📄 মুহাজিরদের সাদরে গ্রহণ এবং মু'মিনদের অন্তরে এর প্রভাব
মাদীনার আনসার সাহাবিদের ঈমান আনা, আল্লাহর রাসূলের কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ এবং সাহায্য-প্রতিশ্রুতির একটা ফল হলো, তারা রাসূল ও মুসলিমদের মাদীনায় হিজরাত করার আহ্বান জানান। অন্য একটা সুফল হলো, মুহাজির সাহাবিদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আনসারদের বাড়িঘরের দরজা মুহাজির নারী-পুরুষদের জন্য অবারিত করে দেওয়া হয়। আনসাররা তাদের সাদরে গ্রহণ করে নেন। একটি বাড়িতে ভাগাভাগি করে থেকেছেন একজন মুহাজির ও একজন আনসার। একজন মহিলা আনসার ও একজন মহিলা মুহাজির। আনসাররা কেবল মুহাজিরদের জন্য আবাসনেরই ব্যবস্থা করেননি; বরং তারা তাদের ধনসম্পদও মুহাজিরদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে দিয়েছেন অকাতরে। নিজের পাতের খাবার তুলে দিয়েছেন মুহাজির ভাইয়ের মুখে। তাদের ওপর অর্পিত ইসলামের দায়িত্বগুলো পালন করেছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। মুহাজিরদের সাদরে ঠাঁই দিয়েছে যাদের ঘরগুলো:
১) কুবার মুবাশশির ইবনু 'আবদুল মুনযির ইবনু যানবারের বাড়ি: মুহাজির নারী- পুরুষদের একটি দল তার বাড়িতে এসে ওঠেন, 'উমার ইবনুল খাত্তাবের পরিবার ও গোত্রের কয়েকজন, কন্যা হাফসা ও তার স্বামী এবং 'আইয়াশ ইবনু আবু রাবী'আহ মদীনায় এসে এ বাড়িতেই বসবাস করেন।
২) সুনাহ নামক জায়গায় হারিস বংশের আরেক ভাই খুবাইব ইবনু ইসাফের বাড়ি:[৩০] তালহা ইবনু 'উবাইদুল্লাহ ইবনু 'উসমান ও তার মা এবং সুহাইব ইবনু সিনান এ বাড়িতে এসে ওঠেন।
৩) নাজ্জার গোত্রের আস'আদ ইবনু যারারার বাড়ি: বলা হয় হামযাহ ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব এ বাড়িতে এসে ওঠেন।
৪) নাজ্জার গোত্রের আরেক শাখার সা'দ ইবনু খাইসামার বাড়ি: একদল অবিবাহিত মুহাজির বাড়িটিতে হিজরাতের পর বসবাস করতেন বলে বাড়িটির নামই হয়ে যায় 'অবিবাহিত বা কুমারদের বাড়ি।'
৫) বাল'আজালানে আরেক শাখা কুবার 'আবদুল্লাহ ইবনু সালামার বাড়ি: মক্কায় হিজরাত করে এসে এখানে ওঠেন 'উবাইদা ইবনু হারিস, তার মা সাখীলা, মিসতাহ ইবনু আসাসাহ ইবনু 'আব্বাদ ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব, তুফাইল ইবনু হারিস, তুলাইব ইবনু 'উমাইর, হুসাইন ইবনু হারিস।
৬) জাহজাবই গোত্র ও মুহতাদিন অর্থাৎ মুনযির ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু 'উকবাহর বাড়ি: এখানে এসে ঠাঁই নেন যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম, তার স্ত্রী আসমা বিনতে আবু বাক্স, আবু সাবরাহ ইবনু আবু রুহম, তার স্ত্রী উম্মু কুলসুম বিনতে সুহাইল। [৩১]
৭) 'আবদুল আশহাল গোত্র এবং মুহতাদিন অর্থাৎ সা'দ ইবনু মুআয ইবনু নু'মানের বাড়ি: মুস'আব ইবনু 'উমাইরের স্ত্রী হামনাহ বিনতে জাহাশকে নিয়ে এখানেই এসে ওঠেন।
৮) নাজ্জার গোত্র ও মুহতাদিন অর্থাৎ আওস ইবনু সাবিত ইবনু মুনযিরের বাড়ি: 'উসমান ইবনু 'আফ্ফান ও তার স্ত্রী, আল্লাহর রাসূলের কন্যা রুকাইয়া। [৩২]
আনসারদের এমন বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান রাসূল ﷻ ও তাঁর মুহাজির সাহাবিদের মাদীনায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি আল্লাহ্র রাসূলের ওফাতের পরেও মুহাজিররা মাদীনায় খুব সুন্দরভাবে বসবাস করে গেছেন। মিলমিশ করে একসঙ্গে বসবাস করার এমন দৃষ্টান্ত যেকোনো মানুষের অন্তরকে নাড়া দেবেই। [৩৩]
উদার মানসিকতা, অবিচল ঈমান, লেনদেনের ব্যাপারে স্বচ্ছ সততার মধ্য দিয়েই পরিপূর্ণতা লাভ করে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের মাঝে গড়ে ওঠে আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসার সেতুবন্ধন। তবে ফাঁকফোকরে প্রশ্ন ওঠে, আনসারদের এ বাড়িগুলোতেও যে পরস্পরে বিবাদের কিছু ঝাপটা লেগেছিল, আমরা কেন সেগুলো আমলে নিই না! কিংবা এর সপক্ষে তুলে ধরি না শক্তিশালী কোনো রেফারেন্স? কলহ-বিবাদে নাম করেছেন এমন মুসলিম নারীদের নামই বা কেন কোথাও উল্লেখ করা হয় না?
