📘 রউফুর রহীম 📄 উহুদের আলোচিত শহিদেরা

📄 উহুদের আলোচিত শহিদেরা


হামযা ইবনু 'আবদিল মুত্তালিব
কিয়ামাত দিবসে তিনি আল্লাহর কাছে শহিদদের সর্দার হিসেবে গণ্য হবেন। আল্লাহর সিংহ হামযা সেদিন প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন। অনেক মুশরিককে হত্যা করেন। বনু 'আবদুদ দারের মধ্য থেকে মুশরিকদের ঝান্ডাবাহীদের একটি অংশকে ধ্বংস করে দেন নিমিষেই। এভাবেই অভাবনীয় বীরত্ব ও সাহসিকতার ঝলক দেখিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন তিনি। এরই মাঝে ওয়াহশি তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। একটি মোক্ষম সুযোগ তার সামনে আসে। তাকে নিশানা করে বর্শা নিক্ষেপ করে ওয়াহশি। হামযা বর্শাবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

হামযার শাহাদাতের এই মর্মস্পর্শী কাহিনি ওয়াহশির জবানীতেই স্মরণীয় হয়ে আছে। ওয়াহশি বলেন, বদরযুদ্ধে হামযা তাঈমা বিন আদি বিন খিয়ারকে হত্যা করেছিলেন। আমার মুনিব জুবাইর বিন মুতঈম আমাকে বলল, আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধে হামযাকে হত্যা করতে পারলে তুমি আযাদ। এই প্রস্তাবের পর আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। আইনাইনের বছর কুরাইশি লোকদের সঙ্গে আমি যুদ্ধে বের হই (আইনাইন উহুদের একটি পাহাড়ের নাম)। সবাই যখন যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হলো, তখন সিবা' সারি থেকে সামনে এসে বলল, আমার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করার মতো সাহস কারও আছে? হামযা তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, আরে সিবা', তুই তো নারীদের খতনাকারী মায়ের সন্তান; তুই কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করছিস! এরপর চোখের পলকে তার ওপর আক্রমণ করে বসেন। এদিকে আমি হামযাকে ধরাশায়ী করার সুযোগের সন্ধানে একটি পাথরের আড়াল হই। তিনি আমার নিকটবর্তী হলে তার উদ্দেশে বর্শা নিক্ষেপ করি। আমার নিক্ষিপ্ত বর্শা তার কাঁধে আঘাত হেনে অপর পাশে বেরিয়ে আসে। এভাবেই আমি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করি।

যুদ্ধ শেষে লোকদের সঙ্গে মাক্কায় ফিরে আসি। আমি মাক্কাতেই অবস্থান করছিলাম। ইতোমধ্যে এখানেও ইসলাম প্রসার লাভ করে। তারপর কোনো কারণে আমি তায়েফে চলে আসি। এখানকার লোকেরা আল্লাহর রাসূলের কাছে একজন দূত পাঠায়। আমাকে বলা হয়—দূতের সঙ্গে তিনি মন্দ আচরণ করেন না। কিছু দিনের মধ্যে একটি প্রতিনিধিদল মাদীনার উদ্দেশে রওনা করে। আমি তাদের সঙ্গে বের হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে চলে আসি। আমাকে দেখে তিনি বললেন, তুমি কি ওয়াহশি? বললাম, জি। তিনি বললেন, তুমিই কি হামযাকে হত্যা করেছ? বললাম, একটা কারণ ছিল এর পেছনে, হয়তো আপনি তা জানেন। তিনি বললেন, তুমি কি পারবে আমার থেকে তোমার চেহারা আড়াল করতে? আমি সেখান থেকে বের হয়ে আসি। ভারাক্রান্ত হৃদয় বহন করে ঘুরেছি অনেক দিন। আল্লাহর রাসূল চলে যান। ইতোমধ্যে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের আবির্ভাব ঘটে। আমি মনে মনে ভাবলাম-অবশ্যই আমি মুসাইলামাকে হত্যা করে হামযাহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করব।

লোকদের সঙ্গে মুরতাদ খতমের এই যুদ্ধে বের হলাম। মিথ্যাবাদী এই শয়তানটাকে আমি চিনতাম না। যুদ্ধের একপর্যায়ে দেখলাম, দেওয়ালের ফাঁকে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। পত্রপল্লবিত উটের মতো তাকে দেখতে। মাথার চুলগুলো বিক্ষিপ্ত। একে লক্ষ করেই সেই বর্শাটা নিক্ষেপ করলাম। কাজ হলো। বুকে বিঁধে দুই কাঁধের মধ্য দিয়ে বের হলো। এরপর আনসারি এক সাহাবি তরবারি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়।

'আবদুল্লাহ ইবনু ফযল বলেন, সুলাইমান ইবনু ইয়াসার আমাকে বলেছেন, তিনি 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমারকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, মুসাইলামাকে বর্শাবিদ্ধ হতে দেখে এক নারী বলে ওঠে, আমীরুল মু'মিনীনের কী সর্বনাশ হয়ে গেল, একটা কালো গোলাম তাকে হত্যা করে ফেলল। [৫১৭]

হামযার শাহাদাত ও আল্লাহর রাসূলের প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, কেউ কি হামযার লাশ দেখেছ? এক ব্যক্তি বলল, তার লাশ আমি দেখেছি। রাসূল বললেন, আমাদের নিয়ে চলো, আমরা তাকে দেখব। এরপর নবিজি হামযার লাশের কাছে এসে দাঁড়ালেন। দেখলেন-তার পেট ফাড়া হয়েছে, করা হয়েছে অঙ্গহানি। লোকটা বলল, আল্লাহ ক্ষমা করুন, কীভাবে তার অঙ্গবিকৃতি করা হয়েছে!

অন্য বর্ণনায় আছে-রাসূল হামযার লাশ দেখে ব্যথার আতিশয্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। তিনি শহিদদের লাশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি এদের জন্য সাক্ষী হলাম। রক্তমাখা জামাসহ তাদের কাফন পরাও। কেননা, আল্লাহর রাস্তায় যে-কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে কিয়ামাতের দিন তাকে রক্তমাখা অবস্থায় ওঠানো হবে। তার রং হবে রক্তিম। ঘ্রাণ হবে মিশকের। কুরআন সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিকে আগে কবরে রাখবে। সবাইকে লাহাদ কবরে সমাধিত করো।

উহুদের দিন হামযা ও অন্যান্য সাহাবিদের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। তিনি উহুদের উদ্দেশ্যে বের হবার আগেই সাহাবিগণকে তাঁর স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। নবিজি বলেন, আমি আমার তরবারি জুলফিকার দেখলাম ভগ্ন অবস্থায়। আমি এর ব্যাখ্যা করেছি—তোমাদের পরাজয়। আরও দেখলাম, আমি একটা ভেড়ার পিঠে আরোহণ করে আছি; এর ব্যাখ্যা হলো—একটা ভেড়ার পাল। এরপর দেখলাম, আমি একটি সুরক্ষিত দুর্গে; তা হলো—মাদীনা। সবশেষে দেখলাম, একটি গাভি জবাই হচ্ছে; আল্লাহর কসম, এতে কল্যাণ আছে! আল্লাহর কসম, এতে কল্যাণ আছে! [৫১৮]

