📘 রউফুর রহীম 📄 যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কারণসমূহ

📄 যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কারণসমূহ


উহুদযুদ্ধের বিশ্লেষণ করলে এর প্রেক্ষাপট রচিত হওয়ার কিছু কারণ বেরিয়ে আসে। কারণগুলো কখনো ধর্মীয় ও সামাজিক, আবার কখনো-বা আর্থিক ও রাজনৈতিক। কারণগুলো আমরা বিস্তারিত করে দেখার চেষ্টা করব—

ধর্মীয় কারণ
ইসলাম প্রচার ও দীন পালনে মুশরিকরা বাধা দিত। সাধারণ মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করতে দিত না। ইসলাম, ইসলামি রাষ্ট্র ও মুসলিমদের ধ্বংস করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করত। তাদের এই অপতৎপরতা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(স্মরণ করো) যখন কাফিররা আল্লাহর পথ থেকে (লোকদের) বিরত করতে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে থাকে। অতএব, তারা তা ব্যয় করবে; তবে অবশেষে এই সম্পদ তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হবে। তারপর তারা পরাজিত হবে। আর কাফিরদের জাহান্নামে একত্র করা হবে। [সূরা আনফাল, ৮: ৩৬]
আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারি বলেন, মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধা দেওয়ার জন্য তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করত। ইবনু কাসীর বলেন, সত্যানুসরণে বাধা দেওয়ার জন্য কাফিররা তাদের সম্পদ ব্যয় করত, এই তথ্য জানিয়ে দেন আল্লাহ তা'আলা। [৫০১] মহান মুফাসসির শাওকানি বলেন, কাফিরদের সম্পদ ব্যয়ের উদ্দেশ্য হলো, রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সেনা সমাবেশ করে সত্যের পথে বাধা দেওয়া। [৫০২]
এ থেকে বুঝা যায়, দীন-ধর্ম হিসেবেই ইসলাম একটা বড় উপলক্ষ্য, যাকে কেন্দ্র করে উহুদযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের মাধ্যমেই কুরাইশরা আল্লাহর দীনের পথে বাধা সৃষ্টি করতে চায়। সত্যানুসরণ ও ইসলাম গ্রহণ করতে মানুষকে বাধা দেয় এবং ইসলামের প্রচারব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা করে।

সামাজিক কারণ
বদরযুদ্ধে চরম পরাজয় ও বরেণ্য নেতাদের হারানোর কারণে কুরাইশরা তীব্র গ্লানি ও চরম লাঞ্ছনার মধ্যে পড়ে। এই গ্লানি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে বদর থেকে ফেরামাত্রই রাসূলের বিরুদ্ধে এক মরণপণ যুদ্ধের জন্য অর্থসংগ্রহের কাজে নেমে পড়ে তারা। এই প্রসঙ্গে ইবনু ইসহাক বলেন, বদর রণাঙ্গনে কুরাইশের বরেণ্যদের নিহত হওয়া স্বজন এবং অন্যান্য যোদ্ধা ও আবু সুফিয়ানের বণিক কাফেলা মাক্কায় ফেরার পর দারুণ নাওয়ায় এক জরুরি সভা বসে। এই সভা থেকেই নেতৃস্থানীয় কুরাইশরা রাসূলের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য এক বিশাল বাহিনী গঠন করে। বদরযুদ্ধে পিতা, পুত্র ও ভ্রাতৃহারাদের মাঝে ঘুরে তাদের বুঝান 'আবদুল্লাহ বিন রাবী'আ, ইকরিমা বিন আবু জাহল, হারিস বিন হিশাম, হুওয়াইতিব বিন 'আবদুল 'উযযা, সাফওয়ান বিন উমাইয়া প্রমুখ আরব বীরেরা। আবু সুফিয়ান ও তার কুরাইশি বণিকদের সঙ্গে আলোচনা করে। তারা বলে, তোমাদের আপনজনহারা করে দিয়েছে মুহাম্মাদ। সে তোমাদের ভালো লোকদের হত্যা করেছে। সুতরাং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এই সম্পদ দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করো। আশা করি, আমরা তার থেকে যথোচিত প্রতিশোধ নিতে পারব। তাদের কথায় আবু সুফিয়ান একবাক্যে বলে, আমিই প্রথম তোমাদের ডাকে সাড়া দিলাম।
নিজের আবিসিনীয় দাস ওয়াহশিকে ডেকে যুবাইর বিন মুতইম বলে, আমার চাচা তু'আইমা বিন 'আদির বদলে মুহাম্মাদের চাচা হামযাহকে হত্যা করতে পারলে তুমি মুক্ত। উল্লেখ্য, দাস ওয়াহশি আবিসিনীয় কায়দায় বেশ নির্ভুলভাবে বর্ষা ছুড়তে জানত।

অর্থনৈতিক কারণ
শুরুর দিকে ইসলামি রাষ্ট্র মাদীনার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল সারিয়া অভিযান। এসব অভিযানের ফলে ব্যাপক হুমকি ও অবরোধের মুখে পড়ে কুরাইশ অর্থনীতি। তাদের এই অর্থনীতি শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের যাত্রানির্ভর ছিল। শীতকালীন যাত্রায় শাম থেকে আমদানিকৃত পণ্য নিয়ে তারা ইয়ামান যেত আর গ্রীষ্মকালীন যাত্রায় ইয়ামান থেকে আমদানিকৃত পণ্য নিয়ে শামে যেত। সম্পূর্ণরূপে পরস্পর নির্ভরশীল ছিল মক্কার দুই ঋতুভিত্তিক এই বাণিজ্যযাত্রা। এক ঋতুর যাত্রা ব্যাহত হলে অপর ঋতুর ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়ত। কারণ—তাদের এই ব্যবসা এক দেশ থেকে অপর দেশে আমদানি-রপ্তানি নির্ভর ছিল। এক দেশে ঠিকঠাক রপ্তানি করতে না পারলে পরের বারের যাত্রার জন্য সেখান থেকে আমদানির অর্থ যোগান দেওয়া বেশ মুশকিল হয়ে যেত। তাদের ব্যবসা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
কুরাইশদের অভ্যস্ত করার জন্য, তাদের অভ্যস্ত করার জন্য শীত ও গ্রীষ্মের সফরে। অতএব, তারা যেন এই কা'বা ঘরের প্রভুর ইবাদাত করে, যিনি তাদের ক্ষুধায় খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপদ করেছেন। [সূরা কুরাইশ, ১০৬: ১-৪]
সাফওয়ান বিন উমাইয়া বলে, মুহাম্মাদ ও তাঁর অনুসারীদের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। যেভাবে হোক তাদের শায়েস্তা করা দরকার! উপকূলীয় এলাকায় তারা টহল দেয়। স্থানীয় জনসাধারণকে তার দলে ভিড়িয়েছে। জানি না, ভবিষ্যতে কোন পথে ব্যবসা করব আমরা। দেশে বসে বসে যদি পুঁজি খেতে থাকি, আমরা তাহলে বেশি দিন টিকতে পারব না। আমরা বরং গ্রীষ্ম ঋতুতে শামে ব্যবসা করি আর শীতে আবিসিনীয়ায়—এটাই ভালো হয়। উমাইয়ার কথা থেকে বোঝা যায়, মুসলিমদের অভিযানের ফলে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর অর্থনীতি কতটা হুমকিতে পড়েছিল।

রাজনৈতিক কারণ
বদরযুদ্ধের পর হুমকির মুখে পড়ে কুরাইশ নেতৃত্ব। আরবের গোত্রগুলোর ওপর নিজেদের একক কর্তৃত্ব হারাতে বসে তারা। তাই এই যুদ্ধের মাধ্যমে জানমাল সর্বস্ব উৎসর্গ করে হলেও যেকোনো মূল্যে তারা নিজেদের নেতৃত্ব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এজন্যেই নেতৃত্ব-পিপাসু কুরাইশ ইসলামি রাষ্ট্র মাদীনার বিরুদ্ধে একটি সামরিক সমাধানে যেতে উঠেপড়ে লাগে।

মাদীনার উদ্দেশে কুরাইশদের যুদ্ধ-যাত্রা
তৃতীয় হিজরির ৮ শাওয়াল শনিবার কুরাইশ বাহিনী তাদের সার্বিক যুদ্ধপ্রস্তুতি শেষ করে। তিন হাজার যোদ্ধা, নারী ও দাসদের সমন্বয়ে বাহিনী গঠিত হয়। এতে যোগ দেয় প্রতিবেশী আরবগোত্র এবং কিনানা ও তিহামার অধিবাসীরা। আরও যোগ দেয় গায়িকা ও নর্তকী নারীরা, যেন কেউ রণেভঙ্গ না দিতে পারে। সবাইকে নিয়ে অপ্রতিরোধ্য দল হিসেবে কুরাইশরা এ যাত্রা করে। এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় আবু সুফিয়ান। সঙ্গে নেয় তার স্ত্রী উতবা বিন রাবী'আর কন্যাকে। তাদের সঙ্গে মাসঊদ সাকাফির কন্যা বারযাহকে নিয়ে সাফওয়ান বিন উমাইয়া বিন খালফও যুদ্ধ-যাত্রা করে। ইকরামা বিন আবু জাহল বের হয় উম্মু হাকীম বিনতু হারিস বিন হিশাম বিন মুগীরাকে নিয়ে। হারিস বিন হিশাম বিন মুগীরা বের হয় ফাতিমা বিনতু ওয়ালীদ বিন মুগীরাকে নিয়ে। তারা সকলে মাদীনার নিকটবর্তী শাফীরুল ওয়াদি উপত্যকার সাবা এলাকায় এসে যাত্রাবিরতি করে। উহুদযুদ্ধে সেনাবিন্যাসের পূর্বেই কুরাইশরা ব্যাপক প্রচারাভিযান চালায়। এ ক্ষেত্রে গুরুদায়িত্ব পালন করে আবু ইযযা আমর বিন 'আবদুল্লাহ আল-জুমাহি, আমর বিন 'আস, হুবাইরা আল-মাখযুমি ও বিন যাব'আরি। এই প্রচারাভিযান ব্যাপক ফলপ্রসু হয়। এই যুদ্ধে কুরাইশদের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা।

শত্রুর ওপর রাসূলের গোয়েন্দা নজরদারি ও চাচা আব্বাসের চিঠি
কুরাইশদের গতিবিধি ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন আব্বাস বিন 'আবদুল মুত্তালিব। তাদের মাক্কা ছেড়ে যাওয়ামাত্রই কুরাইশ সামরিক প্রস্তুতির বিবরণ দিয়ে রাসূলের নিকট তড়িৎ বার্তা পাঠান তিনি। মাত্র তিনদিনে মাক্কা-মাদীনার মাঝেকার প্রায় পাঁচশো কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাসূলের হাতে চিঠি পৌঁছে দেন আব্বাসের দূত। রাসূল তখন কুবা মাসজিদে অবস্থান করছিলেন।
রাসূল তার চাচা আব্বাসের মাধ্যমে কুরাইশদের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। এ সম্পর্কে বিন 'আবদুল বার বলেন, মুশরিকদের গতিবিধি সম্পর্কে রাসূলের নিকট চিঠি লিখতেন চাচা আব্বাস। তার মাক্কায় অবস্থানের ফলে মুসলিমদের খুব উপকার হতো। আর (বদর যুদ্ধের পর) তিনি রাসূলের নিকট চলে আসতে চাইতেন; কিন্তু রাসূল তাঁকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, আপনার মাক্কায় অবস্থানই শ্রেয়। রাসূলের উদ্দেশ্যে পাঠানো চিঠিতে অনেক গোপন তথ্য পাঠান আব্বাস। এই চিঠিতে তিনি বলেন, কুরাইশরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ-যাত্রা শুরু করেছে। তাদের প্রতিরোধ করতে যা যা করার দরকার, আপনি করুন। তাদের সঙ্গে আছে তিন হাজার যোদ্ধা—এদের রয়েছে সাতশো বর্মধারী যোদ্ধা, দুশো ঘোড়া ও তিন হাজার উট; আর তাদের সকল অস্ত্রই তারা সঙ্গে নিয়েছে। [৫০৩] চিঠিটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যেমন: ১। মাদীনার অভিমুখে যুদ্ধযাত্রারত মুশরিকদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান। ২। শত্রুবাহিনীর সামরিক শক্তি সম্পর্কে সঠিক সময়ে অবহিত করা। ফলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিস্তারিত পরিকল্পনা করা সহজ হয়েছিল।
তার পরও মাক্কা থেকে পাওয়া তথ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি রাসূল; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি অত্যন্ত তৎপর ছিলেন; এতে মুসলিম নেতাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো—শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্যের সরবরাহ থাকলে তাদের দমনে সঠিক পরিকল্পনা করা যায়। এ কল্পেই রাসূল হুবাব বিন মুনযির বিন জামুহকে কুরাইশদের তথ্য সংগ্রহের কাজে পাঠান। তিনি কুরাইশ বাহিনীর ভেতরে প্রবেশ করে তাদের সংখ্যা ও সামর্থ্য নিরূপণ করে আসেন। তার ফিরে আসার পর রাসূল ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করেন, কী দেখলে? তিনি বলেন, হে রাসূল, তাদের সংখ্যা তিন হাজারের চেয়ে কিছু কমবেশি হতে পারে। তাদের আছে দুশো ঘোড়া ও প্রায় সাতশো বর্মধারী সৈন্য। রাসূল জানতে চান, তাদের কি গায়িকা আছে? তিনি বলেন, ঢাকী ও নর্তকী নারীদের দেখেছি। রাসূল বলেন, এরা এসেছে সৈন্যদের উন্মাদনা বাড়াতে এবং বদরের নিহতদের উদ্দেশ্যে মারসীয়া গাইতে। তারপর তিনি বলেন, এভাবেই আমার নিকট তাদের তথ্য আসে। আর শোনো, এ ব্যাপারে কাউকে জানাবে না। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক। হে আল্লাহ, তোমার নামেই চলি আমি, তোমার নামেই পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সাহাবি ফুযালার দুই ছেলে আনাস ও মুআন্নাসকে কুরাইশ বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠান রাসূলুল্লাহ। মাদীনার অদূরে কুরাইশ বাহিনীকে তারা দেখতে পায়। নিকটস্থ চারণভূমিতে ওদের উট-ঘোড়াকে ঘাস খেতে দেখে। তারা ফিরে এসে রাসূলকে এ সংবাদ দেয়। কুরাইশ বাহিনী সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য লাভের পর রাসূল তা নেতৃস্থানীয়দের মাঝে গোপন রাখেন। কারণ, এই তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে সাধারণ মুসলিম যোদ্ধাদের মননে চির ধরতে পারে। এজন্যই উবাই বিন কা'ব যখন আব্বাসের চিঠি পড়ছিলেন, রাসূল তাকে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন এবং দ্রুত মাদীনায় ফিরে আসেন। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের জন্য নেতৃস্থানীয় আনসার ও মুহাজিরদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আনসার-প্রধান সা'দ বিন রাবিকে রাসূল কুরাইশদের সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে অবহিত করলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, ভালো কিছুরই আশা করছি আমি। রাসূল তাকে ব্যাপারটি গোপন রাখতে বলেন। সা'দের কাছ থেকে আল্লাহর রাসূল চলে গেলে তার স্ত্রী তাকে বলেন, আপনাকে কী বললেন রাসূল? সা'দ তার স্ত্রীকে বলেন, এসব শুনে তোমার কী কাজ? সা'দের স্ত্রী বলে, রাসূল আপনাকে কী বলেছেন, তা শুনেছি আমি—রাসূলের গোপন কথা সা'দকে শুনিয়ে দেয় তার স্ত্রী। বিষয়টি রাসূলকে অবহিত করে সা'দ বলেন, হে রাসূল, আমার আশঙ্কা হয়, খবরটি ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তখন আপনি ভাববেন, কাজটি আমিই করেছি, অথচ আপনি আমাকে গোপন রাখতে বলেছিলেন। তখন রাসূল বলেন, তোমার স্ত্রীর কথা বাদ দাও।
এই ঘটনায় সামরিক লোকদের জন্য একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে; কোনো অবস্থাতেই সামরিক বিষয় ও পরিকল্পনার কথা স্ত্রীদের নিকট বলা যাবে না। এ জাতীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে খুব সতর্ক হতে হবে। না হয় দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। অতীতের বিভিন্ন জাতির পতন ও বিপর্যয়ের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো, নেতাদের বিশ্বাস ঘাতক স্ত্রী, ছদ্মবেশী গাদ্দার কিংবা বর্ণচোরা আপনজনদের মাধ্যমে গোপন তথ্য পাচার হয়ে যাওয়া।

