📘 রউফুর রহীম 📄 রণাঙ্গনের কিছু চিত্র ও ঘটনা

📄 রণাঙ্গনের কিছু চিত্র ও ঘটনা


পাপিষ্ঠদের মৃত্যু:
আবু জাহল বিন হিশাম আল-মাখযূমির মৃত্যু: আবদুর রাহমান ইবনু আওফ বলেন, বদরের দিন দেখি আমার দুই পাশে দুইজন আনসারি কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন এসে বলল, চাচা, আবু জাহলকে চেনেন? সে আল্লাহর রাসূলকে গালি দেয়। ওকে পেলে আমি জীবিত ছাড়ব না। একটু পরই দেখি আবু জাহল লোকেদের মাঝে পায়চারি করছে। আমি কিশোরদের ইশারা দিতেই তারা বাজের মতো তলোয়ারের আঘাত হানে আবু জাহলের ওপর। এক আঘাতেই সে ভূপতিত হয়। কিশোররা ছিলেন মু'আয বিন আফরা ও মু'আয বিন আমর বিন আল-জামূহ। [৪৪১] ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ আবু জাহলকে ভূপতিত অবস্থায় পেয়ে তার শিরস্ত্রাণ সরিয়ে ঘাড়ে আঘাত করেন এবং তার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে রাসূলের নিকট নিয়ে আসেন। রাসূল তাকে দেখে বলেন, এই হতভাগাই আমার উম্মাতের ফিরআউন। [৪৪৩]

উমাইয়া বিন খালফের হত্যাকাণ্ড:
'আবদুর রাহমান বিন 'আউফ উমাইয়া বিন খালফ ও তার ছেলেকে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিলাল তাকে দেখে ফেলেন। তিনি চিৎকার করে আনসারি সাহাবিদের ডাকেন। আনসারি সাহাবিরা উমাইয়ার ছেলেকে হত্যা করার পর উমাইয়াকে ঘিরে ফেলেন। তারা 'আবদুর রাহমান বিন আউফের নিচ দিয়ে তলোয়ার দিয়ে তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ইসলামের প্রথম যুগে মাক্কায় এই পাষণ্ড উমাইয়া হযরত বিলালকে মরুর উত্তপ্ত বালিতে ফেলে পাশবিক নির্যাতন করত। বদর প্রান্তরে সে তার কৃতকর্মের পরিণাম ভোগ করে। [৪৪৪]

উবাইদা বিন সায়ীদ বিন 'আসের মৃত্যুর ঘটনা:
যুবাইর ইবনুল আওয়াম বলেন, বদরযুদ্ধে উবাইদা বিন সায়ীদ বিন 'আসের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে এমনভাবে শিরস্ত্রাণ ও বর্ম পরা ছিল যে, তার চোখ দুটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমি তার চোখ বরাবর বর্শা দিয়ে আঘাত করি। অমনি সে ভূপতিত হয়। তার শিরস্ত্রাণ ভেদ করে আমার বর্শা এমনভাবে আটকে যায় যে, তার শরীরে পা তুলে সজোরে টান দিয়ে তা বের করতে হয়। [৪৪৯]

আসওয়াদ আল-মাখযুমির হত্যাকাণ্ড:
ইবনু ইসহাক বলেন, বদরযুদ্ধে নিষ্ঠুর দুরাচারী আসওয়াদ মাখযূমি নিহত হয়। সে রণাঙ্গনে এলে হামযা বিন 'আবদুল মুত্তালিব তার দিকে ছুটে যান। হামযা আসওয়াদের পায়ের গোছায় প্রচণ্ড আঘাত হানেন এবং এক আঘাতেই তার ইহলীলা সাঙ্গ করে দেন। হামযার অসীম সাহসিকতায় সেদিন কুরাইশ বাহিনী একেবারেই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। [৪৫১]

টিকাঃ
৪৪১. বুখারি, হাদীস নং ৩১৪১
৪৪৩. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, সাদিক উরজুন ৩/৪৩১, ৪৩২
৪৪৪. বুখারি, হাদীস নং ২৩০১
৪৪৯. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৯৮
৪৫১. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/১২১

📘 রউফুর রহীম 📄 কয়েকজন শহিদের ঘটনা

📄 কয়েকজন শহিদের ঘটনা


হারিসা বিন সুরাকার শাহাদাত:
কিশোর বয়সেই হারিসা বদরযুদ্ধে যোগদান করে শাহাদাত বরণ করেন। তার মা রাসূলের নিকট সন্তানের অবস্থা জানতে চাইলে রাসূল বলেন, ও তো জান্নাতের অনেক বাগানে অবস্থান করছে। আর শোনো, তোমার ছেলে সর্বোচ্চ জান্নাতুল ফিরদাউস অর্জন করেছে। [৪৫২]

