📄 গানীমাত ও বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ
গানীমাতের ব্যাপারে মতবিরোধ:
যুদ্ধ শেষে গানীমাত বণ্টনের ব্যাপারে সৈন্যদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। একদল বলে তারা গানীমাত সংগ্রহ করেছে তাই তারা পাবে, অন্যদল বলে তারা শত্রুকে তাড়িয়েছে তাই তারা হকদার। তাদের এ মতবিরোধ নিরসনের জন্য আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন, 'বলো, গানীমাতের মাল আল্লাহ ও রাসূলের।' [সূরা আনফাল ৮: ১] এরপর রাসূল সমানভাবে যোদ্ধাদের মাঝে গানীমাত বিতরণ করেন। [৪৫৬] আল্লাহর পক্ষ থেকে গানীমাত বিতরণের মূলনীতি হিসেবে অবতীর্ণ হয় যে, এর এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং বাকি অংশ মুজাহিদদের মাঝে বিতরণ করা হবে। [৪৫৮]
গানীমাত বিতরণে রাসূলের ন্যায়াচার ছিল অসাধারণ। যারা তাঁর নির্দেশে যুদ্ধে না গিয়ে মাদীনায় বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন, তাদেরও তিনি গানীমাতের ভাগ দিয়েছেন। যেমন 'উসমান বিন আফফানকে অসুস্থ স্ত্রী রুকাইয়ার সেবা করার জন্য থেকে যেতে বলা হয়েছিল, তিনিও গানীমাতের ভাগ ও সাওয়াব পান। [৪৬০] এমনিভাবে আরও কয়েকজন সাহাবিকে বিশেষ প্রয়োজনে মাদীনার দায়িত্বে রাখা হয়েছিল।
বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ:
বদরযুদ্ধে ৭০ জন কাফির বন্দি হয়। তাদের ব্যাপারে রাসূল আবু বাকর ও 'উমারের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আবু বাকর মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু 'উমার বলেন, এরা ইসলামের শত্রু, এদের হত্যা করা উচিত। রাসূল আবু বাকরের মত গ্রহণ করে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেন। এরপর এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছুটা ভর্ৎসনামূলক আয়াত নাযিল হয় যে, যমিনে ব্যাপক শত্রুনিধন না করা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দি রাখা কোনো নবির কাজ নয়। [৪৬৪]
উকবা বিন আবু মু'ইত ও নাযর বিন হারিসের মৃত্যুদণ্ড:
এরা ছিল ইসলামের চরম শত্রু এবং যুদ্ধের উসকানিদাতা। এদের অপরাধ বিবেচনা করে রাসূল তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। আসিম বিন সাবিত উকবার এবং 'আলি বিন আবি তালিব নাযর বিন হারিসের দণ্ড কার্যকর করেন। [৪৬৭]
বন্দিদের সঙ্গে সদাচরণ:
রাসূল ﷺ বন্দিদের সাহাবিদের মাঝে বিতরণ করে তাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন। আবু 'আযীয বিন 'উমাইর বলেন, আনসারিরা নিজেরা শুধু খেজুর খেয়ে আমাদের রুটি খেতে দিতেন। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে সাহাবিরা বন্দিদের সঙ্গে যে চরম মহানুভবতা প্রদর্শন করেন তার ফলে অনেক বন্দি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। [৪৬৮]
আল্লাহর রাসূলের জামাতার মুক্তিপণ:
রাসূলের কন্যা যাইনাব তাঁর স্বামী আবুল 'আসের জন্য মুক্তিপণ হিসেবে মা খাদীজার দেওয়া একটি হার পাঠান। হারটি দেখে রাসূল স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সাহাবিদের অনুমতি নিয়ে তিনি হারটি ফিরিয়ে দেন এবং আবুল 'আসকে এই শর্তে মুক্তি দেন যে তিনি যাইনাবকে মাদীনায় পাঠিয়ে দেবেন। [৪৭০]
মুক্তিপণ হিসেবে শিক্ষাদান:
বন্দিদের মাঝে যারা মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ ছিল, রাসূল তাদের দায়িত্ব দেন মাদীনার শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর। দশজন শিশুকে শেখাতে পারলেই একজন বন্দি মুক্তি পাবে—এমন অভিনব ও শিক্ষানুরাগী সিদ্ধান্ত সে যুগে ইসলামই প্রথম দিয়েছিল। [৪৭৩]
টিকাঃ
৪৫৬. মুসনাদ, ইমাম আহমাদ, ৫/৩২৪, হাদীস নং ২২৭৬২; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/২৮৩
৪৫৮. সুয়ারুন ওয়া ইবারুন মিনাল জিহাদিন নাবাউই ফিল মাদীনাহ, পৃ. ৬১, ৬২
৪৬০. বুখারি, হাদীস নং ৩৬৯৯
৪৬৪. মুসনাদ, ইমাম আহমাদ, ১/৩৮৩, ৩৮৪, হাদীস নং ৩৬৩২; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩২৫
৪৬৭. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৩০৬
৪৬৮. মাজমাউয যাওয়াইদ, ৬/৮৬
৪৭০. আবু দাউদ, হাদীস নং ২৬৯২
৪৭৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১৬৪, ১৬৫
📄 বদরযুদ্ধের ফলাফল ও রাসূলকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা
বদরযুদ্ধের ফলাফল:
বদরযুদ্ধের ফলে মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায় এবং মাদীনা ও আশপাশের এলাকায় ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন হয়। মুসলিমরা সামরিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা লাভ করে। অপরদিকে কুরাইশরা তাদের বরেণ্য নেতাদের হারিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। মাক্কায় কুরাইশদের ঘরে ঘরে তখন নিহতদের জন্য মাতম চলছিল। বদরযুদ্ধের পরাজয়ের খবর শুনে আবু লাহাব তীব্র যন্ত্রণায় এবং পরবর্তীতে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। [৪৭৫]
রাসূলকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা:
বদরযুদ্ধের পর 'উমাইর বিন ওয়াহাব ও সাফওয়ান বিন উমাইয়া মাক্কার অদূরে এক নির্জন জায়গায় বসে রাসূলকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। সাফওয়ান 'উমাইরের ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিলে 'উমাইর বিষমাখা তলোয়ার নিয়ে মাদীনা যাত্রা করে। মাদীনার মাসজিদে পৌঁছার পর হযরত 'উমার তাকে চিনে ফেলেন এবং সতর্কতার সঙ্গে তাকে রাসূলের নিকট হাজির করেন। রাসূল ﷺ তাকে দেখে তাঁর ও সাফওয়ানের গোপন কথোপকথনের হুবহু বিবরণ দিলে 'উমাইর স্তম্ভিত হয়ে যান এবং তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন এবং তাঁর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। [৪৭৬]
টিকাঃ
৪৭৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১৭১
৪৭৬. সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ২৬০
৪৭৭. গাযওয়াতু বাদরিল কুবরা, আবু ফারিস, পৃ. ৮২
৪৭৮. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৩/৭৩