📄 যুদ্ধপূর্ব কয়েকটি খণ্ডচিত্র
শাম থেকে কুরাইশদের এক বিরাট ব্যবসায়ী কাফেলা আসছে। প্রচুর পণ্য বোঝাই করা, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে স্বয়ং আবু সুফিয়ান, নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আছে ত্রিশ-চল্লিশজন যোদ্ধা। এ কথা মুসলিমরা আল্লাহর রাসূলকে জানান। তিনি বাসবাস বিন আম্রকে সেই বাণিজ্যকাফেলার তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠান। বাসবাসের মাধ্যমে সত্য সংবাদ পেয়ে রাসূল সাহাবিদের তৈরি হতে নির্দেশ দেন। তাদের উদ্দেশে বলেন, দেখো, কুরাইশ ব্যবসায়ী কাফেলা অজস্র সম্পদ নিয়ে তোমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তোমরা তাদের আক্রমণ করো। হয়তো আল্লাহ এই সম্পদ তোমাদের ভাগ্যে রেখেছেন।
দ্বিতীয় হিজরির ১২ রামাদান। রাসূল মাদীনা থেকে বের হন। তবে এটা নিশ্চিত যে, সমরসাজে বের হলেও লড়াইয়ের ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল, জালিম কুরাইশের বণিক কাফেলা। এদিকে মাদীনার মুসলিম ও মাক্কার কাফিরদের মধ্যকার অবস্থা ছিল যুদ্ধংদেহি। আর যুদ্ধকালীন অবস্থায় শত্রুর সম্পদ ও রক্ত প্রতিপক্ষের জন্য বৈধ। এই বৈধতা আরও বেড়ে যায় যখন জানা যায়, শত্রু নিরীহ প্রতিপক্ষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছে, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে।
এ যাত্রায় রাসূল 'আবদুল্লাহ বিন উম্মু মাকতূমকে মাদীনায় সালাতের দায়িত্ব দেন এবং রাওহা এলাকা থেকে আবু লুবাবাকে ফিরিয়ে এনে মাদীনার গভর্নর করেন। প্রথমেই কুরাইশ-কাফেলার তথ্য সংগ্রহের জন্য রাসূল দুজন সাহাবিকে বদরের উদ্দেশে পাঠান। তারা সংবাদ নিয়ে আসেন। বদরযুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে রাসূলের সেনাসখ্যা সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মাঝে দ্বিমত আছে। ইমাম বুখারির মতে, ৩১০-এর চেয়ে সামান্য বেশি; [৩৮৯] ইমাম মুসলিমের মতে ৩১৯ জন। [৩৯০] আবার কোনো কোনো সূত্রে ৩৪০ জন সাহাবির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বদরযুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা একটি ইসলামি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তির সমতুল্য ছিল না। তা ছাড়া মুসলিমরা যাত্রা করেছিল একটি কাফেলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য, যুদ্ধ করার জন্য নয়। তাদের জানাই ছিল না যে, পুরো কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে তারা যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। এই যুদ্ধে কুরাইশ সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। তাদের উটগুলোর পাশাপাশি দুশো ঘোড়াও ছিল। ছিল অনেক ঢাকিনী ও গায়িকা। তারা রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক গান পরিবেশন করছিল। পক্ষান্তরে মুসলিমদের ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট। পালা করে তারা উটে আরোহণ করছিলেন। [৩৯১]
বদর উদ্দেশে যাত্রাপথে কয়েকটি ঘটনা:
রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের বদরে যাওয়ার পথে শিক্ষা ও উপদেশ-সংবলিত কিছু ঘটনা ঘটেছিল। ধারাবাহিকভাবে কিছু উল্লেখ করা হলো-