সাহাবিদের সঙ্গে আল্লাহর রাসূলের পরামর্শ
কুরাইশদের সম্পর্কে সার্বিক তথ্য সংগ্রহের পর সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন রাসূল। এই যুদ্ধে কি তারা মাদীনার ভেতরে নিরাপদে থেকে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করবেন, নাকি মাদীনার বাইরে গিয়ে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করবেন—এই বিষয়ে সাহাবিদের মতামত নেন তিনি। মাদীনায় অবস্থান করে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের মত দিয়ে রাসূল বলেন, আমাদের মাদীনায় থাকাটা নিরাপদ দুর্গে থাকার মতো। তোমরা যদি এখানে থাকতে চাও এবং শত্রুকে তাদের জায়গায় থাকতে দাও, এটা কেমন হয়?—কারণ, শত্রুরা অবস্থান নিলে একটি খারাপ জায়গাতে অবস্থান নেবে; আর যদি তারা মাদীনা আক্রমণ করে, তাহলে আমরা তদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। মাদীনায় থেকে যুদ্ধের ব্যাপারে রাসূলের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন ‘আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালূল। তবে বদরযুদ্ধে অনুপস্থিত কতিপয় সাহাবি এ ব্যাপারে ভিন্ন মত দেন। তারা চান, মাদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে। তারা রাসূলের নিকট আবেদন করেন, হে রাসূল, আমাদের মাদীনার বাইরে নিয়ে চলুন। আমরা সেখানে গিয়ে লড়াই করব।
ইমাম ইবনু কাসীর বলেন, রাসূলের মতের ওপর স্থির না থেকে অধিকাংশ মানুষই শত্রু মোকাবিলার জন্য মাদীনার বাইরে যেতে গোঁ ধরে। রাসূলের মতের ওপর স্থির থাকলে তা-ই সিদ্ধান্ত হিসেবে মনোনীত হতো; কিন্তু সিদ্ধান্ত অন্যটিই চূড়ান্ত হলো। কারণ, বদরযুদ্ধের ফযিলতের কথা জেনে সেসময়কার অনুপস্থিত অনেক সাহাবিই মাদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার মত দেন।
ইবনু ইসহাক বলেন, শত্রুর মোকাবিলা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহাবিরা তখনো রাসূলের মাজলিসে বসা ছিলেন। সে অবস্থায় তাদের রেখে রাসূল ঘরে চলে যান। রণসজ্জা গ্রহণ করেন—বর্ম পরে হাতিয়ার ধারণ করেন। এদিকে সাহাবিরা বলাবলি করতে থাকে, তোমরা রাসূলের মতের পিঠে মত দিয়ে ভালো করোনি। তারপর সবাই পরামর্শ করে হামযাকে রাসূলের নিকট পাঠায়। তারা তাকে বলে, আপনি রাসূলের নিকট গিয়ে বলুন, হে রাসূল, আমরা আপনার মত মেনে নিচ্ছি। আপনার মত অনুযায়ী আমরা চলব। হামযা রাসূলের নিকট গিয়ে বলেন, হে রাসূল, লোকজন তাদের মতের ব্যাপারে একে অপরকে তিরস্কার করছে। এখন তারা আপনার মত মেনে নিতে চাইছে। তার কথা শুনে রাসূল দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, কোনো রাসূলের পক্ষে রণসজ্জা গ্রহণ করে বিনা যুদ্ধে তা ত্যাগ করা সংগত নয়।

মাদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মত প্রদানকারীদের যুক্তি
১। মাদীনার আনসার সাহাবিগণ দ্বিতীয় আকাবার শপথে রাসূলকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই মাদীনার ভেতরে থেকে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করাটা আপাত চোখে তাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়।
২। কিছুসংখ্যক মুহাজির সাহাবি মনে করেন, মাদীনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আনসারদের চেয়েও মুহাজিরদের বেশি। কুরাইশদের আক্রমণ থেকে মাদীনা রাষ্ট্র ও আনসারদের কৃষি-শস্য রক্ষা করতে হবে।
৩। যেসকল সাহাবি বদরযুদ্ধে উপস্থিত হতে পারেননি, তারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে শাহাদাত বরণের অধীর অপেক্ষায় থাকেন। তাই তারা উহুদের সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না।
৪। অনেক সাহাবি মনে করেন, কুরাইশদের মাদীনা অবরোধ করতে দেওয়াটা তাদের জন্য একপ্রকার বিজয়। কাফিরদের এই স্বপ্ন পূরণ হতে দেওয়া যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে এ আশঙ্কাও তারা করেন যে, পাছে অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়ে মাদীনার রসদব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সাধারণ জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়বে।

মাদীনায় থেকে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের পক্ষে মত প্রদানকারীদের যুক্তি
১। মাক্কার শত্রুবাহিনী একতাবদ্ধ কোনো দল নয় যে, তারা দীর্ঘকাল মাদীনা অবরোধ করে রাখতে পারবে না। আজ নয় কাল, তিক্ত মতবিরোধের ফলে তাদের মাঝে ফাটল ধরবেই।
২। কোনো সুরক্ষিত শহরের নিরাপদ জলাধার, দুর্গ ও অভ্যন্তর গলিয়ে সেখানে আক্রমণ করাটা দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিশেষত, যখন পক্ষ-প্রতিপক্ষ উভয়ের সামরিক সক্ষমতা সমান হয়। ঘটনাক্রমে উহুদ প্রেক্ষাপটে মাক্কা ও মাদীনার সামরিক সক্ষমতা সমান সমান ছিল।
৩। আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার হলো—যোদ্ধারা যখন পরিবার-পরিবেষ্টিত থাকে, তখন আপনজন, সন্তানসন্ততি, নারী ও সম্পদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তখন প্রাণপণ লড়াই করে।
৪। যুদ্ধে নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণের কারণে যোদ্ধাদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
৫। প্রতিরোধকারীগণ পাথর ও এ জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করলে শত্রুদের মনে আতঙ্ক ঢুকে যাবে। এতে শত্রুদের ঘায়েল করা খুব সহজ হবে।

স্পষ্টতই সাহাবিদের নির্দ্বিধায় মতপ্রকাশের প্রশিক্ষণ দেন রাসূল ﷺ। এমনকি রাসূলের মতের অমিল হলেও স্বাধীনভাবে মত দিতে পারতেন তারা। সাধারণ ও জাতীয় সমস্যা সমাধানে যোগ্য করে তুলতেই—ওয়াহির প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছিল না, এমন বিষয়ে—রাসূল তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। তারাও স্বাধীনভাবে মত দিতেন। কারণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া পরামর্শ করার কোনো মানে হয় না। কারও চিন্তাভাবনা ও মতপ্রদানে ভুল হলে রাসূল কখনো তাকে তিরস্কার করতেন না। কেননা, পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ইমাম—অর্থাৎ নেতার। আর এ ক্ষেত্রে কুরআনের দিক-নির্দেশ গ্রহণ করতেন রাসূল। পরামর্শ ও মতবিনিময়ের আদবকেতা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলে। যদি তুমি রূঢ় ও কঠিনহৃদয় হতে, তাহলে অবশ্যই তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে যেত। তুমি তাদের মাফ করে দাও, তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করো এবং কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো। আর যখন কিছু করার জন্য সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। আল্লাহ (তাঁর ওপর) ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৯]
উম্মাহকে পরামর্শব্যবস্থায় অভ্যস্ত করার জন্য রাসূল তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করতেন। এ ঘটনা থেকে সাহাবিদের রাজনৈতিক রক্ষণশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। নেতার মতের ওপর মত প্রদান করা জরুরি না, তার পরও পরামর্শের শিষ্টাচারের জন্য তারা মত দেন। নিজেদের মত বাদ দিয়ে নেতার মতেই সন্তুষ্ট থাকা তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। তাই গরিষ্ঠ সাহাবি ও রাসূলের সিদ্ধান্তে তারা আর কোনো দ্বিমত করেননি। সকলেই মাদীনার বাইরে গিয়ে খুশি মনে যুদ্ধ করতে রাজি হন। এসব কিছুর মাঝে তাদের একটি গভীর শিক্ষা দান করেন রাসূল; তা হলো, সফল নেতৃত্ব মানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আর কোনো নড়চড় নেই। এবার একনিষ্ঠভাবে তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় অধীনদের মাঝে হতাশা, হীনম্মন্যতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
সবশেষে রাসূল মাদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার দৃঢ় ঘোষণা দেন। তাঁর ঘোষণা পেয়ে সাহাবিরা যুদ্ধের সাজ গ্রহণ করেন। রাসূল মাদীনার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার আদেশ দেন। মুহাম্মাদ বিন মাসলামার নেতৃত্বে পঞ্চাশজন বীর সেনা নিযুক্ত করেন তিনি। এদিকে সাহাবিগণ রাসূলকে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। শুক্রবার রাতে একদল জানবাজ নিয়ে মাসজিদে নাবাওয়ির দরজায় রাসূলকে সশস্ত্র পাহারা দেন সা'দ বিন মু'আয, উসাইদ বিন হুযাইর ও সা'দ বিন উবাদা। [৫০৪]

উহুদের উদ্দেশে মুসলিম বাহিনীর যাত্রা
শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাসূল কয়েকটি বিষয়ের প্রতি খুব গুরুত্ব দেন, যেমন: উপযুক্ত সময়, সঠিক রাস্তা ও সুপরিকল্পনা ইত্যাদি। সাধারণত মধ্যরাতে যুদ্ধযাত্রা শুরু করতেন তিনি। কারণ, এ সময় আবহাওয়া শান্ত থাকে। লোকজনের চলাচল কম থাকে। সাধারণত শত্রুরা ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে থাকে। আর এটা জানা কথা যে, ক্লান্তির পর ঘুম হয় গভীর। তাই কোনো শব্দ বা ভারী নড়াচড়াও তারা শুনতে পায় না। ওয়াকিদি বলেন, নৈশযাত্রায় রাসূল প্রথমাংশে ঘুমাতেন আর দ্বিতীয়াংশে যাত্রা শুরু করতেন। প্রত্যুষে পথ-দেখিয়েদের ডেকে একত্র করে সফরে বের হতেন। উহুদ প্রান্তরের উদ্দেশে তিনি গোপন পথ ধরে এগিয়ে যান। যুদ্ধযাত্রায় গোপনীয়তা রক্ষা করা তাঁর অন্যতম কৌশল ছিল; এমনকি সৈন্যদের চলার পথও তিনি গোপন রাখতেন, যেন মুসলিমদের গতিবিধি ও অবস্থা জানতে না পারে তারা।
এ সময় রাসূল তাঁর সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন, কে পারবে আমাদের অত্যন্ত গোপন পথে রণাঙ্গনে পৌঁছাতে? আবু খাইসামা বলেন, আমি পারব রাসূল! তাঁকে নিয়ে তিনি বনু হারিসার প্রস্তরময় এলাকা ও তাদের ধনসম্পদের কাছাকাছি পৌঁছান। যেতে যেতে অন্ধ মুনাফিক মুরাব্বা বিন কাইযির বাগানের ভেতর দিয়ে পথ ধরেন। রাসূল ও সাহাবিদের উপস্থিতি টের পেয়ে সে তাদের দিকে ধূলি মেরে ভর্ৎসনা করে বলে, আপনি যদি মুহাম্মাদ হন, তাহলে আমার প্রাচীরের ভেতর আপনাকে ঢুকতে দেবো না। সাহাবিদের সূত্রে জানা যায়, সে নাকি বলেছিল—আল্লাহর শপথ হে মুহাম্মাদ, আমি যদি চোখে দেখে ছুড়তে পারতাম, তাহলে এই ধূলি আপনার মুখেই মারতাম। লোকজন ক্ষীপ্ত হয়ে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তাদের শান্ত করে রাসূল বলেন, ওকে মেরো না। ওর চোখ ও হৃদয় উভয়টাই অন্ধ। রাসূলের বারণের আগেই বনু আসহালের ভাই সা'দ বিন যাইদ ধনুক দিয়ে বাড়ি মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দেন।
ঘন ঝোঁপ ও বাগানের ভেতর দিয়ে রাসূলের যাত্রাপথ নির্ধারণ দেখে বোঝা যায়, তিনি যুদ্ধের সফরে কতটা গোপনীয়তা ও গভীর সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কারণ, এখানে অসতর্ক হলে শত্রুপক্ষ মুসলিমদের লোকবল ও অস্ত্রবল পরিমাপ করে ফেলবে। প্রতিপক্ষকে কখনো অভ্যন্তরীণ গোপন বিষয় টের পেতে দেওয়া যাবে না। এর মাধ্যমে উম্মাহকে রাসূল শেখাতে চেয়েছেন যে, স্থান ও কাল বিবেচনা করে অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় তথ্যের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা করে মোকাবিলায় নামবে শত্রুপক্ষ। ফলে সেনাবিন্যাস ও সকল প্রস্তুতি ভেস্তে যাবে।
রাসূলের এ ঘটনা থেকে আমরা একটি শিক্ষা পাই যে, ব্যক্তিস্বার্থ ও গণস্বার্থে বিরোধ হলে গণস্বার্থকে প্রধান্য দিতে হবে। তাই মুনাফিক মুরাব্বা বিন কাইযির ফসলি জমির ওপর দিয়েই সাহাবিদের যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি; যদিও এতে তার ফসলের ক্ষতি হয়; কিন্তু এতে সাহাবিদের উহুদ রণাঙ্গনে যাওয়ার দূরত্ব কমে যায়। এই ঘটনায় রাসূল স্পষ্ট করে বলেন, সকল স্বার্থের ওপর দীনের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষের কল্যাণের জন্য শারী'আর উদ্দেশ্যসমূহ অত্যন্ত সুচারুরূপে সাজিয়েছেন; তাই প্রথমে এনেছেন দীনের সংরক্ষণের বিষয়; তারপর প্রাণ, বিবেক, বংশ ও সম্পদের বিষয় এনেছেন। দীনের মৌলিক পাঁচটি বিষয়ের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এই বিষয়গুলো গুরুত্বের বিচারে পর্যায়ক্রমে আনা হয়েছে। প্রথমে দীনের অবস্থান, তারপর প্রাণ, বিবেক, বংশ ও সম্পদ; তাই বিরোধকালে দীন রক্ষায় সহায়ক প্রাণ রক্ষায় সহায়কের ওপর প্রাধান্য পাবে, প্রাণ রক্ষায় সহায়ক বিবেক রক্ষায় সহায়কের ওপর প্রাধান্য পাবে, বংশ রক্ষায় সহায়ক সম্পদ রক্ষায় সহায়কের ওপর প্রাধান্য পাবে। শারী'আর উদ্দেশ্যসমূহের এই ধারাবাহিকতার ব্যাপারে আলিমগণ একমত। [৫০৫]

