📘 রউফুর রহীম 📄 মুহাজিরদের পুরস্কার ও পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি ধমক

📄 মুহাজিরদের পুরস্কার ও পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি ধমক


নবি -এর মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাতের বৃত্তান্তটি ইসলামের ইতিহাসে মহান এক ঘটনা। শুধু ইসলাম কিংবা আরব নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের বয়ে চলা গতিধারাও পালটে দেয় এই হিজরাত; এর আগ পর্যন্ত মাক্কার মুসলিমরা শুধু দাওয়ার কাজ করতেন। সে সময় এমন কোনো রাজনৈতিক পরিকাঠামো তাদের ছিল না, যা ইসলামের দা'ইদের সুরক্ষা দিতে পারে। রুখে দেবে শত্রুদের আক্রমণ।
কিন্তু হিজরাতের পর মুসলিমদের একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রটির মূল কাজই হয়ে ওঠে দিকে দিকে ইসলামের সুমহান দাওয়াহকে ছড়িয়ে দেওয়া; আরব উপদ্বীপের ভেতরে এবং বাইরে। দা'ইদের পাঠিয়ে দেয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। দায়িত্ব নেয় এদের সুরক্ষার ও শত্রুদের প্রতিহত করার। এ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য যদি যুদ্ধও করতে হয়, তাতেও রাষ্ট্রটি প্রস্তুত। [১৩৭]
এ তো গেল এক দিক। কুরআন বোঝা এবং এ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করার বেলায়ও নবি -এর হিজরাতের গুরুত্ব অপরিসীম। 'আলিমগণ পুরো কুরআনকে মাক্কি ও মাদানি এ দুভাগে ভাগ করেছেন; ওই সূরাগুলোকে মাক্কি বলা হয়, যা হিজরাতের পূর্বে নাযিল হয়েছে, যদিও সেটা মক্কায় না হয়। আর হিজরাতের পরে নাযিল হওয়া সূরাগুলোকে বলা হয় মাদানি। সেটা যে স্থানেই অবতীর্ণ হয়ে থাকুক। সূরাগুলো মাক্কি ও মাদানিতে বিন্যস্ত হওয়ায় যেসব শিক্ষণীয় দিক রয়েছে, তা হলো:
১) কুরআনের অনুপম উপস্থাপনশৈলীর স্বাদ আস্বাদন এবং দাওয়াহ দেওয়ার বেলায় তার প্রয়োগ ঘটানো।
২) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে হিজরাতের ঘটনা অনুধাবন করা: [১৩৮] হিজরাতের গুরুত্ব অপরিসীম; সন্দেহ নেই। আমরা দেখি কুরআন মু'মিনদের আল্লাহর পথে হিজরাত করার ব্যাপারে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে; কখনো মুহাজিরদের প্রশংসা করে, কখনো বা তাদের পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আবার কখনো হিজরাত না করে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সতর্ক করার মাধ্যমে। [১৩৯]

কুরআনে মুহাজিরদের প্রশংসা: যেসব গুণে গুণান্বিত করে কুরআনে মুহাজিরদের প্রশংসা করা হয়েছে: [১৪০]
১) নিষ্ঠা: আল্লাহ বলেন- (এ সম্পদ) দেশত্যাগী (মুহাজির) গরিবদের জন্য, যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশ্র, ৫৯: ৮] আয়াতের يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَরিضْوَانًا অংশটি প্রমাণ করে যে, মুহাজিররা কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ ছেড়ে আসেননি। স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই পথে হিজরাত করেন।[১৪১]
২) ধৈর্য: আল্লাহ বলেন- নির্যাতিত হওয়ার পর যারা আল্লাহর জন্য হিজরাত করেছে, দুনিয়ায় আমি তাদের উত্তম বাসস্থান দেবো। আর আখিরাতের পুরস্কার তো আরও বড়, যদি তারা জানত! (এরা তারাই) যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪১,৪২]
৩) সততা: আল্লাহ বলেন—
(এ সম্পদ) দেশত্যাগী (মুহাজির) গরিবদের জন্য, যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে, তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশর, ৫৯: ৮]
ইমাম বাগাউই তার বিখ্যাত তাফসীরে ‘তারা সত্যবাদী’ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ তারা তাদের ঈমানে সত্যবাদী। [১৪২]
৪) জিহাদ ও ত্যাগ-তিতিক্ষা: আল্লাহ বলেন—
যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
আয়াতটিতে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, আল্লাহর পথে জিহাদ ও ত্যাগ- তিতিক্ষা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া জিহাদের কল্পনাই করা যায় না। [১৪৩]
৫) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করা: আল্লাহ বলেন—
এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশর, ৫৯:৮]
৬) আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা: আল্লাহ বলেন—
যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪২]
৭) আশা-আকাঙ্ক্ষা: আল্লাহ বলেন—
যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরাত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা সবাই আল্লাহর দয়া কামনা করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা বাকারাহ, ২: ২১৮]
আয়াতে يَرْجُونَ (তারা কামনা করেন) বলে মুহাজিরদের প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করার পরেও পৃথিবীতে কেউই হলফ করে বলতে পারবে না যে, তার জন্য জান্নাত অবহারিত। দুটি কারণে—এক, কারও জানা নেই অন্তিম মুহূর্তটা তার কীসের ওপর হবে; ঈমান না কুফুরি? দুই, সৎকাজ করছে বলে মনে ফুরফুরে কোনো আমেজও আনা যাবে না। এমন ভাব করা যাবে না যে, তার সৎকাজ অবশ্যই তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। তবে মুহাজির সাহাবিদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর দয়া ও কৃপার আশা করতেন। এটা তাদের ঈমান বৃদ্ধিরই লক্ষণ। [১৪৪]
৮) দুর্দিনেও আল্লাহ্র রাসূলের আনুগত্য: আল্লাহ বলেন—
আল্লাহ দয়াপরবশ নবির প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সংকটের সময়ে তার অনুসারি হয়েছিল, তাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল হয়েছেন, যখন ইতোমধ্যেই তাদের মধ্যে একটি দলের মনে (এ ব্যাপারে) বিভ্রান্তি সৃষ্টির উপক্রম হয়েছিল, অতঃপর তিনি তাদের ক্ষমাও করে দিয়েছিলেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা, ৯: ১১৭]
তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আয়াতটি নাযিল হয়। মুফাস্স্সির কাতাদা বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় সাহাবিগণ শাম অভিমুখে রওনা হন। তখন প্রচণ্ড গরম পড়ছিল। এমন খরা রোদে তাদের খুব কষ্ট হয়। এরপর একটা পর্যায়ে গিয়ে এমন অবস্থাও হয় যে, দুজন সাহাবিকে মাত্র একটা খেজুরও ভাগ করে খেতে হয়েছিল। [১৪৫]
৯) ঈমান ও সৎকাজে অগ্রগামীদের নেতৃত্ব অর্জন: আল্লাহ বলেন—
প্রথমদিকের মুহাজির ও আনসারদের প্রতি এবং তাদের যথার্থ অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাই আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এটাই তো বড় সাফল্য। [সূরা তাওবা, ৯: ১০১]
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযি বলেন, মর্যাদা পেতে হলে অগ্রগামী হওয়া চাই। এমন ভালো কাজে অগ্রগামিতার জন্য তাদের অনুসরণ আবশ্যক। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুহাজিররাই মুসলিমদের নেতা ও তাদের সর্দার। [১৪৬]
১০) সফলতা: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
আবু সউদ তার তাফসীরে বলেন, আল্লার বাণী, أُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ 'তারাই সফলকাম' অর্থাৎ একটা মহান সফলতা প্রাপ্তির জন্য তারা বিশেষভাবে যোগ্য। কেমন যেন অন্যদের সাফল্য মুহাজিরদের সফলতা প্রাপ্তির ধারে কাছেও নেই।[১৪৭]
১১) ঈমান: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদের) আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই হচ্ছে সত্যিকার মু'মিন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৪]

মুহাজিরদের জন্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি: মুহাজিরদের আল্লাহ পৃথিবীতে ও পরকালে যে যে নি'আমাহ ও অনুগ্রহ দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কুরআনে সেগুলো বিধৃত হয়েছে এভাবে:
১) দুনিয়াতে আল্লাহ তাদের রুটিরুজিতে প্রশস্ততা দান করবেন: আল্লাহ বলেন— যে আল্লাহর পথে হিজরাত করে, সে পৃথিবীতে অনেক আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশে হিজরাত করে নিজের ঘর থেকে বের হয়, তারপর (হিজরাতে থাকা অবস্থায়) মারা যায়। তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, দয়াময়। [সূরা নিসা, ৪: ১০০]
ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) ও গানীমাত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দিয়ে আল্লাহ মুহাজিরদের দুনিয়াতে রিজিকের প্রশস্ততা দান করেন। রিজিকে তাদের এমন প্রশস্ততা দেওয়ার কারণও আছে। তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য নিজেদের ভিটেভূমি ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সুতরাং এমন সম্পদ পাওয়ার হকদার তো এরাই।[১৪৮]
