📄 আল্লাহর পথে সশস্ত্র জিহাদের লক্ষ্য
বিশ্বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা:
সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে আল্লাহর দীন নিরাপদ থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
আর তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো, যাতে ফেতনা (শিরক, কুফর ইত্যাদি অধর্ম) না থাকে এবং দীন সামগ্রিকভাবে আল্লাহর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যদি তারা (অন্যায় থেকে) বিরত হয়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তাদের (এ) কাজ দেখতে পান। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় (অন্যায় ছেড়ে দিতে রাজি না হয়), তাহলে জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক; (তিনি) উত্তম অভিভাবক ও উত্তম সাহায্যকারী। [সূরা আনফাল, ৮: ৩৯, ৪০]
দীনের অনুষ্ঠান ও ইবাদাতের নিরাপত্তা:
জিহাদ অব্যাহত থাকলে নিরাপদে দীন চর্চা ও ইবাদাত করা যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন- আল্লাহ মু'মিনদের রক্ষা করেন। আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। যারা যুদ্ধ করছে, তাদের অনুমতি দেওয়া হলো-এ কারণে যে, তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে। আর আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। যাদের কেবল 'আমাদের প্রভু আল্লাহ' বলার কারণে অন্যায়ভাবে বের করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ যদি একদল মানুষকে আরেকদল মানুষ দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে (সন্ন্যাসীদের) আশ্রম, (খ্রিষ্টানদের) গির্জা, (ইয়াহুদিদের) সিনাগগ ও (মুসলিমদের) মাসজিদসমূহ-যেখানে আল্লাহর নাম অধিক পরিমাণে স্মরণ করা হয়- অবশ্যই বিধ্বস্ত হয়ে যেত। আল্লাহ নিশ্চয় তাদের সাহায্য করবেন, যারা তাঁকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন লোক যে, আমি যদি পৃথিবীতে তাদের ক্ষমতা দিই, তাহলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে ও খারাপ কাজ করতে নিষেধ করবে। আল্লাহর হাতেই সবকিছুর পরিণতি। [সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৮-৪১]
দেশে অরাজকতা প্রতিহত করা:
জিহাদের মাধ্যমে অরাজকতা ও নৈরাজ্য দমন হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
আল্লাহ যদি কতক মানুষকে কতক মানুষের দ্বারা দমনের ব্যবস্থা না রাখতেন, তাহলে পৃথিবী বিনষ্ট হয়ে যেত। তবে বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল। এগুলো আল্লাহর নিদর্শন; আমি তা তোমার কাছে যথার্থভাবে বর্ণনা করছি। আর অবশ্যই তুমি রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা বাকারা, ২: ২৫১-২৫২]
জিহাদ মু'মিনের অন্তরের পরীক্ষা, দীক্ষা ও পরিশুদ্ধির মাধ্যম:
জিহাদে গেলে ঈমানের পরীক্ষা হয়-ঈমান খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
অতএব, কাফিরদের সঙ্গে যখন তোমাদের মোকাবিলা হবে, তখন তাদের শিরশ্ছেদ করবে। অবশেষে যখন তোমরা তাদের রক্তপাত ঘটাবে, তখন (অবশিষ্টদের) কষে বাঁধবে (বন্দি করবে)। তারপর হয় অনুকম্পা, না হয় মুক্তিপণ। (তবে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে) যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা নামিয়ে রাখে (শত্রু তার অস্ত্র-সমর্পণ করে)। (এটাই আল্লাহর নির্দেশ) আল্লাহ চাইলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন; কিন্তু তিনি চান, তোমাদের এক দলকে অন্য দল দ্বারা পরীক্ষা করতে। তবে যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় (শহিদ হয়), তাদের কর্ম তিনি কিছুতেই নষ্ট করবেন না। তিনি তাদের সৎপথ প্রদর্শন করবেন এবং তাদের অবস্থা ভালো করবেন। আর তাদের সেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যে বিষয়ে তিনি তাদের জানিয়ে দিয়েছেন। [সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৪-৬]
জিহাদ কাফিরদের দমনের উপায়:
মুসলিমদের সামরিক প্রস্তুতির জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন—
