📘 রউফুর রহীম 📄 আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ

📄 আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ


রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সাহাবিদেরকে আত্মপরিশুদ্ধির প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলেন। কুরআনের আলোকে তিনি তাঁদেরকে এমন পথ বাতলে দেন যে পথ তাঁদেরকে আত্মশুদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে। প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক ছিল:

* আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ ও তাঁর কুরআন নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া।
* আল্লাহর জ্ঞানের ব্যাপ্তি, সৃষ্টিজগতের সবকিছু তাঁর জ্ঞানের পরিবেষ্টনে থাকা এবং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের সবকিছু সম্বন্ধে তাঁর অবগতির বিষয়ে নিবিষ্টভাবে ভাবা।
* আত্মশুদ্ধি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো, আল্লাহর 'ইবাদাতে নিমগ্ন হওয়া। কারণ, 'ইবাদাতই একমাত্র জায়গা যেখানে মানুষ মাথা নত করে অবলীলায় রবের আনুগত্যের স্বীকৃতি দেয়। তাঁরই সামনে লুটিয়ে পড়ে সিজদায়। আর এমন বশ্যতা ও সিজদা পাওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহই রাখেন। অন্য কেউ নয়।

চিত্তের পরিশুদ্ধি ঘটায় ও আত্মার পবিত্রতা আনে এমন 'ইবাদাত দুই ধরনের। যেমন:

* প্রত্যক্ষ পালনীয় 'ইবাদাত। যেমন: পবিত্রতা অর্জন, সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হাজ্জ ইত্যাদি।
* ব্যাপক অর্থে ‘ইবাদাত’। এই প্রকারের ‘ইবাদাত’, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য করা হয় এমন সব কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে। ‘ইবাদাতকারীকে এর জন্য সওয়াব দেওয়া হবে এবং এটি তাঁর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে।

একজন মুসলিমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সে সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর স্মরণ, তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা ও তাসবীহ পাঠ করার মাধ্যমে তাঁর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে। কারণ, এটি খুবই স্বাভাবিক যে, কেউ যদি প্রবৃত্তির তাড়না থেকে মুক্ত হতে আপন রবের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে না পারে তবে সে শারীরিক-আত্মিক অন্যান্য বিধান পালনের জন্য যথেষ্ট শক্তি পাবে না। আর ধারাবাহিক ‘ইবাদাত’ আত্মাকে জ্বালানী, পাথেয় ও অনুপ্রেরণা সরবরাহ করে এমন শক্তি যোগায় যে, তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সে সদা তৎপর থাকে।

সালাত সকল ‘ইবাদাত’র মধ্যে অগ্রগণ্য; একজন মুসলিমের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে সালাতের ভূমিকা নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের ওপর সালাতের প্রভাব ছিল একটি অন্যরকম:

* সালাত আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিত ও তাঁর জন্য আনুগত্য প্রকাশ করতে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা যোগাত। তাঁর ডাকে সাড়া দানকারী মু’মিনদের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, “যারা তাঁদের রবের ডাকে সাড়া দেয়, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে কর্ম সম্পাদন করে এবং আমি তাঁদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।” [সূরা আশ-শুরা, ৪২: ৩৮]

প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা সালাতের প্রতিটি রোকন, প্রতিটি আমলকে দেখতেন আল্লাহর দাসত্ব করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে। তাঁরা মনে করতেন, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা ও রুহের খোরাক জোগানে সালাতের প্রভাব অপরিসীম।

* রবের সঙ্গে বান্দার একান্ত আলাপের মাধ্যম সালাত: রাসূল ﷺ সালাতের মাধ্যমে রবের সঙ্গে বান্দার একান্ত আলাপের একটি বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ বলেছেন, ‘সালাতকে আমি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দু’ভাগে ভাগ করেছি এবং বান্দা যা চাইবে তাঁর জন্য তা-ই হবে’।” যখন বান্দা বলে, ‘সকল প্রশংসা জগৎসমূহের রব আল্লাহরই।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।’ এবং যখন সে বলে, ‘যিনি করুণাময়, পরম দয়ালু।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার গুণগান করেছে।’ যখন সে বলে, ‘বিচারদিনের মালিক।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমাকে মহিমান্বিত করেছে।’ যখন বান্দা বলে, ‘আমরা কেবল তোমারই ‘ইবাদাত করি এবং তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে এবং বান্দা যা চাইবে তা-ই দেওয়া হবে।’ এবং বান্দা যখন বলে, ‘আমাদেরকে সরল পথে চালিত করো। তাঁদের পথ, যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছ; তাঁদের পথ নয়, যারা (তোমার) রোষে পতিত ও পথভ্রষ্ট।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘এটা আমার বান্দার জন্য, আর সে যা চাইবে তাঁর জন্য তা-ই দেওয়া হবে’।”

