📄 বদর প্রান্তরে রাসূল সা. ও সাহাবিগণের অবস্থান
সাহাবিদের নিয়ে বদরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন রাসূল। মুশরিকদের সবচেয়ে নিকটতম কুয়োর কাছে যাত্রাবিরতি করেন। সেনাপতির নিরাপত্তার কথা ভেবে সা'দ বিন মু'আয রাসূলের নিকট একটি নিরাপদ ছাউনি নির্মাণের আবেদন করেন। মুসলিমরা রাসূলের জন্য ছাউনি নির্মাণের কাজে নেমে পড়েন। রণাঙ্গনে একটি উঁচু ঢিবির ওপর নির্মিত হয় ছাউনি। সেখানে রাসূলের সঙ্গে আবু বাকরও অবস্থান করেন। সা'দ বিন মু'আযের নেতৃত্বে একদল তরুণ আনসারি সাহাবি রাসূলের ছাউনির নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। [৪০৮]
লড়াই শুরুর আগেই আল্লাহর করুণা:
বদর প্রান্তরে লড়াই শুরুর আগেই মুসলিমরা আল্লাহর দয়া হিসেবে তন্দ্রা ও বৃষ্টি লাভ করে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, (স্মরণ করো) যখন তিনি তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি দেওয়ার জন্য তোমাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছিলেন এবং তোমাদের পবিত্র করার জন্য... আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করেছিলেন। [সূরা আনফাল, ৮: ১১]
আল্লাহ্র রাসূলের রণ-পরিকল্পনা:
বদরের দিন আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাসূল ﷺ নতুন কয়েকটি অভিনভ রণকৌশল আবিষ্কার করেন। প্রথম সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেন রাসূল ﷺ। সারিবদ্ধ রণশৈলী সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন— আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে (অটল থেকে) কাতার বেঁধে যুদ্ধ করে, যেন তারা এক সুদৃঢ় প্রাচীর। [সূরা সফ, ৬১:৪]
সারিবদ্ধ রণকৌশলের কিছু উপকারিতা হলো শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করা এবং গোটা যুদ্ধ পরিচালনা সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে থাকা। রাসূল নির্দেশ দেন শত্রু খুব কাছাকাছি চলে আসার পর তির ছোড়ার, যেন তা অধিক লক্ষ্যভেদী হয়। [৪১২] শত্রুকে প্রতিহত করতে রাসূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করতেন। সূর্যোদয়কালে সেনাসারি বিন্যাস করে পশ্চিমাভিমুখী হন। এতে মুসলিমরা সূর্যের বিরক্তিকর রশ্মি থেকে নিরাপদ থাকেন এবং শত্রুবাহিনী সূর্যরশ্মির মুখোমুখি পড়ে। [৪১৩]
সেনাসারিতে সাওয়াদ বিন গাযিয়ার অবস্থান ও রাসূলুল্লাহ:
যোদ্ধাদের অটুট বন্ধন বজায় রাখতে বদরযুদ্ধে সারি বিন্যাস ও সেনা পরিপাটির কাজ করেন রাসূল নিজেই। সাওয়াদ বিন গাযিয়া নামক এক যোদ্ধা সারির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর পেটে আলতো আঘাত করে রাসূল বলেন, সাওয়াদ, সোজা হয়ে দাঁড়াও। সাওয়াদ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। আমাকে প্রতিশোধ নিতে দিন। রাসূল তাঁর পেট উদাম করে বলেন, এই নাও, প্রতিশোধ নাও। সাওয়াদ রাসূলকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটে চুমু খান। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, জীবনের শেষ মুহূর্তে আপনার দেহের স্পর্শ লাভের আশাতেই এমনটা করেছি। [৪১৪]
লড়াইয়ের জন্য রাসূলের উৎসাহ দান:
সাহাবিদের পর্বতসম মানসিক দৃঢ়তার প্রশিক্ষণ দিতেন রাসূল। সাহাবিদের উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন, আকাশ ও পৃথিবীজোড়া প্রশস্ত জান্নাতের দিকে তোমরা ধাবিত হও। এ কথা শুনে ‘উবাইর বিন হুমাম আল-আনসারি আনন্দিত হয়ে তাঁর হাতের খেজুরগুলো ছুড়ে ফেলে শত্রুর ওপর প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। [৪১৬]
আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা:
বদরযুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য রাসূল আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে সাহায্য প্রার্থনা করেন। রণাঙ্গনে সেনাবিন্যাস ও নানা দিক-নির্দেশনা দিয়ে আবু বাকরকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল তাঁর জন্য নির্মিত ছাউনিতে ফিরে আসেন। রাসূল তাঁর দু'আয় বিশেষভাবে বলেন, হে আল্লাহ, আপনার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করুন। হে আল্লাহ, আজ যদি এই মুসলিম জনগোষ্ঠী বিলীন হয়ে যায়, তাহলে আর আপনার ইবাদাত করা হবে না। এত পরিমাণে কাঁদলেন এবং দু'আ করলেন যে, তাঁর চাদর পড়ে গেল। [৪২২]
শত্রু দমনে আল্লাহর সাহায্য:
ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে রাসূল একমুষ্ঠি ধূলি নিয়ে মুশরিকদের দিকে ছুড়ে মেরে বলেন, মলিন হোক ওদের মুখ। আল্লাহর সাহায্যে মুশরিকদের চোখে গিয়ে পড়ে সেই ধূলিকণা। [৪২৬] আল্লাহ তা'আলা বলেন— তুমি যখন (কঙ্কর) নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি (তা) নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন। [সূরা আনফাল, ৮: ১৭]
লড়াইয়ের সূচনা ও মুশরিকদের পরাজয়:
একক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। মুশরিকপক্ষ থেকে বের হয় উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ। মুসলিমদের পক্ষ থেকে বের হন উবাইদা বিন হারিস, হামযাহ ও 'আলি। হামযাহ ও শাইবার লড়াইয়ে শাইবা নিহত হয়। 'আলি ও ওয়ালিদের লড়াইয়ে ওয়ালিদ নিহত হয়। হামযাহ ও 'আলি এগিয়ে এসে উতবাকে হত্যা করেন। এরপর সদলবলে মুশরিকরা মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাসূলের নির্দেশমতো 'আহাদ আহাদ' স্লোগানে শর ছুড়তে থাকে মুসলিমরা। [৪২৯]
মুসলিমদের সাহায্যে ফেরেশতা প্রেরণ:
আল্লাহ কাফিরদের মনে ভীতি সঞ্চার করেছিলেন। ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্যের সংবাদ পেয়ে মুসলিমদের সাহস ও উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। [৪৩০] ইবনু আব্বাস বলেন, বদরযুদ্ধের দিন জনৈক মুসলিম এক মুশরিককে ধাওয়া করার সময় হঠাৎ তার ওপর চাবুকের শব্দ ও ঘোড়সওয়ারের ডাক শুনতে পান—হাইযূম, এগিয়ে চলো। ইবনু আব্বাস বলেন, বদর-রণাঙ্গনে রাসূল ঘোষণা দেন, এই তো ঘোড়ায় চড়ে সশস্ত্র জিবরীল আসছেন। [৪৩২]
মুসলিমদের জয় ও নিহত মুশরিকদের উদ্দেশে রাসূলের ঘোষণা:
মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের অসামান্য বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বদরযুদ্ধ। এ যুদ্ধে নেতৃস্থানীয় ৭০ জন মুশরিক নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়; আর ১৪ জন মুসলিম শহিদ হন। রাসূল ﷺ বদর প্রান্তরে তিনদিন অবস্থান করেন। [৪৩৫] শত্রুবাহিনীর বিক্ষিপ্ত লাশগুলো সংগ্রহ করে বদরের এক পরিত্যক্ত অন্ধকূপে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন রাসূল। সেখানে দাঁড়িয়ে রাসূল মর্মাহত হৃদয়ে ঘোষণা দেন, তোমরা ছিলে রাসূলের নিকৃষ্টতম প্রতিবেশী। রাসূল লাশগুলো ফেলার সময় ডাক দেন, হে রাবী'আর পুত্র উতবা... তোমরা কি তোমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুত বিষয় বাস্তবে পেয়েছ? আমি তো আমার রবের প্রতিশ্রুত বিষয় বাস্তবেই পেয়েছি। [৪৩৯]