অপ্রাপ্ত বয়সের কারণে যুদ্ধ থেকে বারণ: আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে ধরার উদ্দেশ্যে সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে রাসূলের যাত্রার পর তারা মাদীনার বাইরে বুয়ূতুস সুকয়া এলাকায় পৌঁছান। রাসূল ﷺ সেখানে সেনাছাউনি স্থাপন করে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যাওয়ার অনুপযোগী যোদ্ধাদের রেখে যান। তন্মধ্যে বারা বিন আযিব ও 'আবদুল্লাহ বিন 'উমারকে তাদের অপ্রাপ্ত বয়সের কারণে রেখে যান-যদিও তারা জিহাদে শরিক হওয়ার জন্য পূর্ণ আগ্রহ ও মনোবল নিয়েই বের হয়েছিলেন।
মুশরিকের সহায়তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন: বদরের উদ্দেশে যাত্রাপথে জনৈক মুশরিক নেতার সঙ্গে রাসূলের সাক্ষাৎ হয়। তিনি সদলবলে মুসলিমদের সাহায্য করার আগ্রহ দেখান। তাকে ফিরিয়ে দিয়ে রাসূল বলেন, চলে যাও তুমি; আমি কোনো মুশরিকের সহায়তা নিতে চাই না। তার পীড়াপীড়িসত্ত্বেও রাসূল তাকে ফিরিয়ে দিলেন। অবশেষে সে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেয়। [৩৯২]
কঠিন পরিস্থিতিতে সাহাবিদের সঙ্গে রাসূলের সহাবস্থান: এই প্রসঙ্গে 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, বদরযুদ্ধের সময় আমরা একটি উটে তিনজন করে চড়তাম। আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে এক উটে চড়েন আবু লুবাবা ও 'আলি ইবনু আবি তালিব। রাসূলের পেছনে বসেন তারা। রাসূলের উদ্দেশ্যে তারা বলেন, আমরা আপনার পেছনে হাঁটছি। রাসূল ﷺ তাদের বলেন, তোমরা আমার চেয়ে শক্তিশালী নও, আবার তোমাদের চেয়ে আমার সাওয়াবের প্রয়োজনও কম নয়। [৩৯৩]
বদরযুদ্ধে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস:
আবু সুফিয়ানের কাফেলা ধরতে রাসূল ﷺ সাহাবিদেরসহ মাদীনা থেকে বের হয়েছেন—এই কথা জানতে পেরে আবু সুফিয়ান সমুদ্র উপকূলীয় পথ ধরে পালিয়ে যান এবং কুরাইশদের তাদের জানমাল রক্ষার ডাক দিতে আমর বিন দামদাম আল-গিফারিকে মাক্কার দিকে দ্রুত পাঠান। চতুর আবু সুফিয়ান মুসলিমদের খবরাখবর নিতে শুরু করেন। তাদের অবস্থাদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। রীতিমতো গুপ্তচরবৃত্তি করে যান। বদর প্রান্তরে এসে স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি এখানে কোনো বহিরাগতদের আনাগোনা লক্ষ করেছ কখনো? তারা অপরিচিত দুজন লোককে দেখেছে বলে জানায়। তিনি তাদের সেই লোকদের বাহনের চলার জায়গাটা দেখিয়ে দিতে বলেন। তারা তাকে সেই জায়গা দেখিয়ে দেয়। তিনি উটের লাদি হাতে নিয়ে ভেঙে দেখেন। এর ভেতরে খেজুরদানা দেখে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, এটা তো ইয়াসরিবের জন্তুর লাদি। [৩৯৪] এ থেকে তিনি প্রতিপক্ষের গতিবিধি আঁচ করতে পারেন। নিশ্চিত হন যে, অপরিচিত লোকেরা মাদীনার মুসলিম অধিবাসী এবং তারা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে বেরিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে তিনি আমর ইবনু দামদামকে কুরাইশদের উদ্দেশে পাঠিয়ে নিজে কাফেলা নিয়ে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা হয়ে মাক্কায় পৌঁছেন। বাণিজ্য কাফেলার বিপদের খবর শুনে কুরাইশরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কারণ, এতে তাদের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। মাক্কায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কুরাইশ ও মিত্ররা তীব্র মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে। [৩৯৫]
সাহাবিদের সঙ্গে আল্লাহর রাসূলের পরামর্শ:
