📄 দা‘ওয়াতের বিরোধিতায় কাফিরদের কৌশল
মাক্কার মুশরিকরা ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে নানা ফন্দি-ফিকির আঁটত। তাঁরা প্রথমে রাসূলুল্লাহর ওপর থেকে চাচা আবু তালিবের ছায়া সরাতে চেষ্টা করে। কুরাইশরা আবু তালিবকে লোভনীয় প্রস্তাব দেয় এবং ভাতিজাকে তাঁদের হাতে সোপর্দ করতে বলে। কিন্তু আবু তালিব আমৃত্যু নবিজিকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করেন।
মুশরিকরা দা'ওয়াতের বিকৃতি ঘটাতে হাজ্জের মৌসুমকে বেছে নিত। ওয়ালীদ ইবনু মুগিরা নবিজিকে 'জাদুকর' আখ্যা দেওয়ার পরামর্শ দেয় যাতে আগন্তুক হাজিরা তাঁর থেকে দূরে থাকে। তবে তাঁদের এই অপপ্রচার প্রায়ই উল্টো ফল দিত। অনেক সত্যসন্ধানী মানুষ কৌতুহলী হয়ে নবিজির কাছে আসতেন এবং ইসলাম গ্রহণ করতেন। দিমাদ আল-আযদি, 'আম্র ইবনু 'আবাসা এবং আবু যার গিফারির ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রাসূলুল্লাহর দা'ওয়াতি পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কৌশলী। তিনি গোত্রগুলোর সঙ্গে রাতের অন্ধকারে দেখা করতেন এবং পরিবারের মাধ্যমে দা'ওয়াত শুরু করতেন। তিনি মাক্কার বাইরেও ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। মুশরিকদের সকল কূটচাল ও প্রোপাগান্ডা নবিজির সত্যনিষ্ঠা ও দৃঢ় মনোবলের সামনে ব্যর্থ হয়ে যায়।
টিকাঃ
৩৭৫. সাহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবরাহীম আল-'আলী (পৃ. ৭৮)
৩৭৬. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৩/৪৮)
৩৭৭. আস-সিয়ারা ওয়াল-মাগাজী, ইবনু ইশাক (পৃ. ১৫০, ১৫১) এবং তাহযীব আস-সীরাহ (১/৬৪,৬৫)।
৩৭৮. সাহীহ মুসলিম, জুমু'আহ; অধ্যায়: সালাত ও খুতবা সংক্ষিপ্তকরণ। হাদীস নং ৮৬৮।
৩৭৯. আল-ইসাবাহ ফী তামঈয আস-সাহাবাহ, ইবনু হাজার (১/৩৩৭)
📄 কুরাইশ-সভাসদদের বৈঠক ও নবিজিকে আঘাত
নবিজি যখন প্রকাশ্য দা'ওয়াত শুরু করেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট দিতে শুরু করে। আবু জাহল রাসূলুল্লাহর সালাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করত এবং তাঁকে অপদস্থ করার জন্য উটের বিষ্ঠা ও নাড়িভুঁড়ি তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দিত। আবু লাহাব ও তাঁর স্ত্রী উম্মু জামীল নবিজির পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত এবং তাঁর নামে কুৎসা রটাত।
কুরাইশদের এক বৈঠকে নবিজিকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়। তখন আবু বাক্র (রা.) তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, "তোমরা কি কেবল এ কারণে একজন লোককে হত্যা করবে যে তিনি বলেন আল্লাহ আমার রব?" রাসূলুল্লাহ অনেক সময় মুশরিকদের বিদ্রূপের জবাবে ধৈর্য ধরতেন এবং আল্লাহর কাছে তাঁদের হিদায়াতের জন্য প্রার্থনা করতেন। নবিজি নিজেই বলেছেন যে, আল্লাহর পথে তিনি যতটুকু কষ্ট সহ্য করেছেন, তা অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
টিকাঃ
৩৮০. সাহীহ মুসলিম, "হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম" হাদীস নং ২৭৯৭
৩৮১. সাহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবরাহীম আল-'আলী, পৃ. ৯৬
৩৮২. সুনান আত-তিরমিযী (৪/৬৪৫) এবং আল-আলবানী একে সাহীহ আল-জামাই'-তে বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, নং ৫০০১。
৩৮৩. ইবনু মাজাহ (৪০২৩)। সাহীহ সুনান ইবনু মাজাহ-তে আল-আলবানী একে হাসান বলে উল্লেখ করেছেন।
📄 রাসূলুল্লাহর সাহাবিদের নির্যাতন ভোগ
