📘 রউফুর রহীম 📄 রাসূল সা.-কে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র

📄 রাসূল সা.-কে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র


সব ধরনের কুৎসিত শক্তির দাপট প্রদর্শন ও নোংরা অপচেষ্টা চালানোর পরও যখন মুশরিক-কুরাইশরা সাহাবিদের মাদীনায় হিজরাত থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি, তখন নিজেদের অবস্থার ভঙ্গুরতা তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে যায়। দু ধরনের আশঙ্কা তাদের পেয়ে বসে; রুটিরুজির বন্দোবস্ত করার জন্য তাদের বছরে দুটি বাণিজ্যিক সফর করতেই হয়। মাদীনার পাশ দিয়েই সমস্ত সামানাপত্তর আর লোক-লস্করের বহর নিয়ে যাতায়াত করতে হয়, দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই। যেহেতু মাদীনা এখন মুসলিমদের হাতে, তাদের আশঙ্কা—মুসলিমরা সুযোগ বুঝে হামলে পড়বে তাদের বহরে। দ্বিতীয় যে আশঙ্কা তাদের মনে দানা বাঁধে, সারা আরবে, আরব উপদ্বীপে, কুরাইশদের যে একচ্ছত্র মোড়লিপনা চলে আসছিল এতদিন ধরে, তা বুঝি শেষ হতে চলল। দিশেহারা হয়ে বর্তমান কর্তব্য ঠিক করার জন্য নেতারা গিয়ে জমায়েত হয় তাদের পরামর্শগৃহ ‘নাদওয়ায়’; কীভাবে মুসলিমদের অবিসংবাদিত নেতা মুহাম্মাদ ﷺ-কে আটকানো যায়, সে নিয়ে চলে আলোচনা। তাদের ষড়যন্ত্র পাকানোর এ কথা আল্লাহ কুরআনে এভাবে উল্লেখ করে বলেন—
(স্মরণ করো) যখন কাফিররা তোমাকে বন্দি করার জন্য অথবা হত্যা করার জন্য কিংবা (মাতৃভূমি থেকে) বের করে দেওয়ার জন্য তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল; আল্লাহও কৌশল করছিলেন। আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী। [সূরা আনফাল, ৮: ৩০]
আয়াতটির ব্যাখ্যায় সাহাবি ইবনু ‘আব্বাস বলেন, কুরাইশরা মাক্কার পরামর্শগৃহে একে একে পরামর্শ দিতে থাকে। তাদের কেউ কেউ বলল, সকাল হলে গলায় শিকল পরিয়ে তাঁকে আটকে রাখো। অন্য কয়েকজন দ্বিমত পোষণ করে বলল, না, বরং তাঁকে হত্যা করো। বাকিরা বলল, না তা-ও না, এর চেয়ে ভালো তোমরা তাকে বের করে দাও। শেষ পর্যন্ত হত্যা করার সিদ্ধান্তই গৃহীত হলো। আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্রের আদ্যোপান্ত তার নবি-কে অবহিত করেন। সে রাতে আলি আল্লাহর রাসূলের বিছানায় শুয়ে পড়েন।[৫৯] আর রাসূল ঘর থেকে বেরিয়ে যান। সকাল বেলায় মুশরিকরা আল্লাহ্র রাসূলের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। গিয়ে তো তাদের চক্ষু ছানাবড়া; সেখানে রাসূল ﷺ নেই। তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন আলি। আলিকে দেখেই তারা বুঝে ফেলে আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্রের কথা মুহাম্মাদ-কে জানিয়ে দিয়েছেন। আলিকে উদ্দেশ্য করে তারা বলে, তোমার এ সাথি কোথায়? আলি সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন, আমি জানি না। সুতরাং রাসূল-কে ঘরে না পেয়ে তাঁর পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তারা পাহাড়ের কাছে এসে থামে; কিন্তু এখানে এসে তারা দ্বিধায় পড়ে যায়। আশপাশের সবকিছু আরও ভালো করে দেখার জন্য এবার তারা পাহাড়ে গিয়ে ওঠে। এরপর একটা গুহার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পায় মাকড়সা গুহার মুখে বসে বসে জাল বুনছে। নিজেরাই বলে উঠল, তিনি যদি এখানে প্রবেশ করতেনই, তাহলে তো গুহার মুখে মাকড়সার জাল থাকার কথা না। অথচ রাসূল ﷺ সেই গুহার ভেতরেই ছিলেন এবং সেখানে তিনদিন অবস্থান করেন।[৬০]
রাসূল-কে নিয়ে মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের কথা বর্ণনা সংবলিত আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় প্রফেসর সাইয়িদ কুতুব বলেন, মাক্কার সার্বিক অবস্থার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আয়াতগুলো। ভবিষ্যতের দৃঢ় অবস্থানের দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে। আল্লাহ যে কাজ করেন, যে আদেশ করেন, এর পেছনে তাঁর পরিকল্পনা ও প্রজ্ঞার কথারও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় আয়াতগুলোতে...। প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা, কুরআনের প্রথম সম্বোধিত ব্যক্তিগণ মাক্কা ও মাদীনা দুটি শহরের অবস্থার কথা ভালো করেই জানতেন; এ জানাটা কারও কাছ থেকে ধার করা নয়; নিজেরা থেকেছেন, দেখেছেন এবং চলতে-ফিরতে অর্জন করা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান তাদের। বর্তমান অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মাদীনায় মুসলিমরা যে খুব নিশ্চিন্ত ও নিরাপদে আছেন—কথাটি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের নিকট অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট ছিল; কী অস্থিরতায়, কী ভয়াবহতার মধ্য দিয়েই না তারা একটা দীর্ঘ সময় পার করেছেন মাক্কায়। দাওয়াহর কাজ থেকে রাসূল-কে নিবৃত্ত করতে পদে পদে ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে, বাধা দিয়েছে। চেষ্টা করেছে রাসূল-কে মেরে ফেলার; কিন্তু আজ তারা মুশরিকদের সব বাধা ডিঙিয়ে পরিত্রাণই পায়নি কেবল, বরং তারা মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের সব পথ বন্ধ পর্যন্ত করে দিয়েছে।
মুশরিকরা ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল রাসূল-কে গলায় রশি প্যাঁচিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বন্দি করে রাখার। বুদ্ধি পাকাচ্ছিল কীভাবে রাসূল-কে হত্যা করে তাঁর প্রভাব থেকে নিস্তার পাওয়া যায়। কিংবা মাক্কা থেকে তাঁকে চিরদিনের নির্বাসনে পাঠানো যায়...। পরামর্শ সভায় মুশরিকরা দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রস্তাবিত প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলোচনা- পর্যালোচনা করে। শেষ পর্যন্ত রাসূল-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গর্হিত কাজটির জন্য তারা মাক্কার প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে সুঠামদেহী যুবককে বেছে নেয়। যেন রাসূল-কে হত্যার দায় কোনো একটি গোত্র কিংবা কোনো একক ব্যক্তির ওপর না চাপে। আল্লাহর রাসূলের বংশ বনু হাশিম সারা আরবের বিরুদ্ধে একা লড়তে পারবে না। বাধ্য হয়েই তারা আপসে আসবে; রক্তপণ নিয়েই থাকবে সন্তুষ্ট। বিষয়টি সেখানেই খতম হবে বিবেচনা করে তারা এই সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
আল্লাহর বাণী—তারাও চক্রান্ত করছিল আর আল্লাহও কৌশল করছিলেন। [সূরা আনফাল, ৮: ৩০]
কঠিন একটা চিত্র আয়াতটি চিত্রায়ণ করছে আমাদের সামনে। একই সঙ্গে সেটি ভীতিপ্রদও বটে। কী করে কৃশকায়, দুর্বল মানুষেরা মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর শক্তির সামনে দাঁড়ানোর স্পর্ধা দেখায়, যিনি তাঁর বান্দাদের ওপর এক মহাপরাক্রান্ত সত্তা। তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এবং সবকিছুকে বেষ্টন করে আছেন কেবল তিনিই।[৬১]

হিজরাতের জন্য আল্লাহ্র রাসূলের প্রস্তুতি
উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা বলেন, দিনের দুই প্রান্ত ভাগের একটিতে; সকাল কিংবা সন্ধ্যায়, আবু বাক্র-এর বাসায় রাসূল আসতেনই, কখনো ব্যত্যয় হতো না; কিন্তু যেদিন রাসূল-কে হিজরাত করতে বলা হয়, কেবল সেদিনই এ নিয়মের হেরফের ঘটে; তিনি সেদিন আমাদের কাছে এসেছিলেন দ্বিপ্রহরের কিছু পরে। সাধারণত তিনি এ সময়টাতে আসেন না। আবু বাক্র তাকে দেখেই বলে উঠলেন, 'আল্লাহর রাসূল তো সাধারণত এ সময়টাতে আসেন না, গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়েছে বলেই তিনি এসেছেন।
রাসূল ঘরে প্রবেশ করলে আবু বাক্র তাকে বসতে দিলেন। রাসূল বললেন, ঘরের লোকদের একটু দূরে যেতে বলো। আবু বাক্র বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এরা তো অন্য কেউ না, আমারই দুই মেয়ে। আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আপনার কী হয়েছে? রাসূল বললেন, আমাকে মাক্কা ছেড়ে হিজরাত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবু বাক্র জানতে চান, সাহচর্য, হে আল্লাহর রাসূল? রাসূল জানালেন, সাহচর্য। সেদিন (আমার পিতা) আবু বাক্রকে না দেখলে আল্লাহর কসম, আমি হয়তো জানতেই পারতাম না যে, খুশিতে কেউ এভাবে কাঁদতে পারে। আবু বাক্র এরপর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই উট দুটিকে এ সফরের জন্যই আমি প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। উট দুটির ইজারা নেয় বনু দুওয়াইল ইবনু বাক্ গোত্রের 'আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত নামের এক মুশরিক ব্যক্তি। তার মা সাহম ইবনু 'আমর গোত্রের একজন মহিলা। তিনি উট দুটির দেখভালের দায়িত্ব লোকটার হাতে তুলে দেন। সে সেগুলো নিজের কাছে রেখে যথাসময়ের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল। [৬২]

সফরের জন্য আমরা উট দুটিকে যথাসম্ভব দ্রুত প্রস্তুত করে ফেলি এবং তাদের জন্য একটা সুফরাহ (খাবারের কাজে ব্যবহৃত এক ধরনের মাদুর) তৈরি করে বস্তায় ভরি। আসমা বিনতে আবু বাক্র তার কোমর বন্ধনীর একটা অংশ কেটে নিয়ে বস্তার মুখ শক্ত করে বাঁধেন। এ কাজের কারণেই তিনি 'যাতুন-নিকাতাইন' বা দুটি কোমরবন্ধনীর অধিকারিণী বলে সবার কাছে পরিচিতি পান। এরপর রাসূল ও আবু বাক্র সাওর পাহাড়ের গুহার দিকে এগিয়ে যান। সেখানে তিন রাত আত্মগোপন করে থাকেন।[৬৩] আবু বাক্র সিদ্দীকের ছেলে 'আবদুল্লাহ তখন তরুণ, চটপটে ও বুদ্ধিমান। রাতের বেলা সে তাদের দুজনের সঙ্গে গুহায় থাকত এবং সকাল হওয়ার আগেই মাক্কায় এসে হাজির। কুরাইশদের মাঝে এমনভাবে ঘুরে বেড়াত, যেন সে রাতে মাক্কাতেই ছিল। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে মাক্কার যেখানেই কোনো ষড়যন্ত্রের কথা তার কানে আসত, রাতে গিয়ে সে খবর পৌঁছে দিত।
বিকাল গড়িয়ে একসময় অন্ধকারে ছেয়ে যায় চারপাশ। মরুভূমির বুকে সন্ধ্যা নামে। আরও বেশ পরে; ইশার এক ঘণ্টা পার হওয়ার পর চুপিসারে তাদের কাছে যেত আবু বাক্রের দাস 'আমির ইবনু ফুহাইরাহ। ভেড়ার দুধ দোহন করে সে তাদের দুজনকে পান করিয়ে আসে। 'আমির সুবহে সাদিকের পূর্বক্ষণে ভেড়াগুলো হাঁকিয়ে ফিরে যায় মাক্কায়। ওই তিনদিন সে নিয়ম করেই তার কাজ করে।
'আবদ ইবনু 'আদি গোত্রের দুওয়াইল বংশের একজন দক্ষ লোককে নিজেদের গাইড হিসেবে ভাড়া করেন রাসূল ও আবু বাক্র। এই বংশের সঙ্গে 'আস ইবনু ওয়াইল আস-সাহমি বংশের মিত্রতা ছিল। লোকটা ছিল কাফির কুরাইশদের আচরিত ধর্মের অনুসারী। তা সত্ত্বেও তারা লোকটিকে বিশ্বাস করেন এবং নিজেদের ঘোড়ার লাগাম তার হাতে ছেড়ে দেন। তিন রাত পর তৃতীয় দিন সকালে তাদের ঘোড়া নিয়ে সাওর পাহাড়ের গুহার মুখে তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়ও নির্ধারণ করে দেন। তারা সফর শুরু করলেন, সঙ্গে 'আমির ইবনু ফুহাইরাহ ও সেই গাইড। লোহিত সাগরের কোল ঘেঁষে যে পথটি মাদীনার দিকে এগিয়ে চলেছে, সে পথেই গাইড তাদের নিয়ে চলল।[৬৪]

গুহা অভিমুখে আল্লাহ্র রাসূলের পথ চলা
মাক্কা ছেড়ে আল্লাহ্র রাসূলের চলে যাওয়ার খবরটি 'আলি, আবু বাক্র সিদ্দীক ও তার পরিবার ছাড়া আর কেউ জানত না। 'আলি তো আল্লাহ্র রাসূলের ঘরেই ছিলেন। রাসূল-ই তাকে আদেশ করেন থেকে যেতে। আল্লাহর রাসূলের কাছে মাক্কাবাসীর গচ্ছিত ধনসম্পদ যেন তিনি মালিকদের হাতে পৌঁছে দিতে পারেন। মক্কার লোকেরা আল্লাহর রাসূলের কাছে তাদের সম্পদ গচ্ছিত রেখে নিশ্চিন্ত হতো। তারা জানত, জগতের পরম বিশ্বস্ত মানুষটির কাছ থেকে তার সম্পদ খোয়ানোর কোনো ভয় নেই।[৬৫] আলি-কে সবার আমানত বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে পূর্ব নির্ধারিত সময়ে আবু বাক্রের ঘর থেকে;[৬৬] প্রায় মধ্যরাতে তারা দুজন বেরিয়ে পড়েন অত্যন্ত গোপনে, টের পেয়ে কুরাইশরা যেন পিছু না নিতে পারে এবং হিজরাতের মতো বারাকাহপূর্ণ এক সফর থেকে তাদের আটকাতে না পারে।

মাক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় নবিজির বেদনা
মাক্কা থেকে হিজরাত করে মাদীনায় যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাযওয়ারাহ নামক মাক্কার একটা জায়গায় একটু দাঁড়ান। বলেন, হে মাক্কা, আল্লাহর শপথ, আল্লাহর যমিনের শ্রেষ্ঠ অংশ তুমিই, আল্লাহর যমিনের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে তুমিই প্রিয়। আমাকে যদি তোমার বুক থেকে বের করে দেওয়া না হতো, তাহলে আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না। [৬৭]
এরপর রাসূল ও তার প্রিয় সাহাবি এগিয়ে চললেন। মুশরিকদের পাকড়াও ও নজরদারি থেকে আল্লাহ তাদের দুজনকে নিরাপদে পার করেন।

রাসূল-কে আল্লাহ তা'আলার সুরক্ষা দান
মাদীনায় হিজরাত করার পথ নিরাপদ করার জন্য রাসূল জাগতিক সব ধরনের প্রস্তুতিই গ্রহণ করেন। তবে এমন নয় যে, জাগতিক প্রস্তুতির ওপরই তাঁর নির্ভরতা ছিল; বরং পূর্ণ আস্থা ছিল আল্লাহর ওপর। আশা ছিল—তাঁর কাজে আল্লাহ সাহায্য করবেন, তাঁকে সমর্থন করবেন। সাহায্য কামনা করে আল্লাহর কাছে দু'আ করেন; দু'আর কথাগুলো আল্লাহই তাঁকে শিখিয়েছেন; [৬৮] আল্লাহ বলেন—
বলো, হে আমার রব, আমাকে ভালোভাবে প্রবেশ করান এবং ভালোভাবে বের করুন। আর আমার জন্য আপনার পক্ষ থেকে এক সহায়ক শক্তির ব্যবস্থা করুন। [সূরা ইসরা, ১৭: ৮০]
কুরআনের এই আয়াতে রয়েছে, এমন একটি দু'আ যা আল্লাহ তাঁর নবিকে শিখিয়েছেন, যেন তিনি এর মাধ্যমে আল্লাহকে ডাকেন। আল্লাহর কাছে দু'আ করার জন্য তাঁর উম্মাহকেও যেন শিখিয়ে দেন। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়— এক. যে দেশের অধিবাসীরা সত্যকে ভালোবাসে, সেখানে প্রবেশ করানোর কথা আছে। দুই. আর যেখান থেকে বের হওয়া প্রয়োজন, সেখান থেকে বের করে আনার কথাও আছে। মোটকথা, সফরের আগাগোড়া যাতে নিরাপদ হয় এবং সফরসঙ্গীরা যেন দীনের জন্য একনিষ্ঠ হন, সেই দু'আও আছে। সফরটির শুরু-শেষ, প্রথম ও পরের ধাপগুলো এবং এর মাঝের যতগুলো পদক্ষেপ আছে, সব নিরাপদে শেষ হয়।
সত্যের রয়েছে উপযুক্ত একটি মূল্য; এ মূল্যকে অবমূল্যায়ন করার জন্য মুশরিকরা নানান ফন্দি-ফিকির আঁটে। আল্লাহকে উপাস্য না মেনে নিজেদের মনগড়া দেবদেবীকে তারা উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল এবং এর জন্য তারা নিজেদের জানমাল বাজি রেখেছিল। মনে করেছিল এতে করে তারা নবি-কে ঘাবড়ে দিতে পারবে; কিন্তু আল্লাহ তাদের সব অপকর্মের কথাই তার নবিকে জানিয়ে দেন। সত্যকে কে না ভালোবাসে? সমাজের বুকে সত্য ঠাঁই পেয়েছে বিশেষ এক স্থানে; যে সমাজে প্রশান্তি, পরিচ্ছন্নতা ও নিষ্ঠা আছে, সে সমাজের মানুষ সততাকে নিয়েছে একান্ত আপন করে। আল্লাহ দু'আ শিখিয়ে বলছেন—
আর আমার জন্য আপনার পক্ষ থেকে এক সহায়ক শক্তির ব্যবস্থা করুন।
অর্থাৎ এমন সাহায্যকারী আমার জন্য ব্যবস্থা করুন, মুশরিকদের ওপর যাদের প্রভাব হবে প্রবল। যাদের শক্তিমত্তা ও ক্ষমতার দাপট পৃথিবীর বুকে আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আয়াতের একটি শব্দ مِّن لَّدُنكَ -আপনার পক্ষ থেকে; একজন প্রার্থনাকারী আল্লাহর সঙ্গে নিজেকে খুবই সম্পৃক্ত ও ঘনিষ্ঠ মনে করে। এতটাই যে, তার চাওয়ার ভাষার মধ্যে, তার দু'আর বাক্যের মধ্যে ফুটে ওঠে নৈকট্যের ছোঁয়া। আর এমন নৈকট্যের বলেই কেবল সে বলতে পারে, অন্য কারও পক্ষ থেকে নয়, কারও ওয়াসিলা বা কারও মাধ্যমেও নয়, রব, আমি সরাসরি আপনার কাছেই চাই, স্রেফ আপনার কাছ থেকেই।

এমনভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু'আ করে সে ভালো করেই জানে যে, ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি কেবল আল্লাহ। তিনি ছাড়া কেউই কাউকে ক্ষমতা দিতে পারে না। সে বিশ্বাস করে, কোনো দাবিদাওয়া আর মনের আকুতি-মিনতি বলতে হলে কেবল আল্লাহর কাছেই বলতে হবে; অন্য কারও কাছে নয়। কারণ, দিতে পারেন শুধু তিনিই। তিনিই তাকে সাহায্য করেন। আবার চাইলে সাহায্যের সকল দুয়ার বন্ধ করে দেন। যতদিন পর্যন্ত সে আল্লাহর দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ না করে দু'আ করবে, ততদিন আল্লাহর সাহায্য আসবে না। একান্ত মিনতি করে যদি প্রবল ক্ষমতাধর বা অত্যন্ত ত্যাঁদড় কারও কাছেও কিছু চাওয়া হয়, একসময় ওই ব্যক্তির মন গলে যায়। আবার অনেক সময় মিনতিকারী ওই ক্ষমতাধরের সেবকে পরিণত হয়েও সফলতা আদায় করে নেয়; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য কোনো প্রভাবশালীর মধ্যস্থতা শর্ত নয়। কে সাহায্য পাবে আর কে পাবে না, বিষয়টি একান্তই আল্লাহর। জনগণের দুয়ারে সরকারের সাহায্য আসে প্রতিনিধির হাত হয়ে; কিন্তু বান্দার প্রয়োজনে আল্লাহর সাহায্য আসে আরশ থেকে সরাসরি। [৬৯]
একসময় মুশরিকরা গুহার চারপাশ ঘিরে ফেলে। রাসূল ﷺ ও আবু বাক্র তাদের গুহা থেকে তাদের দেখতে পাচ্ছিলেন; তখন রাসূল ﷺ আবু বাক্র-কে সান্ত্বনার বাণী শোনান। বলেন, আল্লাহ আমাদের সঙ্গেই আছেন। পরবর্তী সময়ে আবু বাক্র বর্ণনা করে বলেন, গুহায় অবস্থানকালে আমি রাসূল ﷺ-কে বললাম, তাদের কেউ তাঁর পায়ের দিকে তাকালেই তো সে আমাদের দেখে ফেলবে। তখন রাসূল বললেন, এমন দুজনের ব্যাপারে তুমি কি চিন্তা করো, যাঁদের তৃতীয়জন আল্লাহ্?[৭০]
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল বলেছেন, শান্ত হও আবু বাক্র, দুজনের আল্লাহ তাদের তৃতীয় জন।
গুহায় বসে আবু বাক্র-কে বলা আল্লাহ্র রাসূলের সান্ত্বনার বাণীটি কুরআনে বিধৃত হয়েছে এভাবে; আল্লাহ বলেন— তোমরা যদি তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে (তাঁর কোনো অসুবিধা হবে না, কারণ) আল্লাহ তো তাঁকে তখনো সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিররা তাঁকে বের করে দিয়েছিল, যখন সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন, তারা দুজন গুহায় ছিল, সে তাঁর সঙ্গীকে বলেছিল, চিন্তা করো না, নিশ্চয় আমাদের সঙ্গে আল্লাহ আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর ওপর শান্তি বর্ষণ করেছেন, তোমরা দেখনি এমন সেনাদল (ফেরেশতাদের) দিয়ে তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং কাফিরদের কথা হেয় করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর কথাই সমুন্নত (রয়েছে)। আল্লাহ পরাক্রমশালী, পরম প্রাজ্ঞ। [সূরা তাওবাহ, ৯: ৪০]

হিজরাতের পথে উম্মু মা'বাদের তাঁবুতে
সাওর পাহাড়ের গুহায় তিন রাত কাটিয়ে রাসূল ও আবু বাক্র গুহা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। চারপাশ তখন শান্ত। মুশরিক অনুসন্ধানকারী দল রাসূল-কে খুঁজে পাওয়ার আশা বহু আগেই ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছে। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম, রাসূল ও আবু বাক্র বনু দুওয়াইল গোত্রের 'আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিতকে গাইড হিসেবে ভাড়া করেছিলেন। লোকটি মুশরিক জানার পরেও তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন তারা। নিজেদের উটের দড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন তার হাতে। তিন রাত পর গুহায় আসার জন্য বলেও দেন তাকে। লোকটি কথা রাখে; যথাসময়ে গুহায় এসে হাজির হয়। তাদের দুজনকে নিয়ে সে অপরিচিত, প্রায় অব্যবহৃত একটি পথ দিয়ে চলা শুরু করে। কাফির কুরাইশদের কেউ তাদের খোঁজে পেছনে লেগে থাকলেও সহজেই পথটির সন্ধান পাবে না। [৭১]
চলতে চলতে তারা খুযা'আহ গোত্রের বাসস্থান কুদাইদ এলাকার উম্মু মা'বাদ নামক এক ভদ্রমহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার পুরো নাম 'আতিকা বিনতে কা'ব আল-খুযা'আহ; খুনাইস ইবনু খালিদ আল-খুযা'ইর বোন। খুনাইস ইবনু খালিদই বোনের ঘটনাটি বর্ণনা করেন। উম্মু মা'বাদের ঘটনাটি বেশ প্রসিদ্ধ ও বর্ণনা-বহুল। সীরাত সংকলকগণ তাদের গ্রন্থে ঘটনাটি বেশ গুরুত্ব ও যত্নের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকেন। ইমাম ইবনু কাসীর বলেন, তার ঘটনাটি একটি বিখ্যাত ঘটনা। অনেকগুলো সূত্রে বর্ণিত; একটি সূত্র অপরটিকে শক্তিশালী করে জোরালোভাবে।[৭২]
খালিদ ইবনু খুনাইস আল-খুযা'ই থেকে বর্ণিত, রাসূলﷺ মাক্কা ছেড়ে হিজরাত করার জন্য মাদীনা অভিমুখে বের হন, সঙ্গে সাহাবি আবু বাক্র ও তার আযাদকৃত দাস 'আমির ইবনু ফুহাইরা এবং তাদের গাইড 'আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিতও ছিল। তারা উন্মু মা'বাদ আল-খুযা'ইয়্যার তাঁবুর পাশ অতিক্রম করছিলেন। উন্মু মা'বাদ ছিলেন বেশ বয়স্ক মহিলা; কিন্তু শক্তিশালী ও অকুতোভয়। হাতের ওপর হাত ভাঁজ করে হাঁটুতে ঠেস দিয়ে তিনি তখন বসে ছিলেন তাঁবুর বাইরে। তার কাছে কিছু গোশত ও খেজুর চাইলেন তারা; এমনি এমনি না, দাম দিয়েই কিনে নেবেন। কিন্তু উম্মু মা'বাদ এর কিছুই তাদের দিতে পারেননি। কারণ, তার গোত্রের লোকদের তখন খাদ্যের জোগান ফুরিয়ে যায়, তারা একপ্রকার দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করছিল।
রাসূল তাঁবুর পাশে একটা ভেড়া দেখতে পান। জিজ্ঞেস করেন, ভেড়াটির কী হয়েছে, হে উম্মু মা'বাদ?
সে বলল, দুর্ভিক্ষ তাকে দুর্বল করে রেখে গেছে।
রাসূল জানতে চান, তার কি কিছু দুধ হবে?
সে বলল, দুধ দোহানোর মতো অবস্থায় সে নেই।
রাসূল বললেন, এর দুধ দোহন করতে আপনি কি আমায় অনুমতি দেবেন?
তিনি বললেন, অবশ্যই, আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক। হ্যাঁ, দুধের কোনো আশা যদি আপনি দেখতে পান, তাহলে দোহন করুন।
রাসূল প্রথমেই আল্লাহর কাছে বারাকাহর জন্য দু'আ করেন। এরপর ভেড়ার ওলানে হাত রেখে বিসমিল্লাহ বলেন। ভেড়াটি দোহনে সুবিধা করে দেওয়ার জন্য ওলান প্রস্তুত করে দাঁড়ায় এবং দুধ দেওয়া শুরু করে। রাসূল একটি পাত্র নিয়ে আসার জন্য বলেন। দুধে পাত্র এমনভাবে ভরে যায় যে তা পুরো একটা দল খেতে পারবে। এরপর রাসূল ﷺ উম্মু মা'বাদকে সে দুধ পান করান। তিনি পরিতৃপ্ত হওয়া পর্যন্ত পান করেন। নবিজি তাঁর সফরসঙ্গীদেরও পান করান। তারাও পান করে পরিতৃপ্ত হন। সবশেষে রাসূল ﷺ নিজে পান করেন। নতুন করে তিনি আবার দুধ দোহন করেন। পাত্র কানায় কানায় ভরে যায়। দুধসমেত সে পাত্র রাসূল ﷺ উম্মু মা'বাদের কাছে রেখে যান। যাওয়ার আগে পরিশোধ করেন তার দুধের মূল্য। সেখান থেকে তারা আবার সফর শুরু করেন।
রাসূল ﷺ তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে চলে গেছেন বেশিক্ষণ হয়নি। একটু পরই উম্মু মা'বাদের স্বামী আবু মা'বাদ পেছনে একপাল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা দুর্বল ছাগল নিয়ে হাজির। দুধ দেখে তো তিনি অবাক। বললেন, হে উম্মু মা'বাদ, কোথায় পেলে এ দুধ? ভেড়া তো চারণভূমিতে এখন আর চরে না। উপরন্তু সেটা কোনো বাচ্চাও প্রসব করেনি। আর ঘরে না আছে কোনো দুগ্ধবতী উটনী।
জাবে উম্মু মা'বাদ জানালেন, না, আল্লাহর কসম, একজন কল্যাণময় ব্যক্তি আমাদের পাশ দিয়ে গেছেন। তাঁর এই এই অবস্থা। তিনি বললেন, হে উম্মু মা'বাদ, আমার কাছে তাঁর বর্ণনা দাও। তিনি বললেন, আমি সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার মিশেলের এক ব্যক্তিকে দেখেছি। প্রদীপ্ত চেহারা, রুচিবান ব্যক্তিত্ব; না কৃশকায় আর না স্থূলকায়, না খর্বকায় না দীর্ঘকায়, সুদর্শন, চোখের কালো অংশটি গভীর কালো আর সাদা অংশটি উজ্জ্বল সাদা। ঈষৎ কোকড়ানো চুল। কণ্ঠস্বর মিষ্টি, দীর্ঘ গ্রীবা, নিবিড় দাড়ি। চিকন কিন্তু লম্বা ও জোড়া ভ্রু। যখন চুপ থাকেন তখন অত্যন্ত গুরুগম্ভীর, আর যখন কথা বলেন তখন মাথা উঁচু করে বলেন। দূর থেকে তিনি অত্যন্ত সুদর্শন আর কাছ থেকে আরও প্রদীপ্ত। মিষ্টভাষী; না অনর্থক, না গোঁজামিল; বরং একটা পরিমিতিবোধ পরিলক্ষিত হয় তাঁর কথায়। মালার সুতা ছেড়ে দিলে একটার পর একটা দানা যেভাবে আলাদা আলাদা করে বেরিয়ে আসে, তাঁর কথাগুলো সেভাবে পরিস্ফুট হয়। তিনজনের মধ্যে দেখতে তিনিই সবচেয়ে প্রাণবন্ত, আর আকারে সবচেয়ে সুন্দর। সঙ্গী-সাথিরা তাঁকে আগলে রাখেন চারপাশ থেকে। যখন কথা বলেন, তারা মন দিয়ে শোনে। আদেশ করলে সেটা পালনে উঠে-পড়ে লাগে। বিরক্ত নিয়ে ভ্রু কুঁচকে থাকেন না, অজ্ঞতা কিংবা নির্বুদ্ধিতার কোনো ছাপ তাঁর মাঝে নেই।
আবু মা'বাদ বলেন, আল্লাহর কসম, তিনি কুরাইশদের সেই লোক, তাঁর সম্পর্কেই আমাদের বলা হয়েছে। আমার অভিপ্রায় তাঁর সঙ্গী হব। যে-কোনোভাবেই আমি তাঁর সঙ্গে মিলিত হব। [৭৩]

রাসূল-কে ধরার অভিযানে সুরাকা ইবনু মালিকের পশ্চাদ্ধাবন
মাক্কার সব জায়গায় কুরাইশ নেতারা ঘোষণা দেয়, মুহাম্মাদকে যে জীবিত বা মৃত ধরে নিয়ে আসতে পারবে, তাকেই পুরস্কৃত করা হবে; তার জন্য রয়েছে ১০০ উট। বাতাসের বেগে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। মাক্কার উপকণ্ঠে বাস করা গোত্রগুলোও শুনতে পায় ঘোষণাটা। পুরস্কারের লোভ লেগে যায় সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু'শুমের মনে। সে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়ে; কিন্তু আল্লাহর শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠার সাধ্যি কার! যে সুরাকা পুরস্কারের লোভে রাসূল-কে ধরার জন্য বেরিয়েছিল, আল্লাহ তাকেই আল্লাহর রাসূলের একজন রক্ষকে পরিণত করেন।
ইবনু শিহাব বলেন, সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু'শুমের ভাতিজা আবদুর রাহমান ইবনু মালিক আল-মুদলিজি আমাকে সংবাদ দেন, তার বাবা তাকে জানিয়েছেন, তিনি সুরাকাহকে বলতে শুনেছেন, কাফির কুরাইশদের কয়েকজন দূত একদিন আমাদের কাছে এসে ঘোষণা দেয়, যে ব্যক্তি রাসূল অথবা আবু বকর-কে ধরে নিয়ে আসতে পারবে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে; তাদের দুজনের যেকোনো একজনকে হত্যা কিংবা বন্দি করে কেউ আনতে পারলেই সে হবে পুরস্কারের অধিকারী। আমি সে সময় আমার গোত্র বানু মুদলিজের একটা বৈঠকে বসা ছিলাম। গোত্রের একজন আমাদের দিকে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলল, হে সুরাকা, সাগরের ওই দিকটায় আমি ছায়ার মতো কালো একটা জিনিস দেখেছি; মনে হচ্ছে মুহাম্মাদ ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। সুরাকা মনে মনে বলল, আমি বুঝে ফেলি এরাই তারা (মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গী-সাথিরা)। তবে প্রকাশ্যে ওই লোকটাকে বললাম, আরে না, তারা না। অন্য কেউ হবে।
এরপর ঘণ্টাখানিক বৈঠকে বসে থাকি, যেন কেউ আমার মতলব না বোঝে। তারপর বাসায় গিয়ে দাসীকে বলি আমার ঘোড়াটিকে পাহাড়ের ওপাশে নিয়ে প্রস্তুত করে আমার জন্য অপেক্ষা করতে। এ ফাঁকে আমি তির নিয়ে ঘরের খিড়কি পথে বেরিয়ে আসি। তিরের নিচের অংশ মাটিতে গেড়ে ভাগ্য গণনা করি। এরপর ঘোড়ায় চড়ে বসি। তাদের নাগাল পাওয়ার আশায় দ্রুত ছুটাই ঘোড়া। একসময় খুব কাছাকাছি চলে আসি। এমন সময় আমার ঘোড়া আচমকা এত জোরে হোঁচট খায়, আমি দূরে ছিটকে পড়ি। উঠে দাঁড়িয়ে তৃণীরের দিকে হাত বাড়াই। বের করে আনি ভাগ্য গণনার তির। দেখার চেষ্টা করি, আমি কি তাদের ধরতে পারব, নাকি পারব না? কিন্তু আমি যা অপছন্দ করি সেটাই বেরিয়ে আসে; আমি তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারব না।
আমি সোজা ঘোড়ায় চড়ে বসি এবং ভাগ্য গণনার তিরের ব্যাপারটি উপেক্ষা করি। এমনকি তাদের কাছাকাছি চলে আসি। এতটাই কাছে যে, রাসূল ﷺ-এর তিলাওয়াত শুনতে পাচ্ছিলাম; কিন্তু তিনি পেছনে ঘুরেও তাকাননি। অন্যদিকে আবু বাক্র বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন। আচমকা আবার আমার ঘোড়ার সামনের পা দুটি মাটিতে দেবে যায়। যেতে যেতে একেবারে হাঁটু পর্যন্ত এসে ঠেকে। আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ি। উঠে দাঁড়ানোর জন্য ঘোড়াটিকে খোঁচাতে থাকি; কিন্তু কিছুতেই সে মাটি থেকে পা বের করতে পারছে না। ঘোড়াটি দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু পা খুব সামান্যই বের করতে পেরেছে। এ সময় পুরো আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। আবার ভাগ্য গণনার জন্য তিরের দিকে হাত বাড়াই। যা চাচ্ছিলাম ফলাফল তার বিপরীত হলো। অর্থাৎ আমি তাদের কেশাগ্রও ছুঁতে পারব না। এদিকে ঘোড়া আছে আটকে। বাধ্য হয়ে নিরাপত্তা চেয়ে তাদের ডাকলাম। তারা দাঁড়িয়ে পড়লেন। ঘোড়ায় চড়ে আমি তাদের কাছে এসে পৌঁছি। যে আমি তাদের বন্দি করতে এলাম, সে আমি এখন তাদের কাছে অনুগ্রহ চাচ্ছি। আল্লাহর রাসূলের সত্যতার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। আমি বললাম, আপনার জাতি আপনাকে ধরে দিতে পারলে পুরস্কার ঘোষণা করেছে। কুরাইশের কাফিররা তাদের নিয়ে কী করতে চেয়েছিল, সে খবরটাও দিই। আমি তাদের রসদ সরবরাহের প্রস্তাব দিই; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার থেকে কিছুই গ্রহণ করেননি। তিনি শুধু বলেছেন, আমাদের বিষয়টি গোপন রাখবে। তখন আমি আল্লাহ্র রাসূলের কাছে একটা আবদার করি। তিনি যেন আমাকে নিরাপত্তা দানের কথা লিখে দেন। রাসূল ﷺ ‘আমির ইবনু ফুহাইরাহকে লিখে দিতে আদেশ দিলেন। সে চামড়ার একটা টুকরায় আমাকে নিরাপত্তানামা লিখে দেয়। এরপর তারা চলে যান। [৭৪]
সুরাকাকে নিয়ে ইতিহাসে একটা বিখ্যাত গল্প প্রচলিত আছে। ইবনু 'আবদুল বার ও ইবনু হাজারসহ অনেকেই তার সেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইবনু 'আবদুল বার বলেন, সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনা আবু মূসা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি হাসান থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল ﷺ একবার সুরাকা ইবনু মালিককে বলেন, খসরুর হাতের বালা যখন তুমি পরবে, তখন তোমার কেমন লাগবে? এর অনেক বছর পর খলীফা 'উমারের যুগে মুসলিমরা পারস্য বিজয় করে। অনেক গানীমাতের (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) সঙ্গে খসরুর দুটি বালা, বেল্ট ও মুকুট খলীফা 'উমারের কাছে নিয়ে আসা হয়। 'উমার সুরাকা ইবনু মালিককে ডেকে পাঠালেন। মাথাভর্তি চুল ও লোমশ হাত ছিল সুরাকার। 'উমার তাকে হাত দুটো এগিয়ে দিতে বললেন এবং বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবার; আল্লাহ মহান। সকল গুণগান আল্লাহর। যিনি এ দুটোকে কিসরা ইবনু হুরমুজের কাছ থেকে এনে দিয়েছেন; সে দাবি করত, আমিই মানুষের প্রতিপালক। এরপর 'উমার আল্লাহর রাসূলের ভবিতব্য প্রাপ্ত মুদলিজ গোত্রের সেই বেদুইন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু'শুমকে বালা দুটো পরিয়ে দেন।
'উমার কথাগুলো উচ্চকিত আওয়াজে বলেন।[৭৫] এরপর সুরাকাকে একটা বাহনের ওপর আরোহণ করিয়ে দিলেন। মাদীনার পথে পথে তাকে কুচকাওয়াজ করান। তার চারপাশে উৎসাহী ও আনন্দিত লোকজনের স্রোত ছিল। সুরাকা তখন 'উমার ফারুকের কথাগুলো প্রতিধ্বনিত করছিলেন। তিনি বলছিলেন, আল্লাহু আকবার; আল্লাহ মহান। আলহামদুলিল্লাহ; সকল গুণগান আল্লাহরই। যিনি এ দুটোকে কিসরা ইবনু হুরমুজের কাছ থেকে এনে দিয়েছেন এবং মুদলিজ গোত্রের বেদুইন সুরাকা ইবনু জু'শুমকে তা পরিয়েছেন।[৭৬]