ইসলাম সত্য এক দীন। প্রতিটি সত্তার নড়াচড়ার মাপকাঠি হিসেবে ইসলাম নির্ধারণ করেছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। মুসলিমদের পরস্পরে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা ও দীনকে সাহায্য করার বিষয়টিকে ঘোষণা করা হয়েছে উন্নত চারিত্রিক সুষমা হিসেবে। এর সূচনা হয়েছিল আল্লাহর রাসূলের কাছে আনুগত্যের শপথ করার মাধ্যমে। তাদের অন্তরে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রত্যেক সাহাবি সততার সঙ্গেই মুসলিম উম্মাহর একতার জন্য কাজ করেছেন। কবরের শাস্তি, কিয়ামাত দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি এবং বিনিময়ে সাওয়াব ও জান্নাতে যাওয়ার আশা নিয়ে তারা এমন ভালো কাজগুলো করেছেন। এটা ঈমানের সুদৃঢ় দেয়ালের ভেতরের উষ্ণতা, ব্যক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং নিয়তের বিশুদ্ধতার প্রতীক। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, আনুগত্যের শপথ করেছেন এবং যে মুসলিম নারীই জেনেশুনে আনুত্যের শপথ নিয়ে দীনের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা মনগড়া কিছু করেননি; যে আদেশ তাদের করা হয়েছে, তারা তা-ই তামিল করেছেন মাত্র। একনিষ্ঠ ছিলেন কথা ও কাজে। যা বলতেন, বুঝেশুনেই বলতেন। আল্লাহকে ভয় করতেন সর্বাবস্থায়; কি প্রকাশ্যে কি গোপনে। কেবল আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে পেরেছেন বলেই আনসাররা নিজেদের কোঁচড়ে ঠাঁই দিতে পেরেছিলেন মুহাজিরদের। প্রত্যেকেই কাজ করতেন, সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেন তার ভাইয়ের কল্যাণের জন্য।
আনসাররা যা করেছেন, এর চেয়ে উত্তম পারস্পরিক সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিরল নজির আর হতে পারে না। পার্থিব কোনো প্রাপ্তির আশা তাদের মনে ঘুণাক্ষরেও জাগেনি। আল্লাহই দেবেন তার প্রতিদান, সাওয়াব দেবেন একমাত্র তিনিই—এমন আশাতেই অনুপ্রাণিত ছিলেন তারা।[৩৪]
ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দান-অনুদানের বিষয়টি খুবই স্পষ্ট; আমরা প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে মাদীনার আনসার সাহাবিদের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা বলেই যাব। আমরা আজকের সামসময়িক বিশ্বের 'ব্রেইন ওয়াশড' মুসলিমদের কাতারে গিয়ে গবেষণার নামে হয়তো তাদের কিছু দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করলাম, এতে ফায়দা কী? ক্ষুদ্র দিয়ে বৃহৎ ঢাকার চেষ্টা? সাহাবিরা তো আমাদের মতো ছিলেন না!
ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে আগের মতো নিষ্পাপ হয়ে যেতেন। ভুলের জন্য অনুতাপ তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিল। মানবিক দুর্বলতাগুলো ডিঙিয়ে দীনের জন্য, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য তারা যা করেছেন, তার তুলনা চলে না।
আনসার সাহাবিরা মাক্কায় আগত মুহাজির দলটির জন্য নিজেদের ঘরের সবগুলো দুয়ার খুলে দেন; নিছক দু-একজন ব্যক্তির জন্যই নয়; বরং যত জন মুহাজির মদীনায় এসে ওঠেন, তাদের সবাইকেই তারা নিজেদের করে নেন, আপন করে নেন। আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি দু-এক দিনের জন্য ছিল না, আনসারদের ঘরে মুহাজিররা বসবাস করেন মাসের পর মাস। খাবার খান ধারাবাহিকভাবে। তাদের কাছে আগত মুহাজির ভাইদের জন্য আনসাররা নিজেদের ধনসম্পদ বিলিয়ে দেন। আপন করে নেন ভালোবাসা দিয়ে। পাশে গিয়ে দাঁড়ান তাদের সুবিধা-অসুবিধায়। আমরা এখন এমন এক ইসলামি সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যা ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। নিজেদের আদর্শের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আনসারদের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দান-অনুদানের কোনো কাজে লাগতে পারছিলেন না মুহাজিররা।
মদীনায় এলে নিরাপত্তা ও সহযোগিতার অঙ্গীকার ছিল, কিন্তু এই রকম অন্য-বস্ত্র-বাসস্থানের আশা ও নিশ্চয়তা তাদের সামনে ছিল না। মক্কায় মুহাজিররা সব ত্যাগ করে এলেন, মাদীনার আনসাররা নিজেদের অঙ্গ-অংশ ত্যাগ করে বাস্তুভিটা ছেড়ে আসা মুহাজিরদের সমীপে তা নিবেদন করে দিলেন। কুরআন তাদের ভূষিত করে এভাবে—
(এ সম্পদ) দেশত্যাগী গরিবদের জন্য (গরিব মুহাজিরদের জন্য), যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে; তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশ্র, ৫৯:৮]
মাদীনার নতুন পরিবেশ গড়ে ওঠে ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির ওপর ভিত্তি করে। তবে রাসূল ﷺ তখন পর্যন্ত মাদীনায় হিজরাত করেননি। শিষ্যরা যেভাবে ঈসা ইবনু মারইয়াম-কে সাহায্য করেছিলেন, তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে নিজ জাতির কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন ১২ জন আনসার সাহাবি প্রতিনিধির কাছ থেকে তাকে নিরাপত্তা দিতে পারবেন মর্মে আশ্বাস পেয়েই কেবল রাসূল ﷺ পরবর্তী সময়ে হিজরাত করেন। ইতোমধ্যে হিজরাত করে মাদীনায় চলে এসেছেন মুহাজিরদের নেতৃত্বস্থানীয় দলটিও; তারা মাদীনার মুসলিমদের নবি-এর দেখানো পথের কথা বলেন, শোনান নবি-এর মুখনিঃসৃত অমিয় বাণী। তাদের এমন দাওয়াতি প্রচেষ্টার কারণেই সেখানে একটা পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং মুহাজিরদের এ দলটির তত্ত্বাবধান পেয়েই রাসূল ﷺ সেখানে হিজরাত করেন। [৩৬]
নতুন এ সমাজের অনন্য ও বিরল একটি বৈশিষ্ট্য হলো, শ্রেণিবৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার কবর রচনা করা। ছোট-বড়, সাদা-কালো কিংবা ধনী-গরিবের কোনো ফারাক ছিল না সমাজটিতে। তাদের সালাতের ইমামাত করতেন হুযাইফা-এর মুক্ত করা দাস সালিম। তিনি তাদের সবার মধ্যে ভালো কুরআন পড়তে জানতেন। অথচ তাদের মধ্যে অনেক নেতা ছিলেন। আনসার-মুহাজির, কুরাইশ, আওস এবং খাযরাজের বড় বড় সব নেতাই সেখানে ছিলেন। সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অথচ সালাতের ইমামাত করছেন তাদের কেউ নন, একজন কুরআনের হাফিজ। সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হতো কুরআনের পাঠক ও বাহককে। তিনি কেবল সালাতেরই ইমামাত করতেন না, যুদ্ধের ঝান্ডাও থাকত তার হাতে। ইসলামের সোনালি সে যুগে কুরআনের বাহক আর যুদ্ধের পতাকাবাহীর মাঝে কোনো তফাত ছিল না। আজ আমাদের সমাজে এ প্রভেদটা বড়ই প্রকট। নেতৃত্বটা আজ দুইটা শিবিরে বিভক্ত; সালাতের ইমামাত করছেন কুরআনের বাহকগণ, আর আল্লাহর পথে জিহাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবল মুজাহিদগণের কাঁধে। আমরা এই রকম ধারণা ও মানসিক বৈকল্য নিয়েই ইসলাম পালন করে যাচ্ছি। ইয়ামামার যুদ্ধে মুহাজিরদের পতাকা বহন করছিলেন হুযাইফা-এর সেই মুক্ত করা দাস সালিম; যুদ্ধের একপর্যায়ে তার ডান হাত কেটে গেলে বাম হাতে তুলে নেন পতাকা। বাম হাতও কেটে যায় একসময়; তিনি এবার কাঁধ ও ঘাড়ের সাহায্যে পতাকা আঁকড়ে ধরেন। উভয় পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়, একপর্যায়ে তিনি শহিদ হন আল্লাহর পথে।