আউফ বিন হারিসের আত্মত্যাগ:
আফরার পুত্র 'আউফ বিন হারিস রাসূলকে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল, বান্দার কোন কাজে আল্লাহর হাসি পায়? রাসূল বলেন, বান্দাকে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে। এ কথা শুনে তিনি তার বর্মটি খুলে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। [৪৫৩]

সা'দ বিন খাইসামা ও তার বাবার আত্মত্যাগ:
বদরযুদ্ধের দিন সা'দ বিন খাইসামা ও তার বাবা যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে লটারি করলে সা'দের নাম ওঠে। সা'দ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। আর তার বাবা খাইসামা পরের বছর উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। সাহাবিদের পরিবারগুলোতে আল্লাহর পথে শাহাদাতের কী তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল এটি তার প্রমাণ। [৪৫৪]

আবু হুযাইফা বিন 'উতবা বিন রাবী'আর জন্য রাসূলের দু'আ:
বদরযুদ্ধ শেষে কুরাইশদের লাশগুলো অন্ধকূপে ফেলে দেওয়ার সময় আবু হুযাইফা বিন উতবার মুখে ঈষৎ ঘৃণার ভাব ফুটে ওঠে। কারণ সেখানে তাঁর বাবার লাশও ছিল। তিনি তাঁর বাবার অবিশ্বাসের মৃত্যুতে মর্মাহত হয়েছিলেন। নবিজি তাঁর জন্য কল্যাণের দু'আ করেন। [৪৫৫]

টিকাঃ
৪৫২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৮২
৪৫৩. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/৩১
৪৫৪. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/৮৭
৪৫৫. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/১৭৪

📘 রউফুর রহীম 📄 গানীমাত ও বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ

📄 গানীমাত ও বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ


গানীমাতের ব্যাপারে মতবিরোধ:
যুদ্ধ শেষে গানীমাত বণ্টনের ব্যাপারে সৈন্যদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। একদল বলে তারা গানীমাত সংগ্রহ করেছে তাই তারা পাবে, অন্যদল বলে তারা শত্রুকে তাড়িয়েছে তাই তারা হকদার। তাদের এ মতবিরোধ নিরসনের জন্য আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন, 'বলো, গানীমাতের মাল আল্লাহ ও রাসূলের।' [সূরা আনফাল ৮: ১] এরপর রাসূল সমানভাবে যোদ্ধাদের মাঝে গানীমাত বিতরণ করেন। [৪৫৬] আল্লাহর পক্ষ থেকে গানীমাত বিতরণের মূলনীতি হিসেবে অবতীর্ণ হয় যে, এর এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং বাকি অংশ মুজাহিদদের মাঝে বিতরণ করা হবে। [৪৫৮]

গানীমাত বিতরণে রাসূলের ন্যায়াচার ছিল অসাধারণ। যারা তাঁর নির্দেশে যুদ্ধে না গিয়ে মাদীনায় বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন, তাদেরও তিনি গানীমাতের ভাগ দিয়েছেন। যেমন 'উসমান বিন আফফানকে অসুস্থ স্ত্রী রুকাইয়ার সেবা করার জন্য থেকে যেতে বলা হয়েছিল, তিনিও গানীমাতের ভাগ ও সাওয়াব পান। [৪৬০] এমনিভাবে আরও কয়েকজন সাহাবিকে বিশেষ প্রয়োজনে মাদীনার দায়িত্বে রাখা হয়েছিল।

বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ:
বদরযুদ্ধে ৭০ জন কাফির বন্দি হয়। তাদের ব্যাপারে রাসূল আবু বাকর ও 'উমারের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আবু বাকর মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু 'উমার বলেন, এরা ইসলামের শত্রু, এদের হত্যা করা উচিত। রাসূল আবু বাকরের মত গ্রহণ করে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেন। এরপর এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছুটা ভর্ৎসনামূলক আয়াত নাযিল হয় যে, যমিনে ব্যাপক শত্রুনিধন না করা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দি রাখা কোনো নবির কাজ নয়। [৪৬৪]

উকবা বিন আবু মু'ইত ও নাযর বিন হারিসের মৃত্যুদণ্ড:
এরা ছিল ইসলামের চরম শত্রু এবং যুদ্ধের উসকানিদাতা। এদের অপরাধ বিবেচনা করে রাসূল তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। আসিম বিন সাবিত উকবার এবং 'আলি বিন আবি তালিব নাযর বিন হারিসের দণ্ড কার্যকর করেন। [৪৬৭]

