📄 কিছু উপকারী কথা ও শিক্ষা
দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন
কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, সাহাবি তলক বিন 'আলি আল-ইয়ামামি আল-হানাফি মাসজিদে নববির নির্মাণকালে খুব দক্ষতার সাথে মাটির সংমিশ্রণ করতেন। ইবনুল আসীর রচিত জামিউল 'উসূল গ্রন্থে এই ধরনের আরও কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বুখারির সালাতের অধ্যায়ে মাসজিদ নির্মাণে সামাজিক সহযোগিতা পরিচ্ছেদে হাদীসটি সংকলন করেন। বুখারিতে হাদীসটির ক্রমধারা ৪৪৭ এবং বুখারির জিহাদ অধ্যায়ে মাথার ধূলি মোছার পরিচ্ছেদে ২৮১২ ক্রমে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে।
ইবনুল আসীর রাযীনের সূত্রে বলেন, হাদরামাউত এলাকা মাটির খামির তৈরি করতে একজন দক্ষ রাজমিস্ত্রী আসেন। রাসূল ﷺ তাঁর জন্য আল্লাহর দয়া ও রাহমাতের দু'আ করেন। এ কাজে তার ঝোঁক দেখে এই পেশায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেন।
মাদীনায় এই নতুন আগন্তুককে নবি গুরুত্বসহকারে নেন। কারণ, প্রাথমিক যুগে মুসলিমদের সচরাচর এই দক্ষতা ছিল না। ভালোভাবে মাটির খামির তৈরি করতে রাসূল ﷺ তাঁকে কাজে লাগান। এতে মুসলিমদের জন্য অমূল্য শিক্ষা আছে যে, কীভাবে যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হয় এবং তা থেকে উপকৃত হতে হয়। নববি দিক-নির্দেশন মানুষকে ক্রমেই শিক্ষা-সমৃদ্ধ করে। [১৯৩]
টিকাঃ
১৯৩. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, মুনীর আল-গাযবান, ২/২৫২
📄 মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতীক
আন্তর্জাতিকভাবে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের মহান প্রতীক সালাতের আযান- 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার'- অর্থাৎ আল্লাহ সবচেয়ে মহান। তিনি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী।
'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-শাসকত্ব, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব জগতের একমাত্র রব মহান আল্লাহর। বিধান একমাত্র তাঁরই। তাহলে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু'র অর্থ হলো-একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সার্বভৌম শাসক, কোনো আদেশদাতা কিংবা কোনো বিধানদাতা নেই।
'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ'-আল্লাহ মুহাম্মাদ ﷺ-কে নেতৃত্ব দান করেছেন। কারও সাধ্য নেই তাঁর ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার। তাঁর নেতৃত্ব সরাসরি চলবে কুরআন ও সুন্নাহর ওয়াহির দ্বারা পূর্ণ দীন কায়েম হওয়া পর্যন্ত। [১৯৪] মানে, নবিজির রিসালাত, দীন-দুনিয়ায় তাঁর নেতৃত্ব, শ্রবণ ও তাঁর প্রতি আনুগত্য মেনে নিতে হবে। তাঁর ওয়াফাতের পরেও তাঁকে অনুরূপ বিশ্বাস করে যেতে হবে। সব সময়ে তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। [১৯৫]
'হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ'-হে মানুষ, আল্লাহর দাসত্বে গড়া রাষ্ট্রের পতাকাতলে আলোকিত হতে এসো। যে রাষ্ট্রের লক্ষ্য-স্রষ্টা ও মুসলিমদের মাঝে অটুট সম্পর্ক স্থাপন করা।
'কাদ কামাতিস সালাহ'-সকল ইবাদাতের মাঝে নির্বাচিত ইবাদাত সালাত; কারণ, সালাত গোটা দীনের খুঁটি। সালাতের রুকু, সিজদা, কিয়াম ইত্যাদি আল্লাহর সম্মুখে বান্দার বিনয়, আনুগত্য, দাসত্ব ও দীনতা প্রকাশ করে। সালাতের মধ্য দিয়ে দাস আনুগত্য ও দীনতাভরে মনিবের সামনে সমর্পিত বদনে দাঁড়ায়। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা আনুগত্যের স্বরূপ তুলে ধরে বলেন,
বলো, যেহেতু আমার রবের পক্ষ থেকে আমার কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি এসেছে, তাই তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের আহ্বান করো, নিশ্চয় তাদের ইবাদাত করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আর জগৎসমূহের পালনকর্তার নিকট আত্মসমর্পণ করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। (সূরা গাফির, ৪০: ৬৬)
'হাইয়া আলাস সালাহ' ও 'কদ কামাতিস সালাহ'- এই মহান দুই বাক্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতীক, আল্লাহর বিধায়কত্ব, শারী'আতের কর্তৃত্ব, তাগুতি আইনকানুন ও শাসনব্যবস্থা পতনের সম্পর্ক এই ইঙ্গিত করে যে, যথাযথ সালাত সম্পাদন কেবল এমন রাষ্ট্রের ছায়াতেই সম্ভব, যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় সালাতের মাধ্যমে ও সালাতের জন্য।
'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার'-তারপর পূর্বের কথার তাগিদ দেওয়ার জন্য আবার বলা হয়। [১৯৬]
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলিমরা মাক্কার গিরিপথে লুকিয়ে সালাত সম্পাদন করত। পরে আনসারদের তলোয়ারের ছায়ায় মাদীনাতে সালাত প্রতিষ্ঠিত হলে সাহাবিগণ প্রকাশ্যে আযান-ইকামাত দিয়ে মহান রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশে রুকু-সিজদা করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দীনের শত্রুদের থেকে প্রজাদের সুরক্ষা দিতে পারে, এমন শক্তিধর রাষ্ট্রেই আল্লাহর যথাযথ ইবাদাত সম্ভব। কুফরের পতাকা ভূপাতিত করতে, ঈমানের পতাকা তুলে ধরতে এবং শারী'আহ-পরিচালিত তাওহীদি রাষ্ট্র কায়েম করতে আমাদের অন্তর থেকে আযানের মর্মকথা অনুধাবন করতে হবে।
মাসজিদে নববির মর্যাদা
