📘 রউফুর রহীম 📄 বদর ও উহুদ-মধ্যবর্তী কয়েকটি যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ

📄 বদর ও উহুদ-মধ্যবর্তী কয়েকটি যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ


বদরযুদ্ধের পর আরব উপদ্বীপে মুসলিমদের সামরিক ভাবমূর্তি পরাশক্তির রূপ নেয়। এতে দুর্বল মুশরিকরা ঝুঁকির আশঙ্কা করে আর শক্তিশালী মুশরিকরা ইসলামকে একটি বিজয়ী দীন হিসেবে দেখতে শুরু করে। ফলে অনেক মানুষ ইসলামের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে—প্রসারিত হতে থাকে ইসলাম; সঙ্গে সঙ্গে কপটতা ও ধোঁকার মুখোশ পরেও অনেকে ইসলামে প্রবেশ করে। এই সার্বিক পরিস্থিতিতে নতুন ইসলামি রাষ্ট্রটি সম্প্রীতি, শত্রুতা ও কপটতায় জর্জরিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়; কিন্তু আল্লাহর অবিরাম সাহায্য ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কল্যাণে প্রতিপক্ষের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। [৪৮৫]

বনু সুলাইমের মা-উল কাদির অভিযান
বদরযুদ্ধ থেকে মাদীনায় ফেরার সাত রাত পর এই অভিযানে বের হয়ে রাসূল ﷺ বনু সুলাইমের মাউল কাদির এলাকায় পৌঁছান। এই এলাকার মানুষ রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিল; কিন্তু এই যাত্রায় কোনো যুদ্ধ হয় না। এখানে জলাশয়ের পাড়ে তিন রাত অবস্থান করে রাসূলুল্লাহ মাদীনায় ফিরে আসেন।

বদরযুদ্ধের পরপরই এই এলাকার মানুষ রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও তাকে প্রতিরোধের ঘোষণা দেয়। তাই তাদের মোকাবিলায় রাসূল ক্ষীপ্র গতিতে আকস্মিক অভিযানে বের হন। রাসূলের আগমনের খবর পেয়ে বনু সুলাইমের লোকজন ভয়ে পাহাড়ে পালিয়ে যায়। পালাবার আগে ইয়াসার নামক এক রাখালের তত্ত্বাবধানে পাঁচশো উট ফেলে রেখে যায়। রাখালসহ উটগুলো হাঁকিয়ে মাদীনা থেকে তিন কিলোমিটার দূরের সারার এলাকা পর্যন্ত নিয়ে আসেন রাসূল। সবগুলো উট সাহাবিদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। মাথাপিছু দুটি করে উট পান সাহাবিরা। অভিযানলব্ধ এক পঞ্চমাংশ ও রাখাল ইয়াসারকে ভাগে পান রাসূল; কিন্তু ইয়াসারকে তিনি মুক্ত করে দেন। [৪৮৬]

সাউয়িক অভিযান
মাক্কা থেকে নাজদের পথে দুশো অশ্বারোহী যোদ্ধা নিয়ে রাতের অন্ধকারে আবু সুফিয়ান বনু নাযীরের এলাকায় পৌঁছে। বনু নাযীরের গোত্রপ্রধান সালাম বিন মিশকাম তাদের স্বাগত জানায়। রাতের আঁধারেই তাদের ভুরিভোজ করিয়ে মুসলিমদের সম্পর্কে তথ্য দেয়। যেকোনো উপায়ে মুসলিমদের বিপদে ফেলার জন্য তারা শলাপরামর্শ করে। তারপর উরাইদ (হারা ও উকুম এলাকার একটি উপত্যকা) এলাকায় অতর্কিত আক্রমণ করে দুজন মুসলিমকে হত্যা করে খেজুরগাছ পুড়িয়ে দিয়ে মাক্কার দিকে পালিয়ে যায়। আবু সুফিয়ানের দুর্বৃত্তাচারের খবর পেয়ে রাসূল ﷺ দুশো মুহাজির ও আনসার যোদ্ধার সমন্বয়ে তাদের ধাওয়া করেন; কিন্তু আবু সুফিয়ান ও তার লোকেরা প্রাণপণে ঘোড়া হাঁকিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পালানোর সুবিধার্থে সকালের নাস্তার রসদ ছাতুবোঝাই বস্তাগুলো ফেলে দিয়ে যায়। ছাতুভর্তি বস্তাগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুসলিমরা এগুলো তুলে নেয়। সব বস্তা জমা করার পর দেখা যায়, অনেক রসদ তারা ফেলে গেছে। তাই ছাতুর অর্থেই অভিযানটির নাম দেওয়া হয় 'গাযওয়াতু সাউয়িক'। এই অভিযানেও কোনো লড়াই হয়নি। মাদীনার বাইরে পাঁচ দিন থেকে ফিরে আসেন রাসূল ﷺ। [৪৮৭]