টিকাঃ
৪০৮. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৩৩
৪১২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৮৪, ৩৯৮৫
৪১৩. আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৫৪
৪১৪. সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ২৩৬
৪১৬. মুখতাসার সহীহ মুসলিম, মুনযিরি, ২/৭০, হাদীস নং ১১৫৭
৪২২. মুসলিম, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ৩/৩৮৪
৪২৬. আল-মুসতাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/১২৫
৪২৯. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১১৬-১১৮
৪৩০. তাফসীর আয-যামাখশূরি, ২/২২৫; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩১৫
৪৩২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৯৫
৪৩৫. সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ২৫০
৪৩৯. বুখারি, হাদীস নং ৩৯৭৬; মুসলিম, হাদীস নং ২৮৭৩, ২৮৭৪
📄 রণাঙ্গনের কিছু চিত্র ও ঘটনা
পাপিষ্ঠদের মৃত্যু:
আবু জাহল বিন হিশাম আল-মাখযূমির মৃত্যু: আবদুর রাহমান ইবনু আওফ বলেন, বদরের দিন দেখি আমার দুই পাশে দুইজন আনসারি কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন এসে বলল, চাচা, আবু জাহলকে চেনেন? সে আল্লাহর রাসূলকে গালি দেয়। ওকে পেলে আমি জীবিত ছাড়ব না। একটু পরই দেখি আবু জাহল লোকেদের মাঝে পায়চারি করছে। আমি কিশোরদের ইশারা দিতেই তারা বাজের মতো তলোয়ারের আঘাত হানে আবু জাহলের ওপর। এক আঘাতেই সে ভূপতিত হয়। কিশোররা ছিলেন মু'আয বিন আফরা ও মু'আয বিন আমর বিন আল-জামূহ। [৪৪১] ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ আবু জাহলকে ভূপতিত অবস্থায় পেয়ে তার শিরস্ত্রাণ সরিয়ে ঘাড়ে আঘাত করেন এবং তার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে রাসূলের নিকট নিয়ে আসেন। রাসূল তাকে দেখে বলেন, এই হতভাগাই আমার উম্মাতের ফিরআউন। [৪৪৩]
উমাইয়া বিন খালফের হত্যাকাণ্ড:
'আবদুর রাহমান বিন 'আউফ উমাইয়া বিন খালফ ও তার ছেলেকে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিলাল তাকে দেখে ফেলেন। তিনি চিৎকার করে আনসারি সাহাবিদের ডাকেন। আনসারি সাহাবিরা উমাইয়ার ছেলেকে হত্যা করার পর উমাইয়াকে ঘিরে ফেলেন। তারা 'আবদুর রাহমান বিন আউফের নিচ দিয়ে তলোয়ার দিয়ে তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ইসলামের প্রথম যুগে মাক্কায় এই পাষণ্ড উমাইয়া হযরত বিলালকে মরুর উত্তপ্ত বালিতে ফেলে পাশবিক নির্যাতন করত। বদর প্রান্তরে সে তার কৃতকর্মের পরিণাম ভোগ করে। [৪৪৪]
উবাইদা বিন সায়ীদ বিন 'আসের মৃত্যুর ঘটনা:
যুবাইর ইবনুল আওয়াম বলেন, বদরযুদ্ধে উবাইদা বিন সায়ীদ বিন 'আসের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে এমনভাবে শিরস্ত্রাণ ও বর্ম পরা ছিল যে, তার চোখ দুটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমি তার চোখ বরাবর বর্শা দিয়ে আঘাত করি। অমনি সে ভূপতিত হয়। তার শিরস্ত্রাণ ভেদ করে আমার বর্শা এমনভাবে আটকে যায় যে, তার শরীরে পা তুলে সজোরে টান দিয়ে তা বের করতে হয়। [৪৪৯]
আসওয়াদ আল-মাখযুমির হত্যাকাণ্ড:
ইবনু ইসহাক বলেন, বদরযুদ্ধে নিষ্ঠুর দুরাচারী আসওয়াদ মাখযূমি নিহত হয়। সে রণাঙ্গনে এলে হামযা বিন 'আবদুল মুত্তালিব তার দিকে ছুটে যান। হামযা আসওয়াদের পায়ের গোছায় প্রচণ্ড আঘাত হানেন এবং এক আঘাতেই তার ইহলীলা সাঙ্গ করে দেন। হামযার অসীম সাহসিকতায় সেদিন কুরাইশ বাহিনী একেবারেই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। [৪৫১]
টিকাঃ
৪৪১. বুখারি, হাদীস নং ৩১৪১
৪৪৩. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, সাদিক উরজুন ৩/৪৩১, ৪৩২
৪৪৪. বুখারি, হাদীস নং ২৩০১
৪৪৯. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৯৮
৪৫১. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/১২১
📄 কয়েকজন শহিদের ঘটনা
হারিসা বিন সুরাকার শাহাদাত:
কিশোর বয়সেই হারিসা বদরযুদ্ধে যোগদান করে শাহাদাত বরণ করেন। তার মা রাসূলের নিকট সন্তানের অবস্থা জানতে চাইলে রাসূল বলেন, ও তো জান্নাতের অনেক বাগানে অবস্থান করছে। আর শোনো, তোমার ছেলে সর্বোচ্চ জান্নাতুল ফিরদাউস অর্জন করেছে। [৪৫২]
আউফ বিন হারিসের আত্মত্যাগ:
আফরার পুত্র 'আউফ বিন হারিস রাসূলকে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল, বান্দার কোন কাজে আল্লাহর হাসি পায়? রাসূল বলেন, বান্দাকে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে। এ কথা শুনে তিনি তার বর্মটি খুলে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। [৪৫৩]
সা'দ বিন খাইসামা ও তার বাবার আত্মত্যাগ:
বদরযুদ্ধের দিন সা'দ বিন খাইসামা ও তার বাবা যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে লটারি করলে সা'দের নাম ওঠে। সা'দ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। আর তার বাবা খাইসামা পরের বছর উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। সাহাবিদের পরিবারগুলোতে আল্লাহর পথে শাহাদাতের কী তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল এটি তার প্রমাণ। [৪৫৪]
আবু হুযাইফা বিন 'উতবা বিন রাবী'আর জন্য রাসূলের দু'আ:
বদরযুদ্ধ শেষে কুরাইশদের লাশগুলো অন্ধকূপে ফেলে দেওয়ার সময় আবু হুযাইফা বিন উতবার মুখে ঈষৎ ঘৃণার ভাব ফুটে ওঠে। কারণ সেখানে তাঁর বাবার লাশও ছিল। তিনি তাঁর বাবার অবিশ্বাসের মৃত্যুতে মর্মাহত হয়েছিলেন। নবিজি তাঁর জন্য কল্যাণের দু'আ করেন। [৪৫৫]
টিকাঃ
৪৫২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৮২
৪৫৩. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/৩১
৪৫৪. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/৮৭
৪৫৫. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/১৭৪
📄 গানীমাত ও বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ
গানীমাতের ব্যাপারে মতবিরোধ:
যুদ্ধ শেষে গানীমাত বণ্টনের ব্যাপারে সৈন্যদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। একদল বলে তারা গানীমাত সংগ্রহ করেছে তাই তারা পাবে, অন্যদল বলে তারা শত্রুকে তাড়িয়েছে তাই তারা হকদার। তাদের এ মতবিরোধ নিরসনের জন্য আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন, 'বলো, গানীমাতের মাল আল্লাহ ও রাসূলের।' [সূরা আনফাল ৮: ১] এরপর রাসূল সমানভাবে যোদ্ধাদের মাঝে গানীমাত বিতরণ করেন। [৪৫৬] আল্লাহর পক্ষ থেকে গানীমাত বিতরণের মূলনীতি হিসেবে অবতীর্ণ হয় যে, এর এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং বাকি অংশ মুজাহিদদের মাঝে বিতরণ করা হবে। [৪৫৮]