সহোদরের মৃত্যুতে সাফিয়্যাহ বিনতে 'আবদুল মুত্তালিবের ধৈর্যধারণ
যুবাইর ইবনুল আওয়াম বলেন, যুদ্ধ শেষে এক মহিলা দৌড়ে এদিকে আসছিলেন। শহিদদের লাশ দেখতে চাচ্ছিলেন তিনি। রাসূল চাচ্ছিলেন না, তিনি তাদের দেখুক। নবিজি বললেন, এই নারীকে থামাও। আমি লক্ষ করে দেখলাম—তিনি সাফিয়্যাহ। আমি দ্রুত তার দিকে ছুটলাম। তিনি লাশগুলোর কাছে পৌঁছানোর আগেই তার পথ আগলে দাঁড়ালাম। আমাকে সামনে দেখে আমার বুকে একটা ঘুষি মেরে বললেন, আমার পথ ছেড়ে দাও, আমি আমার ভাইকে দেখার জন্য এসেছি। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল আপনাকে এদিকে আসতে নিষেধ করেছেন। তিনি দমলেন। দাঁড়ালেন সেখানে। সঙ্গে আনা দুটি কাপড় বের করে বললেন, এই কাপড় দুটি নাও। আমার ভাই হামযার জন্য এনেছি। আমি তার শাহাদাতের খবর শুনেছি। যাও, কাপড় দুটি দিয়ে তাকে কাফন পরাও। এরপর আমরা কাফন পরানোর জন্য হামযার কাছে গেলাম। এসে দেখি, তার পাশে একজন আনসারি সাহাবি। হামযার মতো তাকেও খুব নিকৃষ্টভাবে অঙ্গহানি করা হয়েছে। তারও কাফনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি আমাদের বিবেকে নাড়া দিল যে, হামযাকে দুটি কাপড় দিয়ে কাফন দেওয়া হবে, অথচ আনসারি সাহাবির কাফনের কোনো ব্যবস্থা হবে না! আমরা বললাম, হামযাকে একটি কাপড় দেওয়া হোক, আরেকটি আনসারি সাহাবিকে। কাপড় দুটি পরিমাপ করে দেখি, একটির তুলনায় আরেকটি বড়। এখন কোন টুকরো কাকে দেবো, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম। অগত্যা লটারি করলাম। যার ভাগে যে কাপড় জুটেছে, সেটি দিয়েই তাদের কাফনের ব্যবস্থা করলাম।

হামযার জন্য শোক
রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদ থেকে ফিরে এসে শুনতে পেলেন, আনসারি নারীরা কাঁদছেন। নবিজি ﷺ বললেন, কিন্তু হামযার জন্য কেউ তো কাঁদছে না! এই কথা আনসারি নারীদের কাছে পৌঁছালে তারা হামযার স্মরণে কান্না শুরু করেন। রাসূল ﷺ ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠেও তিনি শুনতে পান, নারীরা কেঁদেই চলেছে। তিনি বলেন, আরে, আজ পর্যন্ত ওরা কেঁদেই চলেছে! না, আজকের পরে কোনো মৃতের জন্য কেউ কাঁদতে পারবে না। [৫১৯] এ দিন থেকেই মৃত ব্যক্তি জন্য শব্দ করে কাঁদা নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

হামযার নামে এক নবজাতকের নাম
জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের এক আনসারি সাহাবির একটি ছেলে জন্ম নেয়। তারা বলেন, আমরা তার নাম কী রাখব? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো হামযা ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব। এ নামেই তার নাম রাখতে পারো। পরক্ষণেই ওয়াহি নাযিল করে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়-আল্লাহর কাছে প্রিয় নাম হলো 'আবদুল্লাহ ও 'আবদুর রাহমান। এরপর তিনি উপস্থিত লোকদের এই কথা জানিয়ে দেন। [৫২০]

তোমার চেহারা আমার থেকে আড়াল করতে পারবে? [৫২১]
ওয়াহশিকে রাসূলে কারীম ﷺ শুধু এটুকুই বলেছিলেন, 'তোমার চেহারা আমার থেকে আড়াল করতে পারবে?' তাকে জেরা করেননি, কোনো কটু কথাও বলেননি। আড়াল হবার কথা বলেছেন, কারণ, তাকে দেখলেই শহিদ হওয়া চাচা হামযার অঙ্গবিকৃত দেহাবয়ব তাঁর চোখে ভেসে উঠত; মানসিক বিমর্ষতা পেয়ে বসত, বিষন্নতায় ছেয়ে যেত অন্তর-এটাই মানবিক স্বাভাবিক প্রকৃতি। এজন্যই তাকে চোখের আড়াল হতে বলেছেন, যেন ব্যথার স্মৃতির উৎসই না থাকে।

একটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে— ‘ওয়াহশি বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, কে—ওয়াহশি? বললাম, জি, আমি ওয়াহশি। তুমিই হামযাকে হত্যা করেছ?—জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, জি, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার হাত দিয়ে তাকে সম্মানিত করেছেন; কিন্তু তার হাত দিয়ে আমাকে লাঞ্ছিত করেননি। কুরাইশরা নবিজিকে বলেছিল, তুমি কি তাকে ভালোবাসতে পারবে, অথচ সে হামযাকে হত্যা করেছে? এরপর বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। আমার কথা শুনে রাসূল তিনবার মাটিতে হাত মারলেন, তারপর আমার বুকেও তিনবার মৃদু আঘাত করে বললেন, ওয়াহশি, বেরিয়ে পড়ো; আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো, যেমন লড়াই করেছ আল্লাহর রাস্তা থেকে ফিরিয়ে রাখতে।

রাসূলে কারীম পূর্বের কুফুরি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতার পাপ মুছে ফেলতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের নির্দেশ দিলেন, পাশাপাশি জিহাদের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। ওয়াহশি ইয়ামামার যুদ্ধে শরিক হওয়া ও মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে হত্যা করা ছিল আল্লাহর রাসূলের এই কথারই প্রভাব, যা ছিল তার পাপ মোচন, গুনাহ ঝেড়ে ফেলা ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির সর্বোত্তম পন্থা। ওয়াহশি নিজেও এটা অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাই মুসাইলামাকে হত্যার পর বলেছিলেন, আমি একজন উত্তম মানুষ অর্থাৎ হামযা ইবনু 'আবদুল মুত্তালিবকে হত্যা করেছিলাম, আর আজ সর্বনিকৃষ্ট মানুষকে হত্যা করে তার প্রায়শচিত্ত করলাম।