নবিজির সাথে সাথে তাঁর সাহাবিদের ওপরও নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। বিলাল (রা.)-কে উত্তপ্ত মরুভূমিতে শুইয়ে রাখা হতো এবং তাঁর বুকে ভারী পাথর চাপা দেওয়া হতো। তবুও তিনি 'আহাদ, আহাদ' বলে তাওহীদের ঘোষণা দিতেন। আবু বাক্র (রা.) বিলালসহ আরও অনেক মুসলিম দাসকে অর্থ দিয়ে মুক্ত করেন।
ইয়াসির পরিবার—সুমাইয়া, ইয়াসির ও তাঁদের পুত্র 'আম্মার চরম নির্যাতনের শিকার হন। সুমাইয়া (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম শহিদ। রাসূলুল্লাহ তাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ শোনাতেন। খাব্বাব ইবনুল-আরাতকে জ্বলন্ত আগুনের কয়লার ওপর শুইয়ে রাখা হতো। সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে বাধার সম্মুখীন হন। মুস'আব ইবনু 'উমাইর তাঁর ধনাঢ্য জীবন ছেড়ে কষ্টের পথ বেছে নেন। 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ মক্কায় প্রথম উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করেন এবং কুরাইশদের হাতে প্রহৃত হন। এই নির্যাতন সাহাবিদের ঈমানকে আরও মজবুত করেছিল।
টিকাঃ
৩৮৪. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু কাসীর (১/৪৩৯-৪৪১) এবং আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (৩/৩০)
৩৮৫. মুসনাদ আহমাদ (১/৪০৪), হাসান
৩৮৬. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু হিশাম (১/৩৯৪)
৩৮৭. আত-তাবিয়াহ আল-কিয়াদিয়াহ (১/১৪০)
৩৮৮. সাহীহ মুসলিম, বিলালের গুণাবলি, হাদীস নং ২৪৫৮
৩৮৯. আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ইবনু সা'দ (৩/২৩২)।
৩৯০. আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবনু হিশাম (১/৩৯৩)
৩৯৩. সীরাহ ইবনু হিশাম (১.৩১৯) এবং তাফসীর আল-আলুসী (৩০/১৫২)
৩৯৪. সাহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ীয়াহ, ইবরাহীম আল-'আলী, পৃ. ৯৭, ৯৮
৩৯৫. ফিকহুস-সীরাহ, আল-গাযালী, পৃ. ১০৩
৩৯৬. তাফসীর ইবনু কাসীর (৩/৪৪৬)
৩৯৭. বুখারী, নাবৃওয়্যাতের গুণাবলি, হাদীস নং ৩৬১২
৩৯৮. আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন (পৃ. ১৪৫, ১৪৬)
৩৯৯. মুসনাদ আহমাদ (৫/১১১)
৪০০. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়া (৩/৩২)
৪০১. আল-ইসাবা (৬/২১৪)
৪০২. ইবনু হাশীম (১/৩১৪-৩১৫) এবং আসাদ আল-গাবাহ (৩/৩৮৫, ৩৮৬)
৪০৩. বুখারি, স্বপ্নের ব্যাখ্যা; নারীদের স্বপ্ন (৭০০৩, ৭০০৪)
📄 নিরাপত্তার বিষয়ে উম্মু জামীলের সচেতনতা
আবু বাক্র (রা.) গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর মা উম্মুল-খাইর যখন নবিজির খোঁজ নিতে উম্মু জামীল বিনতুল-খাত্তাবের কাছে যান, তখন উম্মু জামীল অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করেন। তিনি শুরুতে এমন ভান করেন যেন তিনি নবিজি বা আবু বাক্রকে চেনেন না, যাতে গোপনীয়তা ফাঁস না হয়। পরে তিনি আবু বাক্রের বাড়িতে গিয়ে তাঁর অবস্থা দেখেন এবং তাঁর মায়ের সহানুভূতি অর্জন করেন।
উম্মু জামীল সরাসরি নবিজির অবস্থান না বলে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন। যখন পরিবেশ শান্ত হয় এবং মানুষের চলাচল কমে যায়, তখন তিনি অত্যন্ত গোপনে আবু বাক্রকে রাসূলুল্লাহর অবস্থানস্থলে পৌঁছে দেন। তথ্য গোপন রাখা এবং সঠিক সময় নির্বাচন করার ক্ষেত্রে উম্মু জামীলের এই সতর্কতা ছিল অতুলনীয়।
টিকাঃ
২৪৭. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬৯। (প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স)