* সালাত আত্মার প্রশান্তি ও আনন্দের কারণ: যখন কোনো বিষয় রাসূলুল্লাহর মনে আঘাত দিত, তখন তিনি সালাত পড়তেন। সালাতে তাঁর চোখ শীতল হতো। রাসূল ﷺ সাহাবিদেরকে হাতেকলমে শিখিয়েছেন কীভাবে সালাত তাঁদের দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও সমস্যা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হতে পারে।

* পাপাচার রোধে সালাত প্রাচীরের মতো কাজ করে: আল্লাহ বলেন, “তোমার কাছে যে কিতাব প্রত্যাদেশ করা হয়েছে তা থেকে তুমি তিলাওয়াত করো এবং সালাত কায়েম করো। নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড়। এবং তোমরা যা করো, আল্লাহ তা জানেন।” [সূরা ‘আনকাবুত, ২৯; ৪৫]

সাহাবিরা যখন সালাত পড়তেন, তখন তাঁদের অন্তর সে সালাতের কারণে প্রশান্তি লাভ করত। সালাত থেকে তাঁরা এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি পেতেন, যা তাঁদেরকে কল্যাণমূলক কাজে, ভালো কাজে অনুপ্রেরণা জোগাত। এবং দূরে রাখত সকল অশ্লীল কাজ থেকে; সালাত তাঁদের জন্য ছিল সুদৃঢ় এক প্রাচীরের মতো, যা তাঁদেরকে পাপ করা থেকে বিরত রাখত।

টিকাঃ
৩৩১. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সালাত, পরিচ্ছেদ: প্রতি রাক'আতে সূরা ফাতিহা পাঠের আবশ্যকতা (হাদীস নং: ৩৯৫)।
৩৩২. আবু দাউদ, সালাত অধ্যায় (হাদীস নং: ১৩১৯)।
৩৩৩. আল-হাকিম (২/১৬০) তিনি বলেন, “ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী এটি সহীহ”; ইমাম যাহাবি তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন।
৩৩৪. দেখুন: আত্মার পরিশুদ্ধিতে ইসলামি মানহাজ (১/২২৭)।

📘 রউফুর রহীম 📄 মানসিক প্রশিক্ষণ

📄 মানসিক প্রশিক্ষণ


সাহাবিদেরকে রাসূল যে দীক্ষা দিতেন তা ছিল সর্বজনীন ও পরিপূর্ণ। কারণ, তিনি তাঁদেরকে কুরআনের আলোকেই দীক্ষা দিতেন, প্রশিক্ষিত করতেন। যে কুরআন মানুষ বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ আত্মা, শরীর ও মন-মননে তৈরি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষকেই সম্বোধন করে কথা বলেছে। নবি মুহাম্মাদ সাহাবিদেরকে মানসিক প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে দেখার ক্ষমতা ও চিন্তা-চেতনার গভীরতার ওপর গুরুত্ব দিতেন। কারণ, দেখার ক্ষমতা ও চিন্তা-চেতনার গভীরতা এমন এক শক্তি যা তাঁদেরকে দা'ওয়াতের পথের কষ্ট সহ্য করার মতো সক্ষম করে তুলবে। আর কুরআনের চাওয়াটা এমনই।

এমন গুরুত্বের কারণেই কুরআন মানসিক প্রশিক্ষণের জন্য একটা মানহাজ বাতলে দিয়েছে। রাসূল তাঁর সাহাবিদের প্রশিক্ষণ দিতে কুরআনের বাতলানো মানহাজেই হেঁটেছেন। মানহাজটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক নিচে বিধৃত হলো:

* নির্লজ্জ তাঁবেদারি, কারও অন্ধ অনুসরণ ও আন্দাজ-অনুমান নির্ভর সকল কিছু থেকে মন বা বিবেককে মুক্ত করা।
* যেকোনো সংবাদ শোনামাত্রই বিশ্বাস না করা। বরং বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে, দলিল-প্রমাণ দিয়ে খবরটির সত্যতা যাচাই-বাছাই করে দেখা।
* প্রকৃতিতে চলা আল্লাহর বিধি-বিধান নিবিষ্টভাবে অবলোকন এবং এর রহস্য উদঘাটনে নিমগ্ন হতে বিবেককে তাড়িত করা।
* ইসলামি শারী'আহর প্রতিটি বিধান দেওয়ার পেছনে যে হিকমা বা প্রজ্ঞা কাজ করেছে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।
* পৃথিবীর শুরু থেকে মানুষের মধ্যে চলে আসা আল্লাহর সুন্নাহ বা রীতিনীতির ধারা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা; যাতে অনুসন্ধানকারী বাপদাদা ও পূর্ববর্তীদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে। এবং বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী, শহর-নগর-বন্দর ও দেশের বিভিন্ন ঘটনা ও আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ কী কী বিধান দিয়েছেন, কেমন আচরণ করেছেন তা জানতে পারে।