মুসআব বিন উমাইর
খাব্বাব বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে হিজরাত করেছি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আমাদের প্রতিদানের দায়িত্ব আল্লাহর। আমাদের মাঝে যারা নিজেদের পথে চলেছেন; কিন্তু তার প্রতিদানের কোনো কিছু ভক্ষণ করেননি, তাদের মধ্যে একজন হলেন মুস'আব বিন উমাইর। তিনি উহুদের দিন শহিদ হন। একটি চাদর ছাড়া আর কিছু রেখে যাননি। আমরা তার মাথা ঢাকলে পা উদোম হয়ে যেত, পা ঢাকলে মাথা হয়ে পড়ত উন্মুক্ত। রাসূল বললেন, তার মাথা ঢেকে পায়ের ওপর ইজখির ঘাস রাখো।

‘আবদুর রাহমান ইবনু আউফ বর্ণিত, একদিন তিনি রোজা ছিলেন। মাগরিবের আযানের সময় তার কাছে ইফতার পরিবেশন করা হয়। সুস্বাদু ইফতারির আয়োজন দেখে তিনি বলেন, মুস'আব বিন উমাইর শহিদ হলো, তিনি ছিলেন আমার চেয়ে উত্তম। আহ, তাকে কাফন দেওয়ার মতো একটা চাদর ছাড়া কিছুই ছিল না। হামযা শহিদ হলেন। তিনিও ছিলেন আমার চেয়ে উত্তম। তাকেও কাফন দেওয়ার মতো ছিল একটিমাত্র চাদর। আমার আশঙ্কা হয়, আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দুনিয়ার জীবনেই দেওয়া হলো কিনা! আখেরাতের দৃশ্যপট তার চোখের তারায় ভাসতে থাকে। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদ থেকে ফেরার সময় মুস'আব ইবনু উমাইরের লাশের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার জন্য দু'আ করে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
মু'মিনদের মাঝে কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে; তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার অনেকে প্রতীক্ষায় আছে; তারা প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন করেনি। [সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩]

রাসূল ﷺ আবার বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, কিয়ামাত দিবসে এরা আল্লাহর কাছে শহিদ হিসেবে গণ্য হবে। তোমরা এখানে এসে তাদের কবর যিয়ারত করবেন। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, কিয়ামাত পর্যন্ত যারা তাদের সালাম দেবে, তারা এর জবাব দেবে। [৫২২]

সা'দ বিন রাবি'
উহুদযুদ্ধ শেষে নবিজি বলেন, সা'দ বিন রাবি'র সংবাদ কে আনতে পারবে? সে জীবিত নাকি মৃত? উবাই ইবনু কা'আব বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তার খবর আমি জেনে আসছি। নবিজি তাকে বলেন, 'সা'দ বিন রাবি'কে খুঁজে পেলে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম বলবে। তারপর বলবে, রাসূল জিজ্ঞেস করছেন—তুমি কেমন আছ? উবাই ইবনু কা'আব খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়ে গেলেন। তিনি আহত অবস্থায় পড়েছিলেন। উবাই তাকে বলেন, সা'দ, নবিজি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমার খবর জানতে। তুমি জীবিত আছ নাকি শহিদ হয়ে গেছ? তিনি বললেন, ১২টি আঘাত আমাকে জীবনসায়াহ্নে উপনীত করেছে। ফুরিয়ে যাচ্ছে আমার সময়। আল্লাহর রাসূলকে সালাম, তোমাকেও সালাম। নবিজিকে বলবে—আমি জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি। আমার আনসারি লোকদের বলবে—যদি তোমাদের একজনও জীবিত থাকে আর আল্লাহর রাসূল কষ্ট পান, তাহলে তোমরা রেহাই পাবে না। এর একটু পরই তার স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়।

'আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ
সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস বলেন, উহুদের দিন 'আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ তাকে বললেন, চলো দু'আ করি। তারা দুজনে এক প্রান্তে এলেন। সা'দ প্রথমে দু'আ করে বললেন, হে আমার রব, রণাঙ্গনে প্রবল শক্তিশালী যোদ্ধার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়ো। আমি তার সঙ্গে লড়াই করব, সেও আমার সঙ্গে লড়াই করবে। সবশেষে তার ওপর আমাকে বিজয় দান করবে, যেন তাকে হত্যা করতে পারি এবং নিতে পারি তার অস্ত্র। 'আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ বললেন, আমীন। এরপর তিনি দু'আ করে বলেন, হে আল্লাহ, আমাকেও প্রবল শক্তিধর ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দিয়ো। তোমার জন্য তার সঙ্গে যুদ্ধ করব, সেও আমার সঙ্গে লড়াই করবে; সে আমাকে ধরাশায়ী করবে, কাটবে আমার নাক কান। কাল যখন তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে, তখন বলবে, তোমার নাক কান কাটা হয়েছে কেন? আমি বলব, তোমার ও তোমার রাসূলের জন্য। তুমি বলবে, সত্য বলেছ।

সা'দ বলেন, বেটা শুনছ, আমার দু'আ অপেক্ষা তার দু'আই উত্তম ছিল। আমি দিন শেষে দেখেছি, নাক কান কেটে তার অঙ্গহানি করা হয়েছে। [৫২৩]

হানযালা ইবনু আবি আমীর
যুদ্ধের সময় হানযালা আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পায়ে আঘাত করেন। সে মাটিতে পড়ে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে। হানযালা তার গর্দান আলাদা করতে চাচ্ছিলেন। এমন সময় আসওয়াদ বিন শাদ্দাদ হানযালাকে ধরাশায়ী করে বর্শা দিয়ে আঘাত হানে। হানযালা বর্শা নিয়েই তার দিকে এগিয়ে যান। আসওয়াদ দ্বিতীয় আঘাতে তাকে শহিদ করে দেয়।

আল্লাহর রাসূলের কাছে তার শাহাদাতের আলোচনা উঠলে বলেন, আমি দেখেছি আসমান ও যমিনের মাঝখানে তাকে একটা রুপার পাত্রে রেখে শিলাগলিত পানি দিয়ে ফিরিশতারা গোসল করাচ্ছে। তোমরা তার আহালকে জিজ্ঞেস করো—উহুদে আসার আগে তার কী হয়েছিল? সাহাবিরা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, মুসলিমদের বিপর্যয়ের কথা শুনে অপবিত্র অবস্থাতেই উনি জিহাদের উদ্দেশ্যে ছুটে যান। রাসূল বললেন, হ্যাঁ, এ কারণেই ফিরিশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।

