📄 বিভিন্ন গোত্রকে দীনের পথে দা‘ওয়াত দেওয়ার সময় আবু জাহ্লসহ মুশরিকদের চক্রান্ত মোকাবিলায় রাসূলুল্লাহর পদ্ধতি
রাসূল এই গোত্রগুলোকে দা'ওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত গোপনীয়তার আশ্রয় নেন; তাঁদেরকে দা'ওয়াত দেওয়ার জন্য তিনি রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগাতেন। যাতে মুশরিকরা তাঁর এ দা'ওয়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। রাসূলুল্লাহর এমন সূক্ষ্ম পরিকল্পনা বিরুদ্ধ শক্তির প্রোপাগান্ডা নিষ্ক্রিয় করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। রাসূল প্রতিটি গোত্রের কাছে এভাবেই দীনের দা'ওয়াত বয়ে বেড়ান। তাঁর এমন কৌশল যে সফল তাঁর প্রমাণ, মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ। তাঁদের সঙ্গে রাসূল রাতের বেলায় দেখা করেন। তাঁদের সঙ্গে রাতের বেলাতেই প্রথম ও দ্বিতীয় 'আকাবার বাই'আত অনুষ্ঠিত হয়।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে দা'ওয়াত: রাসূল কাল্ব, বানু হানীফা ও বানু 'আমির গোত্রের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দীনের পথে তাঁদেরকে আহ্বান করেন। এ পদ্ধতিতে তিনি সহজেই তাঁর কুরাইশদের পিছু নেওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন। এতে করে তিনি তাঁদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে দীনের কথা বলতে পারেন; কুরাইশরা কোনোরূপ গোলযোগ বাধাতে পারেনি, হাজির হতে পারেনি তাঁদের কুৎসিত চেহারা নিয়ে।
সাহায্যকারী সাহচর্য: গোত্রগুলোর কাছে দা'ওয়াতের এ অভিযানে আবু বাক্র ও 'আলি রাসূলুল্লাহকে সঙ্গ দেন। একে তো তাঁদের এ সাহচর্য দীনি দা'ওয়াতের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। উপরন্তু তাঁদের সাহচর্যের কারণে কেউ ভাবতে পারেনি যে, দা'ওয়াতের কাজে আত্মীয়-স্বজন রাসূলুল্লাহর কোনো সঙ্গী-সাথি নেই, তিনি একাই। তা ছাড়া আরবদের বংশধারা সম্পর্কে আবু বাক্র ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ; গোত্রগুলোর বংশধারা সম্পর্কে জানতে বাক্রের এ জ্ঞানটা খুবই কাজে দেয়।
অনিষ্ট না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা: নিরাপত্তা বিধানের প্রশ্নে রাসূল আগেই এসব গোত্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে নিতেন। তাঁদের কাছে দীনের কথা পাড়ার পূর্বেই রাসূল তাঁদের কাছে নিরাপত্তা চাইতেন। যাতে তাঁদের এ শক্তি, প্রভাব-প্রতিপত্তি দীন ইসলামকে শত্রুদের আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রতিরক্ষা এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটা এমন একটা বিষয় যা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ, ইসলাম গ্রহণ করার কারণে গোত্রটিকে তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে সকল অনাচার ও বাতিলকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং তাঁদেরকে অবশ্যই বাতিলের মুখোমুখি দাঁড়াবার মতো যোগ্য হতে হবে। সাধ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করাটাই সপ্রমাণ তাঁর একনিষ্ঠতার, তাঁর ইখলাসের। আল্লাহর সাহায্য, তাঁর বিজয়দানের জন্য এটাই শর্ত।
📄 বানু ‘আমিরের সঙ্গে সংলাপ
রাসূল সবার আগে বানু 'আমিরের সঙ্গে আলোচনা করলেন, দীনের দাওয়াত দিলেন। রাসূল ও আবু বাক্র বানু 'আমির সম্পর্কে বিস্তর খোঁজখবর নিয়ে, অনেক চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বানু 'আমির সাহসী ও যোদ্ধা একটা গোত্র। বিরাটসংখ্যক লোক রয়েছে এ গোত্রের। সারা আরবের হাতে গোনা পাঁচটি গোত্রের মধ্যে বানু 'আমিরও একটা যারা তৎকালীন পারস্য কিংবা রোমান কোনো শাসকের তাঁবেদারি স্বীকার করেনি। রাসূল আরও জানতেন যে, বানু 'আমির ও সাকীফ গোত্রের মধ্যে পুরোনো একটা শত্রুতা রয়েছে। তায়িফে ইসলামের বিজয় ঘটলে কুরাইশদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যাবে। তাই রাসূলুল্লাহর এ সফর ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় পূর্ণ।
সীরাত লেখকগণ উল্লেখ করেন, রাসূল যখন বানু 'আমির ইবনু স'স'আহ গোত্রের কাছে আসেন তখন প্রথমে তিনি তাঁদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। এরপর তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার জন্য বসেন। বাইহারা ইবনু ফারাস নামের একজন লোক নবিজিকে বলল, “আল্লাহর কসম! কুরাইশের এ যুবকের কথা যদি আমি মেনে নিই, তা হলে আরববাসী তা জেনে যাবে।” এরপর লোকটা রাসূলুল্লাহকে আরও বলল, "আচ্ছা বলুন তো, আমরা যদি আপনার ধর্ম মেনে নিয়ে আপনার বাই'আত নিই, এরপর আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয় দান করেন, তখন কি আপনার পরে রাজত্বের বিষয়টি আমাদের হাতে আসবে?"
