📘 রউফুর রহীম 📄 হিজরাতের পূর্ব-প্রস্তুতি

📄 হিজরাতের পূর্ব-প্রস্তুতি


মাদীনায় হিজরাতের আগে সুবিস্তৃত, সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত একটি প্রস্তুতিপর্ব ছিল। নবি খুব সূক্ষ্মভাবে তা করেছিলেন। সর্বোপরি এটা অবশ্যই আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক এবং সম্পন্ন হয়েছিল দুদিক থেকে; মুহাজিরদের মানসিক অবস্থা ও হিজরাতভূমি মাদীনাকে রাজনৈতিকভাবে তাদের উপযোগী করা নিয়ে।

মুহাজিরদের প্রস্তুতি
চিত্তবিনোদন কিংবা রিফ্রেশমেন্টের জন্য ঘুরাঘুরি বা বনভোজনের নাম হিজরাত নয়; বরং নিজ দেশ, পরিবার, আত্মীয়স্বজনের মায়া ও ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সব কিছুর মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর জন্য অন্য দেশে পাড়ি জমানোর নাম হিজরাত। উপার্জনের আরও ভালো সুযোগের জন্যও নয়, আপন আকীদা-বিশ্বাসের প্রতিরক্ষার খাতিরেই তাদের এ হিজরাত। তবে এটা সহজ কোনো ব্যাপার ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের, অনেক দীক্ষা, প্রশিক্ষণ আর প্রস্তুতির। শেষ পর্যায়ে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার হিজরাত করা যেতে পারে। হিজরাত উপলক্ষ্যে মুহাজিরদের প্রস্তুতির কিছু নমুনা—
ক. অবিচল ঈমানের প্রশিক্ষণ; যার বিশদ আলোচনা আমরা প্রথম খণ্ডে করেছি।
খ. মু'মিনরা এমন এমন জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে বসবাস করা আর সম্ভব নয়।
কুরআনের মাক্কায় অবতীর্ণ অংশে হিজরাতের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ ছিল। সে ইঙ্গিত বুঝতে মু'মিনদের বেগ পোহাতে হয়নি। কেননা পৃথিবীটা মাক্কাতেই সীমাবদ্ধ নয়; আল্লাহর যমিন অনেক বিস্তৃত। আল্লাহ বলেন—
(আমার এ কথাটি) বলে দাও, হে আমার বান্দারা, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যারা এ দুনিয়ায় সৎকাজ করে তাদের জন্য কল্যাণ আছে। আর আল্লাহর যমিন প্রশস্ত। ধৈর্যধারণকারীদের বিনা হিসাবে পুরোপুরি পুরস্কার দেওয়া হবে। [সূরা যুমার, ৩৯: ১০]
সূরা কাহফেও হিজরাতের আলোচনা এসেছে। যে যুবকরা তাদের রবের ওপর পূর্ণ ঈমান এনেছে, নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে গুহায় হিজরাত করেছে, তাদের কথা সবিস্তার আলোচনা করেছে সূরাটি। সাহাবিদের সামনে হিজরাত সম্পর্কে কুরআনে বিধৃত এমন ঘটনা ও আলোচনা তাদের মনে দারুণভাবে দাগ কাটে। তাদের ঈমান আরও অবিচল হয়। তারা নিশ্চিত হন, আকীদা-বিশ্বাসের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে নিজ দেশ; এমনকি পরিবার-সংসার পর্যন্তও ছেড়ে দেওয়া যায়।
এরপর সূরা নাহলে কুরআন হিজরাত সম্পর্কে সরাসরি আলোচনা করেছে। আল্লাহ বলেন,
নির্যাতিত হওয়ার পর যারা আল্লাহর জন্য হিজরাত করেছে, দুনিয়ায় আমি তাদের উত্তম বাসস্থান দেবো। আর আখিরাতের পুরস্কার তো আরও বড়, যদি তারা জানত! (এরা তারাই) যারা ধৈর্যধারণ করেছে ও তাদের রবের ওপর ভরসা করে। [সূরা নাহল, ১৬: ৪১,৪২]
সূরাটির শেষদিকে হিজরাতের অর্থকে আরও ব্যাপক করে দেয় কুরআন। আল্লাহ বলেন:
যারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর হিজরাত করেছে, তারপর জিহাদ করেছে ও ধৈর্য ধরেছে, (তাদের জন্য) এসব কিছুর পর অবশ্যই তোমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা নাহল, ১৬: ১১০]
এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের কাছে হিজরাত একটি পরিচিত বিষয় হয়ে ওঠে। এমন নয় যে, তারা বিষয়টিকে একেবারেই জানেন না। দেশ ছেড়ে পরিবার-পরিজন রেখে আবিসিনিয়ায় হিজরাত করার কার্যত একটা নজির মুসলিমদের সামনে ইতোমধ্যে রয়েছেও বটে। [১]

ইয়াসরিবে প্রস্তুতি
প্রথম খণ্ডের আলোচনাগুলো খেয়াল করলে দেখব যে, শুরুর সেই দিনগুলো থেকে রাসূল আনসারদের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে কোনোরকম তাড়াহুড়ো করেননি। দুবছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছেন। যখন তিনি নিশ্চিত যে, সেখানে নেতৃত্বের অনুকূল ভালো একটা বলয় গড়ে উঠেছে এবং একই সঙ্গে মাদীনায় মুস'আব-এর যাওয়ার কারণে পরিবেশটাও হয়ে উঠেছে কুরআনময়, তখনই তিনি হিজরাতের বিষয় নিয়ে ভাবেন।
তা ছাড়াও রাসূল আরও নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, মাদীনার আনসার সাহাবিদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ইয়াসরিবের পরিবেশ অনুকূলে হওয়ায় আনসাররাও আল্লাহর রাসূলকে তাদের কাছে হিজরাত করার আর্জি পেশ করেন। এ প্রস্তুতি তো আছেই, তারও আগে আকাবায় আল্লাহ্র রাসূলের সঙ্গে আনসারদের এসব বিষয়ে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয় এবং তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে আনুগত্যের শপথ নেন। সে সময় রাসূল ইয়াসরিবে হিজরাত করে তাদের কাছে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যে কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী তারাও প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাসূলের অপেক্ষায় প্রহর গুণতে থাকেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—নিজ সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে তারা যেসব বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন, রাসূল-কেও তারা সেসব থেকে সুরক্ষা দেবেন। নবিজিকে কষ্ট দেয় যে মিনাবাসী ও কুরাইশরা, প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে ফায়সালার ব্যাপারেও সেদিন প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন আনসার সাহাবিরা। কিন্তু রাসূল সময়টাকে উপযুক্ত মনে করেননি বলে তাদের এমনটা করার অনুমতি দেননি; বরং তাদের বলেছিলেন, 'আমাদের এ বিষয়ে এখনো আদেশ দেওয়া হয়নি।'
এভাবেই আনসাররা মাক্কার মুহাজিরদের সাদরে বরণ ও তাদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ইয়াসরিবকে উপযুক্ত করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। যেন হিজরাতের কারণে মুশরিকদের পক্ষ থেকে কোনো বিপদ এলে শক্ত হাতে তা প্রতিহত করা যায়।[২]

হিজরাতের সূচনা
দীনের কল্যাণকামী ও আলোর পতাকাবাহী ইয়াসরিববাসী আল্লাহর রাসূলের হাতে বাই'আত গ্রহণ করে ইসলামকে সুরক্ষা দানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বিষয়টি জানার পর মুশরিকদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে তারা। গোস্বায় মুসলিমদের ওপর নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্যাতনের এমন বেপরোয়া ভাব দেখে রাসূল সাহাবাদের মাদীনায় হিজরাতের অনুমতি দেন। মাদীনা হিজরাতের উদ্দেশ্যই হলো—সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যে রাষ্ট্র পৃথিবীর প্রান্তে দীনের দাওয়াত বয়ে নিয়ে যাবে। ইসলাম ও মুসলিম জাতির সুরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়বে জিহাদে। মুসলিমদের ওপর হাত তোলার সাহস যেন কারও না থাকে এবং আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন ইসলামই যেন সব ব্যবস্থার ওপর বিজয় লাভ করে।[৩] আল্লাহ তা'আলাই মাদীনায় হিজরাত করতে আদেশ করেছেন। 'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলের কাছে ৭০ জন লোক যখন বাই'আত নিয়ে গেলেন, তখন তাঁর অন্তর খুশিতে ভরে উঠল। আল্লাহ তাঁর প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করলেন। রক্তে যুদ্ধের নেশা মিশে আছে, এমন এক জাতিকে তিনি আল্লাহ্র রাসূলের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন।
এদিকে মুসলিমদের হিজরাতের খবর পেয়ে মুশরিক সব দিশেহারা। তারা সাহাবিদের চারপাশ থেকে চেপে ধরল। সংকীর্ণ করে দিলো তাদের জীবনযাপন। নানা গালিগালাজ ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ করে তুলল তাদের জীবন। এই অসহনীয় জুলুমের কথা বলে সাহাবাগণ আল্লাহর রাসূলের কাছে হিজরাতের অনুমতি চান। রাসূল বললেন, নিশ্চয় আমাকে তোমাদের হিজরাতের আবাসন দেখানো হয়েছে। দেখানো হয়েছে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী খেজুর বাগান বিশিষ্ট একটা ভূমি।
এরপর কয়েকদিন তিনি চুপচাপ থাকেন এবং একদিন খুব খুশি মনে সাহাবিদের কাছে এসে বললেন, নিশ্চয় আমাকে তোমাদের হিজরাতের স্থান জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সেটা হলো ইয়াসরিব। তাই যারা আগ্রহী তারা যেন সেদিকে বেরিয়ে পড়ে।
আল্লাহর রাসূলের মুখ থেকে হিজরাতের অনুমতি পেয়ে মাক্কার মুসলিমরা প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে, কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই একে একে তারা মাদীনার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন।
সাহাবিদের মধ্যে মাদীনায় প্রথম এসে পৌঁছান আবু সালামা ইবনু 'আবদুল আসাদ। এরপর আসেন আমির ইবনু রাবী'আহ, সঙ্গে স্ত্রী লাইলা বিনতে আবু হাসমাহ; তিনি মাদীনায় পালকিতে চড়ে আসা প্রথম নারী। তারপর দলে দলে সাহাবিরা মাদীনায় আসেন। মাদীনায় এসে তারা আনসারদের বাড়িতে ওঠেন। আনসাররাও তাদের সাদরে সম্ভাষণ জানান, নানাভাবে সাহায্য করেন। রাসূল ﷺ পৌঁছার আগেই আবু হুযাইফার মুক্ত দাস সালিম মুহাজিরদের নিয়ে কুবায় ইমামতি করে সালাত আদায় করেন।
মাদীনার উদ্দেশে মুসলিমদের হিজরাতের খবর শুনে কুরাইশদের ক্ষোভ তখন চূড়ান্ত মাত্রায়। বংশের যেসব যুবকের হিজরাতের খবর পেয়েছিল, তাদের ওপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা।
এর আগে আনসারদের একদল মুসলিম যুবক আল্লাহ্র রাসূলের কাছে দ্বিতীয় আকাবার বাই'আত অনুষ্ঠানে আনুগত্যের শপথ নিয়ে নিজ এলাকা মাদীনায় ফিরে যান। মুহাজির সাহাবিদের প্রথম দল যখন হিজরাত করে কুবা মাসজিদে এসে পৌঁছান, একই সময়ে আনসারদের কয়েকজন মাদীনা থেকে বের হয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে মাক্কায় আসেন। পরে আবার সেখান থেকে মাক্কার মুহাজিরদের সঙ্গে তারাও হিজরাত করে মাদীনার দিকে রওনা দেন; এরই মধ্য দিয়ে তারা একই সঙ্গে আনসার ও মুহাজির হয়ে যান। সংখ্যায় তারা খুব বেশি ছিলেন না। যাকওয়ান ইবনু 'আব্দ কাইস, 'উকবাহ ইবনু ওয়াহাব ইবনু কিলদাহ, আব্বাস ইবনু 'উবাদাহ ইবনু নাদলাহ, যিয়াদ ইবনু লাবীদ প্রমুখ। মুসলিমরা সবাই মাদীনার উদ্দেশে হিজরাতে বেরিয়ে পড়েন। রাসূল ﷺ, আবু বাকর, 'আলি, আর অসুস্থ অথবা বের হতে অক্ষম এমন কয়েকজন ছাড়া মাক্কায় আর কোনো মুসলিম ছিলেন না। [৪]