ওয়াকিদির বর্ণনায় আছে—হানযালা জামীলা বিনতে 'আবদুল্লাহ বিন উবাইকে বিয়ে করেছিলেন। উহুদের আগের রাতে তাদের বাসর হয়। স্ত্রীর কাছে রাত্রি যাপনের অনুমতি চাইলে নবিজি তাকে অনুমতি দেন। সকালে ফজরের সালাতের পর হানযালা আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু জামীলার আকর্ষণে সেবারের মতো ফিরে এসে তারা আবার মিলিত হন। ঠিক এমন সময় তার কাছে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয়ের খবর আসে। গোসল করা পর্যন্ত বিলম্ব করা তার জন্য অসম্ভব মনে হয়। তাই অপবিত্র অবস্থাতেই যুদ্ধে বের হয়ে যান।

এর আগে জামীলা তার গোত্রের চারজন ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে বলেছিলেন, হানযালা তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি আসমান উন্মুক্ত হয়েছে। হানযালা দরজা অতিক্রম করার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। আমি বুঝেছি, তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। হানযালার এই মিলনে জামীলার গর্ভে সন্তান আসে; তার নাম ছিল মুহাম্মাদ বিন হানযালা। এই মুহাম্মাদ অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতেন, ফিরিশতাদের হাতে গোসলকৃত পিতার সন্তান আমি। জামীলাকে পরে বিয়ে করেন সাবিত বিন কাইস। এই সংসারে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাম রাখা হয় মুহাম্মাদ বিন সাবিত বিন কাইস।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর বিন হারাম
'আবদুল্লাহ ইবনু আমর বিন হারাম যুদ্ধের জন্য বের হওয়ার সময় ছেলে জাবিরকে বলেন, বেটা জাবির, আমাদের অবস্থা কত দূর যায়, তা জানা পর্যন্ত বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার কোনো ইচ্ছাধিকার নেই। আল্লাহর কসম, আমার পরে আমার মেয়েদের যদি রেখে না যেতাম, তাহলে আমার সামনে তোমার যুদ্ধ করাকে আমি পছন্দ করতাম। আমি দেখছি আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের মাঝে আমিই প্রথম শহিদ হব। আমার পরে রাসূলুল্লাহ ব্যতীত তোমার চেয়ে উত্তম কোনো প্রাণ আমি রেখে যাচ্ছি না। আমার কিছু ঋণ আছে, সেগুলো পরিশোধ করবে, তোমার বোনদের প্রতি খেয়াল রাখবে।

এরপর তিনি মুসলিমদের সঙ্গে বের হন। যুদ্ধ করতে করতে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেন। জাবির তার বাবার ব্যাপারে বলেন, আমার বাবা শহিদ হওয়ার পর তার চেহারা থেকে কাপড় সরাচ্ছিলাম আর কাঁদছিলাম। সাহাবিরা আমাকে কাঁদতে নিষেধ করছিলেন; কিন্তু নবিজি বারণ করছিলেন না। আমার খালাও তার জন্য কাঁদছিলেন। রাসূল বললেন, সে কাঁদুক বা না কাঁদুক, তোমরা তাকে উঠানোর আগ পর্যন্ত ফিরিশতারা ডানা দিয়ে তাকে ছায়া দেবে।

জাবির-এর দিকে তাকিয়ে নবিজি বললেন, কী ব্যাপার জাবির, তোমাকে ভারাক্রান্ত মনে হচ্ছে! জাবির বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার বাবা শহিদ হয়েছেন, আবার রেখে গেছেন ঋণের বোঝা ও সন্তানাদি। নবিজি বললেন, আমি কি তোমাকে সুসংবাদ শোনাব না, কীভাবে তোমার বাবা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন! জাবির বললেন, জি, অবশ্যই শুনব ইয়া রাসূলাল্লাহ। নবিজি বললেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলেন পর্দার আড়াল থেকে; কিন্তু তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন সরাসরি। আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা, কী চাও? আমি তোমাকে দিয়ে দেব। তোমার বাবা বলেছে, আমার প্রতিপালক আমাকে আবার জীবন দান করুন, আবার তোমার জন্য শহিদ হব। আল্লাহ তা'আলা তখন বলেন, আমার পক্ষ থেকে আগেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে, কেউ সেখানে প্রত্যাবর্তন করবে না। তিনি বলেন, আমার রব, তাহলে আমার পরবর্তীদের জানিয়ে দিন। এরপর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়, তোমরা তাদের মৃত ভেব না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, তারা রিযিকপ্রাপ্ত হয়। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৯]

'আবদুল্লাহ ইবনু আমর উহুদযুদ্ধের আগে একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বলেন, উহুদের আগে আমি স্বপ্ন দেখেছি, মুবাশশির বিন 'আবদুল মুনযির আমাকে বলছে, তুমি কদিনের মাঝেই আমাদের কাছে আসছ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এখন কোথায়? সে বলল, আমরা এখন জান্নাতে, যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াই। আমি বললাম, তুমি না বদরের দিন শহিদ হলে! সে বলল, হ্যাঁ, আবার জীবিত হয়েছি। ইবনু আমর নবিজির কাছে স্বপ্নের কথা উল্লেখের পর তিনি বলেন, আবু জাবির, এটাই হলো শাহাদাত। খুব বেশি দেরি হয়নি-উহুদযুদ্ধেই তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।

খাইসামাহ আবু সা'দ
খাইসামাহ আবু সা'দ বলেন, বদরযুদ্ধে আমার ভুল হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি যুদ্ধের প্রতি আগ্রহী ছিলাম। এমনকি বের হওয়ার ব্যাপারে আমার ছেলের সঙ্গে লটারি করেছিলাম। লটারিতে সে জিতে যায়। বদরে আল্লাহ তাকে শাহাদাতের তাওফীক দান করেন। আজ সকালেই আমি ছেলেকে স্বপ্নে দেখেছি। চেহারা তার অনেক সুন্দর-উজ্জ্বল। জান্নাতের মনোরম উদ্যান ও নহরের পাশ দিয়ে মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে বলছিল, সত্য আমাদের সঙ্গে। আমরা জান্নাতে তা অনুভব করতে পারছি। আমার রবের প্রতিশ্রুতি আমি সত্য পেয়েছি। ইয়া রাসূলাল্লাহ, জান্নাতে তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমার ঘুম ভেঙেছে। বেশ বয়স হয়েছে আমার, হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে। আমি আমার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য দু'আ করুন-আল্লাহ যেন আমাকে শাহাদাতের তাওফীক দান করেন; জান্নাতে যেন সা'দকে দেখতে পারি। নবিজি তার জন্য দু'আ করেন। অবশেষে উহুদযুদ্ধে তিনি শহিদ হন।