রাসূল বললেন, “রাজত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর কাছে ন্যস্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁকে দান করেন।” লোকটি বলল, “আপনার জন্য আরবদের বিরুদ্ধে আমাদের জীবন বাজি রাখব আমরা, অথচ আপনি বিজয়ী হলে রাজত্ব আমাদের না-হয়ে হবে অন্যদের জন্য? আপনার দীন মানার আমাদের কোনো দরকার নেই।” তাঁরা রাসূলুল্লাহর কথা মানতে অস্বীকার করে।
টিকাঃ
৪৬৪. সীরাহ ইবনু হিশাম (২/৩৮)
📄 বানু শাইবান গোত্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা
সাহাবি 'আলি ইবনু আবু তালিবের বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, “আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর নবিকে বিভিন্ন গোত্রের কাছে দীনের দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার জন্য আদেশ করেন, তখন আল্লাহর আদেশ মেনে নবিজি বিভিন্ন গোত্রের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। এরপর আমরা আরেকটা বৈঠকের দিকে এগিয়ে গেলাম। বৈঠকে কোনো হট্টগোল ছিল না। আবু বাক্র সেদিকে এগিয়ে গেলেন। সালাম দিয়ে তাঁদেরকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কোন গোত্র?” তাঁরা বলল, “শাইবান ইবনু সা'লাবা।”
আবু বাক্র রাসূলুল্লাহর দিকে ফিরে বললেন, “আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, এ লোকগুলো সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত।” মাফরূক নামে এদের মধ্যে একজন লোক আছে, কথায় ও সৌন্দর্যে সে সর্বোত্তম। মাফরূক রাসূলুল্লাহর দিকে ফিরে বলল, “হে কুরাইশি ভাই, আপনি কীসের দিকে আমাদেরকে আহ্বান করছেন?” রাসূল বললেন, আমি তোমাদেরকে এই সাক্ষ্য দিতে আহ্বান করছি যে “আল্লাহ ছাড়া 'ইবাদাতের যোগ্য আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আর আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আরও আহ্বান জানাচ্ছি আমাকে আশ্রয় ও সাহায্য প্রদানের জন্য। কারণ, কুরাইশরা আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে এবং তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।"
মাফরূক বলল, “হে কুরাইশি ভাই, আর কীসের দিকে আপনি আহ্বান করে থাকেন। আল্লাহর কসম, এ কথার থেকে সুন্দর কথা আমি আর শুনিনি।” তখন রাসূল সূরা আন'আমের ১৫১ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। নবিজির মুখ থেকে কুরাআনের এ তিলাওয়াত শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে মাফরূক বলল, “আল্লাহর কসম, আপনি তো উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি ও ভালো কাজের দিকেই আহ্বান করেছেন।"
মুসান্না ইবনু হারিসা (যিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন) রাসূলুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে কুরাইশি ভাই, আমিও আপনার বক্তব্য শুনলাম। তবে আমরা দুটো 'সরাই'র (ফাঁদের) মধ্যে পড়ে গেছি; এর একটা ইয়ামামা, অন্যটা সুমামাহ। রাসূল তাঁর কাছে জানতে চান, “সরাই (ফাঁদ) দুটো কী জিনিস?” তিনি বলেন, “পারস্যের নদ-নদী ও আরবদের পানি।”
টিকাঃ
৪৬৫. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৩/১৪২, ১৪৩, ১৪৫) এবং আরও কিছু বাড়তি সংযোজন রয়েছে যেগুলো আস-সালিহীর সুবুল-আর-রাশাদ-এ নেই (২/৫৯৬, ৫৯৭)