মুহাজির মুসলিমদের আটকাতে কুরাইশদের নানা অপচেষ্টা
হিজরাত না করে তখনো যে মুসলিমরা মাক্কায় রয়ে গেছেন, তাদের আটকাতে এমন কোনো চেষ্টা নেই যা কুরাইশ নেতারা করেনি। তারা যেসব চক্রান্ত করেছে, তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো:
১। স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের আলাদা করে ফেলা: আমরা প্রথম খণ্ডে উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামা, হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া নিজের ও তার স্বামী আবু সালামার হিজরাতের সময় ঈমানের অবিচলতার কথা আলোচনা করেছি। তিনি বলেন, 'মাদীনায় হিজরাত করার বিষয়ে যখন আবু সালামা রাজি হলেন, তিনি আমার জন্য তার উটটি নিয়ে আসেন। আমাকে সেটার ওপর আরোহণ করান। আমি আমার ছেলে সালামা ইবনু আবু সালামাকে কোলে নিয়ে হাওদায় বসি। মুগীরা ইবনু 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর ইবনু মাখযূম গোত্রের কিছু লোক আমার স্বামীকে দেখে তার দিকে এগিয়ে এসে বলল, আমাদের ওপর বিজয়ী হবে আর আমরা আমাদের কন্যাকে তোমার হাতে ছেড়ে দেবো, আর তুমি তাকে নিয়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাবে?
উম্মু সালামা বলেন, শেষে তারা আবু সালামার হাত থেকে উটের রশি ছিনিয়ে নিয়ে গেল এবং আমাকে তার থেকে বিছিন্ন করে ধরে নিয়ে গেল।
আবু সালামার গোষ্ঠী 'আবদুল আসাদ বংশ খবর জানতে পেয়ে কুরাইশদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে বলল—না, আল্লাহর কসম, আমরা আমাদের ছেলেকে তাঁদের হাতে ছেড়ে দেবো না।
সালামার মা বলেন, তারা আমার ছেলে সালামাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা ছেলের হাত ছেড়ে দিলে 'আবদুল আসাদ গোত্র তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়; কিন্তু মুগীরা বংশের লোকেরা আমাকে তাদের কাছে আটকে রাখে। শুধু আমার স্বামী আবু সালামা একাই মাদীনায় হিজরাত করে চলে যান।
উম্মু সালামা বলেন, এভাবেই আমাদের তিনজন পরস্পর থেকে একেবারে বিছিন্ন হয়ে যাই। আমি প্রতিদিন সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়ে আতবাহ নামক স্থানে এসে বসে থাকি। একা একা বসে আমি শুধু কাঁদি আর কাঁদি। কাঁদতে কাঁদতে সকাল গড়িয়ে সাঁঝ নামে। এক বছর কিংবা কিছু কম সময় পর্যন্ত আমি এভাবেই কেঁদে যাই। একদিনের ঘটনা—আমি সেখানে বসে আছি। এমন সময় আমার চাচার বংশ মুগীরা গোত্রের এক লোক সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। আমার অবস্থা দেখে সে থমকে দাঁড়ায়। সহানুভূতি দেখায় আমার প্রতি। পরে সে তার বংশ মুগীরার লোকদের কাছে গিয়ে বলল, আচ্ছা তোমরা কি এই অসহায় মহিলাকে যেতে দেবে না? তোমরা তার থেকে তার স্বামী ও ছেলেকে কেন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছ?
লোকটি এসে বলল, তুমি এখন ইচ্ছা করলে তোমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যেতে পার।
উম্মু সালামা বলেন, 'আবদুল আসাদ গোত্রের লোকেরা তখন ছেলেকে আমার কাছে ফেরত পাঠায়।
এরপর আমি আমার উটে চেপে রওনা হই। এসে পৌঁছি আমার স্বামীর কাছে। পথে, তান'ঈম নামক এলাকায়, 'উসমান ইবনু তালহা ইবনু আবু তালহা, 'আবদুদ- দার বংশের ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন তিনি আমাকে বলেন, কোথায় চললে, হে আবু উমাইয়ার মেয়ে?
আমি বললাম, মাদীনায় আমার স্বামীর কাছে।
তিনি বললেন, সঙ্গে কেউ কি আছে?
আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। আর আছে আমার এ ছেলেটি।
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, তুমি বড়ই অসহায়।
এ কথা বলে তিনি উটের রশি হাতে নিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে চললেন। আল্লাহর কসম, তার মতো এত উদার, এত সম্মানিত আরবের আর কোনো লোককে আমি দেখিনি। একসময় আমরা মাদীনায় এসে পৌঁছি। আমার নামার জন্য তিনি উটকে মাটিতে বসার আওয়াজ করেন। আমি নামা পর্যন্ত তিনি দূরে সরে দাঁড়ান। আমি নেমে গেলে তিনি উট নিয়ে গাছের সঙ্গে বাঁধেন।
কুবার বনু 'আমর ইবনু 'আওফ গ্রামটি দেখে বললেন, এ গ্রামেই তোমার স্বামী থাকেন। মাক্কা থেকে এসে আবু সালামা এই গ্রামেই ওঠেন। উম্মু সালামা নেমে পড়েন সেখানে। আর লোকটি মক্কায় ফিরে যান।
উম্মু সালামা প্রায়ই বলতেন, আল্লাহর কসম, ইসলামের এমন কোনো পরিবার দেখিনি যারা আবু সালামা পরিবারের মতো কষ্ট ভোগ করেছে এবং এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, যে কিনা 'উসমান ইবনু তালহার চেয়ে মহৎ।[৫]'
হিজরাত থেকে মুসলিমদের আটকাতে গিয়ে কুরাইশরা যে কঠিন পথে হেঁটেছে আবু সালামার পরিবার তার একটা উদাহরণ। তিনি একজন মাত্র ব্যক্তি। অথচ তাকে তার স্ত্রী থেকে জোর করে বিচ্ছিন্ন করা হয়। কলিজার টুকরা ছেলের মুখ দেখা থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তাকে হিজরাত থেকে নিবৃত্ত রাখতেই এত হাঙ্গামা। কিন্তু যখন একজন মু'মিনের অন্তরে ঈমান আস্থার জায়গায় আসন গেড়ে নেয়, তখন কোনো শক্তিই তাকে ইসলাম থেকে দূরে রাখতে পারে না। মোহ-প্রমত্ত-প্রলোভন অথবা বাধাবিপত্তির কৃপাণ তার অভীষ্ট লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে পথ আটকে দাঁড়াতে পারে না। হোক না সে বাধাটা তার অতি আপন ব্যক্তি অথবা বস্তু; কিংবা তার জীবনেরই কোনো অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন: বাধার পর্বতকে তুড়ি মেরে মাদীনায় হিজরাত করে চলে যান আবু সালামা। তার এমন দৃঢ়চেতা ভূমিকার কারণেই মুশরিকদের সব ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আল্লাহর পথের দা'ঈদের জন্য তার নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে আদর্শের খোরাক।[৬]
'উসমান ইবনু তালহা সেদিন যা করলেন, তা সত্যিই এক অসাধারণ কাজ। অথচ তখন তিনি কাফির ছিলেন (পরে অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করেন; মাক্কা বিজয়ের পূর্বে)। ঈমানহীন ব্যক্তি হয়েও তাদের কবল থেকেই মুক্তির পথে ছুটতে থাকা অসহায় একজন নারী ও তার শিশুসন্তানকে উটের রশি ধরে মক্কা থেকে সুদূর মাদীনায় পৌঁছে দিয়ে আসা নিতান্তই কোনো তুচ্ছ ঘটনা নয়। সেকালে তিনি কাফির থাকা সত্ত্বেও উম্মু সালামা তার সৎসঙ্গের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই উত্তম কর্মে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। দুর্বলকে সাহায্য করার তার যে মানবিক ঔদার্য, সেটারই প্রশংসা করেছেন উম্মু সালামা।[৭] 'উসমান ইবনু তালহার সহজাত মানবিকতা ও একজন আরব হিসেবে তার মৌলিক চারিত্রিক দৃঢ়তা কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারেনি যে, একজন সম্ভ্রান্ত রমণীকে এই বিপদসংকুল ধু-ধু মরুভূমিতে অনিশ্চয়তার মধ্যে একা ছেড়ে দেবেন। হোক না এই মহিলা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী; কিন্তু তাকে তো একা একা যেতে দেওয়া যায় না! তা ছাড়া তিনি জানতেন, উম্মু সালামা হিজরাত করছেন মাদীনায়। কুরাইশ কাফিররা তাকে একা পেলে যেকোনো বিপদ ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
হে আমার মুসলিম জাতি, এমন চারিত্রিক মাধুরী আজ কোথায়! বিংশ শতাব্দীতে এসে, সভ্য জগতে বাস করে আজ এমন চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাব বড়ই অনুভূত হচ্ছে। সর্বত্রই তো এখন মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, মান-সম্মানের ওপর আঘাত হেনে আনন্দ পাচ্ছে মানুষ বেশের কাপুরুষরা। খুন, রাহাজানি, গুম অহরহ নিত্য ঘটনা। প্রতিদিন খবরের পাতা উলটাতেই আমাদের চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হওয়ার গাদাগাদা অস্বস্তিকর খবর।
'উসমান ইবনু তালহার ঘটনাটি একটি আদর্শ ঘটনা। আরব সমাজ কলুষিত হওয়ার পরেও যে কয়টা ভালো গুণের চর্চা তখনো পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছিল, এই ঘটনাটি তার প্রতিনিধিত্ব করে। পৃথিবীর অন্য যেকোনো জাতির তুলনায় আরবরা ভালো কাজের চর্চায় এগিয়ে ছিল অনেক। আর এমন কিছু ভালো গুণ তাদের মধ্যে ছিল বলেই শেষ নবি ও রাসূল মুহাম্মাদ-কে আল্লাহ তা'আলা তাদেরই মধ্য থেকে বেছে নিলেন। [৮]
যুগে যুগে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করে থাকেন। সবকিছু তাদের অনুগত করে দেন। উম্মু সালামা ইসলামের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় এ বান্দার কাজে মনোযোগী হওয়ার জন্য 'উসমান ইবনু তালহার অন্তরকে বিগলিত করে দিলেন। উম্মু সালামার জন্য তিনি তাঁর সময় ও শ্রম ব্যয় করলেন। [৯] ভালো কাজের প্রতি এগিয়ে যাওয়ার 'উসমানের সহজাত প্রবৃত্তির সপ্রমাণও ঘটনাটি। আর এমন সহজাত স্বভাবই তাকে পরবর্তী সময়ে—হুদাইবিয়া সন্ধির পর—ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর হৃদয় আলোকিত হয়ে ওঠে, সম্ভবত উম্মু সালামার সঙ্গে মাদীনার অভিমুখে তাঁর সেই সফরেই।[১০]