[৩৬]
নতুন ইসলামি সমাজের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহর পথে মানুষকে প্রকাশ্যে আহ্বান করা। কারও আর জানার বাকি নেই যে, ইয়াসরিবের অধিকাংশ নেতা ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছেন। দাওয়াতি কাজ থেকে কেউই পিছিয়ে নেই; কি যুবক, কি নারী, কি পুরুষ সবাই মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করার কাজে নেমে পড়েছেন। দ্বারে দ্বারে দিয়ে যাচ্ছেন মাদীনায় আল্লাহর রাসূলের আগমন ও কর্মতৎপরতার সুসংবাদ।
আবিসিনিয়ায় অবস্থানকারী মুসলিম সমাজ এবং ইয়াসরিবে অবস্থাকারী মুসলিম সমাজে একটা তুলনা করা যেতে পারে। আবিসিনিয়ার মুসলিম সমাজ যত না-ইসলামি সমাজের ছাপ বহন করছিল, তার চেয়ে রাজনৈতিক একটা আশ্রয় এবং প্রবাসী কলোনির ছাপ বহন করছিল বেশি। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, মুসলিমরা সেখানে 'ইবাদাতের পুরোপুরি স্বাধীনতা পেতেন। অমুসলিম সমাজ থেকে তাদের বসবাস দূরে হওয়ার কারণে দীনের দাওয়াত দিয়ে তারা নিকটবাসী খ্রিষ্টানদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারছিলেন না। মাক্কায় ইবাদাত করার কোনো স্বাধীনতা ছিল না, দাওয়াত দেওয়ার জন্যও মিল ছিল না সেরকম কোনো সুযোগ, এমন বৈরী পরিবেশের কারণে যদিও আবিসিনিয়ায় সাহাবিরা হিজরাত করেন, কিন্তু আবিসিনিয়ায় এসেও সে সুযোগ যে খুব একটা মিলেছে সে কথা বলা যাবে না। বিপরীতে মাদীনার চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুহাজিররা সেখানে বৈরী কোনো পরিবেশে নয়, বন্ধুভাবাপন্ন একটা পরিবেশে গিয়ে ওঠেন। নিশ্চিন্ত মনে তারা মানুষকে আহ্বান করেন আল্লাহর পথে। আল্লাহর 'ইবাদাত করেন স্বাধীনভাবে। এজন্যই আবিসিনিয়ার মুহাজিরগণ কেবল মাদীনায় হিজরাত করার খবরটি শুনেই সেখান থেকে মাদীনার দিকে রওনা দেন। তারা মাদীনায় হিজরাতের খবর শুনে আর দেরি করেননি, সোজা মাদীনায় গিয়ে ওঠেন। শুধু নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজন মুহাজিরকে সেখানে থেকে যেতে বলা হয়। যুগ যুগ ধরে পৌত্তলিক মুশরিকদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে এভাবেই মাদীনা হয়ে ওঠে আল্লাহর রাসূলের শহর, মুসলিম শহর।
ইয়াসরিব এখন আর ইয়াসরিব নেই, তার নাম এখন মাদীনাতুন নবি বা নবির শহর। পৌত্তলিকতার কবল থেকে মুক্ত হয়ে নবির শহরে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজব্যবস্থা। মূলত এ সমাজটির কার্যকর ভিত্তিস্থাপন এবং উন্নতি শুরু হয় প্রথম আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে ১২ জন সাহাবি মাদীনায় ফিরে আসার পর পরই। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আস'আদ ইবনু যারারাহ। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, তারা কেবল দাওয়াতি মিশন নিয়েই ঘুরে বেড়ান মানুষের দ্বারে দ্বারে। তাদের কাজের পরিসর, ব্যাপকতা ও পরিধি পূর্ণতা পায় ৭০ জন সাহাবি ফিরে আসার পর। ৭০ জনের এ দলের সবার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামাজিক জ্ঞান ছিল পূর্ণমাত্রায়। একত্র হয়ে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, তাদের দেশটি হবে পৃথিবীর বুকে মুসলিমদের প্রথম রাজধানী। বাইরের শত্রুর যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার প্রস্তুতি তারা নিয়ে রাখেন। এভাবেই রাসূল ﷺ মাদীনায় তাদের কাছে আসার ক্ষণ ঘনিয়ে আসে।