যু-আম্র অভিযান
ইসলামি রাষ্ট্রের গোয়েন্দাবাহিনী থেকে খবর আসে, দু'সূর বিন হারিস বিন আল-মাহারিবির নেতৃত্বে সা'লাবা ও মাহারিব গোত্রের লোকজন যু-আম্র এলাকায় রাসূল ﷺ ও মাদীনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে জমায়েত হয়েছে। এই সংবাদ পেয়ে রাসূল ﷺ 'উসমান বিন আফফানকে মাদীনার গভর্নর নিযুক্ত করে যুদ্ধে বের হন। এই যুদ্ধে পদাতিক ও অশ্বারোহী মিলিয়ে সাড়ে চারশো মুসলিম যোদ্ধা অংশগ্রহণ করেন। পথিমধ্যে বনু সা'লাবার হুবার নামক এক ব্যক্তিকে তারা আটক করেন। আটকের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর রাসূলের নিকট তার গোত্রীয় লোকদের সম্পর্কে বেশকিছু স্পর্শকাতর তথ্য সরবরাহ করেন। এরপর বিলালের সান্নিধ্যে থেকে তিনি ইসলামি বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। ওদিকে সা'লাবা ও মাহারিব গোত্রের মুশরিকরা মুসলিমদের প্রতিরোধ-যাত্রার খবর পেয়ে পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যায়। নাজদ এলাকায় প্রায় এক মাস অবস্থান করেন রাসূল ﷺ। কোনো লড়াই ছাড়াই মাদীনায় ফিরে আসেন।

এ অভিযানে গোত্রপ্রধান দু'সূর বিন হারিস রাসূলের মু'জিযা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। অভিযান চলাকালে প্রচুর বৃষ্টি হলে রাসূলের বসন ভিজে যায়। বসন শুকানোর জন্য তা একটি গাছের নিচে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় দু'সূর রাসূলের সামনে খোলা তলোয়ার নিয়ে হাঁক দেয়, হে মুহাম্মাদ, আজ কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? রাসূল ﷺ উত্তর দেন, আল্লাহ। এমন সময় দু'সূরের বুকে সজোরে আঘাত করেন ফেরেশতা জিবরীল। তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যায়। এবার তলোয়ারটি হাতে তুলে নিয়ে রাসূল বলেন, বলো, এখন কে তোমায় রক্ষা করবে? সে উত্তর দেয়, কেউ না। আমি সাক্ষ্য দিই আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই আর মুহাম্মাদ তাঁর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহর শপথ, আর কোনোদিন আমি আপনার বিরুদ্ধে যাব না। তলোয়ারটি তাকে ফিরিয়ে দেন রাসূল ﷺ।

স্বদলের কাছে ফিরে যান তিনি। তাকে দেখে তারা ভর্ৎসনা করে, কী হয়েছে তোমার? সে তাদের বলে, আমি মুহাম্মাদের সামনে তলোয়ার নিয়ে দাঁড়ানোমাত্রই লম্বা গড়নের এক লোক আমার বুকে প্রচণ্ড আঘাত করে। তার আঘাতের ধাক্কা সামলাতে না পেরে আমি চিত হয়ে পড়ে যাই। পরে জানতে পারি, তিনি ফেরেশতা আর আমি সাক্ষ্য দিই যে—মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর শপথ, আর কখনো আমি তাঁর বিরুদ্ধে যাব না। তারপর থেকে তার জাতিকে তিনি ইসলামের পথে আহ্বান করতে থাকেন। [৪৮৮] এই প্রসঙ্গে আয়াত অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন— হে ঈমানদারগণ, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন একটি সম্প্রদায় তোমাদের দিকে তাদের হাত বাড়াতে চেয়েছিল; কিন্তু তিনি তোমাদের থেকে তাদের হাত নিবৃত করেছিলেন। আল্লাহকে ভয় করো; ঈমানদাররা যেন আল্লাহর ওপরই নির্ভর করে। [সূরা মায়িদা, ৫: ১১]

বাহরান অভিযান
হিজরি তৃতীয় বর্ষের জুমাদাল উলা মাসে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনশো মুসলিম যোদ্ধা নিয়ে রাসূল বনু সুলাইমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মাক্কা-মাদীনার মধ্যবর্তী বাহরান এলাকায় পৌঁছেন। রাসূলের আগমনের পূর্বেই তারা পালিয়ে যায়। তাদের না পেয়ে রাসূল ফিরে আসেন। এই অভিযানে তিনি দশ রাত অতিবাহিত করেন।

এ সকল অভিযানে ইসলামি নেতৃত্বের শত্রু দমনের সক্ষমতা, দক্ষতা ও সুপরিকল্পনা প্রমাণিত হয়। কীভাবে রাসূল ﷺ নতুন ইসলামি রাষ্ট্রের এ সকল শত্রুদের সূচনাতেই শান্ত করে দিয়েছেন! নয়তো মাদীনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এরা ক্ষুদ্র থেকে দৈত্যাকার রূপ ধারণ করত। উত্তপ্ত মরুভূমিতে এই অভিযানগুলো পরিচালনার ফলে সাহাবিদের চরিত্র উন্নয়নের প্রশিক্ষণ হয়। রাসূলের নেতৃত্বের কল্যাণে অভিযানগুলো নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। সাহাবিদের জন্য এসব বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক প্রশিক্ষণসমূহ অব্যাহত রাখেন রাসূলুল্লাহ। এ সকল প্রশিক্ষণ পাঁচ দিন থেকে শুরু করে মাসব্যাপী চলত। এতে তাদের দলগত জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বিনা বাক্যে রাসূলের প্রতি আনুগত্যের চর্চা, আত্ম-উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি হয়; অর্জন হয় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, যা তাদের সত্যের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার দমনে সহযোগিতা করে। [৪৮৯]