রাসূল ﷺ মাসজিদে নববির মর্যাদা সম্পর্কে সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সাহাবিরা তাদের ভালোবাসায় এই মাসজিদকে এমনভাবে গ্রহণ করেছেন যে মাসজিদে নববি জুড়ে আছে তাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে। এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ বুখারি ও মুসলিমে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। আমরা মাসজিদে নববির ফাযীলাহ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীস উল্লেখ করছি—
আবু হুরায়রা রাসূল ﷺ থেকে শুনে বর্ণনা করেন, যে আমাদের এই মাসজিদে কল্যাণকর কোনো বিষয় শিখতে অথবা শেখাতে আসে, সে আল্লাহর পথের মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করবে। আর যে ভিন্ন উদ্দেশ্যে আসে, সে যেন অন্যের সম্পদে দৃষ্টি দিল।[১৯৭]
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অনুপম ভ্রাতৃত্ব
রাষ্ট্র, জাতি ও প্রশাসনের সংস্কারপ্রকল্পে রাসূলের সর্বপ্রথম কাজ ছিল মানুষকে তাওহীদ ও কুরআনের দাওয়াত দেওয়া, মাসজিদ নির্মাণ করা ও মুহাজির-আনসার ভ্রাতৃত্ব তৈরি করা। সবগুলোই সমান গুরুত্ববহ। ভ্রাতৃত্ব তৈরি মাসজিদ নির্মাণের চেয়ে কোনো ভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, এর মাধ্যমে নতুন জাতিসত্তার অবকাঠামো নির্মাণ ও লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। [১৯৮]
দাওয়াতের সূচনাকাল থেকেই মুসলিমদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব গড়ার কাজ শুরু হয়। হাদীসে আছে—তোমরা পরস্পরে হিংসা-বিদ্বেষ ও ছিদ্রান্বেষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিম যেন তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের অধিক সম্পর্কচ্ছেদ করে না থাকে। [১৯৯]
রাসূল ﷺ বলেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। এক মুসলিম অপর মুসলিমকে জুলুম করবে না এবং একে অপরকে জুলুম থেকে বাঁচাবে। যে মু'মিন ভাইয়ের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে, আল্লাহও তার প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন। যে ব্যক্তি কোনো মু'মিন ভাইয়ের দুঃখ মুছে দেবে, আল্লাহও কিয়ামাতের দিন তার দুঃখ মুছে দেবেন এবং যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহও কিয়ামাতের দিন তার দোষ গোপন করবেন। [২০০]
কুরআনুল কারীমে মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামাতকে স্মরণ করো- যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে; তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন, অনন্তর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেন, যেন তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও। (সূরা আলে- ইমরান, ৩: ১০৩)
তিনি অন্য আয়াতে বলেন—আর তিনি তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করেছেন। যদি তুমি যমিনে যা আছে, তার সম কিছু ব্যয় করতে-তবুও তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। (সূরা আনফাল, ৮:৬৩)
আমাদের এই আলোচনা বিশেষ ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কে। যে ভ্রাতৃত্বে কিছু বিশেষ অধিকার ও কর্তব্য আছে, যা মু'মিনদের সাধারণ মেলবন্ধনে আবশ্যক নয়। [২০১] তবে কোনো কোনো আলিম হিজরাতের আগে মাক্কিজীবনে মুহাজিরদের মাঝে আরেক ভ্রাতৃত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক বালাযুরি মাক্কায় মুসলিমদের মাঝে সত্য ও সহমর্মিতার ওপর রাসূলের ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের ইঙ্গিত দেন। রাসূল ﷺ ভাই ভাই বানিয়ে দেন হামযাহ ও যাইদ বিন হারিসাকে, আবু বাক্র ও 'উমারকে, 'উসমান ইবনু 'আফফান ও 'আবদুর রাহমান ইবনু 'আউফকে, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদকে, উবাইদা ইবনুল জাররাহ ও বিলাল হাবশিকে, মুসআব ইবনু উমাইর ও সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাসকে, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ও হুযাইফার মুক্ত দাস সালিমকে, সায়ীদ বিন যাইদ বিন আমর বিন নুফাইল ও তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহকে এবং রাসূল নিজে ভাইয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন 'আলি বিন আবু তালিবের সঙ্গে। [২০২]
ঐতিহাসিক বালাযুরি (২৭৬ হিজরি) একজন প্রবীণ সারির ইতিহাসবিদ। তিনি ও আরও কয়েকজন ঐতিহাসিক মাক্কিজীবনের ভ্রাতৃত্বের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ব্যাপারে ইবনু 'আবদিল বার (৪৬৩ হিজরি) ও ইবনু সাইয়িদিন নাস তার সঙ্গে একমত। [২০৩]
ইবনু 'উমার থেকে জামি ইবনু উমাইরের সূত্রে হাকিম তার মুসতাদরাকে উল্লেখ করেন, রাসূল ভাইভাই বানিয়ে দেন আবু বাক্র ও 'উমারকে, তালহা ও যুবাইরকে এবং 'আবদুর রহমান ইবনু 'আউফ ও 'উসমানকে। [২০৪] 'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন, রাসূল যুবাইর ও ইবনু মাসঊদকে ভাই ভাই বানিয়ে দেন।[২০৫]
ইবনুল কাইয়িম, ইবনু কাসীর প্রমুখ ইতিহাসবিদের মতে মাক্কায় কোনো ভ্রাতৃত্ব স্থাপন হয়নি। তবে ইবনুল কাইয়িম বলেন, জানা যায়, রাসূল দ্বিতীয়বার মুহাজিরদের মধ্যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। সেবার তিনি 'আলিকে নিজের ভাই বানান; তবে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন মাদীনাতেই হয়েছিল। [২০৬] ইবনু কাসীর বলেন, কতিপয় আলিম মাক্কার এই ভ্রাতৃত্বসংক্রান্ত বক্তব্যটি নাকচ করে দিয়েছেন-কারণ, ইবনুল কাইয়িম নাকচ করেছেন। [২০৭]
সীরাতের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে মাক্কায় ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত মেলে না। সে মতে বালাযুরির বর্ণনার সনদ না থাকায় তা গ্রহণযোগ্য নয়; এমনকি বালাযুরি নিজেও হাদীস পর্যালোচকদের নিকট দুর্বল বর্ণনাকারী হিসেবে বিবেচিত। তবে মাক্কায় এই ভ্রাতৃত্বের কথা মেনে নিলেও তা ছিল শুধু পারস্পরিক সহযোগিতা ও সদুপদেশের জন্য, উত্তরাধিকারের হক সাব্যস্ত হওয়ার জন্য নয়।[২০৮]
