📄 সাহাবিদের মনে জাহান্নামের বর্ণনার প্রভাব
সাহাবিরা আল্লাহকে ভয় করতেন, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতেন। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে তাঁদের আশাও ব্যক্ত করতেন। নবিজির দীক্ষার বিরাট প্রভাব পড়েছিল তাঁদের মনে। নবি মুহাম্মাদ ﷺ কুরআনের যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সেটা ভালো কাজ করেছিল সাহাবিদের মনে। কারণ, কুরআন কিয়ামাতের ভয়াবহতা, তাঁর নিদর্শন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছে: পৃথিবী সংকুচিত হওয়ার আলোচনা থেকে শুরু করে একে একে পৃথিবীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া, আকাশের ভাঁজ হওয়া, পাহাড়ের পশমের মতো ধুনিত হওয়া, সাগরের উথলে ওঠা, আকাশের ফেটে পড়া, সূর্যের গুটিয়ে যাওয়া, চাঁদে গ্রহণ লাগা, নক্ষত্রের খসে পড়াসহ কিয়ামাতের অনেক কিছুই কুরআন বর্ণনা করেছে সবিস্তারে। কুরআন কাফিরদের করুণ দশারও ছবি এঁকেছে। বর্ণনা দিয়েছে তাঁদের লাঞ্ছনা, অপমান, অপদস্থতা, দুঃখ, আফসোস নিজেদের কাজের ব্যর্থতা ইত্যাদিরও। কাফিরদেরকে জাহান্নামের কাছে একত্র করার কথা, মু'মিনদের পুল-সিরাত পার হওয়ার বর্ণনাও দিয়েছে কুরআন।
কুরআনে বিষয়গুলোর এত সুন্দর উপস্থাপন মু'মিনদের হৃদয়ে ইতিবাচক দারুণ প্রভাব ফেলে। জাহান্নামের শাস্তির বিভিন্ন ধরন এমনভাবে কুরআন চিত্রায়িত করেছে যে, প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কাছে মনে হতো তাঁরা যেন সেগুলোকে তাঁদের চোখের সামনেই দেখছে।
টিকাঃ
৩২৭. দেখুন: আল-ওয়াসাতিয়্যাতু ফিল-কুরআনিল-কারীম (পৃ. ৪০২)।
📄 তাকদীরের সঠিক অনুধাবনের প্রভাব
নুবুওয়াতের মাক্কি যুগে কুরআন তাকদীরের বিষয় আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। যেমন: আল্লাহ বলেন, "আমি সবকিছুই সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [সূরা কুমার, ৫৪:৪৯]
নবিজিও সাহাবিদের মনে খুব ভালোভাবেই তাকদীরের অনুধাবনকে রোপণ করে দিতেন। তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা করে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে তাঁর সবকিছুই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। সাহাবিদের মনে তাকদীরের যে সঠিক বুঝ ও সুদৃঢ় বিশ্বাসের জন্ম নেয় তাঁর ফলাফল খুবই ইতিবাচক ছিল। এই ইতিবাচক ফলাফলের কিছু দিক হলো:
* আল্লাহর 'ইবাদাত যথাযথভাবে আদায় করা।
* তাকদীরে বিশ্বাস স্থাপন শির্ক থেকে নিষ্কৃতির একমাত্র পথ। কারণ, একজন মু'মিন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন: ক্ষতি সাধন, উপকার প্রদান, সম্মানিত করা, অপমানিত করা, উত্থান কিংবা পতন ঘটানোর ক্ষমতা ও শক্তি-সামর্থ্য কেবল আল্লাহই রাখেন।
* বীরত্ব ও সাহসিকতা: তাকদীর বিষয়ে সাহাবিদের পূর্ণ আস্থা থাকার কারণে মৃত্যু-ভয় তাঁদের থেকে দূর হয়ে যায়; তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কেবল আল্লাহর হাতেই রয়েছে মৃত্যুর বিষয়টি।
* ধৈর্যধারণ, সওয়াব প্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন।
* অন্তরের প্রশান্তি ও বিবেকের পরিতুষ্টি লাভ।
* আত্মমর্যাদা ও প্রত্যয় অর্জন এবং সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্তি।
সাহাবিদেরকে রাসূলুল্লাহর প্রশিক্ষণ ঈমানের বিষষগুলো শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষ, জীবন ও পৃথিবী সম্পর্কে তাঁদের যে ভুল ধারণা ছিল, তাও তিনি শুধরে দেন। যাতে করে একজন মুসলিম আল্লাহর দেওয়া আলোর পথে চলতে পারে। অনুধাবন করতে পারে পৃথিবীতে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাঁর কাছে যা চেয়েছেন সেটা যাতে চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। অলীক কল্পনা ও কুসংস্কার থেকে যেন বেঁচে থাকতে পারে।
টিকাঃ
৩২৮. দেখুন: ইসলামি দা'ওয়াহ প্রসারে জিহাদের গুরুতব (পৃ. ৫৯)।
📄 মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে সাহাবিদের অনুধাবন
মানুষের সামনে আল্লাহ ও আখিরাতের পরিচয় তুলে ধরার পর কুরআন মানুষকে তাঁর নিজের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেয়। এবং মানুষের কৌতূহলী মনের অনেক না জানা প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। যেমন: আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? এবং কোথায় যাব? একজন দুজন না, সব মানুষের মনেই এ প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায় সমানভাবে। সে এগুলোর সঠিক উত্তরও জানতে চায়।
কুরআন সাহাবিদের সামনে মানুষ-সৃষ্টির রহস্য, গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা তুলে ধরে। তাঁদের আদি নিবাস সম্পর্কেও কুরআন তাঁদেরকে অবহিত করে যেখানে তাঁরা আবার ফিরে যাবে। জানিয়ে দেয় দুনিয়ার জীবনে তাঁদের কী করণীয় আর কী বর্জনীয়। মৃত্যুর পরের ঠিকানা সম্পর্কেও কুরআন তাঁদেরকে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
টিকাঃ
৩২৯. দেখুন: মুহাম্মাদ কুতুব, মানহাজুত-তারবিয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ (২/৫৪)।
📄 আদম (আ.) ও শয়তানের গল্প থেকে সাহাবিদের শিক্ষা
আল্লাহ কুরআনে আমাদের আদি পিতা আদম ও ইবলিসের গল্পটি বর্ণনা করেছেন। আর মুহাম্মাদ তাঁর সাহাবিদেরকে সে গল্পটি শোনান। ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন মানুষ ও তাঁর চিরশত্রুর মধ্যে ঘটা দ্বন্দ্বের প্রকৃতি; যে শত্রু তাঁদের পিতা আদমকে ধোঁকা দিতে সদা তৎপর ছিল। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত তিলাওয়াত করে করে রাসূল ﷺ সাহাবিদের কাছে শয়তানের শত্রুতার স্বরূপ বুঝিয়ে দিতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “হে আদমসন্তান! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিতনায় না ফেলতে পারে, যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, তাঁদেরকে তাঁদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল। সে নিজে ও তাঁর দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে তোমরা তাঁদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, শয়তানদেরকে আমি তাঁদের অভিভাবক করেছি।” [সূরা 'আরাফ, ৭:২৭]
আদি পিতা আদমের ঘটনা ও শয়তানের সঙ্গে তাঁর লড়াই ও সংগ্রামের কথা কুরআনের যে যে আয়াতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলো প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদেরকে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছে। যেমন:
* আদমই প্রথম মানুষ।
* ইসলামের মণি হলো আল্লাহর জন্য নিঃশর্ত আনুগত্য।
* মানুষের একটা সহজাত প্রবণতা হলো সে ভুল করে এবং পাপে লিপ্ত হয়।
* আদমের ভুল করাটা একজন মুসলিমকে আল্লাহর ওপর ভরসার করার আবশ্যকতা শিক্ষা দেয়।
* তাওবাহ ও ইসতিগফারের কথা শিক্ষা দেয়।
* অহংকার ও হিংসাকে পরিহার করে চলার শিক্ষা।
* আদম, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের বংশধরদের কমন শত্রুর নাম ইবলিস।
* সাহাবিরা এ ঘটনা থেকে পারস্পরিক সম্বোধনের ক্ষেত্রে মার্জিত ভাষা ব্যবহার করা শিখলেন।
যে যে পন্থায়, যে যে উপায়-উপকরণে সাহাবিরা শয়তানের মোকাবিলা করেছেন, তাঁর একটা চিত্র কুরআনের নিচের আয়াতটিতে পাওয়া যায়, আল্লাহ বলেন, “তুমি আমার বান্দাদেরকে কেবল যা উত্তম তা বলতে বলো। নিশ্চয়ই শয়তান তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উসকানি দেয়। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা ইসরা, ১৭: ৫৩]
টিকাঃ
৩৩০. ড. 'আলি 'আবদুল-হালীম, ফিকহ আদ-দা'ওয়া (১/৪৭১, ৪৭২)।