📄 শিক্ষা ও উপকারিতা
১) সত্য ও মিথ্যার চিরকালের সংঘাত:
সেই প্রথম মানব, নবি আদম-এর সঙ্গে ইবলিসের যে সত্য-মিথ্যার সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে এবং চলবে। আল্লাহ বলেন—
যাদের কেবল 'আমাদের রব আল্লাহ' বলার কারণে তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভবে বের করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ যদি একদল মানুষকে আরেকদল মানুষ দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে আশ্রম, গীর্জা, সিনাগগ ও মাসজিদসমূহ; যেখানে আল্লাহর নাম অধিক পরিমাণে স্মরণ করা হয়, অবশ্যই বিধ্বস্ত হয়ে যেত। আল্লাহ নিশ্চয় তাদের সাহায্য করবেন, যারা তাঁকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [সূরা হাজ্জ, ২২: ৪০]
তবে এ সংঘাতের পরিণতি কী, সেটা সবারই জানা; আল্লাহ বলেন—
আল্লাহ লিখে দিয়েছেন: আমি ও আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। [সুরা মুজাদালাহ, ৫৮: ২১]
২) দীনের দা'ইদের প্রতি শত্রুতা:
যুগে যুগে সব নবি-রাসূলই এমন ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছেন। যারাই দাওয়াহর কাজ করবেন, তাদের বেলায়ও একই জিনিসের পুনারাবৃত্তি ঘটবে। বহুভাবে কাফির-মুশরিকরা তাদের কষ্ট দেয়; বন্দি করা, হত্যা করা, নির্বাসনে পাঠানো কিংবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তারা দাওয়াহর পথ রুদ্ধ করতে চেষ্টা চালায়। যত উপায় আর কূটচাল আছে, এর কিছুই বাদ দেয় না। প্রতিটি যুগেই এর বিপুল নমুনা আছে। তাদের আপতিত এই বিপদগুলোর মুখে একজন দা'ইকে উদ্যমহারা হলে চলবে না। তাকে অবশ্যই তার রবের কাছে আশ্রয় নিতে হবে। ভরসা রাখতে হবে কেবল তাঁরই ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস, অটল পদক্ষেপ, মুষ্টিবদ্ধ প্রতিজ্ঞা এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। কুচক্রীরা তাদের অপকর্ম অব্যাহত রাখবে, কিন্তু আল্লাহর বিরুদ্ধে জয়ী হবার সাধ্যি আছে কার![৮৭] আল্লাহ বলেন—
(স্মরণ করো) যখন কাফিররা তোমাকে বন্দি করার জন্য অথবা হত্যা করার জন্য কিংবা (মাতৃভূমি থেকে) বের করে দেওয়ার জন্য তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিল। তারাও ষড়যন্ত্র করছিল আর আল্লাহও কৌশল করছিলেন। [সূরা আনফাল, ৮: ৩০]
বাতিলপন্থি ও দীনের শত্রুরা দাওয়াহকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য দুর্বল মনের অধিকারী লোকদের অর্থের প্রলোভন দেয়। তারা ঘোষণা দেয়, দুই মুহাজিরের একজন রাসূল ﷺ কিংবা আবু বাক্র রা.-কে জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারলে তাকে ১০০ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। এমন লোভনীয় পুরস্কারের কথা শুনে অনেকেই প্রলুব্ধ হয়। তাদের একজন সুরাকা। ১০০ উট পুরস্কারের এমন জাগতিক প্রাপ্তিকে দুপায়ে মাড়িয়ে একসময় সুরাকা ফিরে আসে তৃপ্তির পথে, সত্যিকারের লাভের দিকে, পবিত্র রিজিকের দিকে; ঈমানের রিজিক। সব ছেড়ে-ছুড়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। অন্ধকার পথ থেকে কেবল ফিরেই আসেনি, আরও যারা ওই পথ মাড়াবার জোর চেষ্টা করেছেন, রাসূল ﷺ-কে ধরে পুরস্কার বাগাবার খায়েশে মেতেছে, তাদের সে ভুল পথ দেখিয়ে দিয়ে আল্লাহর রাসূলের অনিষ্টতা থেকে নিরত করেছে। আল্লাহ তা'আলা এভাবেই তাঁর বন্ধুদের, দীনের দা'ইদের সকল অনিষ্টের কবচ থেকে রক্ষা করেন।[৮৮] আল্লাহ বলেন—
যারা কুফরি করে, তারা আল্লাহর পথ থেকে (লোকদের) বিরত করতে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে থাকে। অতএব, তারা তা ব্যয় করবে; তবে অবশেষে এই সম্পদ তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হবে। তারপর তারা পরাজিত হবে। আর কাফিরদের জাহান্নামে একত্র করা হবে। [সূরা আনফাল, ৮:৩৬]
৩) হিজরাতের পরিকল্পনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্ন করতে রাসূল যে যে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করেছেন—
সীরাত-পাঠকদের যে কেউ এগুলো নিয়ে ভালোভাবে গবেষণা করলে চিন্তার অনেক খোরাক পাবেন। উপলব্ধি করবেন, ওয়াহির আলোকে নেওয়া প্রতিটি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ তিনি কী প্রজ্ঞার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছেন। কোনো ভালো কাজে পরিকল্পনা ও শলা-পরামর্শ সুন্নাতেরই একটা অংশ। প্রতিটি কাজে পরিকল্পনা করে আগোনোর তাগাদা মুসলিমদের আল্লাহই দিয়েছেন। পরিকল্পনা ও শলা-পরামর্শকে সুন্নাহ মনে না করে অনেকের মধ্যে এগুলোকে পাশ কাটানোর প্রবণতা আছে। এরা নিশ্চিত ভুলের মধ্যে আছে।[৮৯]
রাসূল মাদীনায় হিজরাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা নিম্নরূপ:
ক) তখন সূর্য প্রচণ্ড তাপদাহ ছড়াচ্ছে। সাধারণত কেউ এ সময় ঘর থেকে বের হয় না। ঠিক এ সময়টাতেই রাসূল আবু বাক্র সিদ্দীকের বাসায় আসেন। কেন? যাতে কেউ দেখা তো দূরে থাক, বুঝতেও না পারে।
খ) আবু বাক্রের বাড়ি যাওয়ার পথে গোপনীয়তার জন্য নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। সম্পূর্ণ মাথা ও চেহারার কিছু অংশ ঢেকে পথে বের হন।[৯০]
গ) গিয়েই প্রথমে আবু বাক্রকে আদেশ করেন সেখানে উপস্থিত অন্যান্য লোকদের সরিয়ে দিতে। তাও মাদীনায় হিজরাত করার বিষয়টি ছাড়া বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই বলেননি। এমনকি কোন পথে মাদীনায় গিয়ে পৌঁছাবেন, সেটা পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করলেন না।
ঘ) তিনি আবু বাক্রের বাসা থেকে রাতের বেলায় খিড়কি পথ দিয়ে বের হন।[৯১]
ঙ) নিরাপদে, নির্বিঘ্নে মাদীনায় পৌঁছানোর জন্য রাসূল ﷺ অপরিচিত একটা পথ বেছে নিলেন। মানুষজনের চলাচলও সে পথে বেশি একটা নেই; কদাচিৎ সে পথ ব্যবহার করে তারা। মরুভূমির গতিপ্রবাহ ও রাস্তাঘাট চেনে এমন একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ লোকের সাহায্য নেন রাসূল ﷺ। অভিজ্ঞ সেই গাইড মুশরিক বটে তবে আচার-আচরণ ও চারিত্রিক গুণে অত্যন্ত ভদ্র ও গুরুগম্ভীর স্বভাবের। একজন মুশরিককে গাইড হিসেবে নেওয়ার বিষয়টি সপ্রমাণ যে, লোক যে-ই হোক না কেন—পেশাদার ও অভিজ্ঞ লোকের সাহায্য নিতে রাসূল দ্বিধা-সংশয়ে ভুগতেন না।[৯২]
হিজরাতের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ যথার্থ করার জন্য রাসূল কিছু দক্ষ ও বিশ্বাসী লোককে বেছে নেন। একটু খেয়াল করলেই দেখব যে, অভিজ্ঞ এ লোকগুলো হয় তাঁর সঙ্গে, না হয় আবু বাকরের সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা বিশেষ কোনো কাজে বিশেষভাবে পারদর্শী। দলের সবার পারস্পরিক সহযোগিতা আবর্তিত হয় মহান একটা লক্ষ্য বাস্তবায়নকে ঘিরে; হিজরাত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক—একযোগে সবার চাওয়া হয়ে ওঠে এটাই।
রাসূল প্রত্যেক কাজের জন্য যথার্থ লোককেই বেছে নেন। হিজরাত সফল হওয়ার পেছনে আল্লাহর রাসূলের এ পরিকল্পনা যথাযথভাবেই কাজে দেয়।
আল্লাহ্র রাসূলের বিছানায় 'আলি ইবনু আবু তালিবের ঘুমিয়ে থাকাটা অত্যন্ত ফলপ্রসূ এক কৌশল ছিল। কাফিরদের বোকা বানাতে কৌশলটির জুড়ি মেলা ভার। আল্লাহর রাসূলের ওপর থেকে তাদের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরে যায়। এ সুযোগে রাসূল বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। মুশরিকরা টেরই পায়নি। আল্লাহ তাঁর রাসূল-কে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। সকালবেলা তাদের দৃষ্টি আটকে আল্লাহর রাসূলের বিছানায়। সবই ঠিক আছে, মুহাম্মাদ রাতের বেলায় বের হতে পারেননি। এখনো চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানাতেই ঘুমিয়ে আছেন—এ ব্যাপারে তাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ কাজ করেনি। অথচ বিছানায় রাসূল নন, ঘুমিয়ে আছেন তাঁর চাচাতো ভাই ও সাহাবি 'আলি ইবনু আবু তালিব।
হিজরাতে কার কী ভূমিকা:
ক) 'আলি: আল্লাহর রাসূলের বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রথমত এতে কাফিরদের বোকা বানানো হয়। তা ছাড়া আল্লাহর রাসূলের কাছে গচ্ছিত রাখা কাফিরদের সম্পদ যথাযথভাবে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি তাকেই দিয়ে যান।
খ) 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু বাক্র: হিজরাতের প্রথম দিকে, রাসূল ও আবু বাক্র তখন গুহায়, সে সময় তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। সব সময় চোখ রাখেন শত্রুদের প্রতিটি গতিবিধির ওপর।
গ) আসমা: মুহাম্মাদ-কে হত্যা করার জন্য মুশরিকরা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সব জায়গায়। এমন বিপৎসংকুল পরিবেশে আসমা বিনতে আবু বাক্র সবার চোখ এড়িয়ে মাক্কা থেকে তাদের জন্য নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ করতেন।
ঘ) 'আমির ইবনু ফুহাইরা: সাদাসিধে ও বিশ্বস্ত একজন রাখাল। প্রতিদিন গুহায় রাসূল ও আবু বাক্রের জন্য খাদ্য সরবরাহ করতেন। হিজরাত সফল করতে তিনি আরেকটা দুর্দান্ত কাজ করেন। মরুভূমির বালুর ওপরে তার মেষপাল ছুটিয়ে রাসূল ও আবু বাক্র-এর পায়ের চিহ্ন মিশিয়ে দিতেন; খুঁজতে আসা লোকজন যাতে কোনো ভাবেই পায়ের চিহ্ন ধরে তাদের হদিস বের করতে না পারে—বিষয়টি তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত করেন।
ঙ) 'আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত: হিজরাতের পরম বিশ্বস্ত একজন গাইড। মরুভূমির অপরিচিত ওই পথটি তার নখদর্পণে। নিজের কাজ সম্পাদন করেছে সে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সঙ্গেই; গুহা থেকে তাদের পথ দেখিয়ে নিরাপদেই নিয়ে যায় ইয়াসরিবে।
এতক্ষণের আলোচনা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান যে, মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাত নিরাপদ করার জন্য রাসূল সম্ভবপর সব ধরনের কৌশলই গ্রহণ করেছেন। তাঁর গৃহীত এমন কৌশল বিচক্ষণতা এবং গোপনীয়তার যোগসাজশেই সহজে সব ধরনের ঝামেলা এড়ানো গেছে। এ কথা ঠিক যে, তাঁর পরিকল্পনাটি বিশদ ও নিশ্ছিদ্র। তবে সেটাকে জটিল বলা চলে না। সঠিক মানুষ চিনে তিনি তাকে উপযুক্ত জায়গায় কাজে লাগান। এই সঠিক লোকদের সংখ্যাও ছিল একেবারে যথাযথ; না বেশি, না কম। [৯৩]