এক তৃতিয়াংশ সৈন্য নিয়ে 'আবদুল্লাহ বিন উবাইর পশ্চাদপসরণ
শাওয়াত বাগান এলাকায় পৌঁছার পর মুসলিমদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে 'আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালূল। তার এক তৃতীয়াংশ মুনাফিক সৈন্য নিয়ে সে চলে যায়। তার মতে এ যাত্রায় মুশরিকদের সঙ্গে কোনো লড়াই হবে না। আর মাদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে সে একমতও নয়। তার অভিযোগ— ইঁচড়েপাকা ছেলেদের কথামতো মাদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করা হচ্ছে; আমার মতের তোয়াক্কা না করে তাদের মতের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে; কীসের ওপর ভরসা করে আমরা আত্মহুতি দিতে যাব!
তবে এই রণেভঙ্গের পেছনে তার গোপন মতলব ছিল, ইসলামি সেনাবাহিনীতে উদ্বেগ ও উৎকঠা ছাড়ানো, যেন মানসিকভাবে তারা ভেঙে পড়ে আর শত্রুরা এর সুযোগ নিয়ে রসদ সঞ্চয় করে। তার এই কুকর্ম একপ্রকার গাদ্দারি এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতার নামান্তর। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন, মুসলিম বাহিনীকে পরীক্ষায় ফেলে ভালো-মন্দের যাচাই করতে, যেন প্রকৃত মুসলিম ও স্বার্থলোভীর মাঝে ব্যবধান হয়ে যায় এবং মু'মিন আর মুনাফিক পৃথক হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন— শিষ্ট থেকে দুষ্টকে পৃথক না করা পর্যন্ত আল্লাহ মু'মিনদের তোমাদের (বর্তমান) অবস্থায় রাখবেন না। আল্লাহ তোমাদের গায়েব সম্বন্ধেও অবহিত করবেন না। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭৯] কুরআনুল কারীমে মুনাফিকদের কাপুরুষতা ও হীনম্মন্যতা বিবৃত হওয়ার পূর্বেই নানা কুকীর্তির কারণে জনসম্মুখে তাদের গোমর ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। [৫০৬]

বনু সালামা ও বনু হারিসা
উবাই ইবনু সালুল তার অনুচরদের নিয়ে পিছুটানের পর বনু সালামা ও বনু হারিসাও ফিরে যেতে মনস্থির করে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের দৃঢ়পদ ও অবিচল রাখেন। জাবির ইবনু 'আবদিল্লাহ বলেন, এই আয়াত নাযিল হয়েছে আমাদের সম্পর্কে—আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমাদের মধ্যে দুটি দল (বনু সালামা ও বনু হারিসা) যখন সাহস হারিয়ে ফেলার পড়ার উপক্রম হয়েছিল, যতক্ষণ না আয়াতের এই অংশ—আর আল্লাহই তাদের অভিভাবক—নাযিল হয়েছে আমার মনে হচ্ছিল, আহ! আয়াতটি যদি নাযিলই না হতো। [৫০৭]
মুনাফিকদের অবস্থান মুসলিমদের এই দুই দলের মাঝে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। তারা মাদীনায় ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন; কিন্তু আল্লাহ তাদের অভিভাবক ঘোষণার পর তারা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠেন, প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হন, অবিচল থাকেন মুসলিমদের সঙ্গে। উবাই ইবনু সালূলের এই অবস্থানের ওপর সাহাবিদের মাঝে দুটি মত প্রকাশ পায়; একদল বলছিলেন—সৈন্যদলের মাঝে ফাটল সৃষ্টির কারণে প্রস্থানকারী মুনাফিকদের হত্যা করা হবে; অন্যরা বলছিলেন—তাদের হত্যা করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ কুরআনে এ দু-দলের অবস্থানের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন [৫০৮], তোমাদের কী হলো—মুনাফিকদের ব্যাপারে তোমরা দু-দলে বিভক্ত হলে! অথচ আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে ভ্রষ্ট করেছেন, তোমরা কি তাকে হিদায়াত দিতে চাচ্ছ? আল্লাহ যাকে বিচ্যুত করেন, তুমি তার জন্য কোনো পথ পাবে না। [সূরা নিসা, ৪:৮৮]

অমুসলিমদের থেকে সাহায্য গ্রহণে নবিজি
শাইখাইন নামক স্থানে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটা বাহিনী দেখতে পেলেন। তারা খুব হাঁকডাক ছেড়ে সামরিক কসরত প্রদর্শন করছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? সাহাবিরা বললেন, এরা ইয়াহুদি। উবাই ইবনু সালুলের মিত্রলোক। রাসূল বললেন, মুশরিকদের বিরুদ্ধে আমরা কোনো মুশরিকের সাহায্য নিতে চাই না। নবিজি এখানে একটা মূলনীতি বর্ণনা করেছেন; তা হলো—ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্যের দিকে ঝুঁকে না পড়া। [৫০৯]

অল্পবয়স্ক সাহাবিদের ফিরিয়ে দেওয়া
বয়স কম হওয়ার কারণে শাইখাইন নামক স্থান থেকে আল্লাহর রাসূল কিশোরদের একটি দল ফিরিয়ে দেন। তাদের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। অনেকের বয়স এর চেয়েও কম। এই অল্প বয়েসি জানবাজদের কয়েকজন হলেন—'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার, যাইদ ইবনু সাবিত, উসামা ইবনু যাইদ, যাইদ বিন আরকাম, বারা ইবনু আযিব, আবু সাঈদ খুদরি। ছোট হওয়ার কারণে সুযোগ না পাওয়াদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ জন।
রাফি' ইবনু খাদীজের ব্যাপারে যখন বলা হলো, তিনি দক্ষ তিরন্দাজ, তখন তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। এই খবর সামুরা ইবনু জুনদূবের কাছে পৌঁছালে তিনি দৌড়ে বাবা মুররা বিন সিনানের কাছে ছুটে যান—ইনি ছিলেন আবু সাঈদ খুদরির চাচা। সামুরা তার কাছে কেঁদে কেঁদে বলেন, বাবা, রাসূলুল্লাহ রাফি'কে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু আমাকে দেননি। অথচ আমি ওকে কুপোকাত করতে পারি। মুররা বিন সিনান তখনই নবিজির কাছে এলেন। খুলে বললেন সবকিছু। রাসূল রাফি' ও সামুরাকে কুস্তি লড়তে বললেন। লড়াই শুরু হলো। অল্প সময়ের মাঝে সামুরা রাফি'কে ভূপাতিত করলেন। এরপর রাসূল সামুরাকেও যুদ্ধের অনুমতি দেন।
নবিজি-এর সমরাভিজ্ঞতা, নেতৃত্বে নিখুঁত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার দীপায়িত প্রকাশ ঘটেছে এখানে। সে সময় ছোটদের মাঝে জিহাদের অদম্য আগ্রহ ছিল; কিন্তু তিনি তাদের মধ্য থেকে শুধু রাফি' ও সামুরাকেই তাদের শক্তি পরীক্ষা করে সেনাবাহিনীতে সুযোগ দিয়েছেন—বাকিদের ফিরিয়ে দিন। কারণ, তিনি আশঙ্কা করেছেন—তরবারি, বর্ষা বা তিরের আঘাত তারা সহ্য করতে পারবে না, আঘাতে আতঙ্কিত হয়ে যাবে। যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করলে বেছে নিতে পারে পলায়নের পথ। ফলে মুসলিমদের সৈন্যব্যূহে ফাটল সৃষ্টি হবে, ভাঙতে পারে মনোবল। এতে বিপর্যয় সৃষ্টি হবার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

টিকাঃ
৫০১. তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩৪১
৫০২. ফাতহুল কাদীর, ৩০৯
৫০৩. আল-মাগাযি, ওয়াকিদি, ১/২০৪
৫০৪. গাযওয়াতু উহুদ, আবু ফারিস, পৃ. ৩৪, ৩৫
৫০৫. আল-মাকাসিদুল আম্মাহ লিশ-শারীআহ, ইউসুফ হামিদ, পৃ. ১৬৬
৫০৬. মারউয়্যাতু গাযওয়াতি উহুদ, হুসাইন আহমাদ, পৃ. ৭১
৫০৭. বুখারি, হাদীস নং ৪০৫১
৫০৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ৩/ ৩৮২
৫০৯. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, মুহাম্মাদ উরজন, ৩/৫৬১

📘 রউফুর রহীম 📄 রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুদ্ধপরিকল্পনা

📄 রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুদ্ধপরিকল্পনা


সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার চিত্র
কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ বহুমুখী কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উপযুক্ত স্থান বেছে নেন। নির্বাচন করেন যুদ্ধবাজ সাহাবিদের, অনুপযুক্তদের অব্যাহতি দেন। ৫০ জন সাহাবির একটি তিরন্দাজ বাহিনী গঠন করেন। বিশেষ দিক-নির্দেশনা দিয়ে তাদের কাজ বুঝিয়ে দেন। পদাতিক বাহিনীকে তিনভাগে ভাগ করেন। প্রত্যেক দলের জন্য নির্ধারণ করেন একজন করে পতাকাবাহী কমান্ডার।
পদাতিক বাহিনীর তিনটি অংশ ছিল— ১. মুহাজির বাহিনী—তাদের পতাকা দেওয়া হয় মুস'আব ইবনু উমাইরের হাতে; ২. আনসারি আওস বাহিনী—উসাইদ ইবনু হুজাইরকে দেওয়া হয় এই দলের পতাকা; ৩. আনসারি খাযরাজ বাহিনী—হুবাব বিন মুনজির এদের পতাকা বহন করেন। [৫১০]

উদ্দীপনা সৃষ্টিমূলক নীতি
রাসূলে কারিম ﷺ-এর নীতি ছিল তিনি সাহাবিদের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। রণাঙ্গনেও শিক্ষা দিতেন সবরের, যেন অভ্যন্তরীণ তাকওয়া অর্জিত হয়, শত্রুর সাক্ষাতে যেন ভড়কে না পড়তে হয়। উহুদ যুদ্ধে নবিজির কর্মতৎপরতার বর্ণনা করতে গিয়ে ওয়াকিদি বলেন, রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন—প্রিয় আল্লাহর সেনাদল, আমি তোমাদের সেই উপদেশ দেবো, যা কুরআনে আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। তাঁর আনুগত্যে আমল করবে, হারাম থেকে বেঁচে থাকবে; তোমরা আজ প্রতিদান ও সঞ্চিত নিয়ামাতের মানযিলে দাঁড়িয়ে আছ—যে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের পথে, চলেছে কঠোর পরিশ্রম ও উদ্যমী হয়ে। জিহাদ একটি দৃঢ় সংকল্পের ব্যাপার, খুব অল্প মানুষ রণাঙ্গনে অটল থাকতে পারে। অবিচল থাকতে পারে সে-ই, আল্লাহ যাকে স্থিরচিত্ত রাখেন। আল্লাহ তারই সাহায্যে থাকেন, যে তাঁর আনুগত্য করে। আল্লাহর যে অবাধ্য হয়, শয়তান হয়ে যায় তার সহযোগী। তোমরা জিহাদের সূচনা করো অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতার মাধ্যমে, অর্জন করো আল্লাহর প্রতিশ্রুত প্রতিদান। আমি তোমাদের সরলতায় পরম আগ্রহী। মতানৈক্য বিভেদ ও নিজেদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি অক্ষমতা ডেকে আনে, চলে আসে দুর্বলতা, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না—এতে সাহায্য ও বিজয় অর্জনে ব্যত্যয় ঘটে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাব্যূহ
মুসলিম বাহিনীর সুরক্ষায় রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদ পাহাড়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই সাহাবিরা যখন উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে, তখন তিনি পাহাড়কে বাহিনীর পশ্চাদমুখী করেন, তারা হন মাদীনার অভিমুখী। তিনি 'আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইরের নেতৃত্বে ৫০ জন সৈন্যের একটি তিরন্দাজ বাহিনী গঠন করেন, তাদের আইনাইন পর্বতের ওপরে উহুদের অভিমুখী হয়ে অবস্থান নিতে বলেন। এই তিরন্দাজ প্রতিরক্ষা বাহিনীর দায়িত্ব ছিল, মুশরিকদের আকস্মিক আক্রমণ প্রতিহত করবে।
বিশেষভাবে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, খবরদার! তোমরা আমাদের বিজয়ী হতে দেখলেও এখান থেকে সরবে না; তাদের আমাদের ওপর বিজয়ী হতে দেখলেও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। [৫১১] সৈন্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করবে না। লড়াই শুরু করবে না, যতক্ষণ না আদেশ করি। তিরন্দাজ বাহিনীর আমীরকে বলেন, বর্শা দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনীর প্রতিরক্ষায় থাকবে তুমি। পেছন থেকে শত্রু যেন আমাদের আক্রমণ করতে না পারে। জয়-পরাজয় যা-ই ঘটুক, তোমার স্থানে অটল থাকবে। তিরন্দাজদের উদ্দেশে বলেন, বজ্র শক্তিতে তোমাদের স্থান ধরে রাখবে, এখান থেকে সরবে না। যদি দেখো, আমরা তাদের ওপর বিজয়ী হয়েছি, এমনকি সৈন্যব্যূহ ভেদ করেছি, তবুও তোমাদের স্থান থেকে পৃথক হবে না। আমাদের পরাজিত হতে দেখলেও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। পশ্চাদাক্রমণকারীকে বর্শা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করবে—কেননা ঘোড়া বর্শার চেয়ে দ্রুতগামী নয়। আমরা ততক্ষণ বিজয়ী থাকব, যতক্ষণ তোমরা নিজেদের স্থানে অটল থাকবে। হে আল্লাহ, তোমাকে তাদের ওপর সাক্ষী রাখছি। মুসলিমরা উঁচু স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। কাফির বাহিনীর জন্য রেখে দেন উপত্যকার উন্মুক্ত প্রান্তর, যেন তাদের চেহারা থাকে উহুদের দিকে আর পেছনে থাকে মাদীনা। তিরন্দাজদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল—পেছন থেকে মুসলিমদের রক্ষা করা, সেদিক থেকে আসা অশ্বারোহী বাহিনী প্রতিহত করা।

