহুদযুদ্ধে মুসলিমদের বিপক্ষে আবার যুদ্ধে নামে। মাদীনায় ফিরে পুনরায় বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আর যুদ্ধ করব না। নবিজি বলেন, এবার আর তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি না। মাক্কায় গিয়ে তুমি এবার এ কথা বলার সুযোগ পাবে না যে—মুহাম্মাদকে আমি দুবার ধোঁকা দিয়েছি। যুবাইর, ওর গর্দান উড়িয়ে দাও। তার গর্দান কাটার পর নবিজি বলেন, মু'মিন কখনো এক গর্তে দুবার দংশিত হয় না। মুশরিকদের মধ্যে এই লোকটাই শুধু বন্দি হয়েছিল উহুদযুদ্ধে। এই কাজটিকে শারঈ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা, এই কবি ছিল নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী—ফিতনা উসকে দিত। তাকে অনুগ্রহ করা হলে সে আবার হয়তো মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত।

উহুদযুদ্ধে মুসলিমরা শহিদ হন ৭০ জন। নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসীর এ সংখ্যাটাকে আরও স্পষ্ট করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, যখন তোমাদের ওপর বিপদ এলো, (অথচ) তোমরা তো ইতঃপূর্বে দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়েছিলে। তোমরা বললে, এমন কেন হলো! আপনি বলুন, এটা তোমাদের নিজেদের কারণেই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের ওপর ক্ষমতাবান। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৫] উহুদে আপতিত বিপদে মুসলিমরা ছিলেন ভারাক্রান্ত। তাদের ব্যথিত হৃদয়ে সান্ত্বনার প্রলেপ ঢেলে দিতে আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন। ইবনু আতিয়াহ বলেন, মুসলিমরা বদরযুদ্ধে ৭০ জন মুশরিককে হত্যা করেছিল, বন্দি করেছিল ৭০ জনকে। মুশরিকরা উহুদযুদ্ধে ২২ জন নিহত হলেও ৭০ জন মুসলিমকে শহিদ করে।

মুসলিম মুজাহিদরা ছিলেন ক্ষতবিক্ষত। অযাচিত বিপদে পর্যুদস্ত। হয়তো সময়ের দাবি ছিল বেদনাকাতর এই বাহিনীকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া; কিন্তু সূক্ষ্ম কিছু কারণে আল্লাহর রাসূল তাদের নিয়েই হামরাউল আসাদে গমন করেন— ১. উহুদযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের মাঝে যেন পরাজয়ের অনুভূতি না থাকে। ২. এ কথা স্পষ্ট করা যে, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে দুর্বল হওয়ার পরও শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই এবং আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দিতে তারা প্রস্তুত। ৩. শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহাবিগণকে চাঙ্গা রাখা। ৪. এ কথা জানানো যে, মুসলিমদের ওপর আপতিত এই বিপদ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এটাই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। এর পেছনের হিকমাহ তিনিই ভালো জানেন। মূলত মুসলিমরাই শক্তিশালী। আর প্রতিপক্ষ বাহ্যত শক্তিশালী হলেও দুর্বল। হামরাউল আসাদে গমন, সেখানে তিনদিন অবস্থান, প্রতি রাতে মশাল প্রজ্বলন, সবশেষে মুশরিকদের ধাওয়া করাই প্রমাণ করে মুসলিমরাই ছিল শক্তিশালী।

টিকাঃ
৫৩১. আস-সারায়া ওয়াল বু'উসুন নাবাউয়্যাহ, ২/১২৮

📘 রউফুর রহীম 📄 উহুদযুদ্ধ: শিক্ষা ও ইতিবাচক দিকসমূহ

📄 উহুদযুদ্ধ: শিক্ষা ও ইতিবাচক দিকসমূহ


কুরআনে উহুদযুদ্ধের কথা খুব সূক্ষ্মভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরআন উহুদযুদ্ধের যে চিত্র এঁকেছে, অন্যান্য বর্ণনা অপেক্ষা তা অধিক স্পষ্ট ও জীবন্ত। কুরআনে তিরস্কার করা হয়েছে, দেওয়া হয়েছে উপদেশ। সবশেষে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে সবার অন্তরে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুরআনুল কারীম নবিজির এই বাহিনীর অন্তরের কথা স্পষ্ট করেছে। কুরআন অন্তরের গহীনে আলোর বিকীরণ ছড়িয়েছে, মুসলিমরাও নিজেদের হৃদয়ের গভীরে তা উপলব্ধি করতে পেরেছে।

কুরআনের মর্ম নবিজি ﷺ-এর অনুভূতি চিন্তাচেতনা ও উপলব্ধিতে গেঁথে গেছে। কুরআনের আবেদন মোতাবেক তিনি পরিচালনা করেছেন উম্মাহকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার আন্দোলন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পৃথিবীর মূলে দীনের শেকড় মজবুতকরণ প্রচেষ্টা। এজন্যই আমরা দেখি উহুদের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে তিনি কুরআনের পন্থা অনুসরণ করেছেন। আমরা গৃহীত সমূহ পন্থার কথা উল্লেখের প্রয়াস চালাব ইনশাআল্লাহ...