কুরাদা অভিমুখে যাইদ বিন হারিসার অভিযান
বদরযুদ্ধে পরাজয়ের পর শাম দেশে নিজেদের ব্যবসাপাতি টিকিয়ে রাখার জন্য মক্কার মুশরিকরা বিকল্প রাস্তা খুঁজতে শুরু করে। এ ব্যাপারে তারা পরামর্শ করে। কেউ কেউ ইরাকের নাজদের পথে চলাচলের পরামর্শ দেয়। পরামর্শ অনুযায়ী পথটি ধরে নেমে পড়ে আবু সুফিয়ান বিন হারব, সাফওয়ান বিন উমাইয়া ও হুয়াইতিব বিন 'আবদুল উয্যার সমন্বিত একদল ব্যবসায়ী। প্রায় এক লক্ষ দিরহাম সমমূল্যের পসরা ও রুপা নিয়ে তারা বাণিজ্যযাত্রায় বের হয়। ইসলামি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সালিত বিন নু'মানের সূত্রে সংবাদ পেয়ে রাসূল ﷺ বণিক কাফেলার গতিরোধ করতে যাইদ বিন হারিসাকে একশো অশ্বারোহী সৈন্যসহ পাঠান। মুসলিমবাহিনী নাজদের কুরাদা নামক জলাশয়ের কাছে তাদের দেখতে পায়। মুসলিম সৈন্যদল দেখে সেই কাফেলা ভয়ে পালিয়ে যায়; ফেলে যায় তাদের সদাইপাতি ও পণ্যসামগ্রী। সেগুলো গানীমাতরূপে গ্রহণ করে মুসলিমরা আর তাদের কাফেলার পথপ্রদর্শক ফুরাত বিন হাইয়ানকে বন্দি করা হয়। পরবর্তীকালে তিনি রাসূলের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। গানীমাত নিয়ে মুসলিমরা মাদীনায় ফিরে আসেন। এক-পঞ্চমাংশ নিজের জন্য রেখে বাকি গানীমাত রাসূল ও অভিযানের সদস্যদের মাঝে বণ্টন করে দেন। [৪৯০]

বনু কাইনুকা অভিযান
ইবনু শিহাব যুহরির মতে দ্বিতীয় হিজরি সনে এই অভিযান পরিচালিত হয়; আর ওয়াকিদি ও বিন ইসহাকের মতে শাওয়াল মাসের দ্বিতীয়ার্ধ শনিবারে চালানো হয় অভিযানটি। তবে অধিকাংশ সীরাতবিদ ও রাসূলের সমর-ইতিহাসবিদ এই ব্যাপারে একমত যে, বদরযুদ্ধের পরেই এই অভিযান চালানো হয়। কারণ, বদরের পরপরই রাসূলের সঙ্গে নিজেদের চুক্তি ভঙ্গ করতে শুরু করে বনু কাইনুকার ইয়াহুদিরা। চুক্তির শর্তসমূহ অমান্য করে রাসূল ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতা প্রদর্শন করে তারা। তাদের ধৃষ্টতা ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখে রাসূল তাদের মাদীনার বাজারে সমবেত করে উপদেশ দেন। ইসলামের দিকে আহ্বান করেন এবং বদর রণাঙ্গনে কুরাইশদের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে সতর্ক করে দেন; কিন্তু চুক্তি অনুসারে রাসূলের প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার না করে তারা নবিজির প্রতি হুমকি ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। শিষ্টাচারের সীমালঙ্ঘন করে রাসূলকে বলে, হে মুহাম্মাদ, আপনি এই ভেবে প্রতারিত হবেন না যে, এক দল বোকা কুরাইশকে হত্যা করতে পেরেছেন। আমাদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামলে বুঝতে পারবেন, আমাদেরই আসল যোদ্ধা। আমাদের মতো যোদ্ধার মুখোমুখি কখনো আপনি হননি।

এভাবেই সংকট বাড়তে থাকে। কারণ, তারা চুক্তি রক্ষার পরিবর্তে লঙ্ঘনই করে যাচ্ছিল; বরং তারা শত্রুতামূলক আচরণ করছিল। এমন বিশ্বাসঘাতকতা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আয়াত অবতীর্ণ হয়, অবিশ্বাসীদের বলো, তোমাদের শিগগিরই পরাজিত করা হবে এবং একত্র করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেটা বড় খারাপ ঠিকানা। (যুদ্ধক্ষেত্রে) মিলিত হওয়া দুটো দলের মধ্যে তোমাদের জন্য অবশ্যই এক নিদর্শন আছে। একটি দল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিল আর অন্যটি ছিল কাফিরদের দল, যারা তাদের (ঈমানদারদের) চোখের দেখায় তাদের (নিজেদের) দ্বিগুণ দেখছিল। আর আল্লাহ যাকে চান, স্বীয় সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় ওই ঘটনার মধ্যে দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১২-১৩] [৪৯১]

যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণসমূহ
বদরযুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় ও ইয়াহুদিদের উদ্দেশে রাসূলের উপদেশ প্রদানের পর বনু কাইনুকার ইয়াহুদিরা গোপনে গোপনে মুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গের পরিকল্পনা করে এবং মুসলিমদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানোর চেষ্টা করে। একসময় তারা এর ঘৃণ্য সুযোগও পেয়ে যায়। একবারের কথা। জনৈক আরব নারী তার পণ্য নিয়ে বনু কাইনুকা গোত্রের বাজারে বিক্রি করতে আসেন। পণ্য বিক্রি শেষে ওই বাজারেই এক অলংকারীর দোকানে যান। দোকানের লোকেরা তার মুখের নিকাব খুলতে বললে তিনি নিকাব খুলবেন না বলে জানিয়ে দেন। এতে অলংকারী চুপি চুপি ওই নারীর কাপড়ের এক কোণ তার পিঠের সঙ্গে বেঁধে দেয়। তারপর ওই নারী দাঁড়াতে গেলে গিটের কারণে নিকাব খুলে যায়। তার বিব্রতকর দৃশ্য দেখে দোকানের ইয়াহুদিরা হো হো করে হেসে ওঠে। একজন নারীর অসহায় অবস্থা দেখে সেখানে থাকা এক মুসলিম অলংকারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক আঘাতেই অলংকারীকে হত্যা করে ফেলে। এ অবস্থায় ইয়াহুদিরাও মুসলিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে মুসলিমরা নিজেদের লোকদের ইয়াহুদিদের বিরুদ্ধে ডাকতে থাকে। এতে মুসলিমরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে এগিয়ে এলে দুপক্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংবাদ পেয়ে মুহাজির ও আনসারদের সমন্বিত একদল যোদ্ধা নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন রাসূল ﷺ। তখন সময় দ্বিতীয় হিজরি সনের শাওয়াল মাসের প্রথমার্ধের এক শনিবার ছিল। সেদিন মুসলিমবাহিনীর পতাকা ধারণ করেন হামযা বিন 'আবদুল মুত্তালিব। অভিযানে বের হওয়ার সময় আবু লুবাবা বিন 'আবদুল মুনযির আল-'উমারিকে মাদীনার গভর্নর নিযুক্ত করেন রাসূল ﷺ। আর যাওয়ার আগে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী রাসূল তাদের সঙ্গে কৃত-অঙ্গীকারও ছুড়ে ফেলেন। [৪৯২]

অবরোধের কবলে বনু কাইনুকা
রাসূলের আগমনের খবর শুনে বনু কাইনুকার লোকজন দুর্গের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। ইবনু হিশামের তথ্য মতে—এই পরিস্থিতিতে তাদের প্রায় দুই সপ্তাহ অবরোধ করে রাখেন রাসূল ﷺ। রাসূলের অবরোধ-পদ্ধতি দেখে দিশেহারা হয়ে যায় ইয়াহুদিরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধের কারণে খাদ্যদ্রব্যের অভাবে নিরাশা ও দুশ্চিন্তায় পড়ে দিশেহারা হয়ে তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে আসে। এমন অবস্থায় তারা রাসূলের মোকাবিলা করার চিন্তাই ছেড়ে দেয়—যদিও ইতঃপূর্বে রাসূল ও সাহাবিদের তারা হুমকি দিত আর কুরাইশদের চেয়েও বড় যোদ্ধাজাতি বলে আত্মপ্রচার করত নিজেদের। দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসার পর তাদের পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলার নির্দেশ দেন রাসূল ﷺ এবং মুনযির বিন কুদামা আস-সুলামি আল-আওসিকে তাদের প্রহরায় নিযুক্ত করেন। [৪৯৩]