আল্লাহ যাকে পথে এনেছেন তাকে কেউ বিপথে নিতে পারে না
রাসূল-কে পাকড়াও করে মাক্কার নেতাদের হাতে তুলে দিয়ে ১০০ উটের বিশাল পুরস্কার বাগিয়ে নিচ্ছে-এমন অভিপ্রায় নিয়েই সুরাকা প্রথমে আল্লাহর রাসূলের পেছনে লাগে; কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে চিত্রপট পালটে যায়, যে এসেছিল জীবিত কিংবা মৃত রাসূল-কে পাকড়াও করতে, সে-ই এখন রাসূল-কে প্রতিরক্ষা দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহকে খুঁজে বের করতে এসেছে, এমন যার সঙ্গেই তার দেখা হয়, তাকেই সে ফেরত পাঠায়। বলে, তিনি আর তোমাদের নাগালের মধ্যে নেই। রাসূল নিরাপদে মাদীনায় গিয়ে পৌঁছেছেন-বিষয়টি নিশ্চিন্ত হওয়ার পর সুরাকা নিজের গল্পটি প্রকাশ করলেন। পথে কী কী ঘটেছিল, তার ঘোড়ার ভাগ্যে কী জুটেছিল, আগাগোড়া সমস্ত বলে যান মানুষের কাছে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গল্পটি। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে একসময় গিয়ে পৌঁছে মাক্কায়। কুরাইশ মোড়লরা এমন গল্প শুনে ভড়কে যায়। তাদের ভয়-এই বুঝি গল্পটি শুনে লোকেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলল! প্রতিবাদ হিসেবে তারা খুব বেশি কিছু করার সাহস দেখাল না। কারণ, সুরাকা তার গোেত্র মুদলিজের মামুলি কোনো লোক ছিল না; বরং সে তাদের নেতা। সুতরাং অনুসারীদের কাছে নেতার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার রটিয়ে ফায়দা হবে না। অগত্যা আবু জাহল তাদের কাছে একটা চিঠি লেখে।

রাসূল-কে আনসার সাহাবিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা
হিজরাতের পথে রাসূল-এর মাক্কা ছেড়ে বের হওয়ার খবরটা যেদিন প্রথম মাদীনার মুসলিমদের কানে এসেছে, সেদিন থেকে প্রতিদিন সকালে তারা হাররায় এসে তাঁর অপেক্ষায় থাকতেন এবং দুপুরের রোদের প্রখরতায় বাড়ি ফিরে যেতেন।
রোজকার এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটল একদিন। সেদিন তারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে বাড়ির পথ ধরছিলেন, এমন সময় একজন ইয়াহূদি কেল্লা থেকে কী একটা দেখছে বলে চিৎকার করে ওঠে। দূরের দৃশ্য স্পষ্ট হলে দেখা যায় সাদা পোশাক গায়ে রাসূল ও তাঁর সঙ্গীরা এগিয়ে আসছেন। সঙ্গে সঙ্গে সে চিৎকার করে উঠে, হে আরব সমাজ, ইনিই তিনি, যাঁর অপেক্ষা তোমরা করছিলে। তৎক্ষণাৎ মুসলিমরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে বেরিয়ে পড়েন। হাররায় গিয়ে তারা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে দেখা করেন। বানু 'আমর ইবনু 'আওফ গোত্রে গিয়ে রাসূল তাঁর যাত্রা বিরতি করেন। দিনটি ছিল সোমবার, রবিউল আওয়াল মাস। [৭৭] আবু বাক্র উপস্থিত লোকদের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। রাসূল তখন চুপচাপ বসা। আগত আনসারদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা রাসূল-কে এর আগে কোনোদিন দেখেননি। আবু বাক্রকে দাঁড়ানো দেখে তাকেই নবি ভেবে অনেকে অভিবাদন জানাচ্ছিল। এদিকে আল্লাহ্র রাসূলের গায়ে রোদের তাপ এসে পড়লে আবু বাক্র এগিয়ে যান। নিজের চাদর দিয়ে আড়াল করে রাসূল-কে ছায়া দেন। এমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত লোকদের বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, বসা ব্যক্তিই হলেন আল্লাহর রাসূল।
বানু 'আমর ইবনু 'আওফ গোত্রে রাসূল ১৩ থেকে ১৫ দিন ছিলেন।[৭৮] এ সময় তিনি সেখানে একটা মাসজিদ নির্মাণ করেন। যে মাসজিদের ভিত্তিই হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। মাসজিদে রাসূল সালাত আদায় করেন। এরপর তিনি তাঁর বাহনে চরে আবার রওনা হন। [৭৯]
বেশ কিছুদিন কুবায় অবস্থান করে রাসূল এবার মাদীনায় প্রবেশ করতে চাইলেন। তখন তিনি আনসারদের ডেকে পাঠালেন। ডাকে সাড়া দিয়ে তারা রাসূল ও আবু বাক্রের কাছে আসেন। দুজনকেই সালাম দিয়ে তারা বললেন, নিরাপদের সঙ্গেই আপনারা দুজন আরোহণ করুন। আপনাদের আনুগত্য করা হবে। তাদের এমন কথা শোনার পর নবি ও আবু বাক্র নিজেদের বাহনে চড়ে বসেন। আনসাররা অস্ত্র হাতে তাদের গার্ড অব অনার করতে করতে এগিয়ে নিয়ে চলেন। [৮০]
রাসূল মাদীনায় প্রবেশ করার সময় মাদীনার লোকজন বলতে লাগল, আল্লাহর নবি এসেছেন। আল্লাহর নবি এসেছেন। [৮১]
যেদিন রাসূল মাদীনায় পা রাখলেন, সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য সেদিনটি ছিল সবচেয়ে খুশি ও আনন্দের দিন। আগে বা পরে ইতিহাসে আর কখনো মাদীনায় এমন উৎসবমুখর দিন দেখা যায়নি। লোকেরা নিজেদের সবচেয়ে উত্তম পোশাক পরিধান করে আসে, যেন তারা ঈদ উদ্যাপন করছে। মাদীনার রৌদ্রোজ্জ্বল দিকে- প্রান্তরে আনন্দের হৃদয় প্রশান্তকারী আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। মাক্কার সংকীর্ণ ও বৈরী পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের অবস্থান এখন উদার ও বন্ধুভাবাপন্ন একটা পরিবেশে। মাদীনার এই পবিত্র পরিবেশের সব জায়গায় ইসলাম তার আপন বাণী নিয়ে হাজির হচ্ছে মানুষের দ্বারে দ্বারে। এখান থেকেই পরবর্তীকালে পৃথিবীর প্রতিটি ভূখণ্ডে পৌঁছে যায় ইসলামের সুমহান দাওয়াহর বাণী।
আল্লাহর রাসূলের কারণেই আল্লাহ মাদীনাবাসীকে ভালোবাসেন এবং তাঁর কারণেই আল্লাহ তাদের সম্মানিত করেছেন—বিষয়টি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারেন আনসার সাহাবিরা। তাদের শহর মাদীনা পরিণত হয় রাসূল ও তাঁর মুহাজির সাহাবিদের আবাসনে। পরবর্তীকালে ইসলামকে সাহায্য করার কেন্দ্রও হয়ে ওঠে এটি। এমনিভাবে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে মাদীনা হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্র। আল্লাহর রাসূলের কারণেই তাদের এত সম্মান, মাদীনার এমন সুনাম—বিষয়টি উপলব্ধি করেই আল্লাহ্র রাসূলের আগমনে তারা খুশি হয়, আনন্দ প্রকাশ করতে করতে মাদীনা থেকে বেরিয়ে আসে রাসূল-কে অভ্যর্থনা জানাতে। আপ্লুত কণ্ঠে বলতে থাকেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ; ইয়া মুহাম্মাদ; ইয়া রাসূলাল্লাহ। [৮২]
ইমাম মুসলিম তার নিজের সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, রাসূল যখন মাদীনায় প্রবেশ করেন, নারী-পুরুষরা ঘরবাড়ির ছাদে গিয়ে ওঠে এই ঐতিহাসিক দৃশ্যের সাক্ষী হওয়ার জন্য। ছেলে, জোয়ান, সোমত্তরা রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বলতে থাকে, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ; ইয়া মুহাম্মাদ; ইয়া রাসূলাল্লাহ। [৮৩] মানব ইতিহাসের বিরল এক অভ্যর্থনা গ্রহণ করার পর রাসূল সামনে এগিয়ে চলেন। গিয়ে নামেন একেবারে আবু আইয়ূব আনসারির ঘরে। হযরত আনাস থেকে হিজরাতের লম্বা এক হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এরপর রাসূল এগিয়ে চললেন। গিয়ে থামলেন একেবারে আবু আইয়ূবের ঘরের পাশে। তখন রাসূল বললেন, আমাদের পরিবারের [৮৪] মধ্যে কোন ঘরটা সবচেয়ে কাছে? আবু আইয়ূব বললেন, আমার, হে আল্লাহর নবি, এই যে এটা আমার ঘর। এটা দরজা। রাসূল বললেন, এগিয়ে চলো, আমাদের জন্য বিশ্রামের জায়গা প্রস্তুত করো। [৮৫] এরপর রাসূল আবু আইয়ূবের সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে এখানেই তিনি তাঁর মাসজিদ ও বাসস্থান নির্মাণ করেন।
আবু আইয়ূবের বাড়িতে অবতরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূলের হিজরাত-যাত্রার সমাপ্তি হয়; তবে হিজরাতের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তা এখনো শেষ হয়নি; বরং রাসূল নিরাপদে মাদীনায় এসে পৌঁছানোর পরই কেবল তা সাধনের যাত্রা শুরু হলো। একই সঙ্গে শুরু হলো বিপদ, কষ্ট ও চ্যালেঞ্জের সফরও। আল্লাহর রাসূল কোনো কিছুই পরোয়া করেননি; বিপদের পর্বত ডিঙিয়ে তিনি প্রস্তুত করে যান উম্মাহর জন্য উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ। ভিত্তি স্থাপন করেন ইসলামি রাষ্ট্রের রূপরেখার। যে রাষ্ট্র পৃথিবীকে উপহার দেয় অনন্য মানবিক সভ্যতা। মিথ্যা, জড়তা কিংবা অস্পষ্টতার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় সে রাষ্ট্র; এর ভিত্তি ঈমান, তাকওয়া; পরোপকার ও ন্যায়নিষ্ঠা। রাসূল মাদীনায় এমনই এক রাষ্ট্র গঠন করেন যে রাষ্ট্রের ধারক-বাহকগণ উন্নত চারিত্রিক সুষমা ও ইসলামের আলোয় উজ্জীবিত ছিলেন। ঐক্যের সমন্বয়ে তারা এতটাই উদ্দীপ্ত ছিলেন যে, পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের মতো তৎকালীন পৃথিবীর দুই পরাশক্তি রাষ্ট্রকে স্বল্প সময়ের মধ্যে অনায়াসেই পরাভূত করে ফেলেন। [৮৬]

টিকাঃ
৫৯. দেখুন: আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ : প্রক্ষিত সতর্কতা ও প্রতিরক্ষা, পৃ. ১৩৫।
৬০. দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/১৮১; আল-ফাতহ, ইবনে হাজার, এর বর্ণনাসূত্র হাসান, ফাতহুল-বারি, ৭/২৩৬।
৬১. দেখুন: ফী যিলালিল কুরআন, ৩/১৫০১।
৬২. দেখুন: আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু কাসীর, ৩/২৩৩,২৩৪
৬৩. আন-নিহায়া, ৪/২০১
৬৪. সহীহ বুখারি, কিতাবু মানাকিবিল-আনসার, নবি ﷺ-এর হিজরাত পরিচ্ছেদ, হাদীস- ৩৯০৫।
৬৫. ইবনে কাসীর, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ২/২৩৪।
৬৬. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল-কারীম, পৃঃ ৩৩৪।
৬৭. তিরমিযি, মানাকিব অধ্যায়, মাক্কার ফজিলত পরিচ্ছেদ, ৫/৭২২, আল-বানি এটিকে সহীহ বলেছেন (সহীহ সুনানুত তিরমিযি, হাদীস নং ৩৯২৫)
৬৮. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃষ্ঠা. ৭২
৬৯. ফি যিলালিল কুরআন, ৪/২২৪৭
৭০. বুখারি, সাহাবাদের ফজিলত অধ্যায়, মুহাজিরদের মানাকিব পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ৩৬৫৩
৭১. আল-মুস্তাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/১০১
৭২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৮৮
৭৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১০৪-১০৬। 'আল-হাওয়ামিশ'-এর বিবরণে এর থেকে সামান্য পরিবর্তন আছে।
৭৪. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাত পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ৩৯০৬
৭৫. আর-রাওযুল আনফ, ৪/২১৮, আল-হিজরাতু ফিল-কুরআন, পৃ. ৩৪৬
৭৬. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৫
৭৭. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৫১
৭৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫২
৭৯. সাহীহ বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, নবিজির হিজরাত পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ৩৯০৬
৮০. প্রাগুক্ত, হাদীস নং ৩৯১১
৮১. প্রাগুক্ত
৮২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআন, পৃ. ৩৫৩
৮৩. মুসলিম, যুহদ ও রাকায়িক অধ্যায়, হিজরাতের ঘটনার পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ২০০৯
৮৪. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৫৪
৮৫. বুখারি, আনসারদের মানাকিব অধ্যায়, নবিজির মাদীনায় হিজরাত পরিচ্ছেদ, ৫/৭৯, হাদীস নং ৩৯১১
৮৬. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৫৫

📘 রউফুর রহীম 📄 শিক্ষা ও উপকারিতা

📄 শিক্ষা ও উপকারিতা


১) সত্য ও মিথ্যার চিরকালের সংঘাত:
সেই প্রথম মানব, নবি আদম-এর সঙ্গে ইবলিসের যে সত্য-মিথ্যার সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে এবং চলবে। আল্লাহ বলেন—
যাদের কেবল 'আমাদের রব আল্লাহ' বলার কারণে তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভবে বের করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ যদি একদল মানুষকে আরেকদল মানুষ দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে আশ্রম, গীর্জা, সিনাগগ ও মাসজিদসমূহ; যেখানে আল্লাহর নাম অধিক পরিমাণে স্মরণ করা হয়, অবশ্যই বিধ্বস্ত হয়ে যেত। আল্লাহ নিশ্চয় তাদের সাহায্য করবেন, যারা তাঁকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [সূরা হাজ্জ, ২২: ৪০]
তবে এ সংঘাতের পরিণতি কী, সেটা সবারই জানা; আল্লাহ বলেন—
আল্লাহ লিখে দিয়েছেন: আমি ও আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। [সুরা মুজাদালাহ, ৫৮: ২১]