আল্লাহর বিধানের স্মরণ ও দৃঢ় ঈমানের দিকে আহ্বান
আল্লাহ তা'আলা বলেন, অবশ্যই তোমাদের পূর্বে বহু বিধান গত হয়েছে। অতএব, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের পরিণতি কেমন হয়েছিল! এটি মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত ও উপদেশ। তোমরা দুর্বল হয়ো না, দুশ্চিন্তাও করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি মু’মিন হও। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৩৭-১৩৯]

উল্লিখিত আয়াতে উহুদযুদ্ধে পরাজয়ের পর আল্লাহ মুসলিমদের অন্তরে শয়তানের প্ররোচনার কোনো অবকাশ রাখেননি। এই আয়াত দিয়ে সম্বোধন করে তাদের অন্তরে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। দেখিয়েছেন অবিচলতা ও দৃঢ় ঈমানী শক্তির পথ। প্রশমিত করেছেন তাদের হৃদয়ের ব্যথা। কুরতুবি বলেন, এই আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'মিনদের জন্য সান্ত্বনা।

পূর্ববর্তী উম্মাহর মাঝে আল্লাহর একত্ববাদের আহ্বান যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাদের পরিণতি নিয়ে ভাবার কথা উঠে এসেছে এই আয়াতে। চিন্তার বিষয় হলো, কীভাবে কর্ম অনুযায়ী আল্লাহর নীতি তাদের ওপর বাস্তবায়িত হয়েছে! তা এভাবে- যুলুম, পাপাচার, অবাধ্যতা ও কুফুরির কারণে বিভিন্নভাবে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া। উদ্দেশ্য হলো-মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীদের অবস্থা সম্পর্কে একটা চিত্র অঙ্কন করা, যারা অবাস্তব দাবি উত্থাপন করত। পাশাপাশি বাস্তব উপলব্ধির বীজ বপন করা এবং মু'মিন অন্তরে উপদেশের জল সিঞ্চন করা। আল্লাহ দুনিয়াতে পূর্ববর্তীদের রাজত্ব দিয়েছিলেন। দান করেছিলেন বেশুমার নিয়ামাত; কিন্তু তারা এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। ফলে অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাদের বিনাশ করেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা বলছেন, তোমরা দুর্বল হয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি মু'মিন হও-এখানে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, দুর্বলতা ত্যাগ করতে, ভীরুতা ঝেড়ে ফেলতে; বলছেন-আবল্যতায় আচ্ছন্ন হওয়া কিংবা দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই; কেননা মু'মিনই ঈমানের কারণে বিজয়ী হবে।

মু'মিনদের প্রতি সান্ত্বনা ও উহুদে আপতিত বিপদে আল্লাহর হিকমাহ
আল্লাহ তা'আলা বলেন, যদি তোমাদের আঘাত স্পর্শ করে থাকে, তবে এর অনুরূপ আঘাত সেসব লোকদেরও স্পর্শ করেছিল। আর এইসব দিন আমি মানুষের মাঝে পালাক্রমে আবর্তিত করি, যেন আল্লাহ ঈমানদারদের জানতে পারেন এবং তোমাদের কতককে গ্রহণ করতে পারেন শহিদ হিসেবে, আর আল্লাহ যালিমদের ভালোবাসেন না। আর যাতে আল্লাহ বাছাই করেন মু'মিনদের এবং কাফিরদের করে দেন ধ্বংস। তোমরা কি ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি-তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করেছে এবং এ-ও জানেননি যে, কারা ধৈর্যশীল! তোমরা মৃত্যু কামনা করেছিলে তার সঙ্গে সাক্ষাতের আগে, এখন তো তোমরা তা স্বচক্ষে দেখলে। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৪০-১৪৩]

আল্লাহ বর্ণনা করছেন—এই আঘাত ও শাহাদাত, মু'মিনদের দেহে এবং কঠোর সংগ্রামে যেন কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে। কেননা এবার তোমরা যেমন আঘাত পেয়েছ, তেমনি ইতঃপূর্বে তোমাদের শত্রুরাও পেয়েছিল। যুদ্ধে এমনটা হওয়ার কারণে তারা তাদের ভ্রষ্টতা ও অশুভ পরিণতি নিয়ে যদি না ভাবে, তাহলে যারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যাদের পরিণতি সুন্দর, তারা এ ব্যাপারে না ভাবা আরও বাঞ্ছনীয়। তাফসীরুল কাশ্শাফের রচয়িতা বলেন, আয়াতের অর্থ হলো, উহুদের দিন তোমরা যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছ, বদরযুদ্ধে তারাও এর মুখোমুখি হয়েছিল। এটা তাদের অন্তর দুর্বল করেনি, যুদ্ধ করে তোমাদের থেকে বদলা দেওয়ার মনোবৃত্তিতে ভাটা পড়েনি। অতএব, তোমাদের জন্য এটাই অধিক বাঞ্ছনীয় যে, তোমরা দুর্বল হবে না কিংবা হীনম্মন্যতায় ভুগবে না। ইবনু আব্বাস বলেন, উহুদের দিন ছিল বদরের বিনিময়। উহুদের মু'মিনরা যুদ্ধ করেছে; আল্লাহ তাদের মধ্য হতে শহিদদের গ্রহণ করেছেন। আর বদরের দিন মুশরিকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাসূল বিজয় অর্জন করার ফলে ইসলাম একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভ করেছে। উহুদযুদ্ধে মু'মিনরা যে বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে, এতে আল্লাহ চারটি হিকমাতের কথা উল্লেখ করছেন— ১) আল্লাহর জ্ঞান বাস্তবায়িত হওয়া এবং মু'মিনদের সামনে তা প্রকাশ করা। ২) মু'মিনদের অনেককে শাহাদাতের মাধ্যমে সম্মানিত করা, এতে শহিদ ব্যক্তি সমুন্নত মর্যদায় উন্নীত হতে পারবে। ৩) মু'মিনদের পবিত্র করা। তাদের ভুল থেকে মুক্ত করা এবং মুনাফিকদের থেকে পৃথক করা। ৪) কাফির সম্প্রদায়কে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।