বনু কাইনুকার ইয়াহুদিদের পরিণতি
বনু কাইনুকার ইয়াহুদিদের বন্দিদশা দেখে কুচক্রী মুনাফিক-নেতা ইবনু উবাইয়ের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। তাদের বন্ধন খুলে দেওয়ার জন্য সে মুনযিরকে নির্দেশ দেয়। তার কথা শুনে মুনযির বলেন, রাসূলের বেঁধে রাখা লোকদের ছাড়ানোর জন্য আপনি এসেছেন? আল্লাহর কসম করে বলছি, যে তাদের বন্ধন খুলবে, তাকে শেষ করে ফেলব। মুনযিরনের সঙ্গে না পেরে একপ্রকার বাধ্য হয়ে সে কাইনুকার ইয়াহুদিদের মুক্তির ব্যাপারে রাসূলের নিকট গিয়ে হাজির হয়। আল্লাহর রাসূলকে সে বলে, হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি দয়া করুন (খাযরাজ গোত্রের সঙ্গে কাইনুকার ইয়াহুদিদের মৈত্রী ছিল)। মুনাফিক নেতার অনুরোধ শুনে তিনি নীরব থাকেন। সে আবার বলে, হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি দয়া করুন। এবার তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন রাসূল ﷺ। তার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেন না তিনি। এ অবস্থা দেখে সে রাসূলের বর্মের পকেটে নিজ হাত ভরে দিয়ে তাঁকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। রাগে ক্ষোভে রাসূলের গাল লাল হয়ে যায়। তাকে ধমকে বলেন, ছাড়ো আমাকে! তিনি আবার বলেন, ধিক তোমায়, ছাড়ো বলছি আমাকে। ইবনু উবাই নাছোড়বান্দা। সে রাসূলকে ছাড়ে না। সে বলে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার মিত্রদের প্রতি দয়া না করলে আমি আপনাকে ছাড়ব না। ওরা সাতশো জন বন্দি। চারশো বর্মহীন লোক আর তিনশো বর্মধারী। ওরা সুখে-দুঃখে আমাদের পাশে থেকেই শত্রু প্রতিহত করত। আমি আশা করব, এক প্রভাতের ভেতরেই আপনি ওদের মুক্তি দেবেন। আমার ভয় হচ্ছে, ওরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অবশেষে ইবনু উবাইয়ের কাকুতি মিনতি শুনে রাসূল বলেন, যাও, ওদের নিয়ে যাও।
তাদের মুক্তি দিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেন রাসূল ﷺ। তাদের সকল সম্পদ রাসূল ও মুসলিমরা ভাগ করে নেন। গানীমাত জমা ও গণনার দায়িত্ব পান মুহাম্মাদ বিন মাসলামা। বনু কাইনুকার ইয়াহুদিদের নির্বাসনের শাস্তি রদ করার জন্য ইবনু উবাই আবার তদবীর শুরু করে। তাদের নিজ এলাকায় বহাল রাখার জন্য সে রাসূলের সঙ্গে দেখা করতে যায়। রাসূলের বাড়িতে গিয়ে দেখে দরজায় কঠোর নিরাপত্তা দিচ্ছেন 'উয়াইম বিন সাইদা আল-আনসারি আল-আউসি। ইবনু উবাইকে থামিয়ে দিয়ে 'উয়াইম বলেন, রাসূলের অনুমতি ছাড়া ঢুকতে পারবে না। ইবনু উবাই তাকে ধাক্কা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ঠেকান। ধস্তাধস্তির কারণে দেওয়ালের সঙ্গে লেগে ইবনু উবাইয়ের চেহারায় চোট লেগে রক্ত বের হয়। [৪৯৪]

বনু কাইনুকার সঙ্গে উবাদা বিন সামিতের মৈত্রীচ্ছেদ
বনু কাইনুকার সঙ্গে বনু 'আওফের উবাদা বিন সামিত ও খাযরাজ বংশের 'আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলের মৈত্রীচুক্তি ছিল। বনু কাইনুকার ইয়াহুদিরা বিশ্বাসভঙ্গ করলে তাদের সঙ্গে মৈত্রীচ্ছেদ করেন উবাদা বিন সামিত; কিন্তু চুক্তি ধরে রাখেন খাযরাজ বংশের 'আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল।
রাসূলের নিকট গিয়ে বনু কাইনুকার সঙ্গে মৈত্রীচ্ছেদের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেন উবাদা বিন সামিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মৈত্রী থাকবে আল্লাহ, রাসূল ও মু'মিনদের সঙ্গে, অন্য কারও সঙ্গে নয়। অবিশ্বাসী ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে আমার কোনো মৈত্রী নেই। বনু কাইনুকার ইয়াহুদিদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেলে রাসূল উবাদা বিন সামিতকে তা তদারকি করার নির্দেশ দেন। উবাদা বিন সামিতকে দেখে বনু কাইনুকার ইয়াহুদিরা বলে, ওহে আবুল ওয়ালিদ, আউস ও খাযরাজ বংশের ভেতরে তুমি আমাদের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক কাজ করতে পারলে! অথচ আমরা তো তোমার মিত্র ছিলাম। তাদের কথা শুনে উবাদা বলেন, তোমরাই তো আগে রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছ।
বনু কাইনুকার ইয়াহুদিদের সঙ্গে উবাদা বিন সামিত ও 'আবদুল্লাহ ইবনু উবাই বিন সালুলের একই সমান মৈত্রী ছিল। উবাদা বিন সামিতের মৈত্রীচ্ছেদের কথা শুনে ইবনু উবাই বলে, তুমি কি তোমার মিত্রদের সম্পর্কচ্ছেদ করেছ? আর মৈত্রীচ্ছেদ তোমার হাতে নয়। তারপর সে নানা দুঃসময়ের কথা মনে করিয়ে বলল, তখন কিন্তু তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। উবাদা বলেন, আবুল হুবাব (ইবনু উবাইর আরেক নাম), মনের অবস্থা বদলে গেছে, তাই চুক্তিগুলোও মুছে ফেলেছে ইসলাম। সাবধান, মনে রেখো, তুমি এমন একটা বিষয় আঁকড়ে ধরে আছ, আগামীদিনই যার বিপরীত চিত্র দেখতে পাব আমরা। কাইনুকার লোকজন বলে, হে মুহাম্মাদ, লোকজনের কাছে আমাদের অনেক ঋণের পাওনা আছে। আমাদের একটু পাওনা উসুলের সময় দিন। রাসূল বলেন—বাদ দাও ঋণ, তাড়াতাড়ি ভাগো। তাদের নির্বাসন-যাত্রা তদারকি করেন উবাদা বিন সামিত। তার নিকট প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় চায় তারা। তিনি ধমকে বলেন, তোমাদের একপ্রহরও অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে না। তোমাদের তিনদিন সময় দিলাম; এর ভেতরেই প্রস্তুত হয়ে নাও। এটা আল্লাহর রাসূলের আদেশ। আমি হলে তোমাদের কোনো সময়ই দিতাম না। তিনদিন পর তারা শামের পথ ধরে চলে যায়। তিনি বলেন, তারা অনেক দূরে চলে যায়। সিরিয়ার ইযরা'আত এলাকায় গিয়ে আবাসন গড়ে। আর তাদের খালফ আয-যুবাব এলাকায় রেখে উবাদা বিন সামিত ফিরে এসেছিলেন। [৪৯৫]