২) দীনের দা'ইদের প্রতি শত্রুতা:
যুগে যুগে সব নবি-রাসূলই এমন ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছেন। যারাই দাওয়াহর কাজ করবেন, তাদের বেলায়ও একই জিনিসের পুনারাবৃত্তি ঘটবে। বহুভাবে কাফির-মুশরিকরা তাদের কষ্ট দেয়; বন্দি করা, হত্যা করা, নির্বাসনে পাঠানো কিংবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তারা দাওয়াহর পথ রুদ্ধ করতে চেষ্টা চালায়। যত উপায় আর কূটচাল আছে, এর কিছুই বাদ দেয় না। প্রতিটি যুগেই এর বিপুল নমুনা আছে। তাদের আপতিত এই বিপদগুলোর মুখে একজন দা'ইকে উদ্যমহারা হলে চলবে না। তাকে অবশ্যই তার রবের কাছে আশ্রয় নিতে হবে। ভরসা রাখতে হবে কেবল তাঁরই ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস, অটল পদক্ষেপ, মুষ্টিবদ্ধ প্রতিজ্ঞা এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। কুচক্রীরা তাদের অপকর্ম অব্যাহত রাখবে, কিন্তু আল্লাহর বিরুদ্ধে জয়ী হবার সাধ্যি আছে কার![৮৭] আল্লাহ বলেন—
(স্মরণ করো) যখন কাফিররা তোমাকে বন্দি করার জন্য অথবা হত্যা করার জন্য কিংবা (মাতৃভূমি থেকে) বের করে দেওয়ার জন্য তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিল। তারাও ষড়যন্ত্র করছিল আর আল্লাহও কৌশল করছিলেন। [সূরা আনফাল, ৮: ৩০]
বাতিলপন্থি ও দীনের শত্রুরা দাওয়াহকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য দুর্বল মনের অধিকারী লোকদের অর্থের প্রলোভন দেয়। তারা ঘোষণা দেয়, দুই মুহাজিরের একজন রাসূল ﷺ কিংবা আবু বাক্র রা.-কে জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারলে তাকে ১০০ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। এমন লোভনীয় পুরস্কারের কথা শুনে অনেকেই প্রলুব্ধ হয়। তাদের একজন সুরাকা। ১০০ উট পুরস্কারের এমন জাগতিক প্রাপ্তিকে দুপায়ে মাড়িয়ে একসময় সুরাকা ফিরে আসে তৃপ্তির পথে, সত্যিকারের লাভের দিকে, পবিত্র রিজিকের দিকে; ঈমানের রিজিক। সব ছেড়ে-ছুড়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। অন্ধকার পথ থেকে কেবল ফিরেই আসেনি, আরও যারা ওই পথ মাড়াবার জোর চেষ্টা করেছেন, রাসূল ﷺ-কে ধরে পুরস্কার বাগাবার খায়েশে মেতেছে, তাদের সে ভুল পথ দেখিয়ে দিয়ে আল্লাহর রাসূলের অনিষ্টতা থেকে নিরত করেছে। আল্লাহ তা'আলা এভাবেই তাঁর বন্ধুদের, দীনের দা'ইদের সকল অনিষ্টের কবচ থেকে রক্ষা করেন।[৮৮] আল্লাহ বলেন—
যারা কুফরি করে, তারা আল্লাহর পথ থেকে (লোকদের) বিরত করতে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে থাকে। অতএব, তারা তা ব্যয় করবে; তবে অবশেষে এই সম্পদ তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হবে। তারপর তারা পরাজিত হবে। আর কাফিরদের জাহান্নামে একত্র করা হবে। [সূরা আনফাল, ৮:৩৬]

৩) হিজরাতের পরিকল্পনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্ন করতে রাসূল যে যে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করেছেন—
সীরাত-পাঠকদের যে কেউ এগুলো নিয়ে ভালোভাবে গবেষণা করলে চিন্তার অনেক খোরাক পাবেন। উপলব্ধি করবেন, ওয়াহির আলোকে নেওয়া প্রতিটি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ তিনি কী প্রজ্ঞার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছেন। কোনো ভালো কাজে পরিকল্পনা ও শলা-পরামর্শ সুন্নাতেরই একটা অংশ। প্রতিটি কাজে পরিকল্পনা করে আগোনোর তাগাদা মুসলিমদের আল্লাহই দিয়েছেন। পরিকল্পনা ও শলা-পরামর্শকে সুন্নাহ মনে না করে অনেকের মধ্যে এগুলোকে পাশ কাটানোর প্রবণতা আছে। এরা নিশ্চিত ভুলের মধ্যে আছে।[৮৯]
রাসূল মাদীনায় হিজরাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা নিম্নরূপ:
ক) তখন সূর্য প্রচণ্ড তাপদাহ ছড়াচ্ছে। সাধারণত কেউ এ সময় ঘর থেকে বের হয় না। ঠিক এ সময়টাতেই রাসূল আবু বাক্র সিদ্দীকের বাসায় আসেন। কেন? যাতে কেউ দেখা তো দূরে থাক, বুঝতেও না পারে।
খ) আবু বাক্রের বাড়ি যাওয়ার পথে গোপনীয়তার জন্য নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। সম্পূর্ণ মাথা ও চেহারার কিছু অংশ ঢেকে পথে বের হন।[৯০]
গ) গিয়েই প্রথমে আবু বাক্রকে আদেশ করেন সেখানে উপস্থিত অন্যান্য লোকদের সরিয়ে দিতে। তাও মাদীনায় হিজরাত করার বিষয়টি ছাড়া বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই বলেননি। এমনকি কোন পথে মাদীনায় গিয়ে পৌঁছাবেন, সেটা পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করলেন না।
ঘ) তিনি আবু বাক্রের বাসা থেকে রাতের বেলায় খিড়কি পথ দিয়ে বের হন।[৯১]
ঙ) নিরাপদে, নির্বিঘ্নে মাদীনায় পৌঁছানোর জন্য রাসূল ﷺ অপরিচিত একটা পথ বেছে নিলেন। মানুষজনের চলাচলও সে পথে বেশি একটা নেই; কদাচিৎ সে পথ ব্যবহার করে তারা। মরুভূমির গতিপ্রবাহ ও রাস্তাঘাট চেনে এমন একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ লোকের সাহায্য নেন রাসূল ﷺ। অভিজ্ঞ সেই গাইড মুশরিক বটে তবে আচার-আচরণ ও চারিত্রিক গুণে অত্যন্ত ভদ্র ও গুরুগম্ভীর স্বভাবের। একজন মুশরিককে গাইড হিসেবে নেওয়ার বিষয়টি সপ্রমাণ যে, লোক যে-ই হোক না কেন—পেশাদার ও অভিজ্ঞ লোকের সাহায্য নিতে রাসূল দ্বিধা-সংশয়ে ভুগতেন না।[৯২]

হিজরাতের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ যথার্থ করার জন্য রাসূল কিছু দক্ষ ও বিশ্বাসী লোককে বেছে নেন। একটু খেয়াল করলেই দেখব যে, অভিজ্ঞ এ লোকগুলো হয় তাঁর সঙ্গে, না হয় আবু বাকরের সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা বিশেষ কোনো কাজে বিশেষভাবে পারদর্শী। দলের সবার পারস্পরিক সহযোগিতা আবর্তিত হয় মহান একটা লক্ষ্য বাস্তবায়নকে ঘিরে; হিজরাত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক—একযোগে সবার চাওয়া হয়ে ওঠে এটাই।
রাসূল প্রত্যেক কাজের জন্য যথার্থ লোককেই বেছে নেন। হিজরাত সফল হওয়ার পেছনে আল্লাহর রাসূলের এ পরিকল্পনা যথাযথভাবেই কাজে দেয়।
আল্লাহ্র রাসূলের বিছানায় 'আলি ইবনু আবু তালিবের ঘুমিয়ে থাকাটা অত্যন্ত ফলপ্রসূ এক কৌশল ছিল। কাফিরদের বোকা বানাতে কৌশলটির জুড়ি মেলা ভার। আল্লাহর রাসূলের ওপর থেকে তাদের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরে যায়। এ সুযোগে রাসূল বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। মুশরিকরা টেরই পায়নি। আল্লাহ তাঁর রাসূল-কে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। সকালবেলা তাদের দৃষ্টি আটকে আল্লাহর রাসূলের বিছানায়। সবই ঠিক আছে, মুহাম্মাদ রাতের বেলায় বের হতে পারেননি। এখনো চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানাতেই ঘুমিয়ে আছেন—এ ব্যাপারে তাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ কাজ করেনি। অথচ বিছানায় রাসূল নন, ঘুমিয়ে আছেন তাঁর চাচাতো ভাই ও সাহাবি 'আলি ইবনু আবু তালিব।

হিজরাতে কার কী ভূমিকা:
ক) 'আলি: আল্লাহর রাসূলের বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রথমত এতে কাফিরদের বোকা বানানো হয়। তা ছাড়া আল্লাহর রাসূলের কাছে গচ্ছিত রাখা কাফিরদের সম্পদ যথাযথভাবে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি তাকেই দিয়ে যান।
খ) 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু বাক্র: হিজরাতের প্রথম দিকে, রাসূল ও আবু বাক্র তখন গুহায়, সে সময় তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। সব সময় চোখ রাখেন শত্রুদের প্রতিটি গতিবিধির ওপর।
গ) আসমা: মুহাম্মাদ-কে হত্যা করার জন্য মুশরিকরা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সব জায়গায়। এমন বিপৎসংকুল পরিবেশে আসমা বিনতে আবু বাক্র সবার চোখ এড়িয়ে মাক্কা থেকে তাদের জন্য নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ করতেন।
ঘ) 'আমির ইবনু ফুহাইরা: সাদাসিধে ও বিশ্বস্ত একজন রাখাল। প্রতিদিন গুহায় রাসূল ও আবু বাক্রের জন্য খাদ্য সরবরাহ করতেন। হিজরাত সফল করতে তিনি আরেকটা দুর্দান্ত কাজ করেন। মরুভূমির বালুর ওপরে তার মেষপাল ছুটিয়ে রাসূল ও আবু বাক্র-এর পায়ের চিহ্ন মিশিয়ে দিতেন; খুঁজতে আসা লোকজন যাতে কোনো ভাবেই পায়ের চিহ্ন ধরে তাদের হদিস বের করতে না পারে—বিষয়টি তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত করেন।
ঙ) 'আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত: হিজরাতের পরম বিশ্বস্ত একজন গাইড। মরুভূমির অপরিচিত ওই পথটি তার নখদর্পণে। নিজের কাজ সম্পাদন করেছে সে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সঙ্গেই; গুহা থেকে তাদের পথ দেখিয়ে নিরাপদেই নিয়ে যায় ইয়াসরিবে।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান যে, মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাত নিরাপদ করার জন্য রাসূল সম্ভবপর সব ধরনের কৌশলই গ্রহণ করেছেন। তাঁর গৃহীত এমন কৌশল বিচক্ষণতা এবং গোপনীয়তার যোগসাজশেই সহজে সব ধরনের ঝামেলা এড়ানো গেছে। এ কথা ঠিক যে, তাঁর পরিকল্পনাটি বিশদ ও নিশ্ছিদ্র। তবে সেটাকে জটিল বলা চলে না। সঠিক মানুষ চিনে তিনি তাকে উপযুক্ত জায়গায় কাজে লাগান। এই সঠিক লোকদের সংখ্যাও ছিল একেবারে যথাযথ; না বেশি, না কম। [৯৩]

৪) উপায়-উপকরণ গ্রহণের আবশ্যকতা: উপায়-উপকরণ গ্রহণ এমন একটা বিষয় যা অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক। তবে এর অর্থ এই নয় যে, উপায়-উপকরণ অবলম্বন করলেই এর ফলাফল আসতে বাধ্য। কারণ, কোনো কাজের ফলাফল আসাটা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ থেকে বুঝা যায়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা বিষয়। আর হবেই-বা না কেন, উপকরণ গ্রহণের পূর্ণতাপ্রাপ্তির একটা দুয়ার তো এই তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, প্রস্তুতি আর উপায়-উপকরণ গ্রহণ করেই রাসূল ক্ষান্ত হননি। পূর্ণ ভরসা রেখেছেন আল্লাহর ওপর। তাকে ডেকেছেন, তাঁর নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন। মহান রব তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। সাহায্য করেছেন পদে পদে; গুহার মুখে দাঁড়ানোর পরেও রাসূল-কে মুশরিকরা দেখতে পায়নি। সুরাকার ঘোড়ার পা মাটিতে দেবে যায়। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বিভিন্ন পন্থায় রক্ষা করেছেন এবং তাঁর হিজরাতকে করেছেন সাফল্যমণ্ডিত।[৯৪]

৫) মু'জিজা বা অলৌকিক ঘটনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন: নবি-এর হিজরাতের ঘটনায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকগুলো অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের রাসূলের প্রতি আল্লাহর হেফাজত নিরাপত্তাবিধানের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এর একটি উদাহরণ এরকম, রাসূল যে গুহায় আত্মগোপন করে ছিলেন, গুহাটির মুখে মাকড়সা জাল বোনে। আরেকটি ঘটনা ছিল, রাসূল যখন উম্মু মা'বাদের তাঁবু অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি সেখানে নেমে পড়েন। আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি উম্মু মা'বাদের জীর্ণ-শীর্ণ দুর্বল ভেড়ার দুধ দোহন করেন। আরেকটি মু'জিজা হলো সুরাকার ঘটনা। রাসূল তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সে একদিন পারস্য সম্রাটের দুটি বালা পরিধান করবে।
আমাদের মুসলিমদের জন্য নবি-জীবনের বৃত্তান্ত শুধু পড়া বা জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমরা প্রতিটি খুঁটিনাটি আদ্যোপান্ত জানব, আলোচনা করব, যদি দেখা যায়, মু'জিজাটি সাহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তাহলে সেটাতে বিশ্বাস স্থাপন করব, জ্ঞানের বিভিন্ন আসরে আলোচনা তুলব। মানুষকে দেখিয়ে দেব, মু'জিজাটি নবি-এর নবুওয়াতেরই একটা নিদর্শন।[৯৫]

৬) বিশ্বস্ত কাফিরের সাহায্য-সহযোগিতা নেওয়ার বৈধতা: একজন দা'ইর পক্ষে এমন একজন কাফিরের সাহায্য নেওয়ার সুযোগ আছে, যে লোক তার দাওয়া বিশ্বাস করে না। তবে ঢালাওভাবে সব কাফিরের সাহায্য গ্রহণ করা যাবে না। পেশাদারিত্ব ও বিশ্বস্ততার প্রশ্নে লোকটিকে অবশ্যই উত্তীর্ণ হতে হবে। তবেই তার সাহায্য নেওয়ার প্রসঙ্গ আসবে। হিজরাতের ঘটনায় আমরা দেখেছিলাম, রাসূল ও আবু বাক্র একজন মুশরিককে ভাড়া করেন তাদের মাদীনার পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নিজেদের বাহনের ভার পুরোপুরি ছেড়ে দেন তার হাতে। তিন দিন পর সাওর পর্বতের গুহায় তাদের সঙ্গে দেখা করার সময়ও নির্ধারণ করে দেন লোকটিকে। বিশ্বাসের মাত্রাটা কত বেশি হলে এমন স্পর্শকাতর একটা গোপন বিষয়ে তাকে বিশ্বাস করতে পারেন! এতে প্রমাণিত হয়, কোনো কাফির কিংবা পাপাচারীর ওপরও কখনো কখনো আস্থা রাখা যায়; নির্ভর করে, যে কারণে তাকে বিশ্বাস করার প্রশ্ন আসে, ওই বিষয়ে সে পূর্ণ দক্ষ কিনা। হয়তো সে ওই মুসলিমের খুব কাছের কেউ, কিংবা তাকে তিনি অনেকদিন ধরে খুব ভালো করেই জানেন, বা লোকটা তার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশী, কিংবা নৈতিকতার প্রশ্নে সে সবার কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। অথবা অন্য যেকোনো ভালো গুণের কারণেই লোকটিকে বিশ্বাস করা যায়। তবে কোনো কাফিরকে বিশ্বাস করাটা একান্তই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মুসলিমের বিচারবিবেচনার ও তার বুদ্ধিমত্তার ওপর। তিনি কাফির, ওই লোকটিকে কতটা চেনেন, কীরকম জানেন তার ওপরই নির্ভর করে—তার থেকে কোনো সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা।[৯৬]

৭) হিজরাতের ঘটনায় মুসলিম নারীদের ভূমিকা: হিজরাতের আকাশে নারীদেরও অনেকগুলো নাম জ্বলজ্বল করছে, যাদের ভূমিকা নেহায়াতই কম নয়। এদের একজন হযরত আবু বাক্র সিদ্দীকের মেয়ে 'আয়িশা। হিজরাতের ঘটনায় তার ভূমিকা সবার থেকে একটু ভিন্ন; মোটেই বিস্মৃত না হয়ে তিনি ঘটনার আদ্যোপান্ত মনে রেখেছেন এবং উম্মাহর কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। অত্যন্ত ধৈর্যশীল উম্মু সালামা; তিনি মাদীনায় হিজরাত করেন। আসমা যাতুন নিতাকাইন; [৯৭] তিনি রাসূল ও আবু বাক্রের জন্য বিভিন্ন বস্তুর জোগান দিতেন। খাবার ও পানীয় সরবরাহ করতেন। কী কষ্টটাই না তিনি আল্লাহর পথে সহ্য করেছেন! ইতিহাসের পাতায় তিনি নিজেই আমাদের কাছে তার ঘটনা ব্যক্ত করেছেন; তিনি বলেন—
'রাসূল ও আবু বাক্র যখন বের হয়ে যান, তার একটু পরই কুরাইশদের একটা দল আমাদের কাছে আসে। আবু জাহল ইবনু হিশামও ছিল তাদের মধ্যে। আবু বাক্রের দরজায় এসে তারা দাঁড়ায়। দেখে আমি এগিয়ে যাই। তারা বলল, হে আবু বাকরের মেয়ে, তোমার বাবা কোথায়? জবাবে আমি বললাম, আমি জানি না, আল্লাহর কসম, আমার বাবা কোথায়! আবু জাহল ছিল বদমাশ ও পাজি প্রকৃতির লোক, সে কষে আমার গালে এমন এক চড় বসাল যে, কানের দুল ছিটকে গিয়ে পড়ে। এরপর তারা চলে যায়। [৯৮]
রাসূল-এর হিজরাতের খবর শত্রুদের কাছে গোপন রাখা এবং উৎপীড়ক ও অত্যাচারীর সামনে ভড়কে না গিয়ে আসমা যেভাবে অবিচল ও অটল ছিলেন, তা সব মুসলিম নারী-পুরুষের জন্যই অনন্য এক শিক্ষা। তার অবিচল ভূমিকা এখানেই শেষ নয়, অন্য একটি ঘটনাও তিনি অত্যন্ত শক্তহাতে সামলেছেন; দাদা আবু কুহাফা তখন অন্ধ, একদিন তার কাছে এসে বলেন, আমি নিশ্চিত আবু বাক্র তার সমুদয় সম্পদ নিয়ে গিয়ে তোমাদের বিপদে ফেলে গেছে। আসমা বললেন, না, অবশ্যই না, দাদা। এই যে আপনি এগুলোর ওপর হাত রেখে দেখুন। আসমা বলেন, তিনি সেগুলোর ওপর হাত রাখলেন। এরপর বললেন, তাহলে তো ঠিকই আছে। যদি সে তোমাদের জন্য সম্পদগুলো রেখেই যায়, তাহলে সে তো ভালোই করেছে। পরে আসমা বলেন, না, আল্লাহর কসম, তিনি আমাদের জন্য কিছুই রেখে যাননি। তবে আমি এর দ্বারা দাদাকে শুধু প্রবোধ দিতে চেয়েছিলাম।[৯৯]
আসমা তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের মাধ্যমে বাবার বিষয়টি গোপন রাখতে সক্ষম হন। তার অন্ধ দাদার মনেও কোনোরূপ সন্দেহের উদ্রেক হতে দেননি। এসব করার জন্য তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়নি। বাস্তবেই আবু বাক্র তাদের জন্য পাথরগুলো রেখে যান। যাতে মেয়ে তার দাদাকে এগুলো দেখিয়ে বুঝ দিতে পারেন। তবে তিনি পাথরগুলোর সঙ্গে তাদের জন্য রেখে যান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও দৃঢ় ঈমান। কোনো পাহাড়ধস যে ঈমানকে টলাতে পারবে না, দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারবে না প্রবল উত্তাল ঘূর্ণিঝড় এসেও। বাবা মেয়ে উভয়েই আল্লাহর ওপর ঈমানের এমন এক স্তরে ছিলেন যে, সম্পদের অভাব-অনটন কিংবা প্রাচুর্য কোনোকিছুই তাদের বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি। আবু বাক্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পরকালীন উচ্চাকাঙ্ক্ষার এমন এক বীজ রোপণ করেন, যা তাদের সকল ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্তি দেয়। দুনিয়ার তুচ্ছ কোনো বস্তু নয়, তাদের চাওয়া কেবল ওপরের দিকে; রবের সন্তুষ্টি কামনাই যার আসল লক্ষ্য। তিনি একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠন করেন, যার নজির বিরল।
আবু বাক্রের কন্যা আসমা-ও মুসলিম নারীদের জন্য স্থাপন করেন অনুপম এক দৃষ্টান্ত। আজ সময় এসেছে মুসলিম নারীরা নিজেদের আসমা-এর আদর্শে উন্নীত করবেন।
রাসূল ও আবু বাক্র হিজরাত করে মাদীনায় চলে যান। আর আসমা ও তার বোনেরা মাক্কাতেই রয়ে যান। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে মুখ বুজে পড়ে ছিলেন সেখানে। নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা, অভাব-অনটনের কথা কাউকে বলেননি। এজন্য কাউকে দোষারোপ করেননি, কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি-এভাবে কিছু দিন কেটে গেল। রাসূল একসময় যাইদ ইবনু হারিসা ও তার মুক্ত দাস আবু রাফিকে মাক্কায় পাঠান। সঙ্গে দিয়ে দেন দুটি উট ও পাঁচশো দিরহাম। তারা মাক্কা যান। ফিরতি পথে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন আল্লাহ্র রাসূলের দুকন্যা ফাতিমা ও উন্মু কুলসুম, আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আহ, 'উসামা ইবনু যাইদ, তার মা উম্মু বারাকা; যার উপনাম উন্মু আইমান। তাদের সঙ্গে এসে আরও যোগ দেন 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু বাক্র, সঙ্গে আবু বাক্রের পরিবার; 'আয়িশা ও আসমা। একটা সময় তারা মাদীনায় এসে পৌঁছেন। সেখানে এসে তারা প্রথমে হারিসা ইবনু নু'মানের বাসায় ওঠেন। [১০০]