মাদীনায় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রাসূল মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যকে এক সুতোয় বাঁধার লক্ষ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করেন। এক অন্যরকম পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাঙ্গীণ ভ্রাতৃত্ব, যার সামনে জাহিলি স্বজনপ্রীতি একেবারে বিলীন; বংশ, বর্ণ ও রাষ্ট্রের শ্রেণিভেদ হয়ে যায় অস্তিত্বহীন; ফলে কেউ অগ্রসর কিংবা পশ্চাৎপদ নয়। একমাত্র ইসলামের জন্যই তারা নিজেদের জানমাল সর্বস্ব উৎসর্গ করে। তাদের কাছে সম্মানের মাপকাঠি তাকওয়া ও মানবতা। রাসূলের গড়া এ ভ্রাতৃত্ব শুধু মৌখিক স্বীকারোক্তির কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং তা ছিল আত্মার অটুট বন্ধনের উপমাবাহী বিস্ময়কর ঘটনা-যা ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। নতুন সমাজ বিনির্মাণে এই অনন্য ভ্রাতৃত্বের প্রভাব ছিল অপরিসীম।[২০৯] আল্লাহর ভালোবাসার ভিত্তিতে গড়া এই সমাজের প্রত্যেক সদস্য একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহর দীন তাদের শেখায় ঈমান, আমাল, কথা, কাজ ইত্যাদি। ফলে তারা হয়েছেন অনন্য মানুষ। কুরআনের ভাষায় তারা ছিলেন এমন—
মু'মিনদের যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে এই মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে, তখন তারা বলে, 'আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম।' আর তারাই সফলকাম। [সূরা নূর, ২৪: ৫১]
এই অনন্য ভ্রাতৃত্বের কল্যাণেই আজও মুসলিম উম্মাহর সমৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এরই মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর দীন ও রাসূলকে সুদৃঢ় করেছিলেন। রাসূল আজীবন তাঁর দাওয়াতি কাজে এর সুফল পেয়েছেন; এমনকি আবু বাক্র সিদ্দীকের বাই'আতকালেও মুসলিম উম্মাহ এই ভ্রাতৃত্বের সুফল পায়। আনসার সাহাবিগণ ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে উম্মাহর ঐক্যে চিড় ধরাননি। মোটকথা, রাজনৈতিক অঙ্গনে ভ্রাতৃত্বের অভূতপূর্ব এই শিক্ষার মাধ্যমে রাসূল আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করেন এবং তাদের মনে ভ্রাতৃত্বের শিকড় গেঁথে দেন। ফলে আন্তরিকভাবে তারা এর যত্ন নেন; এমনকি এই ভ্রাতৃত্বের ধারা বাস্তবায়নে রীতিমতো তারা প্রতিযোগিতা করতেন। [২১০] বিশেষত, আনসার সাহাবিদের বদান্যতা ও উদারতার যথাযথ বিবরণ দেওয়া কোনো লেখক-গবেষকের পক্ষে সম্ভব নয়। একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই পারেন এর যথার্থ বিবরণ দিতে। [২১১] তিনি বলেন— আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মাদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এই সম্পদে অংশ রয়েছে); আর যারা তাদের কাছে হিজরাত করে এসেছে, তাদের ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে, তার জন্য তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও তাদের অগ্রাধিকার দেয়। মনের কার্পণ্য থেকে যাদের রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম। (সূরা হাশর, ৫৯: ৯)
আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ কতিপয় আনসার-মুহাজির
আবু বাক্র সিদ্দীক ও খারিজা ইবনু যুহাইর, 'উমার ইবনুল খাত্তাব ও ইতবান ইবনু মালিক, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ও সা'দ ইবনু মু'আয, 'আবদুর রহমান ইবনু 'আউফ ও সা'দ ইবনুর রাবি, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সালামাতু ইবনু সালামাতু ইবনু ওয়াকশ, তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ ও কা'ব বিন মালিক, সায়ীদ ইবনু যাইদ ও উবাই ইবনু কা'ব, মুসআব ইবনু উমাইর ও আবু আইয়ূব খালিদ বিন যাইদ, আবু হুযাইফা ইবনু উতবা ইবনু রাবী'আ ও আববাদ ইবনু বিশর ইবনু ওয়াকশ, আম্মার ইবনু ইয়াসীর ও হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান, আবু যার গিফারি ও মুনযির ইবনু আমর, হাতিব ইবনু আবু বালতা ও উয়াইম ইবনু সাইয়িদা, সালমান আল ফারসি ও আবু দারদা, রাসূলের মুয়াজ্জিন বিলাল ও আবু রুওয়াইহা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আবদুর রাহমান আল খাস'আমি পরস্পর আনসার-মুহাজির কেবল আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। [২১২]
টিকাঃ
১৯৪. কিরাআতু সিয়াসিয়্যাহ, লিস-সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ কিলআজি, পৃ. ১১৪
১৯৫. দাউলাতুর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনাত-তাকউইনি ইলা-তামকীন, ড. কামিল সামাহ আদ-দাকস, পৃ. ৪৩৮
১৯৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩৯
১৯৭. মুসান্নাফ লি ইবনি আবি শাইবাহ, ২/৩৭১, ১২/২০৯-হাদীস নং ১২৫৬৭;
১৯৮. আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাতু ফি আসরি উমার বিন আল-খাত্তাব, ড. মুজদালাউই, পৃ. ৫২, ৫৩
১৯৯. বুখারি, হাদীস নং ৬০৬৫; মুসলিম, হাদীস নং ২৫৫৯
২০০. বুখারি, হাদীস নং ২৪৪২; আল-মুসনাদ, ২/৯১ হাদীস নং ৫৬৪৬
২০১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, উমারি, ১/২৪০
২০২. আনসাবুল আশরাফ, বালাযুরি, ১/২৭০
২০৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২৪০
২০৪. প্রাগুক্ত
২০৫. ফাতহুল বারি, ৭/৩০৪
২০৬. যাদুল মাআদ, ২/৭৯
২০৭. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু কাসীর