টিকাঃ
৪৮৫. আল-আসাসু ফিস সুন্নাতি ওয়া ফিকহিহা: আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ১/৫১২
৪৮৬. আত-তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারি, পৃ. ২৭৭
৪৮৭. সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/৫১; আত-তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারি, পৃ. ২৭৮, ২৭৯
৪৮৮. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/৩
৪৮৯. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৩/১১৮, ১১৯
৪৯০. ইবনু হিশাম রচিত সীরাত, ৩/৫৬
৪৯১. তারীখ আত-তাবারি, ২/৪৮১
৪৯২. সীরাতে ইবনে হিশাম, ৩/৫৫
৪৯৩. আল-ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ, ১/২৮০
৪৯৪. আস-সারায়া মাআল ইয়াহুদ, আবু ফারিস, ১/১৪৮
৪৯৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/৩০২

📘 রউফুর রহীম 📄 ইসলামি রাষ্ট্রের বিদ্রোহীদের নির্মূল

📄 ইসলামি রাষ্ট্রের বিদ্রোহীদের নির্মূল


ইসলামবিদ্বেষী সশস্ত্র যোদ্ধার চেয়েও ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো উসকানিদাতারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, তারা না থাকলে নৈরাজ্যের সূত্রপাতই হতো না। তাই নৈরাজ্য দমন ও সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূল তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করেন। বদরযুদ্ধের পর এমন অনেক নৈরাজ্যবাদীকে হত্যা করা হয়। তারা হলো—

আসমা বিনতু মারওয়ান
রাসূলের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর কাজে কুখ্যাত ছিল 'আসমা বিনতু মারওয়ান। উমাইর বিন আদি আল-খাতমির হাতে নিহত হয় সে। তার মৃত্যুতে চিন্তামুক্ত হন রাসূল। তাকে হত্যাকারী সাহাবিকে তিনি বলেন, হে উমাইর, তুমি আল্লাহ ও রাসূলের সাহায্য করেছ। 'উমাইর বলেন, তাকে একটি বর্শার আঘাতেই শেষ করে দিয়েছি। তার হত্যার কারণে বনু খাতমার অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করে এবং অনেকে প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়।

আবু আফক আল-ইয়াহুদির মৃত্যুদণ্ড
আবু আফক ছিল বনু আমর বিন আউফ গোত্রের এক অশীতিপর বৃদ্ধ। এই পাপীষ্ঠ ইয়াহুদি রাসূলের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃত্তি করে মানুষকে ক্ষেপাত। তার কাব্যাত্যাচারে বিরক্ত হয়ে রাসূল বলেন, এই পিশাচ থেকে আমাকে রক্ষা করার কেউ কি আছে? রাসূলের ডাকে সালিম বিন উমাইর সাড়া দিয়ে তাকে হত্যা করেন।

কা'ব বিন আশরাফের মৃত্যুদণ্ড
রাসূলের বিরুদ্ধে উসকানিদাতা কা'ব বিন আশরাফ ছিল ত্বাই গোত্রের অন্তর্গত বনু নাবহান বংশের লোক। জাহিলি যুগে খুনের দায়ে তার বাবা মাদীনায় পালিয়ে আসে। বনু নাযীরের সঙ্গে মৈত্রী করে আবুল হাকীকের কন্যা আকিলাকে বিয়ে করে। আকিলার গর্ভে কা'বের জন্ম হয়। সে ছিল ইসলামবিদ্বেষী এক কবি। বদরযুদ্ধে কুরাইশদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ে সে-ই সবচেয়ে বেশি মনঃক্ষুণ্ণ হয়।
মাক্কায় গিয়ে রাসূলের ব্যাপারে আরও জোরেশোরে অপপ্রচার চালানো শুরু করে কা'ব। শোকাতুর কুরাইশদের তাদের নিহতদের কথা স্মরণ করিয়ে উসকানি দেয়। রাসূল ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরও প্রতিশোধপিপাসু করে তোলে। [৪৯৬]