গানীমাত বিতরণে রাসূলের ন্যায়াচার ছিল অসাধারণ। যারা তাঁর নির্দেশে যুদ্ধে না গিয়ে মাদীনায় বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন, তাদেরও তিনি গানীমাতের ভাগ দিয়েছেন। যেমন 'উসমান বিন আফফানকে অসুস্থ স্ত্রী রুকাইয়ার সেবা করার জন্য থেকে যেতে বলা হয়েছিল, তিনিও গানীমাতের ভাগ ও সাওয়াব পান। [৪৬০] এমনিভাবে আরও কয়েকজন সাহাবিকে বিশেষ প্রয়োজনে মাদীনার দায়িত্বে রাখা হয়েছিল।
বন্দিদের ব্যাপারে মতবিরোধ:
বদরযুদ্ধে ৭০ জন কাফির বন্দি হয়। তাদের ব্যাপারে রাসূল আবু বাকর ও 'উমারের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আবু বাকর মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু 'উমার বলেন, এরা ইসলামের শত্রু, এদের হত্যা করা উচিত। রাসূল আবু বাকরের মত গ্রহণ করে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেন। এরপর এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছুটা ভর্ৎসনামূলক আয়াত নাযিল হয় যে, যমিনে ব্যাপক শত্রুনিধন না করা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দি রাখা কোনো নবির কাজ নয়। [৪৬৪]
উকবা বিন আবু মু'ইত ও নাযর বিন হারিসের মৃত্যুদণ্ড:
এরা ছিল ইসলামের চরম শত্রু এবং যুদ্ধের উসকানিদাতা। এদের অপরাধ বিবেচনা করে রাসূল তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। আসিম বিন সাবিত উকবার এবং 'আলি বিন আবি তালিব নাযর বিন হারিসের দণ্ড কার্যকর করেন। [৪৬৭]
বন্দিদের সঙ্গে সদাচরণ:
রাসূল ﷺ বন্দিদের সাহাবিদের মাঝে বিতরণ করে তাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন। আবু 'আযীয বিন 'উমাইর বলেন, আনসারিরা নিজেরা শুধু খেজুর খেয়ে আমাদের রুটি খেতে দিতেন। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে সাহাবিরা বন্দিদের সঙ্গে যে চরম মহানুভবতা প্রদর্শন করেন তার ফলে অনেক বন্দি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। [৪৬৮]
আল্লাহর রাসূলের জামাতার মুক্তিপণ:
রাসূলের কন্যা যাইনাব তাঁর স্বামী আবুল 'আসের জন্য মুক্তিপণ হিসেবে মা খাদীজার দেওয়া একটি হার পাঠান। হারটি দেখে রাসূল স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সাহাবিদের অনুমতি নিয়ে তিনি হারটি ফিরিয়ে দেন এবং আবুল 'আসকে এই শর্তে মুক্তি দেন যে তিনি যাইনাবকে মাদীনায় পাঠিয়ে দেবেন। [৪৭০]
মুক্তিপণ হিসেবে শিক্ষাদান:
বন্দিদের মাঝে যারা মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ ছিল, রাসূল তাদের দায়িত্ব দেন মাদীনার শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর। দশজন শিশুকে শেখাতে পারলেই একজন বন্দি মুক্তি পাবে—এমন অভিনব ও শিক্ষানুরাগী সিদ্ধান্ত সে যুগে ইসলামই প্রথম দিয়েছিল। [৪৭৩]
টিকাঃ
৪৫৬. মুসনাদ, ইমাম আহমাদ, ৫/৩২৪, হাদীস নং ২২৭৬২; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/২৮৩
৪৫৮. সুয়ারুন ওয়া ইবারুন মিনাল জিহাদিন নাবাউই ফিল মাদীনাহ, পৃ. ৬১, ৬২
৪৬০. বুখারি, হাদীস নং ৩৬৯৯
৪৬৪. মুসনাদ, ইমাম আহমাদ, ১/৩৮৩, ৩৮৪, হাদীস নং ৩৬৩২; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩২৫
৪৬৭. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৩০৬
৪৬৮. মাজমাউয যাওয়াইদ, ৬/৮৬
৪৭০. আবু দাউদ, হাদীস নং ২৬৯২
৪৭৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১৬৪, ১৬৫