ভুল সংশোধনের ধরন-প্রকৃতি
বদরযুদ্ধে প্রেক্ষাপটে আল্লাহ যেমন আয়াত নাযিল করেছেন, সে তুলনায় উহুদের পর কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে কোমল সম্বোধনে। আল্লাহ তা'আলা বদরযুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, কোনো নবির জন্য উচিত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে (এবং সম্পদের বিনিময়ে তিনি তাদের মুক্ত করে দেবেন), যতক্ষণ না তিনি জমিনে রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছ, আর আল্লাহ চাচ্ছেন আখিরাত। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর লিখন অতিবাহিত না হয়ে থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ, সে কারণে মহাশাস্তি তোমাদের স্পর্শ করত। [সূরা আনফাল, ৮: ৬৭-৬৮] এরপর উহুদযুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তার প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তার নির্দেশে তোমরা তাদের হত্যা করছিলে; অবশেষে তোমরা যখন দুর্বলতা দেখালে, কাজের ক্ষেত্রে মতভেদ করলে এবং তোমরা যা পছন্দ কর, তা তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হলে, তোমাদের মাঝে কেউ দুনিয়া কামনা করছিল আবার কতক আখিরাত;-অতঃপর তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য তাদের থেকে সরিয়ে নিলেন, নিশ্চয় তিনি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন; আর আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫২]

পূর্ববর্তী মুজাহিদদের দৃষ্টান্ত স্থাপন
আল্লাহ তা'আলা বলেন, আর কত নবি ছিল, যার সঙ্গে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে। আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে, এজন্য তারা হীনবল হয়নি, হয়নি দুর্বল এবং নতশির। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। আর তাদের কথা শুধু এই ছিল যে, তারা বলত, হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহ ও আমাদের কাজে আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন, আমাদের পা দৃঢ় রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৪৬-১৪৮] ইবনু কাসীর বলেন, উহুদযুদ্ধে যখন চিৎকার ভেসে আসে-মুহাম্মাদ নিহত হয়েছেন, এই আওয়াজ শুনে যারা যুদ্ধ ত্যাগ করে মাদীনায় ফিরে গেছে, প্রথমত তাদের তিরস্কার করা হয়েছে।² এরপরই আল্লাহ তাদের সামনে পূর্ববর্তী মুজাহিদদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন—তারা তাদের নবির পেছনে জিহাদের লক্ষে আল্লাহর রাস্তায় সফর করেছে, তদুপরি আল্লাহর রাস্তায় আপতিত বিপর্যয়ে তারা হীনবল হয়নি, জিহাদের মানসিকতায় ভাটা পড়েনি, শত্রুর কাছে তারা কোনোভাবেই মাথা নত করেনি; বরং জিহাদের পথে তারা অবিচল থেকেছে, বিপদে সবর করেছে। তারা যে বলত, হে আমাদের রব, আমাদের পাপ ও আমাদের কাজে সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করে দিন—যদিও তারা ছিল আল্লাহ প্রেমিক তবুও তাদের দু'আর কথা উল্লেখ করে বোঝানো হচ্ছে, তারা ছিল আল্লাহর কাছে নমনীয়। আবার শত্রুর মোকাবিলায় এসে তারা নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন, যেন তাদের আল্লাহ সাহায্য করেন। মুসলিমদের জন্য এখানে শিক্ষা হলো—শত্রুর বিরুদ্ধে জয় লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে বিনয়ী হওয়া, তাওবা ও ইসতিগফার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।

আল্লাহ তা'আলা বলেন, অতঃপর আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পুরস্কার দান করলেন। অর্থাৎ দুনিয়াতে গানীমাত এবং আখিরাতে উত্তম প্রতিদান। এটা তাদের উৎকৃষ্ট পদ্ধতিতে দু'আ ও আল্লাহর দিকে অভিমুখী হওয়ার কারণে। তাদের ইহসান হলো, জিহাদে তাদের অবস্থান; এর মাধ্যমেই তারা দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদের সামনে তাদের উপমা পেশ করছেন। আখিরাতের সাওয়াবের কথা আল্লাহ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন; কেননা দুনিয়ার তুলনায় তা বহুগুণে উত্তম; আল্লাহর কাছে সেটাই গ্রহণযোগ্য।