কা'ব বিন আশরাফের বিরুদ্ধে হাসসান বিন সাবিতের প্রচারযুদ্ধ সফল হয়। পাপিষ্ঠ কা'বের বিরুদ্ধে হাসসান বিন সাবিতের রচিত কবিতার কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো—
কা'বের জন্য শুধুই কান্না হয়, কে আছ শিক্ষা নেবে,
তার যন্ত্রণাময় জীবনের কান্না শোনার মতো কেউ নেই
আমি বদর প্রান্তে দেখেছি লাশের সারি পড়ে আছে,
আহা বেচারির চোখ তাদের জন্য সমবেদনায় কেঁদেছে।
আমি দুগ্ধপোষ্য এক শিশুকে কাঁদিয়েছি, সে দেখতে কেমন
সে দেখতে অনেকটা কুকুর ছানার মতো, হ্যাঁ, এমনই।
দয়াময় রাহমান আমাদের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন, আমরা পরিতৃপ্ত,
আর এক জাতিকে মৃত্যুর স্বাদ বুঝিয়ে লাঞ্চিত করেছেন।

কা'ব বিন আশরাফের পরিণতি
রাসূল ﷺ, সাধারণ মুসলিম ও পুণ্যবতী রমণীদের নিয়ে চরম অশ্লীল কবিতা রচনা, বিশ্বাসঘাতকতাসহ নানা অপরাধ করে পাপিষ্ঠ ইয়াহূদি কা'ব বিন আশরাফ। তার অপরাধসমূহ রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ার কারণে সে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়। এ জাতীয় গুরুতর অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কীই-বা হতে পারে!
রাসূলের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে মিত্রতা, নিহত মুশরিকদের জন্য মার্সিয়া আবৃত্তি করা, সাহাবিদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া ইত্যাদি কারণে মুসলিমদের সঙ্গে ইয়াহুদি কা'ব বিন আশরাফের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়ে যায় এবং সে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী বলে বিবেচিত হয়। তার সকল অপরাধ বিবেচনা করে রাসূল তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। [৪৯৭]

কা'ব বিন আশরাফের মৃত্যুদণ্ডে ইয়াহুদিদের প্রতিক্রিয়া
মাদীনাজুড়ে কা'ব বিন আশরাফের হত্যার ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে ইয়াহূদি পণ্ডিতেরা রাসূলের নিকট ছুটে আসে। সাহাবিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তোলে তারা। তাদের খুব একটা পাত্তা না দিয়ে রাসূল বলেন, তার হত্যা তার কুকর্মেরই পরিণাম। এ ঘটনার পর সমগ্র ইয়াহূদিসমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বরেণ্য ইয়াহুদিরা দুর্গ থেকে বের হতেই ভয় পেত। মাদীনায় চলাফেরা করতেও মুসলিমদের গুপ্তঘাতের ভয়ে তটস্থ থাকত। একপর্যায়ে তারা চুক্তি নবায়নে বাধ্য হয়।
কা'বের পরিণতি দেখে ইয়াহুদিদের মনে ভীষণ ভয় ঢুকে যায়; কিন্তু ভালো হওয়ার পরিবর্তে ইসলামের বিরুদ্ধে নানা গোপন ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করে তারা। আসন্ন ঘটনাবলি থেকে তা পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, কা'ব বিন আশরাফের কুকর্মের কারণে পুরো বনু নাযীরকে রাসূল পাকড়াও করেননি; বরং তার একার চুক্তিভঙ্গের পরিণাম হিসেবে সে একাই গুপ্তঘাতের শিকার হয়। [৪৯৮]

টিকাঃ
৪৯৬. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ৩/৬১, ৬২
৪৯৭. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৫/৫৬, ৫৭
৪৯৮. আস-সারায়া মাআল ইয়াহুদ, ১/১২৬

📘 রউফুর রহীম 📄 কয়েকটি সামাজিক ঘটনাবলি

📄 কয়েকটি সামাজিক ঘটনাবলি


'উমার-কন্যা হাফসাকে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে
'উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, খুনাইস বিন হুযাফা আস-সাহমির মৃত্যুতে আমার মেয়ে হাফসা আকস্মিক বিধবা হয়ে পড়ে। তার স্বামী রাসূলের সাহাবি ছিলেন। মাদীনায় মারা যান তিনি। হাফসার বিয়ের কথা ভেবে 'উসমান বিন 'আফ্ফানের সঙ্গে দেখা করি আমি। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিই। আমার প্রস্তাব শুনে তিনি ভেবে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। কয়েক রাত কেটে যাওয়ার পর আবার তার সঙ্গে আমার দেখা। তিনি আমাকে জানান, আপাতত আমি বিয়ের কথা ভাবছি না।
'উমার বলেন, তারপর আবু বাক্স সিদ্দীকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলি, আপনি চাইলে হাফসাকে আপনার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবো। আবু বাক্ নীরব থাকেন। আমার প্রস্তাবে কোনো উত্তরই দেননি তিনি। তার আচরণে আমি 'উসমানের চেয়েও ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণ হই। এভাবে কয়েক রাত কেটে যায়। তারপর রাসূলের কাছ থেকে প্রস্তাব এলে হাফসাকে আমি তাঁর সঙ্গে বিয়ে দিই। [৪৯৯]