ওয়াহাব মুযানি ও তার ভাতিজা
ওয়াহাব মুযানি ও তার ভাতিজা হারিস বিন উকবা মাদীনার বাইরে ছিলেন। মুযাইনাহ পাহাড় থেকে নিজেদের মেষ নিয়ে মাদীনায় এসে দেখেন জনশূন্য। তারা জিজ্ঞেস করেন, লোকজন কোথায়? উপস্থিত লোকেরা বলল, তারা উহুদে গেছে। রাসূলুল্লাহ কুরাইশের মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছেন। তারা বললেন, চোখ না থাকলে আমাদের থেকে গিয়ে কাজ নেই। তৎক্ষণাৎ চাচা-ভাতিজা উহুদের উদ্দেশে বের হয়ে নবিজির কাছে আসেন। এসে দেখেন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের কর্তৃত্ব আল্লাহর রাসূলের হাতে। উপত্যকায় মুসলিমদের সঙ্গে মিলিত হন। এরপরই খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরিমার অশ্বারোহী বাহিনী পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। সবাই মিশে যায়। শুরু হয় প্রচণ্ড লড়াই। মুশরিকদের একটা দল পৃথক হয়ে আল্লাহর রাসূলের দিকে আসতে থাকে। নবিজি বলেন, কে আছ, এই দলটিকে প্রতিহত করতে পারবে? মুযানি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এদের জন্য আমিই যথেষ্ট। কথা শেষ না হতেই তিনি দাঁড়িয়ে তির নিক্ষেপ করতে থাকেন। অল্প সময়েই ওরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তিনিও আগের স্থানে ফিরে আসেন।

মুশরিকদের আরেকটি দল নবিজির দিকে এগিয়ে আসে। এবারও তিনি বলেন, এই ঝটিকা বাহিনীকে কে রুখতে পারবে? এবারও মুযানি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আছি। বিলম্ব না করে এলোপাথাড়ি তরবারি চালাতে থাকেন। এরাও পিঠ দেখিয়ে ভাগতে বাধ্য হয়। মুযানি আগের স্থানে ফিরে আসেন।

কিছুক্ষণ পর আরেকটি দল এদিকে ছুটে আসতে থাকে। এবারও তিনি বলেন, এদের বিরুদ্ধে কে দাঁড়াতে পারবে? মুযানি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি ক্লান্ত হইনি। নবিজি বললেন, দাঁড়াও এবং জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। মুযানি আনন্দচিত্তে প্রস্তুত হতে হতে বললেন, আল্লাহর কসম, আমি আর ফিরব না, ফিরতে চাইবও না। ক্ষীপ্র গতিতে তাদের মাঝে ঢুকে বিদ্যুৎবেগে তরবারি চালাতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের দেখছিলেন, এমন সময় তাদের পেছন থেকে তিনি বের আসেন। নবিজি দু'আ করছিলেন, হে আল্লাহ, তার প্রতি রহম করো।

একটু জিরিয়ে আবার তিনি কাফিরদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওরাও তাকে লক্ষ্য করে একযোগে তরবারি ও বর্শা চালায়। পরিশেষে শাহাদাতের মহাসৌভাগ্য অর্জন করেন তিনি। তার দেহে বর্শার ১০টি আঘাত পাওয়া যায়। খুব জঘন্য উপায়ে তাকে বিকৃত করা হয়েছিল। তার শাহাদাতের পর ভাতিজা যুদ্ধ শুরু করেন। একসময় তিনিও শহিদ হন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, আমার কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় মৃত্যু হলো মুযানির মৃত্যু। এমন মৃত্যু আমিও কামনা করি।

বিলাল বিন হারিস মুযানি বলেন, সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের সঙ্গে আমরা কাদিসিয়ার যুদ্ধে শরিক ছিলাম। বিজয়ের পর আমাদের মাঝে যখন গানীমাতের সম্পদ বণ্টন করা হয়। তখন কাবূস পরিবারের মুযাইনা গোত্রের এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের কাছে আসি। তিনি বলেন, কে-বেলাল! বললাম, জি, বিলাল। তিনি বললেন, মারহাবা! কিন্তু তোমার সঙ্গে এই যুবক কে? বললাম, আমার গোত্রের কাবুস পরিবারের সন্তান। সা'দ বললেন, তুমি কি সেই মুযানির পরিবারভুক্ত, যিনি উহুদযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। যুবক বলল, আমি তার ভাতিজা।

সা'দ বললেন, মারহাবা, আল্লাহ তোমাকে নিয়ামাত দান করুন। তোমার চাচাকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। উহুদের দিন তার মতো অন্য কাউকে আমি দেখিনি। সেদিনের দৃশ্য এখনো মনে পড়ে। মুশরিকরা চারদিক থেকে আমাদের বেষ্টন করে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ আমাদের মাঝখানে। চারপাশ থেকে একটা করে বাহিনী তার দিকে তেড়ে আসছে। প্রত্যেকটা বাহিনী প্রতিহত করতে মুযানি সাড়া দিয়ে বলেছেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি হাজির! শেষের বার তিনি দাঁড়ানোর সময় নবিজি বলেন-দাঁড়াও, জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। মুযানি চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য অগ্রসর হলেন। আমিও তার পিছু নিলাম। আল্লাহর কসম, সেদিন আমি তার মতোই শাহাদাতের প্রত্যাশী ছিলাম। দেখতে দেখতে মুযানি শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দেন। চাচ্ছিলাম—আমিও তার সহযাত্রী হয়ে যাই; কিন্তু আমার ভাগ্যলিপিতে জীবনের আলো ছিল দীর্ঘ।

সা'দ তখনই এই মুযানি যুবকের অংশ তাকে দিয়ে দেন। অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন তাকে। শেষে বলেন, আমাদের এখানেই থাকবে নাকি পরিবারের কাছে ফিরে যাবে? বিলাল বললেন—সে ফিরে যেতে চায়। এরপর আমরা ফিরে আসি।

সা'দ বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি নবিজি তার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন, কেননা আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহর রাসূল নিজেই ছিলেন ক্ষতবিক্ষত। সোজা হয়ে দাঁড়ানো ছিল তার জন্য ভীষণ কষ্টের। তারপরও মুযানিকে কবরে রাখার সময় তিনি পাশে ছিলেন। নিজে চাদর দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিয়েছেন। এই চাদর তার পায়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। নবিজি আমাদের ঘাস একত্রিত করতে বলেন। আমরা তা সংগ্রহ করে মুযানির পা ঢেকে দিই। আল্লাহর রাসূল এবার প্রস্থান করেন। আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় আকাঙ্ক্ষা হলো—আল্লাহ যেন আমাকে মুযানির মতো মৃত্যু দেন। [৫২৪]

আমর বিন জামুহ
আমর বিন জামুহ ছিলেন একজন পঙ্গু সাহাবি। সিংহের মতো চারটি সন্তান ছিল তার। যারা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে প্রত্যেক যুদ্ধে অংশ নিতেন। তারা হলেন—খাল্লাদ, মুআওয়াজ, মুআয ও আবু আইমান। উহুদের দিন তারা বাবাকে বারণ করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ আপনাকে অপারগ করেছেন, তাই আপনার ওপর জিহাদ আবশ্যক নয়। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে চলে আসেন। অনুযোগের সুরে বলেন, আমার ছেলেরা আমাকে এই মহতি আত্মনিবেদন থেকে বিরত রাখতে চাচ্ছে। বারণ করছে আপনার সঙ্গে বের হতে; কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি এই খোঁড়া পা নিয়েই জান্নাতে হাঁটতে চাই। নবিজি বললেন, দেখো আমর, আল্লাহ তোমাকে অপারগ করেছেন, কাজেই জিহাদ তোমার জন্য ফরজ নয়। আর ছেলেরা শোনো, তোমরা তাকে বাধা দিয়ো না। হতে পারে আল্লাহ তাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করবেন।