বণিক কাফেলার নিরাপদ প্রস্থান ও রাসূলের বিরুদ্ধে মাক্কার নেতৃস্থানীয়দের যুদ্ধ করার আগ্রহের কথা জানতে পেরে বিষয়টি নিয়ে রাসূল ﷺ সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। [৩৯৬] মুহাজিরদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে রাসূল আনসারদের নিকট যান। তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে লোকেরা, তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও। আনসাররাই মুসলিম সেনাবাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ। সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস রা. এগিয়ে এসে বলেন, আল্লাহর শপথ, হে রাসূল, আপনি আমাদের অংশগ্রহণ কামনা করছেন? রাসূল উত্তর দেন, অবশ্যই। রাসূলের উত্তর শুনে তিনি বলেন, আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনাকে বিশ্বাস করেছি। শপথ সেই রবের, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন; আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রাভিযানেও বের হন, তবে আমরা সমুদ্রাভিযানেই বের হব। আমাদের একজন সদস্যও পিছু হটবে না। [৩৯৯]
যুদ্ধ-যাত্রা ও তথ্য সংগ্রহ:
সাহাবিদের আনুগত্য, সাহসিকতা ও একতা দেখে রাসূল ﷺ তাদের সামরিক বিন্যাস করেন। সাদা ঝান্ডা বেঁধে মুস'আব বিন 'উমাইরের হাতে দেন। সা'দ বিন ওয়াক্কাস ও 'আলি বিন আবি তালিবের হাতে দুটি কালো পতাকা দেন। এদিকে রাসূল আবু বাকরকে নিয়ে মুশরিক বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েন। পথিমধ্যে জনৈক আরব বৃদ্ধের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। রাসূল ছদ্মবেশে বৃদ্ধকে কুরাইশ বাহিনী, মুহাম্মাদ ও তাঁর সহচরদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। শেষে বলেন, 'আমরা মা-এর লোক' (আমরা পানি থেকে)।
রাসূল যেদিন আবু বাকরকে নিয়ে বের হন, সেদিন সন্ধ্যাতেই তিনি 'আলি ইবনু আবি তালিব, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের সমন্বিত একদল সাহাবিকে কুরাইশ বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য বদরের কূপ এলাকায় পাঠান। তারা সেখানে গিয়ে মুশরিক বাহিনীর জন্য পানি সংগ্রাহক দুই দাসের সাক্ষাৎ পান। তাদের আল্লাহর রাসূলের নিকট ধরে আনেন। রাসূল জানতে চান, কুরাইশ নেতাদের কে কে এসেছে? দাসরা জানায়, রাবী'আর দুই ছেলে উতবা ও শাইবা, আবু জাহল, উমাইয়া বিন খালফ প্রমুখ নেতৃস্থানীয় কুরাইশ। রাসূল সাহাবিদের বলেন, আরে, এ যে দেখছি, মাক্কাবাসী তাদের হৃদয়ের মানিকদের তোমাদের বিরুদ্ধে লড় লড়তে পাঠিয়েছে। [৪০১]
বদরযুদ্ধে হুবাব বিন মুনযিরের পরামর্শ:
বদর প্রান্তরের কোনো এক কুয়োর কাছে যাত্রাবিরতি করেন; কিন্তু জায়গাটি সাহাবি হুবাব বিন মুনযিরের কাছে খুব ভালো মনে হলো না। তিনি রাসূলের নিকট বিনীতভাবে জানতে চান, হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি আল্লাহর সিদ্ধান্তে নির্ধারিত জায়গা যে আমাদের আগে-পিছে যাওয়ার সুযোগ নেই, নাকি আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ? রাসূল বলেন, না, এটা আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। আর জানো তো, যুদ্ধের অপর নাম কৌশল। রাসূলের কথা শুনে হুবাব বলেন, 'তাহলে হে আল্লাহর রাসূল, এই জায়গাটি আমাদের জন্য খুব উপযোগী নয়। আপনি বরং সাহাবিদের নিয়ে কুরাইশ বাহিনীর কুয়োর নিকটে অবস্থান নিন। রাসূল তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন। [৪০৫]