৪) উপায়-উপকরণ গ্রহণের আবশ্যকতা: উপায়-উপকরণ গ্রহণ এমন একটা বিষয় যা অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক। তবে এর অর্থ এই নয় যে, উপায়-উপকরণ অবলম্বন করলেই এর ফলাফল আসতে বাধ্য। কারণ, কোনো কাজের ফলাফল আসাটা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ থেকে বুঝা যায়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা বিষয়। আর হবেই-বা না কেন, উপকরণ গ্রহণের পূর্ণতাপ্রাপ্তির একটা দুয়ার তো এই তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, প্রস্তুতি আর উপায়-উপকরণ গ্রহণ করেই রাসূল ক্ষান্ত হননি। পূর্ণ ভরসা রেখেছেন আল্লাহর ওপর। তাকে ডেকেছেন, তাঁর নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন। মহান রব তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। সাহায্য করেছেন পদে পদে; গুহার মুখে দাঁড়ানোর পরেও রাসূল-কে মুশরিকরা দেখতে পায়নি। সুরাকার ঘোড়ার পা মাটিতে দেবে যায়। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বিভিন্ন পন্থায় রক্ষা করেছেন এবং তাঁর হিজরাতকে করেছেন সাফল্যমণ্ডিত।[৯৪]
৫) মু'জিজা বা অলৌকিক ঘটনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন: নবি-এর হিজরাতের ঘটনায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকগুলো অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের রাসূলের প্রতি আল্লাহর হেফাজত নিরাপত্তাবিধানের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এর একটি উদাহরণ এরকম, রাসূল যে গুহায় আত্মগোপন করে ছিলেন, গুহাটির মুখে মাকড়সা জাল বোনে। আরেকটি ঘটনা ছিল, রাসূল যখন উম্মু মা'বাদের তাঁবু অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি সেখানে নেমে পড়েন। আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি উম্মু মা'বাদের জীর্ণ-শীর্ণ দুর্বল ভেড়ার দুধ দোহন করেন। আরেকটি মু'জিজা হলো সুরাকার ঘটনা। রাসূল তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সে একদিন পারস্য সম্রাটের দুটি বালা পরিধান করবে।
আমাদের মুসলিমদের জন্য নবি-জীবনের বৃত্তান্ত শুধু পড়া বা জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমরা প্রতিটি খুঁটিনাটি আদ্যোপান্ত জানব, আলোচনা করব, যদি দেখা যায়, মু'জিজাটি সাহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তাহলে সেটাতে বিশ্বাস স্থাপন করব, জ্ঞানের বিভিন্ন আসরে আলোচনা তুলব। মানুষকে দেখিয়ে দেব, মু'জিজাটি নবি-এর নবুওয়াতেরই একটা নিদর্শন।[৯৫]
৬) বিশ্বস্ত কাফিরের সাহায্য-সহযোগিতা নেওয়ার বৈধতা: একজন দা'ইর পক্ষে এমন একজন কাফিরের সাহায্য নেওয়ার সুযোগ আছে, যে লোক তার দাওয়া বিশ্বাস করে না। তবে ঢালাওভাবে সব কাফিরের সাহায্য গ্রহণ করা যাবে না। পেশাদারিত্ব ও বিশ্বস্ততার প্রশ্নে লোকটিকে অবশ্যই উত্তীর্ণ হতে হবে। তবেই তার সাহায্য নেওয়ার প্রসঙ্গ আসবে। হিজরাতের ঘটনায় আমরা দেখেছিলাম, রাসূল ও আবু বাক্র একজন মুশরিককে ভাড়া করেন তাদের মাদীনার পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নিজেদের বাহনের ভার পুরোপুরি ছেড়ে দেন তার হাতে। তিন দিন পর সাওর পর্বতের গুহায় তাদের সঙ্গে দেখা করার সময়ও নির্ধারণ করে দেন লোকটিকে। বিশ্বাসের মাত্রাটা কত বেশি হলে এমন স্পর্শকাতর একটা গোপন বিষয়ে তাকে বিশ্বাস করতে পারেন! এতে প্রমাণিত হয়, কোনো কাফির কিংবা পাপাচারীর ওপরও কখনো কখনো আস্থা রাখা যায়; নির্ভর করে, যে কারণে তাকে বিশ্বাস করার প্রশ্ন আসে, ওই বিষয়ে সে পূর্ণ দক্ষ কিনা। হয়তো সে ওই মুসলিমের খুব কাছের কেউ, কিংবা তাকে তিনি অনেকদিন ধরে খুব ভালো করেই জানেন, বা লোকটা তার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশী, কিংবা নৈতিকতার প্রশ্নে সে সবার কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। অথবা অন্য যেকোনো ভালো গুণের কারণেই লোকটিকে বিশ্বাস করা যায়। তবে কোনো কাফিরকে বিশ্বাস করাটা একান্তই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মুসলিমের বিচারবিবেচনার ও তার বুদ্ধিমত্তার ওপর। তিনি কাফির, ওই লোকটিকে কতটা চেনেন, কীরকম জানেন তার ওপরই নির্ভর করে—তার থেকে কোনো সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা।[৯৬]
৭) হিজরাতের ঘটনায় মুসলিম নারীদের ভূমিকা: হিজরাতের আকাশে নারীদেরও অনেকগুলো নাম জ্বলজ্বল করছে, যাদের ভূমিকা নেহায়াতই কম নয়। এদের একজন হযরত আবু বাক্র সিদ্দীকের মেয়ে 'আয়িশা। হিজরাতের ঘটনায় তার ভূমিকা সবার থেকে একটু ভিন্ন; মোটেই বিস্মৃত না হয়ে তিনি ঘটনার আদ্যোপান্ত মনে রেখেছেন এবং উম্মাহর কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। অত্যন্ত ধৈর্যশীল উম্মু সালামা; তিনি মাদীনায় হিজরাত করেন। আসমা যাতুন নিতাকাইন; [৯৭] তিনি রাসূল ও আবু বাক্রের জন্য বিভিন্ন বস্তুর জোগান দিতেন। খাবার ও পানীয় সরবরাহ করতেন। কী কষ্টটাই না তিনি আল্লাহর পথে সহ্য করেছেন! ইতিহাসের পাতায় তিনি নিজেই আমাদের কাছে তার ঘটনা ব্যক্ত করেছেন; তিনি বলেন—
'রাসূল ও আবু বাক্র যখন বের হয়ে যান, তার একটু পরই কুরাইশদের একটা দল আমাদের কাছে আসে। আবু জাহল ইবনু হিশামও ছিল তাদের মধ্যে। আবু বাক্রের দরজায় এসে তারা দাঁড়ায়। দেখে আমি এগিয়ে যাই। তারা বলল, হে আবু বাকরের মেয়ে, তোমার বাবা কোথায়? জবাবে আমি বললাম, আমি জানি না, আল্লাহর কসম, আমার বাবা কোথায়! আবু জাহল ছিল বদমাশ ও পাজি প্রকৃতির লোক, সে কষে আমার গালে এমন এক চড় বসাল যে, কানের দুল ছিটকে গিয়ে পড়ে। এরপর তারা চলে যায়। [৯৮]
রাসূল-এর হিজরাতের খবর শত্রুদের কাছে গোপন রাখা এবং উৎপীড়ক ও অত্যাচারীর সামনে ভড়কে না গিয়ে আসমা যেভাবে অবিচল ও অটল ছিলেন, তা সব মুসলিম নারী-পুরুষের জন্যই অনন্য এক শিক্ষা। তার অবিচল ভূমিকা এখানেই শেষ নয়, অন্য একটি ঘটনাও তিনি অত্যন্ত শক্তহাতে সামলেছেন; দাদা আবু কুহাফা তখন অন্ধ, একদিন তার কাছে এসে বলেন, আমি নিশ্চিত আবু বাক্র তার সমুদয় সম্পদ নিয়ে গিয়ে তোমাদের বিপদে ফেলে গেছে। আসমা বললেন, না, অবশ্যই না, দাদা। এই যে আপনি এগুলোর ওপর হাত রেখে দেখুন। আসমা বলেন, তিনি সেগুলোর ওপর হাত রাখলেন। এরপর বললেন, তাহলে তো ঠিকই আছে। যদি সে তোমাদের জন্য সম্পদগুলো রেখেই যায়, তাহলে সে তো ভালোই করেছে। পরে আসমা বলেন, না, আল্লাহর কসম, তিনি আমাদের জন্য কিছুই রেখে যাননি। তবে আমি এর দ্বারা দাদাকে শুধু প্রবোধ দিতে চেয়েছিলাম।[৯৯]
আসমা তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের মাধ্যমে বাবার বিষয়টি গোপন রাখতে সক্ষম হন। তার অন্ধ দাদার মনেও কোনোরূপ সন্দেহের উদ্রেক হতে দেননি। এসব করার জন্য তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়নি। বাস্তবেই আবু বাক্র তাদের জন্য পাথরগুলো রেখে যান। যাতে মেয়ে তার দাদাকে এগুলো দেখিয়ে বুঝ দিতে পারেন। তবে তিনি পাথরগুলোর সঙ্গে তাদের জন্য রেখে যান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও দৃঢ় ঈমান। কোনো পাহাড়ধস যে ঈমানকে টলাতে পারবে না, দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারবে না প্রবল উত্তাল ঘূর্ণিঝড় এসেও। বাবা মেয়ে উভয়েই আল্লাহর ওপর ঈমানের এমন এক স্তরে ছিলেন যে, সম্পদের অভাব-অনটন কিংবা প্রাচুর্য কোনোকিছুই তাদের বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি। আবু বাক্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পরকালীন উচ্চাকাঙ্ক্ষার এমন এক বীজ রোপণ করেন, যা তাদের সকল ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্তি দেয়। দুনিয়ার তুচ্ছ কোনো বস্তু নয়, তাদের চাওয়া কেবল ওপরের দিকে; রবের সন্তুষ্টি কামনাই যার আসল লক্ষ্য। তিনি একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠন করেন, যার নজির বিরল।
আবু বাক্রের কন্যা আসমা-ও মুসলিম নারীদের জন্য স্থাপন করেন অনুপম এক দৃষ্টান্ত। আজ সময় এসেছে মুসলিম নারীরা নিজেদের আসমা-এর আদর্শে উন্নীত করবেন।
রাসূল ও আবু বাক্র হিজরাত করে মাদীনায় চলে যান। আর আসমা ও তার বোনেরা মাক্কাতেই রয়ে যান। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে মুখ বুজে পড়ে ছিলেন সেখানে। নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা, অভাব-অনটনের কথা কাউকে বলেননি। এজন্য কাউকে দোষারোপ করেননি, কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি-এভাবে কিছু দিন কেটে গেল। রাসূল একসময় যাইদ ইবনু হারিসা ও তার মুক্ত দাস আবু রাফিকে মাক্কায় পাঠান। সঙ্গে দিয়ে দেন দুটি উট ও পাঁচশো দিরহাম। তারা মাক্কা যান। ফিরতি পথে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন আল্লাহ্র রাসূলের দুকন্যা ফাতিমা ও উন্মু কুলসুম, আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আহ, 'উসামা ইবনু যাইদ, তার মা উম্মু বারাকা; যার উপনাম উন্মু আইমান। তাদের সঙ্গে এসে আরও যোগ দেন 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু বাক্র, সঙ্গে আবু বাক্রের পরিবার; 'আয়িশা ও আসমা। একটা সময় তারা মাদীনায় এসে পৌঁছেন। সেখানে এসে তারা প্রথমে হারিসা ইবনু নু'মানের বাসায় ওঠেন। [১০০]
৮) আল্লাহ্র রাসূলের কাছে মুশরিকদের গচ্ছিত ধনসম্পদ:
মাক্কার কাফির-মুশরিকরা একদিকে আল্লাহর রাসূলের দাওয়াহ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ বাধায়, তাঁকে হত্যা করার জন্য নানা ফন্দিফিকির করে। অন্যদিকে নিরাপত্তার ভয়ে, চুরি যাওয়ার ডরে নিজেদের ধনসম্পদ অন্য কারও কাছে নয়, নিয়ে রাখত পরম বিশ্বস্ত আল্লাহ্র রাসূলের কাছেই। মজার ব্যাপার হলো, এমন স্ববিরোধী কাজের দৃষ্টান্ত অন্য কোথাও খুব একটা চোখে পড়ে না; যে লোকটাকে তারা মিথ্যাবাদী, জাদুকর এবং পাগল বলে গালমন্দ করত, দিনশেষে হিসাব মিলিয়ে দেখত, তাঁর চেয়ে উত্তম আমানাতদার এবং পরম বিশ্বস্ত ব্যক্তি আর একজনও নেই। তারা আল্লাহর রাসূলের নিকট নিজেদের সম্পদ আমানাত রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাত। এটা প্রমাণ করে যে, সততার প্রশ্নে রাসূল উত্তীর্ণ না হওয়ার কারণে যে তারা তাকে মানে না—ব্যাপারটা তেমন নয়; বরং রাসূল ইসলাম নামের যে সত্যটা নিয়ে আগমন করেছেন, সেটা নিয়েই তাদের মাথাব্যথা। গায়ে জ্বালা ধরার যত কারণ এই সত্য দীনটাই। ইসলাম তাদের ঔদ্ধত্যে, অহংকারের দেওয়ালে প্রবল আঘাত হানে। নিজেদের মিথ্যা ক্ষমতার মসনদ নিয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে না—এ ভয় তাদের পেয়ে বসে।[১০১] আল্লাহ বলেন—