৮) আল্লাহ্র রাসূলের কাছে মুশরিকদের গচ্ছিত ধনসম্পদ:
মাক্কার কাফির-মুশরিকরা একদিকে আল্লাহর রাসূলের দাওয়াহ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ বাধায়, তাঁকে হত্যা করার জন্য নানা ফন্দিফিকির করে। অন্যদিকে নিরাপত্তার ভয়ে, চুরি যাওয়ার ডরে নিজেদের ধনসম্পদ অন্য কারও কাছে নয়, নিয়ে রাখত পরম বিশ্বস্ত আল্লাহ্র রাসূলের কাছেই। মজার ব্যাপার হলো, এমন স্ববিরোধী কাজের দৃষ্টান্ত অন্য কোথাও খুব একটা চোখে পড়ে না; যে লোকটাকে তারা মিথ্যাবাদী, জাদুকর এবং পাগল বলে গালমন্দ করত, দিনশেষে হিসাব মিলিয়ে দেখত, তাঁর চেয়ে উত্তম আমানাতদার এবং পরম বিশ্বস্ত ব্যক্তি আর একজনও নেই। তারা আল্লাহর রাসূলের নিকট নিজেদের সম্পদ আমানাত রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাত। এটা প্রমাণ করে যে, সততার প্রশ্নে রাসূল উত্তীর্ণ না হওয়ার কারণে যে তারা তাকে মানে না—ব্যাপারটা তেমন নয়; বরং রাসূল ইসলাম নামের যে সত্যটা নিয়ে আগমন করেছেন, সেটা নিয়েই তাদের মাথাব্যথা। গায়ে জ্বালা ধরার যত কারণ এই সত্য দীনটাই। ইসলাম তাদের ঔদ্ধত্যে, অহংকারের দেওয়ালে প্রবল আঘাত হানে। নিজেদের মিথ্যা ক্ষমতার মসনদ নিয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে না—এ ভয় তাদের পেয়ে বসে।[১০১] আল্লাহ বলেন—
আমি তো জানি, তারা যা বলে তা তোমাকে দুঃখ দেয়। তবে তারা তো তোমাকে অবিশ্বাস করে না; বরং (এই) অত্যাচারীরা (প্রকৃতপক্ষে) আল্লাহর আয়াতসমূহকেই অস্বীকার করে। [সূরা আন'আম, ৬: ৩৩]
রাসূল একে একে গচ্ছিত সম্পদের সবকিছু আলির হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আদেশ করেন, মালিকদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দিতে। তিনি যখন আলিকে আমানাত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করছেন, তখন কঠিন একটা মুহূর্ত; মৃত্যু ওত পেতে আছে রাতের আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে। রাত পোহালেই তাকে হত্যা করা হবে—এমন সিদ্ধান্তে উন্মাদ কাফিররা। কঠিন এই মুহূর্তে মানুষ একটা জিনিসই কেবল ভাবতে পারে—পলায়ন। আল্লাহর রাসূলের তখন ভাবনা হওয়ার দরকার ছিল, কীভাবে হিজরাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সফল করা যায়; কিন্তু তিনি তো আল্লাহর রাসূল. এমন সংকটাপন্ন মুহূর্তেও মালিকদের কাছে তাদের সম্পদ ঠিকঠিকভাবে পৌঁছানোর কথা ভুলে যাননি। ঠিক এমন সঙ্গিন অবস্থায় পড়লে অন্যদের সম্পদের কথা দূরে থাক, নিজেদের কথাই ভুলে যেতাম আমরা।[১০২]

৯) মূল্য দিয়ে বাহন খরিদ:
আবু বাক্র চড়ার জন্য রাসূল-কে একটা বাহন সাধলেন; কিন্তু রাসূল বিনামূল্যে সে বাহনে চড়তে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত আবু বাক্র মূল্য নিতে রাজি হলেই কেবল রাসূল বাহনটিতে চড়ে বসেন। তবে রাসূল তখনই মূল্য পরিশোধ করতে পারেননি। বাকিতে কিনে নেন। বিষয়টি আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, একজন দা'ইর পক্ষে কোনো সময়ই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। তারা কেবল দিতেই জানবেন, নিতে নয়; কল্যাণকর সকল কিছু তারা কেবল দেবেনই।
হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, তারাও আর দশজনের মতোই মানুষ; আর্থিক অভাব- অনটনে পড়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে দান-সাদাকাহ করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে; কিন্তু তাদের জন্য গ্রহীতা হওয়া সাজে না। আর এমন উন্নত মূল্যবোধ ছিল বলেই রাসূল আবু বকরের কাছ থেকে বাহনটি খরিদ করতে জোরাজুরি করেন। রাসূল-এর এ গুণটি কুরআনেরই একটি হুবহু অনুবাদ। আল্লাহ বলেন—
আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। বিশ্বজগতের রবই আমার প্রতিদান দেবেন। [সূরা আশ-শু'আরা, ২৬: ১০৯]
যারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন, বিশুদ্ধ আকীদা পোষণ করেন এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা হাত পাতবেন-এটা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা স্পষ্ট স্ববিরোধী একটা কাজ। তারাই সবকিছু আল্লাহর কাছে চাইতে বলেন। অথচ নিজেদের প্রয়োজনের সময় তারা আল্লাহর কাছে না চেয়ে চাচ্ছেন তাঁরই একজন বান্দার কাছে! দাওয়াহর সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো, মুখে মুখে না বলে আমলটা নিজেই করে দেখানো। এতে মানুষ প্রভাবিত হয়। মানার আগ্রহ জন্মে।
আল্লাহকে ভয় করে তাঁর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশা নিয়ে যে কণ্ঠস্বর দাওয়াহর আওয়াজ উচ্চকিত করে, তার সঙ্গে ওই দা'ইর তফাতটা হবে বিস্তর, যার দাওয়াহর লক্ষ্যই হলো দুনিয়া কামানো। টাকার পেছনে তিনি যখন ছুটবেন, কথা বলবেন টাকার বিনিময়ে, তখন তিনি টাকার কাছে বিক্রিত পণ্য। সত্য বলার কণ্ঠস্বর তখন স্তিমিত একজন অকৃতকার্য 'জড়বস্তু'। প্রাচীন একটা প্রবাদ আছে, ভাড়াটে বিলাপকারিণী কখনোই শোকসন্তপ্ত মায়ের মতো শোকাতুর নয়। দুনিয়ায় লালসিত ব্যক্তি দাওয়াহর কাজে আন্তরিক নয় বলে খুব কম মানুষই তার কথায় প্রভাবিত হয়।[১০৩]

১০) মানুষের ধনসম্পদ থেকে দা'ইকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে: সুরাকা একপর্যায়ে রাসূল-কে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই আমার তৃণীর, এখান থেকে আপনার যতটা ইচ্ছা তির নিতে পারেন। আপনি আরও সামনের দিকে এগোলে অমুক অমুক জায়গায় আমার ভেড়ার পালের দেখা পাবেন। প্রয়োজনমাফিক আপনার যতটা ভেড়া নিতে মন চায়, নিতে পারেন। রাসূল-এর মতো রুচিবান একজন ব্যক্তিত্ব সবিনয়ে সুরাকার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তাকে বলেন, এর কোনোকিছুরই আমার প্রয়োজন নেই।[১০৪]
অন্যের সম্পদের লোভ থেকে দা'ই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে পারলে এই কারণেই মানুষ তাকে ভালোবাসবে, আপন করে নেবে। চিত্রটা যদি বিপরীত হয়, অর্থাৎ অন্যের সম্পদের ওপর তার লোভাতুর চোখ থাকে, তাহলে ভালোবাসা দূরে থাক, মানুষ তাকে ঘৃণা করবে, তার থেকে পালিয়ে বাঁচবে। আল্লাহর পথের একজন দা'ইর জন্য এতে রয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষা।[১০৫]

১১. উন্নত প্রশিক্ষণ ও আনন্দাশ্রু:
আল্লাহর রাসূলের তারবিয়া ও প্রশিক্ষণ দানের মাত্রা কেমন ছিল, তার একটা সাক্ষাৎ প্রতিফলন মেলে আবু বাক্র ও আলির মধ্যে; আবু বাক্রের কাছে মাদীনায় হিজরাতের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করার সময় রাসূল বললেন, তাড়াহুড়ো করো না, আল্লাহ হয়তো তোমার একজন সফরসঙ্গী মিলিয়ে দেবেন। সেদিন থেকেই আবু বাক্র প্রস্তুতি গ্রহণে ও পরিকল্পনা প্রণয়নে লেগে গেলেন। হিজরাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি দুটো বাহন কেনেন। সেগুলোকে নিজের ঘরে রেখেই যত্ন- আত্তি করেন ও খাবারদাবার খাওয়ান। বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি দুটো পশুকে নিজের কাছে রেখে সুমুরের (একধরনের গাছ) পাতা খাইয়েছেন টানা চার মাস। আবু বাক্র আল্লাহ্র রাসূলের ওফাতের পর যিনি হবেন মুসলিমদের প্রথম খলীফা, তিনি অন্তর্দৃষ্টিতে ঠিকই দেখেছেন যে, হিজরাতের ক্ষণটি হবে খুবই কঠিন; আগে থেকে জানান না দিয়ে একদিন হঠাৎ করে এর আদেশ চলে আসবে। বুঝতে পেরে আর বসে ছিলেন না; লেগে যান সফরের বাহন জোগাড়ে, খাদ্য সরবরাহে। নিজের পরিবারকেও প্রস্তুত করেন আল্লাহ্র রাসূলের যেকোনো সেবার প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে।
এরপর একদিন রাসূল ﷺ এলেন। জানালেন, আল্লাহ তাকে মাক্কা ছেড়ে মাদীনায় হিজরাত করার আদেশ করেছেন। শুনে আবু বাক্র-এর কান্না আর থামে না, খুশিতে তিনি কেঁদে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে 'আয়িশা ঘটনাটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর কসম, খুশিতে কেউ এভাবে কাঁদতে পারে, ওই দিনের আগে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। মানুষের খুশির আধিক্যতা প্রকাশের ধরনটাই এমন বিচিত্র; বেশি খুশি হলে সে কেঁদে ফেলে।
আবু বাক্র সিদ্দীক ঠিকই এই সাহচর্যের মানে বুঝে ফেলেন; তিনি তখনই টের পেয়ে যান, অচিরেই বিশ্বজগতের রব মহান আল্লাহর দূতের মহিমান্বিত হিজরাতের সফরসঙ্গী হতে চলেছেন তিনি। জগতের আর কেউ না, তিনি একাই আল্লাহ্ রাসূলের সফরসঙ্গী হতে চলেছেন; নিজেকে সম্মানিতবোধ করলেন। একদিন দুদিন নয়, কমপক্ষে ১৩ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত। তার নেতা, সেনাপতি ও তার বন্ধু মুহাম্মাদ-এর জন্য একান্ত সান্নিধ্যে পাশে থাকবেন, প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দেবেন। একজন লোক পৃথিবীতে এর চেয়ে উত্তম সম্মান আর কী আশা করত পারে? তিনি তো দুনিয়ার যেনতেন কোনো লোকের সফরসঙ্গী নন। তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ, আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ-এর হিজরাতের সফরসঙ্গী। এটা চাট্টিখানি কোনো কথা নয়; গোটা দুনিয়ায় আর কারও কপালে এমন সম্মান জুটেছে?[১০৬] গুহায় অবস্থানকালে আবু বাক্র ভয় পেয়ে যান এই বুঝি মুশরিকরা দেখে ফেলল! তার এই ভয় ছিল স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায়। মুশরিকরা এখনই নিজের প্রাণবায়ু বের করে ফেলবে—এমন ভাবনা ঘুণাক্ষরেও তার মনে ঠাঁই পায়নি। জীবনের মায়া যদি তিনি করতেনই, তাহলে কখনোই এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর খড়্গ ঝুলে থাকা আল্লাহ্র রাসূলের সফরসঙ্গী হতে রাজি হতেন না। কারণ, তিনি নির্বোধ ছিলেন না। ভালো করেই জানতেন যে, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে তাকেও যদি মুশরিকরা পাকড়াও করতে পারে, তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু। জোটবদ্ধ মুশরিকরা এর চেয়ে কম মাত্রার কোনো শাস্তি দেবে না। সবকিছু জেনেশুনেই তিনি এখন আল্লাহ্র রাসূলের হিজরাতের সফরসঙ্গী। তার যত উৎকঠা আল্লাহ্র রাসূলের জীবন নিয়ে। তিনি উদ্বিগ্ন, রাসূল যদি মুশরিকদের হাতে ধরা পড়ে যান, তাহলে সদ্য প্রস্ফুটিত ইসলামের কী হবে?[১০৭]
শুধু গুহাতেই নয়, আবু বাক্র হিজরাতের সফরে পথের পুরো সময়টাই আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। পথে এক লোক তাকে জিজ্ঞেস করে বসল, আপনার সঙ্গে উনি কে? আবু বাক্র বললেন, ইনি একজন পথপ্রদর্শক; আমাকে পথ দেখান। লোকটি মনে করল, আবু বাক্র বুঝি পথ দ্বারা এখানে মরুভূমির রাস্তা বুঝাচ্ছেন; কিন্তু তিনি তো পথ দ্বারা এখানে বুঝিয়েছেন হিদায়াতের পথ, কল্যাণের পথ। তাই তো রাসূল মানবজাতিকে কল্যাণের পথেরই দিশা দেন। তিনি তো আলোর পথেরই দিশারি। আবু বাক্র এখানে কোনো মিথ্যা আশ্রয় নেননি; বরং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে হিজরাতের গোপনীয়তা রক্ষা করে লোকটার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এমনও তো হতে পারত, লোকটা আল্লাহ্ রাসূলের পরিচয় জেনে গেলে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত![১০৮] আবু বাক্র সে ঝুঁকিটা পর্যন্ত নেননি। সত্য কথা বলেই তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে লোকটার প্রশ্নের উত্তর দেন। [১০৯]
এবার আসা যাক 'আলি ইবনু আবু তালিবের কথায়। তিনিও রাসূল-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ইসলামের জন্য ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ। নেতা মুহাম্মাদ-এর গায়ে যেন একটা আঁচড়ও না লাগে, সেজন্য এগিয়ে গেলেন নিজের জীবন নিয়ে। কারণ, রাসূল যদি নিরাপদ থাকেন, তাহলে ইসলাম নিরাপদ থাকবে। আর তাঁর কোনো ক্ষতি মানে ইসলামেরই ক্ষতি। হিজরাতের রাতে আল্লাহর রাসূলের বিছানায় নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়েন তিনি। সকালবেলা তাকেই মুহাম্মাদ ভেবে কুরাইশদের সবগুলো তলোয়ার একযোগে আঘাত হানতে পারে—এমন বিপদের কথা জেনেও তিনি পরোয়া করেননি। নিশ্চিন্তে চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন আল্লাহর রাসূলের বিছানায়। তার জীবনের বিনিময়ে হলেও মুসলিম উম্মাহর নবি, আল্লাহর রাসূল নিরাপদ থাকবেন—এর চেয়ে ভিন্ন কিছু চাওয়া ছিল না।[১১০]