টিকাঃ
৩৮৯. ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার আসকালানি
৩৯০. মুসলিম, ইমাম নববির শরাহ, ৬/৩৪০
৩৯১. আল-মুসনাদ, ১/৪১১; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৬/৬৯; জাওয়ামিউস সীরাহ, পৃ. ১০৮
৩৯২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, উমারি, ২/৩৫৫
৩৯৩. আল-মুসনাদ, ১/৪১১; হাদীস নং ৩৯০১
৩৯৪. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ২/২৩০
৩৯৫. মাওসূআতু নাযরাতিন নাঈম, ১/২৮৭
৩৯৬. সহীহ বুখারি, কিতাবুল মাগাযি, ৩/৩৯৫২
৩৯৯. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/২৬২, সনদ সহীহ; আল-মুসনাদ, ৫/২৫৯, হাদীস নং ৩৬৯৮
৪০১. আল-মুসনাদ, ৯৪৮; ইবনু হিশাম, ২/২২৯
৪০৫. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ৩/২১
📄 বদর প্রান্তরে রাসূল সা. ও সাহাবিগণের অবস্থান
সাহাবিদের নিয়ে বদরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন রাসূল। মুশরিকদের সবচেয়ে নিকটতম কুয়োর কাছে যাত্রাবিরতি করেন। সেনাপতির নিরাপত্তার কথা ভেবে সা'দ বিন মু'আয রাসূলের নিকট একটি নিরাপদ ছাউনি নির্মাণের আবেদন করেন। মুসলিমরা রাসূলের জন্য ছাউনি নির্মাণের কাজে নেমে পড়েন। রণাঙ্গনে একটি উঁচু ঢিবির ওপর নির্মিত হয় ছাউনি। সেখানে রাসূলের সঙ্গে আবু বাকরও অবস্থান করেন। সা'দ বিন মু'আযের নেতৃত্বে একদল তরুণ আনসারি সাহাবি রাসূলের ছাউনির নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। [৪০৮]
লড়াই শুরুর আগেই আল্লাহর করুণা:
বদর প্রান্তরে লড়াই শুরুর আগেই মুসলিমরা আল্লাহর দয়া হিসেবে তন্দ্রা ও বৃষ্টি লাভ করে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, (স্মরণ করো) যখন তিনি তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি দেওয়ার জন্য তোমাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছিলেন এবং তোমাদের পবিত্র করার জন্য... আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করেছিলেন। [সূরা আনফাল, ৮: ১১]
আল্লাহ্র রাসূলের রণ-পরিকল্পনা:
বদরের দিন আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাসূল ﷺ নতুন কয়েকটি অভিনভ রণকৌশল আবিষ্কার করেন। প্রথম সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেন রাসূল ﷺ। সারিবদ্ধ রণশৈলী সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন— আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে (অটল থেকে) কাতার বেঁধে যুদ্ধ করে, যেন তারা এক সুদৃঢ় প্রাচীর। [সূরা সফ, ৬১:৪]
সারিবদ্ধ রণকৌশলের কিছু উপকারিতা হলো শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করা এবং গোটা যুদ্ধ পরিচালনা সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে থাকা। রাসূল নির্দেশ দেন শত্রু খুব কাছাকাছি চলে আসার পর তির ছোড়ার, যেন তা অধিক লক্ষ্যভেদী হয়। [৪১২] শত্রুকে প্রতিহত করতে রাসূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করতেন। সূর্যোদয়কালে সেনাসারি বিন্যাস করে পশ্চিমাভিমুখী হন। এতে মুসলিমরা সূর্যের বিরক্তিকর রশ্মি থেকে নিরাপদ থাকেন এবং শত্রুবাহিনী সূর্যরশ্মির মুখোমুখি পড়ে। [৪১৩]
সেনাসারিতে সাওয়াদ বিন গাযিয়ার অবস্থান ও রাসূলুল্লাহ:
