📘 রউফুর রহীম 📄 রাসূলের কয়েকটি মহান আদর্শ

📄 রাসূলের কয়েকটি মহান আদর্শ


সুযোগ্যকে উৎসাহ দান ও প্রশংসা জ্ঞাপন:
জ্ঞান-পিপাসা ও আগ্রহ বাড়ার জন্য রাসূল আবু মূসা আশ'আরিকে উৎসাহ দিতেন। তার সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত শুনে রাসূল বলেন, তুমি যদি দেখো আমি তোমার সুললিত কণ্ঠের তিলাওয়াত শুনছি, তাহলে মনে করবে, তোমাকে দাউদের পরিবারের একটি অনবদ্য বংশী দেওয়া হয়েছে। [৩৫৮]

কেউ ভুল করলে কোমলভাবে তা শুধরে দেওয়া:
রাসূল সাহাবিদের অবস্থা ও সামর্থ্যের দিকে গভীর খেয়াল রাখতেন। তাদের অজ্ঞতা মেনে নিয়েই কোমলভাবে তা শোধরানোর চেষ্টা করতেন। সাহাবিদের প্রতি রাসূলের কোমলতা ও নম্রতার কারণে তারা বেশ মুগ্ধ হয়ে তাঁর বাণী মুখস্থ ও প্রচার করতেন। মুআবিয়া বিন হাকাম আস-সুলামি তাঁর নিজ অভিজ্ঞতার কথা বলেন, একবার রাসূলের সঙ্গে আমার সালাত আদায়কালে একলোক হাঁচি দেয়। 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলে আমি তার হাঁচির উত্তর দিই। উত্তর শুনে সবাই একযোগে আমার দিকে তাকায়। অবস্থা দেখে আমি বলে বসি, কী ব্যাপার! এভাবে তোমরা আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন? রানে হাত চাপড়ে সকলে আমাকে থামাতে চেষ্টা করে। আমিও থেমে যাই। তারপর রাসূলের সালাত শেষ হলে তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। অত্যন্ত কোমলতার সঙ্গে বললেন, এই সালাতে কোনো কথাবার্টা বলা যায় না। কারণ, সালাত তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন পাঠের কাজ। তিনি আমাকে একটু বকলেন না, একটু শাসালেনও না। আল্লাহর শপথ, আমি তাঁর মতো কোমল, দয়ালু শিক্ষক আর দেখিনি। [৩৫৯]

নিন্দনীয় বিষয়ে ব্যক্তিকে না শাসিয়ে সকলকে একসঙ্গে উপদেশ করা ভালো:
এমন পরিস্থিতে একক ব্যক্তিকে না শাসিয়ে সবাইকে একসঙ্গে উপদেশ করলে অপরাধী-নিরপরাধী সকলের মাঝে আত্মসংশোধনের মনভাব তৈরি হয়। এতে যে ভুল করে, তার অনুভূতির প্রতিও সম্মান বজায় থাকে। সঙ্গে সঙ্গে সকলে এমন ভুল না করার জন্য সতর্ক হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে 'আবদুল্লাহ বিন লাতাবিয়ার ঘটনা বেশ উল্লেখযোগ্য- একবার রাসূল তাকে বনু সুলাইম গোত্রের সাদাকা সংগ্রাহক পদে নিয়োগ দেন। এই যাত্রায় তিনি নিজের জন্য উপহারও সংগ্রহ করেন। আবু হুমাইদ আস-সাদি বলেন, 'রাসূল ইবনু লাতাবিয়া নামের এক লোককে বনু সুলাইমের সাদাকা সংগ্রহের কাজে নিয়োগ দেন। তিনি সাদাকার সম্পদ এনে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় বলেন, এটা আপনাদের সম্পদ আর এটা আমার উপহার। তার কথা শুনে রাসূল বলেন, তাহলে তুমি তোমার বাবা-মায়ের ঘরে যখন অবস্থান করতে, তখন দেখা যেত, কে তোমার নিকট উপহার নিয়ে আসে-এমন পরিস্থিতিতে রাসূল আমাদের একত্র করে বোঝান-সাদাকা সংগ্রহের দায়িত্ব আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন আর আমি তোমাদের কাউকে দিয়ে এই কাজ আদায় করে নিই। এমতাবস্থায় কেউ যদি এসে বলে-এটা তোমাদের সম্পদ আর এটা আমার উপহার-তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়! সে যদি উপহার পাওয়ার লোকই হতো, তাহলে সে বাড়িতে তার বাবা- মায়ের নিকট বসে থাকত, তখন দেখা যেত, কে তোমার নিকট উপহার নিয়ে আসে! সাবধান, আল্লাহর শপথ, তোমাদের কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাহলে কিয়ামাতের দিন অবশ্যই তা নিয়ে আল্লাহর নিকট হাজির হতে হবে। আর আমি অবশ্যই সেই লোককে চিনে নেব, যে আওয়াজরত উট, গরু ও ছাগল নিয়ে হাজির হবে। তারপর তিনি আকাশের দিকে দুই হাত তুলে বলেন, হে আল্লাহ, অবশ্যই আমি আমার দেখা ও শোনা অনুযায়ী তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি। [৩৬০]

প্রয়োজনে ক্ষোভ প্রকাশ:
কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মাধ্যমে তার অজ্ঞাতসারে শারী'আ-বিরোধী ঘটনা হয়ে গেলে-যা ইসলাম, ঈমান ও তাওহীদের পরিপন্থি, রাসূল তার সংশোধন ও তাকে দিক-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য ভীষণ রাগ দেখাতেন। এই জাতীয় রাগের ধরন বোঝা যায় 'উমারের ঘটনা থেকে। একবার রাসূলকে পড়ে শোনানোর উদ্দেশ্যে তিনি এক কপি তাওরাত নিয়ে আসেন। জাবির বিন 'আবদুল্লাহ বলেন, একবার 'উমার ইবনুল খাত্তাব এক কপি তাওরাত নিয়ে রাসূলের নিকট আসেন। তিনি রাসূলকে শুনিয়ে পড়তে শুরু করেন। তার পাঠ শুনে রাসূল নীরবে ক্রোধ সংবরণ করেন। অবস্থা দেখে আবু বাক্ 'উমারকে শাসিয়ে বলেন, তুমি রাসূলের মুখে ক্রোধ দেখতে পাচ্ছ না? রাসূলের মুখের দিকে তাকিয়ে 'উমার বলেন, আমি রাসূল ও তাঁর রবের ক্রোধ থেকে আল্লাহর পানাহ চাই। আমি রব হিসেবে আল্লাহ, দীন হিসেবে ইসলাম এবং নবি হিসেবে মুহাম্মাদকে পেয়েই সন্তুষ্ট। তার কথায় রাসূল বলেন, আমার প্রাণ-ধারকের শপথ, যদি স্বয়ং মূসা আসতেন আর তোমরা আমাকে ছেড়ে তার অনুসরণ করতে, তাহলেও তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে! মূসা যদি আমার নবুওয়াতকালে বেঁচে থাকতেন, অবশ্যই তিনি আমার আনুগত্য করতেন। [৩৬১]
রাসূলের সংশোধনীমূলক ক্রোধের আরেকটি উদাহরণ। তিনি ইমাম সাহাবিদের দীর্ঘ সালাতের ব্যাপারে বারণ করতেন। কারণ, জামা'আতের সালাতে অনেক অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশু থাকে। রাসূলের বারণসত্ত্বেও কোনো কোনো সাহাবি লম্বা সময় নিয়ে সালাতের ইমামতি করতেন। অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশুদের দুর্দশার কথা জানতে পেরে রাসূল খুব রাগ করেন। এই প্রসঙ্গে আবু মাসউদ আল-আনসারি বলেন, এক লোক রাসূলের নিকট অভিযোগ নিয়ে আসে, অমুক ইমামের দীর্ঘ সালাতের কারণে আমি সালাত আদায় করতে পারি না। তার অভিযোগ শুনে রাসূল খুব রাগ করেন। আমি কখনো তাঁকে এতটা রাগ করতে দেখিনি। এরপর তিনি লোকদের লক্ষ করে বলেন, তোমরা লোকদের সালাতবিমুখ করো না। তোমাদের কেউ ইমামতি করলে সে যেন নাতিদীর্ঘ করে। কারণ, সালাতের জামা'আতে অসুস্থ, দুর্বল ও প্রয়োজনগ্রস্ত লোকেরাও থাকে। [৩৬২]
রাসূলের সংশোধনীমূলক এমন ক্রোধের আরও একটি উদাহরণ। একবার সাহাবিগণ তাকদীর তথা ভাগ্য বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলে তিনি খুব রাগ করেন। 'আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল 'আস বর্ণনা করেন, একবার রাসূল সাহাবিদের উদ্দেশে বের হয়ে দেখেন, তারা তাকদীর তথা ভাগ্য বিষয়ে বিতর্ক করছেন। এই অবস্থা দেখে তিনি ভীষণ রাগ করেন। তাঁর চেহারায় যেন জ্বলন্ত ছাইয়ের প্রলেপ। সাহাবিদের লক্ষ করে তিনি বলেন, তোমাদের কি এই কাজের আদেশ করা হয়েছে, এই কাজের জন্যই কি তোমাদের সৃষ্টি? তোমরা তো দেখছি কুরআনের এক অংশের সঙ্গে অপরাংশের বিরোধ বাঁধাচ্ছ। জেনে রেখো, এরকম বিতর্কে জড়িয়েই পূর্বের জাতিগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে গেছে। [৩৬৩]

এমনিভাবে সাহাবিগণ রাসূলের নির্দেশ এড়িয়ে ধর্মীয় বিষয়ে অতিরঞ্জন ও অতিকৃচ্ছতা চর্চা করলে তিনি খুব রাগ করতেন। 'আয়িশা থেকে একটি বর্ণনা আছে। সাহাবিদের তিনি তাদের সামর্থ্যমতো কাজ করার নির্দেশ করতেন। একবার এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কেউ একজন বলেন, হে রাসূল, আমাদের ও আপনার অবস্থা এক নয়। আল্লাহ তা'আলা তো আপনার পূর্বাপর সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের কথায় রাসূল রাগ করেন। মাঝে মাঝে রাগে মুখ লাল করে তিনি বলতেন, তোমাদের মাঝে আল্লাহকে আমিই সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং জানি। [৩৬৪] এই জাতীয় পরিস্থিতিতে রাসূল অনর্থক রাগ করতেন না; বরং তিনি রাগ করতেন, যেন সাহাবিগণ সচেতন ও শিক্ষানুরাগী হন। আর সতর্ককারী রাগমাখা চেহারার হওয়াই স্বাভাবিক। অনুরূপভাবে একজনকে কখনো কোমল, কখনো কঠোর হতে হয়। সুতরাং শিক্ষক কিংবা সতর্ককারীভেদে স্থান-কাল ও পাত্র বিচারে আচরণ ও অবস্থার তারতম্য হতে পারে। [৩৬৫]

কোনো আকস্মিক ঘটনার সাহায্যে গভীর শিক্ষাপ্রদান:
রাসূলের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটত। সেসব ঘটনার মাধ্যমে তিনি উদাহরণ দিয়ে সাহাবিদের শেখাতে চেষ্টা করতেন। এতে উপমা ও উপমেয় উভয়টিই খুব স্পষ্টভাবে শ্রোতা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব- একবার রাসূলের নিকট একদল যুদ্ধবন্দি আসে। তাদের মধ্যে এক নারী বন্দি অস্থির পায়ে হাঁটছিল আর নিজ স্তন দোহন করছিল। এমন সময় এক শিশুকে পেয়ে সে বুকে জড়িয়ে দুধ পান করাতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে রাসূল আমাদের জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের কি মনে হয়, এই মা তার সন্তানকে আগুনে ছুড়ে ফেলতে পারে! আমরা বললাম না, সে তার সন্তানকে আগুনে ছুড়ে ফেলতে পারে না। আমাদের কথা শুনে রাসূল বলেন, সন্তানের প্রতি এই মায়ের দয়ার চেয়েও মানুষের প্রতি আল্লাহর দয়ার অনেক অনেক বেশি গভীর। [৩৬৬] এভাবেই রাসূল উপস্থিত সাহাবিদের দুগ্ধপোষ্য শিশুহারা মায়ের ব্যাকুলতা দেখিয়ে শিক্ষা দেন। মায়ের দয়া ও ব্যাকুলতা তুলনা করেন আল্লাহর দয়া ও ব্যাকুলতার সঙ্গে, যেন সাহাবিরা মানুষের প্রতি আল্লাহর গভীর দয়া অনুভব করতে পারেন। [৩৬৭]

টিকাঃ
৩৫৮. মুসলিম, মুসাফিরের সালাত অধ্যায়, হাদীস নং ২৩৬
৩৫৯. মুসলিম, মাসাজিদ অধ্যায়, হাদীস নং ৫৩৭
৩৬০. বুখারি, হাদীস নং ৬৯৭৯
৩৬১. মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/১৭৩, ১৭৪
৩৬২. বুখারি, ইলম অধ্যায়, হাদীস নং ৯০
৩৬৩. ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৮৫
৩৬৪. বুখারি, ঈমান অধ্যায়, হাদীস নং ২০
৩৬৫. ফাতহুল বারি, ১/১৮৭
৩৬৬. বুখারি, আদব অধ্যায়, হাদীস নং ৫৯৯৯
৩৬৭. আর-রাসূলুল মুআল্লিম, আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, পৃ. ১৬০

📘 রউফুর রহীম 📄 রাসূলের সময়-সুযোগ বুঝে শালীনভাবে প্রশ্ন করা

📄 রাসূলের সময়-সুযোগ বুঝে শালীনভাবে প্রশ্ন করা


রাসূলকে প্রশ্ন করার জন্য সাহাবিগণ সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। তাঁকে নির্জন অবস্থায় পেলেই তারা শালীনভাবে প্রশ্ন করার চেষ্টা করতেন—পাছে তিনি যেন বিব্রত কিংবা বিরক্ত না হন, সেদিকেও লক্ষ রাখতেন। আবু মূসা আল-আশ'আরি বলেন, সাধারণত ফজরের সালাতের পর আমরা রাসূলের দিকে মুখ করে বসতাম। তখন কেউ কুরআন, কেউ আবশ্যক বিষয়াদি আবার কেউ স্বপ্ন সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করত। [৩৮০]

রাসূলের অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখা এবং প্রশ্ন করে বিব্রত না করা:
রাসূলকে অতিরিক্ত প্রশ্ন করার ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে বারণ-বাণী আসার পর থেকে সাহাবিগণ সতর্ক হয়ে যান। এরপর থেকে কোনো বেদুইন কিংবা জ্ঞানীকে প্রশ্নের জন্য এগিয়ে দিয়ে তারা পেছন থেকে নীরবে আলোচনা শুনতেন। সাহাবিগণের এই শালীন সংস্কৃতি সম্পর্কে আনাস ইবনু মালিক বলেন, একবার রাসূলকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার ব্যাপারে আমাদের বারণ করা হয়। তারপর থেকে আমরা কোনো বেদুইন কিংবা জ্ঞানী লোকের অপেক্ষায় থাকতাম। পেছনে থেকে রাসূলের সঙ্গে তাদের আলাপচারিতা শুনি। একবার পল্লি এলাকার এক লোক এসে রাসূলকে বলে, মুহাম্মাদ, তোমার প্রতিনিধি আমাদের নিকট এসে বলে, তোমাকে নাকি আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন? রাসূল বলেন, সে সত্য বলেছে। [৩৮১]

টিকাঃ
৩৮০. মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/১৫৯
৩৮১. মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, ইসলামের আরকান সম্বন্ধে প্রশ্ন পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ১০

📘 রউফুর রহীম 📄 কিছু ঘটনা, কিছু বিধান

📄 কিছু ঘটনা, কিছু বিধান


অর্থনৈতিক সংকট নিরসন:
মুসলিমদের মাদীনা হিজরাতের ফলে নতুন রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মহান নেতা রাসূল নানাভাবে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করেন। আনসার-মুহাজির ভ্রাতৃত্ব গড়েন। নববি মাসজিদের অধীনে দরিদ্র মুহাজিরদের মাথা গোঁজার ঠাঁই-সুফফা নির্মাণ করেন। মাদীনার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ দেখতে পান, দেশের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ইয়াহুদিদের হাতে। মাদীনার বাণিজ্য-বাজার, সম্পদ সবকিছু তাদের কর্তৃত্বে। পণ্য, পণ্য-মূল্য ও ভোক্তা-চাহিদাও তাদের নিয়ন্ত্রণে। মাদীনার এমন পরিস্থিতি দেখে রাসূল ﷺ মুসলিমদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক স্বাধীন বাজার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনবোধ করেন, যেখানে বাণিজ্যিক জগতে ইসলামিক মহান আদর্শের স্বাধীন চর্চা হবে।

রাসূল ﷺ মানুষকে কুরআনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির আলোকে উপদেশ দিয়ে অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের চেষ্টা করেন। তিনি মানুষকে অতীতের জাতিগোষ্ঠীর পরিণাম থেকে শিক্ষা নিতে বলেন। আসমানি ওয়াহির আলোকে আল্লাহভীরু-সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে যা যা প্রয়োজন, তিনি সবই করেন। তাওহীদ ও রিসালাতের দায়িত্ব বহনে সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে স্বাবলম্বী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাসূলের মাদীনায় ছোট-বড় সব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা হয়। কারণ, এসবই এই রাষ্ট্রের উন্নয়নের উপাদান।

হিজরাতের পরবর্তী দুই বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইবাদাতমূলক কয়েকটি উপাদান হলো-যাকাত, সাদাকাতুল ফিতর ও সাওম সাধনা। এ সময়ে মুসলিম সমাজের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে ক্রমন্বয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়; কোনো তাড়াহুড়া কিংবা কঠোরতা ছিল না; বরং যথাসময়ে তা সম্পাদন করা হয়েছে। [৩৮২]

সাওম বিধানের ইতিহাস:
হিজরি দ্বিতীয় বছরের শা'বান মাসে সাওম আবশ্যক করে আল্লাহ তা'আলা একে ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ ঘোষণা করেন। তবে সাওমের ইতিহাস নবি মুহাম্মাদের জাতির ওপরই প্রথম নয়। পূর্বেকার জাতির ওপরও এই বিধান ছিল। এতেই সাওমের মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। সাওম ফরজের বিধান ঘোষণা করে আল্লাহ তা'আলা বলেন- হে ঈমানদারগণ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য যেমন সাওম ফরজ করা হয়েছিল, তেমনি তোমাদের জন্যও তা ফরজ করা হলো, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। [সূরা বাকারা, ২: ১৮৩]

যাকাতুল ফিতর বিধানের ইতিহাস:
সাওম ফরজ করার বছরেই সাদাকাতুল ফিতর ফরজ হয়। স্বাধীন, দাস, নারী, পুরুষ, ছোট ও বড় সকল মুসলিমের সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করা আবশ্যক। মুসলিমদের প্রতি সাদাকাতুল ফিতর বিধানের প্রজ্ঞা স্পষ্ট। এই দানের প্রজ্ঞা সম্পর্কে 'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন, পাপ মোচন ও অনাথ-ভোজের উদ্দেশ্যে রাসূল সাওম পালনকারীর প্রতি সাদাকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। ঈদের সালাতের পূর্বে যে প্রদান করবে, তা গ্রহণযোগ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে গণ্য হবে। আর পরে যে প্রদান করবে, তা সাধারণ সাদাকারূপে গণ্য হবে। [৩৮৩]

যাকাত বিধানের ইতিহাস:
যাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। দ্বিতীয় হিজরিতে রামাদানের পর এই বিধান অবতীর্ণ হয়। কেননা সাধারণ যাকাতের বিধান সাদাকাতুল ফিতরের পরে হয়। আর সাদাকাতুল ফিতর অবশ্যই রামাদানের ফরজ সিয়ামের পর। ইমামদের বর্ণনা দ্বারা এমনটাই বুঝা যায়, যেমন: আহমাদ, ইবনু খুজাইমা, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ এবং হাকিম প্রমুখ ইমামগণ কায়েস ইবনু সা'দ ইবনু উবাদা সূত্রে একটা হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে আমাদের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর যখন তা অবতীর্ণ হলো তিনি আমাদের আদেশ করেননি এবং নিষেধ করেননি। আর আমরাও এভাবেই করে যেতে থাকলাম। [৩৮৪] হাফিজ ইবনু হাজার এর সনদকে সহীহ বলেছেন, আর সালাফ ও পরবর্তী সময়ের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত, যাকাতের এই বিধান দ্বিতীয় হিজরিতে মাদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। [৩৮৫]

ঈদের সালাতের ইতিহাস:
দ্বিতীয় হিজরিতেই রাসূল প্রথম ঈদের সালাত আদায় করেন। এ দিনেই সাহাবিদের নিয়ে মহান আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর বলতে বলতে তিনি ঈদগাহে যান।

আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে 'আয়িশার বিবাহ:
খাদীজার মৃত্যুর পর হিজরাতের পূর্বে মাক্কায় রাসূলের সঙ্গে 'আয়িশার বিয়ের চুক্তি সম্পাদন হয়। চুক্তি সম্পাদনের সময় 'আয়িশার বয়স ছিল ছয় বছর। পরে মাদীনায় হিজরাতের প্রথম বছরে শাওয়াল মাসে নয় বছর বয়সে তার সঙ্গে বাসর হয়। [৩৮৬] বিবাহ কিংবা বিবাহোত্তর আনুষ্ঠানিকতার কারণে রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের জীবনে প্রচার, লড়াই, শিক্ষা ও রাষ্ট্রবিনির্মাণের কাজে কোনো ছন্দপতন ঘটেনি; বরং বিবাহ—এমনকি বহুবিবাহ তাদের জীবনে পানাহারের মতো একটি স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কারণ, ইসলাম প্রকৃতি ও বাস্তবতাবান্ধব জীবনব্যবস্থা—বরং বিবাহ ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

চুয়ান্ন বছর বয়সে ‘আয়িশার সঙ্গে বাসরে গমন করেন রাসূল ﷺ—এ কথা শোনামাত্রই আমাদের মাথায় বার্ধক্য, অক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় ভেসে ওঠে। কারণ, বছরের অঙ্কের সঙ্গে বয়সের অঙ্কটাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে—এটাই আমাদের সাধারণ চিন্তানীতি; কিন্তু প্রকৃত চিন্তানীতি হলো মানুষের জীবনীশক্তি, কর্মতৎপরতা ও সামর্থ্য। দেখুন, আমাদের সমাজে কোনো কোনো মানুষ ত্রিশ বছর বয়সেই পঞ্চাশ বছরের পরিপক্বতা লাভ করে, আবার অনেক পঞ্চাশ বছর বয়সি মানুষও ত্রিশ বছর বয়সের পরিপক্কতা অর্জন করতে পারে না। তবে এ ক্ষেত্রে রাসূলের ব্যক্তিত্ব অনন্য ও বিরল। পঞ্চাশ বছর বয়সেও তাঁর পুরুষত্ব, মনোবল ও দৃঢ়তা ছিল টগবগে তরুণের মতো—পৌরুষ ও যৌবনের বিচারে কোনো মানুষ তাঁর সমকক্ষ নয়।

রাসূল ﷺ ও ‘আয়িশার বয়সের দূরত্ব প্রকৃতপক্ষে কোনো দূরত্বই নয়। তারা মাঝে মাঝেই তরুণদের মতো দৌড়-প্রতিযোগিতা করতেন। একবার ‘আয়িশা প্রথম হন, পরের বার রাসূল ﷺ প্রথম হন। রাসূল ﷺ ও ‘আয়িশার জীবনে এ জাতীয় প্রেমময় আবেগসিক্ত ঘটনা অসংখ্য। [৩৮৭]

রাসূল ﷺ ও ‘আয়িশার বিবাহে ধীসম্পন্ন যেকোনো মানুষের পক্ষে উজ্জ্বল প্রজ্ঞা অনুধাবন করা সম্ভব। তাঁর হিজরাত পরবর্তী মাদানিজীবনের শুরুতেই এই পুণ্যময় বিবাহ সম্পাদন হয়। মানুষ জীবনের একটি বড় অংশ কাটায় আপন ঘর ও পরিবারে। রাসূল-আয়িশার এই পুণ্যময় মহান জুটির দাম্পত্যজীবন থেকে যেকোনো মানুষের জন্য ঘর ও পরিবার-সংশ্লিষ্ট অগাধ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। এই অবদানের পেছনে বিশেষ কৃতিত্ব রাখেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা রা., আর সাধারণভাবে রাখেন অন্যান্যরা। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে তিনি তার মেধা ও জ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যয় করেন। ইতিহাসের জগতে সীরাতগ্রন্থগুলো তার উজ্জ্বল সাক্ষী। রাসূলের মৃত্যুপরবর্তী পঞ্চাশটি বছর দীন প্রচারে বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতায় অসাধারণ অবদান রাখেন তিনি। এই মহান জননীর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকুন। [৩৮৮]

টিকাঃ
৩৮২. দিরাসাত ফি আহদিন নুবুয়‍্যাহ, আশ-শুজা, পৃ. ১৬৬, ১৬৮
৩৮৩. সুনানু আবি দাউদ, যাকাত অধ্যায়, হাদীস নং ১৬০৯
৩৮৪. সাহীহ সুনানে নাসাঈ, যাকাত অধ্যায়, হাদীস নং ২৫০৬
৩৮৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ২/১১১
৩৮৬. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৬৮
৩৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২
৩৮৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px