সেনাবিন্যাস
সালাতের মতো সারিবদ্ধ হয়ে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবিরা এগিয়ে আসেন। নবিজি হেঁটে হেঁটে সব সারি সোজা করে দেন। এ সময় সবার স্থান নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেন, অমুক, এগিয়ে এসো, আর এই যে তুমি পিছিয়ে যাও। এভাবে সবাইকে সারিবদ্ধ করেন। প্রথম সারিতে শক্তিধর লোকদের স্থান দেন, যেন পেছনের যোদ্ধাদের জন্য তারা রাস্তা করে দিতে পারেন। রাসূল সেদিন এই পদ্ধতি অবলম্বন করে শত্রুর বিরুদ্ধে অভিজ্ঞ রণকৌশলের পরিচয় দেন।

টিকাঃ
৫১০. গাযওয়াতু উহুদ : দিরাসাতুন দা'উয়্যাতুন, পৃ. ৮৯
৫১১. বুখারি, হাদীস নং ৪০৪৩

📘 রউফুর রহীম 📄 শুরু হলো যুদ্ধ

📄 শুরু হলো যুদ্ধ


তুমুল যুদ্ধ
আবু সুফিয়ান যুদ্ধের শুরুতে সুদৃঢ় মুসলিম শিবিরে ফাটল সৃষ্টির জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। এ লক্ষ্যেই সে আনসারদের কাছে লোক পাঠিয়ে বলে, আমাদের ও আমাদের চাচাতো ভাইদের মাঝ থেকে সরে দাঁড়াও। আমাদের লড়াইয়ের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। আনসার সাহাবিরা তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। প্রথম আলোচনায় ব্যর্থ হয়ে তারা মাদীনাবাসীর মধ্য থেকে একজনকে প্রতারক তৈরির পথ বেছে নেয়। এ কাজের জন্য কুরাইশরা নির্বাচন করে আবু আমির রাহিবকে। সে কিছু আনসার সাহাবিকে স্খলিত করার ফন্দি আঁটে; কিন্তু সে জানত না, তার জন্য লাঞ্চনাকর কিছু অপেক্ষা করছে। সে আনসার সাহাবিদের সামনে গিয়ে বলল, হে আউস সম্প্রদায়, আমাকে তো তোমরা চেনো! আমি আবু আমির। তার কথা শেষ না হতেই আনসার সাহাবিরা বললেন, ওরে ফাসিক, গুপ্তচর হিসেবে তুই খুবই নিকৃষ্ট। আনসারিদের এই প্রত্যুত্তর শুনে সে বলল, আমার পরে আমার জাতির লোকেরা যে অনিষ্টের পথে চলবে, তা একদম ঠিক। এরপর সে তাদের সঙ্গে তীব্র লড়াই শুরু করে দেয় এবং পাথর ছুঁড়ে মারতে থাকে।
দেখতে দেখতে 'আলি ইবনু আবি তালিব ও মুশরিকদের পতাকাবাহী তালহা বিন উসমানের মল্লযুদ্ধের মধ্য দিয়ে লড়াই শুরু হয়। আস-সীরাতুল হালিবিয়্যাহর গ্রন্থকার বলেন, মুশরিকদের সেনাসারি থেকে তালহা বিন উসমান বেরিয়ে এসে কয়েকবার মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানায়। মুসলিম বাহিনীতে তখন নীরবতা। সাহাবিদের কেউ তার দিকে এগিয়ে এলেন না। তালহার সাহস বেড়ে যায়। বুক ফুলিয়ে বলতে থাকে, মুহাম্মাদের সাথিরা, তোমরা তো মনে করো, আল্লাহ খুব দ্রুত তোমাদের তরবারি দিয়ে আমাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং আমাদের তরবারি দ্বারা তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তোমাদের মাঝে কেউ কি আছে আমাকে তার তরবারি দিয়ে জাহান্নামে পাঠাবে, কিংবা আমি তাকে তরবারি দিয়ে তার জান্নাতকে ত্বরান্বিত করব? 'আলি তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ আমার তরবারি দ্বারা তোমার জাহান্নামকে ত্বরান্বিত করা কিংবা তোমার তরবারি দ্বারা আমার জান্নাতকে ত্বরান্বিত করার আগে আমি ক্ষান্ত হব না। বলা শেষ না হতেই 'আলি তাকে আঘাত করে পা কেটে দেন। তালহা মাটিতে পড়ে যায়, উন্মুক্ত হয় তার লজ্জাস্থান। তালহা বলে ওঠে, আমার ভাই, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে দয়া করো। 'আলি তাকে আর আক্রমণ না করে ফিরে আসেন। রাসূলুল্লাহ তাকবীর বলে ওঠেন। কিছু সাহাবি 'আলিকে বলেন, তাকে শেষ করলে না কেনো? 'আলি বললেন, তার লজ্জাস্থান প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর সে অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছে; ফলে তাকে আঘাত করতে আমি লজ্জাবোধ করছিলাম।
উভয় দলের মাঝে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। ওদিকে রাসূলুল্লাহ চেতনা-উদ্দীপক কথায় সাহাবিদের রক্তে জিহাদের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিজের তরবারি জুলফিকার উঁচিয়ে ধরে তিনি বললেন, এটি আমার কাছ থেকে নেওয়ার মতো কেউ কি আছে? উপস্থিত সাহাবিরা একসঙ্গে হাত বাড়িয়ে দেন। প্রত্যেকেই বলছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি নেব। একটা তরবারি তো সবাইকে দেওয়া যায় না। যেকোনো একজনের হাতে শোভা পাবে এটি। সেই কাঙ্ক্ষিত বীরকে খুঁজে নিতে রাসূল বললেন, কে আছে এটির হক আদায় করতে পারবে? সবার মাঝে নীরবতা নেমে আসে। সবার মাঝখান থেকে সিমাক বিন খারশা এগিয়ে এসে বললেন, এটির হক আমি আদায় করতে পারব। [৫১২] তিনি ছিলেন বীর, যুদ্ধের সময় দম্ভ প্রকাশ করতেন, অহংকারীর মতো হাঁটতেন। আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে তরবারি নিয়ে শত্রু-সৈন্যের সারিতে ঢুকে পড়েন তিনি। মুশরিকদের ব্যূহ ভেদ করে সামনে এগোচ্ছিলেন বীরবিক্রমে। রাসূল তার দম্ভের চিত্র দেখে বললেন, তার এই চলনভঙ্গি আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করবে—তবে রণাঙ্গনের ক্ষেত্রটা ভিন্ন।
যুবাইর ইবনুল আওয়াম উহুদের দিনে আবু দুযানা সিমাক বিন খারশার বীরত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রথমে আমি তরবারি চেয়েছিলাম; কিন্তু তিনি আমাকে না দিয়ে আবু দুযানার হাতে তুলে দিলেন। আমি একটু কষ্ট পেলাম। মনে মনে বললাম, আমি ইবনু সাহিয়্যা, কুরাইশের বীর। আল্লাহর কসম, আমি দেখে নেব আবু দুযানা কী করে? আমি তার পিছু নিলাম। দেখলাম—তিনি একটা লাল কাপড় বের করে তা মাথায় বাঁধলেন। আনসার সাহাবিরা বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, আরে দেখছ, আবু দুযানা তো মাথায় মৃত্যুকাপড় বেঁধে নিয়েছে! আবু দুযানা রক্তে আগুন জ্বলা জ্বালাময়ী একটা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে সামনে এগোচ্ছিলেন—
আমি পরম বন্ধুর সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছি;
আমরা তো তরবারি দিয়ে শত্রুকে কুপোকাত করি।
আমি শেয়ালের মতো হাজার বছর বাঁচতে আসিনি—
এসেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তরবারি দিয়ে সিংহের মতো লড়তে...

সামনে যাকেই পাচ্ছিলেন, তার গর্দান কেটে ফেলছিলেন। মুশরিকদের এক ব্যক্তি আহত কোনো মুসলিমকে দেখলেই তার ওপর আক্রমণ করে বসছিল। আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করছিলাম, এরা যদি মুখোমুখি হতো? বলতে না বলতে তাদের সাক্ষাৎ হলো। কয়েকবার চলল ঘাত-প্রতিঘাত। ওই মুশরিক আবু দুযানাকে লক্ষ্য করে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানল। আবু দুযানা চামড়ার তৈরি ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করলেন। তরবারি তাতেই আটকে যায়। এই সুযোগে আবু দুযানা তার ওপর তরবারি চালিয়ে যবনিকাপাত ঘটান।
এরপর দেখলাম আবু দুযানা তরবারি উঁচিয়ে হিন্দা বিনতে উতবার সিঁথি বরাবর তরবারি রাখলেন। কী মনে করে আবার তা সরিয়ে নিলেন। বললাম—আল্লাহই ভালো জানেন, কী মনে করে সরিয়ে নিলেন। আবু ইসহাকের বর্ণনায় এসেছে—আবু দুযানা বলেছেন, আমি দেখলাম, এক ব্যক্তি লোকদের ভীষণভাবে উত্তেজিত করছে। আমি তাকে টার্গেট করলাম। যখন তাকে লক্ষ্য করে তরবারি উঠালাম, দেখি—সে এক নারী! তখন এক নারীকে হত্যা করা থেকে আমি আল্লাহর রাসূলের তরবারিকে সম্মানিত করলাম।

তিরন্দাজ বাহিনীর স্থান ত্যাগ
মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুসলিমরা চোখ ধাঁধানো বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল—শাহাদাত, শাহাদাত! ইতিহাস হামযা ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব, মুস'আব বিন উমাইর, আবু দুযানা, আবু তালহা আনসারি, সাঈদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস প্রমুখ বীরদের বীরত্বগাথা উল্লেখ করেছে নিষ্ঠার সঙ্গে। প্রথমে মুসলিমরা তো বিজয় লাভ করেছিলেন; এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
তোমাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তোমরা তার অনুমতিতে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলে; তবে যখন তোমরা দুর্বলতা দেখালে, জড়িয়ে পড়লে বিবাদে, আমি তোমাদের পছন্দনীয় জিনিস দেখানোর পর তোমরা ভুল করলে; তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া প্রার্থনা করছিল, আবার কেউ আখিরাত। এরপর আল্লাহ পরীক্ষা করার জন্য তোমাদের তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন, অবশ্য তিনি তোমাদের ক্ষমাও করে দিয়েছেন; নিশ্চয় আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল। [সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫২]
তিরন্দাজ বাহিনী দেখল, মুশরিকরা মুসলিমদের ক্ষীপ্রতার সামনে টিকতে না পেরে পলায়ন করছে, রণাঙ্গনে পড়ে আছে গানীমাতের সম্পদ—ব্যাপারটি তাদের স্থান ত্যাগের মন্ত্রণা দেয়। তারা মনে করেছিলেন, যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে। ফলে তারা আমীর 'আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর-কে বললেন, গানীমাত, বন্ধুরা গানীমাত! তোমাদের সাথিরা জয় লাভ করেছে, তাই আর অপেক্ষা কীসের? 'আবদুল্লাহ বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রাসূলের নির্দেশের কথা ভুলে গেছ? তারা বললেন, আরে, লোকজন তাদের অংশ নিয়ে নিচ্ছে, আমরা বসে থাকব কেন? [৫১৩] আমীরের কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে তারা গানীমাতের সম্পদ লুফে নিতে নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করে ময়দানে চলে আসে। তিরন্দাজ বাহিনীর এ অবস্থার কথা বিখ্যাত সাহাবি 'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, মুশরিক বাহিনীর পলায়নের পর নবি যখন গানীমাতের সম্পদ লাভ করেন, তখন তিরন্দাজ বাহিনীর সবাই মূল বাহিনীর মাঝে ঢুকে পড়ে—এরই মাঝে সাহাবিদের সারিগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। তারা যুদ্ধ শেষ ভেবে লড়াই থেকে হাত অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ওদিকে তিরন্দাজদের স্থান খালি পেয়ে মুশরিকদের একটা অশ্বারোহী বাহিনী মুসলিমদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অযাচিত এই আক্রমণে মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তারা ভুলক্রমে নিজেরা নিজেদের অনেককে হত্যা করে ফেলে। মুসলিমদের বহু লোক সেদিন শাহাদাত বরণ করেন। [৫১৪] খালিদ বিন ওয়ালিদ তখনো মুশরিক। উহুদ যুদ্ধে ছিলেন একটা ঝটিকা দলের কমান্ডার। মুসলিম তিরন্দাজ বাহিনীর অনুপস্থিতির এই সুযোগ তিনিই কাজে লাগান।