বন্দিদের সঙ্গে সদাচরণ:
রাসূল ﷺ বন্দিদের সাহাবিদের মাঝে বিতরণ করে তাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন। আবু 'আযীয বিন 'উমাইর বলেন, আনসারিরা নিজেরা শুধু খেজুর খেয়ে আমাদের রুটি খেতে দিতেন। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে সাহাবিরা বন্দিদের সঙ্গে যে চরম মহানুভবতা প্রদর্শন করেন তার ফলে অনেক বন্দি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। [৪৬৮]

আল্লাহর রাসূলের জামাতার মুক্তিপণ:
রাসূলের কন্যা যাইনাব তাঁর স্বামী আবুল 'আসের জন্য মুক্তিপণ হিসেবে মা খাদীজার দেওয়া একটি হার পাঠান। হারটি দেখে রাসূল স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সাহাবিদের অনুমতি নিয়ে তিনি হারটি ফিরিয়ে দেন এবং আবুল 'আসকে এই শর্তে মুক্তি দেন যে তিনি যাইনাবকে মাদীনায় পাঠিয়ে দেবেন। [৪৭০]

মুক্তিপণ হিসেবে শিক্ষাদান:
বন্দিদের মাঝে যারা মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ ছিল, রাসূল তাদের দায়িত্ব দেন মাদীনার শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর। দশজন শিশুকে শেখাতে পারলেই একজন বন্দি মুক্তি পাবে—এমন অভিনব ও শিক্ষানুরাগী সিদ্ধান্ত সে যুগে ইসলামই প্রথম দিয়েছিল। [৪৭৩]

টিকাঃ
৪৫৬. মুসনাদ, ইমাম আহমাদ, ৫/৩২৪, হাদীস নং ২২৭৬২; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/২৮৩
৪৫৮. সুয়ারুন ওয়া ইবারুন মিনাল জিহাদিন নাবাউই ফিল মাদীনাহ, পৃ. ৬১, ৬২
৪৬০. বুখারি, হাদীস নং ৩৬৯৯
৪৬৪. মুসনাদ, ইমাম আহমাদ, ১/৩৮৩, ৩৮৪, হাদীস নং ৩৬৩২; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩২৫
৪৬৭. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৩০৬
৪৬৮. মাজমাউয যাওয়াইদ, ৬/৮৬
৪৭০. আবু দাউদ, হাদীস নং ২৬৯২
৪৭৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১৬৪, ১৬৫

📘 রউফুর রহীম 📄 বদরযুদ্ধের ফলাফল ও রাসূলকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা

📄 বদরযুদ্ধের ফলাফল ও রাসূলকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা


বদরযুদ্ধের ফলাফল:
বদরযুদ্ধের ফলে মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায় এবং মাদীনা ও আশপাশের এলাকায় ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন হয়। মুসলিমরা সামরিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা লাভ করে। অপরদিকে কুরাইশরা তাদের বরেণ্য নেতাদের হারিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। মাক্কায় কুরাইশদের ঘরে ঘরে তখন নিহতদের জন্য মাতম চলছিল। বদরযুদ্ধের পরাজয়ের খবর শুনে আবু লাহাব তীব্র যন্ত্রণায় এবং পরবর্তীতে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। [৪৭৫]

রাসূলকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা:
বদরযুদ্ধের পর 'উমাইর বিন ওয়াহাব ও সাফওয়ান বিন উমাইয়া মাক্কার অদূরে এক নির্জন জায়গায় বসে রাসূলকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। সাফওয়ান 'উমাইরের ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিলে 'উমাইর বিষমাখা তলোয়ার নিয়ে মাদীনা যাত্রা করে। মাদীনার মাসজিদে পৌঁছার পর হযরত 'উমার তাকে চিনে ফেলেন এবং সতর্কতার সঙ্গে তাকে রাসূলের নিকট হাজির করেন। রাসূল ﷺ তাকে দেখে তাঁর ও সাফওয়ানের গোপন কথোপকথনের হুবহু বিবরণ দিলে 'উমাইর স্তম্ভিত হয়ে যান এবং তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন এবং তাঁর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। [৪৭৬]

টিকাঃ
৪৭৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১৭১
৪৭৬. সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ২৬০
৪৭৭. গাযওয়াতু বাদরিল কুবরা, আবু ফারিস, পৃ. ৮২
৪৭৮. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৩/৭৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px