২০৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২৪১
২০৯. ফিকহুস সীরাহ, আল-গাযালি, পৃ. ১৯৩, ১৯৪
২১০. ফুসুলু ফিস-সীরাতিন নাবাউয়্যাহ, ড. আবদুল মুনঈম সাঈদ, পৃ. ২০০
২১১. হিজরাতুর রাসূল ওয়া সাহাবাতিহি ফিল-কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ, জামাল, পৃ. ২৪৫
২১২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ১/৫০৫, ৫০৬; আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু কাসীর, ২/৩২৪
📄 কিছু শিক্ষা ও কিছু উপকারিতা
আকীদা-বিশ্বাসের বন্ধনই প্রকৃত বন্ধন:
ইসলামি সমাজের মূল ভিত্তি আকীদা-বিশ্বাস, যা সরাসরি ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই ইসলামি সমাজে বন্ধুত্ব কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনদের সঙ্গেই হতে পারে। এটিই গভীর আন্তরিক সম্পর্ক। কারণ, এখানে বিশ্বাস, চিন্তা ও প্রেরণার ঐকতান ঘটে।[২১৩] হিজরাতের অন্যতম প্রেরণা ছিল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনদের প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব। এই মহান আদর্শের আলোকেই কুরআনুল কারীম মুসলিমদের পরিচালিত করে। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা নূহ নবির সন্তানকে তার ঔরসজাত হওয়া সত্ত্বেও শুধু আকীদার ভিন্নতার কারণে নবির পরিবারভুক্ত বলে গণ্য করেননি। আল্লাহ তা'আলা নবি নূহ ও তার পুত্র সম্পর্কে বলেন—
আর নূহ তার রবকে ডাকল এবং বলল, হে আমার রব, নিশ্চয় আমার সন্তান আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার ওয়াদা সত্য। আর আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। তিনি বললেন, হে নূহ, নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, আমার কাছে তা চেয়ো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও। [সূরা হূদ, ১১: ৪৫, ৪৬]
ইসলামে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব একমাত্র মু'মিনদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
নিশ্চয় মু'মিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, হয়তো তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। [সূরা হুজরাত, ৪৯: ১০]
ইসলামি আদর্শে কাফের, মুশরিক, ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান অর্থাৎ গায়রুল্লার পূজারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে মুসলিমদের কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে-এমনকি তারা পিতা, ভাই কিংবা সন্তান হলেও। যে মুসলিম এই কাজ করল, সে অন্যায়ে লিপ্ত হলো। সুতরাং মুসলিম-অমুসলিম বন্ধুত্ব মহাপাপ। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন— হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের পিতা ও ভাইদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফুরিকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই জালিম। [সূরা তাওবা, ৯: ২৩]
আল্লাহ তা'আলা সাধারণভাবে কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে বারণ করেছেন; আরও নিষেধ করেছেন তাদের প্রতি ভরসা রাখতে এবং আনুগত্য করতে। এই প্রসঙ্গে কুরআন কারীমের অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে। [২১৪] আল্লাহ তা'আলা বলেন— হে মু'মিনগণ, যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে, তোমরা যদি তাদের একটি দলের আনুগত্য করো, তারা তোমাদের ঈমানের পর তোমাদের কাফির অবস্থায় ফিরিয়ে নেবে। [সূরা আলে ইমরান, ৩:১০০]
তিনি আরও বলেন— হে মু'মিনগণ, ইয়াহুদি ও নাসারাদের তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ জালিম কওমকে হিদায়াত করেন না। [সূরা মায়িদা, ৫: ৫১]
আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের জন্য বন্ধুত্বের একক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেন তাদের ঈমানের কোনো ক্ষতি না হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন— তোমাদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনগণ-যারা সালাত কায়েম করে এবং বিনীত হয়ে যাকাত দেয়। আর যে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহর দলই বিজয়ী। [সূরা মায়িদা, ৫: ৫৫, ৫৬]
সাহাবিগণ এটি খুব ভালো করে বুঝে নিয়েছিলেন যে, তাদের বন্ধুত্ব হবে একমাত্র নেতৃত্বের জন্য, একনিষ্ঠতা হবে শুধু আকীদার জন্য আর তারা জিহাদ করবেন আল্লাহর কালেমা সমুন্নত রাখার জন্য। তাই তারা ব্যক্তিজীবনে এর বাস্তবায়ন ও সামাজিক জীবনে সঠিক প্রয়োগ করেন। ফলে তাদের বন্ধুত্ব হয় শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনদের সঙ্গে। তাদের জীবনেতিহাসে বন্ধুত্বের গভীর মর্মানুধাবনের অসংখ্য উদাহরণ মেলে। স্রষ্টা, দীন, আকীদা ও মু'মিনদের প্রতি তারা ছিলেন আন্তরিক ও উদার।
আনসার ও মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্ব হয় এমন এক আকীদার ভিত্তিতে, যে ব্যাপারে আগে থেকেই তারা জনতেন ও বিশ্বাস করতেন। কারণ, পরস্পরবিরোধী আকীদা পোষণকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়া খুবই কঠিন; বিশেষত রক্ষণশীল ধার্মিক লোকজনের পক্ষে এটা অসম্ভব। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা ভ্রাতৃত্বকে মুহাম্মাদ-এর দীন ইসলামের আকীদার মূল উপাদান বানিয়েছেন। এই আকীদাই মানুষকে সকল শ্রেণিভেদ ভুলে একমাত্র তাকওয়া ও নেক আমলের ভিত্তিতে এক আল্লাহর দাসত্বের সারিতে বসায়। [২১৫]
আল্লাহকেন্দ্রিক ভালোবাসা সভ্য সমাজ বিনির্মাণের ভিত্তি:
আল্লাহকেন্দ্রিক ভালোবাসা- ভিত্তিক ভ্রাতৃত্ব মুসলিম জাতি গঠনের এক শক্তিশালী স্তম্ভ। এই স্তম্ভ দুর্বল হলে পুরো জাতিই দুর্বল হয়ে পড়ে। [২১৬] তাই রাসূল নতুন মুসলিম সমাজে আল্লাহকেন্দ্রিক গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। এই প্রসঙ্গে রাসূল বলেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, যারা একমাত্র আমার উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালো-বেসেছে, তারা আজ কোথায়? আমি তাদের আমার আরশের ছায়ায় স্থান দেব। আজ কোনো ছায়া নেই আমার আরশের ছায়া ছাড়া। [২১৭]
নতুন সভ্য সমাজে ছিল আল্লাহকেন্দ্রিক ভালোবাসার গভীর প্রভাব। এই প্রসঙ্গে আনাস বিন মালিক বলেন, মাদীনায় সবচেয়ে বেশি খেজুরগাছ ছিল আবু তালহার। বাইরুহা নামক বাগান তার সবচেয়ে পছন্দের ছিল। মাসজিদে নববির দিকে মুখ ছিল বাগানটির। মাঝে মাঝে রাসূল এখানে এসে ঝরনা থেকে সুপেয় পানি পান করতেন। একসময় নাযিল হয়—
তোমরা কখনো সাওয়াব অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না ভালোবাসার জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ৯২]
এই আয়াত শুনে আবু তালহা রাসূলের নিকট ছুটে যান। বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ বলেছেন, তোমরা কখনো সাওয়াব অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না ব্যয় করবে তা থেকে, যা তোমরা ভালোবাসো; আর আমার প্রিয় সম্পদ ‘বাইরুহা’ বাগান। এটা আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করে দিলাম। এটা থেকে আমি আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও পুণ্য কামনা করি। আপনি যেখানে ভালো মনে করেন, সেখানে এটি ব্যয় করুন। রাসূল বলেন, ওটা তো লাভজনক সম্পদ, ওটা তো লাভজনক সম্পদ। তুমি যা বলেছ, তা আমি শুনেছি। তবে আমার মত হলো, তুমি ওটা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভাগ করে দাও। আবু তালহা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি তা-ই করব। তারপর আবু তালহা বাগানটি তার নিকটাত্মীয় ও চাচাতো ভাইদের মাঝে ভাগ করে দেন। [২১৮]
আল্লাহকেন্দ্রিক গভীর ভালোবাসার একটি ঘটনা। ‘আবদুর রাহমান ইবনু ‘আউফ বলেন, আমরা যখন মাদীনায় উদ্বাস্তু হয়ে আসি, রাসূল আমাকে সা’দ ইবনু রাবির ভাই বানিয়ে দেন। সা’দ ইবনু রাবি বলেন, মাদীনার আনসারদের মধ্যে আমার সম্পদ অনেক বেশি; আমার ইচ্ছে, আমার সম্পদের অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দেবো। আমার দুই স্ত্রীর যাকে তোমার ভালো মনে হয়, তাকেই তোমার জন্য ছেড়ে দেবো—আর ইদ্দত শেষে তুমি তাকে বিয়ে করে নেবে। ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আউফ বলেন, আমার এত কিছুর প্রয়োজন নেই; তুমি বরং আমাকে একটা ব্যস্ত বাজার দেখিয়ে দাও। তিনি আমাকে কাইনুকার বাজারের কথা বললেন। তার কথামতো আমি কাইনুকা বাজারে চলে যাই। [২১৯]
আল্লাহকেন্দ্রিক ভ্রাতৃত্বে পারস্পরিক শুভ কামনা
মুসলিম সমাজে একে অপরের কল্যাণ কামনায় ভ্রাতৃত্বের গভীর প্রভাব ছিল। রাসূল সালমান ও আবু দারদাকে একে অপরের ভাই বানিয়ে দেন। একদিন সালমান আবু দারদার বাড়িতে বেড়াতে যান। তিনি আবু দারদার স্ত্রীকে অপরিপাটি দেখে জিজ্ঞেস করেন, কী ব্যাপার, আপনার এই অবস্থা কেন? তিনি উত্তর দেন, আপনার ভাই আবু দারদার দুনিয়ার কোনো চাহিদাই নেই। তাই সাজুগুজুর দরকার হয় না। আবু দারদা বাড়ি ফিরে তার জন্য খাবার প্রস্তুত করে তাকে বলেন, খেয়ে নাও, আমি আজ সাওম করছি। সালমান বলেন, তুমি না খেলে তো আমি খাব না। তার কথা শুনে আবু দারদা খেতে বসেন।
রাত গড়িয়ে এলে আবু দারদা সালাতে দাঁড়াতে যান। তার অবস্থা দেখে সালমান বলেন, ঘুমোতে এসো। তিনি তার সঙ্গে ঘুমান। কিছুক্ষণ পর তিনি আবার সালাতে দাঁড়ানোর ইচ্ছে করেন। সালমান তাকে শুইয়ে দেন। অবশেষে রাতের শেষাংশে সালমান তাকে জাগিয়ে দেন। সালমান তাকে বলেন, এখন ওঠো। তারা একসঙ্গে সালাত আদায় করে আলাপ করতে বসেন। সালমান তাকে বলেন, তোমার প্রতি তোমার রবের অধিকার আছে, তোমার প্রতি তোমার নিজের অধিকার আছে, তোমার প্রতি তোমার পরিবারের অধিকার আছে। সুতরাং প্রত্যেক প্রাপককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দাও। তারপর আবু দারদা নবিজির নিকট এসে এই বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চান। নবিজি বলেন, সালমান সত্য বলেছে। [২২০]
আনসারদের অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব ও নজিরবিহীন সহমর্মিতা
আনসারগণ মুহাজির ভাইদের প্রতি খুব আন্তরিক ও সহমর্মী ছিলেন। এমনকি দুনিয়ার সম্পদের ব্যাপারেও আনসারগণ তাদের খুব প্রাধান্য দিতেন। এই প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা বলেন, আনসারগণ নবিজির নিকট এসে আবেদন করেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের ভাই ও আমাদের মাঝে খেজুরগাছগুলো ভাগ করে দিন। তিনি অসম্মতি জানান। তারপর তারা বলেন, আমরা শ্রম দেবো, তবে ফসলে আপনাদের ভাগ দেবো। তারা বলেন, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। [২২১]
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, আনসারগণ রাসূলের নিকট এই আবেদন করেন, তিনি যেন দায়িত্ব নিয়ে তাদের একমাত্র সম্পদ খেজুরগাছ মুহাজির ও আনসারদের মাঝে বণ্টন করে দেন। এই ব্যাপারে রাসূল অসম্মতি জানান। তবে তাঁর মাথায় আরেকটি চিন্তা আসে; তিনি ভাবেন, যেন সহমর্মিতাও হয়, আবার সম্পদ হারিয়ে আনসারগণ ক্ষতিগ্রস্থও না হন; তাই আনসারগণ মুহাজিরদের বলেন, আমরাই খেজুর বাগানে পানি সেচ ও পরিচর্যা করব এবং আপনাদের ফসলে ভাগ দেবো। রাসূল দেখলেন, তাদের এই চিন্তায় মুহাজিরদের অভাবও মোচন হয়, আবার আনসারদের প্রতি ইনসাফও হয়। তাই তিনি এই অভিমতে সম্মতি দেন। তাঁর সম্মতি শুনে সাহাবিরা বলেন, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। [২২২]
