📄 হাজ্জ-‘উমরার মৌসুমে আনসারদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ
রাসূলুল্লাহর দা'ওয়াত দেওয়ার একটা কৌশল ছিল, মাক্কার বাইরে থেকে আরবদের কেউ যখন মাক্কায় আসত, তাঁর নামধাম, বংশ-মর্যাদা ইত্যাদি বিষয় জানার আগেই তাঁকে তিনি আল্লাহর পথে আহ্বান করতেন। তাঁর সামনে পেশ করতেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আনীত সত্য। একদিন 'আম্র ইবনু 'আওফের বংশের ভাই সুওয়াইদ ইবনু সামিত মাক্কায় এলেন হাজ্জ ও 'উমরা পালন করতে। তাঁর মাক্কায় আসার খবর পেয়ে রাসূল তাঁকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তখন সুওয়াইদ রাসূলুল্লাহকে বললেন, “সম্ভবত আপনার কাছে যা আছে অনুরূপ কিছু আমার কাছেও আছে! (আর তা হলো) লুকমানের প্রজ্ঞা।”
নবিজি বললেন, “নিঃসন্দেহ এগুলো সুন্দর কথা। কিন্তু আমার সঙ্গে যা আছে তা এটা থেকেও উত্তম। (আর তা হলো) কুরআন; আল্লাহ আমার ওপর এটা নাযিল করেছেন।” এরপর রাসূল তাঁর সামনে কুরআন তিলাওয়াত করেন। তাকে ইসলামের পথে আহ্বান করেন। তিলাওয়াত শুনে সুওয়াইদ বলল, “এ কথাগুলো খুবই সুন্দর।” এরপর তিনি মাদীনায় তাঁর জাতির কাছে ফিরে আসেন। কিছুদিন পর তিনি বু'আস যুদ্ধে নিহত হন।
যখন আবুল হাইসার ইবনু রাফি বানু 'আবদুল-আশহাল গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে মাক্কায় এল তখন তাঁদের সঙ্গে ইয়াস ইবনু মু'আযও ছিল। রাসূল মাক্কায় তাঁদের আগমনের খবর পেলেন। তিনি তাঁদের বৈঠকে গিয়ে বসলেন। বললেন, “আমি আল্লাহর বান্দাদের কাছে তাঁর প্রেরিত রাসূল। আমি তাঁদেরকে এক আল্লাহর 'ইবাদাতের দিকে ডাকি।” এরপর তিনি তাঁদের কাছে ইসলামের আলোচনা তুলে ধরেন। তখন ইয়াস ইবনু মু'আয বলে, "আল্লাহর কসম, তোমরা যে জন্য এসেছ (কুরাইশদের সাথে মিত্রতা) তাঁর থেকে এটা বহুগুণে উত্তম।" কিন্তু তাঁর সঙ্গী আবুল হাইসার এতে রাজি না হয়ে ইয়াসের মুখে বালু ছুড়ে মারে। ইয়াস ইবনু মু'আয যুদ্ধের কিছুদিনের মধ্যে মারা যান এবং মৃত্যুর সময় তিনি আল্লাহর জিকির করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
📄 আনসারদের ইসলাম গ্রহণের সূচনা
আনসারদের ইসলাম গ্রহণের ফলপ্রসূ সূচনাটা হয়েছিল হাজ্জের মৌসুমে মিনার নিকট 'আকাবা নামক স্থানে। মাদীনার খাযরাজ গোত্রের একটা দল হাজ্জের মৌসুমে মাক্কায় এলে রাসূল তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?” তাঁরা বলল, “খাযরাজ গোত্রের একদল লোক।” নবি মুহাম্মাদ তাঁদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান। তাঁরা নিজেরা বলাবলি করতে লাগল, “আল্লাহর কসম, ইনি তো সেই নবি, তোমাদের কাছে ইহুদিরা যাঁর ব্যাপারে ওয়াদা করেছিল। তাঁর সে আহ্বানে সাড়া দাও।"
তাঁরা রাসূলুল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফিরে গিয়ে নিজ জাতির মাঝে তাঁরা রাসূলুল্লাহর কথা তুললেন। এভাবে মাদীনার একটা ঘরও বাকি ছিল না যেখানে নবিজিকে নিয়ে, তাঁর শিক্ষা নিয়ে আলোচনা চলত না। আনসারদের এ দলটি ছিল কল্যাণের প্রথম মিছিল। তাঁরা মাদীনায় ফিরে গিয়ে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের কাছে তুলে ধরেন ইসলামের সুন্দর শিক্ষাগুলো।
টিকাঃ
৪৬৮. শারহ আল-মাওয়াহিব, আয-যারকানি (১/৩৬১)
📄 প্রথম বাই‘আতুল-‘আকাবা
মিনার সন্নিকটে 'আকাবায় রাসূলুল্লাহর সঙ্গে ইয়াসরিববাসীদের বৈঠকের এক বছর পর আনসারদের আরেকটা দল মাক্কায় আসে। হাজ্জ পালন করতে এসে তাঁদের ১২ জনের একটা দল রাসূলুল্লাহর সঙ্গে 'আকাবায় দেখা করেন। তাঁরা নবিজির হাতে প্রথম 'আকাবার বাই'আত গ্রহণ করেন। ১২ জনের ১০ জন ছিলেন খাযরাজ গোত্রের, ২ জন আউস গোত্রের।
সাহাবি 'উবাদা ইবনু সামিত বলেন, “তখনই আমরা নবিজির হাতে বাই'আত গ্রহণ করি যে, আমরা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করব না, চুরি করব না, যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হব না, আমাদের সন্তানদের হত্যা করব না, জেনে-শুনে আমরা কারও বিরুদ্ধে অপবাদ রটাব না। সৎকাজের অবাধ্য হব না।” সাহাবিদের কাছ থেকে এই বাই'আত গ্রহণ করার পর তাঁদের সঙ্গে সাহাবি মুস'আব ইবনু 'উমাইরকে পাঠান। তিনি তাঁদেরকে দীন শিক্ষা দেবেন, কুরআন শেখাবেন। মাদীনায় মুস'আব ইবনু 'উমাইর 'আস'আদ ইবনু যারারার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন এবং ঘরে ঘরে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন।
মুস'আবের ডাকেই মাদীনার দুই বড় নেতা উসাইদ ইবনু হুদাইর ও সা'দ ইবনু মু'আয ইসলাম গ্রহণ করেন। সা'দ ইবনু মু'আয ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর গোত্র 'আবদুল-আশহালকে ডেকে বলেন, “যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান না আনছ, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের নারী-পুরুষ সকলের সঙ্গে আমার কথা বলা হারাম।” আল্লাহর কসম, সন্ধ্যার মধ্যে ওই গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
মুস'আব তায়িফ থেকে ফেরার পথেও বড় ভূমিকা রাখেন। তাঁর দা'ওয়াত দিতে দিতে আনসারদের এমন একটা ঘরও বাকি ছিল না যার বাসিন্দারা ইসলাম গ্রহণ করেননি। শুধু উসাইরিম বংশের 'আম্র ইবনু সাবিত ওহুদ যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর জন্য এক সিজদাও দিতে না পারার আগেই শহিদ হন।
টিকাঃ
৪৬৯. সাহীহ মুসলিম, শাস্তি, অধ্যায়: আইনি শাস্তি: অপরাধীদের শাস্তি, হাদীস নং ১৭০৯
৪৭০. আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন, পৃ. ১৮৫
৪৭১. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, আবু শুহবাহ (১/৪৪২)
৪৭২. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, আবু শুহবাহ (১/৪৪৪) এবং সাহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়াহ, পৃ. ২৯১।
📄 ‘আকাবার দ্বিতীয় আনুগত্যের শপথ
সাহাবি জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ বলেন, “হাজ্জের মৌসুমে আমাদের সত্তর জন লোক তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। 'আকাবার গিরিপথে দেখা করার জন্য তাঁর কাছ থেকে সময় নিই। সবাই এসে পৌঁছলে আমরা বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা কীসের ওপর আপনার আনুগত্যের শপথ নেব'?”
রাসূল বললেন, “তোমরা সর্বাবস্থায় আমার কথা শুনবে ও মানবে। সচ্ছল অসচ্ছল উভয় অবস্থাতেই দান করবে, সৎ কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তোমরা শপথ করো, আমি যখন তোমাদের কাছে আসব আমাকে এমন সব কিছু থেকে সুরক্ষা দেবে যা থেকে তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে সুরক্ষা দিয়ে থাকো। (বিনিময়ে) তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে।”
সাহাবি কা'ব ইবনু মালিক বলেন, “আমরা তিন প্রহর রাত কেটে যাওয়ার পর গিরিপথে এসে পৌঁছি। সব মিলিয়ে আমরা পুরুষ ছিলাম ৭৩ জন। দুজন মহিলা ছিলেন আমাদের সঙ্গে—নুসাইবা বিন্ত কা'ব ও 'আসমা বিন্ত 'আম্র। বারা ইবনু মা'রূর নবিজির হাত ধরে তাঁর আনুগত্যের শপথ করেন। এরপর রাসূল তাঁদের মধ্য থেকে ১২ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করতে বলেন।”
সব কাজ সম্পন্ন হলে পর রাসূল তাঁদেরকে নিজেদের তাঁবুতে ফিরে যেতে বললেন। পরদিন সকালে কুরাইশরা খবর পেয়ে তাঁবুতে গিয়ে জেরা করলেও মুসলিমরা বিষয়টি এড়িয়ে যান। 'আকাবার এ শপথ অনুষ্ঠানটি ছিল ঐতিহাসিক এক বিজয়, যা মাদীনার ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে।
টিকাঃ
৪৭৬. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ আস-সাহীহাহ (১/১৯৯)
৪৭৭. মাজমা' আয-যাওয়াইদ (২/৪২-৪৬)। বিশুদ্ধ হাদীস।