ছিনতাই:
মাক্কার ভেতরকার মুসলিমদের হিজরাত করতে বাধা দিয়েই মুশরিকরা ক্ষান্ত হলো না, এবার সীমা অতিক্রম করে অপচেষ্টা চালাচ্ছে হিজরাত করে মাদীনায় চলে যাওয়া মুসলিমদের কীভাবে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা যায়। এ অপচেষ্টায় তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফলও হয়; একজন মুহাজিরকে মাদীনা থেকে ছিনিয়ে এনে মাক্কায় ফেরত পাঠায়। [১১] মুশরিকদের ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক এই চিত্রটি আমাদের কাছে তুলে ধরেন সাহাবি 'উমার ইবনুল খাত্তাব। তিনি বলেন, যখন 'আইয়াশ ইবনু রাবী'আ, হিশাম ইবনুল 'আস ইবনু ওয়াইল আস-সাহমি এবং আমি মাদীনায় হিজরাত করব বলে ঠিক করেছি। মক্কা থেকে ১০ মাইল দূরে, সারিফ উপত্যকার ওপরে, গিফার গোত্রের এক গাছ তলায় আমরা তিনজন একত্রিত হব বলে সিদ্ধান্ত হয়। আলোচনায় বলা হয়, আমাদের মধ্যে যে সকালে এই গাছের কাছে আসতে না পারে, তাহলে বুঝতে হবে তাকে আটক করা হয়েছে। সুতরাং বাকি সঙ্গী দুজন এগিয়ে যাবে।
'উমার বলেন, সকালে 'আইয়াশ ইবনু আবু রাবী'আ ও আমি গাছটির কাছে আসি; কিন্তু আমাদের হিশামকে আটক করা হয়। [১২]
এরপর আমরা মাদীনায় এসে কুবায় 'আমর ইবনু 'আওফ গোত্রে উঠি। আবু জাহল ইবনু হিশাম ও হারিস ইবনু হিশাম 'আইয়াশ ইবনু আবু রাবী'আর খোঁজে বের হয়। 'আইয়াশ ছিলেন তাদের দুজনের চাচাতো ভাই। শেষ পর্যন্ত তার খোঁজ করতে করতে তারা দুজন আমাদের কাছে মাদীনায় এসে হাজির হয়। তখন রাসূল মাক্কায়। তারা দুজন 'আইয়াশের কাছে এসে বলল, তোমার মা মানত করেছেন, তোমাকে না দেখা পর্যন্ত তিনি মাথায় চিরুনি পর্যন্ত দেবেন না, ছায়া গ্রহণ করবেন না। তখন আমি তাকে বললাম, 'আইয়াশ, আল্লাহর কসম, যদি তোমার জাতি তোমাকে চেয়েই থাকে; তবে তা কেবল তোমাকে তোমার দীন থেকে বিচ্যুত করার জন্যই। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সতর্ক হও।
আমি আরও বললাম, আল্লাহর কসম, তুমি ভালো করেই জানো যে, আমি কুরাইশদের মধ্যে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। আমার সম্পদের অর্ধেক তোমার জন্য। তারপরও তাদের সঙ্গে তুমি যেয়ো না; কিন্তু সে আমার কথা রাখল না। বেরিয়ে গেল তাদের সঙ্গে। যাওয়ার আগে আমি তাকে বললাম, আমি যা বলার তা তো তোমাকে বলেছিই। আমার উটটি সঙ্গে নাও। এটি খুবই দামি ও অত্যন্ত অনুগত। তুমি এর পিঠেই বসে থাকবে। যদি তাদের থেকে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ে, তবে সঙ্গে সঙ্গে এটা নিয়ে চলে আসবে। এরপর সে এটাতে চড়ে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল। কিছুদূর গিয়ে আবু জাহল তাকে বলল—হে আমার ভাই, আল্লাহর কসম, আমার উটটি আমার ভার আর বইতে পারছে না। তোমার উটের পেছনে কি আমাকে বসতে দেবে! তিনি বললেন, অবশ্যই। এরপর আবু জাহলকে চড়ানোর জন্য যেই তিনি তার উটনীকে নিচু করলেন, অমনি তারা দুজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে ধরে-বেঁধে মাক্কায় নিয়ে আসে। তার ওপর অনেক নির্যাতন চালানো হয়।[১৩]
'উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, আমরা বলাবলি করছিলাম, যে বিচ্যুত হয়েছে আল্লাহ তার কোনোকিছুই গ্রহণ করবেন না। তারা তো এমন এক জাতি যারা আল্লাহকে চিনত, তারপর তারা কুফরির দিকে ফিরে গেল। রাসূল মাদীনায় এলে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো নাযিল করেন—
বলে দাও, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ! আল্লাহর রাহমাত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ তো সব গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। তোমাদের ওপর শাস্তি আসার আগে তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো। তার পরে তোমাদের সাহায্য করা হবে না। আকস্মিকভাবে বা অজ্ঞাতসারে শাস্তি এসে পড়ার আগে তোমাদের রবের নিকট থেকে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ উত্তম বিষয়ের (অর্থাৎ কুরআনের বিধানসমূহের) অনুসরণ করো। [সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩-৫৫]
'উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, আমি আয়াতগুলো আমার নিজের হাতে সহীফাতে লিখে হিশাম ইবনু 'আসের কাছে পাঠাই। হিশাম বললেন, আয়াতগুলো আমার কাছে এলে আমি তুওয়া উপত্যকায় উঠতে উঠতে পাঠ করছিলাম; কিন্তু কিছুতেই এর মর্মার্থ আমার বুঝে আসছিল না। আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করি—হে আল্লাহ, আয়াতগুলো আমাকে বুঝিয়ে দাও। তিনি বলেন, অবশেষে আল্লাহ আমার অন্তরে আয়াতগুলোর একটা বুঝ দিয়ে দিলেন। আমি বুঝতে পারলাম, এগুলো আমাদেরই বিষয়ে, আমরা আমাদের নিজেদের নিয়ে যা যা বলছিলাম তা নিয়ে এবং আমাদের নিয়ে যা বলা হয়েছে সেসব নিয়েই আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে। তিনি বলেন, এরপর আমি দ্রুত উটের পিঠে উঠে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে দেখা করি। রাসূল তখন মাদীনায় অবস্থান করছিলেন। [১৪]
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয় যে, কীভাবে 'উমার তাঁর নিজের জন্য ও তার সঙ্গী 'আইয়াশ ও হিশামের জন্য হিজরাতের পরিকল্পনা করেন। তারা তিনজন কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের ছিলেন। দেখা করার জন্য বেছে নেন মাক্কা থেকে দূরে, হারাম এলাকার বাইরে, মাদীনা যাওয়ার পথে একটি জায়গা। দেখা করার সময় ও স্থান নির্ধারিত হয় খুবই গোপনীয়তার সঙ্গে। যাতে একজনের অন্যথা হলেও সঙ্গী অন্য দুজন তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন ঠিক ঠিকভাবে। তার অপেক্ষায় থেকে সময়ক্ষেপণ না হয়। কারণ, সে তো ধরা পড়েই গেছে এবং সত্যি সত্যি তাই হয়েছিল। হিশাম ইবনুল 'আস ধরা পড়ে যান; কিন্তু বাকি দুজন অর্থাৎ 'উমার ও 'আইয়াশ তাঁদের হিজরাতের কাজ চালিয়ে যান। পরিকল্পনাটি শতভাগ সফল হয়। তারা নিরাপদে মাদীনায় পৌঁছান। [১৫]
ওদিকে কুরাইশ কাফিররা কিছুতেই মুহাজিরদের পিছু ছাড়ছে না। জোঁকের মতো এঁটে আছে তাদের পেছনে এবং মাদীনা থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। এসবের মূল হোতা আবু জাহল ও হারিস; দুজনই 'আইয়াশের বৈমাত্রেয় ভাই; কিন্তু 'আইয়াশের কাছে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি চেপে গিয়ে এমনভাবে মাক্কায় ফিরে যাওয়ার বিষয় উপস্থাপন করে যে, তার কোনো ধরনের সন্দেহ জাগেনি। আর সন্দেহ জাগবে-ই বা কীভাবে, বিষয়টি যখন তার মায়ের সঙ্গে জড়িত! ষড়যন্ত্রটি মূলত আবু জাহলই তুলে ধরে সাহাবি 'আইয়াশের কাছে। কারণ, আবু জাহল ভালো করেই জানত-'আইয়াশ তার মায়ের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। মায়ের কথা বললে সে না গিয়ে থাকতেই পারবে না। তার এমন সহানুভূতির প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন তিনি তাদের দুজনের সঙ্গে যেতে রাজি হন। 'উমার তাকে বারণ করা সত্ত্বেও তিনি তাদের সঙ্গে মাক্কায় যেতে রাজি হয়ে যান। [১৬]
ইসলাম তার অনুসারীদের অন্তরে যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করেছে তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ওপরের ঘটনাটি। আরেক মুসলিম ভাইয়ের জান ও ঈমানের নিরাপত্তা-চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে এবং ফিরে যাওয়ার পর মুশরিকরা তাকে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে, এ ভয়ে 'উমার নিজের অর্ধেক সম্পত্তি তার জন্য উৎসর্গ করে দিতে চেয়েছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত 'আইয়াশ তার মায়ের প্রতি আবেগের মোহ কাটিয়ে উঠতে অক্ষম হন। তাই মক্কায় গিয়ে তিনি মায়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। 'আইয়াশ-এর সহজাত নির্মল চারিত্রিক গুণের কারণে তিনি 'উমার-এর অর্ধেক সম্পদ গ্রহণ করার প্রস্তাবকেও সসম্মানে এড়িয়ে যান। 'উমার মাদীনায় হিজরাত করলেও তার সহায়সম্পত্তি মক্কাতেই ছিল। 'আইয়াশ এর কিছুই গ্রহণ করেননি। তবে 'উমার ছিলেন খুবই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন সাহাবি। 'আইয়াশ যদি মক্কায় ফিরে যান তাহলে তার ওপর কী নির্যাতনটাই না নেমে আসতে পারে— তিনি তা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছিলেন। সেজন্য মুসলিম ভাইয়ের প্রতি দরদদিল হয়ে নিজের অর্ধেক সম্পত্তি তাকে দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেন; কিন্তু এতেও যখন 'আইয়াশ মক্কায় ফিরে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত হলেন না, তখন 'উমার তার দ্রুতগামী ও ভালো জাতের উটনীটি তাকে দেন। তার ব্যাপারে মুশরিকদের বিশ্বাসঘাতকতার যে আশঙ্কা তিনি করেছিলেন শেষমেশ সেটাই ঘটল।[১৭]
মুসলিমদের জানা ছিল, যারা বিভ্রান্ত হবে, অন্যদের বিভ্রান্ত করবে এবং জাহিলি সমাজের সঙ্গে উঠাবসা ও মেলামেশা করবে, আল্লাহ তাদের কোনো দান গ্রহণ করবেন না। এরপর আল্লাহর এ কথা নাযিল হয়; আল্লাহ বলেন—
বলে দাও, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, আল্লাহর রাহমাত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ তো সব গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। [সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩]
আয়াতগুলো নাযিল হতে না হতেই 'উমার দৌড়ে গেলেন। তার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন দুভাই 'আইয়াশ ও হিশামের কাছে আয়াতগুলো পাঠিয়ে দেন। যেন তারা মক্কার কাফিরদের পরিবেষ্টন থেকে নিজেদের মুক্ত করে সে এলাকা ছাড়তে পারে।[১৬]

বন্দি করে রাখা:
হিজরাত করতে বাধা দেওয়ার জন্য একপর্যায়ে কুরাইশরা মুসলিমদের বন্দি করে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। মুসলিমদের কাউকে হিজরাত করার উদ্যোগ নিতে জানলেই তারা তাকে আটক করে বন্দি করে রাখত। হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখত কোনো একটা ঘরে। বন্দি যাতে পালাতে না পরে, সেজন্য কঠোর পাহারা থাকত। কখনো সেই বন্দিখানা হতো ছাদহীন একটি ঘর। 'আইয়াশ ও হিশাম ইবনুল 'আসকে মুশরিকরা আটকে রেখেছিল এমনই একটা ঘরে, চারপাশে দেয়াল; কিন্তু ওপরে ছাদ নেই।[১৯] ছাদযুক্ত ঘরের অভাব ছিল—ব্যাপারটি এমন নয়; বরং এমন ঘরে রেখে শাস্তির মাত্রা বাড়ানোই ছিল তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। মাক্কার মতো উত্তপ্ত পরিবেশে রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে থাকাটা অবশ্যই অসহ্য রকমের একটা শাস্তি!
মুসলিমদের আটক রেখে শাস্তি দিয়ে কাফিররা মূলত দুটো উদ্দেশ্য হতো—বন্দিদের হিজরাত করতে বাধা প্রদান। অন্যটা হলো, মাক্কায় তখনো যেসব মুসলিমরা রয়ে গেছেন, আর মনে মনে হিজরাত করার চিন্তা করছেন, তারা যেন বন্দির ঘটনায় ভীত হয় এবং ভুলেও হিজরাত করার চেষ্টা না করে; কিন্তু মুশরিকদের এমন হীন চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। মাদীনা মুনাওয়ারায় হিজরাত করা থেকে তারা মুসলিমদের আটকাতে পারেনি। 'আইয়াশ ও হিশাম-এর মতো মাক্কার নিপীড়িত মুসলিমরা বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন এবং মাদীনায় গিয়ে আবাসন গাড়েন।[২০]
হিজরাত করে আসার পর নবি মাক্কার দুর্বল মুসলিমদের জন্য কুনুতের সালাত পড়ে দু'আ করেন। বিশেষ করে কয়েকজন মুসলিমের নাম ধরে তিনি দু'আ করেন। হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল যখনই শেষ রুকু থেকে মাথা ওঠাতেন, তখন বলতেন—হে আল্লাহ, আপনি 'আইয়াশ ইবনু আবু রাবী'আকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ, আপনি সালামা ইবনু হিশামকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ, আপনি ওয়ালিদ ইবনু ওয়ালিদকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ, আপনি দুর্বল মু'মিনদের মুক্ত করুন। হে আল্লাহ, মুদার গোত্রের ওপর আপনি আপনার চাপ প্রয়োগ করুন। হে আল্লাহ, আপনি সেটাকে (চাপ প্রয়োগকে) ইউসুফের দুর্ভিক্ষের মতো দুর্ভিক্ষে পরিণত করুন।[২১]
মুসলিমরা তাদের ভাই 'আইয়াশের ছিনতাই হয়ে যাওয়াটা প্রতিকারহীন ছেড়ে দেননি। রাসূল তাঁর একজন সাহাবিকে প্রতিনিধি করে মাক্কায় পাঠান। মেধা ও শক্তি খাটিয়ে তাদের দুজনকে যে ঘরে বন্দি রাখা হয়, সেখানে আসেন তিনি। মুক্ত করেন উভয়কে এবং তাদের সঙ্গে নিয়েই ফিরে আসেন মাদীনায়। [২২]

সহায়সম্পত্তি থেকে বিতাড়ন করা:
একবার রোমানরা নামির ইবনু কাসিত গোত্রে আক্রমণ করে। তখন সুহাইব ইবনু সিনান আন-নামারি ছোট এক বালক। রোমানরা তাকে বন্দি করে নিয়ে যায়। যারা তাকে বন্দি করে, তিনি তাদের অনেক গালমন্দ করেন। শেষে সাহাবি 'আবদুল্লাহ ইবনু জুদ'আন তাকে কিনে নিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দেন। 'আম্মার ইবনু ইয়াসিরের সঙ্গে তিনি একই দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন। [২৩]
সুহাইবের হিজরাতের সময়, কার্যতই ঈমানের সৌন্দর্য ও একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়ার বাস্তবায়ন ঘটে। তিনি সাধ্যের সবটুকু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে ব্যয় করেন। তাওহীদ ও ঈমানের ব্যাটেলিয়নের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হন। [২৪] হযরত আবু 'উসমান আন-নাহদি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে খবর এসেছে যে, সুহাইব যখন মাদীনায় হিজরাত করতে চাইলেন, তখন মাক্কাবাসীরা তাকে বলল, তুমি আমাদের এখানে এসেছিলে নিঃস্ব ও অপমানিত হয়ে। এরপর ধীরে ধীরে আমাদের কাছে তোমার সহায়সম্পত্তি বাড়ে। এভাবেই আজ তুমি এমন অবস্থানে পৌঁছেছ। এখন তুমি তোমার সম্পত্তি নিয়ে চলে যাবে, আল্লাহর কসম, এটা হতে পারে না। তিনি বললেন, আচ্ছা আমি যদি আমার সমুদয় সম্পত্তি রেখে যাই তাহলে তোমরা আমাকে চলে যেতে দেবে তো?
তারা বলল, হ্যাঁ। অতঃপর সুহাইব তার সব সম্পত্তি জমা করে তাদের দিয়ে দেন।
সুহাইবের ঘটনাটি শোনার পর রাসূল বললেন, সুহাইব লাভবান হয়েছে, সুহাইব লাভবান হয়েছে। [২৫] সাহাবি ইকরামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুহাইব যখন হিজরাতের উদ্দেশে বের হন, তখন মাক্কাবাসীরাও তাকে অনুসরণ করে পেছনে পেছনে আসে। সুহাইব তার পিঠে থাকা তৃণীর থেকে একে একে চল্লিশটি তির বের করে আনেন। পেছন পেছন আসা কাফিরদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার কাছাকাছি পৌঁছার চেষ্টা করো না; তাহলে তোমাদের প্রত্যেকের দিকে আমি তির ছুড়ে মারব। তির শেষ হলে তরবারি হাতে নেব; আর তোমরা তো ভালো করেই জানো যে, আমি একজন পুরুষ (বীরপুরুষ)। [২৬]
ইকরামা বলেন, এরপর আল্লাহর রাসূলের ওপর নাযিল হয় কুরআনের এ আয়াত, আল্লাহ বলেন—
মানুষের মধ্যে আবার এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। আল্লাহ (তাঁর) বান্দাদের প্রতি পরম স্নেহপরায়ণ। [সূরা বাকারাহ, ২: ২০৭]
রাসূল তাকে দেখে বলে উঠলেন, আবু ইয়াহইয়া, ব্যবসা সফল হয়েছে। তারপর এ আয়াত তাকে তিলাওয়াত করে শোনান। [২৭]
সুহাইব দীনের জন্য যে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন, বিনিময়ে তিনি কোনো পদের দাবি তোলেননি। নবি মুহাম্মাদ-এর বিনিময়ে তাকে দুনিয়ার কোনো পদপদবি আর্থসামাজিক কোনো সুবিধা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেননি।
মাক্কা ছেড়ে মাদীনার মু'মিনদের দলে যুক্ত হওয়ার জন্য তার যে আপ্রাণ প্রচেষ্টা ছিল, তা তিনি স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করেছেন। দীনের পথে, আল্লাহর খুশি কামনা করে নিজের সবকিছু যেভাবে উজাড় করে দিয়েছেন, তা মুসলিম তরুণ- যুবকদের জন্য এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। আশা করা যায় যুবকরা অনুপ্রাণিত হয়ে তারই দেখানো পথে ইসলামের কাজে এগিয়ে আসবে। [২৮]
মহান হিজরাতের অনেক অনেক বিরল ঘটনার মধ্যে আমরা মাত্র কয়েকটা ঘটনার অবতারণা করেছি এখানে। হিজরাতের প্রক্রিয়াটি আগাগোড়া এমন অগুনতি ঘটনায় ভরপুর। দীনের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া, নিজেকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করার মতো ত্যাগের বিরল সব ঘটনা ছড়িয়ে আছে হিজরাতের ঘটনার পরতে পরতে। সম্মানের সৌধ গড়ে মর্যাদা অর্জন কীভাবে করা যায়, সে শিক্ষাটা মুসলিম উম্মাহ এখান থেকেই পেতে পারে। [২৯]

টিকাঃ
১. আস-সিরাতুন নাবাউইয়্যাহ তারবিয়াতু উম্মাহ ওয়া বানাউ দাওলাহ, সালিহ আশ-শামি, পৃ. ১১৮
২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০, ১২১
৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ৩৩, ৩৪
৪. তাবাকাতু ইবন সাদ, ১/৩২৫
৫. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২০২, ২০৩
৬. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাহ, ড. ইবরাহীম 'আলি মুহাম্মাদ, পৃ. ১৩০, ১৩১। উসলুবের বিন্যাস এই কিতাব থেকে নেওয়া হয়েছে এবং মহত্ত্বের দৃশ্য 'আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ' কিতাব থেকে চয়িত হয়েছে।
৭. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৪
৮. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাহ ফি যাউইল কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ, ড. নুহাম্মাদ আবু শুহবাহ ১/৪৬১
৯. আত-তারীখুল ইসলামি, আল-হামীদি ৩/১২৮
১০. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২০৪
১১. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১৩২
১২. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১২৯
১৩. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাতুস সাহীহাহ, ১/২০৫
১৪. আল-মুজমা লিল-হাইসামি, ৬/৬১, আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৩১
১৫. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/১৫৯
১৬. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১৩৪
১৭. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ, ২/১৬০
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১৩২
২০. প্রাগুক্ত
২১. বুখারি, কিতাবুল ইসতিসকা ২/৩৩, হাদীস নং ১০০৬
২২. আস-সিরাতুন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১৩৫
২৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১১৯
২৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০
২৫. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ১/৪৭৭
২৬. আল-হাকিম, ৩/৩৯৮, সহীহ।
২৭. প্রাগুক্ত
২৮. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, ড. আব্দুর রহমান আল-বার, পৃ. ১২১
২৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৯

📘 রউফুর রহীম 📄 মুহাজিরদের সাদরে গ্রহণ এবং মু'মিনদের অন্তরে এর প্রভাব

📄 মুহাজিরদের সাদরে গ্রহণ এবং মু'মিনদের অন্তরে এর প্রভাব


মাদীনার আনসার সাহাবিদের ঈমান আনা, আল্লাহর রাসূলের কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ এবং সাহায্য-প্রতিশ্রুতির একটা ফল হলো, তারা রাসূল ও মুসলিমদের মাদীনায় হিজরাত করার আহ্বান জানান। অন্য একটা সুফল হলো, মুহাজির সাহাবিদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আনসারদের বাড়িঘরের দরজা মুহাজির নারী-পুরুষদের জন্য অবারিত করে দেওয়া হয়। আনসাররা তাদের সাদরে গ্রহণ করে নেন। একটি বাড়িতে ভাগাভাগি করে থেকেছেন একজন মুহাজির ও একজন আনসার। একজন মহিলা আনসার ও একজন মহিলা মুহাজির। আনসাররা কেবল মুহাজিরদের জন্য আবাসনেরই ব্যবস্থা করেননি; বরং তারা তাদের ধনসম্পদও মুহাজিরদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে দিয়েছেন অকাতরে। নিজের পাতের খাবার তুলে দিয়েছেন মুহাজির ভাইয়ের মুখে। তাদের ওপর অর্পিত ইসলামের দায়িত্বগুলো পালন করেছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। মুহাজিরদের সাদরে ঠাঁই দিয়েছে যাদের ঘরগুলো:

১) কুবার মুবাশশির ইবনু 'আবদুল মুনযির ইবনু যানবারের বাড়ি: মুহাজির নারী- পুরুষদের একটি দল তার বাড়িতে এসে ওঠেন, 'উমার ইবনুল খাত্তাবের পরিবার ও গোত্রের কয়েকজন, কন্যা হাফসা ও তার স্বামী এবং 'আইয়াশ ইবনু আবু রাবী'আহ মদীনায় এসে এ বাড়িতেই বসবাস করেন।
২) সুনাহ নামক জায়গায় হারিস বংশের আরেক ভাই খুবাইব ইবনু ইসাফের বাড়ি:[৩০] তালহা ইবনু 'উবাইদুল্লাহ ইবনু 'উসমান ও তার মা এবং সুহাইব ইবনু সিনান এ বাড়িতে এসে ওঠেন।
৩) নাজ্জার গোত্রের আস'আদ ইবনু যারারার বাড়ি: বলা হয় হামযাহ ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব এ বাড়িতে এসে ওঠেন।
৪) নাজ্জার গোত্রের আরেক শাখার সা'দ ইবনু খাইসামার বাড়ি: একদল অবিবাহিত মুহাজির বাড়িটিতে হিজরাতের পর বসবাস করতেন বলে বাড়িটির নামই হয়ে যায় 'অবিবাহিত বা কুমারদের বাড়ি।'
৫) বাল'আজালানে আরেক শাখা কুবার 'আবদুল্লাহ ইবনু সালামার বাড়ি: মক্কায় হিজরাত করে এসে এখানে ওঠেন 'উবাইদা ইবনু হারিস, তার মা সাখীলা, মিসতাহ ইবনু আসাসাহ ইবনু 'আব্বাদ ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব, তুফাইল ইবনু হারিস, তুলাইব ইবনু 'উমাইর, হুসাইন ইবনু হারিস।
৬) জাহজাবই গোত্র ও মুহতাদিন অর্থাৎ মুনযির ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু 'উকবাহর বাড়ি: এখানে এসে ঠাঁই নেন যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম, তার স্ত্রী আসমা বিনতে আবু বাক্স, আবু সাবরাহ ইবনু আবু রুহম, তার স্ত্রী উম্মু কুলসুম বিনতে সুহাইল। [৩১]
৭) 'আবদুল আশহাল গোত্র এবং মুহতাদিন অর্থাৎ সা'দ ইবনু মুআয ইবনু নু'মানের বাড়ি: মুস'আব ইবনু 'উমাইরের স্ত্রী হামনাহ বিনতে জাহাশকে নিয়ে এখানেই এসে ওঠেন।
৮) নাজ্জার গোত্র ও মুহতাদিন অর্থাৎ আওস ইবনু সাবিত ইবনু মুনযিরের বাড়ি: 'উসমান ইবনু 'আফ্ফান ও তার স্ত্রী, আল্লাহর রাসূলের কন্যা রুকাইয়া। [৩২]

আনসারদের এমন বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান রাসূল ﷻ ও তাঁর মুহাজির সাহাবিদের মাদীনায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি আল্লাহ্র রাসূলের ওফাতের পরেও মুহাজিররা মাদীনায় খুব সুন্দরভাবে বসবাস করে গেছেন। মিলমিশ করে একসঙ্গে বসবাস করার এমন দৃষ্টান্ত যেকোনো মানুষের অন্তরকে নাড়া দেবেই। [৩৩]
উদার মানসিকতা, অবিচল ঈমান, লেনদেনের ব্যাপারে স্বচ্ছ সততার মধ্য দিয়েই পরিপূর্ণতা লাভ করে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের মাঝে গড়ে ওঠে আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসার সেতুবন্ধন। তবে ফাঁকফোকরে প্রশ্ন ওঠে, আনসারদের এ বাড়িগুলোতেও যে পরস্পরে বিবাদের কিছু ঝাপটা লেগেছিল, আমরা কেন সেগুলো আমলে নিই না! কিংবা এর সপক্ষে তুলে ধরি না শক্তিশালী কোনো রেফারেন্স? কলহ-বিবাদে নাম করেছেন এমন মুসলিম নারীদের নামই বা কেন কোথাও উল্লেখ করা হয় না?
ইসলাম সত্য এক দীন। প্রতিটি সত্তার নড়াচড়ার মাপকাঠি হিসেবে ইসলাম নির্ধারণ করেছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। মুসলিমদের পরস্পরে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা ও দীনকে সাহায্য করার বিষয়টিকে ঘোষণা করা হয়েছে উন্নত চারিত্রিক সুষমা হিসেবে। এর সূচনা হয়েছিল আল্লাহর রাসূলের কাছে আনুগত্যের শপথ করার মাধ্যমে। তাদের অন্তরে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রত্যেক সাহাবি সততার সঙ্গেই মুসলিম উম্মাহর একতার জন্য কাজ করেছেন। কবরের শাস্তি, কিয়ামাত দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি এবং বিনিময়ে সাওয়াব ও জান্নাতে যাওয়ার আশা নিয়ে তারা এমন ভালো কাজগুলো করেছেন। এটা ঈমানের সুদৃঢ় দেয়ালের ভেতরের উষ্ণতা, ব্যক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং নিয়তের বিশুদ্ধতার প্রতীক। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, আনুগত্যের শপথ করেছেন এবং যে মুসলিম নারীই জেনেশুনে আনুত্যের শপথ নিয়ে দীনের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা মনগড়া কিছু করেননি; যে আদেশ তাদের করা হয়েছে, তারা তা-ই তামিল করেছেন মাত্র। একনিষ্ঠ ছিলেন কথা ও কাজে। যা বলতেন, বুঝেশুনেই বলতেন। আল্লাহকে ভয় করতেন সর্বাবস্থায়; কি প্রকাশ্যে কি গোপনে। কেবল আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে পেরেছেন বলেই আনসাররা নিজেদের কোঁচড়ে ঠাঁই দিতে পেরেছিলেন মুহাজিরদের। প্রত্যেকেই কাজ করতেন, সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেন তার ভাইয়ের কল্যাণের জন্য।
আনসাররা যা করেছেন, এর চেয়ে উত্তম পারস্পরিক সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিরল নজির আর হতে পারে না। পার্থিব কোনো প্রাপ্তির আশা তাদের মনে ঘুণাক্ষরেও জাগেনি। আল্লাহই দেবেন তার প্রতিদান, সাওয়াব দেবেন একমাত্র তিনিই—এমন আশাতেই অনুপ্রাণিত ছিলেন তারা।[৩৪]
ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দান-অনুদানের বিষয়টি খুবই স্পষ্ট; আমরা প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে মাদীনার আনসার সাহাবিদের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা বলেই যাব। আমরা আজকের সামসময়িক বিশ্বের 'ব্রেইন ওয়াশড' মুসলিমদের কাতারে গিয়ে গবেষণার নামে হয়তো তাদের কিছু দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করলাম, এতে ফায়দা কী? ক্ষুদ্র দিয়ে বৃহৎ ঢাকার চেষ্টা? সাহাবিরা তো আমাদের মতো ছিলেন না!
ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে আগের মতো নিষ্পাপ হয়ে যেতেন। ভুলের জন্য অনুতাপ তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিল। মানবিক দুর্বলতাগুলো ডিঙিয়ে দীনের জন্য, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য তারা যা করেছেন, তার তুলনা চলে না।
আনসার সাহাবিরা মাক্কায় আগত মুহাজির দলটির জন্য নিজেদের ঘরের সবগুলো দুয়ার খুলে দেন; নিছক দু-একজন ব্যক্তির জন্যই নয়; বরং যত জন মুহাজির মদীনায় এসে ওঠেন, তাদের সবাইকেই তারা নিজেদের করে নেন, আপন করে নেন। আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি দু-এক দিনের জন্য ছিল না, আনসারদের ঘরে মুহাজিররা বসবাস করেন মাসের পর মাস। খাবার খান ধারাবাহিকভাবে। তাদের কাছে আগত মুহাজির ভাইদের জন্য আনসাররা নিজেদের ধনসম্পদ বিলিয়ে দেন। আপন করে নেন ভালোবাসা দিয়ে। পাশে গিয়ে দাঁড়ান তাদের সুবিধা-অসুবিধায়। আমরা এখন এমন এক ইসলামি সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যা ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। নিজেদের আদর্শের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আনসারদের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দান-অনুদানের কোনো কাজে লাগতে পারছিলেন না মুহাজিররা।
মদীনায় এলে নিরাপত্তা ও সহযোগিতার অঙ্গীকার ছিল, কিন্তু এই রকম অন্য-বস্ত্র-বাসস্থানের আশা ও নিশ্চয়তা তাদের সামনে ছিল না। মক্কায় মুহাজিররা সব ত্যাগ করে এলেন, মাদীনার আনসাররা নিজেদের অঙ্গ-অংশ ত্যাগ করে বাস্তুভিটা ছেড়ে আসা মুহাজিরদের সমীপে তা নিবেদন করে দিলেন। কুরআন তাদের ভূষিত করে এভাবে—
(এ সম্পদ) দেশত্যাগী গরিবদের জন্য (গরিব মুহাজিরদের জন্য), যারা তাদের ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে; তারাই সত্যবাদী। [সূরা হাশ্র, ৫৯:৮]
মাদীনার নতুন পরিবেশ গড়ে ওঠে ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির ওপর ভিত্তি করে। তবে রাসূল ﷺ তখন পর্যন্ত মাদীনায় হিজরাত করেননি। শিষ্যরা যেভাবে ঈসা ইবনু মারইয়াম-কে সাহায্য করেছিলেন, তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে নিজ জাতির কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন ১২ জন আনসার সাহাবি প্রতিনিধির কাছ থেকে তাকে নিরাপত্তা দিতে পারবেন মর্মে আশ্বাস পেয়েই কেবল রাসূল ﷺ পরবর্তী সময়ে হিজরাত করেন। ইতোমধ্যে হিজরাত করে মাদীনায় চলে এসেছেন মুহাজিরদের নেতৃত্বস্থানীয় দলটিও; তারা মাদীনার মুসলিমদের নবি-এর দেখানো পথের কথা বলেন, শোনান নবি-এর মুখনিঃসৃত অমিয় বাণী। তাদের এমন দাওয়াতি প্রচেষ্টার কারণেই সেখানে একটা পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং মুহাজিরদের এ দলটির তত্ত্বাবধান পেয়েই রাসূল ﷺ সেখানে হিজরাত করেন। [৩৬]
নতুন এ সমাজের অনন্য ও বিরল একটি বৈশিষ্ট্য হলো, শ্রেণিবৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার কবর রচনা করা। ছোট-বড়, সাদা-কালো কিংবা ধনী-গরিবের কোনো ফারাক ছিল না সমাজটিতে। তাদের সালাতের ইমামাত করতেন হুযাইফা-এর মুক্ত করা দাস সালিম। তিনি তাদের সবার মধ্যে ভালো কুরআন পড়তে জানতেন। অথচ তাদের মধ্যে অনেক নেতা ছিলেন। আনসার-মুহাজির, কুরাইশ, আওস এবং খাযরাজের বড় বড় সব নেতাই সেখানে ছিলেন। সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অথচ সালাতের ইমামাত করছেন তাদের কেউ নন, একজন কুরআনের হাফিজ। সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হতো কুরআনের পাঠক ও বাহককে। তিনি কেবল সালাতেরই ইমামাত করতেন না, যুদ্ধের ঝান্ডাও থাকত তার হাতে। ইসলামের সোনালি সে যুগে কুরআনের বাহক আর যুদ্ধের পতাকাবাহীর মাঝে কোনো তফাত ছিল না। আজ আমাদের সমাজে এ প্রভেদটা বড়ই প্রকট। নেতৃত্বটা আজ দুইটা শিবিরে বিভক্ত; সালাতের ইমামাত করছেন কুরআনের বাহকগণ, আর আল্লাহর পথে জিহাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবল মুজাহিদগণের কাঁধে। আমরা এই রকম ধারণা ও মানসিক বৈকল্য নিয়েই ইসলাম পালন করে যাচ্ছি। ইয়ামামার যুদ্ধে মুহাজিরদের পতাকা বহন করছিলেন হুযাইফা-এর সেই মুক্ত করা দাস সালিম; যুদ্ধের একপর্যায়ে তার ডান হাত কেটে গেলে বাম হাতে তুলে নেন পতাকা। বাম হাতও কেটে যায় একসময়; তিনি এবার কাঁধ ও ঘাড়ের সাহায্যে পতাকা আঁকড়ে ধরেন। উভয় পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়, একপর্যায়ে তিনি শহিদ হন আল্লাহর পথে।[৩৬]
নতুন ইসলামি সমাজের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহর পথে মানুষকে প্রকাশ্যে আহ্বান করা। কারও আর জানার বাকি নেই যে, ইয়াসরিবের অধিকাংশ নেতা ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছেন। দাওয়াতি কাজ থেকে কেউই পিছিয়ে নেই; কি যুবক, কি নারী, কি পুরুষ সবাই মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করার কাজে নেমে পড়েছেন। দ্বারে দ্বারে দিয়ে যাচ্ছেন মাদীনায় আল্লাহর রাসূলের আগমন ও কর্মতৎপরতার সুসংবাদ।
আবিসিনিয়ায় অবস্থানকারী মুসলিম সমাজ এবং ইয়াসরিবে অবস্থাকারী মুসলিম সমাজে একটা তুলনা করা যেতে পারে। আবিসিনিয়ার মুসলিম সমাজ যত না-ইসলামি সমাজের ছাপ বহন করছিল, তার চেয়ে রাজনৈতিক একটা আশ্রয় এবং প্রবাসী কলোনির ছাপ বহন করছিল বেশি। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, মুসলিমরা সেখানে 'ইবাদাতের পুরোপুরি স্বাধীনতা পেতেন। অমুসলিম সমাজ থেকে তাদের বসবাস দূরে হওয়ার কারণে দীনের দাওয়াত দিয়ে তারা নিকটবাসী খ্রিষ্টানদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারছিলেন না। মাক্কায় ইবাদাত করার কোনো স্বাধীনতা ছিল না, দাওয়াত দেওয়ার জন্যও মিল ছিল না সেরকম কোনো সুযোগ, এমন বৈরী পরিবেশের কারণে যদিও আবিসিনিয়ায় সাহাবিরা হিজরাত করেন, কিন্তু আবিসিনিয়ায় এসেও সে সুযোগ যে খুব একটা মিলেছে সে কথা বলা যাবে না। বিপরীতে মাদীনার চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুহাজিররা সেখানে বৈরী কোনো পরিবেশে নয়, বন্ধুভাবাপন্ন একটা পরিবেশে গিয়ে ওঠেন। নিশ্চিন্ত মনে তারা মানুষকে আহ্বান করেন আল্লাহর পথে। আল্লাহর 'ইবাদাত করেন স্বাধীনভাবে। এজন্যই আবিসিনিয়ার মুহাজিরগণ কেবল মাদীনায় হিজরাত করার খবরটি শুনেই সেখান থেকে মাদীনার দিকে রওনা দেন। তারা মাদীনায় হিজরাতের খবর শুনে আর দেরি করেননি, সোজা মাদীনায় গিয়ে ওঠেন। শুধু নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজন মুহাজিরকে সেখানে থেকে যেতে বলা হয়। যুগ যুগ ধরে পৌত্তলিক মুশরিকদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে এভাবেই মাদীনা হয়ে ওঠে আল্লাহর রাসূলের শহর, মুসলিম শহর।
ইয়াসরিব এখন আর ইয়াসরিব নেই, তার নাম এখন মাদীনাতুন নবি বা নবির শহর। পৌত্তলিকতার কবল থেকে মুক্ত হয়ে নবির শহরে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজব্যবস্থা। মূলত এ সমাজটির কার্যকর ভিত্তিস্থাপন এবং উন্নতি শুরু হয় প্রথম আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে ১২ জন সাহাবি মাদীনায় ফিরে আসার পর পরই। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আস'আদ ইবনু যারারাহ। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, তারা কেবল দাওয়াতি মিশন নিয়েই ঘুরে বেড়ান মানুষের দ্বারে দ্বারে। তাদের কাজের পরিসর, ব্যাপকতা ও পরিধি পূর্ণতা পায় ৭০ জন সাহাবি ফিরে আসার পর। ৭০ জনের এ দলের সবার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামাজিক জ্ঞান ছিল পূর্ণমাত্রায়। একত্র হয়ে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, তাদের দেশটি হবে পৃথিবীর বুকে মুসলিমদের প্রথম রাজধানী। বাইরের শত্রুর যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার প্রস্তুতি তারা নিয়ে রাখেন। এভাবেই রাসূল ﷺ মাদীনায় তাদের কাছে আসার ক্ষণ ঘনিয়ে আসে।
যে নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য রাসূল ﷺ অবিশ্রান্তভাবে তাঁর মেধা সময় ও শ্রম দিয়েছিলেন, তার সুফল বইতে শুরু করেছে এখন। সুফলের প্রভাবটা বেশি অনুভূত হচ্ছে মাদীনার নতুন এ সমাজের উদ্যমতা ও তৎপরতার মধ্য দিয়ে। রাসূলের নেতৃত্বকে যেমন তারা নিজেদের কল্যাণের চাবিকাঠি জ্ঞান করে লুফে নিয়েছে, তেমনি ইসলামের সমস্ত বিধি-নিষেধ পালনেও একনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার।
রাসূল ﷺ খাঁটি মনের এ মানুষগুলোকে তৈরি করেছেন সুনিবিড় তত্ত্বাবধানে। একতার গলনপাত্রে ঢেলে সাজিয়ে তুলে এনেছেন পাকসাফ করে। সিসাঢালা প্রাচীরতুল্য এক সুদৃঢ় ঢাল ও শক্তিতে পরিণত করেন তাদের। সাহাবিরা উদ্ধত কাফিরদের বিপক্ষে, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে জিহাদ করার শপথ নেওয়ার পরই মুসলিম সমাজের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এ কারণে আমরা বলতে পারি, পৃথিবীতে ইসলামি সমাজকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো যথাযথ প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল ইসলামি সমাজ গড়ে ওঠে আপন ভিত্তিতে।[৩৭]