যোদ্ধাদের অটুট বন্ধন বজায় রাখতে বদরযুদ্ধে সারি বিন্যাস ও সেনা পরিপাটির কাজ করেন রাসূল নিজেই। সাওয়াদ বিন গাযিয়া নামক এক যোদ্ধা সারির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর পেটে আলতো আঘাত করে রাসূল বলেন, সাওয়াদ, সোজা হয়ে দাঁড়াও। সাওয়াদ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। আমাকে প্রতিশোধ নিতে দিন। রাসূল তাঁর পেট উদাম করে বলেন, এই নাও, প্রতিশোধ নাও। সাওয়াদ রাসূলকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটে চুমু খান। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, জীবনের শেষ মুহূর্তে আপনার দেহের স্পর্শ লাভের আশাতেই এমনটা করেছি। [৪১৪]
লড়াইয়ের জন্য রাসূলের উৎসাহ দান:
সাহাবিদের পর্বতসম মানসিক দৃঢ়তার প্রশিক্ষণ দিতেন রাসূল। সাহাবিদের উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন, আকাশ ও পৃথিবীজোড়া প্রশস্ত জান্নাতের দিকে তোমরা ধাবিত হও। এ কথা শুনে ‘উবাইর বিন হুমাম আল-আনসারি আনন্দিত হয়ে তাঁর হাতের খেজুরগুলো ছুড়ে ফেলে শত্রুর ওপর প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। [৪১৬]
আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা:
বদরযুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য রাসূল আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে সাহায্য প্রার্থনা করেন। রণাঙ্গনে সেনাবিন্যাস ও নানা দিক-নির্দেশনা দিয়ে আবু বাকরকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল তাঁর জন্য নির্মিত ছাউনিতে ফিরে আসেন। রাসূল তাঁর দু'আয় বিশেষভাবে বলেন, হে আল্লাহ, আপনার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করুন। হে আল্লাহ, আজ যদি এই মুসলিম জনগোষ্ঠী বিলীন হয়ে যায়, তাহলে আর আপনার ইবাদাত করা হবে না। এত পরিমাণে কাঁদলেন এবং দু'আ করলেন যে, তাঁর চাদর পড়ে গেল। [৪২২]
শত্রু দমনে আল্লাহর সাহায্য:
ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে রাসূল একমুষ্ঠি ধূলি নিয়ে মুশরিকদের দিকে ছুড়ে মেরে বলেন, মলিন হোক ওদের মুখ। আল্লাহর সাহায্যে মুশরিকদের চোখে গিয়ে পড়ে সেই ধূলিকণা। [৪২৬] আল্লাহ তা'আলা বলেন— তুমি যখন (কঙ্কর) নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি (তা) নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন। [সূরা আনফাল, ৮: ১৭]
লড়াইয়ের সূচনা ও মুশরিকদের পরাজয়:
একক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। মুশরিকপক্ষ থেকে বের হয় উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ। মুসলিমদের পক্ষ থেকে বের হন উবাইদা বিন হারিস, হামযাহ ও 'আলি। হামযাহ ও শাইবার লড়াইয়ে শাইবা নিহত হয়। 'আলি ও ওয়ালিদের লড়াইয়ে ওয়ালিদ নিহত হয়। হামযাহ ও 'আলি এগিয়ে এসে উতবাকে হত্যা করেন। এরপর সদলবলে মুশরিকরা মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাসূলের নির্দেশমতো 'আহাদ আহাদ' স্লোগানে শর ছুড়তে থাকে মুসলিমরা। [৪২৯]
মুসলিমদের সাহায্যে ফেরেশতা প্রেরণ:
আল্লাহ কাফিরদের মনে ভীতি সঞ্চার করেছিলেন। ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্যের সংবাদ পেয়ে মুসলিমদের সাহস ও উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। [৪৩০] ইবনু আব্বাস বলেন, বদরযুদ্ধের দিন জনৈক মুসলিম এক মুশরিককে ধাওয়া করার সময় হঠাৎ তার ওপর চাবুকের শব্দ ও ঘোড়সওয়ারের ডাক শুনতে পান—হাইযূম, এগিয়ে চলো। ইবনু আব্বাস বলেন, বদর-রণাঙ্গনে রাসূল ঘোষণা দেন, এই তো ঘোড়ায় চড়ে সশস্ত্র জিবরীল আসছেন। [৪৩২]