১২) একজন আদর্শ নেতার বৈশিষ্ট্য:
আবু বাক্র রাসূল-কে কতটা ভালোবাসতেন, হিজরাতের বিস্তৃত আলোচনায় তার একটা ঝলক আমাদের নজরে এসেছে। আল্লাহর রাসূলের সব সাহাবিই তাঁকে এমন ভালোবাসতেন। সীরাতের পরতে পরতে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। অন্তরের গহিন থেকে এ ভালোবাসা উৎসারিত ছিল। মোটেও কপট কিংবা মেকি নয়। ছিল না পার্থিব কোনো স্বার্থ উদ্ধার; কিংবা রাসূল-কে ধরে নিজের আখের গোছানোর ফন্দি। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেই রাসূল-কে তারা ভালোবাসতেন। একজন নেতার যত ভালো গুণ থাকতে পারে, তার সবই ছিল আল্লাহ্র রাসূলের মাঝে। সাহাবিরা সেগুলো নিজ চোখে দেখেছেন। তারা দেখেছেন, রাসূল জেগে থাকেন, তারা যেন ঘুমাতে পারেন। তিনি কাজ করে যান আপন মনে, যেন তারা বিশ্রাম নিতে পারেন। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে পরিতৃপ্ত করে যান তাঁর সাহাবিদের। তিনি আকাশে ধরাছোঁয়ার বাইরে জ্বলতে থাকা তারার মতো কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি তাদেরই একজন হয়ে তাদের নেতা ছিলেন; সবার সুখে সুখী যেমন সবার দুঃখেও দুঃখী। তিনি সাহাবিদের চিন্তার সমান ভাগীদার হতেন, পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের হাত। রাসূল তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে যেভাবে উত্তম আচরণ করতেন, কোনো নেতা যদি ঠিক সেভাবেই তার অনুগামীদের সঙ্গে করেন, স্রেফ আল্লাহর জন্য তাদের দুঃখে-সুখে পাশে থাকবেন, তাহলে অবশ্যই সে নেতা অধস্তন এবং অনুগামীদের থেকে এমন ভালোবাসাই পাবেন। বিশেষ করে তিনি যদি মুসলিম উম্মাহর নেতা হয়ে থাকেন, তাহলে অনুসারীদের এমন ভালোবাসা তার জন্য অবধারিত।[১১১]
অধীনদের হয়তো জোর করে কোনো কাজে বাধ্য করা যায়; কিন্তু তাদের ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তারা হয়তো তাদের নেতাকে ঘৃণা করে, ভয়ের কারণে প্রকাশ করে না। সত্যিকারের নেতা তো আসলে তিনিই, যিনি জোর করে নয়, কাজ আদায় করেন ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। নিজের উত্তম আচরণ দিয়ে জয় করেন অনুসারীদের মন। নেতা অনুসারীদের প্রতি কতটা উদার, কেমন উত্তম আচরণ করেন তাদের সঙ্গে—এর ওপরই নির্ভর করে অনুসারীর আনুগত্যের মাত্রা। অনুসারীদের জন্য তিনি নিজেকে যতটা বিলিয়ে দিতে পারবেন, ততটা ভালোবাসা পাবেন তাদের থেকে। তারা তাকে প্রাণখুলে ভালোবাসবে। আল্লাহ্র রাসূলের মতো একজন উত্তম নেতার নজির পৃথিবীতে বিরল; অনুসারী ও সাহাবিদের প্রতি তিনি একই সঙ্গে দরদি ও সমব্যথী ছিলেন। তাঁর অধিকাংশ সাহাবি নিরাপদে মাদীনায় হিজরাত করে চলে যাওয়ার পরই কেবল তিনি হিজরাত করেন। [১১২]

১৩) পথিমধ্যে বুরাইদা আল-আসলামির ইসলাম গ্রহণের ঘটনা:
পরিস্থিতি যত কঠিন হোক, বিপদ যত বড় হোক, সত্যিকার মুসলিম এগুলোকে পরোয়া করে না। আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকার ক্ষুদ্র কোনো সুযোগও তিনি অবহেলায় হারাতে চান না। প্রতিটি সুযোগ তার কাছে সুবর্ণ। মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকে সে সুযোগকে তিনি যথাযথ কাজে লাগান। আল্লাহর নবি ইউসুফ সুযোগের এমনই সদ্ব্যবহার করেছিলেন। অন্যায়ভাবে জেলের প্রকোষ্ঠে তখন তিনি বন্দি। সুন্দর আচরণে মুগ্ধ হয়ে অন্য বন্দিরা তার চারপাশে ভিড় জমায়। শুনতে চায় তার মুখের মিষ্টি বাণী। তিনি সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না। জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠ তাকে তাওহীদের দাওয়াহ দেওয়া থেকে বিমুখ করতে পারেনি। লোকদের তিনি এক আল্লাহর কথা শোনালেন। আল্লাহর সঙ্গে শিরক না করার কথা বললেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করা যাবে না—সে কথাও জানালেন। কেবল আল্লাহর সামনেই নত হতে বলেন, কোনো সৃষ্টিজীবের সামনে নয়। আল্লাহ বলেন—
এবং আমি আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করেছি। আমরা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করি না। এটা আমাদের প্রতি ও মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। হে কারাগারের সঙ্গীদ্বয়, পৃথক পৃথক অনেক প্রভু ভালো নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? আল্লাহ ব্যতীত তোমরা তো কেবল কতগুলো নামের পূজা করছ, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের বাপদাদারাই রেখেছ। আল্লাহ তো ওগুলো সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাঠাননি। কার্যকর নির্দেশ তো একমাত্র আল্লাহরই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কিছুরই উপাসনা না করো। এটাই সঠিক ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। [সূরা ইউসুফ, ১২: ৩৭-৪০]
সূরা ইউসুফ মাক্কি; আল্লাহর পথে ডাকার জন্য রাসূল-কে আল্লাহ তা'আলা আগেকার নবি-রাসূলদের পথ ও পন্থা অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন। রাসূল অক্ষরে অক্ষরে আল্লাহর আদেশ মেনে চলেছেন। মাক্কা ছেড়ে মাদীনার পথে যখন তিনি হিজরাত করছিলেন, রক্তলোলুপ খুনি মুশরিকরা পেছন পেছন ধাওয়া করে আসছে। ঘোষণা দিয়েছে, জীবিত কিংবা মৃত রাসূল-কে ধরে আনতে পারলে নগদ ১০০ উট পুরস্কার। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও রাসূল তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব ভুলে যাননি। পথে বুরাইদা ইবনুল হুসাইব আল-আসলামি নামের একজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়। লোকটির সঙ্গে তার জাতির আরও কয়েকজন ছিল। রাসূল তাদের ইসলামের পথে আহ্বান জানালে তারা বিশ্বাস করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।[১১৩]
ইমাম ইবনু হাজার আস্কলানি উল্লেখ করেন, মাদীনায় হিজরাতের পথে রাসূল বুরাইদা ইবনুল হুসাইব ইবনু 'আবদুল্লাহ ইবনু হারিস আল-আসলামির সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তাকে ইসলামের পথে আহ্বান করেন। বুরাইদা ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের একজন দা'ই বনে যান এবং পরবর্তী সময়ে তিনি আল্লাহ্র রাসূলের সঙ্গে থেকে ১৬ টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।[১১৪] তার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তার গোত্র 'আসলাম'-এর লোকদের জন্য হিদায়াতের দুয়ার খুলে দেন। তার দাওয়াহর মধ্য দিয়ে পুরো গোত্র ইসলামের দিকে আসে। রাসূল তার সম্পর্কে বলেছেন, 'আসলাম', আল্লাহ একে নিরাপদ করেছেন। 'গিফার', আল্লাহ একে ক্ষমা করেছেন। এটা আমি বলছি না। এ কথা বলছেন আল্লাহ নিজেই।[১১৫]

১৪) দুজন চোরের ইসলাম গ্রহণ:
মাদীনার কাছাকাছি একটা জায়গায় মুহানান নামের দুজন চোরকে দেখে রাসূল এগিয়ে যান। উপস্থাপন করেন ইসলামের অনুপম শিক্ষা। আল্লাহর রাসূলের কথা শুনে তারা মুগ্ধ হয়ে ইসালম গ্রহণ করেন। এরপর রাসূল তাদের নাম জানতে চান। জবাবে তারা বলেন, আমরা মুহানান (অপদস্থ)। রাসূল বললেন, না, তোমরা বরং মুক্তমান (সম্মানিত)। এরপর রাসূল তাদের দুজনকে মাদীনায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন।[১১৬] চোর দুজনের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সপ্রমাণ যে, আল্লাহর পথে দাওয়াহ দেওয়াকে রাসূল কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। চলতি পথে পাওয়া ছোট্ট একটা সুযোগও তিনি হাতছাড়া করেননি; দাওয়াতের কাজে সদ্ব্যবহার করেছেন। চোর দুজনকে ইসলামের পথে ডেকেছেন। সে ডাকে তারাও সাড়া দিয়েছেন। গ্রহণ করেছেন ইসলাম। [১১৭]

১৫) পথে আল্লাহ্র রাসূলের সঙ্গে যুবাইর ও তালহার সাক্ষাৎ:
পথে আরেকটি ঘটনা ঘটে। যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম একটি বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে শাম থেকে ফিরছিলেন। পথে দেখা হয়ে যায় আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে। রাসূল ও আবু বাক্রকে তিনি সাদা কাপড় উপহার দেন। ঘটনাটি ইমাম বুখারি উল্লেখ করেছেন।[১১৮]
সীরাতপ্রণেতারা অন্য একটি ঘটনাও নিয়ে আসেন তাদের বইয়ে। সেটা হলো, তালহা ইবনু 'উবাইদুল্লাহও হিজরাতের সে পথে তাদের দুজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তখন শাম থেকে ফিরছিলেন। কিছু কাপড় তিনিও উপহার দিয়েছিলেন।[১১৯]

১৬) শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ অপসারণে দীনের ভূমিকা:
গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করা ও শত্রুতাকে মিত্রতায় উন্নীত করার জন্য ইসলামি অনুশাসনের বিকল্প নেই। পৃথিবীর আর কোনো ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা অন্য কোনো মূল্যবোধের সাধ্য নেই, এমন একটা ভূমিকা পালন করে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা ব্যতীত জাতিতে জাতিতে ভেদাভেদ ঘোচানো কোনো কালেই সম্ভব না। বিগত কয়েকটি পরিচ্ছেদের আলোচনায় আমরা দেখেছি, ইসলাম কী করে অসম্ভব একটা কাজকে সম্ভব করেছে। আওস ও খাযরাজের মতো চিরশত্রু গোত্র দুটোকে ইসলাম একত্র করেছে। মিটিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগ চলতে থাকা তাদের ক্রুদ্ধ-যুদ্ধের ইতিহাস। যে আওস ও খাযরাজের লোকেরা মওকা পেলেই একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারাই কিনা এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসলামের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আরও দেখেছি, কীভাবে ইসলাম মাদীনার আনসার সাহাবিদের মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়; মাক্কার মুহাজিরদের সাদরে গ্রহণ করেন তারা। নেন আপন করে। পরস্পরে এমন ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান, পৃথিবীর ইতিহাস যা কেউ কোনোদিন দেখেনি, আর দেখবে কিনা সন্দেহ। সমাজে শান্তি আনয়নের অংশ হিসেবে সংস্কারকরা সাহাবিদের এই সব ভ্রাতৃত্বের উপমা পেশ করে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।
ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা মনে লালন করা এবং সে অনুযায়ী জীবনধারণের প্রচেষ্টা ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো চিন্তাচেতনা, মন্ত্র-তন্ত্র, প্রতীক সভ্যতা কার্যকর ও আদর্শ শক্তি হতে পারে না।
এখনো ইসলামি বিশ্বাসের শক্তিমত্তা ও এর প্রভাব সম্পর্কে দীনের শত্রুরা সম্যক ওয়াকিবহাল। যার ফলে তারা এই বিশুদ্ধ আকীদার শক্তিমত্তা কমিয়ে দিতে গোপনে গোপনে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। মুসলিমদের মন-মগজ থেকে দীনের প্রভাব ঝেটিয়ে বিদায় করতে তারা সাধ্যের কিছু বাকি রাখছে না। একের পর এক নতুন নামে, সুন্দর মোড়কে বিশুদ্ধ আকীদাবিরোধী বিভিন্ন মতবাদ তুলে ধরছে আমাদের সামনে। জাতীয়তাবাদ, দেশাত্মবোধের চেতনা ও সাম্প্রদায়িকতার গালভরা মন্ত্র গিলিয়ে সামগ্রিক ঐক্যের বাসনা বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা পরিবর্তন- পরিমার্জন ও বিকৃতির মিশন নিয়ে এগিয়ে চলেছে দুর্দান্ত গতিতে। নানান ফিরকা ও মতবাদ উসকে দিয়ে ইসলাম নামের দুর্গে ক্রমাগত আঘাত করে যাচ্ছে। [১২০]

১৭) রাসূল মাদীনায় পৌঁছালে সাহাবিদের আনন্দ:
রাসূল নিরাপদে মাদীনায় এসে পৌঁছেছেন। ইয়াসরিবের অধিবাসী আনসার ও মুহাজিরগণ এ খবরে যারপরনাই খুশি। ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নারী ও শিশুরা। পুরুষ সবাই কাজ ফেলে দৌড়ে আসেন রাসূল-কে সংবর্ধনা দিতে। আনন্দের এই মিছিলে ইয়াহুদিরাও এসে যোগ দেয়। তবে এটা ছিল বাহ্যিক প্রকাশ। কীভাবে আল্লাহর রাসূলের ক্ষতি করা যায়, তলে তলে সে ষড়যন্ত্রে মত্ত ছিল তারা; কিন্তু মু'মিনদের আনন্দ ইয়াহুদিদের ন্যায় মেকি বা কপট ছিল না। অনেকদিন পর আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন, এ আনন্দে তারা বিভোর। একটা জীবন তো তারা আগুনের কুণ্ডলীর কাছাকাছি ছিলেন। বাস করেছেন অন্ধকার জগতে। রাসূল-ই তাদের আগুনের কিনারা থেকে উদ্ধার করেন। অন্ধকার পথ থেকে নিয়ে আসেন পরাক্রান্ত, প্রশংসিত রবের নির্দেশিত আলোর ভুবনে। [১২১]
মাদীনায় রাসূল-কে আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের সংবর্ধনা থেকে একটা বিষয় অনুমিত হয়, আমির-উমারা ও আলিম-উলামাগণের সম্মানার্থে এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানানো যেতে পারে। এতে দোষের কিছু নেই। রাসূল-কেও আনসার ও মুহাজিরগণ এগিয়ে গিয়ে সম্মান দেখিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। তারা রাসূলকে ভালোবেসেই সম্মানপ্রদর্শন করেন এবং এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানান; কিন্তু এ সময়ে আমাদের নেতারা যেভাবে সংবর্ধনা নেন, সেটা সমীচীন নয়। রাসূলুল্লাহকে সংবর্ধনা দেওয়ার সঙ্গে এদের সংবর্ধনা দেওয়ার দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।
রাসূল-কে সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনা থেকে আরেকটি জিনিস অনুমিত হয়। উত্তম ও কল্যাণকর কাজে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করা। সম্মানিত ব্যক্তিকে, জ্ঞানী-গুণীজনকে সমীহ করার ক্ষেত্রে পরস্পরে রীতিমতো পাল্লা দেওয়া যেতে পারে। মদিনায় রাসূল আসার পর আমরা এমনই একটা চিত্র দেখি। সব গোত্রের একই আশা, রাসূল তার আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। গোত্রের পুরুষেরা বেরিয়ে আসেন আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সাহাবিদের এমন প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। [১২২]