আমীরের অমান্যতা পরাজয়ের কারণ
'আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার অনুচর মুনাফিকরা রণে ভঙ্গ দিলে মুসলিমরা প্রাথমিক একটা ধাক্কা খেলেও তা সামলে নেন; কিন্তু তিরন্দাজ বাহিনী তাদের আমীরের নির্দেশ অবহেলা করে স্থান ত্যাগ করার কারণে মুসলিম বাহিনী ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ তাদের ওপর শত্রুদের চাপিয়ে দেন। মুসলিমরা মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পরাজয় ঘনীভূত হয়। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ মোতাবেক সবাই যখন নিজ নিজ অবস্থানে ছিল, ততক্ষণ মুসলিমদের বিজয়ের পাল্লা ভারী ছিল; কিন্তু আমীরের কথা অমান্য করে যখন তিরন্দাজ বাহিনী পাহাড় থেকে নেমে আসে, বিপর্যয় দেখা দেয় ঠিক তখনই। মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, স্মরণ করো, যখন তোমরা ওপরের দিকে ছুটছিলে এবং কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিলে না, আর রাসূল তোমাদের ডাকছিলেন পেছন থেকে। ফলে তিনি তোমাদের দুঃখের ওপর দুঃখ দিয়েছেন, যেন তোমরা যা হারিয়েছ এবং তোমাদের যা স্পর্শ করেছে, সে কারণে তোমরা ব্যথিত না হও, আর আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৩]

দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষতি
আল্লাহর কাছে দুনিয়ার অবস্থান কী পর্যায়ে, তার বর্ণনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ কুরআনের আয়াত ও হাদীস উল্লিখিত হয়েছে। দুনিয়ার চাকচিক্য ও প্রভাব মানুষের জন্য যে ফিতনার কারণ, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এর প্রতি লালায়িত হওয়া থেকে সতর্ক করে বলেছেন, নারী, সন্তান, রাশিকৃত সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু এবং খেতখামারের প্রতি আসক্তিকে মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে, এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগ্যসামগ্রী। আর আল্লাহর কাছে আছে উত্তম আশ্রয়স্থল। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৪] রাসূলুল্লাহ তাঁর উম্মতকে দুনিয়াবি কারণে প্রতারিত হওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত-রাসূলুল্লাহ বলেন, নিশ্চয় দুনিয়া সুমিষ্ট ও লোভনীয়, আর আল্লাহ তোমাদের এতে প্রতিনিধি বানিয়েছেন, কে ভালো আমল করে তা দেখার জন্য। সুতরাং তোমরা দুনিয়া ও নারী থেকে বেঁচে থাকো; কেননা বনি ইসরাইলে প্রথম ফিতনা শুরু হয়েছিল নারী থেকে। ইবনু আব্বাস বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে মুশরিকরা পরাজিত হলে কিছু তিরন্দাজ বলল, বন্ধুগণ, আল্লাহর নবির সঙ্গে যুক্ত হও, গানীমাতের কাছে চলো। তোমরা বিলম্ব করলে রিক্তহস্ত থাকতে হবে। অনেকে বলল, আল্লাহর রাসূল আমাদের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত আমরা এখান থেকে একচুলও সরব না। এ পরিপ্রেক্ষিতেই নাযিল হয়-তোমাদের অনেকে দুনিয়া প্রত্যাশা করেছে এবং অনেকের প্রত্যাশা আখিরাত।³ তাবারি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমাদের অনেকে দুনিয়া প্রত্যাশা করেছে-অর্থাৎ গানীমাত। ইবনু মাসঊদ বলেন, উহুদের ক্ষেত্রে উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার আগে আমি কোনো সাহাবির ব্যাপারে জানতাম না, যিনি দুনিয়া প্রত্যাশা করেন।

দীনের দা'ঈদের জন্য উহুদের এই ঘটনায় রয়েছে বিরাট শিক্ষা। দুনিয়ার ভালোবাসা এমন, যা ক্রমশ ঈমানদার ব্যক্তির অন্তরে ছেয়ে যায়, ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। একসময় মু'মিন ব্যক্তি দুনিয়া ও পার্থিব ঐশ্বর্যকে প্রাধান্য দেয় আখিরাতের ওপর, আখিরাতের বিজয় ও অফুরান নিয়ামাতের ওপর-ফলে সে শারঈ নির্দেশনা অমান্য করে, ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়। সাহাবিগণ ঠিক একই কাজ করেছিলেন; তারা ভুলে গিয়েছিলেন নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এমনিভাবে দীনের দা'ঈরা যদি নিজেদের পরিচয় ভুলে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, ভুলে যায় আখিরাতের কথা, তাহলে একসময় তারাও শারী'আতের নির্দেশনার কথা ভুলে যাবে, নেমে আসবে বিপদ।