আমি তো জানি, তারা যা বলে তা তোমাকে দুঃখ দেয়। তবে তারা তো তোমাকে অবিশ্বাস করে না; বরং (এই) অত্যাচারীরা (প্রকৃতপক্ষে) আল্লাহর আয়াতসমূহকেই অস্বীকার করে। [সূরা আন'আম, ৬: ৩৩]
রাসূল একে একে গচ্ছিত সম্পদের সবকিছু আলির হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আদেশ করেন, মালিকদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দিতে। তিনি যখন আলিকে আমানাত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করছেন, তখন কঠিন একটা মুহূর্ত; মৃত্যু ওত পেতে আছে রাতের আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে। রাত পোহালেই তাকে হত্যা করা হবে—এমন সিদ্ধান্তে উন্মাদ কাফিররা। কঠিন এই মুহূর্তে মানুষ একটা জিনিসই কেবল ভাবতে পারে—পলায়ন। আল্লাহর রাসূলের তখন ভাবনা হওয়ার দরকার ছিল, কীভাবে হিজরাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সফল করা যায়; কিন্তু তিনি তো আল্লাহর রাসূল. এমন সংকটাপন্ন মুহূর্তেও মালিকদের কাছে তাদের সম্পদ ঠিকঠিকভাবে পৌঁছানোর কথা ভুলে যাননি। ঠিক এমন সঙ্গিন অবস্থায় পড়লে অন্যদের সম্পদের কথা দূরে থাক, নিজেদের কথাই ভুলে যেতাম আমরা।[১০২]
৯) মূল্য দিয়ে বাহন খরিদ:
আবু বাক্র চড়ার জন্য রাসূল-কে একটা বাহন সাধলেন; কিন্তু রাসূল বিনামূল্যে সে বাহনে চড়তে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত আবু বাক্র মূল্য নিতে রাজি হলেই কেবল রাসূল বাহনটিতে চড়ে বসেন। তবে রাসূল তখনই মূল্য পরিশোধ করতে পারেননি। বাকিতে কিনে নেন। বিষয়টি আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, একজন দা'ইর পক্ষে কোনো সময়ই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। তারা কেবল দিতেই জানবেন, নিতে নয়; কল্যাণকর সকল কিছু তারা কেবল দেবেনই।
হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, তারাও আর দশজনের মতোই মানুষ; আর্থিক অভাব- অনটনে পড়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে দান-সাদাকাহ করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে; কিন্তু তাদের জন্য গ্রহীতা হওয়া সাজে না। আর এমন উন্নত মূল্যবোধ ছিল বলেই রাসূল আবু বকরের কাছ থেকে বাহনটি খরিদ করতে জোরাজুরি করেন। রাসূল-এর এ গুণটি কুরআনেরই একটি হুবহু অনুবাদ। আল্লাহ বলেন—
আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। বিশ্বজগতের রবই আমার প্রতিদান দেবেন। [সূরা আশ-শু'আরা, ২৬: ১০৯]
যারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন, বিশুদ্ধ আকীদা পোষণ করেন এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা হাত পাতবেন-এটা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা স্পষ্ট স্ববিরোধী একটা কাজ। তারাই সবকিছু আল্লাহর কাছে চাইতে বলেন। অথচ নিজেদের প্রয়োজনের সময় তারা আল্লাহর কাছে না চেয়ে চাচ্ছেন তাঁরই একজন বান্দার কাছে! দাওয়াহর সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো, মুখে মুখে না বলে আমলটা নিজেই করে দেখানো। এতে মানুষ প্রভাবিত হয়। মানার আগ্রহ জন্মে।
আল্লাহকে ভয় করে তাঁর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশা নিয়ে যে কণ্ঠস্বর দাওয়াহর আওয়াজ উচ্চকিত করে, তার সঙ্গে ওই দা'ইর তফাতটা হবে বিস্তর, যার দাওয়াহর লক্ষ্যই হলো দুনিয়া কামানো। টাকার পেছনে তিনি যখন ছুটবেন, কথা বলবেন টাকার বিনিময়ে, তখন তিনি টাকার কাছে বিক্রিত পণ্য। সত্য বলার কণ্ঠস্বর তখন স্তিমিত একজন অকৃতকার্য 'জড়বস্তু'। প্রাচীন একটা প্রবাদ আছে, ভাড়াটে বিলাপকারিণী কখনোই শোকসন্তপ্ত মায়ের মতো শোকাতুর নয়। দুনিয়ায় লালসিত ব্যক্তি দাওয়াহর কাজে আন্তরিক নয় বলে খুব কম মানুষই তার কথায় প্রভাবিত হয়।[১০৩]
১০) মানুষের ধনসম্পদ থেকে দা'ইকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে: সুরাকা একপর্যায়ে রাসূল-কে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই আমার তৃণীর, এখান থেকে আপনার যতটা ইচ্ছা তির নিতে পারেন। আপনি আরও সামনের দিকে এগোলে অমুক অমুক জায়গায় আমার ভেড়ার পালের দেখা পাবেন। প্রয়োজনমাফিক আপনার যতটা ভেড়া নিতে মন চায়, নিতে পারেন। রাসূল-এর মতো রুচিবান একজন ব্যক্তিত্ব সবিনয়ে সুরাকার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তাকে বলেন, এর কোনোকিছুরই আমার প্রয়োজন নেই।[১০৪]
অন্যের সম্পদের লোভ থেকে দা'ই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে পারলে এই কারণেই মানুষ তাকে ভালোবাসবে, আপন করে নেবে। চিত্রটা যদি বিপরীত হয়, অর্থাৎ অন্যের সম্পদের ওপর তার লোভাতুর চোখ থাকে, তাহলে ভালোবাসা দূরে থাক, মানুষ তাকে ঘৃণা করবে, তার থেকে পালিয়ে বাঁচবে। আল্লাহর পথের একজন দা'ইর জন্য এতে রয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষা।[১০৫]
১১. উন্নত প্রশিক্ষণ ও আনন্দাশ্রু:
আল্লাহর রাসূলের তারবিয়া ও প্রশিক্ষণ দানের মাত্রা কেমন ছিল, তার একটা সাক্ষাৎ প্রতিফলন মেলে আবু বাক্র ও আলির মধ্যে; আবু বাক্রের কাছে মাদীনায় হিজরাতের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করার সময় রাসূল বললেন, তাড়াহুড়ো করো না, আল্লাহ হয়তো তোমার একজন সফরসঙ্গী মিলিয়ে দেবেন। সেদিন থেকেই আবু বাক্র প্রস্তুতি গ্রহণে ও পরিকল্পনা প্রণয়নে লেগে গেলেন। হিজরাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি দুটো বাহন কেনেন। সেগুলোকে নিজের ঘরে রেখেই যত্ন- আত্তি করেন ও খাবারদাবার খাওয়ান। বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি দুটো পশুকে নিজের কাছে রেখে সুমুরের (একধরনের গাছ) পাতা খাইয়েছেন টানা চার মাস। আবু বাক্র আল্লাহ্র রাসূলের ওফাতের পর যিনি হবেন মুসলিমদের প্রথম খলীফা, তিনি অন্তর্দৃষ্টিতে ঠিকই দেখেছেন যে, হিজরাতের ক্ষণটি হবে খুবই কঠিন; আগে থেকে জানান না দিয়ে একদিন হঠাৎ করে এর আদেশ চলে আসবে। বুঝতে পেরে আর বসে ছিলেন না; লেগে যান সফরের বাহন জোগাড়ে, খাদ্য সরবরাহে। নিজের পরিবারকেও প্রস্তুত করেন আল্লাহ্র রাসূলের যেকোনো সেবার প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে।
এরপর একদিন রাসূল ﷺ এলেন। জানালেন, আল্লাহ তাকে মাক্কা ছেড়ে মাদীনায় হিজরাত করার আদেশ করেছেন। শুনে আবু বাক্র-এর কান্না আর থামে না, খুশিতে তিনি কেঁদে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে 'আয়িশা ঘটনাটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর কসম, খুশিতে কেউ এভাবে কাঁদতে পারে, ওই দিনের আগে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। মানুষের খুশির আধিক্যতা প্রকাশের ধরনটাই এমন বিচিত্র; বেশি খুশি হলে সে কেঁদে ফেলে।
আবু বাক্র সিদ্দীক ঠিকই এই সাহচর্যের মানে বুঝে ফেলেন; তিনি তখনই টের পেয়ে যান, অচিরেই বিশ্বজগতের রব মহান আল্লাহর দূতের মহিমান্বিত হিজরাতের সফরসঙ্গী হতে চলেছেন তিনি। জগতের আর কেউ না, তিনি একাই আল্লাহ্ রাসূলের সফরসঙ্গী হতে চলেছেন; নিজেকে সম্মানিতবোধ করলেন। একদিন দুদিন নয়, কমপক্ষে ১৩ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত। তার নেতা, সেনাপতি ও তার বন্ধু মুহাম্মাদ-এর জন্য একান্ত সান্নিধ্যে পাশে থাকবেন, প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দেবেন। একজন লোক পৃথিবীতে এর চেয়ে উত্তম সম্মান আর কী আশা করত পারে? তিনি তো দুনিয়ার যেনতেন কোনো লোকের সফরসঙ্গী নন। তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ, আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ-এর হিজরাতের সফরসঙ্গী। এটা চাট্টিখানি কোনো কথা নয়; গোটা দুনিয়ায় আর কারও কপালে এমন সম্মান জুটেছে?[১০৬] গুহায় অবস্থানকালে আবু বাক্র ভয় পেয়ে যান এই বুঝি মুশরিকরা দেখে ফেলল! তার এই ভয় ছিল স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায়। মুশরিকরা এখনই নিজের প্রাণবায়ু বের করে ফেলবে—এমন ভাবনা ঘুণাক্ষরেও তার মনে ঠাঁই পায়নি। জীবনের মায়া যদি তিনি করতেনই, তাহলে কখনোই এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর খড়্গ ঝুলে থাকা আল্লাহ্র রাসূলের সফরসঙ্গী হতে রাজি হতেন না। কারণ, তিনি নির্বোধ ছিলেন না। ভালো করেই জানতেন যে, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে তাকেও যদি মুশরিকরা পাকড়াও করতে পারে, তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু। জোটবদ্ধ মুশরিকরা এর চেয়ে কম মাত্রার কোনো শাস্তি দেবে না। সবকিছু জেনেশুনেই তিনি এখন আল্লাহ্র রাসূলের হিজরাতের সফরসঙ্গী। তার যত উৎকঠা আল্লাহ্র রাসূলের জীবন নিয়ে। তিনি উদ্বিগ্ন, রাসূল যদি মুশরিকদের হাতে ধরা পড়ে যান, তাহলে সদ্য প্রস্ফুটিত ইসলামের কী হবে?[১০৭]
শুধু গুহাতেই নয়, আবু বাক্র হিজরাতের সফরে পথের পুরো সময়টাই আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। পথে এক লোক তাকে জিজ্ঞেস করে বসল, আপনার সঙ্গে উনি কে? আবু বাক্র বললেন, ইনি একজন পথপ্রদর্শক; আমাকে পথ দেখান। লোকটি মনে করল, আবু বাক্র বুঝি পথ দ্বারা এখানে মরুভূমির রাস্তা বুঝাচ্ছেন; কিন্তু তিনি তো পথ দ্বারা এখানে বুঝিয়েছেন হিদায়াতের পথ, কল্যাণের পথ। তাই তো রাসূল মানবজাতিকে কল্যাণের পথেরই দিশা দেন। তিনি তো আলোর পথেরই দিশারি। আবু বাক্র এখানে কোনো মিথ্যা আশ্রয় নেননি; বরং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে হিজরাতের গোপনীয়তা রক্ষা করে লোকটার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এমনও তো হতে পারত, লোকটা আল্লাহ্ রাসূলের পরিচয় জেনে গেলে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত![১০৮] আবু বাক্র সে ঝুঁকিটা পর্যন্ত নেননি। সত্য কথা বলেই তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে লোকটার প্রশ্নের উত্তর দেন। [১০৯]
