📄 কিছু ঘটনা, কিছু বিধান
অর্থনৈতিক সংকট নিরসন:
মুসলিমদের মাদীনা হিজরাতের ফলে নতুন রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মহান নেতা রাসূল নানাভাবে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করেন। আনসার-মুহাজির ভ্রাতৃত্ব গড়েন। নববি মাসজিদের অধীনে দরিদ্র মুহাজিরদের মাথা গোঁজার ঠাঁই-সুফফা নির্মাণ করেন। মাদীনার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ দেখতে পান, দেশের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ইয়াহুদিদের হাতে। মাদীনার বাণিজ্য-বাজার, সম্পদ সবকিছু তাদের কর্তৃত্বে। পণ্য, পণ্য-মূল্য ও ভোক্তা-চাহিদাও তাদের নিয়ন্ত্রণে। মাদীনার এমন পরিস্থিতি দেখে রাসূল ﷺ মুসলিমদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক স্বাধীন বাজার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনবোধ করেন, যেখানে বাণিজ্যিক জগতে ইসলামিক মহান আদর্শের স্বাধীন চর্চা হবে।
রাসূল ﷺ মানুষকে কুরআনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির আলোকে উপদেশ দিয়ে অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের চেষ্টা করেন। তিনি মানুষকে অতীতের জাতিগোষ্ঠীর পরিণাম থেকে শিক্ষা নিতে বলেন। আসমানি ওয়াহির আলোকে আল্লাহভীরু-সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে যা যা প্রয়োজন, তিনি সবই করেন। তাওহীদ ও রিসালাতের দায়িত্ব বহনে সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে স্বাবলম্বী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাসূলের মাদীনায় ছোট-বড় সব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা হয়। কারণ, এসবই এই রাষ্ট্রের উন্নয়নের উপাদান।
হিজরাতের পরবর্তী দুই বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইবাদাতমূলক কয়েকটি উপাদান হলো-যাকাত, সাদাকাতুল ফিতর ও সাওম সাধনা। এ সময়ে মুসলিম সমাজের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে ক্রমন্বয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়; কোনো তাড়াহুড়া কিংবা কঠোরতা ছিল না; বরং যথাসময়ে তা সম্পাদন করা হয়েছে। [৩৮২]
সাওম বিধানের ইতিহাস:
হিজরি দ্বিতীয় বছরের শা'বান মাসে সাওম আবশ্যক করে আল্লাহ তা'আলা একে ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ ঘোষণা করেন। তবে সাওমের ইতিহাস নবি মুহাম্মাদের জাতির ওপরই প্রথম নয়। পূর্বেকার জাতির ওপরও এই বিধান ছিল। এতেই সাওমের মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। সাওম ফরজের বিধান ঘোষণা করে আল্লাহ তা'আলা বলেন- হে ঈমানদারগণ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য যেমন সাওম ফরজ করা হয়েছিল, তেমনি তোমাদের জন্যও তা ফরজ করা হলো, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। [সূরা বাকারা, ২: ১৮৩]
যাকাতুল ফিতর বিধানের ইতিহাস:
সাওম ফরজ করার বছরেই সাদাকাতুল ফিতর ফরজ হয়। স্বাধীন, দাস, নারী, পুরুষ, ছোট ও বড় সকল মুসলিমের সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করা আবশ্যক। মুসলিমদের প্রতি সাদাকাতুল ফিতর বিধানের প্রজ্ঞা স্পষ্ট। এই দানের প্রজ্ঞা সম্পর্কে 'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন, পাপ মোচন ও অনাথ-ভোজের উদ্দেশ্যে রাসূল সাওম পালনকারীর প্রতি সাদাকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। ঈদের সালাতের পূর্বে যে প্রদান করবে, তা গ্রহণযোগ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে গণ্য হবে। আর পরে যে প্রদান করবে, তা সাধারণ সাদাকারূপে গণ্য হবে। [৩৮৩]
যাকাত বিধানের ইতিহাস:
যাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। দ্বিতীয় হিজরিতে রামাদানের পর এই বিধান অবতীর্ণ হয়। কেননা সাধারণ যাকাতের বিধান সাদাকাতুল ফিতরের পরে হয়। আর সাদাকাতুল ফিতর অবশ্যই রামাদানের ফরজ সিয়ামের পর। ইমামদের বর্ণনা দ্বারা এমনটাই বুঝা যায়, যেমন: আহমাদ, ইবনু খুজাইমা, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ এবং হাকিম প্রমুখ ইমামগণ কায়েস ইবনু সা'দ ইবনু উবাদা সূত্রে একটা হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে আমাদের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর যখন তা অবতীর্ণ হলো তিনি আমাদের আদেশ করেননি এবং নিষেধ করেননি। আর আমরাও এভাবেই করে যেতে থাকলাম। [৩৮৪] হাফিজ ইবনু হাজার এর সনদকে সহীহ বলেছেন, আর সালাফ ও পরবর্তী সময়ের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত, যাকাতের এই বিধান দ্বিতীয় হিজরিতে মাদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। [৩৮৫]