১৮) 'ধীরে চলো' নীতি:
মাক্কা পর্বের শেষ দিকের আলোচনায় আমরা লক্ষ করে থাকব, আনসারদের প্রথম প্রতিনিধিবর্গ মক্কায় এসে পৌঁছালে রাসূল তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। ইসলামের প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা ছাড়া সে সময় তিনি আর কিছুই করেননি। প্রতিনিধিদলটি পরের বছর আবার এলেন। রাসূল এবার 'বাই'আতুন-নিসা' বা মহিলাদের আনুগত্যের শপথের ন্যায় তাদের থেকেও একই শপথ গ্রহণ করেন; ইবাদাত, সচ্চরিত্র এবং মহৎ ও কল্যাণকর কাজ সম্পাদনের শপথ। এরপর তারা আবারও মক্কায় আসেন। এবার রাসূল তাদের থেকে যে শপথটা নিলেন, ইতিহাসে সেটা আকাবাহ্র দ্বিতীয় বাই'আত নামে খ্যাত; জিহাদ-অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, দীনকে সাহায্য ও রাসূল-কে আশ্রয় দেবেন-এ মর্মে তারা আনুগত্য করেন। [১২৩]
এখানে খেয়াল করার বিষয়, তাদের থেকে জিহাদ বা যুদ্ধের শপথ গ্রহণ করার জন্য পাক্কা দুবছর সময় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটা শপথের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে তারা সময় লাগিয়েছেন টানা দুবছর। যখন তারা নিজেদের প্রস্তুত মনে করলেন, আর দেরি করলেন না, আল্লাহর রাসূলের সমীপে এসে ব্যক্ত করেন জিহাদের শপথ। এভাবে তিলে তিলে বিষয়টি পূর্ণতার দিকে গড়ায়। প্রথমদিন থেকে ইসলাম ধীরে-সুস্থে চলার যে পদ্ধতি গ্রহণ করে এগোচ্ছিল, তার সঙ্গে পূর্ণ সংগতি রেখেই সম্পাদিত হয় এই গুরুত্বপূর্ণ বাই'আত পর্ব। [১২৪]
ধাপে ধাপে চলার বিষয়টিকে আল্লাহ তাঁর নবি-এর জন্য আবশ্যক করে দিয়েছেন। রাসূল কখনোই তাঁর রবের নির্দেশিত এ পথের বাইরে হাঁটেননি। তিনি মাদীনার আনসারদের কাছে থেকে দুটো আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। একদম 'ধীরে চলো' নীতির আলোকে; তাড়াহুড়ো করে নয়। যার কারণে দুটো বাই'আতই ফলপ্রসূ ও কার্যকারিতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে; প্রথম আনুগত্যের শপথে ছিল ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষার উপস্থাপন, দ্বিতীয়টি ছিল জিহাদ অর্থাৎ ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধব্যবস্থার প্রতিজ্ঞা। কী অপূর্ব বিচক্ষণতা এবং ধারাবাহিকতা দুটোর মধ্যে; একত্রেই যেমন সব গিলিয়ে দেওয়া হয়নি, পরের জিনিসকে আগে আর আগের জিনিসকে পরে নিয়ে এসেও লেজেগোবরে করে ফেলা হয়নি।
আরেকটা জরুরি কনসেপ্ট হলো, ইসলাম ব্যতীত কোনো আদর্শ, নৈতিকতার প্রতিযোগিতা কিংবা কল্যাণের পথে প্রাণ বিসর্জনও একটি জীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গতা নয়। আনসাররা আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ধাতস্থ করেন নিজেদের ইসলামের সঙ্গে। মোটামুটি দুই বছর ইবাদাত-বন্দেগি ও মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর তারা জিহাদ করার শপথ গ্রহণ করেন।
এখানে দ্রষ্টব্য যে, ইসলাম এসেছে তাও অনেক দিন হয়ে গেল। ওই দিনের আগ পর্যন্ত রাসূল কোনো মুসলিমের কাছে থেকেই জিহাদের শপথ নেননি। মাক্কার মুসলিমদের আরবের মোড়ল কুরাইশরা যেভাবে দাবিয়ে রাখত, আনসারদের বেলায় তেমন কোনো বিপত্তি ছিল না। জিহাদের শপথ নেওয়ার জন্য ইসলাম এখানে আনসারদের মতো মানুষ পেল; এমন একটা গুরুতর দায়িত্ব গ্রহণে যাদের কোনো বাধা কিংবা পিছুটান ছিল না। ইয়াসরিবের মতো শহর জুটল, ভৌগোলিক দিক থেকে যে একটি প্রাকৃতিক দুর্গ হয়ে আগলে রেখেছিল তার জনপদকে। অন্যদিকে মক্কা তখন পর্যন্ত যুদ্ধের জন্য যথার্থ বলে বিবেচিত ছিল না। কুরাইশের কাফিরদের বেপরোয়া আচরণে সাহাবিরাও ছিলেন বিপর্যস্ত। [১২৫]
শারী'আতের বিধানদাতা আল্লাহ ভালো করেই জানেন, কখন কোন বিধান দিতে হবে; মুসলিমদের একটা ইসালমি রাষ্ট্র হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহও তাদের ওপর জিহাদ করাকে আবশ্যক করেননি। রাষ্ট্রটি হবে দুর্গসম এমন এক আবাসন, যেখানে গিয়ে তারা আশ্রয় নেবে। ইতিহাসে প্রথম এই ইসলামি রাষ্ট্রের নাম 'আল- মাদীনাতুল মুনাওয়ারাহ।'[১২৬]
আল্লাহর রাসূলের হাতে করা আনসারদের প্রথম বাই'আতের ভিত্তি ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ-এর ওপর ঈমান ও পূর্ণ আস্থা। আর দ্বিতীয় বাই'আতের ভিত্তি হলো, হিজরাত ও জিহাদ। এ তিনটি মৌলিক কাজ অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান, হিজরাত ও জিহাদের মাধ্যমে মাদীনাতে ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। আবার যদি আশ্রয়দানে আগ্রহী এমন একটা দল প্রস্তুত না থাকত, তাহলে হিজরাত করা সম্ভব হয়ে উঠত না। আর আল্লাহ কুরআনে এ তিনটি ভিত্তিকে ব্যক্ত করেছেন এভাবে—
যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে, নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদের) আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারা সবাই একে অপরের মিত্র। আর যারা ঈমান এনেছে; কিন্তু হিজরাত করেনি, তাদের প্রতি তোমাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরাত করে। আর যদি তারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তাহলে (তাদের) সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য; তবে তা এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের মৈত্রীচুক্তি রয়েছে। আর তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সব দেখতে পান। [সূরা আনফাল, ৮: ৭২]
আল্লাহ আরও বলেন—আর যারা পরে ঈমান এনেছে এবং হিজরাত করে তোমাদের সঙ্গে জিহাদও করেছে তারাও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত। আর রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়রা (উত্তরাধিকার প্রশ্নে) আল্লাহর বিধানে পরস্পরের অধিকতর হকদার। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে অবগত আছেন। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৫]
রাসূল ও সাহাবিদের মাদীনায় হিজরাতের সবশেষ পটভূমি ছিল জিহাদের শপথ। এভাবেই ইসলাম তার নিজের জন্য এমন একটি নিবাসের সন্ধান পায়, যেখান থেকে সত্যের দা'ইরা অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও কৌশলের সঙ্গে দীনের দাওয়াহ নিয়ে ছুটবেন পৃথিবীর দিদিগন্তে। সেখানে গড়ে ওঠে আল্লাহর নাযিলকৃত শারী'আতের পূর্ণ আনুগত্যসমেত ইসলামি রাষ্ট্র।[১২৭]

১৯) আল্লাহর পথে ত্যাগের অনুপম এক দৃষ্টান্ত হিজরাত:
নিজেদের পিতৃভূমি মাক্কা ছেড়ে মাদীনায় হিজরাত করাটা রাসূল ও তাঁর সাহাবিদের জন্য নিঃসন্দেহে বিরাট ত্যাগ। হিজরাতের প্রাক্কালে মক্কাকে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, তুমি আল্লাহর যমিনের শ্রেষ্ঠ অংশ এবং আল্লাহর কাছে আল্লাহর যমিনের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় তুমিই। আমাকে যদি বের করে দেওয়া না হতো, আমি কখনোই বের হতাম না।[১২৮]
'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল যখন মাদীনায় আগমন করেন, তখন সেটা আল্লাহর যমিনের মধ্যে জ্বর-উপদ্রুত একটা এলাকা। রং ও স্বাদ বিনষ্ট হওয়া লোনা পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে এখানকার উপত্যকাগুলো। তাই কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের বিভিন্ন রোগ-বালাই পেয়ে বসে। তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এসব রোগ-বালাই থেকে রক্ষা করেন। আবু বাক্র, 'আমির ইবনু ফুহাইরা ও বিলাল এক ঘরেই থাকতেন। তারাও জ্বরে আক্রান্ত হন। আমি তাদের দেখতে যেতে চাইলে রাসূল আমাকে অনুমতি দিলেন। এটা পর্দার বিধান আসার আগের ঘটনা। আমি তাদের ঘরে গিয়ে দেখি প্রত্যেকের অবস্থা খুবই সঙ্গিন; জ্বরের মাত্রা ভয়াবহ। আমি একে একে সবার কাছে গিয়ে খোঁজখবর নিলাম। জানতে চাইলাম, তারা এখন কেমন বোধ করছেন। আমার কথার উত্তর তারা ঠিকই দিয়েছেন; কিন্তু জ্বরের প্রকোপে হয়তো নিজেরাই জানেন না কী বলেছেন!
আমি তাদের অবস্থার কথা রাসূল-কে জানাই। তিনি আল্লাহর নিকট দু'আ করে বলেন, হে আল্লাহ, আমাদের কাছে মাদীনাকে প্রিয় করে দিন, যেভাবে আপনি মাক্কাকে আমাদের কাছে প্রিয় করে দিয়েছিলেন বা তা থেকেও বেশি। আপনি এখানকার জ্বর জুহফাহর দিকে স্থান্তরিত করেন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের মুদ্দ ওসা'-এ বারাকাহ দিন।[১২৯]
আল্লাহ তাঁর আল্লাহর রাসূলের ডাকে সাড়া দেন, দু'আ কবুল করেন। এরপরই মুসলিমরা জ্বর থেকে সেরে ওঠেন। মাদীনা মুহাজির ও তার কাছে আগত মেহমানদের জন্য হয়ে ওঠে নির্মল পরিবিশের অনন্য আবাসন। [১৩০]

২০) উম্মু মা'বাদকে আল্লাহ্র রাসূলের প্রতিদান:
মাদীনায় হিজরাতের পথে উম্মু মা'বাদের ওখানে আল্লাহর রাসূলের যে মু'জিযা প্রকাশ পেয়েছে, তা আমরা পেছনে আলোচনা করেছি। বর্ণিত আছে, ওই ঘটনার পর উম্মু মা'বাদের ভেড়ার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। একদিন তিনি তার বিশাল ভেড়ার পালের একটা অংশ নিয়ে মাদীনায় এসে হাজির। ওই সময় আবু বাক্র সেখান দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। মহিলার ছেলে তাকে দেখেই চিনে ফেলেন। মাকে বলেন, মা, ওই দিন কল্যাণময় লোকটির সঙ্গে যে ব্যক্তি ছিলেন, ইনিই সে লোক।
উম্মু মা'বাদ এগিয়ে যান আবু বাক্রের দিকে। গিয়ে বলেন, হে আবদুল্লাহ (কারও নাম না জানলে আরবরা সবাই এই নামেই সম্বোধন করে), আপনার সঙ্গে ওদিন যিনি ছিলেন, তিনি কে?
আবু বাক্র তাঁকে পালটা প্রশ্ন করেন, আপনি কি বুঝতে পারেননি, তিনি কে?
উম্মু মা'বাদ বলেন, না।
আবু বাক্র রা. বললেন, তিনি আল্লাহর নবি। এরপর আবু বাক্র তাকে নিয়ে আল্লাহ্র রাসূলের কাছে আসেন। রাসূল তাকে খাবার খাওয়ালেন এবং দিয়েও দিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, এরপর তিনি আমার সঙ্গে রওনা দিলেন এবং রাসূল-কে আরবের বিখ্যাত একটা পণ্য হাদিয়া দিলেন। রাসূলও তাকে কাপড় উপহার দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি ও তার স্বামী হিজরাত করেন। তার ভাই খুনাইসও ইসলাম গ্রহণ করেন। মাক্কা বিজয়ের দিন তিনি শহিদ হন। [১৩১]

২১) আবু আইয়ুব আল-আনসারির আতিথেয়তা:
আবু আইয়ূব আল-আনসারি বলেন, মাদীনায় আসার পর রাসূল আমার বাড়িতেই মেহমান হিসেবে অবস্থান করেন। তিনি থাকতেন নিচ তলায় আর আমি ও আইয়ূবের মা ওপরের তলায়। আমি রাসূল-কে বললাম হে আল্লাহর নবি, আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আমি এটাকে ঘৃণা করি এবং বড় ধরনের ধৃষ্টতা মনে করি যে, আপনি নিচে অবস্থান করছেন আর আমি কিনা ওপরে! আপনি ওপরে উঠে আসুন এবং সেখানেই অবস্থান করুন। আমরা নিচে নেমে আসি। রাসূল বললেন, হে আবু আইয়ূব, বাসার নিচ তলায় অবস্থান করাটা আমাদের যেমন সহজ, তেমনই সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্যও সুবিধা। একদিন আমাদের পানিভর্তি বড় একটা মটকি ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি ও আইয়ূবের মা আমাদের এক টুকরা মখমল দিয়ে দ্রুত সব পানি শুকিয়ে ফেলি। পানি শুকানোর মতো আমাদের কাছে অন্য কিছু ছিল না বিধায় এই ব্যবস্থা। ভীষণ ভয় হচ্ছিল, পানির ফোঁটা গড়িয়ে নিচে আল্লাহর রাসূলের গায়ে পড়ে তাকে কষ্ট দেবে। [১৩২]

২২) আলি ইবনু আবু তালিবের হিজরাত:
রাসূল তাঁর নিকট গচ্ছিত রাখা লোকদের মালামাল হিজরাতের রাতে 'আলি-এর হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আসেন। 'আলি যথাযথভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন; যার যার মাল তার তার কাছে বুঝিয়ে দেন। এরপর তিনি সময়-সুযোগ করে মাদীনার উদ্দেশে হিজরাত করেন। রাসূল কুবায় গিয়ে পৌঁছানোর দুই কি তিন রাত পর 'আলি কুবায় গিয়ে পৌঁছেন; সেখানেই তিনি আল্লাহর রাসূলের সাক্ষাৎ পান। দুই রাত কাটানোর পর আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে জুমার দিনে মাদীনার উদ্দেশে রওনা দেন। [১৩৩]
কুবায় অবস্থানকালে 'আলি একটা অবাক করা বিষয় লক্ষ করেন। দেখেন, এক অবিবাহিত লোক গভীর রাতে একজন মুসলিম নারীর দরজায় এসে কড়া নাড়ছেন। দরজা খুলে যায়। বেরিয়ে আসেন সে নারী। লোকটি তার হাতে কী যেন একটা তুলে দেন। তিনি সেটা গ্রহণ করেন। 'আলি বলেন, লোকটার ব্যাপারে আমার সন্দেহ জাগে। আমি মহিলার কাছে গিয়ে জানতে চাই, হে আল্লাহর বান্দি, কে এই লোক, যিনি প্রতি রাতে তোমার দরজায় আসেন? কিন্তু তুমি তো একজন মুসলিমাহ। উপরন্তু তোমার এখনো বিয়েশাদি হয়নি! উত্তরে মহিলা বললেন, লোকটার নাম সাহল ইবনু হুনাইফ ইবনু ওয়াহাব। কীভাবে যেন তিনি জানতে পারেন, আমি একাকী থাকি, আমার আর কেউ নেই। তাই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তার জাতি পূজা- অর্চনা করে চলে যাওয়ার পর তিনি সে মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন। তারপর ভাঙা টুকরাগুলো আমাকে এনে দেন জ্বালানির কাজে ব্যবহার করার জন্য। পরবর্তীকালে 'আলি যখন ইরাকে অবস্থান করছিলেন তখন সেখানেই তার কাছে সাহল ইবনু হুনাইফ মারা যান। [১৩৪]

২৩) মানব ইতিহাসে আল্লাহ্র রাসূলের হিজরাতের গুরুত্ব:
মাক্কা থেকে মাদীনায় আল্লাহর রাসূলের হিজরাত এমন একটি মহান ঘটনা, যা ইতিহাসের গতিধারা পালটে দেয়। ঝিমিয়ে পড়া জীবন ও জীবনপ্রণালি আবার জেগে উঠে। এই হিজরাতের কারণেই ব্যক্তি ও সমাজ আবার প্রাণ ফিরে পায়। [১৩৫]

২৪) নবি-রাসূলগণের এক অমোঘ নিয়তি হিজরাত:
আল্লাহর পথে, আল্লাহর জন্য হিজরাত করার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়; প্রাচীনকাল থেকেই এই রীতি চলে আসছে। হিজরাতের ইতিহাসে মুহাম্মাদ-এর বসতভিটা ছেড়ে যাওয়া প্রথম ঘটনা নয়। ইতঃপূর্বে তাঁর ভাই অন্যান্য নবি- রাসূলগণও আল্লাহর জন্য হিজরাত করেছেন। যে জন্য নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানো, হিজরাত করে পেছনকে ফেলে আসা, প্রতিটি যুগেই সেটার কারণ একই ছিল—দীনের অনুসারীদের মুশরিকদের হাত থেকে রক্ষা করা এবং দাওয়াহর কাজ সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়া। সেজন্য তারা নিরাপদ ও দীনের কাজে উর্বর এমন একটা দেশে হিজরাত করে পাড়ি জমিয়েছেন, যে দেশ তাদের দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করেছে। স্থানীয় অধিবাসীরা দীনের দাওয়াহ্ ডাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে।
আমরা এতক্ষণ আল্লাহর রাসূলের মহান হিজরাতের অনুপম কিছু শিক্ষা নিয়ে নিবিড় আলোচনা করেছি। এ মহান ঘটনার সব শিক্ষা আমরা এখানে নিয়ে আসতে পেরেছি—এমন অবান্তর দাবি করব না। মান্যবর পাঠক, আপনি যখন বিবরণটি পড়ছেন, আপনার মাথায় হয়তো হিজরাতের নতুন একটা শিক্ষার চিন্তা আসতে পারে, যা আমার মাথায় আসেনি। সে শিক্ষা থেকে আপনি উপকৃত হবেন। পাশের মুসলিম ভাইকে জানান, তিনিও হয়তো আপনার এ চিন্তা থেকে পথ চলার উত্তম পাথেয় পেয়ে যাবেন। [১৩৬]

টিকাঃ
৮৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৯৯
৮৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০
৮৯. আল-আসাসু ফিস-সুন্নাহ, সাঈদ হুয়ি, ১/৩৫৭
৯০. ফিস-সীরাতিন নাবাউয়্যাহ কিরাআতু লিজাওয়ানিবিল হাযরি ওয়াল হিমায়াহ, পৃ. ১৪১
৯১. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৪৭
৯২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৬১
৯৩. আযওয়াউ আলাল হিজরাতি, তাওফীক মুহাম্মাদ, পৃ. ৩৯৩-৩৯৭
৯৪. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৪৮
৯৫. আল-মুস্তাফাদু মিন কিসাসিল কুরআন, ২/১০৮
৯৬. প্রাগুক্ত
৯৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০৬
৯৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬
৯৯. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ২/১০২, সনদ সহীহ।
১০০. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৮
১০১. ফিকহুস সীরাহ, ড. বৃতি, পৃ. ১৯৩
১০২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৬৪
১০৩. মুঈনুস সীরাহ, পৃ. ১৪৮-১৪৯
১০৪. আল-মুসনাদ, আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির তাহকীককৃত ১/৩, হাদীস নং ৩, সনদ সহীহ।
১০৫. ফি যিলালিল হিজরাতিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ৫৮
১০৬. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ২/১৯১, ১৯২
১০৭. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, দুরুস ওয়া 'ইবরুন, আস-সাবাঈ, পৃ. ৭১
১০৮. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০৪
১০৯. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ২৫৪
১১০. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আস-সাবাঈ, পৃ. ৬৮
১১১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ৫৪
১১২. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০৫
১১৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ৫৯; শারহুল মাওয়াহিব, ১/৪০৫
১১৪. আল-ইসালাহ, ১/১৪৬
১১৫. সাহীহ আল-জামিউস সাগীর, ১/৩২৮, হাদীস নং ৯৮৬
১১৬. আল-ফাতহুর রাব্বানি, আস-সাআতি, ২০/ ২৮৯; আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৬৬৯১; আল-মুজমা, হাইসামি, ৬/৫৮, ৫৯
১১৭. আত-তারীখুল ইসলামি, আল-হামিদি, ৩/১৭৮
১১৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৫, বুখারি, হাদীস নং ৩৯০৬
১১৯. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৫, সাহীহ আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১৮১
১২০. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ৪০৫
১২১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আস-সাবাঈ, পৃ. ৪৩; আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৩৬৭
১২২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু ফারিস, পৃ. ৩৫৮, ৩৫৯
১২৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ২০২
১২৪. বানাউল মুজতামাঈল ইসলামিয়্যি ফি 'আসরিন নাবাউয়্যাহ, মুহাম্মাদ তাওফীক, পৃ. ১১৯
১২৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২, ১২৩
১২৬. ফিকহুস সীরাহ, আল-বৃতি, পৃ. ১৭২
১২৭. আল-গুরাবাউল আউয়ালুন, পৃ. ১৯৮, ১৯৯
১২৮. তিরমিযি, মানাকিব অধ্যায়, মাক্কার ফজিলত পরিচ্ছেদ, ৫/৭২২, হাদীস নং ৩৯২৫, হাদীস সহীহ।
১২৯. বুখারি, দাওয়াহ অধ্যায়, হাদীস নং ৬৩৭২; বুখারি, হাদীস নং ১৮৮৯
১৩০. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ২/৩১০
১৩১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৮৯, ৪৯০
১৩২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, উমারি, ১/২২০
১৩৩. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, আবু শুহবাহ, ১/৪৯৭
১৩৪. মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, মুহাম্মাদ সাদিক উরজুন, ২/৪২১
১৩৫. প্রাগুক্ত, ২/৪২৩
১৩৬. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৭৫