পলায়নরত মুশরিকরা এই দৃশ্য দেখে নতুন করে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে, মুসলিমদের দুদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলে। মুসলিমরা হারিয়ে ফেলেন প্রাথমিক অবস্থান। তারা বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। যুদ্ধের এই পটে এসে তাদের মাঝে ছিল না কোনো শৃঙ্খলা বা ঐক্য। তারা শত্রু-মিত্রের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারছিলেন না। ভুল করে হুজাইফা নিজের বাবা ইয়ামানকেই হত্যা করে ফেলেন। একের পর এক শহিদের লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে। রাসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সবাই। বিপর্যস্ত এই সময়ে এ কথাও প্রচারিত হয়—তিনি নিহত হয়েছেন। সৃষ্টি হয় তীব্র বিশৃঙ্খলা, উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র। মুশরিকরা যেকোনো মুসলিমকে দেখলেই হত্যা করছিল। রাসূল পর্যন্ত পৌঁছাতে চেষ্টা করছিল প্রাণান্তকর। সাহাবিদের প্রতিরোধব্যূহ ভেদ করে সামনে এগোনো সম্ভব না হওয়ায় ওরা নবিজির দিকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। একটা পাথর লেগে তাঁর নাক ফেটে যায়, ভেঙে যায় পাটির দুটি দাঁত। তাঁর চেহারায় আঘাত করা হলে কেটে গিয়ে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হয়।
আনাস বলেন, উহুদের দিন নবিজির দাঁত মুবারাক ভেঙে যায়। মাথায় আঘাত করা হয়। নির্গত রক্ত মুছে তিনি বলছিলেন, সেই জাতি কীভাবে সফল হবে, যারা তাদের নবিকে আঘাত করে, তার দাঁত ভেঙে দেয়, অথচ তিনি তাদের আল্লাহর দিকে ডাকেন? এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে আপনার কিছু করার নেই, তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন অথবা তাদের শাস্তি দেবেন, নিশ্চয় তারা জালিম। [সূরা আলে ইমরান: ১২৮]

চেহারা ও গড়নে মুস'আব বিন উমাইর ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। ইবনু কুম'আহ তাকে হত্যা করে কুরাইশদের উদ্দেশে বলতে থাকে, আমার স্বজাতির লোকেরা, শুনছ? আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করেছি! সবখানে বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে মুহাম্মাদ নিহত হয়েছেন। এই সংবাদ শুনে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অনেকেই মাদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। একটি দল পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেয়। বিপর্যস্ত এক করুণ অবস্থা গ্রাস করে নেয় সবাইকে। তারা ভাবতে পারছিলেন না, এমন নাজুক পরিস্থিতিতে কী করবেন? ফলে মুসলিমদের একটি দল যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে সরে যায়। কেউ কেউ অস্ত্র রেখে এক প্রান্তে গিয়ে বসে পড়ে। কিছু সাহাবি ছিলেন, যারা আল্লাহ্র রাসূলের মৃত্যু সংবাদ শুনেও শাহাদাতের নেশায় জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এদের মাঝে ছিলেন আনাস বিন নাজর। বদরযুদ্ধে শরিক হতে না পেরে তিনি সারাক্ষণ আফসোস করতেন। ওয়াদা করে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তাঁর রাসূলের সঙ্গে কোনো যুদ্ধের তাওফীক দিলে আল্লাহকে দেখাব আমি কী করতে পারি। উহুদযুদ্ধেই তিনি কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করেন। জিহাদ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া কিছু লোকের পাশ কেটে যাচ্ছিলেন তিনি। কিছুটা অবাক কণ্ঠে—কী ব্যাপার, তোমরা এভাবে বসে আছ! তারা বললেন, আল্লাহর রাসূল নিহত হয়েছেন, আমরা এখন কী করব? তিনি বললেন, বন্ধুরা, শুনে রাখো, মুহাম্মাদ মারা গেলেও মুহাম্মাদের রব কিন্তু মারা যাননি। তিনি যে জন্য মারা গেছেন, তোমরা সে জন্য মারা যাও! তিনি দু'আ করে বলছিলেন, হে আল্লাহ, এদের কথা থেকে আমি তোমার কাছে অপারগতা প্রকাশ করছি; মুশরিকদের আনীত বিষয় থেকে মুক্ততা ঘোষণা করছি। এরপর সা'দ বিন মু'আযের সঙ্গে তার দেখা। তিনি উহুদের দিকে তাকিয়ে তাকে বলেন, 'সা'দ, আমি তো উহুদের পেছন থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। এরপর তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ক্ষীপ্র গতিতে তরবারি চালাতে চালাতে শাহাদাত বরণ করেন। তির, বর্শা ও তরবারি মিলিয়ে ৮০টিরও অধিক আঘাত তার শরীরে পাওয়া যায়। তাকে চেনা যাচ্ছিল না কোনোভাবেই। তার বোন আঙুল দেখে তার লাশ শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি ও তার মতো বান্দাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন,
মু'মিনদের মাঝে কিছু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার অনেকে প্রতীক্ষায় আছে। তারা প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন করেনি। [সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩]
আর কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে যারা রণাঙ্গন থেকে প্রস্থান করেছিল, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
স্মরণ করো, যখন তোমরা ওপরের দিকে ছুটছিলে এবং কারও দিকে ফিরেও দেখছিলে না। আর রাসূল তোমাদের ডাকছিল পেছন থেকে; অতঃপর তিনি তোমাদের দুশ্চিন্তার ওপর আরেক দুশ্চিন্তা চাপিয়ে দিলেন, যেন তোমরা যা হারিয়েছ এবং যে বিপদ তোমাদের ওপর এসেছে, তার জন্য দুঃখিত না হও। আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৩]

যুদ্ধের সময় নবিজির মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ মুহূর্তেই সবখানে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর পরিত্রাণ ও জীবিত থাকার সুসংবাদ প্রথমে জানেন কা'ব বিন মালিক। তিনি একবার উঁচু আওয়াজে সবাইকে এই সুবার্তা জানিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু রাসূল ﷺ বারণ করেন, যেন মুশরিকরা এদিকটায় দৃষ্টি না ফেরায়। [৫১৫] কুরআনুল কারীমে এ-ও বর্ণিত হয়েছে— আল্লাহ তা'আলা মাদীনায় প্রত্যাবর্তিত এই দলটিকে মাফ করে দিয়েছেন; ইরশাদ হচ্ছে, দুটি দল মুখোমুখি হওয়ার দিন যারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে, নিশ্চয় শয়তান তাদের কিছু কৃতকর্মের কারণে তাদের স্খলিত করেছে, আর আল্লাহ অবশ্যই তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন; নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৫]

সেনাবাহিনী পুনর্গঠন
মুসলিমদের পেছন দিক থেকে মুশরিকরা যখন আকস্মিক আক্রমণ শুরু করে, তখন তাদের মূল টার্গেট ছিল রাসূল ﷺ। নবিজি তাঁর স্থান থেকে সরতেই পারছিলেন না আর সাহাবিরা একের পর এক তাঁর সামনে লুটিয়ে পড়ছিলেন! রাসূল ﷺ মুশরিকদের বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে যান, তাঁর সঙ্গে তখন ছিল মাত্র নয়জন সাহাবি। সাতজনই আনসারি। সাহাবিরা প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন মুশরিকদের এই বেষ্টনী ভেঙে নবিজিকে নিয়ে পর্বতারোহণ করতে, যেন মূল বাহিনীর কাছে নেওয়া যায়।

আনসার সাহাবিরা আল্লাহর রাসূলের সুরক্ষায় অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। তারা একের পর এক শহিদ হচ্ছিলেন। কাইস বিন আবু হাযিম বলেন, আমি দেখেছি, নবিজিকে রক্ষাকারী তালহার হাত চালুনির মতো হয়ে গেছে। নবিজি একটি পাথরে বসতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু পারছিলেন না। এ সময় তালহা তার নিচে বসেন। তার পিঠে ভর করেই রাসূল ﷺ পাথরে বসতে সক্ষম হন। যুবাইর বলেন, আমি নবিজিকে বলতে শুনলাম, তিনি সুসংবাদ শুনিয়ে বলেন, তালহা ওয়াজিব করে নিয়েছে। অর্থাৎ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। আল্লাহর রাসূলের সামনে থেকে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস বীরদর্পে লড়াই করেছেন, রাসূল তাকে বর্শা দিয়ে বলছিলেন, সা'দ, নিক্ষেপ করো—তোমার জন্য আমার বাবা-মা কুরবান হোক।

আবু তালহা আনসারি দক্ষ তিরন্দাজ সাহাবি। আল্লাহর রাসূলকে বাঁচাতে শত্রুদের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন। কঠিনভাবে টেনে তির নিক্ষেপ করার ফলে উহুদের দিন তিনটা ধনুক ভেঙেছিল তার হাতে। তার সম্পর্কে রাসূল বলেন, সৈন্যবাহিনীতে আবু তালহার আওয়াজ মুশরিকদের জন্য একটি বাহিনী অপেক্ষা ভয়ানক। তৃণীরে তির আছে, এমন লোক নবিজিকে অতিক্রম করলে তাকে বলতেন, এগুলো আবু তালহাকে দাও। রাসূল মাথা উঁচু করে লোকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে চাইলে আবু তালহা বলতেন, প্রিয় আল্লাহর নবি, আপনার জন্য আমার বাবা কুরবান হোক; আপনি এভাবে দেখলে তির লাগতে পারে। প্রয়োজনে আমরা রক্ত ঝরাব, তবু আপনার আর এক ফোঁটা রক্তও যেন না ঝরে।

নাসীবাহ বিনতে কা'বও আল্লাহর রাসূলের পাশে থেকে তরবারির আঘাত প্রতিহত করেন, শত্রুদের উদ্দেশে নিক্ষেপ করেন তির। একসময় ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। আবু দুযানা আল্লাহর রাসূলের পেছন দিক থেকে পিঠ পেতে দিয়ে নিজেকে বানিয়েছিলেন ঢাল। বেশ কয়েকটি তির তার পিঠে বিদ্ধ হয়—তিনি কাফেরদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। এই সংক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে নবিজির পাশে আসতে সক্ষম হন আবু বাক্র ও আবু উবাইদা। তিনি নবিজির চেহারায় বিদ্ধ হওয়া তির দাঁত দিয়ে বের করে ফেলেন। এরপর অল্প সময়ের মাঝে একটি মুসলিম বাহিনী তাঁর কাছে এসে একত্রিত হয়। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ জন। আল্লাহর রাসূলকে সুরক্ষা দেওয়া সাহাবিরা হলেন—কাতাদা, সাবিত বিন দাহদাহ, সাহাল বিন হুনাইফ, 'উমার ইবনুল খাত্তাব, 'আবদুর রাহমান বিন 'আউফ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম।

খালিদের নেতৃত্বে আসা একটি আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন 'উমার। এই তীব্র আক্রমণ প্রতিহত করতে 'উমার-এর সঙ্গে থাকা মুসলিমরা বেশ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মুসলিমরা ফিরে আসেন, নতুন করে আবার তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ওদিকে মুশরিকরা যুদ্ধের ইতি টানার ব্যাপারে নিরাশায় ভুগতে থাকে। দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের ফলে ক্লান্তি চলে আসে। রাসূলুল্লাহ তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়া সাহাবিদের নিয়ে একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যান। মুসলিমরা ছিলেন ব্যথিত, শঙ্কিত এবং প্রিয় নবির চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত; বিজয়ের পর আবার মুশরিকদের আক্রমণে অনেকটা পর্যুদস্ত।

এমন ভারাক্রান্ত সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাদের চোখে তন্দ্রা ঢেলে দেন। সাহাবিরা অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়েন। জেগে ওঠার পর তারা ছিলেন নিরাপদ প্রশান্তচিত্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
অতঃপর তিনি তোমাদের ওপর দুশ্চিন্তার পর প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন তন্দ্রারূপে, যা তোমাদের মধ্য থেকে এক দলকে আচ্ছন্ন করেছিল, আরেক দল নিজেরাই নিজেদের উদ্বিগ্ন করেছিল। তারা আল্লাহ সম্পর্কে জাহিলি ধারণার মতো অসত্য ধারণা পোষণ করেছিল। তারা বলছিল, আমাদের কি কোনোকিছুর এখতিয়ার আছে? বলো, নিশ্চয় সব বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারে। তারা তাদের অন্তরে এমন কথা লুকিয়ে রাখে, যা আপনার কাছে প্রকাশ করে না। তারা বলে, যদি কোনো বিষয়ে আমাদের এখতিয়ার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না। বলো, তোমরা যদি তোমাদের ঘরে থাকতে, তবুও যাদের ব্যাপারে নিহত হওয়া অবধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুস্থলের দিকে ছুটে যেত। তা এজন্য যে, তোমাদের মনে যা আছে, আল্লাহ তা যাচাই করেন এবং তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা পরিশুদ্ধ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তস্থিত বিষয়ে সর্বজ্ঞ। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৪] [৫১৬]

টিকাঃ
৫১২. মুসলিম, সাহাবাদের ফজিলত অধ্যায়, হাদীস নং ২৪৭০
৫১৩. বুখারি, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ৩০৩৯
৫১৪. মুসনাদে আহমদ, ১/২৮৭, হাদীস নং ২৬০৮
৫১৫. মাজমাউয যাওয়াইদ, হাইসামি, ৬/১১২
৫১৬. নাযরাতুন নাঈম, ১/৩০৫, ৩০৬

📘 রউফুর রহীম 📄 উহুদের আলোচিত শহিদেরা

📄 উহুদের আলোচিত শহিদেরা


হামযা ইবনু 'আবদিল মুত্তালিব
কিয়ামাত দিবসে তিনি আল্লাহর কাছে শহিদদের সর্দার হিসেবে গণ্য হবেন। আল্লাহর সিংহ হামযা সেদিন প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন। অনেক মুশরিককে হত্যা করেন। বনু 'আবদুদ দারের মধ্য থেকে মুশরিকদের ঝান্ডাবাহীদের একটি অংশকে ধ্বংস করে দেন নিমিষেই। এভাবেই অভাবনীয় বীরত্ব ও সাহসিকতার ঝলক দেখিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন তিনি। এরই মাঝে ওয়াহশি তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। একটি মোক্ষম সুযোগ তার সামনে আসে। তাকে নিশানা করে বর্শা নিক্ষেপ করে ওয়াহশি। হামযা বর্শাবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

হামযার শাহাদাতের এই মর্মস্পর্শী কাহিনি ওয়াহশির জবানীতেই স্মরণীয় হয়ে আছে। ওয়াহশি বলেন, বদরযুদ্ধে হামযা তাঈমা বিন আদি বিন খিয়ারকে হত্যা করেছিলেন। আমার মুনিব জুবাইর বিন মুতঈম আমাকে বলল, আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধে হামযাকে হত্যা করতে পারলে তুমি আযাদ। এই প্রস্তাবের পর আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। আইনাইনের বছর কুরাইশি লোকদের সঙ্গে আমি যুদ্ধে বের হই (আইনাইন উহুদের একটি পাহাড়ের নাম)। সবাই যখন যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হলো, তখন সিবা' সারি থেকে সামনে এসে বলল, আমার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করার মতো সাহস কারও আছে? হামযা তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, আরে সিবা', তুই তো নারীদের খতনাকারী মায়ের সন্তান; তুই কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করছিস! এরপর চোখের পলকে তার ওপর আক্রমণ করে বসেন। এদিকে আমি হামযাকে ধরাশায়ী করার সুযোগের সন্ধানে একটি পাথরের আড়াল হই। তিনি আমার নিকটবর্তী হলে তার উদ্দেশে বর্শা নিক্ষেপ করি। আমার নিক্ষিপ্ত বর্শা তার কাঁধে আঘাত হেনে অপর পাশে বেরিয়ে আসে। এভাবেই আমি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করি।