দীনের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক
ইবনু কাসীর বলেন, মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হওয়া এবং রাসূলুল্লাহ আঘাত পাওয়ার পর শয়তান উঁচু আওয়াজে হাঁক ছেড়ে বলে, মুহাম্মাদ নিহত হয়েছে। ইবনু কুমাইয়া মুশরিকদের কাছে ফিরে গিয়ে বলে, আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করেছি। সে মূলত নবিজির মাথায় আঘাত করেছিল। এটাই বহু সংখ্যক মানুষের মনে গেঁথে যায়। তারা বিশ্বাস করে নবিজি সত্যিই মারা গেছেন। এরপর সবার মাঝে জেঁকে বসে দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতা। লড়াইয়ের ময়দান থেকে অনেকেই পিছু হটে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, মুহাম্মাদ শুধুই একজন রাসূল, তার আগে অনেক রাসূল গত হয়েছেন; তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা পিছু হটবে? নিশ্চয় যে পিছু হটবে, সে আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞচিত্ত বান্দাদের প্রতিদান দেবেন। [সূরা আলে ইমরান ০৩: ১৪৪]⁴

এই আয়াতের তাফসীরে এসেছে-রাসূলগণ কেউই অমর নন। প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। রাসূলের দায়িত্ব হলো, তার কাছে যে বার্তা আসে, তা পৌঁছানো, আর তিনি অর্পিত দায়িত্ব পালনও করেছেন। রিসালাতের জন্য আবশ্যক নয় যে, কওমের সঙ্গে চিরকাল থাকতে হবে। ফলে এই পৃথিবীতে কেউ অমরত্ব পাবে না। অতঃপর আল্লাহ রাসূলের মৃত্যুতে দুর্বলতার শিকার হওয়াকে নাকচ করে বলেন, তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে?- অর্থাৎ তোমরা ফিরে যাবে, ছেড়ে দেবে জিহাদ? তবে পৃষ্ঠপ্রদর্শন নিজেদের অমঙ্গলই ডেকে আনবে। আল্লাহ বলেন, আর যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, সে আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না এবং অচিরেই আল্লাহ কৃতজ্ঞচিত্ত বান্দাদের প্রতিদান দেবেন। অর্থাৎ যারা পিছু হটেনি এবং আল্লাহর রাসূলকে অনুসরণ করে অবিচল ছিলেন, তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় এবং তাঁর মৃত্যুর পরও, তাদের উত্তম প্রতিদান দেবেন আল্লাহ।

উহুদ প্রান্তরে বিপদ নেমে আসার কারণ হলো, মুসলিমরা তাদের ঈমান, আকীদা, আল্লাহর কালেমা সমুন্নত করতে দাওয়াতকে কেবলই রাসূলের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত করে ফেলেছিলেন। একমাত্র প্রতিপালক ও উপাস্য হিসেবে আল্লাহর প্রতি ঈমান; কিন্তু তার সঙ্গে নবিজি ﷺ-এর অমরত্বের বিশ্বাস দীনের পথে অবিচলতায় দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে। রিসালাতের স্থায়িত্ব ও মানব-রাসূলের মাঝে দীনের সম্পর্ক স্থাপন সাহাবিদের মাঝে হীনম্মন্যতা, দুর্বলতা ও উদ্ভ্রান্তি আনয়নের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। বিপদে ধৈর্যধারণ, রিসালাতের সম্প্রসারণ, দাওয়াহ ও তাবলীগ এবং সত্যকে সাহায্যের জন্য আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য একটি ভিত্তি; আল্লাহর কালেমা সমুন্নতকরণে দাওয়াহর ধারাবাহিকতা, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মাধ্যমে দীন বিদ্যমান থাকার সঙ্গে আল্লাহর রাসূলের অমর থাকার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই-এ সত্য থেকে কতিপয় সাহাবির সাময়িক বিচ্যুতি এই বিপদের নেপথ্য কারণ।

ইবনুল কাইয়িম ؒ বলেন, আল্লাহর রাসূলের ওফাতের আগে মৃত্যুর ভুল বার্তা উহুদযুদ্ধ পরবর্তী করণীয় কাজের ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছে। নবিজির ভুল মৃত্যু সংবাদ শুনে যারা পিছু হটেছে, তাদের তিরস্কার করা হয়েছে; জানানো হয়েছে-এটা তাদের জন্য উচিত হয়নি; বরং আবশ্যক ছিল, দীন ও তাওহীদের ওপর অটল থাকা এবং মৃত্যুবরণ করা কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। কেননা, তারা ইবাদাত করতেন মুহাম্মাদের রবের, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। সুতরাং নবি মৃত্যুবরণ করলে কিংবা নিহত হলে তাদের জন্য উচিত নয়-দীন থেকে ফিরে যাওয়া। কেননা প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। এমনকি—যারা ধারণা করে, ইসলাম সমাপ্ত হবে নবি ﷺ-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, যারা মনে করত ইসলামের দাওয়াহ ও বিজয় সীমাবদ্ধ এক ব্যক্তির মাঝে, তাদের অসার ভাবনারও অপনোদন এ আয়াতের মাধ্যমে হয়ে গেছে।