২) তাদের পাপ মোচন: আল্লাহ বলেন— অতঃপর তাদের রব তাদের দু'আ কবুল করে বলেন, তোমাদের কারও কাজ আমি নষ্ট করি না (বিফলে যেতে দিই না), সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ। তাই যারা হিজরাত করেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, আমার পথে নিপীড়িত হয়েছে এবং (আমার পথে) যুদ্ধ করেছে ও শহিদ হয়েছে, আমি তাদের খারাপ কাজগুলো (আমালনামা থেকে) মুছে দেবো এবং তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পুরস্কার। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম পুরস্কার। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৯৫]
হিজরাত পাপ মোচনের বড় একটা মাধ্যম—এমন ধারণাই মেলে আল্লাহর রাসূলের বহু হাদীসে।
৩) রবের নিকট তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
শারীরিক ও আর্থিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে যারা হিজরাত ও জিহাদ করেছেন, প্রকৃত অর্থে তারাই পদের দিক থেকে ও সম্মানের দিক থেকে মহান। [১৪৯]
৪) জান্নাতের সুসংবাদ: আল্লাহ বলেন— তাদের প্রতিপালক তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাঁর দয়া, সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের, যেখানে তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী সুখের ব্যবস্থা। সেখানে তারা চিরকাল বাস করবে। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে রয়েছে এক মহান পুরস্কার। [সূরা তাওবা, ৯: ২১-২২]
মুহাজিরদের অনবরত কষ্ট সহ্য করার দরুন আল্লাহ তাদের সঙ্গে যেসব সাওয়াব ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বিধৃত হয়েছে আয়াতটিতে।[১৫০]

হিজরাত না করে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সতর্কীকরণ: আল্লাহ বলেন—
নিজেদের প্রতি জুলুমকারী (হিজরত না করা) অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তাদের তারা প্রশ্ন করে, তোমরা কোন অবস্থায় ছিলে? উত্তরে তারা বলে, আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ছিলাম। তারা বলে, আল্লাহর যমিন কি তোমাদের হিজরাত করার মতো প্রশস্ত ছিল না? তাই এসব লোকের নিবাস হলো জাহান্নাম, সেটা বড় খারাপ ঠিকানা! [সূরা নিসা, ৪: ৯৭]
ইবনু 'আব্বাস বলেন, মাক্কাবাসীদের একটা জাতি ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে ইসলাম গ্রহণের কথা তারা গোপন রাখতেন। এরপর একটা সময় এলো, যখন মুশরিকরা তাদের সঙ্গে বদর প্রান্তরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাদের কেউ কেউ নিহত হয়। তখন মুসলিমরা বলাবলি করতে লাগল, নিজেদের প্রতি জুলুমকারী অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তাদের তারা প্রশ্ন করে, তোমরা কোন অবস্থায় ছিলে? তখন পর্যন্ত মুসলিমদের যে কয়জন খোঁড়া অজুহাতে হিজরাত না করে মক্কায় থেকে যান, তাদের পরিপ্রেক্ষিতেই আয়াতটি নাযিল হয়। মুশরিকরা তাদের একলা পেয়ে যারপরনাই নির্যাতন করে। তখন নিচের আয়াতটি নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি; কিন্তু যখন তারা আল্লাহর পথে নিপীড়িত হয়, তখন মানুষের নিপীড়নকে আল্লাহর শাস্তির ন্যায় গণ্য করে। আর যখন তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য (বা বিজয়) আসে, তখন তারা বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম। আল্লাহ কি বিশ্বাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন? [সূরা 'আনকাবূত, ২৯: ১০]
সাহাবিরা আয়াতটি মাক্কায় অবস্থানরত মুসলিমদের কাছে লিখে পাঠায়। তারা বেরিয়ে পড়ে এবং ভাবে যে, তারা সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে। এরপর তাদের প্রেক্ষিতে আরেকটি আয়াত নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
যারা নির্যাতন ভোগের পর হিজরাত করেছে, তারপর জিহাদ করেছে ও ধৈর্য ধরেছে, তাদের জন্য এসবকিছুর পরে অবশ্যই তোমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা নাহল, ১৬: ১১০][১৫১]
হিজরাত না করে যারা পেছনে থেকে গেছে, আল্লাহ তাদের 'নিজেদের প্রতি জুলুমকারী' বলে অভিহিত করেছেন। এ আয়াতে জুলুম বলতে বোঝানো হচ্ছে, যারা ইসলাম গ্রহণের পরেও দারুলকুফ্র বা কাফিরদেশে থেকে গেছেন, মাদীনায় হিজরাত করেননি, কার্যত তারা হিজরাত ছেড়ে দিয়ে নিজেরদের ওপর অন্যায় করেছেন।[১৫২]