আমর রণাঙ্গন অভিমুখী হন। কিবলামুখী হয়ে দু'আ করে বলেন, হে আল্লাহ, আমার পরিবারের কাছে আমাকে ব্যর্থ করে ফিরিয়ে এনো না। আমর মুজাহিদদের কাতারে দাঁড়িয়ে যান। খোঁড়া পা নিয়েই জিহাদ করতে করতে কাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের দুয়ারে পৌঁছে যান।

এক বর্ণনায় আছে-আমর বিন জামুহ নবিজির কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কী বলেন, আমি আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হলে সুস্থ পা নিয়ে জান্নাতে হাঁটতে পারব না? রাসূলুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, পারবে। উহুদের দিন তিনি, তার এক ভাতিজা ও তাদের এক গোলাম শহিদ হন। নবিজি তাদের সবাইকে এক কবরে রাখেন।

আবু হুজাইফা বিন ইয়ামান ও সাবিত বিন কাইস
আবু হুজাইফা ও সাবিত বিন কাইস বেশ বয়স্ক সাহাবি ছিলেন। উহুদের দিন তারা ছিলেন নারী ও শিশুদের সঙ্গে। মুসলিমদের বিপর্যয়ের সময় তাদের একজন আরেকজনকে বলেন, তোমার সামনে দুর্দিনের হাতছানি। কেন এখানে অপেক্ষা করছ তুমি? আমরা বেঁচে থাকলে জীবনটা হবে গাধার মতোই। আজ না হয় কাল চূড়ান্ত সময় আসবেই। এখনই মোক্ষম সুযোগ তরবারি নিয়ে নবিজির সঙ্গে মিলিত হওয়ার। হয়তো আমাদের নসিবেও জুটবে শাহাদাতের মৃত্যু। তারা তরবারি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে আসেন। তাদের কেউ চিনত না। সাবিত বিন কাইস-কে মুশরিকরা হত্যা করে; কিন্তু হুসাইল বিন জাবিরের ওপর মুসলিমদের তরবারিই আঘাত হানে। নিজেদের অজান্তেই তাকে হত্যা করা হয়। হুজাইফা বলেন, ইনি আমার পিতা। সাহাবিরা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা তাকে চিনতে পারিনি। হুজাইফা বলেন, আল্লাহ আপনাদের ক্ষমা করুন। তিনি শ্রেষ্ঠ দয়াবান। নবিজি তাকে রক্তপণ দিতে চাইলে হুজাইফা এই রক্তপণের টাকা মুসলিমদের মাঝে সাদাকাহ করে দেন। এতে আল্লাহর রাসূলের কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

ভাবা যায়, একজন বৃদ্ধ মানুষ ঈমানি শক্তিতে কতটা বলিয়ান! শাহাদাতের নেশায় কেমন বিভোর! তারা ছিলেন অশীতিপর-জিহাদ আবশ্যক ছিল না তাদের ওপর; কিন্তু শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের অবিনাশী চেতনায় তারা দুর্গ ছেড়ে অস্ত্র ধরেছেন। হুজাইফা-এর মহানুভবতাও লক্ষণীয় যে, মুসলিমরা তার বাবাকে ভুলে হত্যা করল, তাদের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করলেন, অধিকন্তু বাবার রক্তপণের সম্পদও মুসলিমদের মাঝে সাদাকাহ করে দিলেন। আরেকটি বিষয় এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা জানতে পারি-জিহাদের ময়দানে কাফির মনে করে মুসলিমরা অপর এক মুসলিমকে হত্যা করলে ইমামের উচিত বাইতুল মাল থেকে তার রক্তপণ আদায় করা। কেননা, নবিজি হুজাইফাকে রক্তপণ দিতে চেয়েছিলেন।

উসাইরিম
তার পূর্ণাঙ্গ নাম আমর বিন সাবিত বিন কাইস। প্রথমে তাকে ইসলামের কথা বলা হলেও সে ঈমান আনেনি। আবু হুরাইরা -এর ভাষ্যে তার কাহিনি বর্ণিত রয়েছে; তিনি বলেন, স্বজাতির মাঝে শুধু উসাইরিমই ঈমান আনা থেকে বিরত ছিল। সে এমন একদিনে মাদীনায় আসে, যেদিন রাসূলুল্লাহ ও সাহাবিরা চলে গেছেন উহুদের উদ্দেশে। সে এসে জিজ্ঞেস করল, 'সা'দ বিন মু'আজ কোথায়? বলা হলো—তিনি উহুদে চলে গেছেন। আবার বলল, তার ভাইয়ের গোত্রীয় লোকেরা কোথায়? বলা হলো—তারাও উহুদে। সে আবার জিজ্ঞেস করল, তার জাতির লোকেরা কোথায়? বলা হলো—তারাও উহুদে। এরপর নিজের অজান্তেই তার মনে ঈমানের আলো বিকীর্ণ হয়, সেখানে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। বিলম্ব না করে নিজের তরবারি ও বর্শা বাঁদিকে নিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসেন উহুদের প্রান্তরে। মুসলিমরা তাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলে, আরে আমর, তুমি এখানে! তিনি বলেন, বন্ধুগণ, আমি তো ঈমান এনেছি। এরপর আর কিছু না ভেবে সর্বশক্তি ব্যয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তরবারি ও বর্শার আঘাত তাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

যুদ্ধ শেষে বনু 'আবদুল আশহালের লোকেরা যুদ্ধক্ষেত্রে শহিদদের লাশ খুঁজতে থাকে। একসময় উসাইরিমকে পেয়ে যায়। তারা বলে ওঠে, আরে, এ তো উসাইরিম! তাকে এখানে নিয়ে এলো কে? সে তো ইসলামকে অস্বীকার করেছিল। অনুসন্ধানী এই দলটা তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি এখানে কেন এলে? জাতির টানে এসেছ, নাকি ইসলামকে ভালোবেসে? তিনি বললেন, ইসলামকে ভালোবেসেই এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি, গ্রহণ করেছি ইসলাম। তরবারি নিয়ে সোজা চলে এসেছি এখানে। লড়াই করেছি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে। এখন আমার এই অবস্থা। শোনো বন্ধুরা, আমি মারা গেলে আমার সমুদয় সম্পদ নবিজিকে দিয়ে দেবে। তিনি যেখানে ইচ্ছা খরচ করবেন। একটু পর তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