উহুদযুদ্ধের পর তিরস্কার করে আল্লাহ যে আয়াত নাযিল করেছেন, তা বাস্তবায়িত হয়েছে নবিজির মৃত্যুর সময়। বর্ণিত আছে-তাঁর প্রয়াণের পর সুন্হ নামক স্থান থেকে আবু বকর চলে আসেন। মাদীনায় এসে প্রথমে প্রবেশ করেন মাসজিদে নববিতে। সেখানে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয় না। নীরবে ঢুকেন 'আয়িশা -এর ঘরে। তিনি ইশারা করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন চাদরে আচ্ছাদিত। কাছে এসে চেহারা থেকে কাপড় সরালেন। চুমু খেয়ে কাঁদলেন। বললেন, আপনার জন্য আমার বাবা-মা কুরবান হোক। আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনার জন্য দুবার মৃত্যুর কথা লিপিবদ্ধ করে রাখেননি। যে মৃত্যু আসবার ছিল, তা এসে গেছে। ইবনু আব্বাস বলেন, আবু বাক্স বের হয়ে দেখেন, 'উমার কথা বলছেন। তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'উমার, বসো, 'উমার বসতে চাচ্ছিলেন না; কিন্তু লোকজন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে আবু বারের দিকে মনোনিবেশ করে। সিদ্দীক বলেন, যারা মুহাম্মাদের উপাসনা করত, তারা জেনে রাখো, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহর ইবাদাত করত, জেনে রাখো আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন, মুহাম্মাদ শুধুই একজন রাসূল, তাঁর আগেই অনেক রাসূল গত হয়েছেন; তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা পিছু হটবে? নিশ্চয় যে পিছু হটবে, সে আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞচিত্ত বান্দাদের প্রতিদান দেবেন। ইবনু আব্বাস বলেন, আবু বাক্রের এই আয়াত তিলাওয়াতের আগে লোকজন যেন জানতই না, এই আয়াত নাযিল হয়েছে! তার থেকে মানুষ শিখে নেয়। পরে প্রত্যেক মানুষের মুখে এই আয়াতের তিলাওয়াত শুনেছি আমি। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, 'উমার বলেছেন, আবু বারের মুখে এই তিলাওয়াত শুনে আমি যেন হুঁশ ফিরে পেলাম। আমার পা থরথর করে কাঁপছিল। পড়ে যাচ্ছিলাম মাটিতে। আমার কাছে তখন মনে হলো, নবিজি সত্যিই মারা গেছেন।

টিকাঃ
৫৩২. তাফসীর ইব্‌ন কাসীর, ১/৪১০
৫৩৩. আল-মুসতাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/১৯৭
৫৩৪. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৪৪৫৪

📘 রউফুর রহীম 📄 তিরন্দাজ বাহিনী ও মুনাফিকদের সঙ্গে নবিজির আচরণ

📄 তিরন্দাজ বাহিনী ও মুনাফিকদের সঙ্গে নবিজির আচরণ


তিরন্দাজ বাহিনী
যে তিরন্দাজরা ইজতিহাদে ভুল করেছিলেন, আল্লাহর রাসূল তাদের কাতারের বাইরে পাঠিয়ে দেননি কিংবা তাদের এ কথাও বলেননি যে, তোমরা কোনো ধরনের নামাজ পড়তে পারবে না; বরং তাদের দুর্বলতা গ্রহণ করেছেন, হৃদয় উজাড় করে তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর দিকে খেয়াল করে আল্লাহ তা'আলাও এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। যারা দুনিয়া প্রত্যাশা করেছে, দুর্বলতা প্রকাশ করে রণক্ষেত্র ত্যাগ করেছে, সবার অপূর্ণতা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তাঁর নির্দেশে তোমরা তাদের হত্যা করছিলে; অবশেষে তোমরা যখন দুর্বলতা দেখালে, কাজের ক্ষেত্রে মতভেদ করলে এবং তোমরা যা পছন্দ কর, তা তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হলে, তোমাদের মাঝে কেউ দুনিয়া কামনা করছিল, আবার কতক আখিরাত, অতঃপর তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য তাদের থেকে সরিয়ে নিলেন; নিশ্চয় তিনি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, আর আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫২]

বাস্তবতা হলো—তারা নবিজির পক্ষ থেকে ক্ষমা পেলে মন প্রফুল্ল থাকবে। এর মাধ্যমে তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামাতও পূর্ণতা লাভ করবে। এজন্যই আল্লাহ তাঁর নবিকে বলেছেন তাদের ক্ষমা করে দিতে এবং তাদের ইসতিগফারে উৎসাহিত করতে। এমনিভাবে তাদের সঙ্গে মাশওয়ারা করার কথাও বলেছেন; ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রাহমাতে আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন; আপনি যদি কঠোর ও রুক্ষ মেজাজের হতেন, তাহলে তারা আপনার পাশে ঘেঁষত না; অতএব, তাদের ক্ষমা করে দিন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কোনো বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। যখন সংকল্পবদ্ধ হবেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৯]