এবার আসা যাক 'আলি ইবনু আবু তালিবের কথায়। তিনিও রাসূল-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ইসলামের জন্য ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ। নেতা মুহাম্মাদ-এর গায়ে যেন একটা আঁচড়ও না লাগে, সেজন্য এগিয়ে গেলেন নিজের জীবন নিয়ে। কারণ, রাসূল যদি নিরাপদ থাকেন, তাহলে ইসলাম নিরাপদ থাকবে। আর তাঁর কোনো ক্ষতি মানে ইসলামেরই ক্ষতি। হিজরাতের রাতে আল্লাহর রাসূলের বিছানায় নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়েন তিনি। সকালবেলা তাকেই মুহাম্মাদ ভেবে কুরাইশদের সবগুলো তলোয়ার একযোগে আঘাত হানতে পারে—এমন বিপদের কথা জেনেও তিনি পরোয়া করেননি। নিশ্চিন্তে চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন আল্লাহর রাসূলের বিছানায়। তার জীবনের বিনিময়ে হলেও মুসলিম উম্মাহর নবি, আল্লাহর রাসূল নিরাপদ থাকবেন—এর চেয়ে ভিন্ন কিছু চাওয়া ছিল না।[১১০]
১২) একজন আদর্শ নেতার বৈশিষ্ট্য:
আবু বাক্র রাসূল-কে কতটা ভালোবাসতেন, হিজরাতের বিস্তৃত আলোচনায় তার একটা ঝলক আমাদের নজরে এসেছে। আল্লাহর রাসূলের সব সাহাবিই তাঁকে এমন ভালোবাসতেন। সীরাতের পরতে পরতে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। অন্তরের গহিন থেকে এ ভালোবাসা উৎসারিত ছিল। মোটেও কপট কিংবা মেকি নয়। ছিল না পার্থিব কোনো স্বার্থ উদ্ধার; কিংবা রাসূল-কে ধরে নিজের আখের গোছানোর ফন্দি। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেই রাসূল-কে তারা ভালোবাসতেন। একজন নেতার যত ভালো গুণ থাকতে পারে, তার সবই ছিল আল্লাহ্র রাসূলের মাঝে। সাহাবিরা সেগুলো নিজ চোখে দেখেছেন। তারা দেখেছেন, রাসূল জেগে থাকেন, তারা যেন ঘুমাতে পারেন। তিনি কাজ করে যান আপন মনে, যেন তারা বিশ্রাম নিতে পারেন। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে পরিতৃপ্ত করে যান তাঁর সাহাবিদের। তিনি আকাশে ধরাছোঁয়ার বাইরে জ্বলতে থাকা তারার মতো কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি তাদেরই একজন হয়ে তাদের নেতা ছিলেন; সবার সুখে সুখী যেমন সবার দুঃখেও দুঃখী। তিনি সাহাবিদের চিন্তার সমান ভাগীদার হতেন, পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের হাত। রাসূল তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে যেভাবে উত্তম আচরণ করতেন, কোনো নেতা যদি ঠিক সেভাবেই তার অনুগামীদের সঙ্গে করেন, স্রেফ আল্লাহর জন্য তাদের দুঃখে-সুখে পাশে থাকবেন, তাহলে অবশ্যই সে নেতা অধস্তন এবং অনুগামীদের থেকে এমন ভালোবাসাই পাবেন। বিশেষ করে তিনি যদি মুসলিম উম্মাহর নেতা হয়ে থাকেন, তাহলে অনুসারীদের এমন ভালোবাসা তার জন্য অবধারিত।[১১১]
অধীনদের হয়তো জোর করে কোনো কাজে বাধ্য করা যায়; কিন্তু তাদের ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তারা হয়তো তাদের নেতাকে ঘৃণা করে, ভয়ের কারণে প্রকাশ করে না। সত্যিকারের নেতা তো আসলে তিনিই, যিনি জোর করে নয়, কাজ আদায় করেন ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। নিজের উত্তম আচরণ দিয়ে জয় করেন অনুসারীদের মন। নেতা অনুসারীদের প্রতি কতটা উদার, কেমন উত্তম আচরণ করেন তাদের সঙ্গে—এর ওপরই নির্ভর করে অনুসারীর আনুগত্যের মাত্রা। অনুসারীদের জন্য তিনি নিজেকে যতটা বিলিয়ে দিতে পারবেন, ততটা ভালোবাসা পাবেন তাদের থেকে। তারা তাকে প্রাণখুলে ভালোবাসবে। আল্লাহ্র রাসূলের মতো একজন উত্তম নেতার নজির পৃথিবীতে বিরল; অনুসারী ও সাহাবিদের প্রতি তিনি একই সঙ্গে দরদি ও সমব্যথী ছিলেন। তাঁর অধিকাংশ সাহাবি নিরাপদে মাদীনায় হিজরাত করে চলে যাওয়ার পরই কেবল তিনি হিজরাত করেন। [১১২]
১৩) পথিমধ্যে বুরাইদা আল-আসলামির ইসলাম গ্রহণের ঘটনা:
পরিস্থিতি যত কঠিন হোক, বিপদ যত বড় হোক, সত্যিকার মুসলিম এগুলোকে পরোয়া করে না। আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকার ক্ষুদ্র কোনো সুযোগও তিনি অবহেলায় হারাতে চান না। প্রতিটি সুযোগ তার কাছে সুবর্ণ। মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকে সে সুযোগকে তিনি যথাযথ কাজে লাগান। আল্লাহর নবি ইউসুফ সুযোগের এমনই সদ্ব্যবহার করেছিলেন। অন্যায়ভাবে জেলের প্রকোষ্ঠে তখন তিনি বন্দি। সুন্দর আচরণে মুগ্ধ হয়ে অন্য বন্দিরা তার চারপাশে ভিড় জমায়। শুনতে চায় তার মুখের মিষ্টি বাণী। তিনি সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না। জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠ তাকে তাওহীদের দাওয়াহ দেওয়া থেকে বিমুখ করতে পারেনি। লোকদের তিনি এক আল্লাহর কথা শোনালেন। আল্লাহর সঙ্গে শিরক না করার কথা বললেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করা যাবে না—সে কথাও জানালেন। কেবল আল্লাহর সামনেই নত হতে বলেন, কোনো সৃষ্টিজীবের সামনে নয়। আল্লাহ বলেন—
এবং আমি আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করেছি। আমরা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করি না। এটা আমাদের প্রতি ও মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। হে কারাগারের সঙ্গীদ্বয়, পৃথক পৃথক অনেক প্রভু ভালো নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? আল্লাহ ব্যতীত তোমরা তো কেবল কতগুলো নামের পূজা করছ, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের বাপদাদারাই রেখেছ। আল্লাহ তো ওগুলো সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাঠাননি। কার্যকর নির্দেশ তো একমাত্র আল্লাহরই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কিছুরই উপাসনা না করো। এটাই সঠিক ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। [সূরা ইউসুফ, ১২: ৩৭-৪০]
সূরা ইউসুফ মাক্কি; আল্লাহর পথে ডাকার জন্য রাসূল-কে আল্লাহ তা'আলা আগেকার নবি-রাসূলদের পথ ও পন্থা অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন। রাসূল অক্ষরে অক্ষরে আল্লাহর আদেশ মেনে চলেছেন। মাক্কা ছেড়ে মাদীনার পথে যখন তিনি হিজরাত করছিলেন, রক্তলোলুপ খুনি মুশরিকরা পেছন পেছন ধাওয়া করে আসছে। ঘোষণা দিয়েছে, জীবিত কিংবা মৃত রাসূল-কে ধরে আনতে পারলে নগদ ১০০ উট পুরস্কার। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও রাসূল তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব ভুলে যাননি। পথে বুরাইদা ইবনুল হুসাইব আল-আসলামি নামের একজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়। লোকটির সঙ্গে তার জাতির আরও কয়েকজন ছিল। রাসূল তাদের ইসলামের পথে আহ্বান জানালে তারা বিশ্বাস করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।[১১৩]
ইমাম ইবনু হাজার আস্কলানি উল্লেখ করেন, মাদীনায় হিজরাতের পথে রাসূল বুরাইদা ইবনুল হুসাইব ইবনু 'আবদুল্লাহ ইবনু হারিস আল-আসলামির সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তাকে ইসলামের পথে আহ্বান করেন। বুরাইদা ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের একজন দা'ই বনে যান এবং পরবর্তী সময়ে তিনি আল্লাহ্র রাসূলের সঙ্গে থেকে ১৬ টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।[১১৪] তার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তার গোত্র 'আসলাম'-এর লোকদের জন্য হিদায়াতের দুয়ার খুলে দেন। তার দাওয়াহর মধ্য দিয়ে পুরো গোত্র ইসলামের দিকে আসে। রাসূল তার সম্পর্কে বলেছেন, 'আসলাম', আল্লাহ একে নিরাপদ করেছেন। 'গিফার', আল্লাহ একে ক্ষমা করেছেন। এটা আমি বলছি না। এ কথা বলছেন আল্লাহ নিজেই।[১১৫]
১৪) দুজন চোরের ইসলাম গ্রহণ:
মাদীনার কাছাকাছি একটা জায়গায় মুহানান নামের দুজন চোরকে দেখে রাসূল এগিয়ে যান। উপস্থাপন করেন ইসলামের অনুপম শিক্ষা। আল্লাহর রাসূলের কথা শুনে তারা মুগ্ধ হয়ে ইসালম গ্রহণ করেন। এরপর রাসূল তাদের নাম জানতে চান। জবাবে তারা বলেন, আমরা মুহানান (অপদস্থ)। রাসূল বললেন, না, তোমরা বরং মুক্তমান (সম্মানিত)। এরপর রাসূল তাদের দুজনকে মাদীনায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন।[১১৬] চোর দুজনের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সপ্রমাণ যে, আল্লাহর পথে দাওয়াহ দেওয়াকে রাসূল কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। চলতি পথে পাওয়া ছোট্ট একটা সুযোগও তিনি হাতছাড়া করেননি; দাওয়াতের কাজে সদ্ব্যবহার করেছেন। চোর দুজনকে ইসলামের পথে ডেকেছেন। সে ডাকে তারাও সাড়া দিয়েছেন। গ্রহণ করেছেন ইসলাম। [১১৭]
১৫) পথে আল্লাহ্র রাসূলের সঙ্গে যুবাইর ও তালহার সাক্ষাৎ:
পথে আরেকটি ঘটনা ঘটে। যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম একটি বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে শাম থেকে ফিরছিলেন। পথে দেখা হয়ে যায় আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে। রাসূল ও আবু বাক্রকে তিনি সাদা কাপড় উপহার দেন। ঘটনাটি ইমাম বুখারি উল্লেখ করেছেন।[১১৮]
সীরাতপ্রণেতারা অন্য একটি ঘটনাও নিয়ে আসেন তাদের বইয়ে। সেটা হলো, তালহা ইবনু 'উবাইদুল্লাহও হিজরাতের সে পথে তাদের দুজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তখন শাম থেকে ফিরছিলেন। কিছু কাপড় তিনিও উপহার দিয়েছিলেন।[১১৯]
১৬) শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ অপসারণে দীনের ভূমিকা:
গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করা ও শত্রুতাকে মিত্রতায় উন্নীত করার জন্য ইসলামি অনুশাসনের বিকল্প নেই। পৃথিবীর আর কোনো ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা অন্য কোনো মূল্যবোধের সাধ্য নেই, এমন একটা ভূমিকা পালন করে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা ব্যতীত জাতিতে জাতিতে ভেদাভেদ ঘোচানো কোনো কালেই সম্ভব না। বিগত কয়েকটি পরিচ্ছেদের আলোচনায় আমরা দেখেছি, ইসলাম কী করে অসম্ভব একটা কাজকে সম্ভব করেছে। আওস ও খাযরাজের মতো চিরশত্রু গোত্র দুটোকে ইসলাম একত্র করেছে। মিটিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগ চলতে থাকা তাদের ক্রুদ্ধ-যুদ্ধের ইতিহাস। যে আওস ও খাযরাজের লোকেরা মওকা পেলেই একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারাই কিনা এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসলামের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আরও দেখেছি, কীভাবে ইসলাম মাদীনার আনসার সাহাবিদের মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়; মাক্কার মুহাজিরদের সাদরে গ্রহণ করেন তারা। নেন আপন করে। পরস্পরে এমন ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান, পৃথিবীর ইতিহাস যা কেউ কোনোদিন দেখেনি, আর দেখবে কিনা সন্দেহ। সমাজে শান্তি আনয়নের অংশ হিসেবে সংস্কারকরা সাহাবিদের এই সব ভ্রাতৃত্বের উপমা পেশ করে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।
ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা মনে লালন করা এবং সে অনুযায়ী জীবনধারণের প্রচেষ্টা ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো চিন্তাচেতনা, মন্ত্র-তন্ত্র, প্রতীক সভ্যতা কার্যকর ও আদর্শ শক্তি হতে পারে না।
এখনো ইসলামি বিশ্বাসের শক্তিমত্তা ও এর প্রভাব সম্পর্কে দীনের শত্রুরা সম্যক ওয়াকিবহাল। যার ফলে তারা এই বিশুদ্ধ আকীদার শক্তিমত্তা কমিয়ে দিতে গোপনে গোপনে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। মুসলিমদের মন-মগজ থেকে দীনের প্রভাব ঝেটিয়ে বিদায় করতে তারা সাধ্যের কিছু বাকি রাখছে না। একের পর এক নতুন নামে, সুন্দর মোড়কে বিশুদ্ধ আকীদাবিরোধী বিভিন্ন মতবাদ তুলে ধরছে আমাদের সামনে। জাতীয়তাবাদ, দেশাত্মবোধের চেতনা ও সাম্প্রদায়িকতার গালভরা মন্ত্র গিলিয়ে সামগ্রিক ঐক্যের বাসনা বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা পরিবর্তন- পরিমার্জন ও বিকৃতির মিশন নিয়ে এগিয়ে চলেছে দুর্দান্ত গতিতে। নানান ফিরকা ও মতবাদ উসকে দিয়ে ইসলাম নামের দুর্গে ক্রমাগত আঘাত করে যাচ্ছে। [১২০]
১৭) রাসূল মাদীনায় পৌঁছালে সাহাবিদের আনন্দ:
রাসূল নিরাপদে মাদীনায় এসে পৌঁছেছেন। ইয়াসরিবের অধিবাসী আনসার ও মুহাজিরগণ এ খবরে যারপরনাই খুশি। ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নারী ও শিশুরা। পুরুষ সবাই কাজ ফেলে দৌড়ে আসেন রাসূল-কে সংবর্ধনা দিতে। আনন্দের এই মিছিলে ইয়াহুদিরাও এসে যোগ দেয়। তবে এটা ছিল বাহ্যিক প্রকাশ। কীভাবে আল্লাহর রাসূলের ক্ষতি করা যায়, তলে তলে সে ষড়যন্ত্রে মত্ত ছিল তারা; কিন্তু মু'মিনদের আনন্দ ইয়াহুদিদের ন্যায় মেকি বা কপট ছিল না। অনেকদিন পর আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন, এ আনন্দে তারা বিভোর। একটা জীবন তো তারা আগুনের কুণ্ডলীর কাছাকাছি ছিলেন। বাস করেছেন অন্ধকার জগতে। রাসূল-ই তাদের আগুনের কিনারা থেকে উদ্ধার করেন। অন্ধকার পথ থেকে নিয়ে আসেন পরাক্রান্ত, প্রশংসিত রবের নির্দেশিত আলোর ভুবনে। [১২১]
মাদীনায় রাসূল-কে আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের সংবর্ধনা থেকে একটা বিষয় অনুমিত হয়, আমির-উমারা ও আলিম-উলামাগণের সম্মানার্থে এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানানো যেতে পারে। এতে দোষের কিছু নেই। রাসূল-কেও আনসার ও মুহাজিরগণ এগিয়ে গিয়ে সম্মান দেখিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। তারা রাসূলকে ভালোবেসেই সম্মানপ্রদর্শন করেন এবং এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানান; কিন্তু এ সময়ে আমাদের নেতারা যেভাবে সংবর্ধনা নেন, সেটা সমীচীন নয়। রাসূলুল্লাহকে সংবর্ধনা দেওয়ার সঙ্গে এদের সংবর্ধনা দেওয়ার দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।
রাসূল-কে সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনা থেকে আরেকটি জিনিস অনুমিত হয়। উত্তম ও কল্যাণকর কাজে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করা। সম্মানিত ব্যক্তিকে, জ্ঞানী-গুণীজনকে সমীহ করার ক্ষেত্রে পরস্পরে রীতিমতো পাল্লা দেওয়া যেতে পারে। মদিনায় রাসূল আসার পর আমরা এমনই একটা চিত্র দেখি। সব গোত্রের একই আশা, রাসূল তার আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। গোত্রের পুরুষেরা বেরিয়ে আসেন আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সাহাবিদের এমন প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। [১২২]
১৮) 'ধীরে চলো' নীতি:
মাক্কা পর্বের শেষ দিকের আলোচনায় আমরা লক্ষ করে থাকব, আনসারদের প্রথম প্রতিনিধিবর্গ মক্কায় এসে পৌঁছালে রাসূল তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। ইসলামের প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা ছাড়া সে সময় তিনি আর কিছুই করেননি। প্রতিনিধিদলটি পরের বছর আবার এলেন। রাসূল এবার 'বাই'আতুন-নিসা' বা মহিলাদের আনুগত্যের শপথের ন্যায় তাদের থেকেও একই শপথ গ্রহণ করেন; ইবাদাত, সচ্চরিত্র এবং মহৎ ও কল্যাণকর কাজ সম্পাদনের শপথ। এরপর তারা আবারও মক্কায় আসেন। এবার রাসূল তাদের থেকে যে শপথটা নিলেন, ইতিহাসে সেটা আকাবাহ্র দ্বিতীয় বাই'আত নামে খ্যাত; জিহাদ-অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, দীনকে সাহায্য ও রাসূল-কে আশ্রয় দেবেন-এ মর্মে তারা আনুগত্য করেন। [১২৩]
এখানে খেয়াল করার বিষয়, তাদের থেকে জিহাদ বা যুদ্ধের শপথ গ্রহণ করার জন্য পাক্কা দুবছর সময় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটা শপথের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে তারা সময় লাগিয়েছেন টানা দুবছর। যখন তারা নিজেদের প্রস্তুত মনে করলেন, আর দেরি করলেন না, আল্লাহর রাসূলের সমীপে এসে ব্যক্ত করেন জিহাদের শপথ। এভাবে তিলে তিলে বিষয়টি পূর্ণতার দিকে গড়ায়। প্রথমদিন থেকে ইসলাম ধীরে-সুস্থে চলার যে পদ্ধতি গ্রহণ করে এগোচ্ছিল, তার সঙ্গে পূর্ণ সংগতি রেখেই সম্পাদিত হয় এই গুরুত্বপূর্ণ বাই'আত পর্ব। [১২৪]
ধাপে ধাপে চলার বিষয়টিকে আল্লাহ তাঁর নবি-এর জন্য আবশ্যক করে দিয়েছেন। রাসূল কখনোই তাঁর রবের নির্দেশিত এ পথের বাইরে হাঁটেননি। তিনি মাদীনার আনসারদের কাছে থেকে দুটো আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। একদম 'ধীরে চলো' নীতির আলোকে; তাড়াহুড়ো করে নয়। যার কারণে দুটো বাই'আতই ফলপ্রসূ ও কার্যকারিতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে; প্রথম আনুগত্যের শপথে ছিল ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষার উপস্থাপন, দ্বিতীয়টি ছিল জিহাদ অর্থাৎ ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধব্যবস্থার প্রতিজ্ঞা। কী অপূর্ব বিচক্ষণতা এবং ধারাবাহিকতা দুটোর মধ্যে; একত্রেই যেমন সব গিলিয়ে দেওয়া হয়নি, পরের জিনিসকে আগে আর আগের জিনিসকে পরে নিয়ে এসেও লেজেগোবরে করে ফেলা হয়নি।
আরেকটা জরুরি কনসেপ্ট হলো, ইসলাম ব্যতীত কোনো আদর্শ, নৈতিকতার প্রতিযোগিতা কিংবা কল্যাণের পথে প্রাণ বিসর্জনও একটি জীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গতা নয়। আনসাররা আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ধাতস্থ করেন নিজেদের ইসলামের সঙ্গে। মোটামুটি দুই বছর ইবাদাত-বন্দেগি ও মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর তারা জিহাদ করার শপথ গ্রহণ করেন।
এখানে দ্রষ্টব্য যে, ইসলাম এসেছে তাও অনেক দিন হয়ে গেল। ওই দিনের আগ পর্যন্ত রাসূল কোনো মুসলিমের কাছে থেকেই জিহাদের শপথ নেননি। মাক্কার মুসলিমদের আরবের মোড়ল কুরাইশরা যেভাবে দাবিয়ে রাখত, আনসারদের বেলায় তেমন কোনো বিপত্তি ছিল না। জিহাদের শপথ নেওয়ার জন্য ইসলাম এখানে আনসারদের মতো মানুষ পেল; এমন একটা গুরুতর দায়িত্ব গ্রহণে যাদের কোনো বাধা কিংবা পিছুটান ছিল না। ইয়াসরিবের মতো শহর জুটল, ভৌগোলিক দিক থেকে যে একটি প্রাকৃতিক দুর্গ হয়ে আগলে রেখেছিল তার জনপদকে। অন্যদিকে মক্কা তখন পর্যন্ত যুদ্ধের জন্য যথার্থ বলে বিবেচিত ছিল না। কুরাইশের কাফিরদের বেপরোয়া আচরণে সাহাবিরাও ছিলেন বিপর্যস্ত। [১২৫]
শারী'আতের বিধানদাতা আল্লাহ ভালো করেই জানেন, কখন কোন বিধান দিতে হবে; মুসলিমদের একটা ইসালমি রাষ্ট্র হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহও তাদের ওপর জিহাদ করাকে আবশ্যক করেননি। রাষ্ট্রটি হবে দুর্গসম এমন এক আবাসন, যেখানে গিয়ে তারা আশ্রয় নেবে। ইতিহাসে প্রথম এই ইসলামি রাষ্ট্রের নাম 'আল- মাদীনাতুল মুনাওয়ারাহ।'[১২৬]
আল্লাহর রাসূলের হাতে করা আনসারদের প্রথম বাই'আতের ভিত্তি ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ-এর ওপর ঈমান ও পূর্ণ আস্থা। আর দ্বিতীয় বাই'আতের ভিত্তি হলো, হিজরাত ও জিহাদ। এ তিনটি মৌলিক কাজ অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান, হিজরাত ও জিহাদের মাধ্যমে মাদীনাতে ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। আবার যদি আশ্রয়দানে আগ্রহী এমন একটা দল প্রস্তুত না থাকত, তাহলে হিজরাত করা সম্ভব হয়ে উঠত না। আর আল্লাহ কুরআনে এ তিনটি ভিত্তিকে ব্যক্ত করেছেন এভাবে—
যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে, নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদের) আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারা সবাই একে অপরের মিত্র। আর যারা ঈমান এনেছে; কিন্তু হিজরাত করেনি, তাদের প্রতি তোমাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরাত করে। আর যদি তারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তাহলে (তাদের) সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য; তবে তা এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের মৈত্রীচুক্তি রয়েছে। আর তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সব দেখতে পান। [সূরা আনফাল, ৮: ৭২]