মুসলিমদের জয় ও নিহত মুশরিকদের উদ্দেশে রাসূলের ঘোষণা:
মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের অসামান্য বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বদরযুদ্ধ। এ যুদ্ধে নেতৃস্থানীয় ৭০ জন মুশরিক নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়; আর ১৪ জন মুসলিম শহিদ হন। রাসূল ﷺ বদর প্রান্তরে তিনদিন অবস্থান করেন। [৪৩৫] শত্রুবাহিনীর বিক্ষিপ্ত লাশগুলো সংগ্রহ করে বদরের এক পরিত্যক্ত অন্ধকূপে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন রাসূল। সেখানে দাঁড়িয়ে রাসূল মর্মাহত হৃদয়ে ঘোষণা দেন, তোমরা ছিলে রাসূলের নিকৃষ্টতম প্রতিবেশী। রাসূল লাশগুলো ফেলার সময় ডাক দেন, হে রাবী'আর পুত্র উতবা... তোমরা কি তোমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুত বিষয় বাস্তবে পেয়েছ? আমি তো আমার রবের প্রতিশ্রুত বিষয় বাস্তবেই পেয়েছি। [৪৩৯]
টিকাঃ
৪০৮. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৩৩
৪১২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৮৪, ৩৯৮৫
৪১৩. আল-কিয়াদাতুল আসকারিয়্যাহ ফি আহদির রাসূল, পৃ. ৪৫৪
৪১৪. সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ২৩৬
৪১৬. মুখতাসার সহীহ মুসলিম, মুনযিরি, ২/৭০, হাদীস নং ১১৫৭
৪২২. মুসলিম, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ৩/৩৮৪
৪২৬. আল-মুসতাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/১২৫
৪২৯. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১১৬-১১৮
৪৩০. তাফসীর আয-যামাখশূরি, ২/২২৫; তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩১৫
৪৩২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৯৫
৪৩৫. সাহীহুস সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ২৫০
৪৩৯. বুখারি, হাদীস নং ৩৯৭৬; মুসলিম, হাদীস নং ২৮৭৩, ২৮৭৪
📄 রণাঙ্গনের কিছু চিত্র ও ঘটনা
পাপিষ্ঠদের মৃত্যু:
আবু জাহল বিন হিশাম আল-মাখযূমির মৃত্যু: আবদুর রাহমান ইবনু আওফ বলেন, বদরের দিন দেখি আমার দুই পাশে দুইজন আনসারি কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন এসে বলল, চাচা, আবু জাহলকে চেনেন? সে আল্লাহর রাসূলকে গালি দেয়। ওকে পেলে আমি জীবিত ছাড়ব না। একটু পরই দেখি আবু জাহল লোকেদের মাঝে পায়চারি করছে। আমি কিশোরদের ইশারা দিতেই তারা বাজের মতো তলোয়ারের আঘাত হানে আবু জাহলের ওপর। এক আঘাতেই সে ভূপতিত হয়। কিশোররা ছিলেন মু'আয বিন আফরা ও মু'আয বিন আমর বিন আল-জামূহ। [৪৪১] ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ আবু জাহলকে ভূপতিত অবস্থায় পেয়ে তার শিরস্ত্রাণ সরিয়ে ঘাড়ে আঘাত করেন এবং তার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে রাসূলের নিকট নিয়ে আসেন। রাসূল তাকে দেখে বলেন, এই হতভাগাই আমার উম্মাতের ফিরআউন। [৪৪৩]
উমাইয়া বিন খালফের হত্যাকাণ্ড:
'আবদুর রাহমান বিন 'আউফ উমাইয়া বিন খালফ ও তার ছেলেকে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিলাল তাকে দেখে ফেলেন। তিনি চিৎকার করে আনসারি সাহাবিদের ডাকেন। আনসারি সাহাবিরা উমাইয়ার ছেলেকে হত্যা করার পর উমাইয়াকে ঘিরে ফেলেন। তারা 'আবদুর রাহমান বিন আউফের নিচ দিয়ে তলোয়ার দিয়ে তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ইসলামের প্রথম যুগে মাক্কায় এই পাষণ্ড উমাইয়া হযরত বিলালকে মরুর উত্তপ্ত বালিতে ফেলে পাশবিক নির্যাতন করত। বদর প্রান্তরে সে তার কৃতকর্মের পরিণাম ভোগ করে। [৪৪৪]