যে নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য রাসূল ﷺ অবিশ্রান্তভাবে তাঁর মেধা সময় ও শ্রম দিয়েছিলেন, তার সুফল বইতে শুরু করেছে এখন। সুফলের প্রভাবটা বেশি অনুভূত হচ্ছে মাদীনার নতুন এ সমাজের উদ্যমতা ও তৎপরতার মধ্য দিয়ে। রাসূলের নেতৃত্বকে যেমন তারা নিজেদের কল্যাণের চাবিকাঠি জ্ঞান করে লুফে নিয়েছে, তেমনি ইসলামের সমস্ত বিধি-নিষেধ পালনেও একনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার।
রাসূল ﷺ খাঁটি মনের এ মানুষগুলোকে তৈরি করেছেন সুনিবিড় তত্ত্বাবধানে। একতার গলনপাত্রে ঢেলে সাজিয়ে তুলে এনেছেন পাকসাফ করে। সিসাঢালা প্রাচীরতুল্য এক সুদৃঢ় ঢাল ও শক্তিতে পরিণত করেন তাদের। সাহাবিরা উদ্ধত কাফিরদের বিপক্ষে, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে জিহাদ করার শপথ নেওয়ার পরই মুসলিম সমাজের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এ কারণে আমরা বলতে পারি, পৃথিবীতে ইসলামি সমাজকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো যথাযথ প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল ইসলামি সমাজ গড়ে ওঠে আপন ভিত্তিতে।[৩৭]
টিকাঃ
৩০. আল-মারআতু ফিল-আহদিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১১৬
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৭
৩২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ ফি যাওইল কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ, আবু শুহবাহ ১/৪৬৮, ৪৬৯
৩৩. আল-মারআতু ফিল-আহদিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১১৮
৩৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২
৩৫. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/১৭১, ১৭২
৩৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২/১৭৪, ১৭৫
৩৭. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/১৪৬, ১৪৭
📄 ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে মাদীনাকে বেছে নেওয়ার কারণ
মাদীনাকে হিজরাত ও দাওয়াতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে আল্লাহর কী প্রজ্ঞা কাজ করেছে, সে রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আমরা এতটুকু বলতে পারি, শহরটি প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত ও যুদ্ধ উপযোগী। সুরক্ষিত হওয়ার দিক থেকে আরব উপদ্বীপের আর একটি শহরও এর ধারে কাছে ছিল না। বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণি আগলে আছে মাদীনার পশ্চিম ও পূর্ব দিক; চাইলেও কেউ এই দুটি দিক দিয়ে শহরটিতে আক্রমণ করতে পারবে না। কেবল উত্তর দিকটি উন্মুক্ত ছিল; তাতেও নিরাপত্তার কোনো সমস্যা ছিল না (৫ম হিজরিতে, আহযাব যুদ্ধে পরিখা খনন করে রাসূল ﷺ এ দিকটি থেকে মাদীনাকে সুরক্ষা দেন)। অন্যদিকে দক্ষিণ দিক খেজুরবাগান ও ঘন ঝোপঝাড়ে বেষ্টিত ছিল; কোনো সৈন্যদল আক্রমণ করার ইচ্ছায় এ দিকটাকে যদি বেছেও নেয়, তবে তাদের মাড়াতে হবে খুবই সংকীর্ণ ও বিপৎসংকুল পথ। যেখানে কোনো ভাবেই সৈন্যবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সারিবদ্ধভাবে এগোনোর কোনো সুযোগ নেই এ পথ ধরে।
সামরিক বিবেচনায় ছোট একটা পাহারাও অনেক সময় সামরিক শৃঙ্খলাকে ধূলিসাৎ করা এবং সামনে এগোতে বাধা দানে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক বলেন, মাদীনার একটি দিক ছিল খোলামেলা। আর বাকি সবগুলো দিক ছিল বাড়িঘর এবং খেজুর বাগানে পরিবেষ্টিত, কোনো শত্রুদল বাধাগুলো অতিক্রম করার সামর্থ্য রাখত না।[৩৮]
মাদীনাকে বেছে নেওয়ার পেছনে আল্লাহর প্রজ্ঞার কথা জানাতে গিয়ে হিজরাতের আগে রাসূল ﷺ সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের হিজরাত করার জায়গা দেখেছি। দু-লাবাতের মাঝে খেজুর বেষ্টিত।'[৩৯] এরপর হিজরাতে আগ্রহী সাহাবিরা দল বেঁধে মাদীনায় হিজরাত করেন।
মাদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্র দুটির লোকজন ছিল আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, সাহসী, শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা। কারও সামনে নত হওয়ার নজির তাদের ইতিহাসে নেই। তারা কখনো কোনো গোত্র কিংবা কোনো শাসন কর্তৃত্বের কাছে নতজানু হয়ে কর দেয়নি। ইবনু খালদূন বলেন, এ দুটি গোত্রই ইয়াসরিবে প্রভাব বিস্তার করে ছিল। ইয়াসরিবের প্রতিরক্ষার সবগুলো দিক ছিল তাদের নখদর্পণে। আওস ও খাযরাজের এমন শক্তিমত্তা দেখে প্রতিবেশী মুদার গোত্র তাদের দলে এসে যোগ দেয়।
আল্লাহর রাসূলের মামার বংশ 'আদি ইবনু নাজ্জার গোত্রেরই একজন নারী ছিলেন দাদা 'আবদুল মুত্তালিবের মা; হাশিম 'আদি ইবনু নাজ্জার গোত্রের একজন 'আমরের কন্যা সালমাকে বিয়ে করেন। তার ঘরেই জন্ম নেন আল্লাহর রাসূলের দাদা 'আবদুল মুত্তালিব। হাশিম ছেলেকে সালমার কাছে রেখে চলে আসেন। বয়ঃসন্ধিক্ষণে পৌঁছার আগেই চাচা মুত্তালিব তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন। আরব সামাজিক জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ককে অত্যন্ত সমীহ করা হতো। আবু আইয়ুব আল-আনসারি এমনই একজন আত্মীয়, রাসূল ﷺ মদিনায় গিয়ে যার বাড়িতে ওঠেন।
মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা ছিলেন কাহতান বংশের মুহাজির, মক্কার প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা এবং এর আশপাশের লোকজন ছিলেন 'আদনানের বংশধর। রাসূল ﷺ হিজরাত করে মদিনায় এলে আনসাররা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। সেখানে 'আদনানি ও কাহতানি আরবরা ইসলাম নামের একই পতাকা তলে সমবেত হন। যেন সবাই মিলে হয়ে ওঠেন একটি শরীর, একই আবেগ ও আক্রোশ সম্মিলিত করে তাদের সকলকে। অথচ জাহিলি যুগে তারা পরস্পরে শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করত, বংশ গৌরবের প্রতিযোগিতায় নামত; কিন্তু আজ তারা এক হয়ে যাওয়ায় শয়তান জাহিলি ধারায় কাহতানি কিংবা 'আদনানি সূত্রিতার কোনো জিদ উসকে দেওয়ার রাস্তা পাচ্ছিল না। এভাবেই রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের বসবাস, দীনের দাওয়াত ও দাম্ভিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য মদীনা হয়ে ওঠে যথোপযুক্ত ভূমি। মদীনা নামক সুদৃঢ় কেন্দ্র থেকেই ইসলাম তার আপন মহিমায় গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করে। প্রথমে জয় করে নেয় আরব উপদ্বীপ, তারপর একে একে তার বিজয় নিশান নিয়ে ছুটে চলে পৃথিবীর দিকে দিকে, পথে-প্রান্তরে।[৪০]
১) মদীনার প্রতি আল্লাহ্র রাসূলের মুগ্ধতা এবং এর জন্য তাঁর দু'আ: রাসূল ﷺ আল্লাহর কাছে এ বলে দু'আ করেছেন, 'মক্কা যেমন আমাদের প্রিয়, হে আল্লাহ, আপনি মদীনাকে আমাদের কাছে সেরূপ প্রিয় করে তুলুন বা তার চেয়েও বেশি।'[৪১] হযরত আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল ﷺ যখনই কোনো সফর থেকে ফিরতেন, তিনি মদীনার উঁচু উঁচু রাস্তার দিকে তাকাতেন, তাঁর উটনীকে জোরে হাঁকাতেন। আর যদি (উটনী না হয়ে) অন্য কোনো বাহন হতো, তাহলে সেটাকে দ্রুত ছোটাতেন।' [৪২]
২) মক্কার তুলনায় মাদীনাতে দ্বিগুণ বারাকাহর জন্য আল্লাহর কাছে আল্লাহ্র রাসূলের দু'আ: আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকজন তাদের গাছের প্রথম ফলটি আল্লাহর রাসূলের দরবারে নিয়ে আসতেন। রাসূল ﷺ সেটা দেখে বলতেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ফলে আমাদের জন্য বারাকাহ দিন, বারাকাহ দিন। আমাদের মাদীনাতে, বারাকাহ দিন সা'-এ এবং বারাকাহ দিন আমাদের মুদ্দ-এ। হে আল্লাহ, নিশ্চয় ইবরাহীম ছিলেন আপনার বান্দা, আপনার বন্ধু এবং আপনার একজন নবি। আর আমিও আপনার বান্দা এবং আপনার একজন নবি। তিনি মাক্কার জন্য আপনার নিকট দু'আ করেছিলেন। আর আমিও মাদীনার জন্য আপনার কাছে সেই দু'আ করছি, যা তিনি মাক্কার জন্য করেছিলেন এবং তার অনুরূপ।'[৪৩]