মুনাফিক ইবনু সালুলের পশ্চাদপসরণ
তিনশো মুনাফিককে নিয়ে রণে ভঙ্গ দেওয়ার দ্বারা ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালুলের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি বাহিনীতে দ্বিধা সৃষ্টি করে তাদের দুর্বল করা, শত্রুকে সাহায্য ও নিজের হিম্মত বৃদ্ধি করা। ‘আবদুল্লাহ ইবনু হারাম তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পলায়ন করতে নিষেধ করেছেন; কিন্তু তারা তার ডাক প্রত্যাখ্যান করে।¹ এই পরিস্থিতিতেই আল্লাহ বলেন, দুটি দল মুখোমুখি হবার দিন তোমাদের যা স্পর্শ করেছে, তা আল্লাহর অনুমতিতেই, যেন তিনি মু'মিনদের চিনে নিতে পারেন এবং চিনতে পারেন মুনাফিকদের। তাদের বলা হলো—তোমরা ফিরে এসো, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো কিংবা প্রতিরোধ করো, তারা বলল—আমরা যদি লড়াইয়ের কথা জানতাম, তাহলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ঈমান অপেক্ষা সেদিন তারা কুফুরির অধিক নিকটবর্তী ছিল। তারা মুখে এমন কথা বলে, যা তাদের অন্তরে নেই; তাদের সুপ্ত বিষয় সম্পর্কে আল্লাহই অধিক অবগত। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৬-১৬৭]

মুনাফিকদের পলায়নের ফলে মুসলিমদের সংখ্যা কমে গিয়ে মুশরিকদের সঙ্গে তাদের সৈন্য-ব্যবধানটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। মুসলিমদের দুটি গোত্র প্রভাবিত হয়েছিল বেশ। মুনাফিক নেতাকে কড়া শাস্তির সম্মুখীন করা হলে তা সংগত হতো; কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এই মুনাফিকদের তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। জনসম্মুখে তাদের পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়াকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। এ কারণে হামরাউল আসাদ থেকে ফিরে এসে তাকে তাচ্ছিল্য ও লাঞ্ছিত করা সহজ হয়েছে।

ইমাম যুহরি বলেন, নিজ গোত্রের কাছে বেশ সম্মান ছিল 'আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের। লোকদের মাঝে সে শরীফ হিসেবে পরিচিত ছিল। এক জুমু'আর দিন নবিজি ﷺ বসে আছেন। ইবনু উবাই বয়ান করতে গিয়ে বলছিল, হে লোকসকল, তোমাদের মাঝে ইনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তোমাদের সম্মানিত করেছেন। সুতরাং তাঁকে সাহায্য করো, তাঁর কথা শোনো ও মানো। এ কথা বলে সে বসে পড়ে। উহুদের দিন তার আসল চেহারা সে প্রকাশ করে। লোকজন ফিরে আসার পর সে আবার দাঁড়িয়ে যায় আগের মতোই কিছু বলার জন্য। উপস্থিত মুসলিমরা তার কাপড়ের প্রান্ত ধরে আটকিয়ে বলে, আরে আল্লাহর দুশমন, বসে থাক। তুই যে কাজ করেছিস, তাতে তোর কোনো যোগ্যতা নেই। অপমানে মাথা নিচু করে সে লোকদের ডিঙিয়ে যেতে যেতে বলছিল, আল্লাহর কসম, যদিও আমি তাঁর কাজ শক্তিশালী করার জন্য উঠেছিলাম; কিন্তু ওরা মনে করেছে, আমি অনিষ্ট সাধনের জন্য উঠেছি। মাসজিদের দরজায় কিছু আনসারি সাহাবির সঙ্গে দেখা হলে তারা বলেন, কী ব্যাপার, কী হয়েছে তোমার? ইবনু উবাই ঘটে যাওয়া সবকিছু খুলে বলে। তারা বললেন, আরে, এতে কী হয়েছে! ফিরে যাও, আল্লাহর রাসূল তোমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। সে বলল, আল্লাহর কসম, তিনি আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন, এতে আমার কোনো আগ্রহ নেই।²

উহুদ আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি
আনাস ইবনু মালিক বলেন, একবার উহুদ পাহাড় নবিজির চোখে পড়লে তিনি বলেন, এই পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি। আল্লাহর রাসূলের এই কথার অনেক অর্থ হতে পারে। যেমন: সালিহ শামি বলেছেন, আগেরকার মানুষ আপতিত বিপদের সঙ্গে স্থান ও কালকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করত। মনে করত, এই স্থান কিংবা এই সময়ের কারণে এই বিপদ ঘটেছে। বর্তমানের মূর্তিপূজকরা এখনো এমন বিশ্বাস পোষণ করে। এরপর ইসলামের আবির্ভাব ঘটল। ইসলাম তার জন্মের শুরু থেকেই প্রচলিত ভ্রান্ত বিশ্বাস, অপসংস্কৃতি, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সব সময় দূরে থেকেছে কুলক্ষণের ধারণা থেকে। উহুদযুদ্ধের পর ব্যথাতুর একটি স্মৃতি মুসলিমদের অন্তরে গেঁথে ছিল। এতে সন্দেহ নেই যে, মুসলিমরা উহুদের পাশে দাঁড়ালে যুদ্ধের কথা মনে পড়ত। এরপর তাদের অন্তরে যেন এই মন্দ ধারণা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য নবিজি স্পষ্ট করেছেন স্থান ও কাল আল্লাহর দুটি সৃষ্টি; এই বিপদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই; সবকিছুই আল্লাহর হাতে। আর উহুদকে কেন ভালোবাসবেন না, অথচ হামযা ও সাহাবিদের আশ্রয় দেবার জন্য আল্লাহ এই পাহাড়কে নির্বাচন করেছেন!

