📄 ইসলামি রাষ্ট্রের বিদ্রোহীদের নির্মূল
ইসলামবিদ্বেষী সশস্ত্র যোদ্ধার চেয়েও ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো উসকানিদাতারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, তারা না থাকলে নৈরাজ্যের সূত্রপাতই হতো না। তাই নৈরাজ্য দমন ও সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূল তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করেন। বদরযুদ্ধের পর এমন অনেক নৈরাজ্যবাদীকে হত্যা করা হয়। তারা হলো—
আসমা বিনতু মারওয়ান
রাসূলের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর কাজে কুখ্যাত ছিল 'আসমা বিনতু মারওয়ান। উমাইর বিন আদি আল-খাতমির হাতে নিহত হয় সে। তার মৃত্যুতে চিন্তামুক্ত হন রাসূল। তাকে হত্যাকারী সাহাবিকে তিনি বলেন, হে উমাইর, তুমি আল্লাহ ও রাসূলের সাহায্য করেছ। 'উমাইর বলেন, তাকে একটি বর্শার আঘাতেই শেষ করে দিয়েছি। তার হত্যার কারণে বনু খাতমার অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করে এবং অনেকে প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়।
আবু আফক আল-ইয়াহুদির মৃত্যুদণ্ড
আবু আফক ছিল বনু আমর বিন আউফ গোত্রের এক অশীতিপর বৃদ্ধ। এই পাপীষ্ঠ ইয়াহুদি রাসূলের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃত্তি করে মানুষকে ক্ষেপাত। তার কাব্যাত্যাচারে বিরক্ত হয়ে রাসূল বলেন, এই পিশাচ থেকে আমাকে রক্ষা করার কেউ কি আছে? রাসূলের ডাকে সালিম বিন উমাইর সাড়া দিয়ে তাকে হত্যা করেন।
কা'ব বিন আশরাফের মৃত্যুদণ্ড
রাসূলের বিরুদ্ধে উসকানিদাতা কা'ব বিন আশরাফ ছিল ত্বাই গোত্রের অন্তর্গত বনু নাবহান বংশের লোক। জাহিলি যুগে খুনের দায়ে তার বাবা মাদীনায় পালিয়ে আসে। বনু নাযীরের সঙ্গে মৈত্রী করে আবুল হাকীকের কন্যা আকিলাকে বিয়ে করে। আকিলার গর্ভে কা'বের জন্ম হয়। সে ছিল ইসলামবিদ্বেষী এক কবি। বদরযুদ্ধে কুরাইশদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ে সে-ই সবচেয়ে বেশি মনঃক্ষুণ্ণ হয়।
মাক্কায় গিয়ে রাসূলের ব্যাপারে আরও জোরেশোরে অপপ্রচার চালানো শুরু করে কা'ব। শোকাতুর কুরাইশদের তাদের নিহতদের কথা স্মরণ করিয়ে উসকানি দেয়। রাসূল ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরও প্রতিশোধপিপাসু করে তোলে। [৪৯৬]
কা'ব বিন আশরাফের বিরুদ্ধে হাসসান বিন সাবিতের প্রচারযুদ্ধ সফল হয়। পাপিষ্ঠ কা'বের বিরুদ্ধে হাসসান বিন সাবিতের রচিত কবিতার কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো—
কা'বের জন্য শুধুই কান্না হয়, কে আছ শিক্ষা নেবে,
তার যন্ত্রণাময় জীবনের কান্না শোনার মতো কেউ নেই
আমি বদর প্রান্তে দেখেছি লাশের সারি পড়ে আছে,
আহা বেচারির চোখ তাদের জন্য সমবেদনায় কেঁদেছে।
আমি দুগ্ধপোষ্য এক শিশুকে কাঁদিয়েছি, সে দেখতে কেমন
সে দেখতে অনেকটা কুকুর ছানার মতো, হ্যাঁ, এমনই।
দয়াময় রাহমান আমাদের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন, আমরা পরিতৃপ্ত,
আর এক জাতিকে মৃত্যুর স্বাদ বুঝিয়ে লাঞ্চিত করেছেন।
কা'ব বিন আশরাফের পরিণতি
রাসূল ﷺ, সাধারণ মুসলিম ও পুণ্যবতী রমণীদের নিয়ে চরম অশ্লীল কবিতা রচনা, বিশ্বাসঘাতকতাসহ নানা অপরাধ করে পাপিষ্ঠ ইয়াহূদি কা'ব বিন আশরাফ। তার অপরাধসমূহ রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ার কারণে সে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়। এ জাতীয় গুরুতর অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কীই-বা হতে পারে!
