📄 আবিসিনিয়া যাত্রা
নুবুওয়াতের পঞ্চম বছরের রাজাব মাসে সাহাবিরা মাক্কা থেকে রওনা হন। এ দলে পুরুষ ছিলেন ১৪ জন আর মহিলা ছিলেন ৪ জন। তাঁদেরকে মক্কায় ফিরিয়ে আনতে কুরাইশরা তাঁদের পিছু নেয়। সাহাবিদের পায়ের ছাপ ধরে ধরে তাঁরা সাগরের পাড় পর্যন্ত ধাওয়া করে। কিন্তু ততক্ষণে সাহাবিরা সাগর পার হয়ে আবিসিনিয়া পৌঁছে যান।
মুহাজিরদের হিজরাতের খবরটি সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করা হয়েছিল। সাহাবিরা সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন। শাসক নাজ্জাশি তাঁদেরকে উত্তম আতিথেয়তা করেন। তাঁদেরকে জানান সাদর সম্ভাষণ। নাজ্জাশির এমন কোমল আচরণে সাহাবিরা যারপরনাই অভিভূত হন; তাঁরা নাজ্জাশির নিকট নিজেদেরকে পরম নিরাপদ অনুভব করেন।
আবিসিনিয়ায় হিজরাতকারী অধিকাংশেরই সামাজিক অবস্থান খুবই ভালো ছিল। হিজরাত শুরুর তিন মাস যেতে না যেতেই মাক্কায় মুসলিমদের জীবনে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন ঘটে যায়; হামযা এবং 'উমার ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের ইসলাম গ্রহণের পর সাহাবিরা মক্কায় ফিরে আসেন। তবে মুশরিকরা আবারও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে দ্বিতীয়বারের মতো সাহাবিরা আবিসিনিয়ায় হিজরাত করতে বাধ্য হন। দ্বিতীয় হিজরাতের মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল পুরুষ ৮২ বা ৮৩ জন এবং মহিলা ১৮ জন।
📄 আবিসিনিয়ায় মুসলিমদের দ্বিতীয় হিজরাত
সাহাবি 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ বলেন, “আবিসিনিয়া থেকে সাহাবিরা যখন মক্কায় ফিরে আসেন তখন জাতি তাঁদের সামনে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। তাঁরা মুশরিকদের থেকে কঠিন নির্যাতন ভোগ করেন। সাহাবিদের এমন কষ্ট দেখে রাসূল তাঁদেরকে আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো হিজরাত করার অনুমতি দেন। তবে প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয় হিজরাতটি ছিল খুবই কঠিন।”
কুরাইশরা দেখল, মুহাজিরদেরকে শত নির্যাতন করেও কোনোভাবেই আটকে রাখা গেল না। তখন তাঁরা মুহাজিরদেরকে মাক্কায় ফেরত আনার জন্য নাজ্জাশির কাছে একদল প্রতিনিধি দল পাঠাল। 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু রাবি'আ এবং 'আম্র ইবনুল-'আসকে প্রতিনিধি করে পাঠানো হলো। সঙ্গে ছিল প্রচুর উপঢৌকন। তাঁরা নাজ্জাশির দরবারে গিয়ে উপহার পেশ করে অনুরোধ করলেন যেন মুসলিমদেরকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু নাজ্জাশি চাইলেন মুসলিমদের কথা শুনতে। তিনি মুসলিমদের প্রতিনিধিকে তলব করলেন।
📄 জা‘ফার (রা.) ও নাজ্জাশির কথোপকথন
নাজ্জাশি রাসূলুল্লাহর মুহাজির সাহাবিদেরকে ডাকতে দূত পাঠালেন। সাহাবিরা পরামর্শ করে জা'ফার ইবনু আবু তালিবকে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করলেন। নাজ্জাশি সাহাবিদের নিকট জানতে চান, এটা কোন ধর্ম যা তোমাদের জাতির মধ্যে বিভেদ ঘটিয়েছে?
জা'ফার ইবনু আবু তালিব নাজ্জাশিকে বললেন, “হে মহামান্য শাসক! আমরা গণ্ডমূর্খ একটা জাতি ছিলাম; মূর্তিপূজা করতাম, অশ্লীল কাজ করে বেড়াতাম। এরপর আল্লাহ আমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠালেন; তাঁর বংশমর্যাদা, সততা ও বিশ্বস্ততার কথা আমাদের মধ্যে সর্বজনবিদিত। তিনি আমাদেরকে এক আল্লাহর 'ইবাদাতের দিকে ডাকলেন। তিনি আমাদের সত্য কথা বলতে বললেন। আদেশ করলেন আমানাত আদায় করতে। এ কারণেই আমাদের জাতি আমাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে যাতে আমরা আবার মূর্তিপূজার দিকে ফিরে আসি। তাই আমরা আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছি।”
এরপর নাজ্জাশি কুরআনের কোনো অংশ পাঠ করতে বললে জা'ফার সূরা মারইয়ামের প্রথম আয়াতগুলো পাঠ করেন। জা'ফারের তিলাওয়াত শুনে নাজ্জাশি কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই এটা ঠিক ওই জিনিস, যা নবি মূসা নিয়ে এসেছিলেন। তোমরা চলে যাও। আল্লাহর কসম! আমি তাঁদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছি না।”
টিকাঃ
৪২৫. মুসনাদ ইমাম আহমাদ (১/২০২, ২০৩)
📄 নাজ্জাশি ও মুহাজিরদের মাঝে বিভেদের আরেকটা অপচেষ্টা
নাজ্জাশির নিকট কোনোরূপ সুবিধা করতে না পেরে 'আম্র ইবনুল-'আস নতুন এক ফন্দি আঁটল। সে নাজ্জাশিকে বলল, “এরা আপনাদের নবি 'ঈসা ইবনু মারইয়ামকে আল্লাহর একজন বান্দা মনে করে।” নাজ্জাশি আবারও সাহাবিদের ডেকে পাঠালেন।
দূত এলে সাহাবিরা আবারও পরামর্শ করলেন এবং ঠিক করলেন 'ঈসার ব্যাপারে তাই বলবেন যা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। জা'ফার ইবনু আবু তালিব নাজ্জাশিকে বললেন, “আমরা তাঁর ব্যাপারে তাই বলব যা আমাদের নবি নিয়ে এসেছেন: তিনি (ঈসা) আল্লাহর বান্দা, রাসূল, রূহ এবং তাঁর কালিমা যা তিনি প্রেরণ করেছেন মারইয়ামের কাছে।”
নাজ্জাশি একটি কাঠি কুড়িয়ে নিলেন এবং বললেন, “তুমি যা বললে, 'ঈসা ইবনু মারইয়াম তাঁর চেয়ে এই কাঠির পরিমাণও বেশি কিছু নন।” নাজ্জাশি মুশরিক প্রতিনিধিদের উপহার ফেরত দিয়ে দিলেন এবং মুসলিমদেরকে তাঁর দেশে পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলেন।
টিকাঃ
৪২৬. মুসনাদ ইমাম আহমাদ (১/২০৩), বিশুদ্ধ, হাদীস নং ১৭৪০।