টিকাঃ
৩০. আল-মারআতু ফিল-আহদিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১১৬
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৭
৩২. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ ফি যাওইল কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ, আবু শুহবাহ ১/৪৬৮, ৪৬৯
৩৩. আল-মারআতু ফিল-আহদিন নাবাউয়্যাহ, পৃ. ১১৮
৩৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২
৩৫. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/১৭১, ১৭২
৩৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২/১৭৪, ১৭৫
৩৭. আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ, ২/১৪৬, ১৪৭

📘 রউফুর রহীম 📄 ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে মাদীনাকে বেছে নেওয়ার কারণ

📄 ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে মাদীনাকে বেছে নেওয়ার কারণ


মাদীনাকে হিজরাত ও দাওয়াতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে আল্লাহর কী প্রজ্ঞা কাজ করেছে, সে রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আমরা এতটুকু বলতে পারি, শহরটি প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত ও যুদ্ধ উপযোগী। সুরক্ষিত হওয়ার দিক থেকে আরব উপদ্বীপের আর একটি শহরও এর ধারে কাছে ছিল না। বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণি আগলে আছে মাদীনার পশ্চিম ও পূর্ব দিক; চাইলেও কেউ এই দুটি দিক দিয়ে শহরটিতে আক্রমণ করতে পারবে না। কেবল উত্তর দিকটি উন্মুক্ত ছিল; তাতেও নিরাপত্তার কোনো সমস্যা ছিল না (৫ম হিজরিতে, আহযাব যুদ্ধে পরিখা খনন করে রাসূল ﷺ এ দিকটি থেকে মাদীনাকে সুরক্ষা দেন)। অন্যদিকে দক্ষিণ দিক খেজুরবাগান ও ঘন ঝোপঝাড়ে বেষ্টিত ছিল; কোনো সৈন্যদল আক্রমণ করার ইচ্ছায় এ দিকটাকে যদি বেছেও নেয়, তবে তাদের মাড়াতে হবে খুবই সংকীর্ণ ও বিপৎসংকুল পথ। যেখানে কোনো ভাবেই সৈন্যবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সারিবদ্ধভাবে এগোনোর কোনো সুযোগ নেই এ পথ ধরে।

সামরিক বিবেচনায় ছোট একটা পাহারাও অনেক সময় সামরিক শৃঙ্খলাকে ধূলিসাৎ করা এবং সামনে এগোতে বাধা দানে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক বলেন, মাদীনার একটি দিক ছিল খোলামেলা। আর বাকি সবগুলো দিক ছিল বাড়িঘর এবং খেজুর বাগানে পরিবেষ্টিত, কোনো শত্রুদল বাধাগুলো অতিক্রম করার সামর্থ্য রাখত না।[৩৮]

মাদীনাকে বেছে নেওয়ার পেছনে আল্লাহর প্রজ্ঞার কথা জানাতে গিয়ে হিজরাতের আগে রাসূল ﷺ সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের হিজরাত করার জায়গা দেখেছি। দু-লাবাতের মাঝে খেজুর বেষ্টিত।'[৩৯] এরপর হিজরাতে আগ্রহী সাহাবিরা দল বেঁধে মাদীনায় হিজরাত করেন।

মাদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্র দুটির লোকজন ছিল আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, সাহসী, শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা। কারও সামনে নত হওয়ার নজির তাদের ইতিহাসে নেই। তারা কখনো কোনো গোত্র কিংবা কোনো শাসন কর্তৃত্বের কাছে নতজানু হয়ে কর দেয়নি। ইবনু খালদূন বলেন, এ দুটি গোত্রই ইয়াসরিবে প্রভাব বিস্তার করে ছিল। ইয়াসরিবের প্রতিরক্ষার সবগুলো দিক ছিল তাদের নখদর্পণে। আওস ও খাযরাজের এমন শক্তিমত্তা দেখে প্রতিবেশী মুদার গোত্র তাদের দলে এসে যোগ দেয়।

আল্লাহর রাসূলের মামার বংশ 'আদি ইবনু নাজ্জার গোত্রেরই একজন নারী ছিলেন দাদা 'আবদুল মুত্তালিবের মা; হাশিম 'আদি ইবনু নাজ্জার গোত্রের একজন 'আমরের কন্যা সালমাকে বিয়ে করেন। তার ঘরেই জন্ম নেন আল্লাহর রাসূলের দাদা 'আবদুল মুত্তালিব। হাশিম ছেলেকে সালমার কাছে রেখে চলে আসেন। বয়ঃসন্ধিক্ষণে পৌঁছার আগেই চাচা মুত্তালিব তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন। আরব সামাজিক জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ককে অত্যন্ত সমীহ করা হতো। আবু আইয়ুব আল-আনসারি এমনই একজন আত্মীয়, রাসূল ﷺ মদিনায় গিয়ে যার বাড়িতে ওঠেন।

মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা ছিলেন কাহতান বংশের মুহাজির, মক্কার প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা এবং এর আশপাশের লোকজন ছিলেন 'আদনানের বংশধর। রাসূল ﷺ হিজরাত করে মদিনায় এলে আনসাররা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। সেখানে 'আদনানি ও কাহতানি আরবরা ইসলাম নামের একই পতাকা তলে সমবেত হন। যেন সবাই মিলে হয়ে ওঠেন একটি শরীর, একই আবেগ ও আক্রোশ সম্মিলিত করে তাদের সকলকে। অথচ জাহিলি যুগে তারা পরস্পরে শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করত, বংশ গৌরবের প্রতিযোগিতায় নামত; কিন্তু আজ তারা এক হয়ে যাওয়ায় শয়তান জাহিলি ধারায় কাহতানি কিংবা 'আদনানি সূত্রিতার কোনো জিদ উসকে দেওয়ার রাস্তা পাচ্ছিল না। এভাবেই রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের বসবাস, দীনের দাওয়াত ও দাম্ভিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য মদীনা হয়ে ওঠে যথোপযুক্ত ভূমি। মদীনা নামক সুদৃঢ় কেন্দ্র থেকেই ইসলাম তার আপন মহিমায় গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করে। প্রথমে জয় করে নেয় আরব উপদ্বীপ, তারপর একে একে তার বিজয় নিশান নিয়ে ছুটে চলে পৃথিবীর দিকে দিকে, পথে-প্রান্তরে।[৪০]

১) মদীনার প্রতি আল্লাহ্র রাসূলের মুগ্ধতা এবং এর জন্য তাঁর দু'আ: রাসূল ﷺ আল্লাহর কাছে এ বলে দু'আ করেছেন, 'মক্কা যেমন আমাদের প্রিয়, হে আল্লাহ, আপনি মদীনাকে আমাদের কাছে সেরূপ প্রিয় করে তুলুন বা তার চেয়েও বেশি।'[৪১] হযরত আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল ﷺ যখনই কোনো সফর থেকে ফিরতেন, তিনি মদীনার উঁচু উঁচু রাস্তার দিকে তাকাতেন, তাঁর উটনীকে জোরে হাঁকাতেন। আর যদি (উটনী না হয়ে) অন্য কোনো বাহন হতো, তাহলে সেটাকে দ্রুত ছোটাতেন।' [৪২]

