📄 কুরআনের বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে সাহাবিদেরকে চারিত্রিক প্রশিক্ষণ দান
কুরআনের প্রতিটি ঘটনার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অনুপম সব শিক্ষা, নসিহত ও উপদেশ। এখানে আকীদার আলোচনা আছে। আছে চারিত্রিক উন্নতি সাধনের দিকনির্দেশনাও। আরও আছে প্রাচীন বিভিন্ন জাতির কাহিনি থেকে শিক্ষা। কুরআনের ঘটনাগুলো এমন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নয় যেখানে কেবল ঐতিহাসিকদেরই খোরাক রয়েছে। বরং ইতিহাসের চেয়েও মহৎ কিছু এগুলো। ঘটনাগুলো আরেকবার পড়ুন। দেখবেন প্রতিটি ঘটনা তাওহীদ, জ্ঞানবিজ্ঞান, উত্তম চরিত্র, যৌক্তিক দালিলিক উপস্থাপন, বিগত জাতি-গোষ্ঠীর পরিণতি এবং নান্দনিক শৈলীতে উপস্থাপিত অসাধারণ সব বাক্যশৈলীতে ভরপুর।
কুরআনে বিধৃত এমন হাজারো ঘটনা থেকে নবি ইউসুফের ঘটনার কথা ভাবলে দেখা যায়, মানব-আচরণ বিশেষজ্ঞ ও জ্ঞানীরা বলেন, “কোনো সংস্কারক, নিবেদিতপ্রাণ, হিদায়াতপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শক ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিত্ব ছাড়া উম্মাহর কাজ সুষ্ঠুভাবে কেউই সম্পাদন করতে পারে না।” একজন যোগ্য ও সৎ মুসলিম নেতার জন্য নবি ইউসুফের ঘটনা থেকে অনুপম কিছু শিক্ষা নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রবৃত্তির তাড়না থেকে পবিত্র থাকা; ইউসুফ সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করে জৈবিক বাসনা থেকে নিজের চরিত্রকে পবিত্র রেখেছেন।
২. রাগের মাথায় সহনশীল আচরণ করা।
৩. নম্রতার সময় নম্র আর কঠোরতার সময় কঠোর হওয়া।
৪. আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজের আস্থা রাখা।
৫. প্রখর স্মরণ শক্তির অধিকারী হওয়া।
৬. নির্মল চিত্তের অধিকারী হওয়া।
৭. শিক্ষার প্রতি উদগ্রীব হওয়া, জ্ঞানের জন্য ভালোবাসা।
৮. গায়ে বল ও পদমর্যাদা থাকা সত্ত্বেও দুর্বল-অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি দেখানো।
৯. প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমাসুন্দর আচরণ করা।
১০. নিকটাত্মীয়দের সম্মান করা।
১১. সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপনের যোগ্যতা থাকা।
১২. সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে পারার যোগ্যতা থাকা।
কুরআনের কাহিনিগুলোর উদ্দেশ্য হলো উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জনের প্রতি পাঠককে উদ্বুদ্ধ করা। এ উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, জাতি ও সভ্যতা সবকিছুকেই উপকার করে।
মাক্কী যুগে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাদীনাতে নতুন কিছু পদ্ধতি যোগ হয়। যেমন:
শার'ঈ বিধান প্রণয়ন: ইসলামি শারী'আতের প্রধান লক্ষ্যই হলো মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করা। দণ্ডবিধি ও কিসাসের মতো শারী'আহর বিধানগুলো এজন্যই দেওয়া হয়েছে যাতে বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি ও সমাজকে রক্ষা করা যায়।
সামাজিক কর্তৃত্ব: সামাজিক কর্তৃত্ব এমন এক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, মু'মিনদের পারস্পরিক কল্যাণ কামনার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা (প্রকৃত মুসলিমরা) হলে শ্রেষ্ঠ জাতি যাদেরকে মানুষের জন্য আবির্ভূত করা হয়েছে। তোমরা ভালো কাজ করার আদেশ দাও, খারাপ কাজ করতে বারণ করো এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করো।” [সূরা আলু-'ইমরান, ৩:১িও]
রাষ্ট্র ক্ষমতা: ইসলামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক একটি কাজ। এ রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে উন্নত চরিত্র। শাসক তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন যাতে রাষ্ট্রটি একটি নৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
মাক্কী যুগে চারিত্রিক ও বিশ্বাসগত ভিত্তি তৈরির প্রশিক্ষণের ফলাফল হাতেনাতে পাওয়া যায়; ইসলামে অগ্রগামী সাহাবিদের প্রথম ৫০ জনের মধ্যে ২০ জনের বেশি সাহাবি নেতৃত্বের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষরা ছিলেন এ প্রথম প্রজন্মের সাহাবিদের মধ্যে। আকীদার বিশুদ্ধতা, আত্মিক পরিশুদ্ধতা ও চারিত্রিক উন্নতির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশিক্ষণ পান প্রথম যুগের সাহাবিরা। মানবেতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষক ও উত্তম প্রশিক্ষক নবিজির হাতে তাঁদের দীক্ষা সম্পন্ন হয়। তাঁরা ছিলেন কাফেলার নেতা এবং উম্মাহর পথপ্রদর্শক। রাসূলুল্লাহর সাথে নিয়মিত দেখা হওয়া ও তাঁর থেকে দীক্ষা পাওয়া সাহাবিরা নিজেদেরকে কতটাই-না সৌভাগ্যবান ভাবতেন!
টিকাঃ
৩৪১. আল-মিনহাজুল-কুরআনি ফী আত-তাশরী' (পৃ. ৪৩৩)।
৩৪২. দেখুন: আল-গাদবান, আত-তারবিয়াহ আল-কিয়াদিয়্যাহ (১/২০১)।
৩৪৩. প্রাগুক্ত (১/২০২, ২০৩)।