আল্লাহ আরও বলেন—আর যারা পরে ঈমান এনেছে এবং হিজরাত করে তোমাদের সঙ্গে জিহাদও করেছে তারাও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত। আর রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়রা (উত্তরাধিকার প্রশ্নে) আল্লাহর বিধানে পরস্পরের অধিকতর হকদার। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে অবগত আছেন। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৫]
রাসূল ও সাহাবিদের মাদীনায় হিজরাতের সবশেষ পটভূমি ছিল জিহাদের শপথ। এভাবেই ইসলাম তার নিজের জন্য এমন একটি নিবাসের সন্ধান পায়, যেখান থেকে সত্যের দা'ইরা অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও কৌশলের সঙ্গে দীনের দাওয়াহ নিয়ে ছুটবেন পৃথিবীর দিদিগন্তে। সেখানে গড়ে ওঠে আল্লাহর নাযিলকৃত শারী'আতের পূর্ণ আনুগত্যসমেত ইসলামি রাষ্ট্র।[১২৭]
১৯) আল্লাহর পথে ত্যাগের অনুপম এক দৃষ্টান্ত হিজরাত:
নিজেদের পিতৃভূমি মাক্কা ছেড়ে মাদীনায় হিজরাত করাটা রাসূল ও তাঁর সাহাবিদের জন্য নিঃসন্দেহে বিরাট ত্যাগ। হিজরাতের প্রাক্কালে মক্কাকে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, তুমি আল্লাহর যমিনের শ্রেষ্ঠ অংশ এবং আল্লাহর কাছে আল্লাহর যমিনের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় তুমিই। আমাকে যদি বের করে দেওয়া না হতো, আমি কখনোই বের হতাম না।[১২৮]
'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল যখন মাদীনায় আগমন করেন, তখন সেটা আল্লাহর যমিনের মধ্যে জ্বর-উপদ্রুত একটা এলাকা। রং ও স্বাদ বিনষ্ট হওয়া লোনা পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে এখানকার উপত্যকাগুলো। তাই কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের বিভিন্ন রোগ-বালাই পেয়ে বসে। তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এসব রোগ-বালাই থেকে রক্ষা করেন। আবু বাক্র, 'আমির ইবনু ফুহাইরা ও বিলাল এক ঘরেই থাকতেন। তারাও জ্বরে আক্রান্ত হন। আমি তাদের দেখতে যেতে চাইলে রাসূল আমাকে অনুমতি দিলেন। এটা পর্দার বিধান আসার আগের ঘটনা। আমি তাদের ঘরে গিয়ে দেখি প্রত্যেকের অবস্থা খুবই সঙ্গিন; জ্বরের মাত্রা ভয়াবহ। আমি একে একে সবার কাছে গিয়ে খোঁজখবর নিলাম। জানতে চাইলাম, তারা এখন কেমন বোধ করছেন। আমার কথার উত্তর তারা ঠিকই দিয়েছেন; কিন্তু জ্বরের প্রকোপে হয়তো নিজেরাই জানেন না কী বলেছেন!
আমি তাদের অবস্থার কথা রাসূল-কে জানাই। তিনি আল্লাহর নিকট দু'আ করে বলেন, হে আল্লাহ, আমাদের কাছে মাদীনাকে প্রিয় করে দিন, যেভাবে আপনি মাক্কাকে আমাদের কাছে প্রিয় করে দিয়েছিলেন বা তা থেকেও বেশি। আপনি এখানকার জ্বর জুহফাহর দিকে স্থান্তরিত করেন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের মুদ্দ ওসা'-এ বারাকাহ দিন।[১২৯]
আল্লাহ তাঁর আল্লাহর রাসূলের ডাকে সাড়া দেন, দু'আ কবুল করেন। এরপরই মুসলিমরা জ্বর থেকে সেরে ওঠেন। মাদীনা মুহাজির ও তার কাছে আগত মেহমানদের জন্য হয়ে ওঠে নির্মল পরিবিশের অনন্য আবাসন। [১৩০]
২০) উম্মু মা'বাদকে আল্লাহ্র রাসূলের প্রতিদান:
মাদীনায় হিজরাতের পথে উম্মু মা'বাদের ওখানে আল্লাহর রাসূলের যে মু'জিযা প্রকাশ পেয়েছে, তা আমরা পেছনে আলোচনা করেছি। বর্ণিত আছে, ওই ঘটনার পর উম্মু মা'বাদের ভেড়ার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। একদিন তিনি তার বিশাল ভেড়ার পালের একটা অংশ নিয়ে মাদীনায় এসে হাজির। ওই সময় আবু বাক্র সেখান দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। মহিলার ছেলে তাকে দেখেই চিনে ফেলেন। মাকে বলেন, মা, ওই দিন কল্যাণময় লোকটির সঙ্গে যে ব্যক্তি ছিলেন, ইনিই সে লোক।
উম্মু মা'বাদ এগিয়ে যান আবু বাক্রের দিকে। গিয়ে বলেন, হে আবদুল্লাহ (কারও নাম না জানলে আরবরা সবাই এই নামেই সম্বোধন করে), আপনার সঙ্গে ওদিন যিনি ছিলেন, তিনি কে?
আবু বাক্র তাঁকে পালটা প্রশ্ন করেন, আপনি কি বুঝতে পারেননি, তিনি কে?
উম্মু মা'বাদ বলেন, না।
আবু বাক্র রা. বললেন, তিনি আল্লাহর নবি। এরপর আবু বাক্র তাকে নিয়ে আল্লাহ্র রাসূলের কাছে আসেন। রাসূল তাকে খাবার খাওয়ালেন এবং দিয়েও দিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, এরপর তিনি আমার সঙ্গে রওনা দিলেন এবং রাসূল-কে আরবের বিখ্যাত একটা পণ্য হাদিয়া দিলেন। রাসূলও তাকে কাপড় উপহার দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি ও তার স্বামী হিজরাত করেন। তার ভাই খুনাইসও ইসলাম গ্রহণ করেন। মাক্কা বিজয়ের দিন তিনি শহিদ হন। [১৩১]
২১) আবু আইয়ুব আল-আনসারির আতিথেয়তা:
আবু আইয়ূব আল-আনসারি বলেন, মাদীনায় আসার পর রাসূল আমার বাড়িতেই মেহমান হিসেবে অবস্থান করেন। তিনি থাকতেন নিচ তলায় আর আমি ও আইয়ূবের মা ওপরের তলায়। আমি রাসূল-কে বললাম হে আল্লাহর নবি, আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আমি এটাকে ঘৃণা করি এবং বড় ধরনের ধৃষ্টতা মনে করি যে, আপনি নিচে অবস্থান করছেন আর আমি কিনা ওপরে! আপনি ওপরে উঠে আসুন এবং সেখানেই অবস্থান করুন। আমরা নিচে নেমে আসি। রাসূল বললেন, হে আবু আইয়ূব, বাসার নিচ তলায় অবস্থান করাটা আমাদের যেমন সহজ, তেমনই সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্যও সুবিধা। একদিন আমাদের পানিভর্তি বড় একটা মটকি ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি ও আইয়ূবের মা আমাদের এক টুকরা মখমল দিয়ে দ্রুত সব পানি শুকিয়ে ফেলি। পানি শুকানোর মতো আমাদের কাছে অন্য কিছু ছিল না বিধায় এই ব্যবস্থা। ভীষণ ভয় হচ্ছিল, পানির ফোঁটা গড়িয়ে নিচে আল্লাহর রাসূলের গায়ে পড়ে তাকে কষ্ট দেবে। [১৩২]
২২) আলি ইবনু আবু তালিবের হিজরাত:
রাসূল তাঁর নিকট গচ্ছিত রাখা লোকদের মালামাল হিজরাতের রাতে 'আলি-এর হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আসেন। 'আলি যথাযথভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন; যার যার মাল তার তার কাছে বুঝিয়ে দেন। এরপর তিনি সময়-সুযোগ করে মাদীনার উদ্দেশে হিজরাত করেন। রাসূল কুবায় গিয়ে পৌঁছানোর দুই কি তিন রাত পর 'আলি কুবায় গিয়ে পৌঁছেন; সেখানেই তিনি আল্লাহর রাসূলের সাক্ষাৎ পান। দুই রাত কাটানোর পর আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে জুমার দিনে মাদীনার উদ্দেশে রওনা দেন। [১৩৩]
কুবায় অবস্থানকালে 'আলি একটা অবাক করা বিষয় লক্ষ করেন। দেখেন, এক অবিবাহিত লোক গভীর রাতে একজন মুসলিম নারীর দরজায় এসে কড়া নাড়ছেন। দরজা খুলে যায়। বেরিয়ে আসেন সে নারী। লোকটি তার হাতে কী যেন একটা তুলে দেন। তিনি সেটা গ্রহণ করেন। 'আলি বলেন, লোকটার ব্যাপারে আমার সন্দেহ জাগে। আমি মহিলার কাছে গিয়ে জানতে চাই, হে আল্লাহর বান্দি, কে এই লোক, যিনি প্রতি রাতে তোমার দরজায় আসেন? কিন্তু তুমি তো একজন মুসলিমাহ। উপরন্তু তোমার এখনো বিয়েশাদি হয়নি! উত্তরে মহিলা বললেন, লোকটার নাম সাহল ইবনু হুনাইফ ইবনু ওয়াহাব। কীভাবে যেন তিনি জানতে পারেন, আমি একাকী থাকি, আমার আর কেউ নেই। তাই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তার জাতি পূজা- অর্চনা করে চলে যাওয়ার পর তিনি সে মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন। তারপর ভাঙা টুকরাগুলো আমাকে এনে দেন জ্বালানির কাজে ব্যবহার করার জন্য। পরবর্তীকালে 'আলি যখন ইরাকে অবস্থান করছিলেন তখন সেখানেই তার কাছে সাহল ইবনু হুনাইফ মারা যান। [১৩৪]
২৩) মানব ইতিহাসে আল্লাহ্র রাসূলের হিজরাতের গুরুত্ব:
মাক্কা থেকে মাদীনায় আল্লাহর রাসূলের হিজরাত এমন একটি মহান ঘটনা, যা ইতিহাসের গতিধারা পালটে দেয়। ঝিমিয়ে পড়া জীবন ও জীবনপ্রণালি আবার জেগে উঠে। এই হিজরাতের কারণেই ব্যক্তি ও সমাজ আবার প্রাণ ফিরে পায়। [১৩৫]
২৪) নবি-রাসূলগণের এক অমোঘ নিয়তি হিজরাত:
আল্লাহর পথে, আল্লাহর জন্য হিজরাত করার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়; প্রাচীনকাল থেকেই এই রীতি চলে আসছে। হিজরাতের ইতিহাসে মুহাম্মাদ-এর বসতভিটা ছেড়ে যাওয়া প্রথম ঘটনা নয়। ইতঃপূর্বে তাঁর ভাই অন্যান্য নবি- রাসূলগণও আল্লাহর জন্য হিজরাত করেছেন। যে জন্য নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানো, হিজরাত করে পেছনকে ফেলে আসা, প্রতিটি যুগেই সেটার কারণ একই ছিল—দীনের অনুসারীদের মুশরিকদের হাত থেকে রক্ষা করা এবং দাওয়াহর কাজ সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়া। সেজন্য তারা নিরাপদ ও দীনের কাজে উর্বর এমন একটা দেশে হিজরাত করে পাড়ি জমিয়েছেন, যে দেশ তাদের দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করেছে। স্থানীয় অধিবাসীরা দীনের দাওয়াহ্ ডাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে।
আমরা এতক্ষণ আল্লাহর রাসূলের মহান হিজরাতের অনুপম কিছু শিক্ষা নিয়ে নিবিড় আলোচনা করেছি। এ মহান ঘটনার সব শিক্ষা আমরা এখানে নিয়ে আসতে পেরেছি—এমন অবান্তর দাবি করব না। মান্যবর পাঠক, আপনি যখন বিবরণটি পড়ছেন, আপনার মাথায় হয়তো হিজরাতের নতুন একটা শিক্ষার চিন্তা আসতে পারে, যা আমার মাথায় আসেনি। সে শিক্ষা থেকে আপনি উপকৃত হবেন। পাশের মুসলিম ভাইকে জানান, তিনিও হয়তো আপনার এ চিন্তা থেকে পথ চলার উত্তম পাথেয় পেয়ে যাবেন। [১৩৬]
টিকাঃ
৮৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৯৯
৮৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০
৮৯. আল-আসাসু ফিস-সুন্নাহ, সাঈদ হুয়ি, ১/৩৫৭
৯০. ফিস-সীরাতিন নাবাউয়্যাহ কিরাআতু লিজাওয়ানিবিল হাযরি ওয়াল হিমায়াহ, পৃ. ১৪১
৯১. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৪৭
৯২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৬১
৯৩. আযওয়াউ আলাল হিজরাতি, তাওফীক মুহাম্মাদ, পৃ. ৩৯৩-৩৯৭
৯৪. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৪৮
৯৫. আল-মুস্তাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/১০৮
৯৬. প্রাগুক্ত
৯৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০৬
৯৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬
৯৯. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ২/১০২, সনদ সহীহ।
১০০. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৮
১০১. ফিকহুস সীরাহ, ড. বৃতি, পৃ. ১৯৩
১০২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৬৪