📘 রউফুর রহীম 📄 মুহাজিরদের পুরস্কার ও পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি ধমক

📄 মুহাজিরদের পুরস্কার ও পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি ধমক


নবি -এর মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাতের বৃত্তান্তটি ইসলামের ইতিহাসে মহান এক ঘটনা। শুধু ইসলাম কিংবা আরব নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের বয়ে চলা গতিধারাও পালটে দেয় এই হিজরাত; এর আগ পর্যন্ত মাক্কার মুসলিমরা শুধু দাওয়ার কাজ করতেন। সে সময় এমন কোনো রাজনৈতিক পরিকাঠামো তাদের ছিল না, যা ইসলামের দা'ইদের সুরক্ষা দিতে পারে। রুখে দেবে শত্রুদের আক্রমণ।
কিন্তু হিজরাতের পর মুসলিমদের একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রটির মূল কাজই হয়ে ওঠে দিকে দিকে ইসলামের সুমহান দাওয়াহকে ছড়িয়ে দেওয়া; আরব উপদ্বীপের ভেতরে এবং বাইরে। দা'ইদের পাঠিয়ে দেয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। দায়িত্ব নেয় এদের সুরক্ষার ও শত্রুদের প্রতিহত করার। এ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য যদি যুদ্ধও করতে হয়, তাতেও রাষ্ট্রটি প্রস্তুত। [১৩৭]
এ তো গেল এক দিক। কুরআন বোঝা এবং এ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করার বেলায়ও নবি -এর হিজরাতের গুরুত্ব অপরিসীম। 'আলিমগণ পুরো কুরআনকে মাক্কি ও মাদানি এ দুভাগে ভাগ করেছেন; ওই সূরাগুলোকে মাক্কি বলা হয়, যা হিজরাতের পূর্বে নাযিল হয়েছে, যদিও সেটা মক্কায় না হয়। আর হিজরাতের পরে নাযিল হওয়া সূরাগুলোকে বলা হয় মাদানি। সেটা যে স্থানেই অবতীর্ণ হয়ে থাকুক। সূরাগুলো মাক্কি ও মাদানিতে বিন্যস্ত হওয়ায় যেসব শিক্ষণীয় দিক রয়েছে, তা হলো:
১) কুরআনের অনুপম উপস্থাপনশৈলীর স্বাদ আস্বাদন এবং দাওয়াহ দেওয়ার বেলায় তার প্রয়োগ ঘটানো।
২) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে হিজরাতের ঘটনা অনুধাবন করা: [১৩৮] হিজরাতের গুরুত্ব অপরিসীম; সন্দেহ নেই। আমরা দেখি কুরআন মু'মিনদের আল্লাহর পথে হিজরাত করার ব্যাপারে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে; কখনো মুহাজিরদের প্রশংসা করে, কখনো বা তাদের পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আবার কখনো হিজরাত না করে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সতর্ক করার মাধ্যমে। [১৩৯]

কুরআনে মুহাজিরদের প্রশংসা: যেসব গুণে গুণান্বিত করে কুরআনে মুহাজিরদের প্রশংসা করা হয়েছে: [১৪০]
১) নিষ্ঠা: আল্লাহ বলেন- (এ সম্পদ) দেশত্যাগী (মুহাজির) গরিবদের জন্য, যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশ্র, ৫৯: ৮] আয়াতের يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَরিضْوَانًا অংশটি প্রমাণ করে যে, মুহাজিররা কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ ছেড়ে আসেননি। স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই পথে হিজরাত করেন।[১৪১]
২) ধৈর্য: আল্লাহ বলেন- নির্যাতিত হওয়ার পর যারা আল্লাহর জন্য হিজরাত করেছে, দুনিয়ায় আমি তাদের উত্তম বাসস্থান দেবো। আর আখিরাতের পুরস্কার তো আরও বড়, যদি তারা জানত! (এরা তারাই) যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪১,৪২]
৩) সততা: আল্লাহ বলেন—
(এ সম্পদ) দেশত্যাগী (মুহাজির) গরিবদের জন্য, যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে, তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশর, ৫৯: ৮]
ইমাম বাগাউই তার বিখ্যাত তাফসীরে ‘তারা সত্যবাদী’ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ তারা তাদের ঈমানে সত্যবাদী। [১৪২]
৪) জিহাদ ও ত্যাগ-তিতিক্ষা: আল্লাহ বলেন—
যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
আয়াতটিতে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, আল্লাহর পথে জিহাদ ও ত্যাগ- তিতিক্ষা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া জিহাদের কল্পনাই করা যায় না। [১৪৩]
৫) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করা: আল্লাহ বলেন—
এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশর, ৫৯:৮]
৬) আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা: আল্লাহ বলেন—
যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪২]
৭) আশা-আকাঙ্ক্ষা: আল্লাহ বলেন—
যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরাত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা সবাই আল্লাহর দয়া কামনা করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা বাকারাহ, ২: ২১৮]
আয়াতে يَرْجُونَ (তারা কামনা করেন) বলে মুহাজিরদের প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করার পরেও পৃথিবীতে কেউই হলফ করে বলতে পারবে না যে, তার জন্য জান্নাত অবহারিত। দুটি কারণে—এক, কারও জানা নেই অন্তিম মুহূর্তটা তার কীসের ওপর হবে; ঈমান না কুফুরি? দুই, সৎকাজ করছে বলে মনে ফুরফুরে কোনো আমেজও আনা যাবে না। এমন ভাব করা যাবে না যে, তার সৎকাজ অবশ্যই তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। তবে মুহাজির সাহাবিদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর দয়া ও কৃপার আশা করতেন। এটা তাদের ঈমান বৃদ্ধিরই লক্ষণ। [১৪৪]
৮) দুর্দিনেও আল্লাহ্র রাসূলের আনুগত্য: আল্লাহ বলেন—
আল্লাহ দয়াপরবশ নবির প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সংকটের সময়ে তার অনুসারি হয়েছিল, তাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল হয়েছেন, যখন ইতোমধ্যেই তাদের মধ্যে একটি দলের মনে (এ ব্যাপারে) বিভ্রান্তি সৃষ্টির উপক্রম হয়েছিল, অতঃপর তিনি তাদের ক্ষমাও করে দিয়েছিলেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু। [সূরা তাওবা, ৯: ১১৭]
তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আয়াতটি নাযিল হয়। মুফাস্স্সির কাতাদা বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় সাহাবিগণ শাম অভিমুখে রওনা হন। তখন প্রচণ্ড গরম পড়ছিল। এমন খরা রোদে তাদের খুব কষ্ট হয়। এরপর একটা পর্যায়ে গিয়ে এমন অবস্থাও হয় যে, দুজন সাহাবিকে মাত্র একটা খেজুরও ভাগ করে খেতে হয়েছিল। [১৪৫]
৯) ঈমান ও সৎকাজে অগ্রগামীদের নেতৃত্ব অর্জন: আল্লাহ বলেন—
প্রথমদিকের মুহাজির ও আনসারদের প্রতি এবং তাদের যথার্থ অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাই আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এটাই তো বড় সাফল্য। [সূরা তাওবা, ৯: ১০১]
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযি বলেন, মর্যাদা পেতে হলে অগ্রগামী হওয়া চাই। এমন ভালো কাজে অগ্রগামিতার জন্য তাদের অনুসরণ আবশ্যক। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুহাজিররাই মুসলিমদের নেতা ও তাদের সর্দার। [১৪৬]
১০) সফলতা: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
আবু সউদ তার তাফসীরে বলেন, আল্লার বাণী, أُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ 'তারাই সফলকাম' অর্থাৎ একটা মহান সফলতা প্রাপ্তির জন্য তারা বিশেষভাবে যোগ্য। কেমন যেন অন্যদের সাফল্য মুহাজিরদের সফলতা প্রাপ্তির ধারে কাছেও নেই।[১৪৭]
১১) ঈমান: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদের) আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই হচ্ছে সত্যিকার মু'মিন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। [সূরা আনফাল, ৮: ৭৪]

মুহাজিরদের জন্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি: মুহাজিরদের আল্লাহ পৃথিবীতে ও পরকালে যে যে নি'আমাহ ও অনুগ্রহ দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কুরআনে সেগুলো বিধৃত হয়েছে এভাবে:
১) দুনিয়াতে আল্লাহ তাদের রুটিরুজিতে প্রশস্ততা দান করবেন: আল্লাহ বলেন— যে আল্লাহর পথে হিজরাত করে, সে পৃথিবীতে অনেক আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশে হিজরাত করে নিজের ঘর থেকে বের হয়, তারপর (হিজরাতে থাকা অবস্থায়) মারা যায়। তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, দয়াময়। [সূরা নিসা, ৪: ১০০]
ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) ও গানীমাত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দিয়ে আল্লাহ মুহাজিরদের দুনিয়াতে রিজিকের প্রশস্ততা দান করেন। রিজিকে তাদের এমন প্রশস্ততা দেওয়ার কারণও আছে। তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য নিজেদের ভিটেভূমি ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সুতরাং এমন সম্পদ পাওয়ার হকদার তো এরাই।[১৪৮]
২) তাদের পাপ মোচন: আল্লাহ বলেন— অতঃপর তাদের রব তাদের দু'আ কবুল করে বলেন, তোমাদের কারও কাজ আমি নষ্ট করি না (বিফলে যেতে দিই না), সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ। তাই যারা হিজরাত করেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, আমার পথে নিপীড়িত হয়েছে এবং (আমার পথে) যুদ্ধ করেছে ও শহিদ হয়েছে, আমি তাদের খারাপ কাজগুলো (আমালনামা থেকে) মুছে দেবো এবং তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পুরস্কার। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম পুরস্কার। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৯৫]
হিজরাত পাপ মোচনের বড় একটা মাধ্যম—এমন ধারণাই মেলে আল্লাহর রাসূলের বহু হাদীসে।
৩) রবের নিকট তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি: আল্লাহ বলেন— যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, মর্যাদায় তারাই আল্লাহর কাছে বড়। আর তারাই সফলকাম। [সূরা তাওবা, ৯: ২০]
শারীরিক ও আর্থিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে যারা হিজরাত ও জিহাদ করেছেন, প্রকৃত অর্থে তারাই পদের দিক থেকে ও সম্মানের দিক থেকে মহান। [১৪৯]
৪) জান্নাতের সুসংবাদ: আল্লাহ বলেন— তাদের প্রতিপালক তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাঁর দয়া, সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের, যেখানে তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী সুখের ব্যবস্থা। সেখানে তারা চিরকাল বাস করবে। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে রয়েছে এক মহান পুরস্কার। [সূরা তাওবা, ৯: ২১-২২]
মুহাজিরদের অনবরত কষ্ট সহ্য করার দরুন আল্লাহ তাদের সঙ্গে যেসব সাওয়াব ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বিধৃত হয়েছে আয়াতটিতে।[১৫০]

হিজরাত না করে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সতর্কীকরণ: আল্লাহ বলেন—
নিজেদের প্রতি জুলুমকারী (হিজরত না করা) অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তাদের তারা প্রশ্ন করে, তোমরা কোন অবস্থায় ছিলে? উত্তরে তারা বলে, আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ছিলাম। তারা বলে, আল্লাহর যমিন কি তোমাদের হিজরাত করার মতো প্রশস্ত ছিল না? তাই এসব লোকের নিবাস হলো জাহান্নাম, সেটা বড় খারাপ ঠিকানা! [সূরা নিসা, ৪: ৯৭]
ইবনু 'আব্বাস বলেন, মাক্কাবাসীদের একটা জাতি ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে ইসলাম গ্রহণের কথা তারা গোপন রাখতেন। এরপর একটা সময় এলো, যখন মুশরিকরা তাদের সঙ্গে বদর প্রান্তরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাদের কেউ কেউ নিহত হয়। তখন মুসলিমরা বলাবলি করতে লাগল, নিজেদের প্রতি জুলুমকারী অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তাদের তারা প্রশ্ন করে, তোমরা কোন অবস্থায় ছিলে? তখন পর্যন্ত মুসলিমদের যে কয়জন খোঁড়া অজুহাতে হিজরাত না করে মক্কায় থেকে যান, তাদের পরিপ্রেক্ষিতেই আয়াতটি নাযিল হয়। মুশরিকরা তাদের একলা পেয়ে যারপরনাই নির্যাতন করে। তখন নিচের আয়াতটি নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি; কিন্তু যখন তারা আল্লাহর পথে নিপীড়িত হয়, তখন মানুষের নিপীড়নকে আল্লাহর শাস্তির ন্যায় গণ্য করে। আর যখন তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য (বা বিজয়) আসে, তখন তারা বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম। আল্লাহ কি বিশ্বাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন? [সূরা 'আনকাবূত, ২৯: ১০]
সাহাবিরা আয়াতটি মাক্কায় অবস্থানরত মুসলিমদের কাছে লিখে পাঠায়। তারা বেরিয়ে পড়ে এবং ভাবে যে, তারা সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে। এরপর তাদের প্রেক্ষিতে আরেকটি আয়াত নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
যারা নির্যাতন ভোগের পর হিজরাত করেছে, তারপর জিহাদ করেছে ও ধৈর্য ধরেছে, তাদের জন্য এসবকিছুর পরে অবশ্যই তোমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা নাহল, ১৬: ১১০][১৫১]
হিজরাত না করে যারা পেছনে থেকে গেছে, আল্লাহ তাদের 'নিজেদের প্রতি জুলুমকারী' বলে অভিহিত করেছেন। এ আয়াতে জুলুম বলতে বোঝানো হচ্ছে, যারা ইসলাম গ্রহণের পরেও দারুলকুফ্র বা কাফিরদেশে থেকে গেছেন, মাদীনায় হিজরাত করেননি, কার্যত তারা হিজরাত ছেড়ে দিয়ে নিজেরদের ওপর অন্যায় করেছেন।[১৫২]
পরের আয়াতে এমন লোকদের ধমকি দেওয়া হয়েছে। তাদের পরকালের ঠিকানা বড়ই খারাপ বলে নিন্দামন্দ করা হয়েছে।
এরপর সাহাবিরা আল্লাহর আদেশ শিরোধার্যরূপে মেনে নেন। হিজরাত করেন মাদীনায়। আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন করেন। এমন ধমক তাদের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। মনে সারাক্ষণ আল্লাহর ভয় কাজ করে। দামরাহ ইবনু জুনদুব নামের একজন সাহাবির কাছে যখন কুরআনের এই আয়াতটি গিয়ে পৌঁছে, إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ—ফেরেশতারা যাদের প্রাণ নেয়, তখন তিনি মাক্কায় অবস্থান করছিলেন। ছেলেদের ডেকে বলেন, তোমরা আমাকে নিয়ে চলো। আমি দুর্বল নই। আমি পথ পেয়ে গেছি। আর একটা রাতও মাক্কায় থাকতে চাই না। ছেলেরা তাকে একটা খাটে তুলে নিয়ে মাদীনা অভিমুখে রওনা হন। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। নিজের গণ্ডদেশকে ডানদিক থেকে বামদিকে ঘুরিয়ে দেন এবং বলেন, হে আল্লাহ, এটা আপনার জন্য এবং আপনার আল্লাহর রাসূলের জন্য। আপনার রাসূল যেসব বিষয়ে আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন, সেসব বিষয়ে আমি আপনার নিকট শপথ করছি। খাইবার এলাকায় আসার পর তিনি মারা যান। ছেলেরা বলছিল, হায় তিনি যদি মাদীনায় মারা যেতেন! তখন এই আয়াত নাযিল হয়;[১৫৩] আল্লাহ বলেন—
দুর্বল নরনারী ও শিশুরা ব্যতীত; যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথেরও সন্ধান পায় না। আশা আছে, আল্লাহ এদের মার্জনা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। [সূরা নিসা, ৪: ৯৮, ৯৯]
আয়াতগুলো আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি যত খারাপই হোক, প্রথম প্রজন্মের সাহাবিরা আল্লাহর আদেশ পালনে এবং সেটা বাস্তবায়নে খুবই একনিষ্ঠ ও কর্মঠ ছিলেন। কোনো ধরনের অজুহাত দাঁড় করাতেন না। কোনো সুযোগ খুঁজতেন না।
কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, দামরাহ ইবনু জুনদুব হিজরাত না করে মক্কায় থেকে যান। তার যৌক্তিক কারণও ছিল। তিনি ছিলেন অসুস্থ।[১৫৫] কিন্তু হিসাবনিকাশ করে তিনি দেখলেন, তার তো সম্পদ আছে। তিনি এর সাহায্য নিলেন। খাটিয়ায় চড়ে রওনা দেন মাদীনার দিকে। এতদিন যে কারণে মক্কায় পড়ে ছিলেন, ভাবলেন সেটা কোনো গ্রহণযোগ্য কারণই না। এমন চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় তার এ অজুহাত। প্রমাণ হয় তার ঈমান ও একনিষ্ঠতার।[১৫৬]
আল্লাহ বলেন—দুর্বল নরনারী ও শিশুরা ব্যতীত; যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথেরও সন্ধান পায় না। আশা আছে, আল্লাহ এদের মার্জনা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। [সূরা নিসা, ৪: ৯৮, ৯৯]

টিকাঃ
১৩৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ আবু ফারিস, পৃ. ১৩
১৩৮. মুবাহাসু ফি উলুমিল কুরআন, আল-কাতান, পৃ. ৫৯
১৩৯. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ৮৪
১৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫
১৪১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬
১৪২. তাফসীর আল-বাগাউই, ৪/৩১৮
১৪৩. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১০৬
১৪৪. আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ৩/৫০; তাফসীরু আবিস সাউদ, ১/২১৮
১৪৫. তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৩৯৭
১৪৬. তাফসীরুর রাযি, ১৫/২০৮
১৪৭. তাফসীরু আবিস সাউদ, ৪/৫৩
১৪৮. তাফসীর ইবন কাসীর, ৪/২৯৫; তাফসীরু আবিস সাউদ, ৮/২২৮; তাফসীরু ফাতহিল কাদীর, ৫/২০০; আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৩২
১৪৯. তাফসীরুল মারাগি, ১০/৭৮; তাফসীরুর রাযি, ১৬/১৩, ১৪
১৫০. হিজরাতুর রাসূলি ওয়া সাহাবাতিহি ফিল কুরআনি ওয়াস সুন্নাতি, আল-জামাল পৃ. ৩৩২, ৩৩৩
১৫১. যাদুল মাসীর, ইবনুল জাওযি, ২.৯৭, তাফসীর আল-কাসিমি, ৩/৩৯৯
১৫২. আল-হিজরাতু ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ১৬১
১৫৩. রুহুল মাআনি, আলুসি ৫/১২৮, ১২৯; আসবাবুন নুযূল, আল-ওয়াহিদি, পৃ. ১৮১
১৫৪. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৪
১৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫
১৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px