রাসূলুল্লাহ-এর কাছে তার আলোচনা করা হয়। তিনি বলেন, সে জান্নাতি মানুষ। বলা হলো—সে মরল আর জান্নাতে প্রবেশ করল, অথচ কোনো নামাজ সে পড়েনি! নবিজি বললেন, সে আমল করেছে কম, প্রতিদান পেয়েছে অনেক বেশি। [৫২৫]

আবু হুরাইরা বলতেন, তোমরা আমাকে এমন ব্যক্তির নাম বলো দেখি, যিনি কোনো নামাজ আদায় করেননি, অথচ জান্নাতি! ছাত্ররা বলতে না পারলে তিনি বলতেন, তিনি হলেন উসাইরিম বিন আশহাল। [৫২৬]

মুখাইরিক
উহুদযুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ মুশরিকদের বিরুদ্ধে মাদীনা থেকে বের হওয়ার পর মুখাইরিক ইয়াহুদিদের একত্রিত করে বলেন, আমার ইয়াহূদি ভায়েরা, তোমরা জানো আজ তোমাদের ওপর আবশ্যক হলো মুহাম্মাদকে সাহায্য করা। তারা বলল, আজ তো শনিবার? তিনি বলেন, তোমাদের জন্য কোনো শনিবার নেই। এরপর তিনি ঢাল-তরবারি নিয়ে রওনা করার আগে বলেন, আমার কিছু হলে আমার সম্পদগুলো মুহাম্মাদকে দিয়ে দেবে। তিনি যেখানে ইচ্ছা খরচ করবেন। এ কথা বলে আল্লাহ্র রাসূলের উদ্দেশে বের হন, তার পক্ষে যুদ্ধ করতে করতে মারা যান। নবিজি তার লাশ দেখে বলেন, মুখাইরিক ইয়াহুদিদের মাঝে শ্রেষ্ঠ।

তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ইমাম যাহাবি তাজরীদ গ্রন্থে, ইবনু হাজার ইসাবাহ গ্রন্থে ওয়াকিদি থেকে বর্ণনা করেন মুখাইরিক মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাওদুল আনফ গ্রন্থে সুহাইলি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ড. ‘আবদুল্লাহ শাকারি এই বিষয়টি তাহকীক করেছেন। তিনি এদিকটিতে প্রাধান্য দিয়েছেন যে, মুখাইরিক মুসলিম হয়েছিলেন এবং মুসলিম শহিদদের সঙ্গে তাকে দাফন করা হয়। তার সম্পদের আধিক্যসত্ত্বেও সমুদয় মাল সাদাকাহ করা হয়—অথচ সম্পদের প্রতি ইয়াহুদিদের ভালোবাসা এবং এর দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা কারও কাছে অবিদিত নয়। [৫২৭]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
মুসলিম বাহিনীতে থেকে যারা যুদ্ধ করেছে, তাদের একজন কুযমান। বীরত্বে বেশ খ্যাতি ছিল তার। উহুদের দিন সে যুদ্ধে আসতে দেরি করছিল। তার হেঁয়ালিপনা দেখে বনু যুফারের মহিলারা তিরস্কার করে বলতে থাকে। নারীদের কটাক্ষের সামনে সে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। অবশেষে নবিজি যখন সাহাবিদের সারিবদ্ধ করছিলেন, তখন সে উহুদে এসে উপস্থিত হয়। সবাইকে পাশ কেটে সামনে চলে আসে। শুরু হয় যুদ্ধ। সে-ই প্রথম মুসলিমদের মধ্য থেকে তির নিক্ষেপ করে। তির শেষ হয়ে গেলে তরবারি কোষমুক্ত করে চলে আসে মুখোমুখি আক্রমণে।

সাত থেকে নয়জন শত্রু তার কাছে ধরাশায়ী হয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে। লড়তে গিয়ে একসময় কুযমানও মারাত্মক আঘাত পায়। কাতাদা ইবনু নু'মান তাকে ডেকে বলেন, আবুল গাইদাক, শাহাদাতের ময়দানে তোমাকে আমন্ত্রণ। অনেক মুসলিমও তাকে বলছিলেন, আজ তুমি কাজ দেখিয়েছ, কুযমান; সুসংবাদ গ্রহণ করো। কুযমান বলল, কীসের সুসংবাদ? আমি তো আমার গোত্র বাঁচাতে লড়াই করেছি। আমার জাতির ব্যাপারে আশঙ্কা না হলে এখানে আসতাম না। এ কথা আল্লাহর রাসূলকে বলা হলে তিনি বলেন, সে জাহান্নামে যাবে; আল্লাহ তা'আলা ফাজির লোক দিয়েও তার দীনকে সাহায্য করেন।

আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল; এখানে জিহাদের ক্ষেত্রেও নিয়তের গুরুত্বের ব্যাপারটি আমরা বুঝতে পারি। অনুমিত হচ্ছে, নিজ গোত্র রক্ষা করা কিংবা খ্যাতির জন্য আমল করলে সে আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না。

টিকাঃ
৫১৭. বুখারি, মাগাযি, হাদীস নং ৪০৭২
৫১৮. আল-মুসনাদ, ১/২৭১, হাদীস নং ২৪৪৫
৫১৯. সুনান ইবন মাজাহ, জানাযা অধ্যায়, হাদীস নং ১৫৯১
৫২০. মুসলিম, আদব অধ্যায়, হাদীস নং ২১৩২
৫২১. বুখারি, মাগাযি, হাদীস নং ৪০৭২
৫২২. আল-মুসতাদরাক, ৩/২০০, সনদ সহীহ।
৫২৩. যাদুল মাআদ, ৩/২১২
৫২৪. গায়াতুল মাকসুদ, আবু ফারিস, পৃ. ১১৭
৫২৫. বুখারি, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ২৮০৮
৫২৬. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম ৩/১০০, ১০১
৫২৭. আল-ইয়াদ ফিস শামাইলিল মুহাম্মাদিয়্যাহ, ১/৩০৬

📘 রউফুর রহীম 📄 কিছু নবুওয়াতি নিদর্শন

📄 কিছু নবুওয়াতি নিদর্শন


কাতাদা বিন নু'মানের চোখ
যুদ্ধের সময় কাতাদা বিন নু'মানের চোখ আক্রান্ত হয়। এমনকি চোখের তারা কোটর থেকে বেরিয়ে আসে। নবিজি তার চোখের তারা আবার কোটরে বসিয়ে দেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তা আগের চেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে। এমনকি অন্যটিতে ব্যাধি দেখা দিলেও এটিটিতে কিছুই হতো না। কিছুকাল পরের কথা। তার ছেলে 'উমার বিন 'আবদুল আযীয-এর কাছে আসে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কে তুমি? কাতাদা-এর ছেলে জবাবে বলেন, উহুদযুদ্ধে যার চোখ গণ্ডদেশে নেমেছিল, মুস্তাফা তা প্রতিস্থাপন করার ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় তা আগের চেয়ে সুন্দর হয়—আমি সেই ভাগ্যবান যোদ্ধার সন্তান। 'উমার বিন 'আবদুল আযীয তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্পদ দান করেন।