১০৩. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৪৮-১৪৯
১০৪. আল-মুসনাদ, আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির তাহকীককৃত ১/৩, হাদীস নং ৩, সনদ সহীহ।
১০৫. ফি যিলালিল হিজরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৫৮
১০৬. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/১৯১, ১৯২
১০৭. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, দুরুস ওয়া 'ইবরুন, আস-সাবাঈ, পৃ. ৭১
১০৮. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০৪
১০৯. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ২৫৪
১১০. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আস-সাবাঈ, পৃ. ৬৮
১১১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ৫৪
১১২. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০৫
১১৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ৫৯; শারহুল মাওয়াহিব, ১/৪০৫
১১৪. আল-ইসালাহ, ১/১৪৬
১১৫. সাহীহ আল-জামিউস সাগীর, ১/৩২৮, হাদীস নং ৯৮৬
১১৬. আল-ফাতহুর রাব্বানি, আস-সাআতি, ২০/ ২৮৯; আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৬৬৯১; আল-মুজমা, হাইসামি, ৬/৫৮, ৫৯
১১৭. আত-তারীখুল ইসলামি, আল-হামিদি, ৩/১৭৮
১১৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৫, বুখারি, হাদীস নং ৩৯০৬
১১৯. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৫, সাহীহ আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১৮১
১২০. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ৪০৫
১২১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আস-সাবাঈ, পৃ. ৪৩; আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৬৭
১২২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ৩৫৮, ৩৫৯
১২৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০২
১২৪. বানাউল মুজতামাঈল ইসলামিয়্যি ফি 'আসরিন নাবাউয়্যাহ, মুহাম্মাদ তাওফীক, পৃ. ১১৯
১২৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২, ১২৩
১২৬. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ১৭২
১২৭. আল-গুরাবাউল আউয়ালুন, পৃ. ১৯৮, ১৯৯
১২৮. তিরমিযি, মানাকিব অধ্যায়, মাক্কার ফজিলত পরিচ্ছেদ, ৫/৭২২, হাদীস নং ৩৯২৫, হাদীস সহীহ।
১২৯. বুখারি, দাওয়াহ অধ্যায়, হাদীস নং ৬৩৭২; বুখারি, হাদীস নং ১৮৮৯
১৩০. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/৩১০
১৩১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৮৯, ৪৯০
১৩২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, উমারি, ১/২২০
১৩৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৭
১৩৪. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, মুহাম্মাদ সাদিক উরজুন, ২/৪২১
১৩৫. প্রাগুক্ত, ২/৪২৩
১৩৬. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৭৫
📄 মুহাজিরদের পুরস্কার ও পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি ধমক
নবি -এর মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাতের বৃত্তান্তটি ইসলামের ইতিহাসে মহান এক ঘটনা। শুধু ইসলাম কিংবা আরব নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের বয়ে চলা গতিধারাও পালটে দেয় এই হিজরাত; এর আগ পর্যন্ত মাক্কার মুসলিমরা শুধু দাওয়ার কাজ করতেন। সে সময় এমন কোনো রাজনৈতিক পরিকাঠামো তাদের ছিল না, যা ইসলামের দা'ইদের সুরক্ষা দিতে পারে। রুখে দেবে শত্রুদের আক্রমণ।
কিন্তু হিজরাতের পর মুসলিমদের একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রটির মূল কাজই হয়ে ওঠে দিকে দিকে ইসলামের সুমহান দাওয়াহকে ছড়িয়ে দেওয়া; আরব উপদ্বীপের ভেতরে এবং বাইরে। দা'ইদের পাঠিয়ে দেয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। দায়িত্ব নেয় এদের সুরক্ষার ও শত্রুদের প্রতিহত করার। এ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য যদি যুদ্ধও করতে হয়, তাতেও রাষ্ট্রটি প্রস্তুত। [১৩৭]
এ তো গেল এক দিক। কুরআন বোঝা এবং এ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করার বেলায়ও নবি -এর হিজরাতের গুরুত্ব অপরিসীম। 'আলিমগণ পুরো কুরআনকে মাক্কি ও মাদানি এ দুভাগে ভাগ করেছেন; ওই সূরাগুলোকে মাক্কি বলা হয়, যা হিজরাতের পূর্বে নাযিল হয়েছে, যদিও সেটা মক্কায় না হয়। আর হিজরাতের পরে নাযিল হওয়া সূরাগুলোকে বলা হয় মাদানি। সেটা যে স্থানেই অবতীর্ণ হয়ে থাকুক। সূরাগুলো মাক্কি ও মাদানিতে বিন্যস্ত হওয়ায় যেসব শিক্ষণীয় দিক রয়েছে, তা হলো:
১) কুরআনের অনুপম উপস্থাপনশৈলীর স্বাদ আস্বাদন এবং দাওয়াহ দেওয়ার বেলায় তার প্রয়োগ ঘটানো।
২) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে হিজরাতের ঘটনা অনুধাবন করা: [১৩৮] হিজরাতের গুরুত্ব অপরিসীম; সন্দেহ নেই। আমরা দেখি কুরআন মু'মিনদের আল্লাহর পথে হিজরাত করার ব্যাপারে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে; কখনো মুহাজিরদের প্রশংসা করে, কখনো বা তাদের পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আবার কখনো হিজরাত না করে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সতর্ক করার মাধ্যমে। [১৩৯]
কুরআনে মুহাজিরদের প্রশংসা: যেসব গুণে গুণান্বিত করে কুরআনে মুহাজিরদের প্রশংসা করা হয়েছে: [১৪০]
১) নিষ্ঠা: আল্লাহ বলেন- (এ সম্পদ) দেশত্যাগী (মুহাজির) গরিবদের জন্য, যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশ্র, ৫৯: ৮] আয়াতের يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَরিضْوَانًا অংশটি প্রমাণ করে যে, মুহাজিররা কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ ছেড়ে আসেননি। স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই পথে হিজরাত করেন।[১৪১]
২) ধৈর্য: আল্লাহ বলেন- নির্যাতিত হওয়ার পর যারা আল্লাহর জন্য হিজরাত করেছে, দুনিয়ায় আমি তাদের উত্তম বাসস্থান দেবো। আর আখিরাতের পুরস্কার তো আরও বড়, যদি তারা জানত! (এরা তারাই) যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪১,৪২]
৩) সততা: আল্লাহ বলেন—
(এ সম্পদ) দেশত্যাগী (মুহাজির) গরিবদের জন্য, যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে, তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশর, ৫৯: ৮]
ইমাম বাগাউই তার বিখ্যাত তাফসীরে ‘তারা সত্যবাদী’ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ তারা তাদের ঈমানে সত্যবাদী। [১৪২]
৪) জিহাদ ও ত্যাগ-তিতিক্ষা: আল্লাহ বলেন—
যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
আয়াতটিতে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, আল্লাহর পথে জিহাদ ও ত্যাগ- তিতিক্ষা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া জিহাদের কল্পনাই করা যায় না। [১৪৩]
৫) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করা: আল্লাহ বলেন—
এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশর, ৫৯:৮]
৬) আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা: আল্লাহ বলেন—
যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪২]
৭) আশা-আকাঙ্ক্ষা: আল্লাহ বলেন—
যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরাত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা সবাই আল্লাহর দয়া কামনা করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা বাকারাহ, ২: ২১৮]
আয়াতে يَرْجُونَ (তারা কামনা করেন) বলে মুহাজিরদের প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করার পরেও পৃথিবীতে কেউই হলফ করে বলতে পারবে না যে, তার জন্য জান্নাত অবহারিত। দুটি কারণে—এক, কারও জানা নেই অন্তিম মুহূর্তটা তার কীসের ওপর হবে; ঈমান না কুফুরি? দুই, সৎকাজ করছে বলে মনে ফুরফুরে কোনো আমেজও আনা যাবে না। এমন ভাব করা যাবে না যে, তার সৎকাজ অবশ্যই তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। তবে মুহাজির সাহাবিদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর দয়া ও কৃপার আশা করতেন। এটা তাদের ঈমান বৃদ্ধিরই লক্ষণ। [১৪৪]
৮) দুর্দিনেও আল্লাহ্র রাসূলের আনুগত্য: আল্লাহ বলেন—
আল্লাহ দয়াপরবশ নবির প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সংকটের সময়ে তার অনুসারি হয়েছিল, তাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল হয়েছেন, যখন ইতোমধ্যেই তাদের মধ্যে একটি দলের মনে (এ ব্যাপারে) বিভ্রান্তি সৃষ্টির উপক্রম হয়েছিল, অতঃপর তিনি তাদের ক্ষমাও করে দিয়েছিলেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা, ৯: ১১৭]
তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আয়াতটি নাযিল হয়। মুফাস্স্সির কাতাদা বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় সাহাবিগণ শাম অভিমুখে রওনা হন। তখন প্রচণ্ড গরম পড়ছিল। এমন খরা রোদে তাদের খুব কষ্ট হয়। এরপর একটা পর্যায়ে গিয়ে এমন অবস্থাও হয় যে, দুজন সাহাবিকে মাত্র একটা খেজুরও ভাগ করে খেতে হয়েছিল। [১৪৫]
৯) ঈমান ও সৎকাজে অগ্রগামীদের নেতৃত্ব অর্জন: আল্লাহ বলেন—
প্রথমদিকের মুহাজির ও আনসারদের প্রতি এবং তাদের যথার্থ অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাই আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এটাই তো বড় সাফল্য। [সূরা তাওবা, ৯: ১০১]
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযি বলেন, মর্যাদা পেতে হলে অগ্রগামী হওয়া চাই। এমন ভালো কাজে অগ্রগামিতার জন্য তাদের অনুসরণ আবশ্যক। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুহাজিররাই মুসলিমদের নেতা ও তাদের সর্দার। [১৪৬]
১০) সফলতা: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
আবু সউদ তার তাফসীরে বলেন, আল্লার বাণী, أُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ 'তারাই সফলকাম' অর্থাৎ একটা মহান সফলতা প্রাপ্তির জন্য তারা বিশেষভাবে যোগ্য। কেমন যেন অন্যদের সাফল্য মুহাজিরদের সফলতা প্রাপ্তির ধারে কাছেও নেই।[১৪৭]