ফাতিমার সঙ্গে 'আলির বিয়ে
'আলি বিন আবি তালিবের দাসী বুঝতে পারেন যে ফাতিমা বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূলের নিকট তাঁর বেশকিছু বিয়ের প্রস্তাবও চলে এসেছে। দাসী তাকে বলেন, আপনি কি জানেন, আল্লাহর রাসূলের নিকট ফাতিমার জন্য একজন বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে? আলি বলেন, না। সে বলে, হ্যাঁ, সত্যিই ফাতিমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আপনি তাহলে রাসূলের নিকট তাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন না কেন? আপনি গেলেই তিনি আপনার সঙ্গে তাকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। তার কথায় আলি বলেন, ফাতিমাকে বিয়ে করার মতো আমার কী আছে? সে বলে, আপনি রাসূলের নিকট গেলেই আপনার কাছে বিয়ে দেবেন।
আলি বলেন, আল্লাহর শপথ, সে আমাকে পীড়াপীড়ি করেই যাচ্ছিল। অবশেষে আমি রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাঁর সামনে বসে আমি আড়ষ্ট হয়ে যাই। তাঁর সম্মান ও ব্যক্তিত্বের সামনে কিছুই বলতে পারি না। আমাকে দেখে রাসূল জানতে চান, কেন এসেছ? কী প্রয়োজনে এসেছ? তারপর একটু থেমে তিনি বলেন, মনে হয়, তুমি ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ? আমি বলি, জি। তিনি আমার সম্মতি পেয়ে জানতে চান, ওকে বৈধ করে নেওয়ার মতো (মোহরানা) তোমার কাছে কি কিছু আছে? আমি উত্তর দিই, জি না হে রাসূল, আমার কাছে কিছুই নেই। আমার দীনতার কথা শুনে জানতে চান— আমার দেওয়া বর্মটা কোথায়? হঠাৎ ওটার কথা মনে আসে; আলির প্রাণধারকের শপথ, ওটা জরাজীর্ণ, ওটার দাম চার দিরহামও হবে না। তারপর আমি উত্তর দিই, ওটা আমার কাছে আছে। তিনি বলেন, ফাতিমাকে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম। বর্মটা তার নিকট পাঠিয়ে দাও। বর্মটার বিনিময়ে তাকে তুমি স্ত্রী করে নাও।

হাসান ইবনু 'আলির জন্ম
ইমাম কুরতুবি বলেন, হাসান প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছেন ৪র্থ হিজরিতে। হাসানের জন্মের পর এ বছরেই শেষের দিকে জন্ম হয় হুসাইন-এর। নববি বলেছেন, ৪র্থ হিজরির শা'বান মাসের ৫ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন হাসান।
'আলি বলেন, হাসান জন্মের পর আমি ওর নাম রাখি হারব। আল্লাহর রাসূল এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ছেলেকে নিয়ে এসো, দেখি কী নাম রেখেছ? বললাম, ওর নাম রেখেছি হারব। নবিজি বললেন, ওর নাম বরং হাসান। [৫০০]

যাইদ বিন সাবিত এর ঘটনা
চতুর্থ হিজরিতে তিনি ইয়াহুদিদের ভাষা শিক্ষা করেন। এ বছরেই যাইদ বিন সাবিত ইয়াহুদিদের ভাষা শিখেন। খারিজা বিন যাইদ থেকে বর্ণিত, যাইদ বিন সাবিত বর্ণনা করেন, ইয়াহুদিদের পাঠানো চিঠি যেন লোকদের সামনে পাঠ করে শোনানো যায়, এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইয়াহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। তিনি মাত্র ১৫ দিনে এই ভাষা শিখে ফেলেন।
আরেকটি বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রাসূল মাদীনায় আসার পর যাইদ-কে তার কাছে নিয়ে আসা হয়। লোকেরা বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, বনু নাজ্জারের এই বালক ইতোমধ্যে আপনার ওপর অবতীর্ণ হওয়া ১০টির বেশি সূরা মুখস্থ করেছে। রাসূলুল্লাহ মুগ্ধ হয়ে বলেন, যাইদ, আমার জন্য তুমি ইয়াহুদিদের ভাষা শেখো। কেননা (বার্তায় ও চুক্তিপত্রে) ইয়াহুদিদের লেখা আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
যাইদ বলেন, নবিজির জন্য আমি তাদের ভাষা রপ্ত করি। ১৫ দিন কেটে যাওয়ার আগেই আমি বেশ দক্ষতা অর্জন করি। ইয়াহুদিরা চিঠি পাঠালে আমি রাসূলের সামনে পাঠ করে শোনাতাম। লিখে পাঠাতাম এর প্রত্যুত্তরও।

টিকাঃ
৪৯৯. বুখারি, বিয়েশাদি অধ্যায়, হাদীস নং ৫১২২
৫০০. সিফাতুস সাফওয়াতি, ইবনুল জাওযি, ১/৮৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px