আনসারদের কাজকর্ম, উদারতা, মহানুভবতা ও কোমলতায় মুহাজিরগণ যারপরনাই কৃতজ্ঞ হয়ে রাসূল-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের স্বাগতিকরা দুঃসময়ের মহান সহমর্মী আর সচ্ছল সময়ের উদারমনা জাতি। সত্যিই এরা বেনজির-তুলনাহীন। কী দয়ার্দ্রতা-তারা একাই পরিশ্রম করবে আর ফসলের ভাগ দেবে আমাদের! এরা তো মনে হয় একাই সব সাওয়াব নিয়ে যাবে। রাসূল মুহাজিরদের কথা শুনে বলেন, না, আল্লাহর দয়া অসীম। তোমরা বরং তাদের জন্য দু'আ করার সাওয়াব পাবে আর তারা তোমাদের সহযোগিতা করার সাওয়াব পাবে। [২২৩]
এতেই বোঝা যায়, মুহাজিরগণ পারলৌকিক প্রতিদান কত গভীরভাবে অনুভব করতেন! এই অনুভব কত প্রভাবশালী ছিল তাদের চিন্তার জগতে! তারা ইহকালের চেয়ে পরকালকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। কারণ, পরকালই তো উত্তম ও চিরস্থায়ী। [২২৪]
একবার রাসূল মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের পরম মহানুভবতার প্রতিদান পেশ করতে চান। এই প্রসঙ্গে আনাস বিন মালিক বলেন, রাসূল আনসারদের বাহরাইনের গানীমাত দেওয়ার জন্য ডাকেন; কিন্তু তারা বলেন, আপনি আমাদের মুহাজির ভাইদেরও সমপরিমাণ দিলে আমরা গ্রহণ করব। তাদের কথা শুনে রাসূল বলেন, যদি তোমরা গ্রহণ না করো, তাহলে আমার পরবর্তী সাক্ষাতের অপেক্ষায় থেকো। সাবধান—জেনে রাখো, আমার পরে নিশ্চয় তোমরা স্বার্থপরতার শিকার হবে। [২২৫]
রাসূল আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে গভীর ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করেন। এই ভ্রাতৃত্বের কল্যাণে অনেক লক্ষ্য অর্জন খুব সহজ হয়ে যায় এবং উদ্বাস্তু মুহাজির সাহাবিদের প্রবাস-আতঙ্ক কেটে যায়; কেটে যায় পরিবার ও প্রিয় মানুষদের শূন্যতা। আনসার ও মুহাজির-একে অপরের সম্পর্ক দৃঢ় হয়; এ থেকেই উত্থান হয় নতুন রাষ্ট্রের। কারণ, জাতীয় ঐক্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের উত্থান সম্ভব নয়; পারস্পরিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা ছাড়া একটি অভূত জাগরণ দুরূহই বটে। জাতীয় ঐক্য ও সুষ্ঠু ভ্রাতৃত্ব স্থাপন ব্যতিরেকে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে জড়ো করে টেকসই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিছুতেই সম্ভব নয়। [২২৬]
ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা
গোটা মানব ইতিহাসে আনসারদের ভালোবাসা, উদারতা, বদান্যতা ও মহানুভবতার উপমা মেলা ভার। তারা যে ব্যাকুলতা, ভালোবাসা ও সহৃদয়ে উদ্বাস্তু মুহাজিরদের বরণ করে নেন, সত্যিই তা বিরল ও অভূতপূর্ব। এই ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে রাসূল সকল ভাইদের কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেন। আল্লাহ তা'আলা রক্ত-সম্পর্কীয়ের মতো এই ভ্রাতৃত্ব-সম্পর্কের ওপর ধার্য করেন আত্মীয়তা ও উত্তরাধিকার। এই ধার্যকরণের পেছনে অন্যতম প্রজ্ঞা হলো—এই ভ্রাতৃত্ব শুধু মুখের রটনা হবে না; বরং এটি হবে প্রকৃত মহান ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন ও উদাহরণ। [২২৭]
হিজরাতের প্রথম ধাপে আনসার ও মুহাজিরগণ সহযোগিতা, সহায়তাদান ও আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের সম্মুখীন হন। কারণ, মুহাজিরগণ মাক্কায় তাদের পরিবার-পরিজন, ধনসম্পদ ও ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেন মাদীনার আনসার ভাইদের কাছে। তাই রাসূল ﷺ মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি মনে করেন। কেননা, রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর ও মজবুত একটি সম্পর্কের দায়বদ্ধতা তৈরি না হলে এ অভূতপূর্ব ঐক্যের স্থায়িত্ব ঠুনকো ও সাময়িক হয়ে পড়বে। রাসূলের তৈরি যুগান্তকারী এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক একসময় মাদীনার সবচেয়ে শক্তিধর সম্পর্কে রূপ নেয়। এই সম্পর্কের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে মাদীনার নতুন সামাজিক বন্ধন।
মুহাজিরগণ ধীরে ধীরে মাদীনার পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেন। জীবিকা উপার্জনের নানা কায়দাকানুন আয়ত্ত্ব করেন। এদিকে আবার বদরযুদ্ধ থেকে লাভ করেন বিপুল পরিমাণ গানীমাত। যার মধ্য দিয়ে মুহাজিরদের অধিকারেও পর্যাপ্ত সম্পদ অর্জিত ও সঞ্চিত হয়। তারা ব্যক্তিগতভাবে সাবলম্বী হয়ে ওঠেন। ফলে নিরেট দীনের জন্য গড়ে ওঠা ভাতৃত্বের বিনিময়ে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের প্রয়োজন থাকে না; বরং তারচেয়েও গুরুতর গুরুত্ব রাখে রক্ত-সম্পকীয় প্রিয়জনদের জন্য। ফলে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া পূর্বেকার রক্ত-সম্পর্কের নীতিতে ফিরে যায়। বাতিল হয়ে যায় আনসার-মুহাজির দুই ভাইয়ের উত্তরাধিকার নীতি। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
আর যারা পরে ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং তোমাদের সঙ্গে জিহাদ করেছে, তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত; আর আত্মীয়স্বজনরা একে অপরের তুলনায় অগ্রগণ্য—আল্লাহর কিতাবে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে মহাজ্ঞানী। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৫]