যুদ্ধ শেষে লোকদের সঙ্গে মাক্কায় ফিরে আসি। আমি মাক্কাতেই অবস্থান করছিলাম। ইতোমধ্যে এখানেও ইসলাম প্রসার লাভ করে। তারপর কোনো কারণে আমি তায়েফে চলে আসি। এখানকার লোকেরা আল্লাহর রাসূলের কাছে একজন দূত পাঠায়। আমাকে বলা হয়—দূতের সঙ্গে তিনি মন্দ আচরণ করেন না। কিছু দিনের মধ্যে একটি প্রতিনিধিদল মাদীনার উদ্দেশে রওনা করে। আমি তাদের সঙ্গে বের হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে চলে আসি। আমাকে দেখে তিনি বললেন, তুমি কি ওয়াহশি? বললাম, জি। তিনি বললেন, তুমিই কি হামযাকে হত্যা করেছ? বললাম, একটা কারণ ছিল এর পেছনে, হয়তো আপনি তা জানেন। তিনি বললেন, তুমি কি পারবে আমার থেকে তোমার চেহারা আড়াল করতে? আমি সেখান থেকে বের হয়ে আসি। ভারাক্রান্ত হৃদয় বহন করে ঘুরেছি অনেক দিন। আল্লাহর রাসূল চলে যান। ইতোমধ্যে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের আবির্ভাব ঘটে। আমি মনে মনে ভাবলাম-অবশ্যই আমি মুসাইলামাকে হত্যা করে হামযাহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করব।

লোকদের সঙ্গে মুরতাদ খতমের এই যুদ্ধে বের হলাম। মিথ্যাবাদী এই শয়তানটাকে আমি চিনতাম না। যুদ্ধের একপর্যায়ে দেখলাম, দেওয়ালের ফাঁকে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। পত্রপল্লবিত উটের মতো তাকে দেখতে। মাথার চুলগুলো বিক্ষিপ্ত। একে লক্ষ করেই সেই বর্শাটা নিক্ষেপ করলাম। কাজ হলো। বুকে বিঁধে দুই কাঁধের মধ্য দিয়ে বের হলো। এরপর আনসারি এক সাহাবি তরবারি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়।

'আবদুল্লাহ ইবনু ফযল বলেন, সুলাইমান ইবনু ইয়াসার আমাকে বলেছেন, তিনি 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমারকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, মুসাইলামাকে বর্শাবিদ্ধ হতে দেখে এক নারী বলে ওঠে, আমীরুল মু'মিনীনের কী সর্বনাশ হয়ে গেল, একটা কালো গোলাম তাকে হত্যা করে ফেলল। [৫১৭]

হামযার শাহাদাত ও আল্লাহর রাসূলের প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, কেউ কি হামযার লাশ দেখেছ? এক ব্যক্তি বলল, তার লাশ আমি দেখেছি। রাসূল বললেন, আমাদের নিয়ে চলো, আমরা তাকে দেখব। এরপর নবিজি হামযার লাশের কাছে এসে দাঁড়ালেন। দেখলেন-তার পেট ফাড়া হয়েছে, করা হয়েছে অঙ্গহানি। লোকটা বলল, আল্লাহ ক্ষমা করুন, কীভাবে তার অঙ্গবিকৃতি করা হয়েছে!

অন্য বর্ণনায় আছে-রাসূল হামযার লাশ দেখে ব্যথার আতিশয্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। তিনি শহিদদের লাশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি এদের জন্য সাক্ষী হলাম। রক্তমাখা জামাসহ তাদের কাফন পরাও। কেননা, আল্লাহর রাস্তায় যে-কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে কিয়ামাতের দিন তাকে রক্তমাখা অবস্থায় ওঠানো হবে। তার রং হবে রক্তিম। ঘ্রাণ হবে মিশকের। কুরআন সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিকে আগে কবরে রাখবে। সবাইকে লাহাদ কবরে সমাধিত করো।

উহুদের দিন হামযা ও অন্যান্য সাহাবিদের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। তিনি উহুদের উদ্দেশ্যে বের হবার আগেই সাহাবিগণকে তাঁর স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। নবিজি বলেন, আমি আমার তরবারি জুলফিকার দেখলাম ভগ্ন অবস্থায়। আমি এর ব্যাখ্যা করেছি—তোমাদের পরাজয়। আরও দেখলাম, আমি একটা ভেড়ার পিঠে আরোহণ করে আছি; এর ব্যাখ্যা হলো—একটা ভেড়ার পাল। এরপর দেখলাম, আমি একটি সুরক্ষিত দুর্গে; তা হলো—মাদীনা। সবশেষে দেখলাম, একটি গাভি জবাই হচ্ছে; আল্লাহর কসম, এতে কল্যাণ আছে! আল্লাহর কসম, এতে কল্যাণ আছে! [৫১৮]

সহোদরের মৃত্যুতে সাফিয়্যাহ বিনতে 'আবদুল মুত্তালিবের ধৈর্যধারণ
যুবাইর ইবনুল আওয়াম বলেন, যুদ্ধ শেষে এক মহিলা দৌড়ে এদিকে আসছিলেন। শহিদদের লাশ দেখতে চাচ্ছিলেন তিনি। রাসূল চাচ্ছিলেন না, তিনি তাদের দেখুক। নবিজি বললেন, এই নারীকে থামাও। আমি লক্ষ করে দেখলাম—তিনি সাফিয়্যাহ। আমি দ্রুত তার দিকে ছুটলাম। তিনি লাশগুলোর কাছে পৌঁছানোর আগেই তার পথ আগলে দাঁড়ালাম। আমাকে সামনে দেখে আমার বুকে একটা ঘুষি মেরে বললেন, আমার পথ ছেড়ে দাও, আমি আমার ভাইকে দেখার জন্য এসেছি। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল আপনাকে এদিকে আসতে নিষেধ করেছেন। তিনি দমলেন। দাঁড়ালেন সেখানে। সঙ্গে আনা দুটি কাপড় বের করে বললেন, এই কাপড় দুটি নাও। আমার ভাই হামযার জন্য এনেছি। আমি তার শাহাদাতের খবর শুনেছি। যাও, কাপড় দুটি দিয়ে তাকে কাফন পরাও। এরপর আমরা কাফন পরানোর জন্য হামযার কাছে গেলাম। এসে দেখি, তার পাশে একজন আনসারি সাহাবি। হামযার মতো তাকেও খুব নিকৃষ্টভাবে অঙ্গহানি করা হয়েছে। তারও কাফনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি আমাদের বিবেকে নাড়া দিল যে, হামযাকে দুটি কাপড় দিয়ে কাফন দেওয়া হবে, অথচ আনসারি সাহাবির কাফনের কোনো ব্যবস্থা হবে না! আমরা বললাম, হামযাকে একটি কাপড় দেওয়া হোক, আরেকটি আনসারি সাহাবিকে। কাপড় দুটি পরিমাপ করে দেখি, একটির তুলনায় আরেকটি বড়। এখন কোন টুকরো কাকে দেবো, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম। অগত্যা লটারি করলাম। যার ভাগে যে কাপড় জুটেছে, সেটি দিয়েই তাদের কাফনের ব্যবস্থা করলাম।

হামযার জন্য শোক
রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদ থেকে ফিরে এসে শুনতে পেলেন, আনসারি নারীরা কাঁদছেন। নবিজি ﷺ বললেন, কিন্তু হামযার জন্য কেউ তো কাঁদছে না! এই কথা আনসারি নারীদের কাছে পৌঁছালে তারা হামযার স্মরণে কান্না শুরু করেন। রাসূল ﷺ ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠেও তিনি শুনতে পান, নারীরা কেঁদেই চলেছে। তিনি বলেন, আরে, আজ পর্যন্ত ওরা কেঁদেই চলেছে! না, আজকের পরে কোনো মৃতের জন্য কেউ কাঁদতে পারবে না। [৫১৯] এ দিন থেকেই মৃত ব্যক্তি জন্য শব্দ করে কাঁদা নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

হামযার নামে এক নবজাতকের নাম
জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের এক আনসারি সাহাবির একটি ছেলে জন্ম নেয়। তারা বলেন, আমরা তার নাম কী রাখব? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো হামযা ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব। এ নামেই তার নাম রাখতে পারো। পরক্ষণেই ওয়াহি নাযিল করে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়-আল্লাহর কাছে প্রিয় নাম হলো 'আবদুল্লাহ ও 'আবদুর রাহমান। এরপর তিনি উপস্থিত লোকদের এই কথা জানিয়ে দেন। [৫২০]

তোমার চেহারা আমার থেকে আড়াল করতে পারবে? [৫২১]
ওয়াহশিকে রাসূলে কারীম ﷺ শুধু এটুকুই বলেছিলেন, 'তোমার চেহারা আমার থেকে আড়াল করতে পারবে?' তাকে জেরা করেননি, কোনো কটু কথাও বলেননি। আড়াল হবার কথা বলেছেন, কারণ, তাকে দেখলেই শহিদ হওয়া চাচা হামযার অঙ্গবিকৃত দেহাবয়ব তাঁর চোখে ভেসে উঠত; মানসিক বিমর্ষতা পেয়ে বসত, বিষন্নতায় ছেয়ে যেত অন্তর-এটাই মানবিক স্বাভাবিক প্রকৃতি। এজন্যই তাকে চোখের আড়াল হতে বলেছেন, যেন ব্যথার স্মৃতির উৎসই না থাকে।

একটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে— ‘ওয়াহশি বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, কে—ওয়াহশি? বললাম, জি, আমি ওয়াহশি। তুমিই হামযাকে হত্যা করেছ?—জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, জি, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার হাত দিয়ে তাকে সম্মানিত করেছেন; কিন্তু তার হাত দিয়ে আমাকে লাঞ্ছিত করেননি। কুরাইশরা নবিজিকে বলেছিল, তুমি কি তাকে ভালোবাসতে পারবে, অথচ সে হামযাকে হত্যা করেছে? এরপর বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। আমার কথা শুনে রাসূল তিনবার মাটিতে হাত মারলেন, তারপর আমার বুকেও তিনবার মৃদু আঘাত করে বললেন, ওয়াহশি, বেরিয়ে পড়ো; আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো, যেমন লড়াই করেছ আল্লাহর রাস্তা থেকে ফিরিয়ে রাখতে।

রাসূলে কারীম পূর্বের কুফুরি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতার পাপ মুছে ফেলতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের নির্দেশ দিলেন, পাশাপাশি জিহাদের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। ওয়াহশি ইয়ামামার যুদ্ধে শরিক হওয়া ও মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে হত্যা করা ছিল আল্লাহর রাসূলের এই কথারই প্রভাব, যা ছিল তার পাপ মোচন, গুনাহ ঝেড়ে ফেলা ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির সর্বোত্তম পন্থা। ওয়াহশি নিজেও এটা অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাই মুসাইলামাকে হত্যার পর বলেছিলেন, আমি একজন উত্তম মানুষ অর্থাৎ হামযা ইবনু 'আবদুল মুত্তালিবকে হত্যা করেছিলাম, আর আজ সর্বনিকৃষ্ট মানুষকে হত্যা করে তার প্রায়শচিত্ত করলাম।

মুসআব বিন উমাইর
খাব্বাব বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে হিজরাত করেছি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আমাদের প্রতিদানের দায়িত্ব আল্লাহর। আমাদের মাঝে যারা নিজেদের পথে চলেছেন; কিন্তু তার প্রতিদানের কোনো কিছু ভক্ষণ করেননি, তাদের মধ্যে একজন হলেন মুস'আব বিন উমাইর। তিনি উহুদের দিন শহিদ হন। একটি চাদর ছাড়া আর কিছু রেখে যাননি। আমরা তার মাথা ঢাকলে পা উদোম হয়ে যেত, পা ঢাকলে মাথা হয়ে পড়ত উন্মুক্ত। রাসূল বললেন, তার মাথা ঢেকে পায়ের ওপর ইজখির ঘাস রাখো।

‘আবদুর রাহমান ইবনু আউফ বর্ণিত, একদিন তিনি রোজা ছিলেন। মাগরিবের আযানের সময় তার কাছে ইফতার পরিবেশন করা হয়। সুস্বাদু ইফতারির আয়োজন দেখে তিনি বলেন, মুস'আব বিন উমাইর শহিদ হলো, তিনি ছিলেন আমার চেয়ে উত্তম। আহ, তাকে কাফন দেওয়ার মতো একটা চাদর ছাড়া কিছুই ছিল না। হামযা শহিদ হলেন। তিনিও ছিলেন আমার চেয়ে উত্তম। তাকেও কাফন দেওয়ার মতো ছিল একটিমাত্র চাদর। আমার আশঙ্কা হয়, আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দুনিয়ার জীবনেই দেওয়া হলো কিনা! আখেরাতের দৃশ্যপট তার চোখের তারায় ভাসতে থাকে। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদ থেকে ফেরার সময় মুস'আব ইবনু উমাইরের লাশের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার জন্য দু'আ করে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
মু'মিনদের মাঝে কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে; তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার অনেকে প্রতীক্ষায় আছে; তারা প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন করেনি। [সূরা আহযাব, ৩৩: ২৩]

রাসূল ﷺ আবার বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, কিয়ামাত দিবসে এরা আল্লাহর কাছে শহিদ হিসেবে গণ্য হবে। তোমরা এখানে এসে তাদের কবর যিয়ারত করবেন। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, কিয়ামাত পর্যন্ত যারা তাদের সালাম দেবে, তারা এর জবাব দেবে। [৫২২]

সা'দ বিন রাবি'
উহুদযুদ্ধ শেষে নবিজি বলেন, সা'দ বিন রাবি'র সংবাদ কে আনতে পারবে? সে জীবিত নাকি মৃত? উবাই ইবনু কা'আব বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তার খবর আমি জেনে আসছি। নবিজি তাকে বলেন, 'সা'দ বিন রাবি'কে খুঁজে পেলে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম বলবে। তারপর বলবে, রাসূল জিজ্ঞেস করছেন—তুমি কেমন আছ? উবাই ইবনু কা'আব খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়ে গেলেন। তিনি আহত অবস্থায় পড়েছিলেন। উবাই তাকে বলেন, সা'দ, নবিজি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমার খবর জানতে। তুমি জীবিত আছ নাকি শহিদ হয়ে গেছ? তিনি বললেন, ১২টি আঘাত আমাকে জীবনসায়াহ্নে উপনীত করেছে। ফুরিয়ে যাচ্ছে আমার সময়। আল্লাহর রাসূলকে সালাম, তোমাকেও সালাম। নবিজিকে বলবে—আমি জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি। আমার আনসারি লোকদের বলবে—যদি তোমাদের একজনও জীবিত থাকে আর আল্লাহর রাসূল কষ্ট পান, তাহলে তোমরা রেহাই পাবে না। এর একটু পরই তার স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়।

'আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ
সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস বলেন, উহুদের দিন 'আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ তাকে বললেন, চলো দু'আ করি। তারা দুজনে এক প্রান্তে এলেন। সা'দ প্রথমে দু'আ করে বললেন, হে আমার রব, রণাঙ্গনে প্রবল শক্তিশালী যোদ্ধার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়ো। আমি তার সঙ্গে লড়াই করব, সেও আমার সঙ্গে লড়াই করবে। সবশেষে তার ওপর আমাকে বিজয় দান করবে, যেন তাকে হত্যা করতে পারি এবং নিতে পারি তার অস্ত্র। 'আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ বললেন, আমীন। এরপর তিনি দু'আ করে বলেন, হে আল্লাহ, আমাকেও প্রবল শক্তিধর ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দিয়ো। তোমার জন্য তার সঙ্গে যুদ্ধ করব, সেও আমার সঙ্গে লড়াই করবে; সে আমাকে ধরাশায়ী করবে, কাটবে আমার নাক কান। কাল যখন তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে, তখন বলবে, তোমার নাক কান কাটা হয়েছে কেন? আমি বলব, তোমার ও তোমার রাসূলের জন্য। তুমি বলবে, সত্য বলেছ।

সা'দ বলেন, বেটা শুনছ, আমার দু'আ অপেক্ষা তার দু'আই উত্তম ছিল। আমি দিন শেষে দেখেছি, নাক কান কেটে তার অঙ্গহানি করা হয়েছে। [৫২৩]

হানযালা ইবনু আবি আমীর
যুদ্ধের সময় হানযালা আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পায়ে আঘাত করেন। সে মাটিতে পড়ে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে। হানযালা তার গর্দান আলাদা করতে চাচ্ছিলেন। এমন সময় আসওয়াদ বিন শাদ্দাদ হানযালাকে ধরাশায়ী করে বর্শা দিয়ে আঘাত হানে। হানযালা বর্শা নিয়েই তার দিকে এগিয়ে যান। আসওয়াদ দ্বিতীয় আঘাতে তাকে শহিদ করে দেয়।

আল্লাহর রাসূলের কাছে তার শাহাদাতের আলোচনা উঠলে বলেন, আমি দেখেছি আসমান ও যমিনের মাঝখানে তাকে একটা রুপার পাত্রে রেখে শিলাগলিত পানি দিয়ে ফিরিশতারা গোসল করাচ্ছে। তোমরা তার আহালকে জিজ্ঞেস করো—উহুদে আসার আগে তার কী হয়েছিল? সাহাবিরা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, মুসলিমদের বিপর্যয়ের কথা শুনে অপবিত্র অবস্থাতেই উনি জিহাদের উদ্দেশ্যে ছুটে যান। রাসূল বললেন, হ্যাঁ, এ কারণেই ফিরিশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।

ওয়াকিদির বর্ণনায় আছে—হানযালা জামীলা বিনতে 'আবদুল্লাহ বিন উবাইকে বিয়ে করেছিলেন। উহুদের আগের রাতে তাদের বাসর হয়। স্ত্রীর কাছে রাত্রি যাপনের অনুমতি চাইলে নবিজি তাকে অনুমতি দেন। সকালে ফজরের সালাতের পর হানযালা আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু জামীলার আকর্ষণে সেবারের মতো ফিরে এসে তারা আবার মিলিত হন। ঠিক এমন সময় তার কাছে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয়ের খবর আসে। গোসল করা পর্যন্ত বিলম্ব করা তার জন্য অসম্ভব মনে হয়। তাই অপবিত্র অবস্থাতেই যুদ্ধে বের হয়ে যান।

এর আগে জামীলা তার গোত্রের চারজন ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে বলেছিলেন, হানযালা তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি আসমান উন্মুক্ত হয়েছে। হানযালা দরজা অতিক্রম করার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। আমি বুঝেছি, তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। হানযালার এই মিলনে জামীলার গর্ভে সন্তান আসে; তার নাম ছিল মুহাম্মাদ বিন হানযালা। এই মুহাম্মাদ অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতেন, ফিরিশতাদের হাতে গোসলকৃত পিতার সন্তান আমি। জামীলাকে পরে বিয়ে করেন সাবিত বিন কাইস। এই সংসারে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাম রাখা হয় মুহাম্মাদ বিন সাবিত বিন কাইস।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর বিন হারাম
'আবদুল্লাহ ইবনু আমর বিন হারাম যুদ্ধের জন্য বের হওয়ার সময় ছেলে জাবিরকে বলেন, বেটা জাবির, আমাদের অবস্থা কত দূর যায়, তা জানা পর্যন্ত বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার কোনো ইচ্ছাধিকার নেই। আল্লাহর কসম, আমার পরে আমার মেয়েদের যদি রেখে না যেতাম, তাহলে আমার সামনে তোমার যুদ্ধ করাকে আমি পছন্দ করতাম। আমি দেখছি আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের মাঝে আমিই প্রথম শহিদ হব। আমার পরে রাসূলুল্লাহ ব্যতীত তোমার চেয়ে উত্তম কোনো প্রাণ আমি রেখে যাচ্ছি না। আমার কিছু ঋণ আছে, সেগুলো পরিশোধ করবে, তোমার বোনদের প্রতি খেয়াল রাখবে।

এরপর তিনি মুসলিমদের সঙ্গে বের হন। যুদ্ধ করতে করতে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেন। জাবির তার বাবার ব্যাপারে বলেন, আমার বাবা শহিদ হওয়ার পর তার চেহারা থেকে কাপড় সরাচ্ছিলাম আর কাঁদছিলাম। সাহাবিরা আমাকে কাঁদতে নিষেধ করছিলেন; কিন্তু নবিজি বারণ করছিলেন না। আমার খালাও তার জন্য কাঁদছিলেন। রাসূল বললেন, সে কাঁদুক বা না কাঁদুক, তোমরা তাকে উঠানোর আগ পর্যন্ত ফিরিশতারা ডানা দিয়ে তাকে ছায়া দেবে।

জাবির-এর দিকে তাকিয়ে নবিজি বললেন, কী ব্যাপার জাবির, তোমাকে ভারাক্রান্ত মনে হচ্ছে! জাবির বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার বাবা শহিদ হয়েছেন, আবার রেখে গেছেন ঋণের বোঝা ও সন্তানাদি। নবিজি বললেন, আমি কি তোমাকে সুসংবাদ শোনাব না, কীভাবে তোমার বাবা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন! জাবির বললেন, জি, অবশ্যই শুনব ইয়া রাসূলাল্লাহ। নবিজি বললেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলেন পর্দার আড়াল থেকে; কিন্তু তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন সরাসরি। আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা, কী চাও? আমি তোমাকে দিয়ে দেব। তোমার বাবা বলেছে, আমার প্রতিপালক আমাকে আবার জীবন দান করুন, আবার তোমার জন্য শহিদ হব। আল্লাহ তা'আলা তখন বলেন, আমার পক্ষ থেকে আগেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে, কেউ সেখানে প্রত্যাবর্তন করবে না। তিনি বলেন, আমার রব, তাহলে আমার পরবর্তীদের জানিয়ে দিন। এরপর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়, তোমরা তাদের মৃত ভেব না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, তারা রিযিকপ্রাপ্ত হয়। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৯]

'আবদুল্লাহ ইবনু আমর উহুদযুদ্ধের আগে একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বলেন, উহুদের আগে আমি স্বপ্ন দেখেছি, মুবাশশির বিন 'আবদুল মুনযির আমাকে বলছে, তুমি কদিনের মাঝেই আমাদের কাছে আসছ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এখন কোথায়? সে বলল, আমরা এখন জান্নাতে, যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াই। আমি বললাম, তুমি না বদরের দিন শহিদ হলে! সে বলল, হ্যাঁ, আবার জীবিত হয়েছি। ইবনু আমর নবিজির কাছে স্বপ্নের কথা উল্লেখের পর তিনি বলেন, আবু জাবির, এটাই হলো শাহাদাত। খুব বেশি দেরি হয়নি-উহুদযুদ্ধেই তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।

খাইসামাহ আবু সা'দ
খাইসামাহ আবু সা'দ বলেন, বদরযুদ্ধে আমার ভুল হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি যুদ্ধের প্রতি আগ্রহী ছিলাম। এমনকি বের হওয়ার ব্যাপারে আমার ছেলের সঙ্গে লটারি করেছিলাম। লটারিতে সে জিতে যায়। বদরে আল্লাহ তাকে শাহাদাতের তাওফীক দান করেন। আজ সকালেই আমি ছেলেকে স্বপ্নে দেখেছি। চেহারা তার অনেক সুন্দর-উজ্জ্বল। জান্নাতের মনোরম উদ্যান ও নহরের পাশ দিয়ে মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে বলছিল, সত্য আমাদের সঙ্গে। আমরা জান্নাতে তা অনুভব করতে পারছি। আমার রবের প্রতিশ্রুতি আমি সত্য পেয়েছি। ইয়া রাসূলাল্লাহ, জান্নাতে তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমার ঘুম ভেঙেছে। বেশ বয়স হয়েছে আমার, হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে। আমি আমার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য দু'আ করুন-আল্লাহ যেন আমাকে শাহাদাতের তাওফীক দান করেন; জান্নাতে যেন সা'দকে দেখতে পারি। নবিজি তার জন্য দু'আ করেন। অবশেষে উহুদযুদ্ধে তিনি শহিদ হন।

ওয়াহাব মুযানি ও তার ভাতিজা
ওয়াহাব মুযানি ও তার ভাতিজা হারিস বিন উকবা মাদীনার বাইরে ছিলেন। মুযাইনাহ পাহাড় থেকে নিজেদের মেষ নিয়ে মাদীনায় এসে দেখেন জনশূন্য। তারা জিজ্ঞেস করেন, লোকজন কোথায়? উপস্থিত লোকেরা বলল, তারা উহুদে গেছে। রাসূলুল্লাহ কুরাইশের মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছেন। তারা বললেন, চোখ না থাকলে আমাদের থেকে গিয়ে কাজ নেই। তৎক্ষণাৎ চাচা-ভাতিজা উহুদের উদ্দেশে বের হয়ে নবিজির কাছে আসেন। এসে দেখেন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের কর্তৃত্ব আল্লাহর রাসূলের হাতে। উপত্যকায় মুসলিমদের সঙ্গে মিলিত হন। এরপরই খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরিমার অশ্বারোহী বাহিনী পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। সবাই মিশে যায়। শুরু হয় প্রচণ্ড লড়াই। মুশরিকদের একটা দল পৃথক হয়ে আল্লাহর রাসূলের দিকে আসতে থাকে। নবিজি বলেন, কে আছ, এই দলটিকে প্রতিহত করতে পারবে? মুযানি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এদের জন্য আমিই যথেষ্ট। কথা শেষ না হতেই তিনি দাঁড়িয়ে তির নিক্ষেপ করতে থাকেন। অল্প সময়েই ওরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তিনিও আগের স্থানে ফিরে আসেন।

মুশরিকদের আরেকটি দল নবিজির দিকে এগিয়ে আসে। এবারও তিনি বলেন, এই ঝটিকা বাহিনীকে কে রুখতে পারবে? এবারও মুযানি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আছি। বিলম্ব না করে এলোপাথাড়ি তরবারি চালাতে থাকেন। এরাও পিঠ দেখিয়ে ভাগতে বাধ্য হয়। মুযানি আগের স্থানে ফিরে আসেন।

কিছুক্ষণ পর আরেকটি দল এদিকে ছুটে আসতে থাকে। এবারও তিনি বলেন, এদের বিরুদ্ধে কে দাঁড়াতে পারবে? মুযানি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি ক্লান্ত হইনি। নবিজি বললেন, দাঁড়াও এবং জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। মুযানি আনন্দচিত্তে প্রস্তুত হতে হতে বললেন, আল্লাহর কসম, আমি আর ফিরব না, ফিরতে চাইবও না। ক্ষীপ্র গতিতে তাদের মাঝে ঢুকে বিদ্যুৎবেগে তরবারি চালাতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের দেখছিলেন, এমন সময় তাদের পেছন থেকে তিনি বের আসেন। নবিজি দু'আ করছিলেন, হে আল্লাহ, তার প্রতি রহম করো।

একটু জিরিয়ে আবার তিনি কাফিরদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওরাও তাকে লক্ষ্য করে একযোগে তরবারি ও বর্শা চালায়। পরিশেষে শাহাদাতের মহাসৌভাগ্য অর্জন করেন তিনি। তার দেহে বর্শার ১০টি আঘাত পাওয়া যায়। খুব জঘন্য উপায়ে তাকে বিকৃত করা হয়েছিল। তার শাহাদাতের পর ভাতিজা যুদ্ধ শুরু করেন। একসময় তিনিও শহিদ হন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, আমার কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় মৃত্যু হলো মুযানির মৃত্যু। এমন মৃত্যু আমিও কামনা করি।

বিলাল বিন হারিস মুযানি বলেন, সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের সঙ্গে আমরা কাদিসিয়ার যুদ্ধে শরিক ছিলাম। বিজয়ের পর আমাদের মাঝে যখন গানীমাতের সম্পদ বণ্টন করা হয়। তখন কাবূস পরিবারের মুযাইনা গোত্রের এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের কাছে আসি। তিনি বলেন, কে-বেলাল! বললাম, জি, বিলাল। তিনি বললেন, মারহাবা! কিন্তু তোমার সঙ্গে এই যুবক কে? বললাম, আমার গোত্রের কাবুস পরিবারের সন্তান। সা'দ বললেন, তুমি কি সেই মুযানির পরিবারভুক্ত, যিনি উহুদযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। যুবক বলল, আমি তার ভাতিজা।

সা'দ বললেন, মারহাবা, আল্লাহ তোমাকে নিয়ামাত দান করুন। তোমার চাচাকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। উহুদের দিন তার মতো অন্য কাউকে আমি দেখিনি। সেদিনের দৃশ্য এখনো মনে পড়ে। মুশরিকরা চারদিক থেকে আমাদের বেষ্টন করে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ আমাদের মাঝখানে। চারপাশ থেকে একটা করে বাহিনী তার দিকে তেড়ে আসছে। প্রত্যেকটা বাহিনী প্রতিহত করতে মুযানি সাড়া দিয়ে বলেছেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি হাজির! শেষের বার তিনি দাঁড়ানোর সময় নবিজি বলেন-দাঁড়াও, জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। মুযানি চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য অগ্রসর হলেন। আমিও তার পিছু নিলাম। আল্লাহর কসম, সেদিন আমি তার মতোই শাহাদাতের প্রত্যাশী ছিলাম। দেখতে দেখতে মুযানি শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দেন। চাচ্ছিলাম—আমিও তার সহযাত্রী হয়ে যাই; কিন্তু আমার ভাগ্যলিপিতে জীবনের আলো ছিল দীর্ঘ।

