📄 রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের নির্যাতন ভোগ
নবিজির সাথে সাথে তাঁর সাহাবিদের ওপরও নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। বিলাল (রা.)-কে উত্তপ্ত মরুভূমিতে শুইয়ে রাখা হতো এবং তাঁর বুকে ভারী পাথর চাপা দেওয়া হতো। তবুও তিনি 'আহাদ, আহাদ' বলে তাওহীদের ঘোষণা দিতেন। আবু বাক্র (রা.) বিলালসহ আরও অনেক মুসলিম দাসকে অর্থ দিয়ে মুক্ত করেন।
ইয়াসির পরিবার—সুমাইয়া, ইয়াসির ও তাঁদের পুত্র 'আম্মার চরম নির্যাতনের শিকার হন। সুমাইয়া (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম শহিদ। রাসূলুল্লাহ তাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ শোনাতেন। খাব্বাব ইবনুল-আরাতকে জ্বলন্ত আগুনের কয়লার ওপর শুইয়ে রাখা হতো। সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে বাধার সম্মুখীন হন। মুস'আব ইবনু 'উমাইর তাঁর ধনাঢ্য জীবন ছেড়ে কষ্টের পথ বেছে নেন। 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ মক্কায় প্রথম উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করেন এবং কুরাইশদের হাতে প্রহৃত হন। এই নির্যাতন সাহাবিদের ঈমানকে আরও মজবুত করেছিল।
টিকাঃ
৩৮৪. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু কাসীর (১/৪৩৯-৪৪১) এবং আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (৩/৩০)
৩৮৫. মুসনাদ আহমাদ (১/৪০৪), হাসান
৩৮৬. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু হিশাম (১/৩৯৪)
৩৮৭. আত-তাবিয়াহ আল-কিয়াদিয়াহ (১/১৪০)
৩৮৮. সাহীহ মুসলিম, বিলালের গুণাবলি, হাদীস নং ২৪৫৮
৩৮৯. আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ইবনু সা'দ (৩/২৩২)।
৩৯০. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু হিশাম (১/৩৯৩)
৩৯৩. সীরাহ ইবনু হিশাম (১.৩১৯) এবং তাফসীর আল-আলুসী (৩০/১৫২)
৩৯৪. সাহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবরাহীম আল-'আলী, পৃ. ৯৭, ৯৮
৩৯৫. ফিকহুস-সীরাহ, আল-গাযালী, পৃ. ১০৩
৩৯৬. তাফসীর ইবনু কাসীর (৩/৪৪৬)
৩৯৭. বুখারী, নাবৃওয়্যাতের গুণাবলি, হাদীস নং ৩৬১২
৩৯৮. আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন (পৃ. ১৪৫, ১৪৬)
৩৯৯. মুসনাদ আহমাদ (৫/১১১)
৪০০. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়া (৩/৩২)
৪০১. আল-ইসাবা (৬/২১৪)
৪০২. ইবনু হাশীম (১/৩১৪-৩১৫) এবং আসাদ আল-গাবাহ (৩/৩৮৫, ৩৮৬)
৪০৩. বুখারি, স্বপ্নের ব্যাখ্যা; নারীদের স্বপ্ন (৭০০৩, ৭০০৪)
📄 নিরাপত্তার বিষয়ে উম্মু জামীলের সচেতনতা
আবু বাক্র (রা.) গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর মা উম্মুল-খাইর যখন নবিজির খোঁজ নিতে উম্মু জামীল বিনতুল-খাত্তাবের কাছে যান, তখন উম্মু জামীল অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করেন। তিনি শুরুতে এমন ভান করেন যেন তিনি নবিজি বা আবু বাক্রকে চেনেন না, যাতে গোপনীয়তা ফাঁস না হয়। পরে তিনি আবু বাক্রের বাড়িতে গিয়ে তাঁর অবস্থা দেখেন এবং তাঁর মায়ের সহানুভূতি অর্জন করেন।
উম্মু জামীল সরাসরি নবিজির অবস্থান না বলে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন। যখন পরিবেশ শান্ত হয় এবং মানুষের চলাচল কমে যায়, তখন তিনি অত্যন্ত গোপনে আবু বাক্রকে রাসূলুল্লাহর অবস্থানস্থলে পৌঁছে দেন। তথ্য গোপন রাখা এবং সঠিক সময় নির্বাচন করার ক্ষেত্রে উম্মু জামীলের এই সতর্কতা ছিল অতুলনীয়।
টিকাঃ
২৪৭. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬৯। (প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স)
📄 রাসূল (সা.) তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতেন যে যে বিষয়ের ওপর
রাসূলুল্লাহ সাহাবিদেরকে আধ্যাত্মিক ও মানসিক দৃঢ়তা অর্জনের প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি তাঁদেরকে তিনটি প্রধান বিষয়ে গুরুত্ব দিতেন:
১. পূর্ববর্তী নবি-রাসূলদের ধৈর্যের উদাহরণ দিয়ে তাঁদের সান্ত্বনা দিতেন।
২. মুত্তাকিদের জন্য পরকালে জান্নাতের নেয়ামাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।
৩. এই দুনিয়াতেই আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের সুসংবাদ দিতেন।
তিনি সাহাবিদেরকে শেখাতেন যে, সাহায্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো ধৈর্য ও কষ্ট স্বীকার। তিনি তাঁদেরকে তাড়াহুড়ো না করে আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে বলতেন। পাশাপাশি তিনি কীভাবে একটি শক্তিশালী ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা যায়, সেই পরিকল্পনাও সাহাবিদের মনে গেঁথে দিতেন।
টিকাঃ
৩৯৮. আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন (পৃ. ১৪৫, ১৪৬)
📄 মাক্কায় যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ
মাক্কা যুগে সাহাবিরা মুশরিকদের নির্যাতনের শিকার হলেও রাসূলুল্লাহ তাঁদেরকে যুদ্ধ করার অনুমতি দেননি। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কারণ ছিল। প্রথমত, মুসলিমদের তখন প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল এবং আরবের ঐতিহ্যের বিপরীতে তাঁদেরকে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি ছিল। দ্বিতীয়ত, তখন যুদ্ধ শুরু করলে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিত এবং দা'ওয়াতের কাজ ব্যাহত হতো।
আল্লাহর নির্দেশ ছিল সবুর করা এবং নিজেদের চরিত্র গঠন করা। নবিজি চেয়েছিলেন কাফিরদের বংশধরদের মধ্য থেকে যেন এমন এক প্রজন্ম বের হয়ে আসে যারা এক আল্লাহর 'ইবাদাত করবে। তাই তিনি মাক্কার বৈরী পরিবেশেও সালাত ও আত্মশুদ্ধির দিকেই বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন। এই ধৈর্যই পরবর্তী সময়ে মদীনার বিজয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
টিকাঃ
৪০৪. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ আস-সাহিহাহ (১/১৫৮)
৪০৫. আত-তিরমিযীর সাথে সম্পর্কিত, বিশুদ্ধ, আয-যুহদ (৪/৫১); হাদীস নং ২৩৯
৪০৬. বুখারি, শিষ্টাচার; হাদীস নং ৬০৭৬