এই আয়াতে রক্ত-সম্পর্কের বাইরে ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে উত্তরাধিকারনীতি রহিত করা হয়।[২২৮] তবে একে অপরের মাঝে আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও শুভকামনা আজীবন বজায় ও সতেজ রাখার শিক্ষা বহাল রাখা হয়।[২২৯] এই প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস কুরআনুল কারীমের—
আর আমি প্রত্যেকের জন্য নির্ধারণ করেছি উত্তরাধিকারী, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়স্বজন যা রেখে যায় এবং যাদের সঙ্গে তোমরা চুক্তি করেছ, তা থেকে। সুতরাং তোমরা তাদের অংশ তাদের দিয়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপর সাক্ষী। (সূরা নিসা, ৪: ৩৩)
এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, মুহাজিরদের মাদীনা আগমনের পর প্রথমদিকে তারা রক্ত-সম্পর্ক ছাড়াই রাসূলের গড়ে দেওয়া ভ্রাতৃত্বের সূত্রে আনসারদের সম্পদে উত্তরাধিকার লাভ করতেন। পরে এই আয়াত— আর আমি প্রত্যেকের জন্য নির্ধারণ করেছি উত্তরাধিকারী—নাযিল হলে আনসার-মুহাজির ভ্রাতৃত্ব-সূত্রে আরোপিত উত্তরাধিকারনীতি রহিত হয়ে যায়; তবে সহযোগিতা ও শুভকামনার বিষয়টি স্থায়ী থাকে। [২৩০]
মানবীয় মূল্যবোধ ও মহান আদর্শ
আনসার-মুহাজিরদের মাঝে রাসূলের গড়া ভ্রাতৃত্বের কল্যাণে সামাজিক মানবীয় মূল্যবোধ ও মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যা পূর্বেকার গোত্রীয় সমাজের মানুষ জানতই না—এটি রাসূলের মহান সমাজনীতির অবদান।
আঞ্চলিক ও গোত্রীয় বিভেদ নিরসন
জাহিলি সমাজে আঞ্চলিক ও গোত্রীয় বিভেদ নিরসন করা খুব সহজ ছিল না। সাম্প্রদায়িক বিভেদই তাদের ধর্মের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। আর নববি ভ্রাতৃত্বের মূল লক্ষ্যই ছিল জাহিলি পরিবেশের কেন্দ্র থেকে পুরো সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব মুছে ফেলা। বর্তমানে বিভিন্ন ইসলামি দলের অন্যতম সমস্যা হলো, আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক দূষিত চেতনার কুপ্রভাব। এ সকল দূষিত চেতনা মুসলিম উম্মাহ ও এর সম্ভাবনার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, উম্মাহকে দুর্বল ও শতধা বিভক্ত করে রাখে, উম্মাহ মহান লক্ষ্য ছেড়ে অস্তিত্ব রক্ষায় হিমশিম খায়। মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ হলো, কতিপয় মনীষীর কুরআন-সুন্নাহর বিকল্প খোঁজা, মুহাম্মাদে আরাবির আদর্শ ছেড়ে অন্য কোথাও সমাধান খোঁজা। ফলে উম্মাহর মাঝে পরস্পর রক্তপাত ও সহিংসতা বেড়ে যায়। বর্তমান যুগের মুসলিম উম্মাহর উচিত তৎকালীন মুহাজির-আনসারদের মতো গভীর ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা। ব্যক্তিজীবনে সাহাবিগণের মহান আদর্শ ধারণ করা ছাড়া ইসলামসমৃদ্ধ জীবন গড়া, মহান ত্যাগ ও ঈমানের উচ্চস্তরে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
উম্মাহর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ফলাফল অভ্যন্তরীণ সুসংহতি
উম্মাহর অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষার জন্য কিছু কাজ করা জরুরি। প্রত্যেক মুসলিমকে ইসলামি আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। সমাজে ইসলামি নেতৃত্বদানে যোগ্য লোকবল তৈরি করতে হবে। বিভেদের কারণসমূহ প্রতিহত করতে হবে। ঐক্য ও একতার মূলনীতি মেনে চলতে হবে। [২৩১] উম্মাহর ঐক্যের মূলনীতি হলো বিশ্বাসে একতা স্থাপন করা। আন্তরিকভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। হকের সন্ধানে মনোনিবেশ করা। সাধারণ মুসলিমদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব তৈরি করা। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
আর যদি তারা তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে তাঁর সাহায্য ও মু'মিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। আর তিনি তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করেছেন। যদি তুমি যমিনে যা কিছু আছে, তার সবকিছু ব্যয় করতে, তবুও তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন, নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান। [সূরা আনফাল, ৮: ৬২-৬৩]
আল্লাহ তা'আলা অন্য এক আয়াতে বলেন, নিশ্চয় মু'মিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; আশা করা যায়, তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। [সূরা হুজরাত, ৪৯: ১০]
এই অনুপম ভ্রাতৃত্ব বরণ করা ছাড়া ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করা সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে রাসূল ﷺ বলেন, যে তিনটি গুণ ধারণ করবে, সে ঈমানের স্বাদ লাভ করবে:
১. অন্য সকলের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বেশি ভালোবাসা।
২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ভালোবাসা।
৩. কুফুরিতে ফিরে যেতে ঘৃণা করা— যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে লোকে ঘৃণা করে। [২৩২]
আল্লাহকেন্দ্রিক ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকলে মুসলিম উম্মাহ যেকোনো বিপর্যয়ে অটল থাকতে পারে। এই আন্তরিক ভ্রাতৃত্বই মুসলিম উম্মাহর একতা, শক্তি, উন্নতি ও গর্বের আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামক। [২৩৩]
আনসার সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য