পরের আয়াতে এমন লোকদের ধমকি দেওয়া হয়েছে। তাদের পরকালের ঠিকানা বড়ই খারাপ বলে নিন্দামন্দ করা হয়েছে।
এরপর সাহাবিরা আল্লাহর আদেশ শিরোধার্যরূপে মেনে নেন। হিজরাত করেন মাদীনায়। আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন করেন। এমন ধমক তাদের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। মনে সারাক্ষণ আল্লাহর ভয় কাজ করে। দামরাহ ইবনু জুনদুব নামের একজন সাহাবির কাছে যখন কুরআনের এই আয়াতটি গিয়ে পৌঁছে, إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ—ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তখন তিনি মাক্কায় অবস্থান করছিলেন। ছেলেদের ডেকে বলেন, তোমরা আমাকে নিয়ে চলো। আমি দুর্বল নই। আমি পথ পেয়ে গেছি। আর একটা রাতও মাক্কায় থাকতে চাই না। ছেলেরা তাকে একটা খাটে তুলে নিয়ে মাদীনা অভিমুখে রওনা হন। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। নিজের গণ্ডদেশকে ডানদিক থেকে বামদিকে ঘুরিয়ে দেন এবং বলেন, হে আল্লাহ, এটা আপনার জন্য এবং আপনার আল্লাহর রাসূলের জন্য। আপনার রাসূল যেসব বিষয়ে আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন, সেসব বিষয়ে আমি আপনার নিকট শপথ করছি। খাইবার এলাকায় আসার পর তিনি মারা যান। ছেলেরা বলছিল, হায় তিনি যদি মাদীনায় মারা যেতেন! তখন এই আয়াত নাযিল হয়;[১৫৩] আল্লাহ বলেন—
দুর্বল নরনারী ও শিশুরা ব্যতীত; যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথেরও সন্ধান পায় না। আশা আছে, আল্লাহ এদের মার্জনা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। [সূরা নিসা, ৪: ৯৮, ৯৯]
আয়াতগুলো আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি যত খারাপই হোক, প্রথম প্রজন্মের সাহাবিরা আল্লাহর আদেশ পালনে এবং সেটা বাস্তবায়নে খুবই একনিষ্ঠ ও কর্মঠ ছিলেন। কোনো ধরনের অজুহাত দাঁড় করাতেন না। কোনো সুযোগ খুঁজতেন না।
কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, দামরাহ ইবনু জুনদুব হিজরাত না করে মক্কায় থেকে যান। তার যৌক্তিক কারণও ছিল। তিনি ছিলেন অসুস্থ।[১৫৫] কিন্তু হিসাবনিকাশ করে তিনি দেখলেন, তার তো সম্পদ আছে। তিনি এর সাহায্য নিলেন। খাটিয়ায় চড়ে রওনা দেন মাদীনার দিকে। এতদিন যে কারণে মক্কায় পড়ে ছিলেন, ভাবলেন সেটা কোনো গ্রহণযোগ্য কারণই না। এমন চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় তার এ অজুহাত। প্রমাণ হয় তার ঈমান ও একনিষ্ঠতার।[১৫৬]
আল্লাহ বলেন—দুর্বল নরনারী ও শিশুরা ব্যতীত; যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথেরও সন্ধান পায় না। আশা আছে, আল্লাহ এদের মার্জনা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। [সূরা নিসা, ৪: ৯৮, ৯৯]

টিকাঃ
১৩৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ আবু ফারিস, পৃ. ১৩
১৩৮. মুবাহাসু ফি উলুমিল কুরআন, আল-কাতান, পৃ. ৫৯
১৩৯. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৮৪
১৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫
১৪১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬
১৪২. তাফসীর আল-বাগাউই, ৪/৩১৮
১৪৩. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১০৬
১৪৪. আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ৩/৫০; তাফসীরু আবিস সাউদ, ১/২১৮
১৪৫. তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩৯৭
১৪৬. তাফসীরুর রাযি, ১৫/২০৮
১৪৭. তাফসীরু আবিস সাউদ, ৪/৫৩
১৪৮. তাফসীর ইবন কাসীর, ৪/২৯৫; তাফসীরু আবিস সাউদ, ৮/২২৮; তাফসীরু ফাতহিল কাদীর, ৫/২০০; আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৩২
১৪৯. তাফসীরুল মারাগি, ১০/৭৮; তাফসীরুর রাযি, ১৬/১৩, ১৪
১৫০. হিজরাতুর রাসূলি ওয়া সাহাবাতিহি ফিল কুরআনি ওয়াস সুন্নাতি, আল-জামাল পৃ. ৩৩২, ৩৩৩
১৫১. যাদুল মাসীর, ইবনুল জাওযি, ২.৯৭, তাফসীর আল-কাসিমি, ৩/৩৯৯
১৫২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৬১
১৫৩. রুহুল মাআনি, আলুসি ৫/১২৮, ১২৯; আসবাবুন নুযূল, আল-ওয়াহিদি, পৃ. ১৮১
১৫৪. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৪
১৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫
১৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px