১১) ঈমান: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদের) আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই হচ্ছে সত্যিকার মু'মিন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৪]
মুহাজিরদের জন্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি: মুহাজিরদের আল্লাহ পৃথিবীতে ও পরকালে যে যে নি'আমাহ ও অনুগ্রহ দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কুরআনে সেগুলো বিধৃত হয়েছে এভাবে:
১) দুনিয়াতে আল্লাহ তাদের রুটিরুজিতে প্রশস্ততা দান করবেন: আল্লাহ বলেন— যে আল্লাহর পথে হিজরাত করে, সে পৃথিবীতে অনেক আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশে হিজরাত করে নিজের ঘর থেকে বের হয়, তারপর (হিজরাতে থাকা অবস্থায়) মারা যায়। তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, দয়াময়। [সূরা নিসা, ৪: ১০০]
ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) ও গানীমাত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দিয়ে আল্লাহ মুহাজিরদের দুনিয়াতে রিজিকের প্রশস্ততা দান করেন। রিজিকে তাদের এমন প্রশস্ততা দেওয়ার কারণও আছে। তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য নিজেদের ভিটেভূমি ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সুতরাং এমন সম্পদ পাওয়ার হকদার তো এরাই।[১৪৮]
২) তাদের পাপ মোচন: আল্লাহ বলেন— অতঃপর তাদের রব তাদের দু'আ কবুল করে বলেন, তোমাদের কারও কাজ আমি নষ্ট করি না (বিফলে যেতে দিই না), সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ। তাই যারা হিজরাত করেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, আমার পথে নিপীড়িত হয়েছে এবং (আমার পথে) যুদ্ধ করেছে ও শহিদ হয়েছে, আমি তাদের খারাপ কাজগুলো (আমালনামা থেকে) মুছে দেবো এবং তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পুরস্কার। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম পুরস্কার। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৯৫]
হিজরাত পাপ মোচনের বড় একটা মাধ্যম—এমন ধারণাই মেলে আল্লাহর রাসূলের বহু হাদীসে।
৩) রবের নিকট তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
শারীরিক ও আর্থিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে যারা হিজরাত ও জিহাদ করেছেন, প্রকৃত অর্থে তারাই পদের দিক থেকে ও সম্মানের দিক থেকে মহান। [১৪৯]
৪) জান্নাতের সুসংবাদ: আল্লাহ বলেন— তাদের প্রতিপালক তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাঁর দয়া, সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের, যেখানে তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী সুখের ব্যবস্থা। সেখানে তারা চিরকাল বাস করবে। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে রয়েছে এক মহান পুরস্কার। [সূরা তাওবা, ৯: ২১-২২]
মুহাজিরদের অনবরত কষ্ট সহ্য করার দরুন আল্লাহ তাদের সঙ্গে যেসব সাওয়াব ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বিধৃত হয়েছে আয়াতটিতে।[১৫০]
হিজরাত না করে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সতর্কীকরণ: আল্লাহ বলেন—
নিজেদের প্রতি জুলুমকারী (হিজরত না করা) অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তাদের তারা প্রশ্ন করে, তোমরা কোন অবস্থায় ছিলে? উত্তরে তারা বলে, আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ছিলাম। তারা বলে, আল্লাহর যমিন কি তোমাদের হিজরাত করার মতো প্রশস্ত ছিল না? তাই এসব লোকের নিবাস হলো জাহান্নাম, সেটা বড় খারাপ ঠিকানা! [সূরা নিসা, ৪: ৯৭]
ইবনু 'আব্বাস বলেন, মাক্কাবাসীদের একটা জাতি ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে ইসলাম গ্রহণের কথা তারা গোপন রাখতেন। এরপর একটা সময় এলো, যখন মুশরিকরা তাদের সঙ্গে বদর প্রান্তরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাদের কেউ কেউ নিহত হয়। তখন মুসলিমরা বলাবলি করতে লাগল, নিজেদের প্রতি জুলুমকারী অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তাদের তারা প্রশ্ন করে, তোমরা কোন অবস্থায় ছিলে? তখন পর্যন্ত মুসলিমদের যে কয়জন খোঁড়া অজুহাতে হিজরাত না করে মক্কায় থেকে যান, তাদের পরিপ্রেক্ষিতেই আয়াতটি নাযিল হয়। মুশরিকরা তাদের একলা পেয়ে যারপরনাই নির্যাতন করে। তখন নিচের আয়াতটি নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি; কিন্তু যখন তারা আল্লাহর পথে নিপীড়িত হয়, তখন মানুষের নিপীড়নকে আল্লাহর শাস্তির ন্যায় গণ্য করে। আর যখন তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য (বা বিজয়) আসে, তখন তারা বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম। আল্লাহ কি বিশ্বাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন? [সূরা 'আনকাবূত, ২৯: ১০]
সাহাবিরা আয়াতটি মাক্কায় অবস্থানরত মুসলিমদের কাছে লিখে পাঠায়। তারা বেরিয়ে পড়ে এবং ভাবে যে, তারা সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে। এরপর তাদের প্রেক্ষিতে আরেকটি আয়াত নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
যারা নির্যাতন ভোগের পর হিজরাত করেছে, তারপর জিহাদ করেছে ও ধৈর্য ধরেছে, তাদের জন্য এসবকিছুর পরে অবশ্যই তোমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা নাহল, ১৬: ১১০][১৫১]
হিজরাত না করে যারা পেছনে থেকে গেছে, আল্লাহ তাদের 'নিজেদের প্রতি জুলুমকারী' বলে অভিহিত করেছেন। এ আয়াতে জুলুম বলতে বোঝানো হচ্ছে, যারা ইসলাম গ্রহণের পরেও দারুলকুফ্র বা কাফিরদেশে থেকে গেছেন, মাদীনায় হিজরাত করেননি, কার্যত তারা হিজরাত ছেড়ে দিয়ে নিজেরদের ওপর অন্যায় করেছেন।[১৫২]
পরের আয়াতে এমন লোকদের ধমকি দেওয়া হয়েছে। তাদের পরকালের ঠিকানা বড়ই খারাপ বলে নিন্দামন্দ করা হয়েছে।
এরপর সাহাবিরা আল্লাহর আদেশ শিরোধার্যরূপে মেনে নেন। হিজরাত করেন মাদীনায়। আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন করেন। এমন ধমক তাদের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। মনে সারাক্ষণ আল্লাহর ভয় কাজ করে। দামরাহ ইবনু জুনদুব নামের একজন সাহাবির কাছে যখন কুরআনের এই আয়াতটি গিয়ে পৌঁছে, إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ—ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তখন তিনি মাক্কায় অবস্থান করছিলেন। ছেলেদের ডেকে বলেন, তোমরা আমাকে নিয়ে চলো। আমি দুর্বল নই। আমি পথ পেয়ে গেছি। আর একটা রাতও মাক্কায় থাকতে চাই না। ছেলেরা তাকে একটা খাটে তুলে নিয়ে মাদীনা অভিমুখে রওনা হন। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। নিজের গণ্ডদেশকে ডানদিক থেকে বামদিকে ঘুরিয়ে দেন এবং বলেন, হে আল্লাহ, এটা আপনার জন্য এবং আপনার আল্লাহর রাসূলের জন্য। আপনার রাসূল যেসব বিষয়ে আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন, সেসব বিষয়ে আমি আপনার নিকট শপথ করছি। খাইবার এলাকায় আসার পর তিনি মারা যান। ছেলেরা বলছিল, হায় তিনি যদি মাদীনায় মারা যেতেন! তখন এই আয়াত নাযিল হয়;[১৫৩] আল্লাহ বলেন—
দুর্বল নরনারী ও শিশুরা ব্যতীত; যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথেরও সন্ধান পায় না। আশা আছে, আল্লাহ এদের মার্জনা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। [সূরা নিসা, ৪: ৯৮, ৯৯]
আয়াতগুলো আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি যত খারাপই হোক, প্রথম প্রজন্মের সাহাবিরা আল্লাহর আদেশ পালনে এবং সেটা বাস্তবায়নে খুবই একনিষ্ঠ ও কর্মঠ ছিলেন। কোনো ধরনের অজুহাত দাঁড় করাতেন না। কোনো সুযোগ খুঁজতেন না।
কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, দামরাহ ইবনু জুনদুব হিজরাত না করে মক্কায় থেকে যান। তার যৌক্তিক কারণও ছিল। তিনি ছিলেন অসুস্থ।[১৫৫] কিন্তু হিসাবনিকাশ করে তিনি দেখলেন, তার তো সম্পদ আছে। তিনি এর সাহায্য নিলেন। খাটিয়ায় চড়ে রওনা দেন মাদীনার দিকে। এতদিন যে কারণে মক্কায় পড়ে ছিলেন, ভাবলেন সেটা কোনো গ্রহণযোগ্য কারণই না। এমন চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় তার এ অজুহাত। প্রমাণ হয় তার ঈমান ও একনিষ্ঠতার।[১৫৬]
আল্লাহ বলেন—দুর্বল নরনারী ও শিশুরা ব্যতীত; যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথেরও সন্ধান পায় না। আশা আছে, আল্লাহ এদের মার্জনা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। [সূরা নিসা, ৪: ৯৮, ৯৯]
টিকাঃ
১৩৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ আবু ফারিস, পৃ. ১৩
১৩৮. মুবাহাসু ফি উলুমিল কুরআন, আল-কাতান, পৃ. ৫৯
১৩৯. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৮৪
১৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫
১৪১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬
১৪২. তাফসীর আল-বাগাউই, ৪/৩১৮
১৪৩. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১০৬
১৪৪. আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ৩/৫০; তাফসীরু আবিস সাউদ, ১/২১৮
১৪৫. তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩৯৭
১৪৬. তাফসীরুর রাযি, ১৫/২০৮
১৪৭. তাফসীরু আবিস সাউদ, ৪/৫৩
১৪৮. তাফসীর ইবন কাসীর, ৪/২৯৫; তাফসীরু আবিস সাউদ, ৮/২২৮; তাফসীরু ফাতহিল কাদীর, ৫/২০০; আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৩২
১৪৯. তাফসীরুল মারাগি, ১০/৭৮; তাফসীরুর রাযি, ১৬/১৩, ১৪
১৫০. হিজরাতুর রাসূলি ওয়া সাহাবাতিহি ফিল কুরআনি ওয়াস সুন্নাতি, আল-জামাল পৃ. ৩৩২, ৩৩৩
১৫১. যাদুল মাসীর, ইবনুল জাওযি, ২.৯৭, তাফসীর আল-কাসিমি, ৩/৩৯৯
১৫২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৬১
১৫৩. রুহুল মাআনি, আলুসি ৫/১২৮, ১২৯; আসবাবুন নুযূল, আল-ওয়াহিদি, পৃ. ১৮১
১৫৪. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৪
১৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫
১৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