উহুদযুদ্ধে ফিরিশতাদের দল
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস বলেন, উহুদের দিন আমি রাসূলুল্লাহ-এর ডানে-বামে শুভ্র পোশাক পরিহিত দুজন লোককে দেখেছি। তারা নবিজিকে বাঁচাতে বীর বিক্রমে লড়াই করছিলেন। উহুদের আগে-পরে তাদের কোনো দিন দেখিনি। আর তারা ছিলেন জিবরীল ও মীকাইল। নবিজিকে রক্ষা করতে এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। কেননা তিনি মানুষের অনিষ্ট থেকে তাকে রক্ষার ওয়াদা করেছেন। এছাড়া উহুদের অন্য কোথাও ফিরিশতারা যুদ্ধ করেছিল-বিশুদ্ধ সূত্রে এমনটা প্রমাণিত নয়। তিনটি শর্তসাপেক্ষে আল্লাহ মু'মিনদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন-সবর, তাকওয়া ও দ্রুত শত্রুর আগমন। এ বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি বিধায় আল্লাহর সাহায্য আসেনি (আল্লাহ সরাসরি ফিরিশতা নিযুক্ত করেননি)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, স্মরণ করুন, যখন আপনি মু'মিনদের বলছিলেন, তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয়, তিনি তোমাদের অবতীর্ণ তিন হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য করবেন? হ্যাঁ, তোমরা যদি সবর করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা তোমাদের কাছে দ্রুত আসে, তবে তোমাদের রব তোমাদের সারিবদ্ধ পাঁচ হাজার ফিরিশতা দ্বারা সাহায্য করবেন। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১২৪-১২৫]

শহিদদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের স্থায়ী নিয়ামাত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমাদের ভাইয়েরা উহুদে শহিদ হবার পর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রাণগুলোকে সবুজ পাখির পেটে রেখে দিয়েছেন। ওরা জান্নাতের নহরসমূহের তীরে ঘুরে বেড়ায়, জান্নাতের ফল খায় এবং আরশের ছায়ায় স্বর্ণের বাসায় তারা আশ্রয় নেয়। অমীয় সুধা, সুস্বাদু খাবার ও উত্তম স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন অনুভব করে। জান্নাতি নিয়ামাতের আবেশে মুগ্ধতার পরশে তারা বলে, হায়, আমাদের ভাইয়েরা যদি জানত, আল্লাহ আমাদের জন্য কী প্রস্তুত করে রেখেছেন—তারা আমরণ জিহাদ করত, যুদ্ধ থেকে পলায়ন করত না। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমি তাদের কাছে তোমাদের কথা পৌঁছে দেবো। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেন, আল্লাহর রাস্তায় যারা শহিদ হয়েছে, তাদের মৃত ভেব না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত—রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছে। আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহে তারা উৎফুল্ল, তাদের পেছনে, এখনো যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি, তাদের জন্য আনন্দিত হয় এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামাত ও অনুগ্রহ লাভে আনন্দিত হয় এবং আল্লাহ মু'মিনদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৯-১ৃতি]

আয়াতের তাফসীর আলোচনায় ওয়াহিদি সাঈদ বিন জুবাইর থেকে বর্ণনা করেন, হামযা ও মুস'আব বিন উমাইরের শাহাদাত বরণের পর তাদের জান্নাতের স্বপ্নিল ভুবনে নেওয়া হয়। উত্তম রিযিকের অভাবনীয় স্বাদ প্রাপ্তির পর তারা বলেন, হায়, আমাদের ভাইয়েরা এই সুখ ও সমৃদ্ধির কথা জানলে জিহাদে প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের কথা শুনে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন। মুসলিম মাসরুক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, আমরাও এটা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম; নবিজি বলেছেন, তাদের রূহগুলো সবুজ পাখির পেটে রাখা হয়েছে; আরশের সঙ্গে সংযুক্ত বাসায় তারা থাকে, জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়ায়, আবার তারা তাদের ঘরে আশ্রয় নেয়। আল্লাহ তাদের দর্শন দিয়ে বলেন, তোমরা আরও কিছু প্রত্যাশা করো? তারা বলে, আমরা আর কী চাইব? তারা তো জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা যেতে পারি! এই প্রশ্ন তিনি তাদের তিনবার করেন। যখন তারা দেখল, তাদের কিছু চাওয়া ব্যতীত ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না, তখন তারা বলে, আমাদের রব, আমাদের রূহগুলো আবার আমাদের দেহে প্রবেশ করান, যেন আমরা আপনার রাস্তায় আবার জিহাদ করতে পারি। আল্লাহ তাদের উপযুক্ত কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই দেখে অবশেষে তাদের ছেড়ে দেন।

টিকাঃ
৫৩৫. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/৫৩
৫৩৬. মুসলিম, ফাজায়েল অধ্যায়, ৪/১৮০২

ফন্ট সাইজ
15px
17px