উবাই বিন খালফের মৃত্যু
ঘটনার সূত্রপাত মাক্কায়। একদিন সকালে উবাই বিন খালফ তার ঘোড়াটাকে দানাপানি খাওয়াচ্ছিল। নবিজিকে দেখে সে বলে ওঠে, এটার ওপর সওয়ার হয়েই তোমাকে আমি হত্যা করব। জবাবে রাসূল বলেন, ইনশাআল্লাহ, আমিই তোকে হত্যা করব। উহুদের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ একটা পাথরে হেলান দিয়ে ছিলেন। এমন সময় উবাই বিন খালফ খুঁজতে খুঁজতে নবিজির কাছে চলে আসে। সে বলছিল, মুহাম্মাদ, যদি আজ বেঁচে যায়, তাহলে আমার আর রক্ষা নেই। নবিজি বলেন, ওকে আসতে দাও। সে আরও নিকটবর্তী হলে রাসূল হারিস বিন সাম্মাহ থেকে একটা বর্শা নেন। চোখের পলকে উবাই বিন খালফকে লক্ষ্য করে বর্শা নিক্ষেপ করেন নবিজি নিজে। সেটি উবাইয়ের কাঁধে সামান্য আঘাত হানে; কিন্তু তার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, উবাই ঘোড়া থেকে পড়ে যায়। আল্লাহর এই শত্রু মক্কায় ফেরার পথে সারিফ নামক স্থানেই মারা যায়। আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সে বলছিল, আল্লাহর কসম, আমি যে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করছি, এই কষ্ট গোটা মাক্কাবাসীর মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হলে সবাই মারা যেত।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নবিজি-এর একটি মু'জিযা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় আমিই তোমাকে হত্যা করব। তা বাস্তবায়িত হয় এ যুদ্ধে। আঘাত ছিল সামান্য; কিন্তু এতেই আল্লাহ তাকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করান। আরেকটি বিষয়ও প্রতিভাত হয়—নবিজির কথা সত্যে পরিণত হওয়ার ব্যাপারে এক মুশরিকের বিশ্বাসও কতটা মজবুত ছিল।

টিকাঃ
(এই অধ্যায়ে সরাসরি কোনো ফুটনোট রেফারেন্স মূল টেক্সটে নেই।)

কাতাদা বিন নু'মানের চোখ
যুদ্ধের সময় কাতাদা বিন নু'মান -এর চোখ আক্রান্ত হয়। এমনকি চোখের তারা কোটর থেকে বেরিয়ে আসে। নবিজি তার চোখের তারা আবার কোটরে বসিয়ে দেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তা আগের চেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে। এমনকি অন্যটিতে ব্যাধি দেখা দিলেও এটিতে কিছুই হতো না।

কিছুকাল পরের কথা। তার ছেলে 'উমার বিন 'আবদুল আযীয -এর কাছে আসে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কে তুমি? কাতাদা -এর ছেলে জবাবে বলেন, উহুদযুদ্ধে যার চোখ গণ্ডদেশে নেমেছিল, মুস্তাফা তা প্রতিস্থাপন করার ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় তা আগের চেয়ে সুন্দর হয়—আমি সেই ভাগ্যবান যোদ্ধার সন্তান। 'উমার বিন 'আবদুল আযীয বলেন, এই সম্মান দুধমিশ্রিত পানির মতো নয়, সবশেষে যা মূত্র হয়ে বের হয়। 'উমার বিন 'আবদুল আযীয তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্পদ দান করেন।

উবাই বিন খালফের মৃত্যু
ঘটনার সূত্রপাত মাক্কায়। একদিন সকালে উবাই বিন খালফ তার ঘোড়াটাকে দানাপানি খাওয়াচ্ছিল। এমন সময় নবিজি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। নবিজিকে দেখে সে বলে ওঠে, আমার এই ঘোড়াটাকে প্রতিদিন দানাপানি খাওয়াই, এটার ওপর সওয়ার হয়েই তোমাকে আমি হত্যা করব। জবাবে রাসূল বলেন, ইনশাআল্লাহ, আমিই তোকে হত্যা করব।

উহুদের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ একটা পাথরে হেলান দিয়ে ছিলেন। এমন সময় উবাই বিন খালফ খুঁজতে খুঁজতে নবিজির কাছে চলে আসে। সে বলছিল, মুহাম্মাদ, যদি আজ বেঁচে যায়, তাহলে আমার আর রক্ষা নেই। সাহাবিরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের কেউ তাকে খতম করে দিই! নবিজি বলেন, ওকে আসতে দাও। সে আরও নিকটবর্তী হলে রাসূল হারিস বিন সাম্মাহ থেকে একটা বর্শা নেন। বর্শাটি নেওয়ার সময় আশপাশের সবাই উটের পিঠে থেকেই দীর্ঘকেশীর মতো আন্দলিত হয়। চোখের পলকে উবাই বিন খালফকে লক্ষ্য করে বর্ষা নিক্ষেপ করেন নবিজি নিজে। সেটি উবাইয়ের কাঁধে সামান্য আঘাত হানে; কিন্তু তার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, উবাই ঘোড়া থেকে পড়ে যায়। সে কুরাইশের কাছে ফিরে যাওয়ার পর গাধার মতো চিল্লিয়ে বলছিল, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ আমাকে হত্যা করেছে। লোকেরা বলল, আরে, এই তুচ্ছ আঘাতে তুমি এমন করছ কেন? উবাই বিন খালফ বলল, মুহাম্মাদ আমাকে মাক্কায় বলেছিল, সে আমায় হত্যা করবে। আল্লাহর কসম, সে আমার প্রতি থুতু মারলেও আমি মারা যাব। অবশেষে আল্লাহর এই শত্রু মক্কায় ফেরার পথে সারিফ নামক স্থানেই মারা যায়। অন্য বর্ণনায় আছে—আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সে বলছিল, আল্লাহর কসম, আমি যে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করছি, এই কষ্ট গোটা মাক্কাবাসীর মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হলে সবাই মারা যেত।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নবিজি -এর একটি মু'জিযা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় আমিই তোমাকে হত্যা করব। তা বাস্তবায়িত হয় এ যুদ্ধে। আঘাত ছিল সামান্য; কিন্তু এতেই আল্লাহ তাকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করান। আরেকটি বিষয়ও প্রতিভাত হয়-নবিজির কথা সত্যে পরিণত হওয়ার ব্যাপারে এক মুশরিকের বিশ্বাসও কতটা মজবুত ছিল। উবাই দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল, নবি মুহাম্মাদ -এর কথা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। তবুও নিজেদের গোঁড়ামি ও প্রবৃত্তির পূজা তাদের ইসলাম গ্রহণ করে সম্মানিত হতে দেয়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px