📄 চাচা আবু তালিবের মৃত্যু
বানু হাশিম উপত্যকার অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পরপরই রাসূলুল্লাহর চাচা আবু তালিব মারা যান। বছরটা ছিল নুবুওয়াতের দশম বছরের শেষের দিকে। আবু তালিব নবিজিকে কুরাইশদের সকল আক্রোশ থেকে আগলে রাখতেন এবং তাঁর জন্য অন্যদের সঙ্গে শত্রুতাও করতেন। নানাভাবে তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতাও করতেন। তথাপিও কুরাইশরা আবু তালিবকে খুবই সম্মান করত।
আবু তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে শির্কের ধ্বজাধারীরা তার চারপাশে ভিড় করে; তার শিয়রে বসে ইসলাম গ্রহণ না করে পৌত্তলিকতার ওপর অটল থাকার জন্য অনবরত উৎসাহ জোগাতে থাকে। তাঁরা বলে, “আপনি কি 'আবদুল-মুত্তালিবের মিল্লাত থেকে, তাঁর ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন?”
অন্যদিকে রাসূল চাচার সামনে ইসলাম তুলে ধরেন এ কথা বলে, “আপনি শুধু 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যটি বলুন। কিয়ামাতের দিন আমি আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেবো।” তখন আবু তালিব বললেন, “আবু তালিব ঘাবড়ে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে—কুরাইশদের এমন কথার ভয় যদি আমি না করতাম তবে আমি অবশ্যই তোমার সামনে বাক্যটির সাক্ষ্য দিতাম।”
তখন আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাযিল করলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তুমি যাকে পছন্দ করো (ইচ্ছে করলেই) তাকে সুপথে আনতে পারো না; বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে তিনি সুপথে আনেন। আর তিনিই সুপথপ্রাপ্তদের ভালো জানেন।” [সূরা কসাস, ২৮:৫৬]
জাহিলিয়াতের কৃষ্টি-কালচার, আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-ভাবনা আবু তালিবের মন-মগজে একেবারে গেঁথে ছিল; সেগুলোর উৎপাটন তাঁর পক্ষে একেবারই সম্ভব হয়নি। কুরাইশদের বড় নেতা হওয়ার কারণে জাহিলি চিন্তা-ভাবনা ও বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ভ্রান্ত বিশ্বাসের মোহ কাটিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না।
টিকাঃ
৪৩৬. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ আস-সাহীহাহ, আল-'উমারী (১/১৮৪)
📄 খাদীজার মৃত্যু
রাসূলুল্লাহর স্ত্রী, উম্মুল-মু'মিনীন সাইয়্যিদা খাদীজা মারা যান রাসূলুল্লাহর মাদীনা হিজরাতের তিন বছর আগে; চাচা আবু তালিব যে বছরে মারা গেছেন ঠিক সেই বছরেই; আবু তালিবের কিছুদিন পরেই।
এমন দুজন আপনজনকে হারিয়ে রাসূল খুবই ব্যথিত হন। মুষড়ে পড়েন প্রচণ্ডভাবে। ইসলামের দা'ওয়াত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছাতে গিয়ে তিনি যত কষ্ট পেয়েছেন, যত দুর্ভোগ সয়েছেন তা লাঘবে এ দুজন ছিলেন শক্ত খুঁটি; আবু তালিব সামলাতেন বাইরের ঝক্কি-ঝামেলা, জাতির সকল বাধা মোকাবিলায় ভাতিজার মাথার ওপর ছাতা হয়ে আশ্রয় দিতেন। আর সারাদিনের ক্লান্তি, শ্রান্তি অবসাদগ্রস্ততা রাসূল ﷺ নিমেষেই ভুলে যেতেন খাদীজার কাছে ফিরে। পরম ভালোবাসা দিয়ে তিনি নবিজির সারাদিনের কষ্ট, মুশরিকদের মিথ্যাচারের বেদনা সবকিছু ভুলিয়ে দিতেন। তিনি নবিজির ঘর আগলে রাখতেন পরম মমতায়।
টিকাঃ
৪৩৭. তাবাকাত ইবনু সা'দ (১/২২১), আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ আস-সাহিহাহ (১/১৮৫)