৩) আল্লাহ্র রাসূলের বারাকাহর কল্যাণে মাদীনাকে দাজ্জালের হাত থেকে ও প্লেগ রোগের প্রকোপ থেকে সুরক্ষা দান: আল্লাহ তা'আলা মাদীনার সুরক্ষার জন্য একদল ফেরেশতা নিয়োজিত করে দেন। তাদের নিরাপত্তা দেওয়াল ভেদ করার সাধ্য দাজ্জালেরও নেই। সে সময়ে মাদীনায় বসবাসরত কাফির-মুনাফিকদের দাজ্জালের কাছে ছুড়ে মারবে। এমনিভাবে রাসূল মাদীনাবাসীর সুস্বাস্থ্যের জন্য দু'আ করেছিলেন বলে সেখানে প্লেগ থাবা বসাতে পারেনা। [৪৪]
৪) মাদীনার দুর্দিনে ধৈর্য ধরার ফজিলত: যে ব্যক্তি মাদীনার কঠিন দিনে এবং রুটি-রুজির অনটনের দিনে ধৈর্যধারণ করবে, রাসূল কিয়ামাতের দিন তার জন্য সুপারিশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।[৪৫] সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, 'মাদীনা তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা জানত। যে ব্যক্তি মাদীনার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে মাদীনাকে ছেড়ে যাবে না, আল্লাহ তাকে এর থেকেও উত্তম একটা অবস্থানে উপনীত করবেন।'[৪৬]
৫) মাদীনায় মারা যাওয়ার ফজিলত: ইবনু 'উমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, যার পক্ষে সম্ভব সে যেন মাদীনায় মৃত্যুবরণ করে; কারণ, যে ব্যক্তি সেখানে মারা যাবে, আমি তার জন্য সুপারিশ করব।[৪৭] হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব এ দু'আটি প্রায়ই করতেন, 'হে আল্লাহ, আপানার পথে শহিদ হওয়ার এবং আপনার রাসূলের শহরে মৃত্যুবরণের তাওফীক দিন।[৪৮] আল্লাহ তা'আলা 'উমার ফারুক-এর দু'আ কবুল করেন; 'উমার সালাতের ইমামাত করার সময় আল্লাহর রাসূলের মিহরাবে শাহাদাত বরণ করেন।
৬) মাদীনা ঈমানের ঘাঁটি এবং সকল পঙ্কিলতা থেকে নিষ্কলুষ: ঈমানের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে মাদীনা। পৃথিবীর সেরা মানুষেরা আবাস গেড়েছেন সেখানে। দুষ্ট ও খারাপ লোকরা হয়েছে বিচ্যুত ও বিতাড়িত। কিছুদিন বুদ্বুদের মতো নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ঠিকই; কিন্তু খুব দ্রুতই তাদের উবে যেতে হয়েছে। আপন তাগিদেই রণে ভঙ্গ দিয়ে তারা পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়েছে। কখনো শোনা যায়নি, মাদীনার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে কোনো মুসলিম মাদীনা ছেড়ে অন্য কোথাও থেকেছেন। তবে আল্লাহ কারও ভাগ্যে অন্য কিছু লিখে রাখলে সেটাভিন্ন কথা। [৪৯] আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় ঈমান মাদীনার দিকে এসে মিলিত হবে ঠিক সেভাবে, যেভাবে সাপ তার গর্তে গিয়ে আশ্রয় নেয়। [৫০] রাসূল বলেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, জেনে রাখো, নিশ্চয় মাদীনা হাপরের মতো; অনিষ্টকর সবকিছু সে বের করে দেয়। হাপর যেভাবে লোহার জং দূর করে, ঠিক সেভাবে মাদীনা তার সব অনিষ্ট মিটিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত কিয়ামাত হবেনা। [৫১]
৭) যাইদ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণিত; রাসূল বলেন, নিশ্চয় এটা (মাদীনা) পবিত্র। সে সব পাপাচার মিটিয়ে দেয় ঠিক সেভাবে, যেভাবে আগুন রুপার ময়লা দূর করে। [৫২]
৮) অনিষ্টকারীর হাত থেকে মাদীনাকে আল্লাহর সুরক্ষা প্রদান: মাদীনার বিনাশ চায়, এমন যেকোনো লোকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলা মাদীনা শহরকে সুরক্ষা দান করবেন। যে মাদীনায় কোনো বিদা'আত সৃষ্টি করবে কিংবা কোনো বিদা'আতিকে সেখানে আশ্রয় দেবে, অথবা মাদীনাবাসীকে হুমকি দেবে, রাসূল ﷺ এমন ব্যক্তিকে আল্লাহর অভিশাপ, শান্তি এবং দ্রুত ধ্বংস হওয়ার ভয় দেখিয়েছেন। [৫৩] সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, মাদীনাবাসীর বিরুদ্ধে যে-ই ষড়যন্ত্র পাকাবে, সে লবণ যেভাবে মিশে যায় সেভাবে গলে যাবে। [৫৪] রাসূল আরও বলেন, মাদীনা একটি পবিত্র স্থান; যে ব্যক্তি সেখানে বিদা'আত সৃষ্টি করবে কিংবা কোনো বিদা'আতিকে প্রশ্রয় দেবে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন তার কোনো দান-অনুদান এবং বিনিময় গৃহীত হবে না। [৫৫]
