📄 আবিসিনিয়ায় হিজরাতের কারণ
রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তেই থাকল। কাফির-মুশরিকরা তাঁদেরকে বন্দি করে রাখে, সম্ভাব্য সকল উপায়ে তাঁদেরকে নির্যাতন করে। মক্কার মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে ফেলে ঝলসে দিত তাঁদের চামড়া; যাতে মুসলিমরা ফেরে ইসলামের পথ থেকে। এমন কঠিন নির্যাতনের মুখে মুসলিমদের কেউ কেউ হাল ছেড়ে দেয়; তবে তাঁর অন্তর ঠিকই ঈমানের বলে বলীয়ান থাকে। আর বাদ-বাকিরা নিজেদের দীনে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে। রাসূল ﷺ দেখলেন কোনোভাবেই তাঁর সাহাবিদের ওপর থেকে নির্যাতনের মাত্রা কমানো যাচ্ছে না। এদিকে কষ্ট লাঘবে তিনিও তাঁদের জন্য কিছু করতে পারছেন না; তখন তাঁদেরকে বললেন, “তোমরা যদি আবিসিনিয়ার দিকে বেরিয়ে পড়তে (তবে সেটা ভালো হতো)। কারণ, সেখানে এমন একজন শাসক আছেন কেউই তাঁর নিকট নির্যাতিত হয় না। দেশটি খুবই ভালো। তোমরা এখন যে অবস্থায় আছ তাঁর থেকে নিষ্কৃতির একটা পথ আল্লাহ হয়তো বের করবেন।” রাসূলুল্লাহর এ কথা শুনে একদল মুসলিম আবিসিনিয়ার পথে বেরিয়ে পড়েন; নির্যাতনের মুখে ঈমান হারানোর ভয়ে। নিজেদের দীন নিয়ে তাঁরা আল্লাহর পথে রওনা হলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম হিজরাত। আবিসিনিয়ায় হিজরাতের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে গবেষকরা বিভিন্ন মত দিয়েছেন। নিচে এমনই কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো:
১. ঈমানের প্রচার: এখন ইসলামের অনুসারী অনেক। চারদিকে ইসলামের দা'ওয়াতের বাণী পৌঁছে গেছে। লোকজন হাটে, মাঠে, ঘাটে সব জায়গায় ইসলামের আলোচনা করে। ঈমানের বাণী যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, মুসলিমদের সংখ্যা যখন বেড়ে গেল, তখন কুরাইশ-কাফির-মুশরিকরা গোত্রের মধ্যে যারা ঈমান এনেছেন তাঁদেরকে ধরে ধরে, বেছে বেছে শাস্তি দিত; যাতে মুসলিমরা তাঁদের দীন থেকে ফিরে আসে। ঠিক তখনই রাসূল মু'মিনদেরকে বললেন, “জমিনে ছড়িয়ে পড়ো।”
২. দীন নিয়ে পলায়ন: আবিসিনিয়ায় হিজরাতের কারণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ হলো দীন হারানোর আশঙ্কায় দীন নিয়ে পলায়ন; ওই সময়ে রাসূলুল্লাহর একদল সাহাবি দীন হারানোর ভয়ে নিজেদের দীন নিয়ে আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েন।
৩. মাক্কার বাইরে ইসলামের দা'ওয়াত পৌঁছানো: অধ্যাপক সাইয়্যিদ কুতুব বলেন, “এখান থেকেই মাক্কার বাইরে রাসূল অন্য একটা নেতৃত্ব পাঠান। এমন একটা নেতৃত্ব যে দীনের বিশুদ্ধ আকীদার সুরক্ষা দেবে। ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতার বিধান করবে; তাঁদের হাতে ইসলামের দা'ওয়াতের বাণী ফিরে পাবে তাঁর উচ্চকিত আওয়াজ।”
৪. মুসলিমদের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা: রাসূলুল্লাহর নিরাপত্তা-বিষয়ক পরিকল্পনার উদ্দেশ্যই হলো উম্মাহকে নির্যাতনের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া। এজন্যই রাসূল ﷺ দেখলেন, মুসলিমদের জন্য আবিসিনিয়া একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে পারে।
টিকাঃ
৪১৭. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু হাশীম (১/৩৯৮)
৪১৮. ফী যিলাল আল-কুরআন (১/২৯)
৪১৯. আল-মানহায আল-হারাকি লিস-সীরাহ (১/৬৭,৬৮)
৪২০. বুখারি, আল-মাগাযী, অধ্যায়: খাইবারের যুদ্ধ: হাদীস নং ৪২৩০
৪২১. আল-হিজরাহ আল-উলাহ ফিল-ইসলাম, ড. সালমান আল-'আউদাহ, পৃ. ৩৪।
📄 কেন আবিসিনিয়া
এখানে অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করা হলো যা একজন গবেষককে— কেন রাসূল আবিসিনিয়াকে বেছে নিলেন?—এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে সাহায্য করবে। যেমন:
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজ্জাশি: আবিসিনিয়ায় একজন সত্যনিষ্ঠ শাসক ছিলেন। তাঁকে নাজ্জাশি বলা হয়; তাঁর রাজ্যে কেউই নির্যাতিত হয় না। রাসূল তাঁকে সালিহ বা সত্যনিষ্ঠ বলে প্রশংসা করেছেন। তাঁর এই সত্যনিষ্ঠতা মুসলিমদেরকে নিরাপত্তা বিধানের সময় পরিলক্ষিত হয়।
২. কুরাইশদের বাণিজ্যিক এলাকা: আরব উপদ্বীপের বড় একটা বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিল আবিসিনিয়া। মুসলিমদের কেউ কেউ পূর্বে সেখানে ব্যবসার জন্য যাওয়ার সুবাদে আবিসিনিয়াকে চিনত।
৩. নবিজির পছন্দ: হিজরাতের জন্য রাসূলুল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় দেশ ছিল আবিসিনিয়া। আবিসিনিয়ার অধিবাসীরা পালন করত খ্রিষ্টান ধর্ম; ধর্মটি পৌত্তলিকতার তুলনায় ইসলামের অনেক কাছের ধর্ম। পরিচারিকা উম্মু আইমানের কাছ থেকে রাসূলুল্লাহর আবিসিনিয়া সম্পর্কে জানাটাও সেখানে হিজরাত করার একটা কারণ ছিল।
টিকাঃ
৪২২. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু হিশাম; ব্যাখ্যা, হাম্মাম আবু সা'লেক (১/৪১৩)
📄 আবিসিনিয়া যাত্রা
নুবুওয়াতের পঞ্চম বছরের রাজাব মাসে সাহাবিরা মাক্কা থেকে রওনা হন। এ দলে পুরুষ ছিলেন ১৪ জন আর মহিলা ছিলেন ৪ জন। তাঁদেরকে মক্কায় ফিরিয়ে আনতে কুরাইশরা তাঁদের পিছু নেয়। সাহাবিদের পায়ের ছাপ ধরে ধরে তাঁরা সাগরের পাড় পর্যন্ত ধাওয়া করে। কিন্তু ততক্ষণে সাহাবিরা সাগর পার হয়ে আবিসিনিয়া পৌঁছে যান।
মুহাজিরদের হিজরাতের খবরটি সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করা হয়েছিল। সাহাবিরা সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন। শাসক নাজ্জাশি তাঁদেরকে উত্তম আতিথেয়তা করেন। তাঁদেরকে জানান সাদর সম্ভাষণ। নাজ্জাশির এমন কোমল আচরণে সাহাবিরা যারপরনাই অভিভূত হন; তাঁরা নাজ্জাশির নিকট নিজেদেরকে পরম নিরাপদ অনুভব করেন।
আবিসিনিয়ায় হিজরাতকারী অধিকাংশেরই সামাজিক অবস্থান খুবই ভালো ছিল। হিজরাত শুরুর তিন মাস যেতে না যেতেই মাক্কায় মুসলিমদের জীবনে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন ঘটে যায়; হামযা এবং 'উমার ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের ইসলাম গ্রহণের পর সাহাবিরা মক্কায় ফিরে আসেন। তবে মুশরিকরা আবারও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে দ্বিতীয়বারের মতো সাহাবিরা আবিসিনিয়ায় হিজরাত করতে বাধ্য হন। দ্বিতীয় হিজরাতের মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল পুরুষ ৮২ বা ৮৩ জন এবং মহিলা ১৮ জন।
📄 আবিসিনিয়ায় মুসলিমদের দ্বিতীয় হিজরাত
সাহাবি 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ বলেন, “আবিসিনিয়া থেকে সাহাবিরা যখন মক্কায় ফিরে আসেন তখন জাতি তাঁদের সামনে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। তাঁরা মুশরিকদের থেকে কঠিন নির্যাতন ভোগ করেন। সাহাবিদের এমন কষ্ট দেখে রাসূল তাঁদেরকে আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো হিজরাত করার অনুমতি দেন। তবে প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয় হিজরাতটি ছিল খুবই কঠিন।”
কুরাইশরা দেখল, মুহাজিরদেরকে শত নির্যাতন করেও কোনোভাবেই আটকে রাখা গেল না। তখন তাঁরা মুহাজিরদেরকে মাক্কায় ফেরত আনার জন্য নাজ্জাশির কাছে একদল প্রতিনিধি দল পাঠাল। 'আবদুল্লাহ ইবনু আবু রাবি'আ এবং 'আম্র ইবনুল-'আসকে প্রতিনিধি করে পাঠানো হলো। সঙ্গে ছিল প্রচুর উপঢৌকন। তাঁরা নাজ্জাশির দরবারে গিয়ে উপহার পেশ করে অনুরোধ করলেন যেন মুসলিমদেরকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু নাজ্জাশি চাইলেন মুসলিমদের কথা শুনতে। তিনি মুসলিমদের প্রতিনিধিকে তলব করলেন।