📄 আদম (আ.) ও শয়তানের গল্প থেকে সাহাবিদের শিক্ষা
আল্লাহ কুরআনে আমাদের আদি পিতা আদম ও ইবলিসের গল্পটি বর্ণনা করেছেন। আর মুহাম্মাদ তাঁর সাহাবিদেরকে সে গল্পটি শোনান। ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন মানুষ ও তাঁর চিরশত্রুর মধ্যে ঘটা দ্বন্দ্বের প্রকৃতি; যে শত্রু তাঁদের পিতা আদমকে ধোঁকা দিতে সদা তৎপর ছিল। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত তিলাওয়াত করে করে রাসূল ﷺ সাহাবিদের কাছে শয়তানের শত্রুতার স্বরূপ বুঝিয়ে দিতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “হে আদমসন্তান! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিতনায় না ফেলতে পারে, যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, তাঁদেরকে তাঁদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল। সে নিজে ও তাঁর দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে তোমরা তাঁদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, শয়তানদেরকে আমি তাঁদের অভিভাবক করেছি।” [সূরা 'আরাফ, ৭:২৭]
আদি পিতা আদমের ঘটনা ও শয়তানের সঙ্গে তাঁর লড়াই ও সংগ্রামের কথা কুরআনের যে যে আয়াতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলো প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদেরকে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছে। যেমন:
* আদমই প্রথম মানুষ।
* ইসলামের মণি হলো আল্লাহর জন্য নিঃশর্ত আনুগত্য।
* মানুষের একটা সহজাত প্রবণতা হলো সে ভুল করে এবং পাপে লিপ্ত হয়।
* আদমের ভুল করাটা একজন মুসলিমকে আল্লাহর ওপর ভরসার করার আবশ্যকতা শিক্ষা দেয়।
* তাওবাহ ও ইসতিগফারের কথা শিক্ষা দেয়।
* অহংকার ও হিংসাকে পরিহার করে চলার শিক্ষা।
* আদম, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের বংশধরদের কমন শত্রুর নাম ইবলিস।
* সাহাবিরা এ ঘটনা থেকে পারস্পরিক সম্বোধনের ক্ষেত্রে মার্জিত ভাষা ব্যবহার করা শিখলেন।
যে যে পন্থায়, যে যে উপায়-উপকরণে সাহাবিরা শয়তানের মোকাবিলা করেছেন, তাঁর একটা চিত্র কুরআনের নিচের আয়াতটিতে পাওয়া যায়, আল্লাহ বলেন, “তুমি আমার বান্দাদেরকে কেবল যা উত্তম তা বলতে বলো। নিশ্চয়ই শয়তান তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উসকানি দেয়। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা ইসরা, ১৭: ৫৩]
টিকাঃ
৩৩০. ড. 'আলি 'আবদুল-হালীম, ফিকহ আদ-দা'ওয়া (১/৪৭১, ৪৭২)।
📄 জগৎ, জীবন ও বিভিন্ন সৃষ্টজীবের প্রতি সাহাবিদের দৃষ্টিভঙ্গি
সাহাবিদেরকে আল্লাহর কিতাব কুরআন শেখানোর কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন রাসূল। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে তিনি তাঁদের আকীদা-বিশ্বাস এবং দুনিয়া ও জীবনের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধরে দেন। পৃথিবীর উৎপত্তি ও তাঁর পরিণতি সম্পর্কেও রাসূল তাঁদেরকে সুস্পষ্ট ধারণা দেন। এভাবেই কুরআন সৃষ্টিজগৎ ও এর মধ্যে অবস্থিত সৃষ্টজীব সম্পর্কে সাহাবিদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনাকে একটা বিশুদ্ধ আকৃতি দেয়। ধ্বংসশীল এই জীবনের আসল ঠিকানা কোথায়, তাঁরও প্রকৃতি উন্মোচন করে দেয় কুরআন তাঁদের সামনে। প্রকৃত ঠিকানা ও মুক্তি পাওয়ার উপায়গুলো সাহাবিদেরকে রাসূল বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তাঁদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজের প্রকৃত গন্তব্য এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে যাওয়ার সফলতার বিষয়টি জানবে, সে তাঁর সর্বশক্তি ব্যয় করে মুক্তির সে পথে পা বাড়াবেই। এভাবেই সে কিয়ামতের দিন পেয়ে যাবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতে যাওয়ার মতো মহাসফলতা।
জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে যাওয়ার মতো সফলতার বিষয়ে রাসূলুল্লাহর অধিক জোর দেওয়ার কারণ এই যে, দুনিয়ার জীবন, যত দীর্ঘই হোক না কেন, অনন্তকালীন জান্নাতের তুলনায় তা খুবই ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের সামগ্রী, যতই চোখ ধাঁধানো কিংবা উপভোগ্য হোক না কেন, তা আসলে খুবই সামান্য, খুবই নগণ্য। দুনিয়ার খেল-তামাশা, ধোঁকা-প্রবঞ্চণা অনেক সময় দাওয়াতের মাঠে কাজ করেন এমন অনেককেই হতবুদ্ধি করে দেয়। আপন কর্তব্য ভুলে গিয়ে তাঁরা দুনিয়ার জীবনে মজে থাকে, ভোগের সাগরে হাবুডুবু খায়। দুনিয়ার সঙ্গে অহেতুক সম্পৃক্ততাই তাঁদেরকে এমন খাই খাই স্বভাবের করে তোলে। মুসলিম উম্মাহর কাছে দা'ওয়াতের বাণী পৌঁছানো, তাঁদেরকে গাফিলতির ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার পথে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস নিয়ে মত্ত থাকাটা, নিঃসন্দেহে, মস্ত বড় একটা বিপর্যয়। তবে এখানে খেয়াল করার বিষয়টি হলো, দুনিয়ার কিছুই ভোগ করা যাবে না, সবকিছুতেই মানা—ব্যাপারটি কিন্তু আদৌ তেমন নয়। বরং শারী'আহ একে পরিশীলিত করে এর জন্য একটা সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করা যাবে যা কাজে লাগবে আখিরাতে যাওয়ার বৈতরণীরূপে।