📄 কার্যকারণ প্রক্রিয়ার নিয়ম মেনে পৃথিবীতে রাসূলুল্লাহর কাজকর্ম
নবি মুহাম্মাদ কোনো কাজই নিজের থেকে করতেন না। ওয়াহির নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি পথ চলতেন। তবে প্রকৃতির মধ্যে দেওয়া আল্লাহর যে রীতিনীতি রয়েছে নবিজির কার্যক্রম সেটার ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। কার্যকারণ প্রক্রিয়ার নিয়ম প্রকৃতি প্রকট; আল্লাহ তা'আলা বিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ক্ষমতাবলে। প্রকৃতিতে দিয়েছেন বেশকিছু রীতিনীতি। পৃথিবী সেই রীতিনীতি মেনেই চলছে। আল্লাহ তা'আলাই প্রভাবকে কারণের অনুগামী করে দিয়েছেন; তিনি পৃথিবীকে স্থির করেছেন জমিনে পাহাড়ের পেরেক ঠুকে। উদ্ভিদ উৎপন্ন করছেন পানির সিক্ততায়। খুঁজলে দেখা যাবে, এমন কিছুই প্রকৃতিতে নেই যা কারণ ও প্রভাব—নীতির বাইরে কিছু করছে।
বিশ্বজগতের রব আল্লাহ তা'আলা যদি ইচ্ছে করতেন তা হলে তাঁর সৃষ্টির সবকিছুকে এ প্রক্রিয়া ছাড়াই সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমন কিছু করেননি। আল্লাহ চাইলেন, প্রকৃতিকে যে নিয়ম দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর বান্দারা সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করুক। তিনি যেভাবে জীবন পরিচালনার কথা বলেছেন, তাঁরা যেন সেভাবে জীবন পরিচালনা করে। কারণ ও প্রভাবের নিয়ম-নীতি প্রকৃতিতে যেমন প্রকট, তেমনি কুরআনেও এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। কী বৈষয়িক কী পরকালীন সর্ববিষয়ে মু'মিনদেরকে আল্লাহ তা'আলা এ নীতি মেনে চলতে জোর তাগাদা দিয়েছেন।
📄 আল্লাহর ওপর ভরসা ও কার্যকারণ গ্রহণ
কার্যকারণ গ্রহণ করা আল্লাহর ওপর ভরসার অন্তরায় নয়। আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমানের একটা অংশ হিসেবেই একজন মু'মিন কার্যকারণ গ্রহণ করতে পারে। তবে এ কার্যকারণই তাঁকে চূড়ান্ত ফল এনে দেবে; এর ওপরই ভরসা করতে হবে পূর্ণভাবে—এমনটা ভাবা যাবে না একজন মু'মিনের।
মূলত কার্যকারণকে যিনি সৃষ্টি করেছেন ঠিক তিনিই সেটার ফলাফলও তৈরি করেছেন। ফলাফল নির্ভর করে কারণের ওপর—এমন কোনো ভাবনা একজন মু'মিনের অনুভূতিতে থাকতে পারে না, থাকা উচিত না। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, কারণ বা উপায়-উপকরণ গ্রহণ রবের আনুগত্যের অংশ। আর এর ফল নির্ভর করে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর; কারণের স্রষ্টার ওপর। এটা করলে কী দাঁড়াবে, ওটা করলে কী হবে এটা শুধু আল্লাহই নির্ধারণ করেন; অন্য কেউ না। এমন ভাবনা, এমন আকীদা পোষণের কারণেই সে কারণ ও এর সংশ্লিষ্ট বিষয়কে পূজা করা থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারে। আবার এমন বিশ্বাস পোষণ করার কারণে সে এগুলো ব্যবহার করা থেকে এড়িয়ে যায় না, বরং সে তাঁর সাধ্যমতো কার্যকারণ গ্রহণ করে। তাঁর একটিই আশা—উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার যে আদেশ তা পালন করে সাওয়াবের অংশীদার হবে সে।
আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন রাসূল তাঁর বিভিন্ন হাদীসে। তবে তিনি এও জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ দুটোর মধ্যে কোনো ধরনের বৈপরীত্য নেই।
সাহাবি আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি বলেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমি কি আমার উটের রশি বেঁধে রাখব এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি রশি ছেড়ে দিয়েই আল্লাহর ওপর ভরসা করব?” আনাস বলেন, “মনে লোকটির ধারণা ছিল—উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসার পরিপন্থি।” রাসূল লোকটিকে জানিয়ে দিলেন যে, “উপায়-উপকরণ গ্রহণ একটি সিদ্ধ বিষয়। কোনো অবস্থাতেই বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসার অন্তরায় নয়। তবে উপায়-উপকরণ গ্রহণের নিয়্যাত বা অভিপ্রায়টি বিশুদ্ধ হওয়া চাই।” রাসূল তাঁকে বললেন, “তুমি আগে সেটাকে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।”
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা এবং উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই—রাসূলুল্লাহর একটি হাদীস এ কথারই ইঙ্গিত করে। তবে শর্ত একটাই, তাওয়াক্কুল দূরে ঠেলে স্রেফ উপায়-উপকরণ গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। সাহাবি 'উমার ইবনুল-খাত্তাব বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, “তোমরা যদি সত্যিকারভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পারো, তবে অবশ্যই, আল্লাহ তোমাদেরকে রিয্ক দেবেন, যেভাবে দেন পাখিকে; সে সকালে বের হয় খালি পেটে আর সন্ধ্যায় ফেরে ভর পেটে।”
টিকাঃ
৪১৬. মুসনাদ আহমাদ (১/৫২); হাদীস নং ৩৭০। আশ-শাইখ আহমাদ শাকীর এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন।