📄 আবওয়া অভিযান
রাসূল প্রথমে আবওয়া অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযান 'ওয়াদ্দান' নামেও পরিচিতি পায়। আবওয়া ও ওয়াদ্দান এলাকা দুটি মাত্র ছয় কিংবা আট মাইল দূরত্বে অবস্থিত। এই অভিযানে কোনো লড়াই হয়নি, তবে কিনানার শাখা গোত্র বনু জামরার সঙ্গে শান্তিচুক্তি হয়। দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসে এই অভিযান চালানো হয়। পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈনিক মিলিয়ে এই অভিযানের সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র দুশো। [৩০৬]
উবাইদা ইবনুল হারিসের বাহিনী:
রাসূল প্রথমে এই বাহিনীর জন্য রণ-কেতন নির্ধারণ করেন। [৩০৭] বাহিনীটি গঠন করা হয় ৬০ জন মুহাজিরের সমন্বয়ে। বিপরীতে কুরাইশদের সৈন্যসংখ্যা ছিল পদাতিক ও আরোহী মিলিয়ে প্রায় দুশো। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান বিন হারব। রাবিগ প্রান্তরের জলাশয়ের নিকট দুই পক্ষের মাঝে লঘু সংঘাত হয়। এতে সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস তির ছুড়েন। তার ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তিরই ইসলামের পক্ষে প্রথম তির। [৩০৮]
আমিই আল্লাহর পথে প্রথম ধনুক নিক্ষেপকারী পুরুষ:
মুসলিমদের সামরিক ইতিহাসে কাফিরদের সঙ্গে প্রথম মোকাবিলা হয় এই আবু উবাইদা ইবনুল হারিস অভিযানেই। দু-পক্ষে মৃদু বাণ-বিনিময় হয়। সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস প্রথম এই অভিযানে তির ছুড়েন। তিনিই আল্লাহর পথে প্রথম ধানুকির খেতাব পান। তবে তাদের মধ্যকার লড়াই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ, উভয় পক্ষই নিরাপদে গন্তব্যে যেতে মরিয়া ছিল; কিন্তু মুসলিমরা প্রস্থান করে বীরত্ব ও শৃঙ্খলার সঙ্গে। এই নিরাপদ ও বীরত্বপূর্ণ প্রস্থানের অগ্রভূমিকা পালন করেন সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস। তার লক্ষ্যভেদী বাণ-বৃষ্টির ফলে কাফিররা দিশেহারা হয়ে ছুটে পালায়। এর ফলে মুসলিমদের পক্ষে এক নিরাপত্তাব্যূহ তৈরি হয়। এই সুযোগে উতবা বিন গাযওয়ান ও আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ মুসলিমদের কাছে পালিয়ে চলে আসেন। ইতঃপূর্বে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই অভিযানেই সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস ইসলামের পক্ষে প্রথম সামরিক সমৃদ্ধির স্বাক্ষর রাখেন।
হামযাহ বিন 'আবদুল মুত্তালিবের বাহিনী:
ইবনু ইসহাক বর্ণনা করেন, রাসূল আবওয়া অভিযান থেকে মাদীনায় ফিরে সঙ্গে সঙ্গেই হামযাহ বিন 'আবদুল মুত্তালিবকে ত্রিশজন মুহাজির আরোহী সৈন্য দিয়ে আইস প্রান্তরের সাইফুল বাহর এলাকার উদ্দেশে পাঠান। উপকূলীয় এলাকায় মাক্কার তিনশো আরোহী সৈন্যসহ আবু জাহল বিন হিশামের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। বিচক্ষণ মাজদি ইবনু আমের আল জুহানি তাদের নিবৃত্ত করে উভয় দলকেই সমঝোতায় নিয়ে আসেন। তারা শান্ত হয়ে বিনা লড়াইয়ে যে যার মতো চলে যায়। [৩০৯]
বুওয়াত অভিযান:
দ্বিতীয় হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল কুরাইশ বণিক কাফেলার গতিরোধ করার উদ্দেশ্যে দুশো সাহাবি নিয়ে বুওয়াত অভিযানে বের হন। এসময় বণিক কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন উমাইয়া বিন খালফ। তার সঙ্গে ছিল একশো সওদাগর ও দুই হাজার পাঁচশ উট। কৌশলগত কারণে রাসূল তাদের মুখোমুখি না হয়ে মাদীনায় ফিরে আসেন। [৩১০]
উশাইরাহ অভিযান:
এ যাত্রায় রাসূল আবু সালামা বিন 'আবদুল আসাদকে মাদীনার প্রতিনিধি নিযুক্ত করে উশাইরাহ অভিযানে বের হন। সেখানে জুমাদাল উলা মাস ও জুমাদাল উখরা মাসের কয়েক রাত অবস্থান করে বনু মুদলিজ ও তার বনু যামরাহ গোত্রীয় মিত্রদের সঙ্গে সন্ধি করেন। কৌশলগত কারণে যুদ্ধে না জড়িয়ে মাদীনায় ফিরে আসেন। কারণ, রসদবোঝাই বণিক কাফেলাটি দিন কয়েক আগেই সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা দিয়ে শামের উদ্দেশে চলে গেছে—পরবর্তী সময়ে কাফেলা ফেরার সময় যখন আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়, তখন কুরাইশরা সংবাদ পাওয়া মাত্র দলবেঁধে ছুটে আসে। রাসূলের সঙ্গে তাদের ভয়াবহ মোকাবিলা হয়—এটাই বদর যুদ্ধ। [৩১১]
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের বাহিনী:
উশাইরাহ যুদ্ধের পর রাসূল সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে আট প্লাটুন মুহাজির সাহাবি পাঠান। তারা হিজাযের খাররা এলাকা পর্যন্ত গিয়ে কৌশলগত কারণে বিনা লড়াইয়ে আবার ফিরে আসেন।
টিকাঃ
৩০৬. জাইশুন নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাহমূদ শীত খাত্তাব, পৃ. ৫৪
৩০৭. তাবাকাত ইবনু সাদ, ২/৭
৩০৮. হাদীসুল কুরআন আন গাযওয়াতির রাসূল, ১/৪০
৩০৯. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৫৯৫
৩১০. তাবাকাত ইবনু সাদ, ২/১০, ১১
৩১১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৬০০