২) মক্কার তুলনায় মাদীনাতে দ্বিগুণ বারাকাহর জন্য আল্লাহর কাছে আল্লাহ্র রাসূলের দু'আ: আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকজন তাদের গাছের প্রথম ফলটি আল্লাহর রাসূলের দরবারে নিয়ে আসতেন। রাসূল ﷺ সেটা দেখে বলতেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ফলে আমাদের জন্য বারাকাহ দিন, বারাকাহ দিন। আমাদের মাদীনাতে, বারাকাহ দিন সা'-এ এবং বারাকাহ দিন আমাদের মুদ্দ-এ। হে আল্লাহ, নিশ্চয় ইবরাহীম ছিলেন আপনার বান্দা, আপনার বন্ধু এবং আপনার একজন নবি। আর আমিও আপনার বান্দা এবং আপনার একজন নবি। তিনি মাক্কার জন্য আপনার নিকট দু'আ করেছিলেন। আর আমিও মাদীনার জন্য আপনার কাছে সেই দু'আ করছি, যা তিনি মাক্কার জন্য করেছিলেন এবং তার অনুরূপ।'[৪৩]

৩) আল্লাহ্র রাসূলের বারাকাহর কল্যাণে মাদীনাকে দাজ্জালের হাত থেকে ও প্লেগ রোগের প্রকোপ থেকে সুরক্ষা দান: আল্লাহ তা'আলা মাদীনার সুরক্ষার জন্য একদল ফেরেশতা নিয়োজিত করে দেন। তাদের নিরাপত্তা দেওয়াল ভেদ করার সাধ্য দাজ্জালেরও নেই। সে সময়ে মাদীনায় বসবাসরত কাফির-মুনাফিকদের দাজ্জালের কাছে ছুড়ে মারবে। এমনিভাবে রাসূল মাদীনাবাসীর সুস্বাস্থ্যের জন্য দু'আ করেছিলেন বলে সেখানে প্লেগ থাবা বসাতে পারেনা। [৪৪]

৪) মাদীনার দুর্দিনে ধৈর্য ধরার ফজিলত: যে ব্যক্তি মাদীনার কঠিন দিনে এবং রুটি-রুজির অনটনের দিনে ধৈর্যধারণ করবে, রাসূল কিয়ামাতের দিন তার জন্য সুপারিশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।[৪৫] সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, 'মাদীনা তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা জানত। যে ব্যক্তি মাদীনার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে মাদীনাকে ছেড়ে যাবে না, আল্লাহ তাকে এর থেকেও উত্তম একটা অবস্থানে উপনীত করবেন।'[৪৬]

৫) মাদীনায় মারা যাওয়ার ফজিলত: ইবনু 'উমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, যার পক্ষে সম্ভব সে যেন মাদীনায় মৃত্যুবরণ করে; কারণ, যে ব্যক্তি সেখানে মারা যাবে, আমি তার জন্য সুপারিশ করব।[৪৭] হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব এ দু'আটি প্রায়ই করতেন, 'হে আল্লাহ, আপানার পথে শহিদ হওয়ার এবং আপনার রাসূলের শহরে মৃত্যুবরণের তাওফীক দিন।[৪৮] আল্লাহ তা'আলা 'উমার ফারুক-এর দু'আ কবুল করেন; 'উমার সালাতের ইমামাত করার সময় আল্লাহর রাসূলের মিহরাবে শাহাদাত বরণ করেন।

৬) মাদীনা ঈমানের ঘাঁটি এবং সকল পঙ্কিলতা থেকে নিষ্কলুষ: ঈমানের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে মাদীনা। পৃথিবীর সেরা মানুষেরা আবাস গেড়েছেন সেখানে। দুষ্ট ও খারাপ লোকরা হয়েছে বিচ্যুত ও বিতাড়িত। কিছুদিন বুদ্বুদের মতো নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ঠিকই; কিন্তু খুব দ্রুতই তাদের উবে যেতে হয়েছে। আপন তাগিদেই রণে ভঙ্গ দিয়ে তারা পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়েছে। কখনো শোনা যায়নি, মাদীনার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে কোনো মুসলিম মাদীনা ছেড়ে অন্য কোথাও থেকেছেন। তবে আল্লাহ কারও ভাগ্যে অন্য কিছু লিখে রাখলে সেটাভিন্ন কথা। [৪৯] আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় ঈমান মাদীনার দিকে এসে মিলিত হবে ঠিক সেভাবে, যেভাবে সাপ তার গর্তে গিয়ে আশ্রয় নেয়। [৫০] রাসূল বলেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, জেনে রাখো, নিশ্চয় মাদীনা হাপরের মতো; অনিষ্টকর সবকিছু সে বের করে দেয়। হাপর যেভাবে লোহার জং দূর করে, ঠিক সেভাবে মাদীনা তার সব অনিষ্ট মিটিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত কিয়ামাত হবেনা। [৫১]

৭) যাইদ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণিত; রাসূল বলেন, নিশ্চয় এটা (মাদীনা) পবিত্র। সে সব পাপাচার মিটিয়ে দেয় ঠিক সেভাবে, যেভাবে আগুন রুপার ময়লা দূর করে। [৫২]

৮) অনিষ্টকারীর হাত থেকে মাদীনাকে আল্লাহর সুরক্ষা প্রদান: মাদীনার বিনাশ চায়, এমন যেকোনো লোকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলা মাদীনা শহরকে সুরক্ষা দান করবেন। যে মাদীনায় কোনো বিদা'আত সৃষ্টি করবে কিংবা কোনো বিদা'আতিকে সেখানে আশ্রয় দেবে, অথবা মাদীনাবাসীকে হুমকি দেবে, রাসূল ﷺ এমন ব্যক্তিকে আল্লাহর অভিশাপ, শান্তি এবং দ্রুত ধ্বংস হওয়ার ভয় দেখিয়েছেন। [৫৩] সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, মাদীনাবাসীর বিরুদ্ধে যে-ই ষড়যন্ত্র পাকাবে, সে লবণ যেভাবে মিশে যায় সেভাবে গলে যাবে। [৫৪] রাসূল আরও বলেন, মাদীনা একটি পবিত্র স্থান; যে ব্যক্তি সেখানে বিদা'আত সৃষ্টি করবে কিংবা কোনো বিদা'আতিকে প্রশ্রয় দেবে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন তার কোনো দান-অনুদান এবং বিনিময় গৃহীত হবে না। [৫৫]

৯) মাদীনার পবিত্রতা: রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওয়াহির ভিত্তিতে মাদীনাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন; অতএব, সেখানে কোনো ধরনের রক্তপাত বৈধ নয়। তাই এখানকার অধিবাসীরা কারও চোখ রাঙানির ভয়ে তটস্থ থাকতে হবে না। এই ভূমির গাছপালা কাটা যাবে না। পথে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু নিজের মনে করে পকেটে পুরে ফেলার কোনো সুযোগ নেই, যথাযথ মালিকের হাতে তুলে দিতে হবে [৫৬]। এমন আরও অনেক কিছুই করা যাবে না মাদীনার সে হারাম এলাকায়; কারণ সেখানে এগুলো করা হারাম। রাসূল বলেন, নিশ্চয় ইবরাহীম মাক্কাকে হারাম (পবিত্র) বলে ঘোষণা করেছেন এবং এর জন্য দু'আ করেছেন। ইবরাহীম যেভাবে মাক্কাকে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই আমি মাদীনাকে হারাম ঘোষণা করেছি এবং এর মুদ্দ ও সা'-এ বারাকাহর বিষয়ের জন্য আমি দু'আ করেছি। ঠিক সেভাবেই, যেভাবে ইবরাহীম মাক্কার জন্য দু'আ করেছেন। [৫৭] তিনি আরও বলেন, হে আল্লাহ, নিশ্চয় ইবরাহীম মাক্কাকে হারাম করেছেন, আর আমি দুই লাবিতের মাঝে অবস্থানকারীকে হারাম করেছি, [৫৮] অর্থাৎ মাদীনা।

মাদীনার এমন অনন্য মর্যাদার পুরোমাত্রায় ভাগীদার ছিলেন সাহাবিরা। মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরাত করে কখন আসবেন, সেখানে কবে থেকে বসবাস শুরু করবেন—এ নিয়ে সাহাবিরা খুবই উদ্‌গ্রীব ছিলেন। এভাবেই মুসলিম উম্মাহর শৌর্য-বীর্য সব এসে একত্রিত হয় মাদীনার ভূখণ্ডে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে উম্মাহ তার শক্তি নিয়োগ করে সব ধরনের শির্ক ও রংবেরঙের কুফুরির মূলোৎপাটনে। তারাই পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে নিয়ে যান ইসলামের বিজয় পতাকা।

টিকাঃ
৩৮. আস-সীরাতুন নাবাউয়্যাহ, নদভি, পৃ. ১৫৭
৩৯. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ৫২
৪০. আল-আসাসু ফিস সুন্নাহ, ১/৩৩৩
৪১. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৫৭
৪২. বুখারি, উমরাহ অধ্যায়, ৩/৬৩০, হাদীস নং ১৮০২
৪৩. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, মাদীনার ফজিলত পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ২/১০০০, হাদীস নং ১৩৭৩
৪৪. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃ. ১৫৮
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০
৪৬. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, মাদীনার ফজিলত পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ২/৯৯২, হাদীস নং ১৩৬৩
৪৭. আহমাদ, ২/৭৪, হাদীস নং ৫৮১৮, সনদ সহীহ। ইবনু হিব্বান সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, হাদীস নং ৩৮৪১
৪৮. বুখারি, মাদীনার ফজিলত অধ্যায়, ৪/১০০, হাদীস নং ১৮৯০
৪৯. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃষ্ঠা. ১৬১
৫০. বুখারি, মাদীনার ফজিলত অধ্যায়, ৪/৯৩, হাদীস নং ১৮৭৬
৫১. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, ২/১০০৫, হাদীস নং ১৩৮১
৫২. বুখারি, যুদ্ধাভিযান অধ্যায়, উহুদ যুদ্ধ পরিচ্ছেদ, ৭/৩৫৬, হাদীস নং ৪০৫০
৫৩. আল-হিজরাতুন নাবাউয়্যাতুল মুবারাকাহ, পৃষ্ঠা. ১৬২
৫৪. বুখারি, মাদীনার ফজিলত অধ্যায়, ৪/৯৩, হাদীস নং ১৮৭৭
৫৫. মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, মাদীনার ফজিলত পরিচ্ছেদ, ২/৯৯৯, হাদীস নং ১৩৭১
৫৬. এই বিধি অবশ্য সবখানের জন্যই প্রযোজ্য, পবিত্র স্থানে এটা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
৫৭. বুখারি, বেচাকেনা অধ্যায়, ৪/৩৪৬, হাদীস নং ২১২৯
৫৮. বুখারি, কিতাবুল মাগাযি, ৭/৩৭৭, হাদীস নং ৪০৮৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px