📄 তায়িফে দা‘ওয়াত
রাসূলুল্লাহর কঠিন জীবনের অধ্যায় শুরু হয়ে গেল; এ সময়ে তাঁকে অনেক সমস্যা, বিপদ, কষ্ট ও নির্যাতন মোকাবিলা করতে হয়। তিনি এখন একাই; দা'ওয়াতের বাণী নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; আল্লাহ তা'আলা ছাড়া যেখানে তাঁর আর কোনো সাহায্যকারী নেই। কিন্তু এতেও তিনি দমে যাননি। মুশরিকদের নির্যাতনের ভয়ে ঘাবড়ে গিয়ে দা'ওয়াত দেওয়া থেকে নিবৃত্ত হননি।
দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ তাঁর পূর্বের নবি-রাসূলদের অনুসরণ করতেন। যেমন: নবি নূহ তাঁর জাতিকে দা'ওয়াত দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মানুষকে দীনের আহ্বান করেছেন। সাইয়্যিদুল-মুরাসালীন মুহাম্মাদ মানুষকে দীনের পথে আহ্বান করার ক্ষেত্রে অভিনব বিভিন্ন নিয়ম-পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি মানুষকে দা'ওয়াত দিয়েছেন গোপনে-প্রকাশ্যে, শান্তিতে-সমরে, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে।
রাসূলুল্লাহর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল ইসলামের জন্য নতুন একটা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য; যেখান থেকে তিনি সুষ্ঠুরূপে দীনের দা’ওয়াত ছড়িয়ে দিতে পারবেন পৃথিবীর দিদিগন্তে। এজন্য তিনি তায়িফের বানু সাকীফ গোত্রের কাছে দীনের দা’ওয়াত নিয়ে গেলেন, এ দীনকে সাহায্য করার জন্য তাঁদেরকে আহ্বানও করলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁর ডাকে তো সাড়া দেয়ইনি, উলটো তাঁদের ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চাকে নবিজির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়।
ঐতিহাসিক ওয়াকিদির মতে, নবিজির তায়িফ সফরে যান নুবুওয়াতের দশম বছরের শাওয়াল মাসে; চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদীজার মৃত্যুর পর; তিনি সেখানে দশ দিন অবস্থান করেন।
টিকাঃ
৪৩৮. সীরাহ ইবনু হিশাম (২/৭২)
📄 কেন তায়িফ
তায়িফ অঞ্চলটি কুরাইশ নেতৃবর্গের জন্য কৌশলগত দিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তায়িফের প্রতি কুরাইশদের অনেক লোভের কারণ সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ। রাসূল যখন তায়িফ অভিমুখে রওনা হলেন তখন নিশ্চয়ই সে যাত্রার মধ্যে কোনো হিকমা ছিল; যদি রাসূল সেখানে পা রাখার জায়গা পান এবং এমন কোনো দলকে পেয়ে যান যারা তাঁকে দীনের বিষয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে সাহায্য করবে তা হলে ইসলামের খুবই কাজে আসবে।
তায়িফে পৌঁছেই রাসূল সরাসরি সেখানকার ক্ষমতা ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই দা'ওয়াতের বাণী তুলে ধরেন। তায়িফের বড় দুই গোত্র বানু মালিক ও আহলাফ। রাসূল কুরাইশদের মিত্র আহলাফের নেতৃত্বাধীন বানু 'আম্র ইবনু 'উমাইর গোত্রের কাছে সরাসরি যান। তিনি মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন পায়ে হেঁটে, যাতে কুরাইশরা কোনো সন্দেহ না করে। যাইদকে সফরসঙ্গী হিসেবে সাথে নেন নিরাপত্তার স্বার্থে। তায়িফের নেতারা নবিজির ডাকে তো সাড়া দিলোই না, বরং তাঁরা তাঁকে অত্যন্ত নিকৃষ্টভাবে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে; কিন্তু তিনি মুখ বুজে সহ্য করে গেছেন।