📘 রউফুর রহীম 📄 শারীরিক প্রশিক্ষণ

📄 শারীরিক প্রশিক্ষণ


রাসূল যে সাহাবিদেরকে কেবল আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দিতেন তাই-ই নয়, বরং তিনি তাঁদেরকে শারীরিক প্রশিক্ষণও দিতেন। অবশ্যই, তা ছিল কুরআনের দেখানো পথেই। যাতে শরীরকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শরীর পালন করতে পারে। কোনোরূপ কাটছাঁট না করেই; কোনোরূপ বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি ছাড়াই।

কুরআন যেভাবে মানব-শরীরের প্রয়োজনীয়তার রূপরেখা এঁকেছে:
* খাওয়া ও পানের প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ।
* পোশাক-আশাকের আবশ্যকতার প্রতি নির্দেশ; নিদেনপক্ষে সতর ঢাকা যায় এবং শরীরকে শীতের প্রকোপ ও গরমের উত্তাপ থেকে রক্ষা করা এতটুকু পোশাক লাগবেই। তবে পোশাকের সৌন্দর্যের দিককে ইসলাম উপেক্ষা করেনি কখনোই। বিশেষ করে, সালাতের জন্য মাসজিদে যাওয়ার সময় সুন্দর পোশাক পরিধানকে ইসলাম উৎসাহ দিয়েছে।
* বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ।
* বিয়ে ও সংসার-ধর্ম করার প্রতি গুরুত্বারোপ; বরং অবস্থাভেদে কখনো কখনো এই বিয়েকে শারী'আহ ওয়াজিব করেছে। যিনা-ব্যভিচার, লিভ-টুগেদার ও সমকামিতাকে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছে।
* ব্যক্তি মালিকানা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকারের প্রয়োজনীয়তার প্রতি নির্দেশ; বৈধ পথে, শারী'আহ-সমর্থিত পথে ধন-সম্পদ কামাই ও জায়গা-জমির মালিক হতে ইসলামে কোনো বাধা নেই।
* ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ; এ নিরাপত্তা দিতে ইসলাম জুলুম-অত্যাচার, নিপীড়ন ও সীমালঙ্ঘনকে নিষেধ করেছে।
* কাজ ও সফলতার প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ; অলসতা না করে, আঁতেল সেজে বসে না থেকে কাজ করে রুটি-রুজির বন্দোবস্তের জন্য ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, কাজটি যাতে শারী'আহ-স্বীকৃত হয়। উদ্দেশ্য—বর্তমান ও ভবিষ্যতে ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণ সাধন।
* ঔদ্ধত্য প্রদর্শন, দাম্ভিক আচরণ ও প্রাপ্ত অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞ না হওয়া ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে বারবার সতর্ক করেছেন।

শারীরিক প্রশিক্ষণের এই ছিল মৌলিক কিছু পদ্ধতি; রাসূল ﷺ এভাবেই দীক্ষা দিতেন তাঁর সাহাবিদেরকে। যাতে করে জিহাদের মাঠের ভয়াবহতা, দা'ওয়াতর পথের কষ্ট ও জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে তাঁদের শরীরকে খুব বেশি বেগ পেতে না হয়।

📘 রউফুর রহীম 📄 উত্তম চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ দান

📄 উত্তম চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ দান


উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আকীদা-বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ; উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছাড়া কোনো বিশুদ্ধ আকীদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। রাসূল বিভিন্নভাবে, নানা পদ্ধতিতে সাহাবিদেরকে উন্নত চরিত্র অর্জনের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রাসূল বলেন, “কিয়ামাতের দিন মু'মিনের দাঁড়িপাল্লায় সুন্দর চরিত্রের চেয়ে আর কিছুই ভারী হবে না। কারণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীল ও অশালীনভাষীকে ঘৃণা করেন।” একবার নবিজিকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন কাজটি মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তখন রাসূলুল্লাহ উত্তরে বললেন, “আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র।” আবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, কোন কাজটি মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তিনি বললেন, “মুখ ও লজ্জাস্থান।” চরিত্রের বিষয়টি আল্লাহর এ দীনের দ্বিতীয় কোনো বিষয় নয়। এটা খাঁটি ঈমান ও বিশুদ্ধ আকীদার বাস্তবায়িত রূপের নামই চরিত্র। কারণ, ঈমান কেবল অন্তরের গভীরে লালিত কোনো ভাবাবেগ নয়; বরং চারিত্রিক একটি আমলের নাম ঈমান।