সা'দ তখনই এই মুযানি যুবকের অংশ তাকে দিয়ে দেন। অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন তাকে। শেষে বলেন, আমাদের এখানেই থাকবে নাকি পরিবারের কাছে ফিরে যাবে? বিলাল বললেন—সে ফিরে যেতে চায়। এরপর আমরা ফিরে আসি।

সা'দ বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি নবিজি তার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন, কেননা আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহর রাসূল নিজেই ছিলেন ক্ষতবিক্ষত। সোজা হয়ে দাঁড়ানো ছিল তার জন্য ভীষণ কষ্টের। তারপরও মুযানিকে কবরে রাখার সময় তিনি পাশে ছিলেন। নিজে চাদর দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিয়েছেন। এই চাদর তার পায়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। নবিজি আমাদের ঘাস একত্রিত করতে বলেন। আমরা তা সংগ্রহ করে মুযানির পা ঢেকে দিই। আল্লাহর রাসূল এবার প্রস্থান করেন। আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় আকাঙ্ক্ষা হলো—আল্লাহ যেন আমাকে মুযানির মতো মৃত্যু দেন। [৫২৪]

আমর বিন জামুহ
আমর বিন জামুহ ছিলেন একজন পঙ্গু সাহাবি। সিংহের মতো চারটি সন্তান ছিল তার। যারা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে প্রত্যেক যুদ্ধে অংশ নিতেন। তারা হলেন—খাল্লাদ, মুআওয়াজ, মুআয ও আবু আইমান। উহুদের দিন তারা বাবাকে বারণ করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ আপনাকে অপারগ করেছেন, তাই আপনার ওপর জিহাদ আবশ্যক নয়। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে চলে আসেন। অনুযোগের সুরে বলেন, আমার ছেলেরা আমাকে এই মহতি আত্মনিবেদন থেকে বিরত রাখতে চাচ্ছে। বারণ করছে আপনার সঙ্গে বের হতে; কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি এই খোঁড়া পা নিয়েই জান্নাতে হাঁটতে চাই। নবিজি বললেন, দেখো আমর, আল্লাহ তোমাকে অপারগ করেছেন, কাজেই জিহাদ তোমার জন্য ফরজ নয়। আর ছেলেরা শোনো, তোমরা তাকে বাধা দিয়ো না। হতে পারে আল্লাহ তাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করবেন।

আমর রণাঙ্গন অভিমুখী হন। কিবলামুখী হয়ে দু'আ করে বলেন, হে আল্লাহ, আমার পরিবারের কাছে আমাকে ব্যর্থ করে ফিরিয়ে এনো না। আমর মুজাহিদদের কাতারে দাঁড়িয়ে যান। খোঁড়া পা নিয়েই জিহাদ করতে করতে কাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের দুয়ারে পৌঁছে যান।

এক বর্ণনায় আছে-আমর বিন জামুহ নবিজির কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কী বলেন, আমি আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হলে সুস্থ পা নিয়ে জান্নাতে হাঁটতে পারব না? রাসূলুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, পারবে। উহুদের দিন তিনি, তার এক ভাতিজা ও তাদের এক গোলাম শহিদ হন। নবিজি তাদের সবাইকে এক কবরে রাখেন।

আবু হুজাইফা বিন ইয়ামান ও সাবিত বিন কাইস
আবু হুজাইফা ও সাবিত বিন কাইস বেশ বয়স্ক সাহাবি ছিলেন। উহুদের দিন তারা ছিলেন নারী ও শিশুদের সঙ্গে। মুসলিমদের বিপর্যয়ের সময় তাদের একজন আরেকজনকে বলেন, তোমার সামনে দুর্দিনের হাতছানি। কেন এখানে অপেক্ষা করছ তুমি? আমরা বেঁচে থাকলে জীবনটা হবে গাধার মতোই। আজ না হয় কাল চূড়ান্ত সময় আসবেই। এখনই মোক্ষম সুযোগ তরবারি নিয়ে নবিজির সঙ্গে মিলিত হওয়ার। হয়তো আমাদের নসিবেও জুটবে শাহাদাতের মৃত্যু। তারা তরবারি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে আসেন। তাদের কেউ চিনত না। সাবিত বিন কাইস-কে মুশরিকরা হত্যা করে; কিন্তু হুসাইল বিন জাবিরের ওপর মুসলিমদের তরবারিই আঘাত হানে। নিজেদের অজান্তেই তাকে হত্যা করা হয়। হুজাইফা বলেন, ইনি আমার পিতা। সাহাবিরা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা তাকে চিনতে পারিনি। হুজাইফা বলেন, আল্লাহ আপনাদের ক্ষমা করুন। তিনি শ্রেষ্ঠ দয়াবান। নবিজি তাকে রক্তপণ দিতে চাইলে হুজাইফা এই রক্তপণের টাকা মুসলিমদের মাঝে সাদাকাহ করে দেন। এতে আল্লাহর রাসূলের কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

ভাবা যায়, একজন বৃদ্ধ মানুষ ঈমানি শক্তিতে কতটা বলিয়ান! শাহাদাতের নেশায় কেমন বিভোর! তারা ছিলেন অশীতিপর-জিহাদ আবশ্যক ছিল না তাদের ওপর; কিন্তু শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের অবিনাশী চেতনায় তারা দুর্গ ছেড়ে অস্ত্র ধরেছেন। হুজাইফা-এর মহানুভবতাও লক্ষণীয় যে, মুসলিমরা তার বাবাকে ভুলে হত্যা করল, তাদের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করলেন, অধিকন্তু বাবার রক্তপণের সম্পদও মুসলিমদের মাঝে সাদাকাহ করে দিলেন। আরেকটি বিষয় এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা জানতে পারি-জিহাদের ময়দানে কাফির মনে করে মুসলিমরা অপর এক মুসলিমকে হত্যা করলে ইমামের উচিত বাইতুল মাল থেকে তার রক্তপণ আদায় করা। কেননা, নবিজি হুজাইফাকে রক্তপণ দিতে চেয়েছিলেন।

উসাইরিম
তার পূর্ণাঙ্গ নাম আমর বিন সাবিত বিন কাইস। প্রথমে তাকে ইসলামের কথা বলা হলেও সে ঈমান আনেনি। আবু হুরাইরা -এর ভাষ্যে তার কাহিনি বর্ণিত রয়েছে; তিনি বলেন, স্বজাতির মাঝে শুধু উসাইরিমই ঈমান আনা থেকে বিরত ছিল। সে এমন একদিনে মাদীনায় আসে, যেদিন রাসূলুল্লাহ ও সাহাবিরা চলে গেছেন উহুদের উদ্দেশে। সে এসে জিজ্ঞেস করল, 'সা'দ বিন মু'আজ কোথায়? বলা হলো—তিনি উহুদে চলে গেছেন। আবার বলল, তার ভাইয়ের গোত্রীয় লোকেরা কোথায়? বলা হলো—তারাও উহুদে। সে আবার জিজ্ঞেস করল, তার জাতির লোকেরা কোথায়? বলা হলো—তারাও উহুদে। এরপর নিজের অজান্তেই তার মনে ঈমানের আলো বিকীর্ণ হয়, সেখানে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। বিলম্ব না করে নিজের তরবারি ও বর্শা বাঁদিকে নিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসেন উহুদের প্রান্তরে। মুসলিমরা তাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলে, আরে আমর, তুমি এখানে! তিনি বলেন, বন্ধুগণ, আমি তো ঈমান এনেছি। এরপর আর কিছু না ভেবে সর্বশক্তি ব্যয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তরবারি ও বর্শার আঘাত তাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

যুদ্ধ শেষে বনু 'আবদুল আশহালের লোকেরা যুদ্ধক্ষেত্রে শহিদদের লাশ খুঁজতে থাকে। একসময় উসাইরিমকে পেয়ে যায়। তারা বলে ওঠে, আরে, এ তো উসাইরিম! তাকে এখানে নিয়ে এলো কে? সে তো ইসলামকে অস্বীকার করেছিল। অনুসন্ধানী এই দলটা তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি এখানে কেন এলে? জাতির টানে এসেছ, নাকি ইসলামকে ভালোবেসে? তিনি বললেন, ইসলামকে ভালোবেসেই এসেছি। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি, গ্রহণ করেছি ইসলাম। তরবারি নিয়ে সোজা চলে এসেছি এখানে। লড়াই করেছি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে। এখন আমার এই অবস্থা। শোনো বন্ধুরা, আমি মারা গেলে আমার সমুদয় সম্পদ নবিজিকে দিয়ে দেবে। তিনি যেখানে ইচ্ছা খরচ করবেন। একটু পর তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

রাসূলুল্লাহ-এর কাছে তার আলোচনা করা হয়। তিনি বলেন, সে জান্নাতি মানুষ। বলা হলো—সে মরল আর জান্নাতে প্রবেশ করল, অথচ কোনো নামাজ সে পড়েনি! নবিজি বললেন, সে আমল করেছে কম, প্রতিদান পেয়েছে অনেক বেশি। [৫২৫]

আবু হুরাইরা বলতেন, তোমরা আমাকে এমন ব্যক্তির নাম বলো দেখি, যিনি কোনো নামাজ আদায় করেননি, অথচ জান্নাতি! ছাত্ররা বলতে না পারলে তিনি বলতেন, তিনি হলেন উসাইরিম বিন আশহাল। [৫২৬]

মুখাইরিক
উহুদযুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ মুশরিকদের বিরুদ্ধে মাদীনা থেকে বের হওয়ার পর মুখাইরিক ইয়াহুদিদের একত্রিত করে বলেন, আমার ইয়াহূদি ভায়েরা, তোমরা জানো আজ তোমাদের ওপর আবশ্যক হলো মুহাম্মাদকে সাহায্য করা। তারা বলল, আজ তো শনিবার? তিনি বলেন, তোমাদের জন্য কোনো শনিবার নেই। এরপর তিনি ঢাল-তরবারি নিয়ে রওনা করার আগে বলেন, আমার কিছু হলে আমার সম্পদগুলো মুহাম্মাদকে দিয়ে দেবে। তিনি যেখানে ইচ্ছা খরচ করবেন। এ কথা বলে আল্লাহ্র রাসূলের উদ্দেশে বের হন, তার পক্ষে যুদ্ধ করতে করতে মারা যান। নবিজি তার লাশ দেখে বলেন, মুখাইরিক ইয়াহুদিদের মাঝে শ্রেষ্ঠ।

তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ইমাম যাহাবি তাজরীদ গ্রন্থে, ইবনু হাজার ইসাবাহ গ্রন্থে ওয়াকিদি থেকে বর্ণনা করেন মুখাইরিক মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাওদুল আনফ গ্রন্থে সুহাইলি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ড. ‘আবদুল্লাহ শাকারি এই বিষয়টি তাহকীক করেছেন। তিনি এদিকটিতে প্রাধান্য দিয়েছেন যে, মুখাইরিক মুসলিম হয়েছিলেন এবং মুসলিম শহিদদের সঙ্গে তাকে দাফন করা হয়। তার সম্পদের আধিক্যসত্ত্বেও সমুদয় মাল সাদাকাহ করা হয়—অথচ সম্পদের প্রতি ইয়াহুদিদের ভালোবাসা এবং এর দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা কারও কাছে অবিদিত নয়। [৫২৭]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
মুসলিম বাহিনীতে থেকে যারা যুদ্ধ করেছে, তাদের একজন কুযমান। বীরত্বে বেশ খ্যাতি ছিল তার। উহুদের দিন সে যুদ্ধে আসতে দেরি করছিল। তার হেঁয়ালিপনা দেখে বনু যুফারের মহিলারা তিরস্কার করে বলতে থাকে। নারীদের কটাক্ষের সামনে সে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। অবশেষে নবিজি যখন সাহাবিদের সারিবদ্ধ করছিলেন, তখন সে উহুদে এসে উপস্থিত হয়। সবাইকে পাশ কেটে সামনে চলে আসে। শুরু হয় যুদ্ধ। সে-ই প্রথম মুসলিমদের মধ্য থেকে তির নিক্ষেপ করে। তির শেষ হয়ে গেলে তরবারি কোষমুক্ত করে চলে আসে মুখোমুখি আক্রমণে।

সাত থেকে নয়জন শত্রু তার কাছে ধরাশায়ী হয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে। লড়তে গিয়ে একসময় কুযমানও মারাত্মক আঘাত পায়। কাতাদা ইবনু নু'মান তাকে ডেকে বলেন, আবুল গাইদাক, শাহাদাতের ময়দানে তোমাকে আমন্ত্রণ। অনেক মুসলিমও তাকে বলছিলেন, আজ তুমি কাজ দেখিয়েছ, কুযমান; সুসংবাদ গ্রহণ করো। কুযমান বলল, কীসের সুসংবাদ? আমি তো আমার গোত্র বাঁচাতে লড়াই করেছি। আমার জাতির ব্যাপারে আশঙ্কা না হলে এখানে আসতাম না। এ কথা আল্লাহর রাসূলকে বলা হলে তিনি বলেন, সে জাহান্নামে যাবে; আল্লাহ তা'আলা ফাজির লোক দিয়েও তার দীনকে সাহায্য করেন।

আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল; এখানে জিহাদের ক্ষেত্রেও নিয়তের গুরুত্বের ব্যাপারটি আমরা বুঝতে পারি। অনুমিত হচ্ছে, নিজ গোত্র রক্ষা করা কিংবা খ্যাতির জন্য আমল করলে সে আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না。

টিকাঃ
৫১৭. বুখারি, মাগাযি, হাদীস নং ৪০৭২
৫১৮. আল-মুসনাদ, ১/২৭১, হাদীস নং ২৪৪৫
৫১৯. সুনান ইবন মাজাহ, জানাযা অধ্যায়, হাদীস নং ১৫৯১
৫২০. মুসলিম, আদব অধ্যায়, হাদীস নং ২১৩২
৫২১. বুখারি, মাগাযি, হাদীস নং ৪০৭২
৫২২. আল-মুসতাদরাক, ৩/২০০, সনদ সহীহ।
৫২৩. যাদুল মাআদ, ৩/২১২
৫২৪. গায়াতুল মাকসুদ, আবু ফারিস, পৃ. ১১৭
৫২৫. বুখারি, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ২৮০৮
৫২৬. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম ৩/১০০, ১০১
৫২৭. আল-ইয়াদ ফিস শামাইলিল মুহাম্মাদিয়্যাহ, ১/৩০৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px