📄 মিনতি ও প্রার্থনা
বানু 'আমের লোকেরা ছিল ইতর শ্রেণির মানুষ। রাসূল আসার কথা তাঁরা গোপন রাখেনি। উলটো তাঁর পেছনে তাঁদের নির্বোধ ও দাসশ্রেণির লোকদের লেলিয়ে দেয়; এরা তাঁকে গালিগালাজ করে এবং তাঁর দিকে পাথর ছুড়ে মারে। রাসূলের দুই গোড়ালি রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। তাঁর জুতা রক্তে একাকার হয়ে যায়। তারা নবিজির গায়ে পাথর মারতে মারতে দূরে নিয়ে আসে। পরে তিনি এবং যাইদ রাবি'আর দুই ছেলে 'উতবা ও শাইবার বাগানের দেয়ালের পেছনে আশ্রয় নেন।
এমন বিষাদ ও মর্মপীড়া এবং শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যেও তিনি তাঁর রব আল্লাহর দিকেই ফেরেন। তিনি আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা করেন:
“হে আল্লাহ, আমার দুর্বলতা, অক্ষমতা এবং মানুষের সামনে অপদস্থতার ব্যাপারে আমি আপনার কাছে, হে পরম দয়াবান, অনুযোগ করছি। আপনি দুর্বলদের রব, আপনি আমারও রব। আপনি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করেছেন? দূরের কোনো অনাত্মীয়ের কাছে? নাকি এমন শত্রুর কাছে যে নাকি আমার সব বিষয়ে খবরদারি করে? আপনি যদি আমার ওপর রাগ না করেন তা হলে আমার আর কোনো চিন্তা নেই। তবে আপনার ক্ষমা আমার জন্য খুবই দরকার। আমি আপনার চেহারার ওই আলোর আশ্রয় চাই, অন্ধকার দূর করে যে আলো চারপাশ আলোকিত করেছে। এবং নিষ্পত্তি হয় দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয়।”
টিকাঃ
৪৩৯. ড. আল-'উমারী হাদীসটিকে দুর্বল বলে মত দিয়েছেন তাঁর আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ আস- সাহীহাহ (১/১৮৬) গ্রন্থে। অবশ্য ইবরাহীম আল-'আলী আরেকটি হাদীস উল্লেখ করে একে বিশুদ্ধ বলেছেন। একাধিক বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে হাদীসটি সহীহ ও হাসান।
📄 নুবুওয়তি মমত্ববোধ
নিজের কঠিন কষ্টের দিনেও রাসূলুল্লাহর হৃদয়ে ছিল দয়া-মায়া ও মমত্ববোধের প্রবল প্রভাব। তায়িফের সেদিনের ঘটনায় রাসূল শুধু শারীরিক আঘাতই পাননি, তিনি মানসিকভাবে প্রচণ্ড মুষড়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহর স্ত্রী 'আয়িশা একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “সেদিনটি কি আপনার কাছে ওহুদের দিন থেকে কঠিন হিসেবে এসেছিল?” রাসূল উত্তর করেন, “আমি তোমাদের জাতির কাছ থেকে অনেক নির্যাতন ভোগ করেছি। তবে সবচেয়ে কঠিন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছি 'আকাবার দিনে।”
হুঁশ ফিরে আসার পর রাসূল দেখেন জিব্রীল (আ.)-কে। তাঁর সাথে ছিল পাহাড়ের ফেরেশতা। ফেরেশতা নবিজিকে প্রস্তাব দিলেন যে তিনি চাইলে তায়িফের দুই পাশের পাহাড় একত্র করে অপরাধীদের পিষে মারতে পারেন। কিন্তু দয়ালু নবি মুহাম্মাদ ﷺ বললেন, "বরং আমি চাই, আল্লাহ তা'আলা তাঁদের বংশধরদের মধ্যে এমন কাউকে নিয়ে আসবেন যারা এক আল্লাহর 'ইবাদাত করবে, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুর শরিক করবে না।”
টিকাঃ
৪৪০. বুখারি, সৃষ্টির শুরু; হাদীস নং ৩২৩১
📄 পরিবর্তনের ধারা
নবি ﷺ তায়িফবাসীকে সমূলে উৎপাটনের প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দেন। তিনি আবার কাফির-মাক্কাতেই প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি চাইলেন কুরাইশেরই বিভিন্ন শাখা গোত্রের মধ্যেই ইসলামের বাণী পৌঁছাতে হবে। তায়িফ থেকে ফেরার পথে তিনি আখনাস ইবনু শারীক এবং সুহাইল ইবনু 'আম্রের কাছে আশ্রয় চান, কিন্তু তাঁরা অস্বীকার করে। শেষপর্যন্ত খুযা'আ গোত্রের মাধ্যমে বানু নাওফিলের সর্দার মুত'ইম ইবনু 'আদির কাছে আশ্রয় চান। মুত'ইম সম্মত হলেন এবং নিজের সন্তানদের সশস্ত্র অবস্থায় কা'বার কাছে পাঠিয়ে নবিজিকে নিরাপত্তা দিলেন।
তায়িফ সফরে নবিজির আরেকটি বড় সাফল্য ছিল খ্রিষ্টান দাস 'আদ্দাস-এর ইসলাম গ্রহণ। বাগানের মালি 'আদ্দাস যখন দেখল নবিজি খাওয়ার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলছেন, সে অবাক হয়ে যায়। নবিজির সাথে কথোপকথনের পর সে তাঁর রিসালাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নবিজির হাত-পায়ে চুমু খায়।
টিকাঃ
৪৪১. যাদ আল-মা'দ (২/৪৬)
৪৪২. যাদ আল-মা'দ (২/৪৭)
৪৪৩. সাহীহ বুখারি (৪০২৩)
৪৪৪. সাহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, পৃ. ১৩৬, ১৩৭
৪৪৫. সুবুল-আল-হুদা ওয়ার-রাশাদ (২/৫৭৮)
📄 জিনদের ইসলাম গ্রহণ
তায়িফের সাকীফ গোত্রের আচরণে রাসূল খুবই মুষড়ে পড়েন। সেখান থেকে মাক্কায় যাওয়ার পথে একটা খেজুরের বাগান পড়ে। মধ্যরাতে তিনি সেখানে সালাত পড়েন। ঠিক সে সময় একদল জিন সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁরা দাঁড়িয়ে পড়ে নবিজির কুরআন তিলাওয়াত মন লাগিয়ে শোনে। নবিজির সালাত শেষ হলে পরে জিনরা ঈমান আনয়ন করে এবং নিজ জাতিকে সতর্ক করার জন্য ফিরে চলে।
আল্লাহ কুরআনে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন (সূরা আহকাফ, আয়াত ২৯-৩০)। মানবজাতির সীমা ছাড়িয়ে জিনদের জগতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যাওয়া এবং তাঁদের গ্রহণ করা ছিল এক মহান বিজয়। এর এক মাস পর জিনদের আরেকটি দল নবিজির সাথে দেখা করতে আসে।
টিকাঃ
৪৪৬. মুসলিম, সালাত, হাদীস নং ৪৫০