ঈদের সালাতের ইতিহাস:
দ্বিতীয় হিজরিতেই রাসূল প্রথম ঈদের সালাত আদায় করেন। এ দিনেই সাহাবিদের নিয়ে মহান আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর বলতে বলতে তিনি ঈদগাহে যান।
আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে 'আয়িশার বিবাহ:
খাদীজার মৃত্যুর পর হিজরাতের পূর্বে মাক্কায় রাসূলের সঙ্গে 'আয়িশার বিয়ের চুক্তি সম্পাদন হয়। চুক্তি সম্পাদনের সময় 'আয়িশার বয়স ছিল ছয় বছর। পরে মাদীনায় হিজরাতের প্রথম বছরে শাওয়াল মাসে নয় বছর বয়সে তার সঙ্গে বাসর হয়। [৩৮৬] বিবাহ কিংবা বিবাহোত্তর আনুষ্ঠানিকতার কারণে রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের জীবনে প্রচার, লড়াই, শিক্ষা ও রাষ্ট্রবিনির্মাণের কাজে কোনো ছন্দপতন ঘটেনি; বরং বিবাহ—এমনকি বহুবিবাহ তাদের জীবনে পানাহারের মতো একটি স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কারণ, ইসলাম প্রকৃতি ও বাস্তবতাবান্ধব জীবনব্যবস্থা—বরং বিবাহ ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
চুয়ান্ন বছর বয়সে ‘আয়িশার সঙ্গে বাসরে গমন করেন রাসূল ﷺ—এ কথা শোনামাত্রই আমাদের মাথায় বার্ধক্য, অক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় ভেসে ওঠে। কারণ, বছরের অঙ্কের সঙ্গে বয়সের অঙ্কটাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে—এটাই আমাদের সাধারণ চিন্তানীতি; কিন্তু প্রকৃত চিন্তানীতি হলো মানুষের জীবনীশক্তি, কর্মতৎপরতা ও সামর্থ্য। দেখুন, আমাদের সমাজে কোনো কোনো মানুষ ত্রিশ বছর বয়সেই পঞ্চাশ বছরের পরিপক্বতা লাভ করে, আবার অনেক পঞ্চাশ বছর বয়সি মানুষও ত্রিশ বছর বয়সের পরিপক্কতা অর্জন করতে পারে না। তবে এ ক্ষেত্রে রাসূলের ব্যক্তিত্ব অনন্য ও বিরল। পঞ্চাশ বছর বয়সেও তাঁর পুরুষত্ব, মনোবল ও দৃঢ়তা ছিল টগবগে তরুণের মতো—পৌরুষ ও যৌবনের বিচারে কোনো মানুষ তাঁর সমকক্ষ নয়।
রাসূল ﷺ ও ‘আয়িশার বয়সের দূরত্ব প্রকৃতপক্ষে কোনো দূরত্বই নয়। তারা মাঝে মাঝেই তরুণদের মতো দৌড়-প্রতিযোগিতা করতেন। একবার ‘আয়িশা প্রথম হন, পরের বার রাসূল ﷺ প্রথম হন। রাসূল ﷺ ও ‘আয়িশার জীবনে এ জাতীয় প্রেমময় আবেগসিক্ত ঘটনা অসংখ্য। [৩৮৭]
রাসূল ﷺ ও ‘আয়িশার বিবাহে ধীসম্পন্ন যেকোনো মানুষের পক্ষে উজ্জ্বল প্রজ্ঞা অনুধাবন করা সম্ভব। তাঁর হিজরাত পরবর্তী মাদানিজীবনের শুরুতেই এই পুণ্যময় বিবাহ সম্পাদন হয়। মানুষ জীবনের একটি বড় অংশ কাটায় আপন ঘর ও পরিবারে। রাসূল-আয়িশার এই পুণ্যময় মহান জুটির দাম্পত্যজীবন থেকে যেকোনো মানুষের জন্য ঘর ও পরিবার-সংশ্লিষ্ট অগাধ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। এই অবদানের পেছনে বিশেষ কৃতিত্ব রাখেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা রা., আর সাধারণভাবে রাখেন অন্যান্যরা। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে তিনি তার মেধা ও জ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যয় করেন। ইতিহাসের জগতে সীরাতগ্রন্থগুলো তার উজ্জ্বল সাক্ষী। রাসূলের মৃত্যুপরবর্তী পঞ্চাশটি বছর দীন প্রচারে বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতায় অসাধারণ অবদান রাখেন তিনি। এই মহান জননীর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকুন। [৩৮৮]
টিকাঃ
৩৮২. দিরাসাত ফি আহদিন নুবুয়্যাহ, আশ-শুজা, পৃ. ১৬৬, ১৬৮
৩৮৩. সুনানু আবি দাউদ, যাকাত অধ্যায়, হাদীস নং ১৬০৯
৩৮৪. সাহীহ সুনানে নাসাঈ, যাকাত অধ্যায়, হাদীস নং ২৫০৬
৩৮৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১১১
৩৮৬. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৬৮
৩৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২
৩৮৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