তাদের বিরুদ্ধে যতটা পার শক্তি ও অশ্বারোহী বাহিনী প্রস্তুত রাখবে, যা দ্বারা আল্লাহ তোমাদের শত্রুকে এবং তাদের ছাড়া অন্যান্যদেরও আতঙ্কিত রাখবেন। তাদের তোমরা চেনো না, আল্লাহ চেনেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরোটাই তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তোমাদের প্রতি মোটেও জুলুম করা হবে না। [সূরা আনফাল, ৮: ৬০]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,
তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, যেন আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি দিতে পারেন, তাদের লাঞ্ছিত করতে পারেন, তোমাদের তাদের ওপর বিজয়ী করতে পারেন, মু'মিনদের হৃদয় শান্ত করতে পারেন এবং তাদের অন্তরের ক্রোধ দূর করতে পারেন। আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা, ক্ষমাশীল হন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, পরম প্রাজ্ঞ। [সূরা তাওবা, ৯: ১৪-১৫]
রণাঙ্গনে মুজাহিদদের সাহায্য সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন— তোমরা তাদের হত্যা করোনি; বরং আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন এবং তুমি যখন (কঙ্কর) নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি (তা) নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন, যাতে তিনি মু'মিনদের তাঁর পক্ষ থেকে একটি সুন্দর পরীক্ষার মাধ্যমে নিরীক্ষণ করতে পারেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। এটাই ব্যাপার, আর অবশ্যই আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্র দুর্বল করে দেন। [সূরা আনফাল, ৮: ১৭-১৮]
মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন:
মুনাফিকদের আসল চেহারা শনাক্ত করে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
পবিত্র থেকে অপবিত্রকে পৃথক না করা পর্যন্ত আল্লাহ মু'মিনদের তোমাদের (বর্তমান) অবস্থায় রাখবেন না। আল্লাহ তোমাদের গায়েব সম্বন্ধেও অবহিত করবেন না; তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান, বেছে নেন। তাই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের বিশ্বাস করো আর তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তোমাদের জন্য রয়েছে বিরাট প্রতিদান। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭৯]
পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা:
আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করাই জিহাদের মূল লক্ষ্য। কুরআন নাযিলের লক্ষ্য উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
আমি তোমার কাছে সত্যসহকারে কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি আল্লাহর দেখানো (শেখানো) জ্ঞান দ্বারা লোকদের মাঝে বিচার-মীমাংসা করতে পার। তাই তুমি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়ো না। [সূরা নিসা, ৪: ১০৫]
শত্রুতা দমনে জিহাদ:
ইসলামের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জিহাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য কাফিরদের পরিকল্পিত শত্রুতা ও আক্রমণ দমন করা। জিহাদের উদ্দেশ্যসমূহ কয়েক ভাগে বিভক্ত-
অমুসলিম দেশে মুসলিমদের সুরক্ষা প্রদান:
যদি কোনো মুসলিম জনগোষ্ঠী নিরাপদ জীবনযাপন ও দীন চর্চার উদ্দেশ্যে কাফির দেশ থেকে মুসলিম দেশে হিজরাত করতে না পারে, তাহলে ওই কাফির রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রের জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নিপীড়িত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে জুলুম অত্যাচার থেকে উদ্ধার করা মুসলিম রাষ্ট্রের কর্তব্য। [২৯৯] আল্লাহ তা'আলা বলেন-