এজন্যই আমরা দেখি, কুরআন আকীদা-বিশ্বাসের সঙ্গে চরিত্রের একটি সুদৃঢ় মেলবন্ধন তৈরি করে দিয়েছে। রাসূল তাঁর সাহাবিদেরকে এ দীক্ষা দিতেন যে, 'ইবাদাত হলো উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি প্রকার; কারণ, আল্লাহকে দেওয়া প্রতিজ্ঞাপূরণ, তাঁর দেওয়া অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাঁর অনুগ্রহের স্বীকৃতি প্রদানের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো চরিত্র। ফলে সাহাবিদের চরিত্র গড়ে ওঠে আল্লাহর নির্দেশিত পথে; এ চরিত্রের উদ্দীপক ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল ঈমান, অনুপ্রেরণা ছিল আখিরাতে পাওয়ার আশা এবং এর উদ্দেশ্য ছিল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর পুরস্কার।

নবিজির প্রশিক্ষণের মানহাজে এসে চরিত্র তাঁর পূর্ণতা পায়; মানুষের আচরণগত কোনো দিকই বাদ পড়েনি এখানে। প্রতিটি কাজ, প্রতিটি 'ইবাদাতের চারিত্রিক দিক রয়েছে; সালাতের চারিত্রিক দিক বিনম্রতা, কথার চারিত্রিক দিক অনর্থকতা থেকে জিহ্বাকে সংযত করা। যৌনতার চারিত্রিক দিক হলো আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা ও তাঁর নিষিদ্ধতা থেকে বেঁচে থাকা। অন্যের সঙ্গে লেনদেনেরও চারিত্রিক কিছু দিক আছে; বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মাঝামাঝি একটি অবস্থান মেনে চলাই এর চরিত্র। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজে নামার নামই সামাজিক চরিত্র। রাগে ফেটে পড়ার আগেই ক্ষমা করে দেওয়া মহৎ লোকের কাজ। দুশমনের দুশমনি মোকাবিলারও আছে কিছু আদবকেতা; সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়িতে না গিয়ে শত্রুতা প্রতিহত করে বিজয় ছিনিয়ে আনাই এর চারিত্রিক দিক। মুসলিমের জীবনের এমন একটি দিকও খুঁজে পাওয়া যাবে না যার চারিত্রিক সমাধান ইসলাম দেখায়নি। চারিত্রিক মানহাজের প্রথমদিকে আল্লাহ তাঁর তাওহীদের অবস্থান দিয়েছেন। কুরআন এ চিত্রটি এঁকেছে এভাবে—

"আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। এটা একটা খারাপ কাজ ও নিকৃষ্ট পথ। আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন ন্যায্য কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কোরো না। যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি ক্ষমতা দিয়েছি; তবে সে যেন হত্যার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে। ইয়াতিম বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সুন্দরতম পদ্ধতি ছাড়া তার সম্পদের কাছেও যাবে না। আর ওয়াদা পূরণ করবে। ওয়াদা সম্পর্কে নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করা হবে। মাপ পুরোপুরি দেবে এবং সঠিক নিক্তিতে ওজন করবে। যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই তার পেছনে লেগো না। কান, চোখ ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। জমিনে দম্ভভরে চলো না। এসবের মধ্যে প্রতিটি খারাপ কাজ তোমার রবের কাছে অপছন্দনীয়।" [সূরা ইসরা, ১৭: ৩২-৩৮]

টিকাঃ
৩৩৫. আত-তিরমিযি, সদ্ব্যবহার ও পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা অধ্যায়, সচ্চরিত্র ও সদাচার পরিচ্ছেদ, হাদীস নং: (২০০২), এ হাদীসটি "হাসান সহীহ”।
৩৩৬. আত-তিরমিযি, সদ্ব্যবহার ও পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা অধ্যায়, সচ্চরিত্র ও সদাচার পরিচ্ছেদ, হাদীস নং: (২০০৪), এ হাদীসটি “সহীহ গারীব”।
৩৩৭. দেখুন: মুহাম্মাদ কুতুব, দিরাসাত কুরআনিয়্যা (পৃ. ১৩০)।
৩৩৮. দেখুন: সূরা আল-মু'মিনূন-এর ১-১১ আয়াত, সূরা আল-আন'আম-এর ১৫১-১৫৩ আয়াত, সূরা আর-রা'দ-এর ১৯-২২ আয়াত এবং সূরা আল-ইসরা-এর ২৩-২৮ আয়াত।
৩৩৯. আল-ওয়াসাতিয়্যাতু ফিল-কুরআনিল-কারীম (পৃ. ৫৯১)।
৩৪০. দেখুন: তাফসীর আল-কাসিমি (৯/৩১০)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px