রাসূলের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে মিত্রতা, নিহত মুশরিকদের জন্য মার্সিয়া আবৃত্তি করা, সাহাবিদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া ইত্যাদি কারণে মুসলিমদের সঙ্গে ইয়াহুদি কা'ব বিন আশরাফের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়ে যায় এবং সে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী বলে বিবেচিত হয়। তার সকল অপরাধ বিবেচনা করে রাসূল তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। [৪৯৭]
কা'ব বিন আশরাফের মৃত্যুদণ্ডে ইয়াহুদিদের প্রতিক্রিয়া
মাদীনাজুড়ে কা'ব বিন আশরাফের হত্যার ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে ইয়াহূদি পণ্ডিতেরা রাসূলের নিকট ছুটে আসে। সাহাবিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তোলে তারা। তাদের খুব একটা পাত্তা না দিয়ে রাসূল বলেন, তার হত্যা তার কুকর্মেরই পরিণাম। এ ঘটনার পর সমগ্র ইয়াহূদিসমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বরেণ্য ইয়াহুদিরা দুর্গ থেকে বের হতেই ভয় পেত। মাদীনায় চলাফেরা করতেও মুসলিমদের গুপ্তঘাতের ভয়ে তটস্থ থাকত। একপর্যায়ে তারা চুক্তি নবায়নে বাধ্য হয়।
কা'বের পরিণতি দেখে ইয়াহুদিদের মনে ভীষণ ভয় ঢুকে যায়; কিন্তু ভালো হওয়ার পরিবর্তে ইসলামের বিরুদ্ধে নানা গোপন ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করে তারা। আসন্ন ঘটনাবলি থেকে তা পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, কা'ব বিন আশরাফের কুকর্মের কারণে পুরো বনু নাযীরকে রাসূল পাকড়াও করেননি; বরং তার একার চুক্তিভঙ্গের পরিণাম হিসেবে সে একাই গুপ্তঘাতের শিকার হয়। [৪৯৮]
টিকাঃ
৪৯৬. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ৩/৬১, ৬২
৪৯৭. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৫/৫৬, ৫৭
৪৯৮. আস-সারায়া মাআল ইয়াহুদ, ১/১২৬
📄 কয়েকটি সামাজিক ঘটনাবলি
'উমার-কন্যা হাফসাকে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে
'উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, খুনাইস বিন হুযাফা আস-সাহমির মৃত্যুতে আমার মেয়ে হাফসা আকস্মিক বিধবা হয়ে পড়ে। তার স্বামী রাসূলের সাহাবি ছিলেন। মাদীনায় মারা যান তিনি। হাফসার বিয়ের কথা ভেবে 'উসমান বিন 'আফ্ফানের সঙ্গে দেখা করি আমি। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিই। আমার প্রস্তাব শুনে তিনি ভেবে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। কয়েক রাত কেটে যাওয়ার পর আবার তার সঙ্গে আমার দেখা। তিনি আমাকে জানান, আপাতত আমি বিয়ের কথা ভাবছি না।
'উমার বলেন, তারপর আবু বাক্স সিদ্দীকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলি, আপনি চাইলে হাফসাকে আপনার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবো। আবু বাক্ নীরব থাকেন। আমার প্রস্তাবে কোনো উত্তরই দেননি তিনি। তার আচরণে আমি 'উসমানের চেয়েও ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণ হই। এভাবে কয়েক রাত কেটে যায়। তারপর রাসূলের কাছ থেকে প্রস্তাব এলে হাফসাকে আমি তাঁর সঙ্গে বিয়ে দিই। [৪৯৯]
ফাতিমার সঙ্গে 'আলির বিয়ে