উবাইদা বিন সায়ীদ বিন 'আসের মৃত্যুর ঘটনা:
যুবাইর ইবনুল আওয়াম বলেন, বদরযুদ্ধে উবাইদা বিন সায়ীদ বিন 'আসের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে এমনভাবে শিরস্ত্রাণ ও বর্ম পরা ছিল যে, তার চোখ দুটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমি তার চোখ বরাবর বর্শা দিয়ে আঘাত করি। অমনি সে ভূপতিত হয়। তার শিরস্ত্রাণ ভেদ করে আমার বর্শা এমনভাবে আটকে যায় যে, তার শরীরে পা তুলে সজোরে টান দিয়ে তা বের করতে হয়। [৪৪৯]
আসওয়াদ আল-মাখযুমির হত্যাকাণ্ড:
ইবনু ইসহাক বলেন, বদরযুদ্ধে নিষ্ঠুর দুরাচারী আসওয়াদ মাখযূমি নিহত হয়। সে রণাঙ্গনে এলে হামযা বিন 'আবদুল মুত্তালিব তার দিকে ছুটে যান। হামযা আসওয়াদের পায়ের গোছায় প্রচণ্ড আঘাত হানেন এবং এক আঘাতেই তার ইহলীলা সাঙ্গ করে দেন। হামযার অসীম সাহসিকতায় সেদিন কুরাইশ বাহিনী একেবারেই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। [৪৫১]
টিকাঃ
৪৪১. বুখারি, হাদীস নং ৩১৪১
৪৪৩. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, সাদিক উরজুন ৩/৪৩১, ৪৩২
৪৪৪. বুখারি, হাদীস নং ২৩০১
৪৪৯. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৯৮
৪৫১. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/১২১
📄 কয়েকজন শহিদের ঘটনা
হারিসা বিন সুরাকার শাহাদাত:
কিশোর বয়সেই হারিসা বদরযুদ্ধে যোগদান করে শাহাদাত বরণ করেন। তার মা রাসূলের নিকট সন্তানের অবস্থা জানতে চাইলে রাসূল বলেন, ও তো জান্নাতের অনেক বাগানে অবস্থান করছে। আর শোনো, তোমার ছেলে সর্বোচ্চ জান্নাতুল ফিরদাউস অর্জন করেছে। [৪৫২]
আউফ বিন হারিসের আত্মত্যাগ:
আফরার পুত্র 'আউফ বিন হারিস রাসূলকে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল, বান্দার কোন কাজে আল্লাহর হাসি পায়? রাসূল বলেন, বান্দাকে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে। এ কথা শুনে তিনি তার বর্মটি খুলে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। [৪৫৩]
সা'দ বিন খাইসামা ও তার বাবার আত্মত্যাগ:
বদরযুদ্ধের দিন সা'দ বিন খাইসামা ও তার বাবা যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে লটারি করলে সা'দের নাম ওঠে। সা'দ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। আর তার বাবা খাইসামা পরের বছর উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। সাহাবিদের পরিবারগুলোতে আল্লাহর পথে শাহাদাতের কী তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল এটি তার প্রমাণ। [৪৫৪]
আবু হুযাইফা বিন 'উতবা বিন রাবী'আর জন্য রাসূলের দু'আ:
বদরযুদ্ধ শেষে কুরাইশদের লাশগুলো অন্ধকূপে ফেলে দেওয়ার সময় আবু হুযাইফা বিন উতবার মুখে ঈষৎ ঘৃণার ভাব ফুটে ওঠে। কারণ সেখানে তাঁর বাবার লাশও ছিল। তিনি তাঁর বাবার অবিশ্বাসের মৃত্যুতে মর্মাহত হয়েছিলেন। নবিজি তাঁর জন্য কল্যাণের দু'আ করেন। [৪৫৫]
টিকাঃ
৪৫২. বুখারি, মাগাযি অধ্যায়, হাদীস নং ৩৯৮২
৪৫৩. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/৩১
৪৫৪. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/৮৭
৪৫৫. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/১৭৪