ক—আল্লাহর পক্ষ থেকে আনসার নামকরণ: মাদীনাবাসী মু'মিনদের আনসার খেতাবটি তাদের ইসলামপূর্ব কোনো খেতাব নয়; বরং ইসলামের শপথ গ্রহণকালে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের আনসার খেতাব প্রদান করেন। কারণ, তারা বাস্তুচ্যুত মুহাজিরদের আশ্রয় দান করেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দীনের আন্তরিক সহায়তা করেন। [২৩৪] এই প্রসঙ্গে গাইলান বিন জারীর রাহি. বলেন, একবার আমি আনাস-কে আনসার খেতাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি, এই খেতাব সম্পর্কে আপনার মতামত কী? এটা কি আপনাদের নিজেদের দেওয়া নাম, নাকি আল্লাহপ্রদত্ত? তিনি বলেন, এটা আল্লাহপ্রদত্ত। [২৩৫]
আনসারদের অবদান ও বৈশিষ্ট্য অসংখ্য ও অগুনতি। তাদের সম্বন্ধে বিবরণসংবলিত কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করা হলো—
আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মু'মিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৪]
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে—এটিই মহাসাফ্যল্য। [সূরা তাওবা, ৯: ১০০]
আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মাদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে); আর যারা তাদের কাছে হিজরাত করে এসেছে, তাদের ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে, তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। মনের কার্পণ্য থেকে যাদের রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম। [সূরা হাশর, ৫৯: ৯]
খ—রাসূলের কাছে আনসারগণ: আনসারদের সম্বন্ধে বিবরণসংবলিত কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত হলো—
আয়িশা বলেন, রাসূল বলেছেন, আনসারদের দুই গৃহ অথবা দুই দরজার মধ্যে যাত্রাবিরতি করে, এমন নারী ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।
আনাস বলেন, একবার নবি একদল নারী ও শিশুকে আসতে দেখে সোজা দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, (বর্ণনাকারী বলেন, মনে হয় আনাস বিয়ে ভোজের কথা বলেছিলেন। আল্লাহর শপথ, তোমরা আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ-এভাবে তিনবার বলেন। [২৩৬]
বারা বিন আযিব বলেন, আমি রাসূলকে বলতে শুনেছি, মু'মিন মাত্রই আনসারকে ভালোবাসে আর মুনাফিক মাত্রই তাদের ঘৃণা করে। সুতরাং যে তাদের ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর যে তাদের ঘৃণা করে, আল্লাহও তাকে ঘৃণাকরেন। [২৩৭]
রাসূল বলেন, যদি আনসাররা কোনো উপত্যকা কিংবা গিরিপথ ধরে চলত, তাহলে আমিও তাদের পথে চলতাম। যদি হিজরাতপর্ব না থাকত, তবে তো আমি একজন আনসারিই হয়ে যেতাম। [২৩৮]
বুখারি বর্ণনা করেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু ফযল আনাস বিন মালিককে বলতে শুনেছেন, আমি মাদীনার হতাহতদের জন্য ভীষণ মর্মাহত। আমার তীব্র দুঃখের কথা শুনে যাইদ বিন আরকাম আমাকে এই মর্মে চিঠি লেখেন, তিনি রাসূল-কে বলতে শুনেছেন, হে আল্লাহ, আনসার ও তাদের সন্তানদের ক্ষমা করে দিন। [২৩৯]
আনাস বলেন, রাসূল বলেছেন, আনসারগণ আমার দল, আমার সঙ্গী। আর সাধারণ লোকের সংখ্যা বাড়তে-কমতে পারে। তোমরা আনসারদের সৎকর্মশীলকে গ্রহণ করো আর মন্দ কাজের লোককে ক্ষমা করো। [২৪০]
আবু কাতাদা বলেন, আমি রাসূলকে মিম্বারে দাঁড়িয়ে আনসারদের উদ্দেশ্যে বলতে শুনেছি-যে আনসারদের নেতৃত্ব দেবে, সে যেন তাদের সৎকর্মশীলকে দয়া করে আর মন্দ কাজের লোককে ক্ষমা করে। আর যে তাদের আতঙ্কে রাখে, সে যেন এই (নিজের দিকে ইশারা করে বলেন) ব্যক্তিকেই আতঙ্কে রাখে। [২৪১]
টিকাঃ
২১৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২৫২
২১৪. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, আহযামি জাযওয়ালি, পৃ. ৪১৭
২১৫. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ১৪৮। প্রকাশক: দারুস সালাম
২১৬. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, উরজুন, ৩/১২৯
২১৭. মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৬
২১৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, উমারি, ১/২০৪; বুখারি, হাদীস নং ৪৫৫৪, ১৪৬১, ৫৬১১ এবং আরও কিছু স্থানে।
২১৯. বুখারি, বেচাকেনা অধ্যায়, হাদীস নং ২০৪৮
২২০. বুখারি, রোযা অধ্যায়, হাদীস নং ১৯৬৮
২২১. বুখারি, হাদীস নং ২৩২৫
২২২. আত-তারীখুল ইসলামি, ৪/২৯
২২৩. মুসনাদু আহমাদ, ৩/২০১, হাদীস নং ১৩০৭৫; ইবনু আবি শাইবাহ, ৯/৬৮, হাদীস নং ৬৫৬১
২২৪. আত-তারীখুল ইসলামি, হামীদি, ৪/২৯
২২৫. বুখারি, সাহাবিদের মানাকিব, হাদীস নং ৩৭৯৪
২২৬. ফি যিলালিল কুরআন, ৬/৩৫২৬
২২৭. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ১৪৯
২২৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২৪৬
২২৯. আত-তারীখুল ইসলামি, ৪/২৫
২৩০. বুখারি, তাফসীর অধ্যায়, হাদীস নং ৪৫৮০
২৩১. ফিকহুত তামকীন ফিল কুরআন, আস-সাল্লাবি, ২৫৩
২৩২. বুখারি, ঈমান অধ্যায়, হাদীস নং ১৬
২৩৩. নাযারাত ফি রিসালাতিত তালীম, মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-খাতীব, মুহাম্মাদ আবদুল হালীম হামিদ, পৃ. ২৬২
২৩৪. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, ড. আবদুর রহমান আল-বার, পৃ. ১৩১-১৩৫
২৩৫. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, হাদীস নং ৩৭৭৬
২৩৬. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, হাদীস নং ৩৭৮৫
২৩৭. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, ঈমানের কারণে আনসারদের প্রতি ভালোবাসা পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ৩৭৮৩
২৩৮. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, হাদীস নং ৩৭৭৯
২৩৯. বুখারি, তাফসীর অধ্যায়, হাদীস নং ৪৯০৬
২৪০. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, হাদীস নং ৩৮০১
২৪১. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৫১