তাই যারা আখিরাতের জন্য পার্থিব জীবনকে বিক্রি (ত্যাগ) করতে চায়, তারা যেন আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। আর কেউ আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত কিংবা বিজয়ী হলে অচিরেই আমি তাকে এক মহান পুরস্কার দেবো। তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেসব দুর্বল নরনারী ও শিশুদের (রক্ষার) জন্য যুদ্ধ করছ না—যারা বলছে, হে আমাদের প্রভু, অত্যাচারী অধিবাসী-বিশিষ্ট এই জনপদ থেকে আমাদের বের (উদ্ধার) করো। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী দাও। [সূরা নিসা, ৪: ৭৫-৭৬]
কাফিরদের অগ্রাসন রুখে দেওয়া:
ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাফিরদের আগ্রাসন প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো এবং সীমালঙ্ঘন করো না। আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। তোমরা তাদের যেখানেই পাবে, হত্যা করবে এবং তারা যেখান থেকে তোমাদের বের করে দিয়েছিল, সেখান থেকে তাদের বের করে দেবে। ফিতনা (গোলযোগ, বিশৃঙ্খলা, শিরক) হত্যার চেয়েও গুরুতর। তোমরা মাসজিদুল হারামের কাছে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না, যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে; যদি তারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তাহলে তোমরা তাদের হত্যা করবে—এটাই কাফিরদের (ন্যায্য) প্রতিফল। আর তারা যদি (যুদ্ধ থেকে) বিরত হয়, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু। [সূরা বাকারা, ২: ১৯০-১৯২]
জুলুম-অত্যাচার প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে:
কোনো কাফির শাসক নাগরিকদের অত্যাচার করলে মুসলিমদের কর্তব্য তাকে প্রতিহত করা। কারণ, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর জুলুম হারাম করে দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে দিয়েছেন ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। অত্যাচার বন্ধে যদি মুসলিমরা এগিয়ে না আসে, তাহলে তারা জঘন্য পাপী সাব্যস্ত হবে। কারণ, শান্তি-সমৃদ্ধি বিস্তৃত করতে জালিম প্রতিহতকরণের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাক্ষীরূপে তোমরা অবিচল থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন ন্যায়বিচার না করতে তোমাদের প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়বিচার করবে। এটা তাকওয়ার অধিকতর কাছাকাছি। আর আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ নিশ্চয় তার খবর রাখেন। [সূরা মায়িদা, ৫: ৮]
দীন প্রচারের বাধাবিপত্তি দূর করা:
মানবজাতির মাঝে আল্লাহর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর গুরুদায়িত্ব। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
তোমাদের মধ্যে যেন এমন একটি দল থাকে, যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভালো কাজ করতে আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ করতে নিষেধ করবে। এরাই সফলকাম। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১০৪] [৩০১]
টিকাঃ
২৯৭. মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৭
২৯৮. তাফসীর ইবন কাসীর, ১/২৬২, পৃ. ৪৪৭
২৯৯. আল-জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ, ড. আবদুল্লাহ আল-কাদিরি, ২/১৬২
৩০০. হাশিয়াতু ইবন আবিদীন, ৪/১২৪
৩০১. ফিকহুত তামকীন ফিল কুরআনিল কারীম, আস-সাল্লাবি, পৃ. ৪৮৮
📄 আবওয়া অভিযান
রাসূল প্রথমে আবওয়া অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযান 'ওয়াদ্দান' নামেও পরিচিতি পায়। আবওয়া ও ওয়াদ্দান এলাকা দুটি মাত্র ছয় কিংবা আট মাইল দূরত্বে অবস্থিত। এই অভিযানে কোনো লড়াই হয়নি, তবে কিনানার শাখা গোত্র বনু জামরার সঙ্গে শান্তিচুক্তি হয়। দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসে এই অভিযান চালানো হয়। পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈনিক মিলিয়ে এই অভিযানের সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র দুশো। [৩০৬]
উবাইদা ইবনুল হারিসের বাহিনী:
রাসূল প্রথমে এই বাহিনীর জন্য রণ-কেতন নির্ধারণ করেন। [৩০৭] বাহিনীটি গঠন করা হয় ৬০ জন মুহাজিরের সমন্বয়ে। বিপরীতে কুরাইশদের সৈন্যসংখ্যা ছিল পদাতিক ও আরোহী মিলিয়ে প্রায় দুশো। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান বিন হারব। রাবিগ প্রান্তরের জলাশয়ের নিকট দুই পক্ষের মাঝে লঘু সংঘাত হয়। এতে সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস তির ছুড়েন। তার ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তিরই ইসলামের পক্ষে প্রথম তির। [৩০৮]
আমিই আল্লাহর পথে প্রথম ধনুক নিক্ষেপকারী পুরুষ:
মুসলিমদের সামরিক ইতিহাসে কাফিরদের সঙ্গে প্রথম মোকাবিলা হয় এই আবু উবাইদা ইবনুল হারিস অভিযানেই। দু-পক্ষে মৃদু বাণ-বিনিময় হয়। সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস প্রথম এই অভিযানে তির ছুড়েন। তিনিই আল্লাহর পথে প্রথম ধানুকির খেতাব পান। তবে তাদের মধ্যকার লড়াই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ, উভয় পক্ষই নিরাপদে গন্তব্যে যেতে মরিয়া ছিল; কিন্তু মুসলিমরা প্রস্থান করে বীরত্ব ও শৃঙ্খলার সঙ্গে। এই নিরাপদ ও বীরত্বপূর্ণ প্রস্থানের অগ্রভূমিকা পালন করেন সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস। তার লক্ষ্যভেদী বাণ-বৃষ্টির ফলে কাফিররা দিশেহারা হয়ে ছুটে পালায়। এর ফলে মুসলিমদের পক্ষে এক নিরাপত্তাব্যূহ তৈরি হয়। এই সুযোগে উতবা বিন গাযওয়ান ও আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ মুসলিমদের কাছে পালিয়ে চলে আসেন। ইতঃপূর্বে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই অভিযানেই সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস ইসলামের পক্ষে প্রথম সামরিক সমৃদ্ধির স্বাক্ষর রাখেন।
হামযাহ বিন 'আবদুল মুত্তালিবের বাহিনী:
ইবনু ইসহাক বর্ণনা করেন, রাসূল আবওয়া অভিযান থেকে মাদীনায় ফিরে সঙ্গে সঙ্গেই হামযাহ বিন 'আবদুল মুত্তালিবকে ত্রিশজন মুহাজির আরোহী সৈন্য দিয়ে আইস প্রান্তরের সাইফুল বাহর এলাকার উদ্দেশে পাঠান। উপকূলীয় এলাকায় মাক্কার তিনশো আরোহী সৈন্যসহ আবু জাহল বিন হিশামের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। বিচক্ষণ মাজদি ইবনু আমের আল জুহানি তাদের নিবৃত্ত করে উভয় দলকেই সমঝোতায় নিয়ে আসেন। তারা শান্ত হয়ে বিনা লড়াইয়ে যে যার মতো চলে যায়। [৩০৯]
বুওয়াত অভিযান:
দ্বিতীয় হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল কুরাইশ বণিক কাফেলার গতিরোধ করার উদ্দেশ্যে দুশো সাহাবি নিয়ে বুওয়াত অভিযানে বের হন। এসময় বণিক কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন উমাইয়া বিন খালফ। তার সঙ্গে ছিল একশো সওদাগর ও দুই হাজার পাঁচশ উট। কৌশলগত কারণে রাসূল তাদের মুখোমুখি না হয়ে মাদীনায় ফিরে আসেন। [৩১০]
উশাইরাহ অভিযান:
এ যাত্রায় রাসূল আবু সালামা বিন 'আবদুল আসাদকে মাদীনার প্রতিনিধি নিযুক্ত করে উশাইরাহ অভিযানে বের হন। সেখানে জুমাদাল উলা মাস ও জুমাদাল উখরা মাসের কয়েক রাত অবস্থান করে বনু মুদলিজ ও তার বনু যামরাহ গোত্রীয় মিত্রদের সঙ্গে সন্ধি করেন। কৌশলগত কারণে যুদ্ধে না জড়িয়ে মাদীনায় ফিরে আসেন। কারণ, রসদবোঝাই বণিক কাফেলাটি দিন কয়েক আগেই সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা দিয়ে শামের উদ্দেশে চলে গেছে—পরবর্তী সময়ে কাফেলা ফেরার সময় যখন আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়, তখন কুরাইশরা সংবাদ পাওয়া মাত্র দলবেঁধে ছুটে আসে। রাসূলের সঙ্গে তাদের ভয়াবহ মোকাবিলা হয়—এটাই বদর যুদ্ধ। [৩১১]
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের বাহিনী:
উশাইরাহ যুদ্ধের পর রাসূল সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে আট প্লাটুন মুহাজির সাহাবি পাঠান। তারা হিজাযের খাররা এলাকা পর্যন্ত গিয়ে কৌশলগত কারণে বিনা লড়াইয়ে আবার ফিরে আসেন।
টিকাঃ
৩০৬. জাইশুন নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাহমূদ শীত খাত্তাব, পৃ. ৫৪
৩০৭. তাবাকাত ইবনু সাদ, ২/৭
৩০৮. হাদীসুল কুরআন আন গাযওয়াতির রাসূল, ১/৪০
৩০৯. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৫৯৫
৩১০. তাবাকাত ইবনু সাদ, ২/১০, ১১
৩১১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৬০০