'আলি বিন আবি তালিবের দাসী বুঝতে পারেন যে ফাতিমা বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূলের নিকট তাঁর বেশকিছু বিয়ের প্রস্তাবও চলে এসেছে। দাসী তাকে বলেন, আপনি কি জানেন, আল্লাহর রাসূলের নিকট ফাতিমার জন্য একজন বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে? আলি বলেন, না। সে বলে, হ্যাঁ, সত্যিই ফাতিমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আপনি তাহলে রাসূলের নিকট তাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন না কেন? আপনি গেলেই তিনি আপনার সঙ্গে তাকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। তার কথায় আলি বলেন, ফাতিমাকে বিয়ে করার মতো আমার কী আছে? সে বলে, আপনি রাসূলের নিকট গেলেই আপনার কাছে বিয়ে দেবেন।
আলি বলেন, আল্লাহর শপথ, সে আমাকে পীড়াপীড়ি করেই যাচ্ছিল। অবশেষে আমি রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাঁর সামনে বসে আমি আড়ষ্ট হয়ে যাই। তাঁর সম্মান ও ব্যক্তিত্বের সামনে কিছুই বলতে পারি না। আমাকে দেখে রাসূল জানতে চান, কেন এসেছ? কী প্রয়োজনে এসেছ? তারপর একটু থেমে তিনি বলেন, মনে হয়, তুমি ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ? আমি বলি, জি। তিনি আমার সম্মতি পেয়ে জানতে চান, ওকে বৈধ করে নেওয়ার মতো (মোহরানা) তোমার কাছে কি কিছু আছে? আমি উত্তর দিই, জি না হে রাসূল, আমার কাছে কিছুই নেই। আমার দীনতার কথা শুনে জানতে চান— আমার দেওয়া বর্মটা কোথায়? হঠাৎ ওটার কথা মনে আসে; আলির প্রাণধারকের শপথ, ওটা জরাজীর্ণ, ওটার দাম চার দিরহামও হবে না। তারপর আমি উত্তর দিই, ওটা আমার কাছে আছে। তিনি বলেন, ফাতিমাকে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম। বর্মটা তার নিকট পাঠিয়ে দাও। বর্মটার বিনিময়ে তাকে তুমি স্ত্রী করে নাও।
হাসান ইবনু 'আলির জন্ম
ইমাম কুরতুবি বলেন, হাসান প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছেন ৪র্থ হিজরিতে। হাসানের জন্মের পর এ বছরেই শেষের দিকে জন্ম হয় হুসাইন-এর। নববি বলেছেন, ৪র্থ হিজরির শা'বান মাসের ৫ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন হাসান।
'আলি বলেন, হাসান জন্মের পর আমি ওর নাম রাখি হারব। আল্লাহর রাসূল এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ছেলেকে নিয়ে এসো, দেখি কী নাম রেখেছ? বললাম, ওর নাম রেখেছি হারব। নবিজি বললেন, ওর নাম বরং হাসান। [৫০০]
যাইদ বিন সাবিত এর ঘটনা
চতুর্থ হিজরিতে তিনি ইয়াহুদিদের ভাষা শিক্ষা করেন। এ বছরেই যাইদ বিন সাবিত ইয়াহুদিদের ভাষা শিখেন। খারিজা বিন যাইদ থেকে বর্ণিত, যাইদ বিন সাবিত বর্ণনা করেন, ইয়াহুদিদের পাঠানো চিঠি যেন লোকদের সামনে পাঠ করে শোনানো যায়, এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইয়াহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। তিনি মাত্র ১৫ দিনে এই ভাষা শিখে ফেলেন।
আরেকটি বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রাসূল মাদীনায় আসার পর যাইদ-কে তার কাছে নিয়ে আসা হয়। লোকেরা বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, বনু নাজ্জারের এই বালক ইতোমধ্যে আপনার ওপর অবতীর্ণ হওয়া ১০টির বেশি সূরা মুখস্থ করেছে। রাসূলুল্লাহ মুগ্ধ হয়ে বলেন, যাইদ, আমার জন্য তুমি ইয়াহুদিদের ভাষা শেখো। কেননা (বার্তায় ও চুক্তিপত্রে) ইয়াহুদিদের লেখা আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
যাইদ বলেন, নবিজির জন্য আমি তাদের ভাষা রপ্ত করি। ১৫ দিন কেটে যাওয়ার আগেই আমি বেশ দক্ষতা অর্জন করি। ইয়াহুদিরা চিঠি পাঠালে আমি রাসূলের সামনে পাঠ করে শোনাতাম। লিখে পাঠাতাম এর প্রত্যুত্তরও।
টিকাঃ
৪৯৯. বুখারি, বিয়েশাদি অধ্যায়, হাদীস নং ৫১২২
৫০০. সিফাতুস সাফওয়াতি, ইবনুল জাওযি, ১/৮৪