৯) মাদীনার পবিত্রতা: রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওয়াহির ভিত্তিতে মাদীনাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন; অতএব, সেখানে কোনো ধরনের রক্তপাত বৈধ নয়। তাই এখানকার অধিবাসীরা কারও চোখ রাঙানির ভয়ে তটস্থ থাকতে হবে না। এই ভূমির গাছপালা কাটা যাবে না। পথে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু নিজের মনে করে পকেটে পুরে ফেলার কোনো সুযোগ নেই, যথাযথ মালিকের হাতে তুলে দিতে হবে [৫৬]। এমন আরও অনেক কিছুই করা যাবে না মাদীনার সে হারাম এলাকায়; কারণ সেখানে এগুলো করা হারাম। রাসূল বলেন, নিশ্চয় ইবরাহীম মাক্কাকে হারাম (পবিত্র) বলে ঘোষণা করেছেন এবং এর জন্য দু'আ করেছেন। ইবরাহীম যেভাবে মাক্কাকে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই আমি মাদীনাকে হারাম ঘোষণা করেছি এবং এর মুদ্দ ও সা'-এ বারাকাহর বিষয়ের জন্য আমি দু'আ করেছি। ঠিক সেভাবেই, যেভাবে ইবরাহীম মাক্কার জন্য দু'আ করেছেন। [৫৭] তিনি আরও বলেন, হে আল্লাহ, নিশ্চয় ইবরাহীম মাক্কাকে হারাম করেছেন, আর আমি দুই লাবিতের মাঝে অবস্থানকারীকে হারাম করেছি, [৫৮] অর্থাৎ মাদীনা।
মাদীনার এমন অনন্য মর্যাদার পুরোমাত্রায় ভাগীদার ছিলেন সাহাবিরা। মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাত করে কখন আসবেন, সেখানে কবে থেকে বসবাস শুরু করবেন—এ নিয়ে সাহাবিরা খুবই উদ্গ্রীব ছিলেন। এভাবেই মুসলিম উম্মাহর শৌর্য-বীর্য সব এসে একত্রিত হয় মাদীনার ভূখণ্ডে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে উম্মাহ তার শক্তি নিয়োগ করে সব ধরনের শির্ক ও রংবেরঙের কুফুরির মূলোৎপাটনে। তারাই পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে নিয়ে যান ইসলামের বিজয় পতাকা।
টিকাঃ
৩৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ১৫৭
৩৯. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ৫২
৪০. আল-আসাসু ফিস সুন্নাহ, ১/৩৩৩
৪১. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৫৭
৪২. বুখারি, উমরাহ অধ্যায়, ৩/৬৩০, হাদীস নং ১৮০২
৪৩. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, মাদীনার ফজিলত পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ২/১০০০, হাদীস নং ১৩৭৩
৪৪. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৫৮
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০
৪৬. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, মাদীনার ফজিলত পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ২/৯৯২, হাদীস নং ১৩৬৩
৪৭. আহমাদ, ২/৭৪, হাদীস নং ৫৮১৮, সনদ সহীহ। ইবনু হিব্বান সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, হাদীস নং ৩৮৪১
৪৮. বুখারি, মাদীনার ফজিলত অধ্যায়, ৪/১০০, হাদীস নং ১৮৯০
৪৯. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃষ্ঠা. ১৬১
৫০. বুখারি, মাদীনার ফজিলত অধ্যায়, ৪/৯৩, হাদীস নং ১৮৭৬
৫১. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, ২/১০০৫, হাদীস নং ১৩৮১
৫২. বুখারি, যুদ্ধাভিযান অধ্যায়, উহুদ যুদ্ধ পরিচ্ছেদ, ৭/৩৫৬, হাদীস নং ৪০৫০
৫৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃষ্ঠা. ১৬২
৫৪. বুখারি, মাদীনার ফজিলত অধ্যায়, ৪/৯৩, হাদীস নং ১৮৭৭
৫৫. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, মাদীনার ফজিলত পরিচ্ছেদ, ২/৯৯৯, হাদীস নং ১৩৭১
৫৬. এই বিধি অবশ্য সবখানের জন্যই প্রযোজ্য, পবিত্র স্থানে এটা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
৫৭. বুখারি, বেচাকেনা অধ্যায়, ৪/৩৪৬, হাদীস নং ২১২৯
৫৮. বুখারি, কিতাবুল মাগাযি, ৭/৩৭৭, হাদীস নং ৪০৮৪